ক্রাশ কনফেশন
লেখাঃ আফিয়া আপ্পিতা
অন্তিম পর্ব
স্থির দৃষ্টিতে ফোনের দিকে চোখ ফেলে বারান্দায় বসে আছি। স্ক্রিনে শ্যামবতার ঘুমন্ত ছবি। লুকিয়ে তুলেছিলাম ক'দিন আগে। যাতে তার অনুপস্থিতিতে তাকে দেখতে পারি। "শ্যামবতা" সম্বোধনের মানুষটাকে ভীষণ ভালোবাসি আমি। চাইলেও মন থেকে সরাতে পারি না। এই যে, আজ সারাদিন এই মানুষটাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ফলাফল প্রতিবারই শূন্যতে ঠেকেছে। একমুহূর্তের জন্য ও ভুলতে পারি নি। বরং সময়ের সাথে সাথে তাকে মনে পড়ার মাত্রাটাও বাড়ছে। তার শূন্যতা ঘিরে ধরছে আমায়। সারাদিন আমায় বকে, তাও সামনে থাকলে শান্তি লাগে। আজ সে আমার থেকে দূরে,তাই মনটা অশান্ত লাগছে। সকালে দেখেছি অথচ মনে হচ্ছে কত যুগ দেখিনি! তাকে একবার দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। সন্ধ্যা থাকে বারান্দায় বসে আছি একটাবার দেখব বলে। কিন্তু বিধিবাম, আজ সে বারান্দাতেই আসে নি। আচ্ছা অফিস থেকে ফিরেছে তো! নাকি আমি চলে গেছি ভেবে জরিনার কাছে চলে গিয়েছে। যদিও জানি জরিনাকে সে ভালোবাসে না। তাও কেন যেন সহ্য করতে পারি না এই নামটা। মনটা হু হু করে উঠলো। চোখে জলেরা উঁকি দিল। তখনি পাশ থেকে আওয়াজ এলো,
" ভালোবাসিস ওকে?"
আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে আনমনেই জবাব দিলাম,
"কটকটির থেকেও বেশি।"
পরমুহূর্তেই কারো হাসির শব্দ কানে এলো। চমকে গিয়ে পাশে তাকালাম। দোলনার অপর প্রান্তে শ্যামবতা বসে আছে। হাসছে বত্রিশ দাঁত দেখিয়ে। হাসির শব্দটা তারই। শ্যামবতার হাসি দেখে আমার প্রাণ জুড়ে গেল। এই হাসি দেখার সুযোগ হয়নি কত দিন! শ্যামবতা আমার সামনে হাসে না বললেই চলে! সারাদিন গম্ভীরমুখে হুংকার দিতে থাকে। আজ প্রথম শ্যামবতা হাসলো আমার জন্য। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখে গেলাম শ্যামবতার ভুবন ভুলানো সেই হাসি। আমার তাকিয়ে থাকার মাঝেই শ্যামবতা হাসতে হাসতে বলল,
"এই ভাবনা নিয়ে আমাকে জরিনার কাছে দিতে গিয়েছিলি? কী বলছিলি? অভিহা চলে যাচ্ছে চিরতরে! জোক অফ দ্যা ইয়ার। "
বলে হু হা করে হাসতে লাগলেন। এতক্ষণ আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো এটা কল্পনা। কারণ শ্যামবতা এখানে কেন আসবেন? কিন্তু শ্যামবতার এই খোচানো কথা শুনে বুঝতে পারলাম এটা বাস্তবতা। শ্যামবতা এসেছে। আমাকে তার জন্য কাঁদতে দেখে খোচানোর জন্য এসেছে।। আমি চোখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
" কেন এসেছো?আমাকে অপমান করতে?"
শ্যামবতা হাসল। হাতে থাকা ফোনটা আমার দিকে তাক করে বলল,
"তুই তো আমায় বিবাহিত ব্যাচেলর উপাধি ধরিয়ে দিয়ে চলে এসেছিস। এটাই মোক্ষম সময় জরিনাকে বিয়ে করার। ভাবছি কাল বিয়ে করবো। কিন্তু জরিনার জন্য বিয়ের শাড়িই পছন্দ করতে পারছি না। তুই একটা শাড়ি পছন্দ করে দিবি? শত হলে তুই আমার প্রথম বউ। যাবার আগে স্বামীর সুখের জন্য স্বামীর শেষ আবদার পূরণ করা তোর কর্তব্য !"
গলায় দল পাকিয়ে থাকা কান্নাদের বাধ ছুটাবার জন্য শ্যামবতার নুন ছিটানো কথাগুলোই যথেষ্ট ছিলো। আমি নিজেকে আটকাতে পারলাম না। অন্যদিকে তাকিয়ে কেঁদে দিলাম শব্দ করে। কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
"আমাকে কষ্ট দিয়ে কী মজা পাও তুমি?"
"পান খেয়ে মানুষ যে মজা পায় তোকে কাঁদিয়ে তার চেয়ে ও বেশি মজা পাই আমি। এই জন্যই চলে এসেছি।"
ঠাট্টাসূচক গলা শ্যামবতার। আমি উঠে দাঁড়ালাম। থাকবো না এখানে। এই মানুষটা আমাকে মনের কথা তো বলবেই না। উল্টো আরো কষ্ট দিবে। কালই সকালেই আমি একতারা হাতে সন্নাসীর বেশে বেরিয়ে যাবো বাসা থেকে। ফিরবো না আর কখনোই। চোখ মুছে রুমের দিকে অগ্রসর হলাম। দু'কদম বাড়াতেই শ্যামবতার গরুর চিবানো জবরের মতো কথা কানে এলো,
"তাঙশিনুল সারাঙ হা ইয়ো। নান্নু নিনান্নু প্রীতিসুথিন। ইস লিবে দিস। অ্যাঁই সাঁইতে। দুস্তাত দারাম। ইনবিগ কিটা। "
আমার রাগ হলো। এখনো সে মজা করবে? রাগটাকে সামলাতে পারলাম না। তেড়ে গিয়ে শ্যামবতার গ্রে টি-শার্টের কলার ধরে বললাম,
"তোমাকে কটকটি থেকে বেশি প্রাধান্য দেয়াটাই কী আমার অপরাধ! আমার হৃদমাঝারে বসিয়ে কটকটির ব্যবসা ধরিয়ে দেয়াটাই কী আমার অপরাধ? যার জন্য তুমি আমাকে এত শাস্তি দিচ্ছো, আমার অনুভূতি নিয়ে মজা করছো! বলো শ্যামবতা?"
আমার কথায় শ্যামবতা অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তার হাসি আমার রাগ আরো বাড়িয়ে দিলো। আমি ঝাঁজালো গলায় বললাম,
"কিল্লাই এইচ্ছা করোর তুঁই? আঁরে আগলাই লোইলে কী অয়? বিশ্বাস করবানি শ্যামবতা? আই আঁর হারিয়েন্না এগান সইতাম। তোয়ার কাছে থাই তোঁয়ার চিল্লানি ও হুইনতাম হারিয়েন্না। দূরে আই চিল্লানী নো হুনি ও থাইকত হারি না। কীরুম আঁই? নিজেরে আঁর বাপ্পারাজের মাইয়্যোলা ভার্সন মনে অয়। এত ছ্যাকা খাই অজম কইত্তাম হারি না। আঁর মরি যাইতাম মন চায়। মরি যামু কই, তোঁয়ার দিগে রেইনলে বেক ভুলি যাই। এত ভালা হাই তোঁয়ারে। তুঁই বুঝোনা কিল্লাই শ্যামবতা? কত্তে বুইঝবা তুঁই? আই মরি গেলে নি? তুঁই আগলাই নো লোইলে আই মরি ও শান্তি হাইতান্নো। মইরবের আগে আঁরে টানি লো না নিজের কাছে!"
(তুমি এমন কেন করছো? আমাকে আগলে নিলে কী হয়? বিশ্বাস করবে শ্যামবতা? আমি আর এসব সহ্য করতে পারছিনা। তোমার কাছে থেকে তোমার বকা ও শুনতে পারিনা। দূরে গিয়ে বকা না শুনে ও থাকতে পারি না। কী করবো আমি? নিজেকে আমার বাপ্পারাজের ফিমেল ভার্সন মনে হয়। এত ছ্যাকা খেয়ে হজম করতে পারি না। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। মরে যাবো বলি, কিন্তু তোমার দিকে তাকালে সব ভুলে যাই। এত ভালোবাসি তোমাকে। তুমি বুঝোনা কেন শ্যামবতা? কখন বুঝবে তুমি? আমি মারা গেলে? তুমি আগলে না নিলে আমি মরে গিয়ে শান্তি পাবো না। মারা যাওয়ার আগে আমাকে নিজের কাছে টেনে নাও না!)
কেঁদে দিলাম আবারো। আমার কান্নার জবাবে শ্যামবতা আবারো হাসলেন। রুম থেকে জানালা ভেদ করে আসা আলোয় তা স্পষ্ট চোখে পড়লো। হাসি থামিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে মাদকমাখা গলায় বলল,
" তোমার রাগ, ক্ষোভ, কান্নাগুলো চিৎকার করে তোমার মনে আমার জন্য জায়গাটা দেখিয়ে দেয় যেন। নিজেকে সুখী ভেবেই হাসি পায়। তোমার মুখে 'তুমি' এবং 'শ্যামবতা' শব্দ দুটো পটলের রসমালাইয়ের মতো রসালো শুনায়। খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। কী করা যায় বলতো? এত রসালো করে ডাকো কেন তুমি?"
শ্যামবতার মৃদুস্বরে বলা কথাটা কানে যেতেই আমার কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। হা করে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। শ্যামবতা আদৌ আমাকে এমন কিছু বলেছে! নাকি আমিই উল্টোপাল্টা শুনছি! ব্যাপারটা বোধগম্য হলো না আমার। সম্ভবত কল্পনা এবং বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝাতেই শ্যামবতা আমার চোখের পানি মুছে দিলো। আমি জমে গেলাম। স্ট্যাচু হয়ে ওভাবেই ঝুকে রইলাম শ্যামবতার দিকে। শ্যামবতা আমার মুখে ফু দিলেন। ঘোর ভাঙলো আমার। শ্যামবতা সেই নেশাভরা কন্ঠে বললেন,
"তুমি কী কিছুই বলবে না? আমি তোমার উত্তরের অপেক্ষায় আছি।"
শ্যামবতার 'তুমি' সম্বোধন আমাকে জমিয়ে ক্ষীর বানিয়ে দিচ্ছে। আমার বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডটা লাফাচ্ছে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো। আমি ধরে রাখতে পারছি না। খেই হারিয়ে ফেলছি। কোনমতে তোতলিয়ে বললাম,
"ত্তুউমমিইইই আয়ায়ামমাককে 'ত্তুতুউমিই' ডায়াকবে না। 'ত্তুউই' ক্কোরররে ড্ডায়াকবে।"
বলে সরে আসতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। শ্যামবতা ধরে বসালেন তার পাশে। কাছে টেনে নিয়ে হেসে বলল,
" বলেছিলাম না? আমি অন্য ক্যারেক্টারে এলে সইতে পারবি না। আমার 'তুমি' সম্বোধনই সহ্য করতে পারছিস না তুই। এই সাহস নিয়ে কিস টিসের ধমক দিয়েছিলি ভাবতেই হাসি পাচ্ছে আমার। আরো কত কিছু হওয়া বাকি, সব হতে গেলে কী করবি তুই? "
আমার হৃদপিন্ডটা রীতিমতো উসাইনের গতিতে দৌঁড়াচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে বেরিয়ে পানিতে ডুবে মরবে। যা আমি চাচ্ছি না। হৃদপিণ্ড বাঁচাতে শ্যামবতার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাইলাম। শ্যামবতা আটকালো আবারো।
"সেই সন্ধ্যা থেকে আমাকে এক নজর দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছিস। না দেখে ফোনে আমার ছবির দিকে তাকিয়ে চোখের জ্বল ফেলছিস। এখন যখন আমি কাছে এলাম অমনি দূরে যেতে চাইছিস! কারণটা কী বলতো? তুই চাইছিসটা কী? আমি চলে যাই? "
আমার উঁকিঝুঁকি মারা শ্যামবতা দেখে ফেলেছেন! সব বুঝেছে ফাজিলটা। তাই যেই কথা শুনতে চাচ্ছি সেই কথা না বলে ইচ্ছে করেই আমাকে পচাচ্ছে। বদলোক একটা! আমি অন্যদিকে তাকিয়েই ভেংচি কাটলাম। পরমুহূর্তেই শ্যামবতার হাসির শব্দ কানে এলো। তাও তাকালাম না আমি। শ্যামবতা গম্ভীরকন্ঠে বলল,
"চিৎপটাং পেত্নী? "
আমি চমকালাম। আরে! এটা তো ক্রাশ কনফেশন আর চিরকুটের কথা। তার মানে এটাও শ্যামবতা ছিলো! বিস্মিত চোখে তাকালাম শ্যামবতার দিকে। বললাম,
"চিরকুট, ক্রাশ কনফেশন! "
শ্যামবতা বিরক্তিসূচক ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"ভালোবাসা আমার, বউ আমার। কার এত বড় সাহস আছে তাকে বিরক্ত করার! ঠ্যাং ভেঙে ঝুনঝুনি বাজাবো। তোকে বিরক্ত করার,মারার, ভালোবাসার, সব কিছুর অধিকার এই দিপ্ত ছাড়া কারো নেই বুঝলি চিৎপটাং পেত্নী?"
আমার হৃদপিণ্ড আবার লাফিয়ে উঠলো। আমি লাজুক মুখে কথা না বলে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। যার অর্থ বুঝেছি। শ্যামবতার দিকে আড়চোখে তাকাকেই চোখাচোখি হলাম। শ্যামবতার সূচালো দৃষ্টি আমার দিকেই। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। শ্যামবতা মৃদুস্বরে ডেকে উঠল,
"শুনো?"
চোখ তুলে তাকালাম তার দিকে। চোখাচোখি হতেই শ্যামবতা নেশাভরা কন্ঠে বলল,
"তাঙশিনুল সারাঙ হা ইয়ো। নান্নু নিনান্নু প্রীতিসুথিন। ইস লিবে দিস। অ্যাঁই সাঁইতে। দুস্তাত দারাম। ইনবিগ কিটা। "
শ্যামবতার এই জগাখিচুরি কথা শুনে রাগ হলো। কীসব বলে সারাদিন! যা শুনতে চাইছি সেটা না বলে কাঁঠালের বিচির ভর্তার চেহারার কথা ছাড়ছে! না জানি আবার আমাকে গালি টালি দিচ্ছে নাকি! এই অদ্ভুত লোকের বিশ্বাস নেই। যেকোন মুহূর্তে মজা আর রেগে যাওয়ার রোগ আছে। আমাকে গালি দিয়েছে ভেবে রাগত স্বরে বললাম,
"তুমি আমাকে আবার গালি দিচ্ছো! ভেবেছো আমি বুঝি না?"
শ্যামবতা কপাল চাপড়ালো। আমার মাথায় চাটি দিয়ে বলল,
" সত্যিই,তোর মাথায় গোবরে ভরা। একটা মাকাল ফলের চারা রোপণ করে দিলেই বেড়ে উঠবে। ক'দিন পরে ফল ও দিবে। তুই সেই ফল বিক্রি করে নিজের নামে পাগলা গারদ প্রতিষ্ঠিত করতে পারবি। বুদ্ধু কোথাকার! নিজের পছন্দের উপর বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে আমার। কী বাজে চয়েজ আমার! ইয়াক! বমি পাচ্ছে। মানুষ আবার পোয়াতী ভাবে নাকি এই ভয়েই বমি গিলে ফেলছি। অন্যথায় গড়গড় করে তোর গায়েই বমি করতাম। তাও যদি তোর শিক্ষা হতো। বুদ্ধু! ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে কয়েকটা চড় মারি। শালা, এই মায়ার জন্য হাত ও উঠে না। "
রাগে ফোঁসফোঁস করছে শ্যামবতা। তার মানে আমি উল্টো কথা বলেছি! শ্যামবতা গালি দেয়নি! কিন্তু কথা গুলো তো গালিই মনে হয়েছে। গালি না হলে এই কথার কী মানে? এর আগে তো কখনো শুনিনি। শ্যামবতাকে জিজ্ঞেস করি। তার কথার মানে সে জানতে পারবে। ভেবেই শ্যামবতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
"তোমার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে তুমি আমাকে জঘন্য গালি দিয়েছো। আচ্ছা গালি না দিলে কী বলেছো? অর্থ বলো? সকাল থেকে বারবার এই কথাগুলো কেন বলছো!"
জবাবে শ্যামবতা রেগে তাকাল আমার দিকে। তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। সর্বনাশ! সাহেব রেগে গেছেন! সম্ভবত আমিই ভুল রিয়েক্ট করে ফেলেছি। আগে কথার মিনিং জানি তারপর সঠিক রিয়েক্ট করবো। জানতে হলে আগে সাহেবকে মানাতে হবে। আমি লেগে গেলাম কাজে। শ্যামবতাকে হালকা ঝাকিয়ে বললাম,
"শ্যামবতা? ও শ্যামবতা? বলো না কী বলেছিলে?"
শ্যামবতা হাত সরিয়ে রাগত কন্ঠে বলল,
" যা সর! মুডের বারোটা বাজিয়ে এখন আবার হাঁসের মত প্যাঁক প্যাঁক করতে আসছিস! বিরক্ত করবি না একদম। নাহলে খামারে রেখে আসবো।"
আমি ভয়ংকর কাজ করে ফেললাম। শ্যামবতার কাছে ঘেঁষে বসে তার কাধে মাথা রাখলাম। তারপর মৃদুস্বরে বললাম,
"এখনো বকবে তুমি! আর কত বকবে আমায়? বকতে বকতে রেকর্ড করবে নাকি! এবার বকা অফ দিয়ে দুটো ভালো কথা বলো তো!"
"ভালো কথা বুঝিস তুই? অশিক্ষিত, গাইয়্যা, সরিষা ক্ষেত!" আমাকে সরাবার চেষ্টা করে বলল। আমি না সরে আরো ঘেঁষে বসে বললাম,
" আমি যদি খারাপ হই তবে জরিনার মত সুন্দরী, ভদ্র, গুনী মেয়ে ছেড়ে আমাকে ভালোবাসতে গেলে কেন! উত্তর দাও?"
শ্যামবতা উত্তর দিলো না। অন্যদিকে চেয়ে রইল। আমি মুচকি হেসে বললাম,
" আমি নামক পেত্মীটা তোমায় বশ করেছিলো বলেই জরিনাকে মনে ধরেনি। তাই তো?"
"হাঁসের মত প্যাঁকপ্যাঁক করিস না তো! সর সামনে থেকে।" অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেই বলল। আমি মাথা উঠিয়ে শ্যামবতার গাল টেনে গভীর গলায় বললাম,
"অভিমান হয়েছে জনাবের? সরি তো! আমি সত্যিই বুঝিনি তোমার কথা। বুঝিয়ে বলো যাতে আমি বুঝতে পারি। প্লিজ শ্যামবতা! প্লিজ পেত্না!"
শ্যামবতা আমার মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। চোখ রাঙিয়ে বলল,
"আমি পটছিনা।"
আমি হেসে বললাম,
"পটেই অনেক আগেই গেছো। নতুন করে আর কীইবা পটবে!"
থেমে আবার আকুতিভরা কন্ঠে বললাম,
"বলো না প্লিজ শ্যামবতা! বলো না আমার তুমিটা? আমার পেত্নাটা?"
শ্যামবতার গম্ভীর চেহারায় খুশির আভা দেখা গেলো। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। আমার গাল টেনে বলল,
"এত মায়া লাগাও কেন! টুকটাক রেগে থাকলে ও তোমার সহ্য হয় না। এটা কী ঠিক?"
"বলো না?"
"শুনবে সত্যিই"
আমি মাথা নাড়ালাম। শ্যামবতা আমার দিকে তাকিয়ে কপাল চুলকে বলল,
"আমার কথাগুলোকে তোদের নোয়াখালী ভাষায় কী বলে যেন? ওহ হ্যাঁ, আঁই তোঁয়াঁরে ভালা হাই। এবার বুঝেছিস?"
আমার হৃদপিন্ডটাকে যেন কেউ হিমালয়ে ছুড়ে মেরেছে এমন শীতল লাগছে। ফাইনালি! শ্যামবতা বলেছে তার মনের কথা। ফাইনালি! আমি লাজুক হেসে উত্তর দিলাম,
"আই ও তোঁয়ারে ভালা হাই।" (আমি ও তোমাকে ভালোবাসি) বলে শ্যামবতার বুকে মাথা রাখলাম। শ্যামবতা আগলে নিল আমায়।
হুট করেই মনে পড়লো শ্যামবতা বলেছে তার জগাখিচুরি মার্কা কথা মানেটা নোয়াখালী ভাষায়, আঁই তোঁয়ারে ভালোবাসি। তারমানে শ্যামবতা সকালে এবং একটু আগে এই কথাই বলেছে। আমি পাগলাগারদ ছাড়প্রাপ্ত পাগল তা বুঝিনি! শুধু শুধু এত কাহিনি করছিলাম! শ্যামবতার মনের কথাকেই গালি ভেবেছি! ভাবতেই রাগ লাগছে। আসলেই আমার মাথায় গোবরে ভরা। মাকাল ফল ব্যবসার আইডিয়াই মানায়। নিজের মাথায় নিজেই চাটি মেরে বললাম, "বুদ্ধু!" তা দেখে শ্যামবতা হাসল শব্দ করে। হুট করেই কিছু একটা মনে পড়তেই মাথা তুলে শ্যামবতার দিকে অবাক চোখে চেয়ে বললাম,
"তুমি নোয়াখালীর ভাষা বলতে পারো!"
"খালি কইতাম হারি না বেক কতা বুঝিও।" (শুধু বলতে পারি না সব কথা বুঝতে ও পারি।)
চোখ ছোট ছোট করে বলল। আমি ভয়ে ঢোক গিললাম। শ্যামবতা নোয়াখালী ভাষা বুঝে, তারমানে এতদিন আমি যা যা বলেছি যত গালি দিয়েছি সব বুঝতে পেরেছে! আল্লাহ! আমি ভয়ে সরে গেলাম। তোতলিয়ে বললাম,
"ত্তুউউমমিইইই...
আমার কথা কেড়ে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে শ্যামবতা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
" আমি নোয়াখালী ভাষা বুঝি, বলতে পারি। স্বপ্নীল নোয়াখালীর মানুষ। ওর সাথে থাকতে থাকতেই আয়ত্ত করে ফেলেছি। তোকে বলিনি। কারণ আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমার নোয়াখালী ভাষা না বুঝার সুযোগ কিভাবে তুলিস। বিয়ের দিন থেকে আজ অব্দি যা যা বলেছিস সব বুঝেছি। চিন্তা কর একবার, আমার সামনে দাঁড়িয়ে তুই যখন আমাকেই ভয়ংকর গালি দিতি, মেরে ফেলার হুমকি দিতি তখন আমার কেমন লাগতো? শুধু মাত্র তোকে বুঝতে দিবো না বলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতাম। কত যে কষ্ট হতো! একবার মনে করে দেখতো কী বলেছিলি? বিয়ের দিন, বিয়ের পরদিন সকালে কী বলেছিলি? মনে কর!"
আমি ফ্লাশব্যাকে গেলাম। নিজের কীর্তি মনে করে ভয়ে ঢোক গিললাম। ভীত কন্ঠে বললাম,
"লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা...
শ্যামবতা ফুল স্লিভ টি-শার্টের হাতা গুটাতে লাগলেন। আমি ভয়ে ছিটকে গেলাম। শ্যামবতা বাঁকা হেঁসে বললেন,
" সব কিছুর হিসেব তুলবো আজ। পালিয়ে লাভ হবে না পেত্নী। বাঁশ বাগানের সংসারটা এবার গড়েই নিবো।"
আমি ভীত কন্ঠে পিছু হাটতে হাটতে বললাম,
"আঁই তোঁয়াঁরে ভালা হাই ত। হে উসুল্লায় আঁরে ছাই দো!" (আমি তোমাকে ভালোবাসি তো। সেই উছিলায় আমাকে ছেড়ে দাও !)
শ্যামবতা আমার দিকে এগুতে এগুতে বাঁকা হেঁসে বলল,
"আঁই ও তোঁয়ারে ভালা হাই ত। হে উসুল্লায়ই ছাইতাম হাইতান্নো।"
(আমি ও তোমাকে ভালোবাসি তো। সে উছিলাতেই ছাড়তে পারবো না।)
সমাপ্ত.....