ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাকে ভাবিনি কখনও

২৯তম পর্ব

লেখক: মায়িশা নুরাইন

#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও (২৮)

#মায়িশা_নুরাইন

" লাগেজ গুছাচ্ছো কেন? যাবে তো দুদিনের জন্য। এত কিছু কিসের জন্য লাগবে? "

" আআআ...আপনি? আপনি আমার রুমে কি করছেন? "

" তোমার রুম? তোমার আবার কিছু আছে নাকি? সবই তো আমার। এমনকি তুমিও তো আমারই। "

" আমি আপনার নই। বের হন রুম থেকে। নয়তো আন্টিকে ডাকবো। বলবো তার আবিয়াইত্তা ছেলে আমার সাথে অসভ্যতামি করতে এসেছে। "

কিয়ান মুচকি হেসে নীলাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলে,

" কিছুই তো করছিলাম নাহ। ভদ্র ছেলের মতো বউ এর খবর নিতে এসেছিলাম। তুমিই আগুনে ঘি ঢেলে দিলে। এখন একটু অসভ্যতামি না করলে অন্যায় হয়ে যাবে। "

নীলা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। হটাৎ জড়িয়ে ধরায় সে থমকে গিয়েছে। কিয়ানকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,

" দরজা খোলা আছে। কেউ চলে আসলে ব্যপারটা খুব খারাপ হয়ে যাবে। "

" ব্যাপারটা তবে ভালোই হবে। সবাইকে জনে জনে এক্সপ্লেইন করতে হবে নাহ। "

" আমার গলু-মনু, দ্রুত আয়তো বাচ্চারা। "

কোথায় থেকে বিড়াল ছানা দুটো লাফিয়ে চলে আসে। কিয়ান ঘাবড়ে গিয়ে নীলাকে ছেড়ে বিছানায় উঠে বসে।

" বড্ড চালাক হয়ে গেছো তুমি? "

" আগে থেকেই ছিলাম। এতদিন টের পাননি আপনি। "

বিড়ান ছানা দুটো কিয়ানকে দেখে লাফিয়ে বিছানায় উঠতে চাইলে কিয়ান লাফিয়ে উঠে।

" এইই নীলা, সরাও দুটোকে। নয়তো তুলে জানালা দিয়ে ফেলে দিবো আমি। "

" আপনাকে তবে দরজা দিয়েই ধাক্কা দিয়ে ফেলবো। সাহস তো কম নাহ আমার বাচ্চাদের ফেলে দেওয়ার কথা বলেন। "

" স্টুপিড, আমি কোন বিড়ালের বাবা নই। অসভ্য প্রাণী এরা, যেখানে সেখানে কামড় দিয়ে বসে। এদের বাবা হওয়ার কোন ইচ্ছাও আমার নেই। "

কিয়ানের কথা শুনে নীলা হোহো করে হেসে উঠে। মনে পরে যায় সেদিন সোহানের বলা কথাগুলো। এদিকে কিয়ান হুশ হুশ করে বিড়াল দুটোকে সরানোর চেষ্টা করছে। এতে বিড়াল ছানা দুটো ভাবছে কিয়ান হয়তো তাদের সাথে খেলছে। তাই তারা আরও মজা পেয়ে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ কিয়ানকে হিমশিম খাইয়ে নীলা বলে,

" পেছনে দেখুন ক্যাটফুড আছে। ওদের খেতে দিন। তাহলে আর জ্বালাবে নাহ। "

কিয়ান দ্রুত নীলার কথামতো কাজ করে৷ এতে বিড়াল দুটো খাওয়ায় মনোযোগ দিলে কিয়ান হাফ ছাড়ে। নীলা আপন মনে কাপড় গোছানো শুরু করেছে। কিয়ান কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে থাকে।

" তুমি অনেক কিছুই নিজে করা শিখে গেছো নীলা। শুনলাম সেদিন নাকি কি রান্নাও করতে গিয়েছিলে। খাওয়ালে না তো।"

" ঠেকা পরেছে আমার। আপনি কে? আপনাকে খাওয়াবো কেন? "

" ওকে, আর মাত্র কিছুদিন অপেক্ষা। পরে নিজে থেকেই আমার সেবা করতে উঠে পরে লাগবে। "

" দেখা যাবে। যান তো এখন। কিয়ারা আপু যখন তখন চলে আসবে। "

" আসবে নাহ। ও দেখেছে আমি রুমে এসেছি। এখন ঘন্টাখানিক হলেও রুমে আসবে নাহ। সবাই তো আর তোমার মতো অবুঝ নাহ। "

নীলা মুখ ভেঙচি দেয়। আজকাল সে কিয়ানের সাথে অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। কিয়ান কাছে আসলেই বুকের মাঝে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। আর লোকটা এতই খারাপ, এসেই খালি ছোঁয়াছুঁয়ির ধান্ধায় থাকে। ধান্ধাবাজ লোক একটা!

কিয়ান বিছানায় চুপচাপ বসে ছিলো। নীলাকে শান্ত ভঙিতে কাজ করতে দেখে বলে,

" ভাবীর সাথে নাকি তোমার কথা হয়েছে? কিছু বলেছে তোমায়? "

" হু। অনেকটা বকাবকি করেছে। বলেছে আমাকে ছোট বোনের মতো দেখতো। না জানিয়ে বিয়ে করায় রাগ করেছে। এই ওয়েট, ভাবীকে আপনিই বলেছেন নাহ? "

নীলা তেড়ে এসে কিয়ানের কলার চেপে ধরে৷ কিয়ান হকচকিয়ে যায়।

" এভাবে অ্যাটাক করতে আসছো কেন? আমি কাউকে কিছুই বলি নি। ভাইয়াই নিজে থেকে জেনেছে। খারাপটা কখনও আমায় একা ছাড়লো নাহ। আমার সব বিষয়ে খবরদারি করে। "

" নিজে এতসব কাহিনী করে এখন ভাইয়াকে খারাপ বলছেন? অসভ্য লোক। "

কিয়ান টুপ করে ঝুকে আসা নীলার ঠোঁটে চুমু খায়। মিচকে হেসে বলে,

" শুধু তোমারই। "

" সোহান? এই সোহান? কোথায় তুমি? তোমার দাদুমনি তোমাকে ডাকছে তো। "

হুট করে মীমু রুমে এসে পরায় দুজন দুদিকে ছিটকে পরে। কিয়ান আর নীলাকে এত কাছাকাছি দেখে থমকে যায় সে।

" ক-কি করছিলে তোমরা? কিয়ান ভাই! তুমি এখানে কেন? "

কিয়ান বিছানা থেকে নেমে নিজের শার্ট ঠিকঠাক করে গম্ভীর ভঙিতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নীলা উল্টে ঘুরে ঠোঁট মুছে স্বাভাবিক হয়ে নেয়। মীমু ধপধপ পায়ে নীলার সামনে এসে দাঁড়ায়। কর্কশ কন্ঠে বলে,

" কি করছিলে তোমরা? ভাইয়া এখানে এসেছিলো কেন? "

" তোমার ভাইকেই জিজ্ঞাসা করো গিয়ে। "

মীমু দমে না গিয়ে বলে,

" তুমিই ভাইয়াকে ডেকেছিলে নাহ? নোংরা মেয়েদের মতো সি'ডিউস করছিলে নাকি? "

নীলা মীমুর গালে সজোড়ে একটা থাপ্পড় বসায়। মীমু গালে হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নীলার চোখ দুটো তখনও রাগে জ্বলছে।

" আর একবার এমন কথা বললে শুধু থাপ্পড়েই থামবো না।"

মীমুর চোখ বড় হয়ে যায়। সে গাল থেকে হাত সরিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে,

" তুমি আমাকে মারলে! "

" হ্যাঁ, মেরেছি। কারণ তুমি আমাকে অপমান করেছো। "

" আমি তো শুধু...."

" আমার সাথে কথা বলার আগে বুঝে-শুনে কথা বলবে। এই নীলার মুখের আগে হাত বেশী চলে। নেহাত ভদ্রতা বজায় রাখছি বলে কিছুই বলছি নাহ। নয়তো আমাকে অপমান করার অপরাধে তেমার জিহ্বটাই টেনে ছি'ড়ে ফেলতাম। "

" এত বড় অপমান! আমি কিন্তু এর হিসাব নিয়েই ছাড়বো। তোমার থেকে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকেই কেড়ে নিবো আমি। আমাকেও চিনো নি তুমি। "

" তোকে চিনতেও হবে নাহ। তোর মতো মেয়েদের আমার ভালো করেই জানা আছে। কাজের কাজ না করে মগখ চাাস বেশী। বের হ রুম থেকে। মেজাজটা খারাপ করে দিচ্ছিস। একটু পর আমি বের হবো। তার আগে এসে মেজাজের দফারফা করছিস। "

মীমু গালে হাত চেপে রেগে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। মীমু চলে যেতেই নীলা মাথায় হাত দিয়ে বসে৷ রাগে তার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। লুকিয়ে বিয়ে করার যে এত শাস্তি তা সে জানতো নাহ। আর জানলেই বা কি! খারাপ তো কিয়ান। কে বলেছিলো বিয়ে করতে। নেহাত একটু একটু ভালোবাসে বলেই বিয়েটা একসেপ্ট করেছে সে। নয়তো কবেই মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে চলে যেতো।

**************

" আন্টি, আসি তবে। ভালো থাকবেন। স্যারের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েন। আমি গিফট নিয়ে আসবো। "

" এমন ভাবে বলছো যেন একেবারে চলে যাচ্ছো! "

" একেবারেই তো যাচ্ছি। "

বিরবিরিয়ে কথাটি বললেও মুখে বলে,

" না মানে, ওই আরকি। যাচ্ছি, থাকবো কিছুদিন। এর মাঝে হুট করে বিয়ে করিয়ে দিয়েন নাহ। আমার আবার স্যারের বিয়েতে মাংশ, পোলাও খাওয়ার বড্ড শখ। "

" বলেছিলাম মেয়ে খুঁজে দিতে, দিলে না তো। যাও দিয়েছিলে, মেয়েটার সম্পর্কে যা শুনলাম। তাতে আর রুচি হয় নি। "

" রুচির ট্যাবলেট খেলেই পারতেন। আব..বলি কি, শুধু শুধু জোড়াজুড়ি না করে স্যারের পছন্দ থাকলে বিয়ে করিয়ে নেন। সংসারে শান্তি আসবে। "

" পরে না আবার অশান্তিই রোজকার রুটিন হয়ে যায়। "

" সামিন ভাইয়া! "

" হাহা! মজা করলাম। মা, আমি একটু বাহিরে যাচ্ছি। চলো আসবো তাড়াতাড়ি। "

" এই রাতে কাজ কি? কিয়ান, নীলাও এখনই বেরিয়ে যাবে। তুই চলে যাচ্ছিস। তানহা এখনও হাসপাতাল থেকে ফিরে নি।"

" তো কি হয়েছে? কিয়ারা, মীমু আছে তো। "

কিছুটা এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

" মীমুকে দিয়ে কয়েকটা কাজ করালেই তো পারো। সারাদিন ঘরে বসে কুটননাামি করছে খালি। মায়ের মতোই হয়েছে একদম। "

" সামিন! এসব কি ধরণের কথা? "

" এসব সঠিক কথা। তোমার বিয়ের পর ফুফু কম জ্বালায় নি। আমি বড় হয়েও দেখেছি এসব। আমি এতদিনে মুখ খুললে কবেই তুলকালাম বেধে যেতো। "

নীলা ব্যাগ হাতে কিয়ানের জন্য অপেক্ষা করছে। ছেলেদের তৈরি হতে এত সময় লাগে নাকি! যন্ত্রণা।

তখনই মীমু সেখানে এসে হাজির হয়। নীলা তাকে দেখেই একটা শয়তানি হাসি দেয়। মীমু এতে আরও ফুঁসে উঠে। কিয়ান আসতেই নীলা বলে,

" আপনি আদও ছেলে মানুষ তো! ছেলেদের তৈরি হতে এত সময় লাগে জানতাম না তো। "

" ছেলে কি না, সেটা অন্যসময় বুঝিয়ে দিবো। আপাতত চলো, পরে বেশী রাত হয়ে গেলে সমস্যা। "

নীলা কিছুটা লজ্জা পেলেও মুখ গম্ভীর করে রাখে। কিয়ান মা'কে বিদায় জানালে মা কিয়ারার ডাকে রুমে চলে যান। সামিন ইতোমধ্যে নিজের কাজে বেরিয়ে গেছে। কিয়ান নীলার ব্যাগ হাতে তুলে নিয়েছে। সে আগাতেই যাবে, তখনই নীলা মীমুকে জ্বালাতে কিয়ানের এক বাহু জড়িয়ে ধরে। কিয়ান থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। নীলা বিস্মিত মীমুকে চোখ মেরে কিয়ানকে বলে,

" চলুন নাহ। সামান্য হাত ধরায় ফ্রীজ হওয়ার কি আছে? আমরা তো এরও বেশী কিছু করে ফেলেছি। "

কিয়ান অবাক হয়ে তাকায়। এসব কি বলছে এই মেয়ে! নীলার চোখ অনুসরণ করে মীমুকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে। মেয়েটা মীমুকে জ্বালাতে এসব করছে। সে মুখ নামিয়ে নীলার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। নীলাও এতে মিষ্টি করে হাসে। তারপর দুজনে একত্রে বেরিয়ে আসে। মীমু এসব দেখে হিংসায় ফ্লোরে পা ঠুকতে থাকে। দ্রুত ফোন বের করে মা'কে ফোন লাগায়। সে একা নীলার কিছুই করতে পারছে নাহ। এখন তার মা এসে যা করার করবে।

অপরদিকে নীলা বাড়ির বাহিরে বেরিয়েই কিয়ানের বাহু ছেড়ে দিয়ে জোড়ে চিমটি কাটে। অসভ্য, ধান্ধাবাজ বলে বিরবিরিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। কিয়ান গিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে। নীলা আনমনে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনটা কেন যেন খারাপ লাগছে। কিয়ান বিষয়টা খেয়াল করে বলে,

" মন খারাপ কেন? গান চালাবো? "

নীলা উত্তর করে নাহ। কিয়ানও ওকে আর ঘাটায় নাহ। কিছুক্ষণের মাঝে নীলা গাড়িতেই ঘুমিয়ে পরে। তাদের পৌছতে চার-পাঁচ ঘন্টা লাগবে। কিয়ান আপনমনে গাড়ি চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে নীলার দিকে খেয়াল করছে। হটাৎ তার চোখ পড়ে গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে। অনেকক্ষণ যাবত একটা গাড়ি তাদের গাড়িকে ফলো করছে। এতক্ষণ সে বিষটায় পাত্তা দেয় নি। তবে গাড়ির বাঁক নিতেই পেছনের গাড়িরও বাঁক নেওয়া দেখে তার সন্দেহ হয়। ফোন বের করে সামিনকে কল করে।

" ভাইয়া, কোথায় তুমি? "

" ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং আছে। সেখানেই যাচ্ছি। "

" তুমি বাসায় যাও এখনই। কোন মিটিং করতে হবে নাহ। "

" কিছু হয়েছে? "

" এটা রকিদের ফাঁদ হতে পারে। আমাদের গাড়িও ফলো হচ্ছে। "

সামিন ঘাবড়ায়। চিন্তিত স্বরে বলে,

" ঠিক আছিস তোরা? নীলা? "

" ও কিছুই টের পায় নি, ঘুমাচ্ছে। আমাদের নিয়ে ভেবো নাহ। আমি ভালোভাবেই পৌছে যাবো। "

" সাবধানে যাস। পৌছে ফোন করবি। "

কথা শেষ করে ফেন রাখতেই দেখে নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। কিয়ান স্বাভাবিক স্বরেই বলে,

" ঘুম ভেঙে গেলো এত তাড়াতাড়ি! খিদে পেয়েছে? "

বক্স থেকে একটা কেকের প্যাকেট আর সফট ড্রিংস বের করে নীলার দিকে ঠেলে দেয়। নীলা না খেয়ে সেগুলো হাতে নিয়ে বসে থাকে। তার ঘুম ভাঙলেও ঘুমটা পুরোপুরি কাটে নি। হামি তুলে থ মেরে বসে থাকে। কিয়ান হটাৎ বলে উঠে,

" নীলা৷ তোমার স্কুটির স্পীড লেভেল কত থাকে? "

" নরমাল স্পীড। কেন? "

" কখনও হাই স্পীডে স্কুটি চালিয়েছো? "

" দরকার পরলে। একবার স্কুটির পেছনে কুকুর তাড়া করেছিলো। তখন হাই স্পীডে চালিয়েছিলাম। "

কিয়ান মুচকি হাসে।

" সীটবেল্ট ধরে বসো। আজ কারের হাই স্পীড অনুভব করো। "

তার বলতে দেরী, গাড়ির স্পীড বাড়াতে দেরী নেই। আচমকা ধাক্কায় নীলা ঘাবড়ে গিয়ে সীটবেল্ট ধরে শক্ত করে বসে থাকে৷ রেগে চেচিয়ে বলে,

" কি শুরু করলেন? এখানে কি কার রেইস চলছে? এত তারাহুরোর কি আছে। আমি এত জলদি মরতে চাই নাহ। "

" স্পীড কমলেই বিপদ আছে। আমি থাকতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চোখ বন্ধ করে অনুভব করো শুধু। "

নীলা ভয়ে চেঁচাতে থাকে। কিয়ান তাকে পাত্তা না দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর রিয়ার ভিউ মিরর চেক করতে করতে কার চালাতে থাকে। মেইন রাস্তা খালি থাকায় তার সুবিধাই হয়েছে তার। এদিকে নীলার অবস্হা খারাপ। সীটবেল্ট শক্ত করে চেপে ধরে দোয়া-দুরুদ পড়তে থাকে। কিয়ান রাস্তার একটা বাঁক নিলে পরে আর পেছনের গাড়িটাকে দেখতে পায় নাহ। তাই স্বস্তি পেয়ে সে গাড়ির স্পীড স্বাভাবিক করে নেয়। নীলার অবস্হা দেখে এবার সে হেসে উঠে৷ নীলা রেগে এলোমেলো হাত চালাতে থাকে।

" খারাপ লোক। মেরে ফেলতে চান নাকি? মানছি এখনও ভালোবাসার কথা বলি নি। তাই বলে না বলার আগেই উপড়ে উঠিয়ে দিবেন? কোন কাজ অসম্পূর্ণ রেখে আমি যেতে রাজি নাহ। "

কিয়ান জোড়ে ব্রেক কষে। মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামাতেই নীলা আবারও চেঁচাতে থাকে। কিয়ান অবাক কন্ঠে বলে,

" কি বললে মাত্র? ভালোবাসো আমায়? "

নীলা থতমত খেয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করতে থাকে। কিয়ান সীটবেল্ট খুলে নীলার দিকে এগিয়ে আসে।

" আরেকবার বলো প্লিজ। এতদিন ভাবতাম আমিই জোর করে বিয়ে করলাম। এখন তো দেখছি আড়ালে তোমারও সায় ছিলো। "

" ক-কি বলছেন কি? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? গাড়ির স্পীডে মাথার ব্রেইন নড়ে গেছে? "

" মনে হয়। নয়তো এই মাঝ রাস্তায় কেন তোমার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে এমন সি'ডিউসড হয়ে যাবো৷ "

নীলা হকচকিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠে।

" আআআ, দূরে। দূরে যান, পার্ভার্ট। মাঝ রাস্তায় একটা মেয়েকে একা পেয়ে শয়তানি বুদ্ধি কিলবিল করতে শুরু করেছে নাকি? "

" মেয়েটা যদি নিজের বউ হয়, তবে তাতে কোন পাপ নেই পাখি। "

" আআআ...বাবা। আমাকে বাঁচাও। এই লোকটার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। "

কিয়ান হোহো করে হেসে উঠে। নীলার কপালে টোকা দিতেই নীলা গাল ফুলিয়ে তাকায়।

" ওফফ, টমেটো একটা। খেয়ে ফেলি এখন। এত্ত মিষ্টি কেন তুমি? আমার ভাবতেই অবাক লাগে তুমি আমার বউ! "

নীলা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে। লোকটার মাথা নিশ্চয়ই গেছে। হটাৎ তাদের গাড়িটা সজোড়ে কেঁপে উঠে। সীটবেল্ট বাধা থাকায় নীলা বেঁচে যায়। তবে কিয়ানের সীটবেল্ট খোলা থাকায় সে গিয়ে স্টিয়ারিং-এ ধাক্কা খায়। পেছনে তাকিয়ে দেখে একটা কালো গাড়ি তাদের গাড়িতে আঘাত করেছে। সে দেখেই চিনে ফেলে এই গাড়িটাই একটু আগে তাদের ফলো করছিলো। কিয়ান ফোঁস করে দম ফেলে। নীলার উদ্দেশ্যে বলে,

" তোমার জন্যই এমন হলো। এতক্ষণে তোমার বাবার কাছে পৌছে যেতাম। কে বলেছিলো মাঝ রাস্তায় আমার মাথার পোকা নাড়িয়ে দিতে? "

নীলা কিছুটা ভয়ে পেয়ে বলে,

" এই গাড়িটা আমাদের ফলো করছিলো। আমি তখনও দেখেছি আমাদের পিছু পিছু আসতে। "

" হুম। তাই তো দ্রুত আসছিলাম। এখন থেমে গিয়ে ফাঁদে পরে গেছি। "

" আপনি এত স্বাভাবিক আছেন কিভাবে? গাড়ি স্টার্ট দেন তাড়াতাড়ি। "

" আগে ওদের সাথে একটু গল্প করে আসি। তুমি বসো, একদম নামবে নাহ। "

নীলা দ্রুত কিয়ানের শার্ট চেপে ধরে। কিয়ান তার গালে হাত রেখে তাকে ইশারায় আস্বস্ত করে। তারপর শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে গাড়ি থেকে নেমে আসে। পেছনের গাড়ি থেকে কয়েকজনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। তার মধ্যে একজন কিয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বলে,

" অনেক তো দৌড়ালি, লাভ তো হলো নাহ। এখন ভালোই ভালোই পেনড্রাইভটা দিয়ে দে। "

কিয়ান মাথা ঝুকিয়ে বলে,

" তা দিতে পারি। যদি এর আগে এতক্ষণ অশান্তিতে রাখার জন্য একটু আপ্যায়ন করার সুযোগ দিস। "

" দেখ, এত কথা বলার সময় নেই। দ্রুত পেনড্রাইভটা দে। নয়তো গাড়িতে একটা মেয়ে আছে নাহ, ওকে আমরা সবাই মিলে..."

আচমকা এক ঘুষিতে লোকটা মাটিতে আছড়ে পড়ে। কিয়ান লোকটার কলার চেপে ধরে রক্তচক্ষু নিয়ে বলে,

" কথা বলছিলি আমার সাথে, ভালো কথা। আমার ওয়াইফকে মাঝে টানলি কেন? "

" বাহ! তোর ওয়াইফ হলে তো আরও মজা হবে। "

কিয়ান একের পর এক ঘুষি লোকটার মুখের উপর নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে লোকটা একসময় নেতিয়ে পরতেই বাকিরা গর্জে উঠে। সবাই মিলে কিয়ানের উপর চড়াও হতেই কিয়ান একে একে সবই ধরাশায়ী করতে থাকে।

অপরদিকে গাড়িতে বসে নীলা এসব দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সে আন্দাজও করতে পারে নি এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে তাকে। সে খেয়াল করে তাদের একজন লোক কিয়ানের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছে। নীলা আর বসে থাকতে পারে নাহ। ব্যাক সীটে থাকা ব্যাগে হাত রাখতেই চিকন লাঠিজাতীয় কিছু একটা অনুভব করে। দ্রুত তা টেনে বের করে গাড়ি থেকে নেমে আসে। আর পেছন থেকে সেই লোকটার মাথায় আঘাত করে। লোকটা চিৎকার করে মাটিতে পরতেই নীলা হাতের বস্তুটা দিয়েই এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে।

" শালা বদমাশ, আমার জামাইকে মারতে আসিস। তোর মাথা ফা'টাবো আমি এখন। "

লোকটার চিৎকারে কিয়ান পেছনে তাকিয়ে নীলাকে দেখে অবাক হয়। তার উপর নীলার এমন রুপ দেখে তো আরও অবাক।

" নীলা! তোমাকে গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করি নি। "

" হ্যা, আমি বসে বসে দেখি। আর আপনি মার খেয়ে চিৎপটাং হয়ে পরে থাকুন। "

" তোমার স্বামী কোন দূর্বল পুরুষ নয়। "

তারা দুজনেই প্রতিপক্ষকে সামলাচ্ছে, আর সাথে নিজেদের ঝগড়াও চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে একজন নীলার উপর চড়াও হলে নীলা তার হাত ধরে ঘুরিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে। তারপর নিজের নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। মুহুর্তেই খুশিতে লাফিয়ে বলে,

" ইয়েএএ, আমি পেরেছি। ভাবতাম এসব সেল্ফ ডিফেন্স টেকনিক বাস্তবে কাজে লাগে নাহ। এ তো সত্যিই কার্যকর। হুররেএএ, আজই বাবাকে বলতে হবে। "

" নীলা! সামলে..."

পাশ থেকে আরেকজন আঘাত করতে আসলে নীলা পিছু ঘুরতে গিয়ে ভুলবসত মাথা দিয়ে লোকটার নাকে আঘাত করে বসে।

" সরি সরি, দেখি নি আমি....এই তুই? মোটেও সরি নাহ। নে, আরও মার খা। "

নীলা জুতো খুলে লোকটাকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থালে। ক্রমাগত হামলা সহ্য করতে না পেরে লোকটা সেখান থেকে উঠে দৌড়ে গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট করতে। গাড়ির শব্দ পেয়ে বাকিরাও দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে৷ আর মুহুর্তেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

তারা পালাতেই কিয়ান ক্লান্ত হয়ে রাস্তাতেই বসে পরে। নীলা দৌড়ে গিয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে বলে,

" ব্যাথা পাননি তো কোথাও। এমা, ঠোঁট কে'টে গেছে তো। ঘু'ষি খেয়েছেন নাকি? সামলে মা'রামারি করতে পারেন নাহ।"

কিয়ান নীলাকে টেনে কোলে বসিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ঘন ঘন নিঃশ্বাসের তালে তার সারা শরীর কাঁপছে। কিয়ানের কাপুনি অনুভব করে নীলা আর বাধা দেয় নাহ। নিজেও স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। অনেকটা সময় পর কিয়ান একটু রিল্যাক্স হয়।

" ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তুমি সাথে না থাকলে এতটা টেনশন হতো নাহ। "

" বলেছিলাম তো গাড়ি চালিয়ে যেতে। কে বলেছিলো থামিয়ে হিরোগিরি দেখাতে আসতে? "

নীলা নিজের ওরনা দিয়ে কিয়ানের ঠোঁট মুছিয়ে দিতে থাকে।

এসময় তার চোখ মুখ দেখলে মনে হবে ব্যাথা কিয়ান নয়, সে নিজেই পেয়েছে।

" আরেকটু সামনেই একটা কাঠের ব্রিজ পরবে। এটা শর্টকাট রাস্তা। গাড়ি স্টার্ট দিলেও ওরা আমাদের ফলো করতো৷ আর সেই পর্যন্ত গিয়ে আটকে পরলে ব্যাপারটা আরও মুশকিল হয়ে পরতো। "

" ওরা কারা ছিলো? লোকাল গুন্ডা, নাকি ডাকাত, ছিনতাইকারী? "

কিয়ান একটা বড় শ্বাস ফেলে।

" ভাইয়ার বিজনেস রাইভাল। "

" কিহ! তারা আমাদের পেছনে পরবে কেন? সামিন ভাইয়ার কিসের বিজনেস? শত্রু আসলো কোথা থেকে? "

কিয়ান নীলার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়৷ তারপর নীলাকে কোলে নিয়ে গাড়ির দিকে আগাতে আগাতে বলে,

" যেতে যেতে বলছি। "

আর মাত্র ঘটা কাহিনিতে নীলা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে কিয়ানের বুকে মুখ লুকায়।

*****************

অনেকক্ষণ যাবত কিয়ানকে ফোনে না পেয়ে সামিন টেনশনে ঘরময় পায়চারি করছে। তখন কিয়ান বলার সাথে সাথেই সে বাড়ি চলে এসেছিলো। তবে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, মিটিং টাইম পেরিয়ে গেলেও তার ক্লায়েন্ট থেকে কোন ফোন কল আসে নি৷ সত্যি বলতে রাতে মিটিং রাখায় সে নিজেও একটু দোনামোনা করছিলো। তবে বিজনেসের ব্যাপার বলে তেমন মাথা ঘামায় নি। কথা ছিলো আজ তার সাথে কিয়ানও যাবে। তবে নীলাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিয়ান যেতে পারে নি।

সামিনের ফুড সংক্রান্ত বিজনেস আছে। তার কোম্পানি মূলত প্যাকেটজাত বিভিন্ন খাবার উৎপাদন ও বাজারজাত করে। একই ধরনের পণ্য বাজারজাত করায় তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি। কিছুদিন আগে সামিনের হাতে সেই কোম্পানির কারখানায় খাদ্য উৎপাদনে ভেজাল নিয়ে কিছু তথ্য আসে। তথ্যটি পাওয়ামাত্র সামিন কিয়ানের সাথে কথা বলে। কিয়ান প্রায়শই তার বিজনেস সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে সাহায্য করে। কিয়ান কিছু প্রমাণ সংগ্রহের কথা বলে। সামিনের কাছে সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে কয়েকটি ভিডিও ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসে। প্রমাণ পেয়ে সামিন খাদ্য কতৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে। তারা বিষয়টা জানতে পেরে এই বিষয়ে ব্যবস্হা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে এসব কোনভাবে সেই রাইভাল কোম্পানি জানতে পারে

তারা বুঝতে পারে, সামিনের কাছে থাকা প্রমাণগুলো প্রকাশ পেলে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই প্রমাণগুলো নষ্ট করা এবং সামিনের কাছ থেকে পেনড্রাইভ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তারা লোক লাগায়। তারা যেহেতু জানে নাহ পেনড্রাইভটা কার কাছে আছে, তাই দুই ভাইয়ের পেছনেই লোক লাগায়। সামিনকে ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের কথা বলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তাতে ব্যর্থ হওয়ায় কিয়ানের পেছনে পরে। সামিনের বিভিন্ন কাজে কিয়ানকে সম্পৃক্ত থাকতে দেখে কিয়ানের পেছনেই লোক লাগিয়েছে।

এসব ভেবেই সামিন বেশী চিন্তিত হয়ে পরে। তার উপর কিয়ানের ফোন এখন লাগছে নাহ। এমনকি নীলার ফোনটাও বন্ধ। তাকে চিন্তিত দেখে তানহা বলে,

" কিছু হয়েছে? এত টেনশন করছেন কেন? "

" কিয়ান, নীলা কারও ফোন লাগছে নাহ। আমার খুব টেনশন হচ্ছে। কিয়ান বলছিলো তাদের গাড়ির পেছনে কোন গাড়ি ফলো করছে। কি করবো এখন? আমিও বেরিয়ে পরবো? নাকি পুলিশে কল করবো? "

" আগেই বলেছিলাম যার যার কর্মফল তাকে ভোগ করতে দেন। নিজে থেকে ঝামেলা ঘাড়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিলো নাহ। আরেকটু অপেক্ষা করেন। কিয়ান নিশ্চয়ই কল খেয়াল করে নি। "

সামিন নিশ্চিন্ত হতে পারছে নাহ। কত উল্টোপাল্টা ভাবনা মাথায় আসছে। কিয়ানের এই রাতে বের হওয়া উচিত হয় নি।

দিনের বেলা জ্যাম, গরমের চিন্তা করে রাতের শান্ত পরিবেশে বেরিয়ে এখন টেনশনে ফেলে দিলো। এমন সময় কিয়ান ফোন করে। রিসিভ করেই সামিন চেঁচিয়ে উঠে।

" কিয়ান, কোথায় তোরা? পৌছে গেছিস? ঠিক আছিস তো?"

" আরেহ আস্তে চিল্লাও। এখনও পৌছাই নি। তবে ঘন্টাখানিকের মাঝে পৌছে যাবো। "

" ঠিক আছিস তো তোরা? "

" একদম ফিটফাট। টেনশন করো নাহ। ওদের ফাঁকি দিয়ে

চলে এসেছি। তাই আর ভয় নেই। "

" ফোন রিসিভ না করায় ভয় পাচ্ছিলাম। "

" সাইলেন্ট ছিলো। আর নীলার ফোনের ব্যাটারি ডেথ। তাই আরকি। "

" আচ্ছা, পৌছে জানাস। সোজা কি বাবার ওখানে যাবি নাকি অন্য কোথাও। "

" জানোই তো সম্ভব নাহ। সব পুরুষরা একসাথে থাকে। বাবা আর আঙ্কেলও একটা রুমে থাকে। আমাদের থাকার জায়গা আছে নাকি! সেখানে গিয়ে হোটেলে উঠবো। রুম বুক করা আছে। "

" বাহ! আগে থেকেই প্রিপেয়ার ছিলি! সাবধান থাকিস। উল্টোপাল্টা কিছু করিস নাহ। এখনও বাসায় কিছুই প্রকাশ হয় নি। "

" ধ্যাত ভাইয়া, চুপ করো তো। তুমি দিন দিন বড্ড খারাপ হচ্ছো। রাখলাম আমি। "

সামিন হোহো করে হেসে উঠে। এদিকে সোহান ঘুম থেকে উঠে পরে। ঘুমানোর আগে নীলাকে না পেয়ে কান্না জুড়ে ছিলো। এখন বাবার মুখে নীলাকে কিয়ানের সাথে শুনে আবারও কান্না শুরু করে। তার পরি কেন তাকে রেখে চলে গেলো। এদিকে ছেলেকে ঘুম পারাতে না পেরে তানহা রেগে যায়। কান্নারত ছেলেকে সামিনের কাছে দিয়ে সে রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ছেলে ঘুমালে লোকটাকে যত চুপ করে থাকতে বলা হয়, তিনি ততই শব্দ করেন। তাই এখন কান্নারত ছেলেকে সামলাক। তবে সামিন তো সর্বদাই ছেলের কাছে নাস্তানাবুদ। ছেলের উল্টোপাল্টা

হাত-পা ছুড়াছুড়িতে সামিন নিজেই কান্না করার যোগাড়। কিয়ারা সোহানের কান্না শুনে এসে বড় ভাইকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে হাসিতে ফেটে পরে।

****************

" ভাইয়ার কিসের বিজনেস আছে, তা তুমি এতদিনেও জানতে পারো নি? "

" আমার জেনে লাভ কি? এসব বিষয়ে আমি মাথা ঘামাই নাহ। এমনিই নিজের জীবনে শান্তি নেই। "

" এত কিসের অশান্তি তোমার? "

" একটা আস্ত বড় অশান্তি এসে আমার অশান্তির কথা জিজ্ঞাসা করছে! আপনি থাকতে আর কিছুর দরকার আছে নাকি? "

কিয়ান হেসে ফেলে। নীলার সাহসের তারিফ করে বলে,

" ভাগ্যিস তুমি ছিলে। নয়তো আজ সত্যিই বড় আঘাত পেয়ে বসতাম। "

" প্রেইজ মি মোর। আমি বলেই আপনি এখনও আস্ত আছেন। আমি বলেই সুখটা এখনও বজায় আছে। নয়তো এতদিনে আপনি আর আপনি থাকতেন নাহ। "

" থ্যাংকিউ বউ। অনেক অনেক থ্যাংকিউ আমার জীবনে আসার জন্য। "

" নিজে আসি নি। জোর করে ধরে এনেছেন। "

" দেন থ্যাংকস টু মি। "

নীলা মুখ ফুলিয়ে নেয়। ভাবতে থাকে একটু আগে কি কাহিনিটাই না ঘটলো। ভাবলেই তো গা শিউরে উঠছে। হটাৎ কিছু একটা মনে পরতেই পায়ের কাছে হাত নামিয়ে তখনকার সেই চিকন বস্তুটি তুলে নিতেই অবাক হয়। কিয়ান পাশে তাকিয়ে বলে,

" কি এটা? এখানে কোথায় থেকে আসলো? "

" আরেহ, এটা তো বাবার চুলকানির লাঠি। এটা দিয়ে বাবা পিঠ চুলকাতো। এটা আমার ব্যাগে কি করছিলো! "

" কিহ! এটা নিয়ে তখন তুমি যুদ্ধে নেমে পরেছিলে? "

নীলা নিজেও অবাক হয়ে কিয়ানের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই দুজনই হেসে উঠে। কিয়ান হাসতে হাসতে বলে,

" শেষ বেচারা। যেই যেই যায়গায় তোমার এই স্পেশাল বস্তুর আঘাত পরেছে, সেখানটা নিশ্চয়ই ফুলে আলু হয়ে গেছে। "

নীলা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরছে। ভাবতেই পারছে নাহ সে এমন বস্তু দিয়ে যুদ্ধ জয় করে এসেছে। মুহুর্তেই একটা শয়তানি বুদ্ধি মাথায় আসতেই নীলা সেই লাঠি দিয়ে কিয়ানের গায়ে সুরসুরি দিতে থাকে। এতে কিয়ানের কোন প্রভাব না পরলেও সে বলে,

" তোমার সুন্দর হাত থাকতে কৃত্রিম বস্তুর কি দরকার। নিজের হাতের ব্যবহার করো। আমি বরং খুশিই হবো। "

নীলা টুপ করে কিয়ানের গায়ে চিমটি কেটে বলে,

" নিন, করলাম আমার এই সুন্দর হাতের ব্যবহার। "

" উফফ, বউয়ের হাতের অত্যাচার। মধুর চাইতেও মিষ্টি। "

" অসভ্য লোক। "

শহরে পৌছে কিয়ান স্থানীয় এক হোটেলে উঠে। আগেই থেকেই অনলাইনে রুম বুক করে রেখেছিলো। বাবার কাছে না গিয়ে হোটেলে উঠায় নীলা রাগ দেখাচ্ছিলো। কিয়ান তাকে বুঝিয়ে বলে,

" এটা মাঝরাত বউ। তাছাড়া বাবা আর আঙ্কেল এক রুমে থাকেন। আমাদের জায়গা হবে নাহ সেখানে। "

" আমি বাবার কাছে থাকবো নাহ? আমি যে এই ব্যাগপত্র আনলাম থাকবো বলে। তার কি হবে? "

" এতকিছুর দরকার ছিলো নাহ। দুদিনের বেশী থাকতে দিবো না তোমায়। আর এই দুদিনও তুমি আমার সাথে, এই হোটেলেই থাকবে। "

" আপনার কথায় নাকি? এখনই বাবাকে কল দিবো, এসে আমায় নিয়ে যাবে। আমার ফোন কোথায়? "

কিয়ান মুচকি হেসে বাড়ান্দায় চলে যায়। তার সিগারেটের তেমন নেশা না থাকলেও এখম একটা ধরাতে ইচ্ছে হচ্ছে। তাই সে বাড়ান্দায় চলে আসে।

নীলা ব্যাগ হাতিয়ে ফোন বের করে দেখে ফোন বন্ধ পরে আছে। ধপধপ পায়ে কিয়ানের কাছে গিয়ে বলে,

" আপনার ফোন দিন। "

কিয়ান বিনা বাক্যে ফোন বের করে দেয়। নীলা রুমে গিয়ে বাবাকে কল করতে গিয়ে দেখে এখন বেশ রাত হয়েছে। বাবা নিশ্চই ঘুমাচ্ছে। তাই কল না করে বসে থাকে। বাবাকে জানানো হয় নি সে আজই আসছে। সারপ্রাইজ দিবে বলে কিছুই জানায় নি।

কিছুক্ষণ পর কিয়ান আসতেই নীলা তার দিকে নাম-মুখ কুঁচকে তাকায়। কিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলে নীলা বিরক্তির ভঙিতে তাকে সরতে বলে। কারণ সিগারেটের গন্ধ তার সহ্য হচ্ছে নাহ। কিয়ান বিনা বাক্যে ওয়াসরুমে চলে যায়। এর মাঝে রুমের দরজায় নক পরতেই নীলা ঘাবড়ে যায়। কিয়ান এসে দরজা খুলে খাবার নিয়ে নেয়। আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখায় খাবার পেতে সমস্যা হয় নি।

নীলা ততক্ষণে শুয়ে পরেছে। কিয়ান এসে তাকে টেনে তুলে ল ফ্রেস হতে পাঠায়। তারপর খেতে বললে নীলা ক্লান্তির অজুহাত দেখায়। ফলস্বরুপ কিয়ানকেই সেই দায়িত্ব নিতে হয়। খাবারের সময়ই নীলা ঘুমে ঢলছিলো। খাওয়া শেষ হতেই সে শুয়ে পরে। কিয়ান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। কিয়ান টুকটাক গুছিয়ে নিজেও নীলার পাশে শুয়ে পরে। নীলাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়। সেদিন নীলাদের বাড়িতে থাকার পর আজ দ্বিতীয়বারের মতো তারা একসাথে আছে। প্রথমদিন হোটেল রুমে তাদের মধ্যে যতটুকু দূরত্ব ছিলো, আজ তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। বরং নীলাকে বুকে জড়িয়ে এক পরম শান্তি অনুভূত হয় তার।

মনে পরে প্রথম দিন নীলার সাথে ভার্সিটিতে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা। সে প্রথমদিন থেকেই নীলাকে চিনতো। তবে নীলার বেয়াদবির জন্য নীলাকে তার পছন্দ হয় নি। আর আজ সেই বেয়াদব নীলা তার বুকে পরম শান্তির ঘুম দিয়েছে। মেয়েটার বেয়াদবী সবার সামনে কমলেও তার সামনে আজও কমে নি। তবে তার সেই প্রতিটি মুহুর্তই কিয়ান এখন উপভোগ করে। এজন্যই হয়তো বলে, ভালেবাসার মানুষ ভুল করলেও সেই ভুলকে ফুল মনে হয়।

চলবে.......

(বড় পর্বই দিলাম। এই পর্ব কারও কাছে বড় না মনে হলে তার চোখ নেই। বড় বড় কমেন্ট না করলে খবর আছে😑🔪)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন