ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য প্রনয়িণী

১ম পর্ব

লেখক: আনান রোজ

আমি তোর ফুফুর এক্স ফিয়ন্সে এটা বললি। কিন্তু ওইদিন ফুফুর জায়গায় যে, বিয়ের আসরে তুই বসেছিলি, কবুল তুই বলেছিলি তা বলিসনি কেন তোর বন্ধুকে? লজ্জায়? নাকি অন্য কোনো কা....

অনন্যার হাতের কবজি টা শক্ত করে ধরে কথা গুলো বলল, পুলিশের এলিট (SWAT) ফোর্সের চিফ কমান্ডার,

সালার মুনতাহির ইজান!

অনন্যা এক চিলতে বরফশীতল হাসল। কিন্তু তার চোখে ইজানের জন্য কোনো প্রেম ছিল না, ছিল কেবল তীব্র ঘৃণা। সে নিজেকে ছারিয়ে, বলল—

—"বিয়ে? যে পুরুষ ৫ বছর আগে একটা রাত জোর খাটিয়ে পরদিনই নিজের স্ত্রীকে ফেলে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তাকে স্বামী বলতে আমার ঘৃণা হয়। আপনি আমার স্বামী নন, স্রেফ একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অতীত।"

ইজান অনন্যার মুখে এই অপমান সহ্য করতে পারল না। কিছুক্ষন চুপ রইল, তারপর অনন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল, —

—"তুই আগের মতই রয়ে গেলি, মেনারলেস একঘোয়ে মেয়ে! বাই দ্য ওয়ে, আমি ডিভোর্স চাই... !"

কথা গুলো বলে ইজান ভেবেছিল বিবাহবিচ্ছেদের কথা শুনলে অনন্যা হয়তো ভয় পেয়ে যাবে বা তাকে আটকাবে, কিন্তু অনন্যা এক সেকেন্ডও সময় নিল না। সে ইজানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং স্বস্তির গলায় বলল—

—"আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো সিদ্ধান্ত। পেপার'স রেডি করে নিয়ে আসবেন।"

অনন্যা ফাইলগুলো মাটি থেকে তুলে নিল এবং যাওয়ার আগে ইজানকে বলল—

—"আর শুনুন, এই সব নিয়ে আব্বু বা পরিবারকে জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি পেপার নিয়ে আসবেন, আমি সাইন করে দেব। আর কোর্টে যাওয়ার তারিখ আর সময়টা আমাকে আগে থেকে ইনফর্ম করে দিয়েন।"

~~~~~~~~~~~~~~~~🥀

এক_ঘন্টা_আগে...

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ ভেঙে নামা শ্রাবণের লীলা। অনন্যা একহাতে জামা টা সামলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দিকে এগোচ্ছিল, ইউনিতে একটি বড় আন্তর্জাতিক সেমিনার। এই অনুষ্ঠানের অর্গানাইজিং কমিটির মূল দায়িত্বে আছে অনন্যা ও তার কয়েকজন বন্ধু। ঠিক সময়ে হলে পৌঁছানোর জন্য, সে বেশ তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল।

হুট করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে চার-পাঁচটা কালো রঙের পুলিশের বড় বড় গাড়ি এসে ব্রেক কষল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা থমথমে হয়ে উঠল। গাড়িগুলো থেকে হুড়মুড় করে নেমে এল কুচকুচে কালো পোশাক পরা একদল সশস্ত্র জওয়ান। তাদের প্রত্যেকের বুকে আর পিঠে সাদা বড় বড় অক্ষরে লেখা—SWAT। পুলিশের এই বিশেষ এলিট কমান্ডো বাহিনীকে এভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেখে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ভয়ে এদিক-ওদিক সরতে লাগল।

অনন্যা তাড়াহুড়ো করে করিডোরের দিকে এগোতে গিয়ে গেটের ঠিক মুখে থাকা এক চওড়া, শক্ত বুকের সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেল। হাতের ছাতাটা ছিটকে কাদার মধ্যে পড়ে গেল। ধাক্কার চোটে অনন্যা পড়ে যেতে নিলেই নিজের ভারসাম্য কোনোমতে সামলে নিল। কিন্তু অনন্যা নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে মাথা তুলে না তাকিয়েই রাগ মিশ্রিত গলায় চিৎকার করে বলে উঠল,—

—"চোখে কি দেখতে পান না? অন্ধ নাকি আপনি? রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন!"

অনন্যার রাগী কণ্ঠস্বর শুনে চারপাশের সোয়াত জওয়ানরা স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো করিডোরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল।

অনন্যা রেগে গিয়ে চোখ তুলে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ধক করে ওঠা বুক নিয়ে অনন্যা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরো শরীর মুহূর্তের মধ্যে জমে বরফ হয়ে গেল।

কালো রঙের রেইনকোটের ওপর বুলেটপ্রুফ ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট, কোমরের বেল্টে আধুনিক অস্ত্র আর চোখে কালো সানগ্লাস। বৃষ্টিতে ভেজা ছোট করে ছাঁটা চুল আর তীক্ষ্ণ চোয়ালের সেই পুরুষটিকে দেখামাত্রই অনন্যার পা জোরা কেপে উঠে।

—সালার মুনতাহির ইজান!

তার স্বামী যে কিনা ৫ বছর আগে কাউকে কিছু না বলেই হারিয়ে গিয়েছিল।

ইজান তার চোখের সানগ্লাসটা এক ঝটকায় নামাল। তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া অনন্যার ভেজা মুখের ওপর এসে পড়ল। কিন্তু ইজানের চোখে কোনো চেনা মানুষের আভাস ছিল না, ছিল কেবল চরম বিরক্তি আর রাগ। ৫ বছরে অনন্যার কিশোরী চেহারা বদলে যে এতটা পরিপক্ব ও গম্ভীর হয়ে গেছে, তা ইজানের কল্পনারও বাইরে ছিল। সে অনন্যাকে চিনতেই পারেনি! ইজান অত্যন্ত কড়া এবং ডিনামাইট ফাটার মতো গম্ভীর গলায় বলল—

—"কথা বলতে শিখুন, মিস! সাতসকালে ছাতা ছাড়া বৃষ্টিতে ভিজে ক্যাম্পাসের গেট ব্লক করে ঝগড়া করছেন কেন? পুলিশের ডিউটিতে বাধা দেওয়ার শাস্তি জানা আছে আপনার? রাস্তা ক্লিয়ার করুন, ভেতরে যান!"

কিন্তু অনন্যা কিছু না বলে শক্ত পায়ে ইজানকে পাশ কাটিয়ে ভেতরের দিকে হেঁটে চলে গেল। ইজান পেছন থেকে তার গাড়ির দরজায় হাত রেখে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল। এই সাধারণ মেয়েটার চোখে ভয়ার্ত চাউনির বদলে যে তীব্র অবজ্ঞা সে দেখল, তা তাকে সামান্য অবাক করল। কিন্তু ডিউটির চাপে সে আর ভাবল না, হনহন করে ভেতরে ঢুকে গেল।ডিপার্টমেন্টের করিডোর দিয়ে সেমিনার হলের দিকে যাওয়ার সময় অনন্যার মন ও শরীর দুটোই কাঁপছিল। ইজান ফিরে এসেছে!

মাত্র এক মাস হলো সে রাশিয়া থেকে এই স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটের কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে, আর আজই তাদের ভার্সিটিতে ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারের হাই-প্রোফাইল সিকিউরিটি চেকিংয়ের কাজে সে সশরীরে উপস্থিত!

অনন্যা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল ইজান তার কয়েকজন অফিসারের সাথে দাঁড়িয়ে হলের ম্যাপ দেখছে। অনন্যা দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের বুকটা শান্ত করার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই তার দুই বন্ধু নেহা আর রাফি হন্তদন্ত হয়ে তার কাছে ছুটে এল। নেহা অনন্যার হাত ধরে উত্তেজিত গলায় ফিসফিসিয়ে বলল—

— "অনন্যা, রাফি! শুনেছিস? আজ আমাদের সেমিনারের চিফ সিকিউরিটি ইন-চার্জ যে, তার সাথে উনার ফিওন্সেও এসেছেন! ওই মেয়েটাও নাকি রাশিয়ার ওই স্পেশাল ফোর্সেই জব করে। ওরা নাকি রাশিয়া থেকে এসেছেন! কী চমৎকার জুটি রে ভাই! মেয়েটা দেখতে একদম পরীর মতো, যেমন সুন্দর, তেমনি স্মার্ট!এক মাস আগে বিডিতে ব্যাক করেছে।

নেহার কথাগুলো অনন্যার কানে যেন সীসার মতো গলিয়ে দিল। যে মানুষটা ৫ বছর আগে তার ১৫ বছরের জীবনটাকে একটা অন্ধকার ঘরে ধ্বংস করে দিয়ে রাশিয়া পালিয়ে গিয়েছিল, সে সেখানে নিজের নতুন জীবন সাজিয়েছে? নতুন সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে? অনন্যার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বরফশীতল, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক তখনই ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর করিডোর দিয়ে ইজানের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি উচ্চস্বরে ডাকলেন—

— "অনন্যা! রাফি! এদিকে এসো। আমাদের সোয়াত ইন-চার্জ মিস্টার ইজানের সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। তোমরাই তো এই প্রোগ্রামের দায়িত্বে আছ।"

অনন্যার আর পালানোর কোনো পথ ছিল না। সে নিজের ভেতরের সবটুকু শক্তি এক করে, মাথা উঁচু করে প্রফেসরের দিকে এগিয়ে গেল। ইজান তখন তার ম্যাপ থেকে চোখ তুলে অনন্যার দিকে তাকাল। ইজানের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল এক অপরূপা তরুণী, যার পরনেও পুলিশের মার্জিত ইউনিফর্ম—ইজানের সেই ফিওন্সে রাহি। প্রফেসর হাসিমুখে বললেন—

— "কমান্ডার ইজান, এই আমাদের অনন্যা আইমান। ফারহান আইমানের একমাত্র মেয়ে। আর রাফি আদনান, আজকের পুরো সেমিনারের হলের ভেতরের অ্যারেঞ্জমেন্টের দায়িত্বে ও ওরাই আছে।"

অনন্যা যখন একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন করিডোরের জানালার এক ফালি আলো সরাসরি অনন্যার মুখের ওপর পড়ল। ইজান অনন্যাকে চেনার জন্য চোখ দুটো সামান্য ছোট করল। অনন্যার চোখের সেই চিরচেনা জেদ, তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর তিলটার দিকে তাকিয়ে ইজানের চওড়া বুকটা আচমকা ধক করে উঠল। ৫ বছর আগের সেই ১৫ বছরের কিশোরী অনন্যার অবয়বটা হুট করে ইজানের চোখের সামনে ভেসে উঠল।

ইজান প্রফেসরের সাথে কথা বলতে বলতে মাঝপথেই থমকে গেল। তার মুখের গম্ভীর ভাবটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল—

—"অনন্যা? এই মেয়েটা অনন্যা আইমান? ৫ বছর আগে আমি যাকে...

কিন্তু অনন্যা ইজানের সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া অহংকার আর স্তব্ধতার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করল না। সে অত্যন্ত পেশাদার এবং শান্ত গলায় বলল—

— "স্বাগতম, অফিসার সালার মুনতাহির ইজান। সেমিনার হলের সিকিউরিটি প্ল্যান রেডি আছে, আপনি চাইলে চেক করতে পারেন।"

ইজানের ফিওন্সে অনন্যার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল, কিন্তু ইজান তখনো অনন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের শ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছিল।

কথা গুলো বলে অনন্যা চলে যেতে নিল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফি কৌতূহল সামলাতে না পেরে ফিসফিসিয়ে বলল—

—"এই অনু, তুই সোয়াত অফিসারের পুরো নামটা ' সালার মুনতাহির ইজান'— কীভাবে জানিস রে? উনি তো আইডিতে শুধু ইজান লিখেছেন!"

অনন্যা এক সেকেন্ডের জন্য থামল। তারপর রাফির দিকে এক পলক তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা ও তাচ্ছিল্যের গলায় বলল—

— "উনি নয়না ফুফুর এক্স-ফিয়ান্সে ছিলেন।"

কথাটা বলেই অনন্যা হনহন করে করিডোরের দিকে চলে গেল। অনন্যার মুখে 'নয়নার এক্স-ফিয়ান্সে' পরিচয়টা শুনে ইজানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে রাগে ও অপমানে ভেতরে ভেতরে একদম কটমট করে উঠল।

কিছুক্ষণ পর,

কাজের ফাঁকে অনন্যা যখন সেমিনার হলের পেছনের একটা অন্ধকার প্রায় রুম দিয়ে ফাইল নিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারপাশটা একদম ফাঁকা ছিল। আচমকা একটা শক্ত, লোহার মতো হাত অনন্যার কব্জি চেপে ধরল এবং এক হ্যাঁচকা টানে তাকে দেয়ালের আড়ালে, অন্ধকারের মধ্যে নিয়ে গেল।

ফাইলগুলো অনন্যার হাত থেকে পড়ে গেল। অনন্যা চোখ মেলতেই দেখল ইজানের সেই রাগী, ভয়ঙ্কর মুখটা তার ঠিক ইঞ্চিখানেক দূরত্বে। ইজান অনন্যাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল—

— "আগের থেকেও সাহস বেড়ে গেছে না তোর, অনন্যা? তখন তুই কী বললি? আমি তোর ফুফুর এক্স-ফিয়ান্সে?!"

অনন্যা এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেল না। সে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ইজানের চওড়া বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে এক পা পিছিয়ে দিল। নিজের সাদা আনারকলি ড্রেসটা ঠিক করতে করতে অনন্যা তীব্র অপমানের সুরে বলল—

—"মিথ্যে বলেছি? আপনি কি আমার ফুফুর এক্স-ফিয়ান্সে না? নাকি সেই সত্যিটা বলতে আপনার ইগোতে লাগছে?"

—"আমি তোর কিছু না? নাকি অন্যের স্ত্রী হয়েও আরেক পুরুষকে মনে লালন করছিস?"

—"কার স্ত্রী? আপনার?"

কথাটা শেষ করেই অনন্যা, ইজানকে ওভাবেই স্তব্ধ অবস্থায় ফেলে রেখে বের হয়ে গেল। আর সোয়াত অফিসার ইজান অন্ধকারের মাঝে অনন্যার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~🥀

সেমিনার হলের একপাশে অনন্যা, রাফি, নেহা এবং রাহি একসাথে স্টেজ বাকি কাজগুলো তদারকি করছিল। কাজের মাঝেই রাহি বেশ অমায়িক হেসেই জানায়, সে জন্মসূত্রে পুরোদস্তুর বাঙালি হলেও তার পুরো ফ্যামিলি বহু বছর ধরে রাশিয়াতেই সেটেল্ড। ওখানে স্পেশাল ফোর্সে কাজ করার সময় ইজানের সাথে তার পরিচয়! তবে ইজানের মা আর রাহির পরিবার পূর্ব পরিচিত। আর তারা খুব শীগ্রই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে।

রাহির মুখে ইজানের প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা আর অধিকারের কথাগুলো শুনে অনন্যার বুকের ভেতরটায় এক হালকা অদৃশ্য কষ্টের মোচড় দিয়ে উঠল। রাহির ওপর তার কোনো রাগ নেই, কিন্তু তার নিজের চার বছরের নিষ্পাপ ছেলে আইনানের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। যে ছেলেটা বাবার স্নেহ ছাড়া প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে, আর তার জন্মদাতা বাবা নিজের দায়িত্ব ফেলে বিদেশে গিয়ে অন্য মেয়েদের নিয়ে এমন আয়েশ করে বেড়াচ্ছে!

অনন্যা হলের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইজানের দিকে কিছুক্ষণের জন্য স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখন আর আগের সেই কিশোরীসুলভ অভিমান নেই। সে মনে মনে আওড়াল— যাকে চেয়েছিল তাকে পাওয়া হলো না। আর যাকে পেল সেও অস্বীকার করল।

ভেতরের দমবন্ধ করা কষ্টটা সামলাতে না পেরে অনন্যা কাজের ফাঁকে হলের এক কোণের নির্জন বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। আইনানের কথা খুব মনে পড়ছে তার। চার বছরের বাচ্চাটা যখন মাঝে মাঝে বাইরের অন্য ছেলেমেয়েদের তাদের বাবার সাথে খেলতে দেখে, তখন সেও আপনমনে অবুঝের মতো 'বাবা' বলে ডেকে ওঠে। সেই ডাকের কোনো উত্তর অনন্যা দিতে পারে না....

হটাৎ অনন্যার এই একাকীত্ব কাটাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল রাফি। রাফি অনন্যার জীবনের এই সংগ্রামের কথা খুব ভালো করেই জানে। সে জানে অনন্যার চার বছরের একটা ছেলে আছে যাকে সে একা বড় করছে, কিন্তু আইনানের বাবা যে কে—তা রাফি আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি। অনন্যাকে ওভাবে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফি হালকা মজার কোনো কথা বলে তাকে হাসানোর চেষ্টা করতে লাগল। বন্ধুর কথায় অনন্যার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন কিন্তু সুন্দর হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, সেমিনার হলের ভেতর থেকে ইজানের জোড়া চোখ বারান্দার দিকেই নিবদ্ধ ছিল। রাফির সাথে অনন্যাকে ওভাবে হাসিমুখে কথা বলতে দেখে ইজানের চওড়া বুকের ভেতর হুট করেই এক তীব্র, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। নিজের বৈধ স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের এত কাছাকাছি সে সহ্য করতে পারল না।

কিছুক্ষণ পর, রাফি অন্য কাজে ভেতরে চলে যেতেই ইজান ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে এল। তার হাতে ছিল এক বোতল মিনারেল ওয়াটার। সে অনন্যার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে পানিটা অনন্যার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত নিচু কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল—

—"নে, পানিটা খা।"

অনন্যা পানির বোতলের দিকে এক পলক তাকিয়েও দেখল না, ইজানের উপস্থিতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে আকাশের দিকেই তাকিয়ে রইল। ইজান এক সেকেন্ডের জন্য চোয়াল শক্ত করল, তারপর পানির বোতলটা রেলিংয়ের ওপর রেখে অনন্যার ধবধবে সাদা আনারকলি ড্রেস আর তার উন্মুক্ত গলার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ইজান ফিসফিস করে বলল—

—"এই ৫ বছরে তুই বেশ সুন্দরী হয়ে গেছিস দেখছি। তোর সেই জানের জান ইফান ভাই তোকে চোখে হারায় না? নাকি সে আর আগের মতো তোকে দেখে না?"

অনন্যা কোনো উত্তর দিল না। সে পাথর হয়ে রইল। ইজান অনন্যার এই নীরবতায় আরও ক্ষিপ্ত হয়ে অনন্যার কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত বিষাক্ত এবং ডার্ক টোনে বলল—

—"৫ বছর আগের ওই রাতে... আমার দেওয়া তীব্র স্পর্শের যে দাগগুলো তোর শরীরে বসেছিল, আজ তার ছিটেফোঁটাও দেখছি না! সব মুছে ফেলেছিস?"

ইজানের এই নোংরা ও পাশবিক মন্তব্য শুনে অনন্যার পুরো শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। সে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে ইজানকে জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে জুতো খটখট শব্দ করে রাহি সেখানে চলে এল।

রাহি আসতেই অনন্যা নিজের রাগটা জোর করে গিলে ফেলল। রাহি একদম ইজানের গা ঘেঁষে, তার একটা হাত জড়িয়ে ধরে অনন্যাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল—

—"কী ব্যাপার ইজান? কাজের মাঝে এখানে এসে অনন্যার সাথে কী গল্প করছ?"

ইজান এক মুহূর্তে নিজের ভেতরের সেই হিংস্র রূপটা লুকিয়ে রাহির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু অনন্যা তখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ইজান ও রাহির দিকে এক শেষ তাচ্ছিল্যের পলক ফেলে ভেতরের দিকে চলে গেল।

~সূচনা পর্ব~

#অবাধ্য_প্রনয়ীণি

আনান_রোজ

[প্রিয় পাঠক! কেমন লাগলো অবশ্য জানাবেন,রেসপন্স পেলে কন্টিনিউ করবো।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন