#অবাধ্য_প্রনয়ীণি
~২য় পর্ব~
আনান_রোজ
উনি আমার ছোট ফুফুর এক্স ফিয়ন্সে, এই কথাটাই SWAT অফিসারের মাথায় ঘুরছে! সে ভাবছে— আমি ওর বিবাহিত বর হই! আর সে নিজের জামাই কে ফুফুর ফিয়ন্সে পরিচয় দিতে লজ্জা করল না? কতখানি সেলফিস বউটা!
ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর বারোটা ছুঁল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার হলের ভেতরের ডেকোরেশনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। অনন্যা তার হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অস্থির হয়ে উঠল আইনানকে ডে-কেয়ার থেকে নিয়ে আসার সময় হয়ে গেছে, তাকে দুপুরের খাবার খাওয়াতে হবে ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর অনন্যার পারিবারিক কঠিন পরিস্থিতি এবং তার এই একাকী লড়াইয়ের কথা আগে থেকেই জানতেন, তাই তিনি নিজে থেকেই এগিয়ে এসে বললেন—
—"অনন্যা, দুপুরের বাকি কাজটুকু রাফি আর নেহা সামলে নিতে পারবে। তুমি এখন আসতে পারো"
অনন্যা ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই করিডোরের ওপাশ থেকে জাঁদরেল সোয়াত কমান্ডার ইজান কঠোর গলায় বাধা দিয়ে উঠল—
—"একটু দাঁড়ান, মিস অনন্যা! ডিউটি আওয়ার শেষ হওয়ার আগেই অর্গানাইজিং কমিটির মেইন মেম্বার এভাবে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবে কেন? আমি এটা অ্যালাউ করতে পারি না"
ইজানের এই আচমকা বাধা দেওয়াটা হলের বাকিদের অবাক করল, অনন্যা চলে যাচ্ছে—এই ব্যাপারটা ইজানের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করছিল, যা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না। কিন্তু প্রফেসর পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝখানে এসে কথা ঘুরিয়ে বললেন—
—"কমান্ডার ইজান, অনন্যার কিছু পার্সোনাল ও জরুরি কাজ আছে, যার পারমিশন আমি আগেই দিয়েছি. সিকিউরিটির বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আপনি বরং আমার অফিসে চলুন"
প্রফেসরের বুদ্ধিমত্তার কারণে ইজান আর কিছু বলতে পারল না, তবে তার চোখ দুটো রাগে জ্বলতে লাগল। অনন্যা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত হলরুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এল।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে পৌঁছাতেই ইজান হনহন করে তার পথ আটকে দাঁড়াল। ইজান তার রেইনকোটের পকেটে হাত রেখে অত্যন্ত বাঁকা ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—
— "কী রে, দুপুরের কড়া রোদে রিকশা দিয়ে যাবি নাকি?তোর অহংকারী বাবা তোকে একটা গাড়িও দেয়নি? তুই না এই সিটির অন্যতম রিচেস্ট ফেমিলি থেকে বিলং করিস? আজ এই দশা কেন তোর?"
বাবার প্রসঙ্গ এবং নিজের বর্তমান সংগ্রাম নিয়ে ইজানের মুখে এমন সস্তা খোঁচা শুনে অনন্যার ভেতরের প্রতিবাদী রূপটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে ইজানের ঠিক ইঞ্চিখানেক সামনে এসে দাঁড়িয়ে বরফশীতল অথচ ধারালো গলায় বলল—
—"মিস্টার সোয়াত অফিসার সালার মুনতাহির, আমার বাবা আমাকে গাড়ি দিল নাকি আমি রিকশায় গেলাম, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো ফালতু সময় আপনার থাকার কথা নয়। নিজের ওই ক্ষমতার দাপট অন্য কোথাও দেখাবেন, আমার সামনে আপনার এই সস্তা মানসিকতা প্রকাশ করতে আসবেন না। রাস্তা ছাড়ুন"
অনন্যার মুখে এই তীব্র অপমান শুনে ইজানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
—"তুই আগের মতোই ম্যানারলেস আর বেয়াদব রয়ে গেলি অনন্যা! বদলালি না একটুও"
ইজান অবজ্ঞার হাসি হেসে, আবার অনন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
—"বাই দ্য ওয়ে, তোর ফোন নাম্বারটা দে."
অনন্যা এক চুলও নড়ল না। সে তীব্র অনীহা নিয়ে বলল—
—"আপনাকে আমি আমার ফোন নাম্বার কেন দিব?"
ইজান এবার অনন্যার খুব কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—
— "ডিভোর্স পেপার রেডি হলে সেই খবর কি আমি কবুতর দিয়ে পাঠাব, নাকি সরাসরি তোর বাপের বাসায় গিয়ে হাজির হব?"
বাবার বাসায় ইজানের যাওয়ার কথা শুনে অনন্যা আর ঝামেলা বাড়াতে চাইল না। সে দ্রুত ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ইজানকে তার নাম্বারটা মুখস্থ বলে দিল। নাম্বারটা নিয়েই ইজান আর কথা না বাড়িয়ে তার রাস্তার দিকে চলে গেল।
আর এদিকে ইজান ফোনের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল। তারপর কীবোর্ডে কুটকুট করে টাইপ করলো, স্টাববোর্ন গা.... লিখে থামলো। মুখ তুলে অনন্যার যাওয়ার রিকশার দিকে তাকিয়ে, আবার চোখ জোড়া ফোনের দিকে নিবদ্ধ করে, লিখল "স্টাববোর্ন ওয়াইফি" তারপর সেইভ অপশনে ক্লিক করে দিল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~🥀
অনন্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে সোজা ডে-কেয়ারে পৌঁছাল। আইনানকে দেখা মাত্রই অনন্যার সকালের সব ক্লান্তি আর মনের ভেতরের বিষাক্ত মেঘ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। আইনান তার ছোট ছোট পা ফেলে দৌড়ে এসে মায়ের কোল জড়িয়ে ধরল।
বাসায় ফিরে অনন্যা তার বাবার বাড়ির পেছনের সেই ছোট্ট, এক চিলতে স্যাঁতসেঁতে রুমটায় ঢুকল। আইমান কুঞ্জ কোনো রাজপ্রসাদের চেয়ে কম না হলেও, এই ঘরটাই অনন্যা আর আইনানের সম্পূর্ণ পৃথিবী। সে পরম মমতায় আইনানের জামা বদলে দিল, তাকে কোলে বসিয়ে দুপুরের খাবার খাইয়ে দিল। আইনান তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আধো আধো বোল ফুটিয়ে বলতে লাগল—,
—"আম্মু, আজ না এটটা বলো গায়ি দেকেচি! তুমি আমাকে এনে দেবে?"
অনন্যা মলিন হাসলো, সে আইনানের কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল—
—"হ্যাঁ বাবা, আম্মু অনেক বড় গাড়ি এনে দেবে তোমাকে।"
মা-ছেলের এই ছোট্ট ঘরে তখন এক ফালি রোদ এসে পড়েছে, যেখানে ইজান আর পরিবারের দেওয়া সব আঘাত ভুলে অনন্যা তার সন্তানের হাসির মাঝে নিজের বেঁচে থাকার নতুন শক্তি খুঁজে পাচ্ছিল...
দেখতে দেখতে শ্রাবণের সেই মেঘলা দিনটি গড়িয়ে চারপাশ ধূসর করে সন্ধ্যা নেমে এল। সন্ধ্যার পরপরই অনন্যার ঘরে তার দুজন টিউশনির ছাত্র এল। অনন্যা তার বাবার বাড়ির এক কোণে পড়ে থাকলেও নিজের এবং চার বছরের ছেলে আইনানের সমস্ত খরচ একাই চালায়। তার অহংকারী বাবা ফারহান আইমান কিংবা পরিবারের অন্য কারও কাছ থেকে সে একটি টাকাও সাহায্য হিসেবে নেয় না। নিজের আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখতে ইউনিভার্সিটির পড়াশোনার পাশাপাশি এই প্রাইভেট পড়ানোই তার একমাত্র অবলম্বন।
দুই ছাত্রকে পড়ানো শেষ করে যখন ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁল, তখন অনন্যার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল এর মাঝেই সে রাতের রান্না শেষ করে আইনানকে খাইয়ে নিয়েছে ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে অনন্যার ঘরে এসে ঢুকল ইফান
ইফান ঘরে ঢুকেই বিছানায় বসা আইনানকে কোলে তুলে নিল ইফান আইনানকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসে, আর আইনানও তার ‘ইফান মামু’কে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না কিন্তু আইনানের সাথে খেলার ছলে ইফানের চোখ দুটো বারবার অনন্যার ক্লান্ত মুখের দিকেই ফিরে আসছিল ৫ বছর কেটে গেলেও ইফান আজও অনন্যাকে ঠিক আগের মতোই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চায় কিন্তু অনন্যা প্রতিবারই অত্যন্ত শক্তভাবে নিজেকে সরিয়ে নেয়
সে কিছুতেই ইফানের জীবনটা নষ্ট করতে চায় না ৫ বছর আগের তাদের সেই স্নিগ্ধ, পবিত্র প্রেমটা বাস্তবতার নিষ্ঠুর চাকা আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কাছে হেরে গেছে অনন্যা খুব ভালো করেই জানে, সমাজ এবং তার নিজের চাচা-চাচি (যারা তাকে এত আদর করেন) তারাও কখনো মেনে নেবেন না যে তাদের অবিবাহিত তরুণ ছেলেটি এক বাচ্চার মা আর ডিভোর্সি একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলুক সে ইফানের জীবনে কোনো বোঝাতে পরিণত হতে চায় না তাই নিজের মনের সব অনুভূতিকে পাথর চাপা দিয়ে সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
ইফান যখন আইনানের সাথে বিছানায় উপুড় হয়ে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছিল। অনন্যা তখন এক ফাঁকে নিজের ক্লান্ত শরীরটা একটু জুড়াতে ওয়াশরুমে গেল শাওয়ার নেওয়ার জন্য। সারাদিনের এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু ঠাণ্ডা পানি গায়ে ঢালা খুব দরকার ছিল। আইনানকে একা রেখে ওয়াশরুমে যেতেও মনে মনে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করে মেয়েটার।
অনন্যা শাওয়ারে ঢোকার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় তার বিছানায় রাখা ভাঙা স্ক্রিনের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটি অপরিচিত নম্বর ইফান প্রথমে খেয়াল করেনি, কিন্তু প্রথমবার কেটে গিয়ে যখন দ্বিতীয়বার একটানা ফোনটা বাজতে শুরু করল, তখন ইফান আইনানের হাত ছেড়ে ফোনটা হাতে নিল
সবুজ বাটনটা সোয়াইপ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা গেল না, শুধু একটা ভারী ও গম্ভীর শ্বাসের শব্দ এল ইফান নরম গলায় বলল—
—"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে এবার এক বরফশীতল, ডিনামাইট ফাটার মতো গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল—
—"অনন্যা কোথায়?"
ইফান আইডেন্টিটি না জেনেই খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল—
—"অনু তো শাওয়ার নিচ্ছে। আপনি কে বলছেন?"
কন্ঠের স্বর শুনে, ওপাশে থাকা ইজান বুঝতে পারল মানুষ টা ইফান! তার ভেতরের রক্তের গতি যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল তার চওড়া বুকের ভেতর ঈর্ষা আর অপমানের এক তীব্র দাবানল জ্বলে উঠল। ইফান স্বাচ্ছন্দ্যে অনন্যাকে 'অনু' বলে ডাকছে, আর এত রাতে ও তার রুমে! এটা ইজানের হাতটা ফোনের ওপর শক্ত হয়ে উঠল, চোয়াল কড়মড় করে উঠল তার। তবে ইজান নিজের রাগকে কোনোমতে চেপে অত্যন্ত পেশাদার ও কড়া গলায় বলল—
— "আমি স্পেশাল ক্রাইম ইউনিট থেকে কমান্ডার বলছি ইউনিভার্সিটির আগামীকালের সেমিনারের সিকিউরিটি প্রোটোকল রিলেটেড কিছু জরুরি কাজে কথা ছিল ,ম্যামকে বলবেন"
কথাটা শেষ করেই ইজান অপর প্রান্ত থেকে এক ঝটকায় কলটা কেটে দিল। ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইজান তখন রাগে কাঁপছিল, তার রাহির কথা মনে ছিল না, মনে ছিল শুধু অনন্যার সেই শান্ত ভেজা রূপ আর অন্য পুরুষের উপস্থিতি। সে দ্রুত সাইট টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে, ওর অফিসিয়াল বাসভবন থেকে বেড়িয়ে গেল।
ইফান ফোনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলো সে বুঝতে পারল না এত রাতে পুলিশের স্পেশাল অফিসার কেন অনন্যাকে পার্সোনালি কল করবে তবে অনুষ্ঠানের ঝামেলার কথা ভেবে সে আর বেশি মাথা ঘামাল না। ফোনটা যথাস্থানে রেখে সে আবার আইনানের সাথে খেলায় মেতে উঠল।
অনন্যা যখন শাওয়ার নিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখল, তখন দেখল ইফান ফোনে কারও সাথে জরুরি কথা বলছে। অনন্যাকে দেখামাত্রই ইফান ফোনটা পকেটে পুরে একটু তাড়াহুড়ো করে বলল—
—"অনু, আমার একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে রে, আমি এখন আসি।"
অনন্যা ওর দিকে তাকিয়ে একটা মায়াবী মুচকি হাসি দিয়ে বলল—
— "আচ্ছা, সাবধানে যাস।"
ইফান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পর অনন্যার ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে সেই অপরিচিত নম্বর। অনন্যা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোনো হ্যালো বা ভূমিকা ছাড়া ইজানের বরফশীতল স্বৈরাচারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
—"আমি তোর বাড়ির পেছনে আছি। এখনই নিচে আয়। নয়তো আমি ভেতরে আসছি।"
কথাটা বলেই ইজান অনন্যাকে কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে খট করে লাইনটা কেটে দিল। অনন্যার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে ধক করে উঠল। এত রাতে নিচে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু সে খুব ভালো করে জানে, ইজান একজন একগুঁয়ে লোক, সে যা বলে তা করতে দ্বিধা করে না। যদি এই গভীর রাতে ইজান বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে আর তার বাবা জানতে পারেন যে ইজান দেশে ফিরেছে, তবে তিনি অনন্যাকে আবার ইজানের সাথে সংসার করতে বাধ্য করবেন। কিন্তু ইজান বা সে, তারা কেউ ই এই সম্পক চায় না।আর ইজান তো এসেই, বলল ওর ডিভোর্স লাগবে। আর সবচেয়ে বড় ভয় হলো, ইজান যদি আইনান এর কথা জেনে যায়, তবে ক্ষমতার জোর দিয়ে সে যদি আইনানের কাস্টিডি ছিনিয়ে নিবে?? এই তীব্র আতঙ্কে অনন্যা আর দেরি করল না।
যেহেতু সে বাড়ির পেছনের এক চিলতে ঘরে সবার থেকে আলাদা থাকে, তাই মূল ফটক না পেরিয়েই পেছনের ছোট গেট দিয়ে সে অনায়াসে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে তখন হালকা কুয়াশা আর মেঘের ছায়া। গেট পেরিয়ে অন্ধকার গলির মোড়ে তাকাতেই অনন্যা দেখল, ইজান তার কালো রঙের সরকারি গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পড়নে একটা হোয়াইট শার্ট, হাতা ফোল্ড করা, চুল গুলো এলোমেলো। তার দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, যার থেকে ক্ষণে ক্ষণে বিষাক্ত নিকোটিনের ধোঁয়া রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। অনন্যাকে গলি দিয়ে আসতে দেখে ইজান হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে পিষে, ঠোঁট জোড়া মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
অনন্যার পরনে তখনো আনারকলি ড্রেস। সে তার ভেজা লম্বা চুলগুলো একটা গোলাপি টাওয়াল দিয়ে পিঠের ওপর পেঁচিয়ে রেখেছে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসায় তার ফর্সা চোখে-মুখে তখনো পানির কণা চকচক করছে। ভেজা অনন্যার এই অবিশ্বাস্য স্নিগ্ধ ও মাদকতাময় রূপ দেখে ইজান এক মুহূর্তের জন্য নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে চাইল। হটাৎ এই মেয়ের প্রতি নিজের অবাধ্য দুর্বলতা ইজানকে ভেতরে ভেতরে আরও হিংস্র করে তুলছিল।
অনন্যা ইজানের থেকে দুই হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বলল—
— "কিছু বলবেন? এত রাতে এখানে কেন এসেছেন?"
অনন্যার কণ্ঠস্বরে ইজানের মোহগ্রস্ততার ঘোরটা এক ঝটকায় কেটে গেল। নিজের ভেতরের দুর্বলতা লুকাতে সে চোখ দুটো ছোট করে অত্যন্ত চড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল—
—"এত রাতে কেন শাওয়ার নিলি? তোর না ছোটবেলা থেকেই রাতে সর্দি লেগে যায়? এখন এই ভেজা চুল কীভাবে শুকাবি?"
ইজানের মুখে নিজের পুরনো অভ্যাসের কথা শুনে একটু অবাক হলেও অনন্যা তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলল—
—"আমার সর্দি লাগবে কি লাগবে না, তা নিয়ে আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে। কাজের কথা বলুন, কেন এসেছেন?"
ইজান নিজের পকেটে হাত গুঁজে একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বাঁকা হেসে বলল—
—"তোকে দেখতে আসিনি। শুধু এটা বলতে এলাম যে, আমি ডিভোর্সের ফাইল প্রসেস করেছি। তবে হয়তো কিছুটা লেট হবে।"
অনন্যা এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সরাসরি ইজানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
—"যত জলদি হয়ে যায়, ততই ভালো। আপনার এই বিষাক্ত নামটা থেকে যত দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়, আমার জন্য ততই মঙ্গল।"
অনন্যার মুখে এই চটজলদি মুক্তির কথা শুনে ইজানের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে উঠল। কেন জানি অনন্যার এই অনীহা আর দূরে চলে যাওয়ার তীব্র জেদ তার মোটেও ভালো লাগল না। তার বুকের ভেতর ঈর্ষার আগুনটা আবার চড়া দিয়ে উঠল। সে আর এক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়াল না। ধপাস করে গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল—
—"চুল ভালো করে শুকিয়ে ঘুমাস, না হয় সর্দি লেগে মরবি। নিজেকেই সামলাতে পারে না, আবার পেত্নির মতোন চুল রেখে দিয়েছে!"
বলেই ইজান এক ঝটকায় গাড়ির এক্সিলারেটরে চাপ দিল। চাকার কর্কশ আওয়াজ তুলে কালো গাড়িটা অন্ধকার গলির ওপারে মিলিয়ে গেল। তবে,এক্টুপরেই কিছু টা দূর থেকে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ টা প্রতিধ্বনি হতে লাগলো, ইজান বোধহয় সাইরেন অন করেছে।
অনন্যা মাঝরাস্তায় একদম টাসকি খেয়ে, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান দুটো তখনো বিশ্বাস করতে পারছিল না ইজানের শেষ কথাগুলো। পেত্নি? ইজান তাকে পেত্নি বলে গেল? আর সবচেয়ে বড় কথা, সর্দি লাগার সেই পুরনো সমস্যার কথা এই নিষ্ঠুর মানুষ টার এখনো নিখুঁতভাবে মনে আছে?
ভাবতে ভাবতে অনন্যার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিকর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
তবে, সে দ্রুত পেছনের গেট দিয়ে নিজের অন্ধকার ঘরে ফিরে এল। বিছানায় পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা চার বছরের আইনানকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে, ইজানের দেওয়া সমস্ত বিভ্রান্তি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সেও এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল...
~~~~~~~~~~~~~~~~~🥀
পরদিন সকালে
অনন্যা অন্যদিনের চেয়েও বেশি ক্লান্ত বোধ করছিল রাতে ঘুমাতে দেরি হওয়া এবং ভেজা চুলের কারণে সকাল থেকেই তার শরীরটা বেশ ভারী লাগছিল. তবুও জোর করে বিছানা ছেড়ে উঠে সে আইনানকে খাইয়ে দাইয়ে রেডি করল, তারপর তাকে নিয়ে ডে-কেয়ারে দিয়ে এল আজ ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে অনন্যার ছিল না, শুধু ওই একটা মানুষের উপস্থিতির কারণে কিন্তু প্রফেসরের দেওয়া দায়িত্ব আর সেমিস্টার ফাইনালের প্রেসারের কারণে সে নিজের ইচ্ছেকে দমন করে শেষমেশ ক্যাম্পাসের দিকে রওনা হলো।
আইনানকে ডে-কেয়ারে ছাড়ার সময় ছেলেটা আজ খুব কান্না করছিল, তাই ওকে শান্ত করতে গিয়ে অনন্যার বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেল।
সেমিনার হলের ভেতরে যখন সে পৌঁছাল, তখন চারপাশ সাজসজ্জার কাজে পুরোপুরি ব্যস্ত কালকেই মূল অনুষ্ঠান রাফি, নেহা এবং ডিপার্টমেন্টের অন্য স্টুডেন্টরা হন্যে হয়ে কাজ করছে, আর একপাশে রাহি তার সোয়াত টিম নিয়ে সিকিউরিটির ফাইনাল চেকিং তদারকি করছে।
অনন্যাকে হলরুমে ঢুকতে দেখেই রাফি প্রায় ছুটে এল. সে অনন্যার হাতটা আলতো করে ধরে তাগাদা দেওয়ার সুরে বলল—
—"কী রে অনু, এত লেট কেন আজকে? তুই ছাড়া কি কাজ এগোয়?"
অনন্যা হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইজানের দিকে আড়চোখে এক পলক তাকাল, তারপর রাফির দিকে ফিরে আস্তে করে বলল—
—"আসলে আইনান আজ খুব কান্না করছিল, তাই আসতে লেট হলো..."
রাফি মাথা নেড়ে অনন্যার হাতটা ধরে সিকিউরিটি গার্ডদের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যাতে হলের ভেতরের গেট পাস আর প্রোটোকলের বাকি কথাগুলো অনন্যা ওদের বুঝিয়ে দিতে পারে কিন্তু দূর থেকে রাফির অনন্যার হাত ধরার এই দৃশ্যটি দেখামাত্রই ইজানের ভেতরের রক্ত আবারও টগবগ করে ফুটে উঠল নিজের চোখের সামনে অন্য একটা পুরুষ তার বৈধ স্ত্রীর হাত ধরে ঘুরছে—এই দৃশ্য সোয়াত কমান্ডার ইজানের অহংকার আর পুরুষালী সত্তায় তীব্র আঘাত করল।
তার ওপর সে লক্ষ্য করল, অনন্যা একহাতে টিস্যু নিয়ে বারবার নাক মুছছে এবং গার্ডদের সাথে কথা বলতে বলতেই পর পর কয়েকটা জোরালো হাঁচি দিল। অনন্যার লাল হয়ে যাওয়া নাক আর ভেজা চোখ দুটো দেখেই ইজান আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। সে নিজের সমস্ত প্রোটোকল ভুলে, বড় বড় পা ফেলে হলের মাঝখান দিয়ে তীব্র গতিতে এগিয়ে এল। সবার সামনেই সে এক ঝটকায় অনন্যার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
অনন্যাকে হলের একপাশে টেনে নিয়ে যেতে যেতে ইজান সবার সামনেই কড়া ধমকের সুরে বলে উঠল—
—"কাল রাতেই তোকে বলেছিলাম না যে সর্দি লেগে যাবে? নিজের জেদ দেখাতে গিয়ে রাতে চুল শুকাসনি তো? এখন এই দশা কেন?"
ইজানের এই আচমকা আক্রমণ আর ধমক শুনে অনন্যা একদম থমতমে খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো সেমিনার হলের কাজ এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। রাফি, নেহা এবং বাকি স্টুডেন্টরা হা করে তাকিয়ে রইল। সবচেয়ে বেশি অবাক আর স্তম্ভিত হয়ে গেল রাহি। সে বড় বড় চোখে ইজানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পাগলামি দেখছিল
ইজান অনন্যাকে হলের পাশের একটা খালি চেয়ারে জোর করে বসিয়ে দিল তারপর নিজের বুলেটপ্রুফ ভেস্টের ভেতরের পকেট থেকে একটা অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধের পাতা বের করল। পাশে থাকা টেবিল থেকে পানির বোতলটা তুলে ওষুধের সাথে অনন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত খিটখিটে গলায় বলল—
— "আমি জানতাম এমনই হবে। এখন সর্দি লেগেছে, একটু পর দেখবি গলা ব্যথাও শুরু হয়ে গেছে। জলদি ওষুধটা খেয়ে নে"
অনন্যা ইজানের এত বড় দাপট আর সবার সামনের এই আদিখ্যেতা সহ্য করতে পারল না। সে পানির বোতলটা সরিয়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল—
—"আমি ওষুধ খাব না। হাত ছাড়ুন আমার।"
ইজান এবার অনন্যার কাছে কিছু টা ঝুঁকে এসে চোখ দুটো রাগে লাল করে কামড়ানোর মতো গলায় বলল—
—"সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে আমার সময় লাগে না অনন্যা। নিজে খাবি? নাকি আমি খাইয়ে দেব?"
ইজানের চোখের সেই ভয়ঙ্কর ডার্ক জেদ দেখে অনন্যা বুঝল এই লোকটার ইগো এখন চড়া. এখানে আর ঝামেলা বাড়ালে সে সত্যিই কোনো কেলেঙ্কারি করে বসবে। সে কথা না বাড়িয়ে ইজানের হাত থেকে ওষুধ আর পানির বোতলটা নিয়ে এক ঢোকে খেয়ে নিল।
ঠিক তখনই রাহি দ্রুত পায়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তার ফর্সা মুখটা তখন বিস্ময় আর সন্দেহে থমথম করছে। সে ইজানের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল—
—"ইজান! তুমি জানলে কী করে যে অনন্যার রাতে সর্দি লেগে যায়? আর ও সর্দিতে ঠিক কোন ওষুধটা খায়, সেটাও তুমি এত নিখুঁতভাবে জানলে কী করে?"
চলবে,,,,,,