ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য প্রনয়িণী

৩য় পর্ব

লেখক: আনান রোজ

#অবাধ্য_প্রনয়িণী

পর্ব |৩|

আনান_রোজ

রাহির এই ধারালো প্রশ্ন শুনে অনন্যার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে ধক করে উঠল। কিন্তু ইজান বিন্দুমাত্র না কেঁপে, অত্যন্ত ডোন্ট-কেয়ার একটা ভাব নিয়ে রাহির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

—"ওকে ছোটবেলা থেকে কোলে-পিঠে করে বড় করেছি। ওর কোন জিনিসে অ্যালার্জি আর ওর সর্দির সমস্যা —তা আমি জানব না তো কে জানবে?"

ইজানের মুখে এই উত্তরটা শুনে অনন্যা এক তীব্র বিষম খেল। তার ভেতরের আতঙ্ক এবার চরম সীমায় পৌঁছাল। ইজান যেভাবে সবার সামনে তার ওপর অধিকার খাটাচ্ছে আর তাদের ছোটবেলার চেনা-শোনার গল্প বলছে, তাতে অনন্যার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। সে মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল—ইজান যদি রাগের মাথায় বা পজেসিভনেসের চোটে তাদের জোরপূর্বক বিয়ের কথাও ফাঁশ করে দেয়? যদি সে বলে দেয় অনন্যা অন্য কেউ নয়, অনন্যা তার স্ত্রী?

অনন্যা নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো আনারকলি ড্রেসের ঘেরের আড়ালে লুকিয়ে ইজানের চোখের দিকে তাকাল, যেখানে এক ভয়ঙ্কর অধিকার আর জেদের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল...

ইজান অনন্যার দিকে আরও একটা ফ্রেশ টিস্যু বাড়িয়ে দিতে দিতে রাহির দিকে তাকাল। তার চোখের সেই আদিম একগুঁয়েমি আর পজেসিভনেস তখন তুঙ্গে। সে রাগে ও জেদের বশে রাহির সামনেই অনন্যাকে নিজের সম্পত্তি দাবি করার জন্য মুখ খুলল—

— "একচুয়ালি শি ইজ মাই ওয়া..."

—"উনি আমার ছোট ফুফুর ফিয়ন্সে ছিলেন!"

ইজান 'ওয়াইফ' শব্দটা শেষ করার আগেই অনন্যা চেয়ার থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রলয়ঙ্করী গলায় চিৎকার করে উঠল তার ফর্সা মুখটা তখন আতঙ্কে এবং রাগে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বলে, অনন্যা আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে রাফির হাত ধরে প্রায় টেনে হলের অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে যেতে বলল—

—"রাফি, চল, গার্ডদের প্রোটোকল ফাইলটা ক্রসচেক করতে হবে"

রাহি ইজানের দিকে চরম আকাশ থেকে পড়া বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। তার ফর্সা কপাল জুড়ে তখন এক ডজন সন্দেহের রেখা। ইজানের অতীত জীবনের এই অধ্যায়টির ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল। সে জানতই না যে বাংলাদেশে ইজানের অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক হয়েছিল কিংবা সে কারও ফিয়ন্সে ছিল।

ইজান চোয়াল শক্ত করে অনন্যার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করে যেই না নিজের টিমের দিকে চলে যেতে নিল, অমনি রাহি এক ঝটকায় ইজানের শক্ত হাতটা চেপে ধরল সে ক্ষুব্ধ ও আহত গলায় জিজ্ঞেস করল—

—"তুমি, আগে অন্য কারও সাথে এনগেজড ছিলে ইজান? একটা বারও এই কথাটা আমাকে বলোনি কেন?"

ইজান রাহির হাতের বাঁধনটা অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ নির্মম এক ঝটকায় আলগা করে দিল। তার চোখে কোনো নরম ভাব ছিল না। সে তার চিরাচরিত রাশভারী, অহংকারী গলায় বলল—

— "আমার অতীতের প্রতিটা গল্প তোমাকে ধরে ধরে বলতে হবে নাকি রাহি? নিজের লিমিটের মধ্যে থাকো

বলেই ইজান রাহিকে ওভাবেই স্তব্ধ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে ভারী বুটের আওয়াজ তুলে করিডোর দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল।

হলের ভেতরে তখন বাকি স্টুডেন্টরা যার যার কাজে ব্যস্ত। সোয়াত টিমের বাকি মেম্বাররাও হলের চারপাশের মেটাল ডিটেক্টর আর সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পজিশন অনুযায়ী গুছিয়ে নিচ্ছিল। অনন্যা আর নেহা হন্তদন্ত হয়ে হলের পেছনের ডাইনিং এরিয়া থেকে কেটারিং সার্ভিসের সমস্ত লাঞ্চ আর স্ন্যাকসের মেনু তদারকি করে রুমে ফিরল ওদিকে রাফি আর বাকি ছেলেরা মিলে আগামীকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রফেসরের বক্তব্য দেওয়ার স্ক্রিপ্টগুলো টেবিল জুড়ে সাজাচ্ছিল।

সেমিনার হলের এক কোণের ডেস্কে বসে ইজান তার ল্যাপটপে পুরো ক্যাম্পাসের ডিজিটাল সিকিউরিটি সিস্টেমের লাইভ ফিড নিখুঁতভাবে দেখছিল। তার চোখে তখনো এক কড়া প্রফেশনাল অফিসারের চাউনি।

অনন্যা সারাদিনের ধকল, সর্দির ওষুধের ঝিমুনি আর কেটারিংয়ের তদারকিতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে নিজের অজান্তেই সে খেয়াল না করে ইজানের পাশে থাকা খালি যায়গায় ধপ করে বসে পড়ল। তবে সে ইজানের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই বসেছিল। ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে সে চোখ বুজে এক ঢোক পানি খেল।

অনন্যা এসে বসামাত্রই তার আনারকলি ড্রেস আর চুল থেকে ভেসে আসা এক অসম্ভব মিষ্টি, চেনা ঘ্রাণ বাতাসের ঢেউয়ে ভর করে সরাসরি গিয়ে ধাক্কা খেল ইজানের নাকে। ওই একটি সুবাস মুহূর্তের মধ্যে সোয়াত কমান্ডার ইজানের ভেতরের সমস্ত কঠোরতা আর ল্যাপটপের স্ক্রিনকে এক নিমেষে ফিকে করে দিল, ৫ বছর আগের সেই সুবাস!

ইজান এক ঝটকায় নিজের মুখ তুলে অনন্যার দিকে তাকাল অনন্যা তখনো ক্লান্তিতে চোখ বুজে আছে। ইজান আর নিজের ডেস্কে বসে থাকতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে অত্যন্ত ধীর অথচ শিকারী পায়ে অনন্যার ঠিক পাশে এসে বসল।

অনন্যার কানের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে ইজান ফিসফিস করে বলল—

—"এখনো একই পারফিউম ইউজ করিস? এই পাঁচ বছরে তোর এই একটা অভ্যাসও বদলাল না?"

অনন্যা চমকে উঠে চোখ মেলতেই ইজান তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত নরম অথচ বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল—

—"তোকে কাল আমি একটা নতুন পারফিউম এনে দেব, রাশিয়ান। এটার চেয়ে অনেক ভালো ঘ্রাণ"

অনন্যা ইজানের দিকে এক পলকও তাকাল না। তার চোখে-মুখে তীব্র বিরক্তি আর অবজ্ঞা ফুটিয়ে তুলে বরফশীতল গলায় বলল—

—"আপনার ওই রাশিয়ান পারফিউম নিজের কাছেই রাখুন, আমার লাগবে না সস্তা মানসিকতার মানুষ আর তাদের দেওয়া কোনো কিছু আমার একদম পছন্দ না"

কথাটা বলেই অনন্যা ইজানের পাশ থেকে উঠে দাঁড়াতে গেল, কিন্তু অনন্যা তার নিজের শরীরটা সোজা করার আগেই ইজানের লোহার মতো শক্ত হাতটা এক ঝটকায় অনন্যার ফর্সা কব্জি চেপে ধরল অত্যন্ত রুক্ষ আর আদিম এক টানে সে অনন্যাকে আবার চেয়ারের ওপর আছড়ে বসিয়ে দিল।

অনন্যা এই আচমকা হামলায় পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল হলের বাকিরা তখন স্ক্রিপ্ট আর সিসিটিভি তার গোছানোয় ব্যস্ত থাকায় কেউ এই কোণটার দিকে খেয়াল করেনি। অনন্যা রাগে, অপমানে আর ক্ষোভে অন্ধ হয়ে ইজানের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে উঠল—

"কী করছেন কী আপনি, সালার?!"

—'সালার'—অনন্যার মুখ থেকে এই একটিমাত্র পুরোনো ডাক শোনামাত্রই ইজানের পুরো শরীর যেন এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় শান্তিতে জুড়িয়ে গেল। এই নামে ডাকা সে গত ৫ বছরে শোনেনি। যেন এই নামটা শুধু অনন্যার একার অধিকার ছিল।

ইজান অনন্যার কব্জির ওপর নিজের হাতের মুঠোটা আরও কিছুটা শক্ত করে, তার চোখের একদম গভীরে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে এক অদ্ভুত ডার্ক ও পজেসিভ গলায় বলল—

—"ইশ...! কত দিন পর তুই আমাকে এই নামে ডাকলি, অনন্যা!"

অনন্যা ইজানের চোখের সেই অবাধ্য গভীরতা আর তীব্র অধিকারের চাউনি দেখে নিজের শ্বাস নিতে ভুলে গেল, যেন এই অন্ধকার কোণটায় ৫ বছরের দীর্ঘ দূরত্ব এক নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল...

কিন্তু ইজান তখনও অনন্যার ফর্সা কব্জিটা তার লোহার মতো শক্ত মুঠোর ভেতর আটকে রেখেছে। অনন্যার চোখে তখন রাগের আগুন। ইজান তার ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, মনকাড়া হাসি ফুটিয়ে অনন্যার একদম কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—

—"কিন্তু এবার শুধু সালার কেন? তোর পুরোনো ডাক টা 'সালার চাচু' বললি না যে? নাকি এতদিনে তুই এক্সেপ্ট করে নিয়েছিস যে তুই অন্য কেউ নোস—তুই আসলে মিসেস সালার মুনতাহির?"

ইজানের থেকে বিবাহিত নাম 'মিসেস সালার মুনতাহির' শুনে অনন্যার পুরো শরীর অপমানে কাঁপতে লাগল। সে নিজের হাতটা হেঁচকা টানে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

—"ছাড়ুন আমার হাত! আপনি এত বেহায়া কেন?"

ইজান অনন্যার কব্জির ওপর নিজের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ ভয়ঙ্কর গলায় বলল—

— "চুপ করে সোজা হয়ে বোস। নয়তো আমি পুরো হলের সামনে বউ বলে চিৎকার করব!!

অনন্যা এক মুহূর্তে একদম স্তব্ধ হয়ে থেমে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে এই জেদি সোয়াত অফিসারের পক্ষে এই পাগলামি করা অসম্ভব কিচ্ছু নয়। সে নিজের রাগ চেপে সোজা হয়ে বসল। অনন্যাকে শান্ত হতে দেখে ইজান চেয়ারটা টেনে তার আরও একটু ঘেঁষে বসল। কিছুক্ষণ সে পলকহীন চোখে অনন্যার ফর্সা, রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। ইজানের চোখের সেই আদিম চাউনি দেখে অনন্যার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হতে লাগল। ইজান মনে মনে ভাবছিল—এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে মেয়েটা কতটা বদলে গেছে! শরীরের রেখায়, চোখের চাউনিতে, এখন এক প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পূর্ণতা পেয়েছে, কিন্তু স্বভাবে আগের মতোই জেদি আর স্টাবর্ন রয়ে গেছে!

কিছু সময় পর ইজান অনন্যার গায়ের হালকা নীল রঙের জামাটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল—

—"আচ্ছা, তুই কিসব মরা মরা কালারের ড্রেস পরছিস বলতো? কাল পরলি সাদা, আজ পরেছিস এই হালকা নীলচে! তোকে না লাল রঙে বেশ মানায়। ওই যে...পাঁচ বছর আগে আমাদের বিয়ের রাতে যে পরেছিলি?"

বিয়ের রাতের সেই ভয়ঙ্কর ট্রম্যাটিক স্মৃতি ইজানের মুখে শোনামাত্রই অনন্যা তীব্র ঘৃণা নিয়ে ইজানের চোখের দিকে তাকাল। সে একদম বিষাক্ত গলায় বলল—

— "নয়না ফুফু আপনাকে রিজেক্ট করে একদম ঠিক কাজ করেছিল। আপনার মতো একটা অহংকারী পশুর সাথে কোনো সুস্থ মেয়ে বাঁচতে পারে না।"

অনন্যার এই ধারালো তিরে ইজান বিন্দুমাত্র রাগল না। সে এক চিলতে বাঁকা হেসে বলল—

—"হুম, ও রিজেক্ট করেছিল বলেই তো তুই পেয়েছিস! ওয়েট... ইটস মিন তুই অসুস্থ?

—"মানে?"

—"এইযে বললি...আচ্ছা বাদ দে। এত সুন্দর কবে হলি বল?"

অনন্যা ইজানের এই কথার পিঠে আরও বড় কোনো আঘাত করার জন্য যেই না মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে রাহি জুতো খটখট করে তাদের দিকে এগিয়ে এল। রাহি এসে কোনো ভণিতা না করে সরাসরি ইজানের পাশের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল। অনন্যা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে এক ঝটকায় ইজানের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল।

রাহি অনন্যার দিকে কড়া, সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে এক কৃত্রিম মুচকি হাসি দিয়ে বলল—

— "অনন্যা, তোমরা যে ছোটবেলা থেকে এত গভীরভাবে পরিচিত, তা কিন্তু আমার মোটেও জানা ছিল না। ইজান তো আমাকে এই পাঁচ বছরে একটা বারও তোমাদের কথা বলেনি।"

অনন্যা রাহির সেই বিষাক্ত হাসির জবাবে নিজের মুখে অত্যন্ত মার্জিত ও শান্ত একটা হাসি ফুটিয়ে বলল—

— "পুরোনো ডাস্টবিন নতুন জায়গায় গিয়ে, আগের গল্প এমনিতেও শেয়ার করে না। আচ্ছা, আমার কাজ আছে, আমি আসছি।"

কথাটা শেষ করেই অনন্যা চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ওড়নাটা সামলে হনহন করে হলের মাঝখানের দিকে চলে গেল। অনন্যা ডাস্টবিন বলে তাকে অপমান করে চলে গেছে—এই সত্যটা ইজানের ইগোতে গিয়ে বড় ধাক্কা দিল। অনন্যা হলরুমের মাঝখানে চলে যেতেই ইজানও রাহির কোনো কথা না শুনে এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে অনন্যার পেছন পেছন চলে গেল। রাহি মাঝপথে একা বসে ইজানের এই অবাধ্যতা দেখে তীব্র বিস্ময় আর রাগে স্তম্ভিত হয়ে রইল।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

ওদিকে সেমিনার হলের এক প্রান্তে, উঁচুতে সিলিংয়ের কাছাকাছি দুটো সিসিটিভি সিকিউরিটি ক্যামেরা লাগানোর চেষ্টা করছিল ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ছেলেরা। কিন্তু মইয়ের ওপর দাঁড়িয়েও তারা কিছুতেই ক্যামেরা দুটো সঠিক অ্যাঙ্গেলে ফিক্স করতে পারছিল না। অনন্যাও সেই স্পটের নিচে দাঁড়িয়ে ফাইল হাতে ছেলেদের ডিরেকশন দিচ্ছিল।

ঠিক তখনই ইজান সেখানে এসে দাঁড়াল। সে ছেলেদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই মই বেয়ে ওপরে উঠে গেল। সোয়াতের স্পেশাল ট্রেইনিংপ্রাপ্ত ইজানের কাছে এই কাজটা সহজ হলেও, উঁচুতে ঝুলে স্পেশাল ক্যাবল কানেক্ট করতে গিয়ে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল। দুপুরের কড়া গরমে আর হলের ভেতরের ভ্যাপসা আবহে ইজানের চওড়া কপাল আর ফর্সা মুখ বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতে লাগল।

ক্যামেরা দুটো পারফেক্টলি সেট করে ইজান যখন মই বেয়ে নিচে নেমে এল, তখন তার কপালে আর চুলে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। অনন্যা ফাইলটা বুকে চেপে তার ঠিক দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলছিল।

ঠিক তখনই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি, যা পুরো হলের বাতাসকে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দিল।

ইজান নিচে নেমেই, কোনো কিছু না ভেবে বা পারমিশন না নিয়ে, সরাসরি সবার সামনে এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় অনন্যার কাঁধে থাকা হালকা নীল রঙের ওড়নাটার একটা কোণ নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিল। অনন্যা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ইজান অত্যন্ত স্বাভাবিক ও কড়া অধিকারে অনন্যার সেই ওড়নার কোণটা দিয়ে নিজের কপালের আর মুখের ঘামগুলো মুছে নিতে লাগল।

ইজানের এই চরম দুঃসাহস আর পাগলামি দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফি আর বাকি স্টুডেন্টরা হা করে টাসকি খেয়ে গেল। সবার চোখ ছানাবড়া! অনন্যা নিজের জায়গায় একদম পাথর হয়ে জমে গেল, তার হাত থেকে ফাইলটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সবার সামনে ইজান তার ওড়না দিয়ে মুখ মুছছে!

হলের ওপাশ থেকে রাহি এই দৃশ্যটি দেখামাত্রই তার হাতের ফাইলটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। রাহির পুরো শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। সে খুব ভালো করে জানে, ইজান একজন চরম হাইজিন-ফ্রিক মানুষ। সে রাশিয়ার থাকার সময় ওয়েট নেপকিন বা টিস্যু ছাড়া কখনো কিচ্ছু ব্যবহার করত না। অত্যন্ত বিলাসী আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা সেই সোয়াত কমান্ডার ইজান আজ একটা সাধারণ মেয়ের গায়ের ওড়না দিয়ে সবার সামনে মুখ মুছছে?

ইজান ঘাম মোছা শেষ করে অনন্যার ওড়নাটা ছেড়ে দিল। অনন্যার চোখের সেই স্তব্ধ ও ভয়ার্ত চাউনির দিকে তাকিয়ে সে তার ঠোঁটের কোণে এক পজেসিভ ডার্ক হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল—

— "তোর ওড়নার ঘ্রাণটা আজও বদলায়নি, অনন্যা।"

বলেই সে তার সোয়াত টিমকে অর্ডার দেওয়ার জন্য ভারী বুটের শব্দ তুলে করিডোরের দিকে চলে গেল। আর অনন্যা নিজের ওড়নার সেই ভেজা কোণটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে, পুরো হলের হাজারটা সন্দেহভরা চোখের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তীব্র আতঙ্কে কাঁপতে লাগল—ইজানের এই অবাধ্য অধিকার বোধহয় এবার সত্যি কোনো বড় ঝড় ডেকে আনতে চলেছে...

ইজান একটা ডেভিল হাসি দিয়ে, চওড়া পিঠ ঘুরিয়ে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নিজের সোয়াত টিমের দিকে লম্বা পায়ে হেঁটে চলে গেল। আর অনন্যা ঠিক নিজের জায়গায় হা করে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, সে কী করবে বা কী বলা উচিত—তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না ইজান এমন অবাধ্য, খামখেয়ালী আচরণ সবার সামনে কেন করছে সে কি সত্যি কোনো কেলেঙ্কারি ঘটাতে চায়?

হঠাৎ করেই নেহা খুব দ্রুত পায়ে অনন্যার পাশে এসে ওকে একটা হালকা ধাক্কা দিল। অনন্যার স্তম্ভিত মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারায় বেশ রসিয়ে বলল—

— "কী রে অনু? কমান্ডার সাহেবের সাথে তোর ওড়নার এই মাখামাখি কীসের ইঙ্গিত?"

নেহার ধাক্কায় অনন্যার ঘোরটা এক ঝটকায় কেটে গেল সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের হালকা নীল ওড়নাটা দ্রুত টেনেটুনে ঠিক করতে করতে সামনের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, হলের ওপাশ থেকে রাহি এক দৃষ্টিতে বিষাক্ত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

অনন্যা করিডোর ধরে কিছুটা দূরে যেতেই পেছন থেকে রাহির তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

—"অনন্যা! একটু শুনবে?"

অনন্যা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল এবং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। রাহি ধীর পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল, তার চোখে তখন একাধারে ঈর্ষা আর এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা।

সে অনন্যার খুব কাছে এসে বলল—

—"তোমার সাথে আমার ইজানকে নিয়ে কিছু জরুরি কথা ছিল"

অনন্যা নিজের মুখটা একদম ভাবলেশহীন রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল—

— "দুঃখিত ম্যাম, আমি ওনার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না"

রাহি এক চিলতে বাঁকা হেসে বলে —

— "জানো না মানে? তোমরা তো পূর্ব পরিচিত, তাই না?"

অনন্যা রাহির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল—

—"হ্যাঁ, ফ্যামিলিগতভাবে পরিচিত ওনার বাবা আমার ফ্যামিলির অনেক ক্লোজ ছিলেন, ব্যস এইটুকুই"

রাহি এবার ইজানের ওপর নিজের পরম অধিকার জাহির করার জন্য অনন্যার একটা হাত ধরেএক প্রকার আকুতির স্বর নিয়ে বলল—

—"আচ্ছা অনন্যা, ইজানকে নিয়ে আমাকে কিছু বলো না? আমি আসলে ওর মনের মতো হতে চাই। না মানে... এমনিতেও ওর মনে শুধু আমিই আছি, অন্য কারো জায়গা নেই ওখানে, তাও আরকি একটু জানতে চাওয়া"

রাহির এই সস্তা অহংকার আর ইনসিকিউরড কথাগুলো শুনে অনন্যার খুব বিরক্তি লাগল। সে নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল—

—"আমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না ম্যাম। উনার সাথে আমার তেমন কথা হতো না।"

—"আচ্ছা সে আগে কেমন ছিল?"

—"আমার মতে, উনি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত বিরক্তিকর আর অহংকারী।"

অনন্যার মুখে ইজানকে এমন শুনে রাহি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলল—

— "কে বলল বিরক্তিকর? সে তো একজন অত্যন্ত সুপুরুষ এবং ড্যাশিং অফিসার!"

অনন্যা তার ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল—

—"হবে হয়তো, আমার জানা নেই। আসি"

কথাটা বলেই অনন্যা হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল কিন্তু যাওয়ার সময় রাহির বলা সেই একটা কথা তার কানে অনবরত তীরের মতো বাজতে লাগল

—‘ওর মনে শুধু আমিই আছি...’ অনন্যা মনে মনে এক বিষাক্ত হাসল। যে পুরুষকে সে নিজেও চায় না, সেই পুরুষের মনে কে আছে তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

~~~~~~~~~~~~🥀

এর মাঝেই অনেক টা সময় পার হয়ে গেল এবং অন্যান্য দিনের মতোই অনন্যার ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। কিন্তু ঠিক যাওয়ার মুহূর্তে নিজের হ্যান্ডব্যাগ হাতড়াতে গিয়ে অনন্যার বুকটা ধক করে উঠল। তার ফোনটা কোথাও নেই! কাজের ব্যস্ততায় সে ফোনটা ঠিক কোথায় রেখেছে, একদম মনে করতে পারছে না। সে হন্যে হয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল, কিন্তু কোথাও ফোনটার হদিস মিলল না।

অনন্যা কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল এমনিতেই সে টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের আর আইনানের খরচ অত্যন্ত হিমশিম খেয়ে চালায়, তার ওপর তার ফোনটাও ছিল ভাঙা স্ক্রিনের এই পরিস্থিতিতে ফোনটা যদি সত্যি হারিয়ে যায়, তবে নতুন একটা ফোন কেনার সামর্থ্য এই মুহূর্তে তার একদমই নেই।

সেমিনার হলের এক কোণে রাফি বসে ছিল, অনন্যা ওর কাছে গিয়ে বলল—

— "রাফি, তোর ফোনটা একটু দিবি? আমার ফোনে একটা রিং দিতাম"

রাফি নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিন দেখিয়ে আফসোস করে বলল—

— " অনু, আমার ফোনে তো চার্জ শেষ হয়ে এক্কেবারে বন্ধ হয়ে গেছে!"

অনন্যা তখন পাশে থাকা নেহার দিকে তাকাল. নেহা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,—

— "আমার ফোনে তো আবার রিচার্জ করা নেই রে অনু, ব্যালেন্স একদম জিরো!"

অনন্যার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তার ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বাধ্য হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক সিনিয়র স্টুডেন্টের দিকে তাকিয়ে বলল—,

—"ভাইয়া, তোমার ফোন থেকে আমার নম্বরে একটা কল করা যাবে?"

—"আমার ফোনটা নে"

আচমকা এক গমগমে, গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর অনন্যার ঠিক পাশ থেকে ভেসে এল। অনন্যা চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, ইজান তার নিজের কালো আইফোনটা অনন্যার দিকে বাড়িয়ে ধরে আছে।অনন্যা এই মুহূর্তে ইজানের সাথে কোনো নতুন ঝামেলা চায় না, তাই ফোনটা হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে সে আর নিজের ইগো না দেখিয়ে ইজানের হাত থেকে ফোনটা লুফে নিল।

সে দ্রুত ইজানের ফোনের ডায়াল প্যাডটি বের করে নিজের নম্বরটি টাইপ করল নম্বরটি টাইপ করে যেই না সে কল বাটনে চাপ দিল, অমনি ইজানের ফোনের স্ক্রিন জুড়ে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে একটি কন্টাক্ট নেম ভেসে উঠল—

"Stubborn Wifey"

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অনন্যার চোখের মণি দুটো মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পুরো শরীর যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের শকে জমে পাথর হয়ে গেল।

চলবে????

পর্যাপ্ত রেসপন্স পেলে পরবর্তী পর্ব আসবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন