#হৃদয়াবেগ
#পর্বঃ২১
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
নাযীফাহ ঘাড় ঘুরাতেই তার ওষ্ঠ স্পর্শ করলো তাহমিদের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে আবৃত গাল। আকস্মিক স্পর্শে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো নাযীফাহ। হুট করে কি ঘটে গেলো বোধগম্য হলো না তার। স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ সে। তার সমপূর্ণ কায়া অসাড়,নিশ্চল, অনুভূতিহীন জড় বস্তুতে পরিণত হলো। নড়তে ভুলে গেলো সে কিংবা নড়ার জন্য বিন্দু পরিমাণ শক্তি সে পেলো না। গাত্রে জড়ানো ওড়নার একপাশ খসে পড়লো কাঁধ থেকে।
অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ভাবে নাযীফাহ'র উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া পেয়ে অনড়, স্থির হয়ে গেলো তাহমিদ। আকস্মিক কি ঘটে গেলো অনুভবয়োগ্য হলো না তারও। হতবিহ্বল হয়ে গেলো সে। আপনা-আপনি তার হাত স্পর্শ করলো তার গাল। নিজে নাযীফাহ কে উষ্ণ স্পর্শ দিলেও কখনো নাযীফাহ তাকে সেভাবে স্পর্শ করেনি। ঠোঁটে ফুটে উঠলো পরিতৃপ্তির হাসি। অপ্রত্যাশিত হলেও বউ থেকে পাওয়া প্রথম পরশ। তাহমিদ দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
'পঁচিশে নভেম্বর সকাল আটট পয়ত্রিশ। সেকেন্ডের কাঁটা হেরফের হবে তবে এই তারিখের এই সময়টা আমার স্মৃতির মানসপটে স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরদিন, অনভিলষিত ভাবে কিছু পাওয়ার খুশিতে। অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটনা কখনো কালজীর্ন হয় না। অভূতপূর্ব থাকে সর্বদা, সব সময়।'
কপাল কুঁজিত হয় নাযীফাহ'র। ঘাড় উঁচু করে তাহমিদের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দু'জনের। তাহমিদ ক্রূর হেসে বলে,
'বউয়ের ঠোঁটে কি ভিটামিন আছে? ঠোঁট জোড়া গাল স্পর্শ করতেই গাত্রে কেমন বল পাচ্ছি। সকাল থেকে শরীর টা ম্যাজম্যাজ করছিলো।এখন শক্তি পাচ্ছি। তাহলে এই ভিটামিনের অভাবে আমার শরীর দূর্বল লাগে। আর আমি শুধু শুধু সবুজ শাক সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছি। আহারে অতীতের দিনগুলোর জন্য বড্ড আফসোস হচ্ছে। আগে জানলে নিয়ম করে তিনবেলা এই ভিটামিন গ্রহণ করতাম।'
দাঁতে দাঁত চেপে একের পর এক তাহমিদের লজ্জাজনক কথা হজম করছে নাযীফাহ। এখন কিছু বলতে গেলে আরো লজ্জা দিবে তাহমিদ। তাই চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করছে সে। নাযীফাহ'র গা থেকে খসে পড়া ওড়নার পাশটা পুনশ্চ গায়ে জড়িয়ে দিলো তাহমিদ। নিরূদ্ধে সে নাযীফাহ'র কানে মৃদু কন্ঠে বলল,
'তিনবেলা নিয়ম করে পাবো কি? থাক তিনবেলা না দুইবেলা দিলেই হবে।তুই রাজি থাকলে ঠোঁট অব্দি পৌঁছানোর দায়িত্ব আমি নিবো।তুই রাজি তো?'
প্রগাঢ় ত্রপায় মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না নাযীফাহ'র।শ্বাস পর্যন্ত আঁটকে আসছে তার। লোকটা এমন কেন? বুঝতে পারছে নাযীফাহ মনের অবস্থা। এসব কথা তার শ্রবণেন্দ্রিয় হতেই সমস্ত কায়া অসাড় হয়ে আসছে।
দু'হাত দূরে গেলো তাহমিদ। হাত ভাঁজ করে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো আপাদমস্তক লজ্জায় মোড়ানো অর্ধাঙ্গীর দিকে। আচমকা বুয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো তাহমিদ। নাযীফাহ ও নড়েচড়ে বসলো। বুয়া আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল,
'ভাইজান কাপড়চোপড় ধুয়া শেষ। দুপুর আর রাইতের জন্যি কি রানমু এট্টু কন।'
তাহমিদ কিছু না বলে রুমে গেলো। তারপর ম্যানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে বুয়ার হাতে দিয়ে বলল,
'তিনদিনের জন্য তোমার ছুটি। পাঁচশো টাকা নাও। ভালো মন্দ কিছু কিনে নিও।'
বুয়া বিস্মিত গলায় বলল,
'ভাইজান হঠাৎ কইরা কি অইছে?'
তাহমিদ অধর জোড়া প্রসারিত করে বলে উঠলো,
'কিছু হয়নি তবে আজ তোমার ভাইজান খুব খুশি। সেই খুশিতে তোমায় ছুটি দিলাম।'
কথার ফাঁকে এক প্রকার পালিয়ে গেলো নাযীফাহ। না হলে দেখা যাবে আবার উল্টো পাল্টা কথায় পুনরায় লজ্জা পাবে।
____________________________________________
পৌনে এগারোটা বাজে। তাহমিদ ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। তার ভার্সিটি অফ। দরজা থেকে নাযীফাহ ডাকল,
'তাহমিদ ভাই?'
তাহমিদ ল্যাপটপে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল,
'কি আশ্চর্য বুঝে গেছিস আমি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। সেজন্য বুঝি ভিটামিন সাপ্লাই দিতে এসেছিস? তা কোন গালে দিবি, বাম গালে নাকি ডান গালে?'
নাযীফাহ মৃদু শব্দে চিৎকার করে বলল,
'আপনি সকাল থেকে কিসব শুরু করেছেন? শুধু আজেবাজে কথা। দাদি শুনলে কি বলবে? আপনার মুখে কিছু আটকায় না?'
তাহমিদের দৃষ্টি এখনো ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির।
'সরি টু সে যতদিন বউ ভাই বলে সম্বোধন করবে ততদিন নিজেকে এসব বলা থেকে সংযত করতে পারবো না। বউ ভাই বলার সাথে সাথে কনফিউজড হয়ে যাই সে বউ নাকি বোন। তাই ভালোবাসার কথা বলে মনে রাখি সে বোন না বউ।'
নাযীফাহ ভ্রুকুটি করে মিনমিনিয়ে রিনরিনে গলায় বলল,
'অসভ্য লোক কোথাকার।'
নাযীফাহ'র রিনরিনে গলার স্বর কর্ণকুহর অব্দি পৌঁছালো তাহমিদের। সে অধর প্রসারিত করে বলল,
'ইতিহাস সাক্ষী পুরুষরা সবার কাছে সভ্য হলেও একমাত্র বউয়ের কাছে অসভ্য। কারন বাবা হওয়ারও একটা ব্যপার আছে।'
নাযীফাহ 'ধ্যাৎ' বলেই চলে গেলো। নাযীফাহ চলে যেতেই শব্দযোগে হাসলো তাহমিদ। মেয়েটাকে রাগাতে তার বেশ লাগে।বিশেষ করে লজ্জায় মিইয়ে যাওয়া আনন। মিনিট পাঁচেকর মাথায় নাযীফাহ আবারও ফিরে এলো। এবার কোনো ভণিতা ছাড়াই বলল,
'বুয়া তো চলে গেলো। দুপুরের রান্না কি হবে?'
তাহমিদ ঘাড় ঘুরিয়ে নাযীফাহ'র দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
'দুপুরের রান্না,,,, '
তাহমিদ কে কথা শেষ করতে না দিয়ে নাযীফাহ বলল,
'রান্না আমি করি?'
কপালে ভাঁজ পড়ে তাহমিদের।
'নুডলস রান্না করতে গিয়ে পায়ে গরম পানি ফেলেছিস। রান্না করতে গিয়ে কি গা পু'ড়াবি? দরকার নাই।'
নাযীফাহ আদুরে স্বরে বলল,
'এমন করছেন কেন করি না রান্না। ফুপি আমাকে রান্না শিখিয়েছে তো।'
'অন্য একদিন করিস। এখন না হয় তোর বরের হাতের রান্না খেয়ে দেখ। খারাপ রাঁধে না তোর বর। মুখে তুলতে পারবি।'
____________________________________________
কোচিং সেন্টারে বসে জান্নাতের জন্য অপেক্ষা করছে নাযীফাহ। এখনো আসেনি সে। এর মধ্যে সেইদিনের সেই মেয়েটা কক্ষে প্রবেশ করলো। নাযীফাহ কে দেখে বাঁকা হাসলো সে। নাযীফাহ পাত্তা দিলো না। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেই জান্নাত আসলো। ব্যাগটা রেখে জিজ্ঞেস করলো,
'কলেজ যাসনি কেন?'
নাযীফাহ মন খারাপ করে বলল,
'যেতে দেয়নি।'
জান্নাত উৎফুল্ল হয়ে বলল,
'জানিস আজ না ফারুক স্যার ক্লাসে গান গেয়েছেন। স্যারের গানের গলা কিন্তু সেই।'
নাযীফাহ আবারও মন খারাপ করে বলল,
'আজ আমি যাইনি তো তাই।শাহরুখ খানও এসেছে নিশ্চয়ই?'
নাযীফাহ'র কথা শুনে উচ্চ শব্দে হাসলো জান্নাত। তারপর সামনের মেয়েটার দিকে নজর যেতেই ফিসফিস করে বলল কিছু একটা। জান্নাতের কথা শুনে নাযীফাহ ক্রূর হেসে জোরে জোরে বলল,
'একজন বলল, কেউ যদি কোনো অন্যায় করে তা যেন ভুল করেছে ভেবে ক্ষমা করে দেই। তাই চুপচাপ আছি।না হলে তো আমায় চিনিসই। কিন্তু দ্বিতীয় বার এমন করলে ছেড়ে দিবো না।'
এক এক সবাই আসার পর ক্লাসে আসলো তাহমিদ। কালকের টপিক থেকে পড়া জিজ্ঞেস করতে লাগলো। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করার পর দাঁড় করালো সেই মেয়েটিকে।
'থার্ড বেঞ্চের লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ড আপ প্লিজ। আপনি বলবেন, পাস্ট পারফেক্ট কনটিনিউয়াস টেন্সের স্ট্রাকচারটা। এবং অন্য ফর্ম থেকে এই ফর্মে নিতে হলে কি কি পরিবর্তন করা লাগবে।'
মেয়েটি আমতা আমতা করে বলল,
'সাবজেক্ট প্লাস ভারবের সাথের ইডি প্লাস,,,'
ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাহমিদ।
'আমি কাল এগুলো পড়িয়েছিলাম? কাল তো বললে ক্লাসে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে বুঝতে পারছো না। তার পরও আমি আরো কয়েকবার বুঝিয়ে দিয়েছি, তাহলে? ক্লাসের শেষে জিজ্ঞেসও করেছি কারো কোনো প্রবলেম আছে কিনা। যদি না বুঝতে বলতে পারতে। শুনো, বাবা র'ক্ত পানি করে ইনকাম করে টাকা দেয় পড়াশোনায় ফাঁকি বাজি করার জন্য। টাকা ইনকাম করতে অনেক কষ্ট। শুধু তুমি না এখানের সবার বাবাই কারো কারো মাও জব করে। ভালো করে পড়াশোনা করো। ভবিষ্যতে কিছু একটা করতে পারবে। বাবা মায়ের কষ্টের দাম দাও।'
পড়া বলতে না পারার কারনে পরপর তিনজন টিচার সেই মেয়েটিকে বকাঝকা করলো।আর সব রাগ গিয়ে জমলো নাযীফাহ'র উপর। ক্লাস বেরিয়ে জান্নাত আর নাযীফাহ অপেক্ষা করতে লাগলো তাহমিদের।
জান্নাত আর নাযীফাহ কথা বলার মাঝেই মেয়েটি এসে ফোঁড়ন কাটে।
'নিজেকে চালাক মনে করো তাই না? ভেবেছো আমরা কিছু বুঝি না। তাহমিদ স্যারের সাথে তোমার এতো কিসের ঢলাঢলি?সব জায়গায় স্যারের তোমাকে দেখা যায় কেন? আমাদের বাচ্চা মনে করেছো।গ্রাম থেকে উঠে আসা মেয়েরা নিজেদের সাধু বানায় সবার কাছে। আসলে এদের চরিত্রের ঠিক থাকে না। শহরে এসে সুন্দর সুন্দর ছেলে দেখলে মাথা ঘুরে যায়। কি দিয়ে স্যার কে পাগল করেছো? নিজের রূপ গুন নাকি?'
কর্ণকুহরে কথা গুলো পৌঁছানো মাত্রই কলিজা ফেটে কান্না আসছে তার। কেউ তার চরিত্র নিয়ে কথা বলছে? আঙ্গুল তুলছে চরিত্রের উপর। গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না তার। এক পর্যায়ে ফুঁপানো শুরু করলো সে।
জান্নাতের কাছে অল্প কিছু শুনেই দৌড়ে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে এলো তাহমিদ। নাযীফাহ কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নাযীফাহ কাউকে পাত্তা না দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাহমিদকে। বাঁধ ভেঙেছে কান্নার।অঝোর ধারায় ঝরছে চোখের পানি।হেঁচকির জন্য কম্পিত হচ্ছে সমস্ত কায়া। মোটামুটি সব স্টুডেন্ট জড়ো হয়ে গেলো। মেয়েটিও আতংকিত হয়ে গেলো। চোখেমুখে ভর করলো এক রাশ ভয়।
নাযীফাহ কে এক হাতে জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
'কি বলেছে তোকে?'
কান্নার জন্য কথাই বলতে পারছে না নাযীফাহ। বার বার হেঁচকি দিয়েই চলেছে সে। তাহমিদ পুনশ্চ জিজ্ঞেস করলো,
'কি হলো? আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তো। কি বলেছে তোকে?'
নাযীফাহ কাঁপা কাঁপা গলায় থেমে থেমে বলল,
'আমার নাকি চরিত্রে সমস্যা
সেজন্য আপনার সাথে এতো ঢলাঢলি করি
এক রিক্সায় যাই।' বলেই খামচে ধরলো তাহমিদের শার্ট।
কথা গুলো কর্ণগোচর হতেই রাগে চক্ষুদ্বয় লাল হয়ে গেলো তাহমিদের। চোখেমুখে কাঠিন্য দেখা দিলে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,
#চলবে
বানান ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সেই বিকেল থেকে চেষ্টা করতেছি আপলোড করার। নেট প্রবলেম এর জন্য পারিনি।