#মন_দিয়েছে_ধরা
#পর্ব_২২
লেখনীতে....#পুষ্পিতা_প্রিমা
রিপ দু-হাত মেলে কোলে তুলতুলে শরীরটা নিতেই বক্ষস্থল কেঁপে উঠলো তার। এত নরম! তার শক্ত হাতে যদি ব্যাথা পায় নীরা তো তার আস্ত রাখবে না। বলবে কতবড় সাহস আপনার আমার বাচ্চাকে ব্যাথা দিয়েছেন। সে মুনাকে বলল
নিয়ে ফেলো আপা।
নেব কেন? রাখ। আদর কর। কার মতো হয়েছে বল তো?
রিপ ভালো করে তাকালো। বলল
কারো মতোই তো লাগছে না।
এখন লাগবে না। চল্লিশ দিন পার হলেই বুঝা যাবে ভালো করে।
রিপ হেঁটে হেঁটে বাচ্চাটার নাকমুখ চোখে ছোট্ট ছোট্ট চুমু বসিয়ে দিল। একদম শান্ত। চোখ মেলতে পারছেনা ভালো করে। ঠোঁট দুটো নাড়ার চেষ্টা করছে। সে ঠোঁটদুটোর উপর আলতো করে চুমু খেল। নীরা যে বলে তার দাঁড়িগুলো মৌমাছির হুলের মতো। কই তার বাচ্চা তো কাঁদলো না? নাকি সে বাবার সামনে ভদ্র সাজছে? অগণিত আদর করা শেষে তালহা বেগম ডাক দিলেন
এই এই এদিকে নিয়ে আয়। ওকে খাওয়াতে হবে।
রিপ এগিয়ে গেল। বাচ্চাকে দিল না। আবদার করলো
মা আমি ভেতরে যেতে পারব?
তালহা বেগম গালভরে হাসলেন। বলল
পাগল ছেলে। যাহ। ওর মাকে দেখা। ওর পরাণ জুড়াক।
রিপ তীব্র উত্তেজনা নিয়ে কেবিনের ভেতরে পা রাখলো। দুর্বল ও শীর্ণমুখে নীরা চোখ বুঁজে আছে। কয়েক মুহূর্তের লহমায় কেমন চুপসে গিয়েছে সে। কত ঝড় না গেল তার উপর। রিপ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশের টুলে বসলো। ডাকলো
নীরা!
নীরা বোধহয় এই ডাক শোনারই অপেক্ষায় ছিল। চোখ মেলে চট করে তাকালো রিপের দিকে। কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর জল জমে উঠলো ওর চোখজোড়ায়। রিপ হাস্যমুখে নীরাকে ইশারায় দেখিয়ে দিল কোলের বাচ্চাটিকে। নীরা দুচোখ মেলে দেখে তাকে । দেখতে দেখতে তার ব্যাথা যন্তণা দুঃখ যাতনার কথা ভুলে যায়। বুকের ভেতরটা লাফাতে থাকে আনন্দে। গলার কাছে কথারা থমকে থাকে। চোখ ফুঁড়ে গাল বেয়ে জলের স্রোত নেমে আসে। আনন্দের, সুখের কান্না। কাঁপা-কাঁপা হাত তুলে নরম তুলতুলে বাচ্চাটিকে ছোঁয়ামাত্রই বাচ্চাটা চেঁচিয়ে কেঁদে উঠে। নীরা দ্রুত হাত সরিয়ে ফেলে। রিপ হেসে বলল
এতক্ষণ কোলে নাওনি তো। তাই রাগ করেছে।
তাই?
হুমম।
নীরা দু-হাত বাড়িয়ে দিল। রিপ ওর বুকের উপর শুয়ে দিতেই নীরা জড়িয়ে ধরলো আলতো করে। বাচ্চা কেঁদেই চলেছে। নীরা চোখ বন্ধ চুপটি করে রইলো। তাকে হাত দিয়ে ছোঁয়ার কত স্বপ্ন দেখে এসেছে সে। আজ ছুঁতে পারছে। কি দুষ্টু বাচ্চা মায়ের উপর অভিমান করে এত কাঁদতে হয়?
মুনা এসে ফিডিং করাতে সাহায্য করে। রিপ তখন চলে যায়। মুনা চলে যেতেই রিপ আবার ফের আসে। বাচ্চা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রিপ গিয়ে নীরার পাশে বসে। নীরা ওর হাতটা নিয়ে কানের পাশে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রাখে। রিপ ওর মুখের সামনে গিয়ে কপালে কপাল চেপে ধরে। কপালে গভীর চুম্বন এঁকে ফিসফিস করে বলে
নীরা তোমাকে পেয়ে আমি খুব খুশি। আমি আজ সুখী মানুষ।
সাথে সাথেই হাতের তালুতে নীরার কান বেয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্তঅশ্রুজল টের পায় সে। নীরা কাঁদতেই থাকে সুখের অসুখে।
___________
বাড়িতে উৎসবের আমেজ। নাজিয়া বেগম আর তালহা বেগমের মধ্যে একপ্রকার বাকবিতণ্ডা লেগে গেল নাম রাখা নিয়ে। তালহা বেগম বললেন আমার ভাইয়ের নাম হবে সুলতান খান। নাজিয়া বেগম বললেন এসব পুরোনো রাজা-বাদশার নাম। তালহা বেগম জবাবে বললেন, আমার ভাই বাদশা-ই।
সুলতান নামটা ভালো হবে না। ওর নাম রাখবো আরশ নয়ত আজিম। এই নামের অনেক ফজিলত আছে।
মুনা এসে বলল
আচ্ছা ঠিক আছে। যার যেটা পছন্দ সেই নামে ডাকবেন।
দু'ঘন্টা তারা একে অপরের সাথে কথা বলেনি এ'নিয়ে। পরে বাবু যখন তালহা বেগমের কোলে হিসু করে দিল তখন নাজিয়া বেগমও হাসতে হাসতে বললেন
সুলতান তো কাম সেড়ে দিয়েছে বেয়াইন।
তালহা বেগম উনার গালে নাতির ছোট্ট তুলতুলে গালটা লাগিয়ে রেখে হেসে উঠে বলেন
এসব তো নিয়ামত।
নামকরণের দিন মাহিদ রেজওয়ান খান রাখা হলো। রিক মুনা আর জহির সাহেবের নামটা বেশ পছন্দ হয়েছে। নীরা মহাখুশি এডভোকেট সাহেব তার কথা রেখেছে বলে। আদি ইশার সাথে পরীও এল নামকরণের দিন। সে মাহিদের মাথার কাছে বসে। ছোট্ট ঠোঁট বাবুর হাতে কপালে গালে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল
বাবুহ বাবুহ আদোল।
রিপ তার গালে চুমু খেয়ে বলল,
মা এটা তো ভাই। পরীর ভাই।
ভাইই? আমাল ভাই?
রিপ হেসে বলে
হ্যা ভাই। আপনি আপু।
আফুহহ?
হুহ আফুহ। বড় আফুহ।
ব-লো।
হুম ব-লো।
পরী দাঁত দেখিয়ে খিকখিক করে হাসে। ভাইকে পেয়ে কি খুশি সে!
_______________
প্রায় চারমাস পরের কথা......
খুশিমনে বাড়ি ফিরতেই রিপ দেখতে পেল নীরা বিছানায় শোয়া বাচ্চাকে আদর আদর করতে বকবক করেই যাচ্ছে।
মাহি সোনা আমায় মা ডাক। একবার ডাক। আচ্ছা অর্ধেক ডাক। একটুখানি ডাক। এট্টুখানি। আচ্ছা এখন ডাকিস না। তুই তো কথা বলতে পারিস না।
শোন তুই সবার আগে মা ডাকবি। সবাইকে একদম তাক লাগিয়ে দিবি। সারাক্ষণ ম্যা ম্যা করবি। আমি একটুও বিরক্ত হব না সোনা। বিনিময়ে বেশি বেশি আদর দেব, সোহাগ দেব। লক্ষকোটি চুমু দেব।
বলতে বলতে আবারও ছেলের দুগালে চুমু খায় সে। পেটে সুড়সুড়ি দেয়। মায়ের মজা ছেলে যেন বুঝতে পারে। তাই হাসতে থাকে মায়ের সাথে। নীরা ওর হাসি দেখতে থাকে মুগ্ধ হয়ে। তারপর চোখের কোণা থেকে কাজল নিয়ে কানের নীচে ছুঁয়ে দেয়। কি প্রাণবন্ত হাসি। মায়ের নজর নাকি লাগে বেশি?
নীরা গালফুলায়। অভিমান করে বলে
এ্যাহ নমাস পেটে রেখে দুনিয়ায় আনলাম আমি। আর সে হচ্ছে বাপের মতো। হাসেও বাপের মতো। দুষ্টু ছেলে। পাজি ছেলে। বাপের ভদদরো ছেলে।
বলতে বলতে ডানেবামে নাড়েচাড়ে । মাহিদ ঠোঁট টেনে কেঁদে উঠে। নীরা পিঠের নীচে হাত গলিয়ে কোলে তুলে আদর করে। দোলাতে দোলাতে বলল
আহারে কাঁদেনা বাবাহ। মা তো মজা করছি। আমার জান্টুস, আমার মনা, আমার সোহাগ। তোকে আমি বকতে পারি? তুই তো আমার কইলজ্যা, আমার ফুসফুস, আমার সব রে মাহি। ও মাহি তোর বাপ কোথায় গেল রে? শালার জামাই বেশ বেশি ছাড় পাইছে এ কয়েকদিনে। দেরী করে ঘরে ফিরে আজকাল । শোন তোর দাঁত উঠলে তোর বাপের ডান হাতের আঙুলে কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবি যাতে আর কলম ধরতে না পারে, লিখতে না পারে বুঝছিস? বুঝছিস মনা?
সুড়সুড়ি দিতেই আবারও হেসে উঠে মাহিদ। নীরা হাসতে হাসতে টাপুসটুপুস চুমু খায়। বুকের সাথে চেপে ধরে বলে, তোরে আমার কি করতে মন চায় রে মাহি।
রিপ ঘরে পা রাখতেই নীরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
এই এই ওয়াশরুমে যান আগে। হাতমুখ ধোয়া ছাড়া আমার বাচ্চাকে ছুঁবেন না।
আচ্ছা ঠিক আছে বাবাহ যাচ্ছি।
রিপ কোর্ট খুলে টিশার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নীরা মিনমিন করে বলে
এই মাহি তোর বাপ আসছে। কোলে নিলেই খ্যাঁচ করে কেঁদে উঠবি। ঠিক আছে। বুঝিয়ে দিবি যে তুই ভয়ানক রেগে আছিস। ঠিক আছে?
রিপ গলায় ঝুলানো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে এল। নীরা চুল আঁচড়াচ্ছে। মাহিদ দোলনায়। হাত পা নেড়ে খেলছে। রিপ তোয়ালে রেখে দিয়ে মাহিদকে কোলে তুলে নিল। বাবার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সে। রিপ ওর হাসি দেখে কপালে বিরাট চুম্বন দিল। দু গালে চুমু চুমু দিতে দিতে বলল
কি ব্যাপার খান সাহেব? খ্যাঁচ করে কেঁদে উঠছেন না কেন?
নীরা চমকে উঠে তাকালো রিপের দিকে। রিপ ওকে ঠেস মেরে বলল
দাঁত উঠেনি এখনো? দাঁত উঠলে খাওয়ার সময় খ্যাঁচখ্যাঁচ করে কামড় বসিয়ে দেবেন। ঠিক আছে।
নীরা লজ্জা পেয়ে বলল
যাহ। অসভ্য লোক।
বাবার কোল পেয়ে শান্ত বাচ্চার মতো ঘুমে তলিয়ে যায় মাহিদ। রিপ কিছুক্ষণ পায়চারি করে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে। সারাবাড়ি হাঁটে। মুনা একসময় দেখে বলে
এত শান্ত হয়ে আছে। ঘুমালো নাকি?
রিপ বলল,
হ্যা।
তা তুই ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘুরছিস? তারউপর আবার আদর করছিস? ঘুমের মধ্যে আদর করলে রাগী হয় সেটা জানিস না?
এসব আবার কেমন লজিক?
জানিনা। তোকে বুঝানোর সময় নেই। যা ওকে শুয়ে দিয়ে আয়। কোলে ঘুমানোর অভ্যাস করলে তো আরও জ্বালা।
রিপ ওকে নিয়ে গিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিল।
নীরা চুল আঁচড়ানো শেষ করে রিপের দিকে তাকালো। বলল
বিনুনি পাকাতে পারেন?
চেষ্টা করে দেখা যায়।
নীরার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। চুল নিয়ে বিনুনি পাকানোর অব্যর্থ চেষ্টার পরেও যখন সম্ভব হলো না তখন নীরা তার দিকে ফিরে রেগে বলল
কচু জানেন? শুধু ফসফস করে লিখতে জানলে হয় না।
রিপ হেসে উঠে তাকে আয়নার দিকে ফিরিয়ে চুলগুলো বামপাশে সামনে ফিরিয়ে দিল। ডানপাশে অনাবৃত স্থানে ঠোঁট চেপে ধরে জড়িয়ে ধরে গালে গাল চেপে ধরে বলে
কাল ব্যারিস্টারি প্রমোশনের লেটার হাতে পাচ্ছি ম্যাডাম।
নীরা হতভম্ব চোখে আয়নায় রিপের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সত্যি?
হুমম।
আমি এখন থেকে ব্যারিস্টার ডাকবো?
পারেন।
মাহি ডাকবে ব্যারিস্টার বাপ।
মোটেও না। ও আমাকে পাপা ডাকবে।
কচু ডাকবে কচু কচু।
রিপ হাসলো। নীরাও তার সাথে সাথে হাসলো। হাসি থামিয়ে বলল
আমার মাহিটা কি লাকি না? সে আসার সাথে সাথেই আপনার লেটার চলে এল। আপনি সিনিয়র এডভোকেট থেকে সোজা ব্যারিস্টার হয়ে গেলেন।
হু। হি ইজ আওয়ার কিং। দা গ্রেট মাহিদ রেজওয়ান খান। সান অফ রিপ রেজওয়ান খান এন্ড নীরা মারিয়াম।
নীরা মিষ্টি করে হাসলো। রিপের ফোন বেজে উঠতেই সে ফোনের কাছে চলে গেল। ফোন করা শেষে নীরা ডেকে বল,
এই ব্যারিস্টার সাহেব একটাহহ।
রিপ ফিরতেই সে নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরলো। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রিপ মৃদু হেসে উঠে বলল
ওহহ, কাম। এটা কোনো ব্যাপারই না।
নীরা ভালোবাসা পেতে ছুটে এল।
_____________________
মাহিদ এখন বসতে শিখেছে। হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। কোলে স্থির হয়ে বসতে চাই না। রিক তাকে সবেমাত্র কোলে নিয়েছে। সে মোচড়ামুচড়ি করতে শুরু করে দিল । হাত পা নাড়তে নাড়তে রিকের মুখে ধমাধাম পা দিয়ে মেরে বসলো। রিক হো হো করে হেসে উঠে বলল
নীরু রে তোর বাচ্চা তো ভারী পাজি হয়েছে।
হ্যা বাপের মতো হচ্ছে।
রিপ ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো। রিক হেসে বলল
বল তোর মতো হয়েছে। আমার ভাই কি এত পাজি?
নীরা হেসে বলল
হ্যা আমার মতো হয়েছে। আমার ছেলে আমার মতো না হয়ে তোমার ভাইয়ের মতো হতে যাবে কেন?
রিক হেসে উঠলো। রিপ ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো। মাহিদ রিকের কোল থেকে নেমে যাওয়ার পায়তারা করছে। এখন আধোআধো কথা বলতে শিখছে যদিও তেমন কিছুই স্পষ্ট করে পারেনা। নিজে নিজে কি যেন আওড়াতে থাকে।
ঠাসস করে জগ পড়ে যাওয়ার শব্দ হতেই সবাই আঁতকে উঠলো। তালহা বেগম কপাল চাপড়ে হায়হায় করে বলে উঠলেন
সর্বনাশ করেছে রে রিপ। তোর পোলা তো জগ ভেঙে ফেলছে। তুই ওকে ধরে রাখতে পারলি না গাঁধা?
রিক অসহায় মুখে চেয়ে দেখলো টি টেবিলে রাখা জগটা লাতি মেরে ফেলে দিয়েছে মাহি। সে বলল
ও সেটাতে লাতি বসাবে কে জানে?
নীরা এসে ধমক দিয়ে বলল
হ্যা রে মাহি এরকম করে কেউ? এভাবে জগটা ভেঙে ফেললি?
মাহি ঠোঁট টানতে শুরু করলো মায়ের বকুনি খেয়ে। বহুযুদ্ধ করে ডাকলো
আপপা।
রিপ সোফা থেকে উঠে গিয়ে কোলে নিয়ে হেসে বলল
নীরা দেখেছ পাপপা ডেকেছে।
নীরা বলল
কচু ডেকেছে।
রিপ মাহিদের গালে চুমু দিয়ে বলল
আমাকে পাপপা ডেকেছে। তুমি অস্বীকার করো আমার তাতে কি যায় আসে?
দেখেছ দেখেছ কান্ড! আমার কত সাধের জগটা ভেঙে ফেললো।
রিক বলল
আর কত কি ভাঙবে।
কি বললি?
কিছু না মা।
বলেই হাসলো রিক। মুনা এসে রিপের কোল থেকে কোলে নিল। সেদ্ধ করা নুডলস খাইয়ে দিতে দিতে বলল
এই মাহি সবাইকে বল আমি এই বাড়ি ভেঙে আবার গড়বো। তুলে আবার বসাবো। কেউ কিচ্ছু বলতে পারবে না।
মাহিদ মুখ থেকে নুডলস গুলো ফুঁড়ফুঁড় করে উড়িয়ে দিয়ে কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য
মোচড়ামুচড়ি করতে করতে ডাকলো
উউউব্বাপ।
মুনা ফিক করে হেসে বলল
হ্যা রে নীরু ওকে বাপ ডাকা শিখিয়ে ফেলেছিস?
নীরা রিপের দিকে তাকিয়ে জিভের আগায় কামড় খেল।
_________________
পরিশিষ্ট :
মাহিদের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে তাই
জন্মদিন উপলক্ষে চৌধুরী বাড়ির সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। মাহিদ অসুস্থ ছিল। গত দুদিন আগে সিঁড়ি থেকে পড়ে কপাল ফাটিয়েছে। তার ব্যান্ডেজ এখনো আছে। নীরা তাকে দেখে দেখে রাখলেও সে একপলক চোখের আড়াল হতেই কাম বাড়িয়ে বসে থাকে। একমুহূর্তের জন্যও শান্তিতে এক জায়গায় বসে না। তার আগে ব্যাট ঘুরাতে গিয়ে নিজের ব্যাটের বাড়ি নিজে খেয়ে মাথায় ফুলিয়ে ডবডবে বানিয়ে ফেললো। নীরা কেঁদেকেটে সাগর বানালো অন্যদিকে মায়ের কান্না দেখে সে হেসে লুটোপুটি। কিন্ডারগার্টেনে পড়তে দিয়েছে তাকে। সেখানে একটা মেয়েকে একটা ছেলে মারতে দেখে ওই ছেলেটাকে মেরে, খামচি দিয়ে রক্তাক্ত করে এসেছে। টিচাররা সবাই নীরা আর রিপকে ডাক পাঠালো। অভিযোগ শুনিয়ে ইজ্জতের দফারফা বানিয়ে ছাড়লো। সেসব তো গেল। পরীর সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল মচকে আরও হো হো করে হাসতে নীরাকে এসে বলল
আম্মুউউ বুড়ো আঙুল রাগ করেছে। ব্যারিস্টারের মতো।
নীরার কি আর বলার থাকে? ভেবেছে ব্যারিস্টারকে বিচার দেবে। সে আদর করে করে বাঁদর বানিয়ে ফেলেছে খুব। কিন্তু কোথায় তার বাপ তাকে শাসন করবে তা না করে তিনি বাড়ি ফিরে ছেলের আঙুলে মলম মালিশ করতে করতে ব্যাথা কমিয়ে দিতে পেরে বলল
নীরা ম্যাজিক দেখেছ? মাহির ব্যাথা ভ্যানিশ।
বাপের গলা ধরে ঝুলিয়ে থেকে কি আহ্লাদ তখন ছেলের। বড় হতে হতে এসব থাকলে ভালোই। ছেলেরা বড় হলে তো আবার বাবার ছেলের মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি হয়ে যায় আপনাআপনি। নীরা রাগ করে আর থাকতে পারেনা বাবা ছেলের খুনসুটি দেখে।
ইশার কোলে বাচ্চা এসেছে দেড়বছর হলো। পুরোটাই ইশার কার্বনকপি। দেখতে শ্যামবরণ। চেহারায় গুচ্ছ গুচ্ছ মায়া। মাথা গোলগাল করে চুল কাঁটা। ডাগর ডাগর চোখ। রঙটা ফর্সা হলে, চোখটা ঘোলাটে হলে একদম পরীর মতো লাগতো। দু বোনের চেহারার অনেক মিল। পরী রিক মুনার পরিচয়েই বড় হচ্ছে। সে এখন ক্লাস থ্রি'তে পড়ে। তার আর মাহিদের জন্মতারিখ একই। সাত তারিখ। তাই তাদের দুজনের জন্মদিনের অনুষ্ঠান একসাথে হচ্ছে।
ভাইবোন নতুন জামাকাপড় পড়ে মেহমানের অপেক্ষায় বসে থাকলো। আদি ইশা, রাইনা আফি আসার পর থেকেই পরীর খোঁজ করে যাচ্ছে। পরী তাদের দেখে লুকিয়ে থাকলো সুপ্ত অভিমানে। আম্মার কোলে বোনকে দেখে দেখার ইচ্ছে হলেও সে সামনে গেল না। আদি পাগলের মতো খোঁজ করলো তার । পরী এল না। দেখা দিল না। রিপ এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলল
আমি নিয়ে আসবো। তুই শান্ত হয়ে বোস। দেখি মামাকে দে তো ইশু। এটা তো পুরোটাই তুই।
ইশা হাসলো। বলল
সবাই এইরকম বলে। পরী ওর আব্বার মতো হয়েছে। পিহু আমার মতো।
রিপ পিহুকে কোলে নিয়ে চলে গেল। ঘরে গিয়ে দেখলো পরীর পাশে মন খারাপ করে বসে আছে মাহিদ। রিপ গিয়ে বলল
কি হয়েছে আপনাদের? মন খারাপ কেন? পরী মা এখানে কেন? আম্মা আব্বা এসেছে তোমার।
পরী ছুটে এসে পিহুকে কোলে নিতে চাইলো। রিপ বললো
তুমি বসো। আমি দেই।
পরী কান্না আটকে রেখে বসলো। রিপ ওর কোলের উপর পিহুকে দিল। পরী বোনকে ছুঁতে পেরে হাসলো। গালে আদর আদর করতে করতে ডাকলো
বোন। আমি তোমার আপু।
রিপ হেসে বলল
বোনকে তো দেখতে যায় না তার বড় আপু।
পরী চোখ পাকিয়ে তাকায়। রিপ কপালে আদর দিয়ে বলে
পরীর এত দুঃখ কিসের? পরীর চারটা মা চারটা বাবা। দুটো বাড়ি। চারজন দাদু নানু। দুটো ভাই। রেহান আর মাহি। একটা পুচকু বোন। কেন এত দুঃখ মায়ের?
পরী ঠোঁট উল্টায়।
রিপ পিহুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পরীকে কোলে টেনে গাল মুছে দিতে দিতে বলে
পরী মা এখন আম্মা আব্বার কাছে যাবে। তারা তো পাগল হয়ে আছে পরী মাকে দেখবে বলে, আদর করবে বলে। পরী মা এখন যাবে, তাদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কত আদর বাকি আছে তার জন্য।
রিপের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠে পরী। বলে
আই অলওয়েজ মিস মাই আম্মা আব্বা এন্ড মাই ফ্যামলি।
পরীকে নিয়ে রিপ চলে গেল। মাহিদকে বলল
পাপা বাবুকে দেখে রেখো। আমি তোমার আম্মুকে পাঠাচ্ছি।
মাহিদ মাথা নাড়ায়। রিপ চলে যেতেই পিহুর দিকে সরু চোখে তাকায় মাহিদ ।
গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ পিহুর হাত পা নেড়ে খেলা দেখতে থাকে। তারপর ওর পিঠের নীচে হাত গলিয়ে কোলে নিয়ে বসে।
হাত ছুঁতেই পিহু ওর আঙুল আঁকড়ে ধরে। জিহবা দেখিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে। উঃউঃ শব্দ করে হাসে।
মাহিদ ওর আঙুল ছাড়িয়ে নেয়। খিক করে হেসে বলে,
কালো বাবুনি।
পিহু হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে একসময় ওর নাক বরাবর হাতের পড়া ঝুনঝুনি দিয়ে দুম করে মারে। মাহিদ ব্যাথা পায়। রেগে গিয়ে বলে
কালোনিইইইই।
ধপাস করে বিছানায় ফেলে দিতেই পিহু চেঁচিয়ে কেঁদে উঠে। নীরা হন্তদন্ত পায়ে হেঁটে এসে পিহুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শান্ত করাতে করাতে বলে
মাহি কি করেছিস?
পিহুনি কালোনি আমাকে মেরেছে। ব্যাথা পেয়েছি। তোকে আর কোলে নেব না বাপ।
সমাপ্ত......
ইয়া বড় বড় কমেন্ট চাই আজকে......... 🥹