ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাগি বরের দুষ্টু বউ

১ম পর্ব

লেখক: মারিয়া নুসাইবা মৌ
____________________________ 
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান ‎সকালের রোদ জানালার কাঁচ ভেদ করে ঢুকে পড়েছে বিশাল এক ডুপ্লেক্স বাড়ির ভেতর বাড়ির প্রতিটি কোণ আলোকিত করে তুলেছে,,,চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ...কিন্তুু সেটা অন্তত পাঁচ সেকেন্ড আগ পর্যন্তই ছিলো!
‎‎"মেহুউউউ...!!"
‎‎পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করলেন মেহুর মা।
‎‎দোতলা থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—
‎‎"আসছি মা... আর পাঁচ মিনিট!"
‎‎মেহুর মা দু'হাত কোমরে দিয়ে বললেন,
‎‎"তুই আধা ঘণ্টা ধরে এই পাঁচ মিনিট বলছিস,তুই নামবি না আমি ওপরে আসবো,,,
‎‎ঠিক তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি বেয়ে নামল মেহু নুসাইবা—বয়স ২০ পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা, দুধে-আলতা ফর্সা গায়ের রঙ, কোমর ছাপিয়ে নামা ঘন কালো রেশমি চুল, বড় বড় মায়াবী চোখ আর গোলাপি ঠোঁটে লেগে থাকা দুষ্টু হাসি। চঞ্চল, হাসিখুশি আর ভীষণ দুষ্টু স্বভাবের এই মেয়েটা মুহূর্তেই সবার মন জয় করে নিতে পারে। 
‎নিচে নামতেই সে সোফায় বসে থাকা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
‎‎— "গুড মর্নিং, আব্বু!"
‎বাবা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
‎— "গুড মর্নিং, রাজকুমারী।"
‎মা চোখ রাঙিয়ে বললেন,
‎— "রাজকুমারী না ছাই,, মেয়েকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছো,,একটু অন্তত শাসন করো !"
‎মেহু মুখ ফুলিয়ে বলল,
‎— "মা, সকাল সকাল নিজের মেয়ের নামে বদনাম করা ঠিক না,,আমি তোমার নিজের মেয়ে না বলো।"
‎‎এমন সময় দরজা ঠেলে ঢুকল মেহুর ছোট কাজিন নিহাল।তার হাতে একটা প্লেট ভর্তি সমুচা,,,
‎মেহু চোখ বড় বড় করে বলল,
‎— "এই! এতগুলো সমুচা কার?"
‎নিহাল খুব গম্ভীর হয়ে বলল,
‎— "আমার,,,, আমি ডায়েট করছি।"
‎‎মেহু এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হো হো করে হেসে উঠল।
‎‎— "ডায়েট? তাও আবার পাঁচটা সমুচা নিয়ে?"
‎‎— " আরে গাধা আগে আটটা খেতাম। এখন পাঁচটা। ইমপ্রুভমেন্ট!"
‎ওর কথা শুনে ‎বাড়ির সবাই হেসে উঠল।
‎_______‎★★★_______
‎অন্যদিকে...‎খান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ‎টপ ফ্লোরের বিশাল কেবিনে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে আয়ান খান বয়স ২৭ ‎ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা, ফর্সা গায়ের রঙ, নিয়মিত জিম করা সুঠাম দেহ। বাদামি চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন মুহূর্তেই যে কাউকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। ভীষণ রাগী, গম্ভীর আর স্বল্পভাষী; মুখে হাসি খুব কমই দেখা যায় পরনে কালো শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, চোখে গম্ভীর দৃষ্টি।
‎ঠিক তখনি দরজা না নক করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল একজন।‎— "মে আই কাম ইন?"
‎‎আয়ান মাথা না তুলেই বলল,
‎‎— "ইউ আর অলরেডি ইন।"
‎ছেলেটা আর কেউ নয়...রাফাত আয়ানের বেস্ট ফ্রেন্ড,,,পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ, জিম করা ফিট শরীর, এলোমেলো কালো চুল আর  চোখে সবসময় দুষ্টুমির ঝিলিক ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি,, ভীষণ ফাজিল, হাসিখুশি আর বাচাল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ আয়ানকে বিরক্ত করা।
‎রাফাত ঢুকেই বলল,
‎— "দোস্ত, একটা সিরিয়াস সমস্যা হয়েছে।"
‎আয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
‎‎— " কি হয়েছে কোম্পানি লস করেছে?"
‎‎— "না।"
‎‎— "আগুন লেগেছে?"
‎— "না।"
‎‎— "তাহলে?"
‎রাফাত বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,‎
‎— "ক্যান্টিনে আজ বিরিয়ানি শেষ!"
‎আয়ান ধীরে ধীরে মাথা তুলল কয়েক সেকেন্ড রাফাতের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‎‎— "আই সোয়্যার... একদিন আমি তোকে অফিস থেকেই বের করে দেব স্টুপিট ।"
‎রাফাত হেসে বলল,
‎— "বের করার আগে একটা বিরিয়ানি খাওয়াস দোস্ত আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা ।"
‎আয়ান টেবিলের ওপর থাকা ফাইলটা তুলে ছুড়ে মারতেই—‎" আরে আরে ভাই! কথায় কথায় ভায়োলেন্স কেন?"
‎রাফাত ফাইলটা সড়িয়ে হেসে বলল,
‎‎— "এই রাগটাই একদিন ভাবির সামনে গায়েব হয়ে যাবে দেখেনিস বাবু।"
‎— "শাট আপ!"
‎‎— "উফ! দোস্ত তোর রাগটা একটু বেশি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে বিয়ের বয়স হয়ে গেছে।"
‎আয়ান দাঁত চেপে বলল,
‎— "রাফাত..."
‎‎— "জি, দোস্ত?"
‎‎— "গেট আউট!"
‎‎রাফাত দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‎— "ঠিক আছে চলে যাচ্ছি... কিন্তু আন্টি আজকে তোকে মেয়ে দেখতে নিয়ে যাবে তাই আগে থেকেই কনগ্র্যাচুলেশন!"
‎‎দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো কেবিনে নীরবতা নেমে এল।‎আয়ান কপালে হাত রেখে বিড়বিড় করল,
‎— "হোয়াট আ ডিজাস্টার..."
‎‎ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
‎‎স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
‎‎Mom Calling...ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ,‎— "আয়ান, আজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাসায় চলে আসবে।"
‎— "হোয়াই?"
‎‎— "একটা মেয়ে দেখতে যাব।"
‎‎— ""নো ওয়ে মম, প্লিজ! এই বিয়ে-শাদি আর প্রেম-ভালোবাসার ইমোশনাল ড্রামায় আমাকে জড়ানোর ট্রাই করো না, আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড অ্যাটলিস্ট নাও!"
‎— " তোর ইন্টারেস্ট থাক বা না থাক, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না! চুপচাপ সময়ের মধ্যে বাড়ি চলে আয়, বাকি কথা সামনাসামনি হবে।"
‎আয়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎‎— "মা... প্লিজ!"
‎‎— "পাঁচটার মধ্যে বাসায় মানে বাসায়! 
একটা কথাও শুনতে চাই না।"
‎ফোন কেটে গেল,,আয়ান চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে শহরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
‎— "হোয়াট আ জোক...! আমার লাইফে এত ঝামেলা কম ছিল নাকি, এখন আবার ম্যারেজ!"
‎‎ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রাফাত ঢুকল।
‎— "কী রে দোস্ত ?তোর মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে কেউ তোর সব সম্পত্তি নিয়ে গেছে!"
‎‎আয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
‎— "রাফাত..."
‎রাফাত ভ্রু তুলে বলল,
‎— "কী হলো?"
‎আয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
‎— "আউট।"
‎রাফাত বলল,
‎কেনো,,
‎‎আয়ান শান্ত গলায় বলল,
‎— "তোকে শেষবারের মতো বলছি, বের হয়ে যা।"
‎‎রাফাত হাসতে হাসতে হাত তুলে বলল,
‎— "ওকে ওকে, যাচ্ছি
‎‎আয়ান শুধু বিরক্ত চোখে তাকিয়ে রইল।
‎‎— "হোয়াট এ পেইন..."
‎ ‎আয়ানের এখনোএকটু ও ধারণা নেই...‎আজ যে মেয়েটার সঙ্গে তার দেখা হতে যাচ্ছে—‎সে-ই একদিন তার হাসির কারণ হবে...আবার ‎তার রাগের কারণ ও হবে... 
________★**★★_______
‎‎‎বিকেল পাঁচটা ‎মেহুদের ভিলার সামনে এসে থামল কালো রঙের একটি বিলাসবহুল গাড়ি ‎গাড়ি থেকে নেমেই রাফাত চারপাশে তাকিয়ে বলল,
‎‎— "ওয়াও! দোস্ত, যদি মেয়ে না-ও পছন্দ হয়, বাড়িটা দেখে আমি রাজি!"
‎‎আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল—
‎— "ইউ আর ইম্পসিবল।"
‎— "ধন্যবাদ এই কমপ্লিমেন্টের জন্য আমি অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম।"
‎আয়ান বিরক্ত হয়ে সামনে হাঁটতে লাগল।
‎‎________★★★★________
‎‎অন্যদিকে...‎মেহুর রুমে তখন যুদ্ধ চলছে ‎মেহু
 বিছানায় বসে দুই হাত গুটিয়ে আছে,,,,
‎‎— "আমি নিচে যাব না।"
‎তার মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
‎‎— "একবার শুধু দেখা করবি।"
‎— ""কোনো দরকার নেই দেখার"
‎— "মেহু বলছি কথা বাড়াবি না বেশি!"
‎‎— "না মানে না, মোটেও নিচে নামব না"
‎‎​ঠিক তখনই মেহুর ছোট কাজিন নিহাল দরজাটা একটু ফাঁক করে ভেতরে মাথা গলিয়ে ফিক করে হেসে বলল,
​— "আপু রে, তুই নিচে যাবি কি যাবি না জানি না, তবে নিচে যে ছেলেটা এসে হাজির হয়েছে না... মাশাল্লাহ দেখতে একদম কোনো সিনেমার হিরোকেও হার মানায়!"
‎মেহু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
‎— "হিরো হোক বা ভিলেন তাতে আমার কী?"
‎‎নিহাল গম্ভীর মুখে বলল,
‎‎— "শুনেছি অনেক ধনী।"
​মেহু ভ্রু কুঁচকে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
‎‎— " তোর এতো ভালো লাগলে তুই বিয়েটা করে ফেল।"
‎​নিহাল থমকে গিয়ে বলল—
— " আরে আমি তো ছেলে!"
‎মেহু ফিক করে হেসে দিয়ে বলল—
— "তো তাতে সমস্যা কোথায় শুনি আজকাল 
তো কত কী-ই না হয়!"
‎​নিহাল চোখ গোল গোল করে হাঁ করে মেহুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার ওই কথা শুনে রুমের বাকি সবাই হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ল,,,।
‎‎_________★★★________
‎‎ড্রয়িংরুমে...‎আয়ান সোফায় বসে আছে ‎মাথা নিচু করে ফোন দেখছে ‎রাফাত পাশে বসে একটার পর একটা স্ন্যাকস খেয়ে যাচ্ছে,,
‎আয়ান বেশ বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
‎‎— "স্টপ ইট!"
‎‎রাফাত একেবারে নিষ্পাপ একটা মুখ বানিয়ে জবাব দিল,— " আরে আমি তো জাস্ট টেস্ট করছি।"
‎‎— "এটা তোর ছয় নাম্বার সমুচা রাফাত।"
‎‎— " তুই হিসাবও রাখেছিস দোস্ত, তুই সত্যিই আমাকে অনেক ভালোবাসিস।"
‎‎আয়ান নিজের কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
​— "খোদা... এ কোন বিপদে ফেললে আমাকে!"
‎ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের ওপরের সিঁড়ি দিয়ে পা ফেলল মেহু। তার এক হাতে ধরা মোবাইল ফোন, সে একদম নিমগ্ন হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল...​নিচে বসা রাফাত সেদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
​— "দোস্ত... মনে হচ্ছে ফাইনালি আমাদের হবু ভাবি এসেই গেছে!"
​আয়ান তখনো না তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
​— "শাট আপ ইউর মাউথ।"
আর ঠিক তার পরের সেকেন্ডেই ঘটল সেই মারাত্মক কাণ্ডটা!পা পিছলে—ধপ!‎মেহু কার্পেটে পা আটকে সামনে পড়ে যেতে লাগল ‎আয়ান স্বভাবতই উঠে মেহুর হাত ধরে ফেলে,,,,,,‎দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের চোখে আটকে গেল,,,আর পরমুহূর্তেই ঘোর কাটল!মেহু ভ্রু কুঁচকে রীতিমতো রেগে গিয়ে বলে উঠে বলল—
‎— "এই যে মিস্টার, আমাকে ধরার আগে জিজ্ঞেস করতে পারতেন!"
আয়ান তো এমন আজব কথায় আকাশ থেকে পড়ল।
— "হোয়াট এক্সকিউজ মি?"
—"হ্যাঁ, আমি তো জাস্ট একটু পড়ে যাচ্ছিলাম... তাই বলে উইদাউট পারমিশনে গায়ে হাত দিয়ে এভাবে ধরার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে বলুন তো?"
​পাশে বসে রাফাত তখন নিজের মুখ চেপে কোনোমতে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।​আয়ান রাগে কটমট করে তার হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
‎— "ফাইন নেক্সট টাইম পড়ে গেলেও আর ধরব না।"
‎মেহু মুচকি হেসে বলল,
‎— "ওহ বাবা এত রাগ?"
‎— "আমার রাগ সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই।"
— "বেশ ভালো তো! আমার আবার রাগী মানুষদের জ্বালিয়ে বেশ দারুণ একটা ফিলিংস হয়।"
রাফাত আর কোনোভাবেই নিজের পেটের হাসি চেপে রাখতে না পেরে ফিক করে শব্দ করে ফেলল—
— "দোস্ত... কসম করে বলছি ভাবি একদম পারফেক্ট চয়েস হয়েছে তোর জন্য,,,। 
আয়ান এমন একটা ভয়ানক দৃষ্টিতে রাফাতের দিকে তাকাল যে বেচারা সাথে সাথে নিজের মুখ চেইন এঁটে বন্ধ করে ফেলল।‎বাড়ির বড়রা সবাই সোফায় এসে বসতেই মেহুর মা মিষ্টি হেসে বললেন,‎— "তোমরা চাইলে একটু আলাদা করে কথা বলতে পারো।"
‎মেহু আর আয়ান একই সঙ্গে বলে উঠল,
‎— "দরকার নেই!"
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে গেল।
মেহু ফিসফিস করে বলল,
‎— "এই আমাকে কপি করলেন কেন?"
‎আয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
‎— "আই ডিডন্ট কপি এনিথিং, ওয়ান্টেড টু সেম থিং।"
মেহু বাঁকা হেসে মাথা নাড়ল,
​— "বাহ! একদিকে যেমন আস্ত একটা রাগি মানুষ, অন্যদিকে তেমনি অদ্ভুত জেদিও ভালো ভালো!"
‎রাফাত নিচু গলায় বিড়বিড় করল,
‎— "আজকের এপিসোড তো সুপারহিট!"
আয়ান মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করে বলল,,
‎"এই মেয়েটা একদম স্টুপিট !"
‎‎মেহু আর আয়ান মুখোমুখি বসে আছে ‎ঘরের সবাই ইচ্ছে করেই একটু দূরে সরে গেছে ‎চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা,,,,‎মেহুই প্রথম মুখ খুলল।
‎‎— "আচ্ছা... আপনি কি সব সময় এমন বরফের মতো মুখ করে থাকেন?"
‎আয়ান আবার ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল—
‎‎— "এক্সকিউজ মি?"
‎‎— " না মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম হাসলে কী ফাইন দিতে হয়?"
‎আয়ান এবার চোখ ছোট করে ঠান্ডা গলায় বলল,
​— "আই ডোন্ট থিংক দ্যাটস এনি অফ ইউর বিজনেস মিস মেহু।"
মেহু মাথা দুলিয়ে চটজলদি উত্তর দিল,
​— "উফ! শুধু রাগ দেখাতে পারেন জেনেই তো অবাক হয়েছিলাম, সাথে দেখছি চমৎকার ইংলিশও বলতে পারেন!"
আয়ান নিজের মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
‎‎"এই মেয়েটা পাঁচ মিনিটেই আমার মাথাটা গরম করে দিল অসহ্য একদম !"
‎‎এদিকে...‎দরজার বাইরে রাফাত কান পেতে দাঁড়িয়ে আছে ‎হঠাৎ পিছন থেকে আয়ানের মা বললেন,
‎‎— "রাফাত! ওখানে কী করছিস?"
‎রাফাত একটুও না ঘাবড়িয়ে বলল,
‎— "আন্টি... আমি সিকিউরিটি চেক করছি।"
‎‎— "কীসের সিকিউরিটি?"
‎‎— "দেখছি দোস্ত ভাবি শুধু কথা বলছে না ঝগড়া করছে,,,আর যদি ঝগড়া করে আয়ানের আমার হেল্প লাগবে কারন ও তো কথায় বলে না,,,,আর মেহু ভাবি তো ওকে কথা বলে বলে শেষ করে ফেলবে!"‎আয়ানের মা হেসে ফেললেন।
ওদিকে রুমের ভেতরে...​মেহু হাতের কাছে থাকা টেবিলের ওপর রাখা জুসের গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুক দিতে গিয়ে আয়ানের দিকে তাকাল।
​— " জুস খাবেন নাকি?"
​আয়ান তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল,
​— "নো থ্যাঙ্ক ইউ, আমার প্রয়োজন নেই।"
​— "একেবারে পাক্কা শিউর তো?"
— "ইয়েস।"
— "বেশ, তাহলে যখন খেতে চাচ্ছেন না..."​বলেই মেহু চোখের পলকে এক টানে পুরো গ্লাসের জুস নিজে গিলে শেষ করে ফেলল! আয়ান তো বোকা বনে হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
​— "তুমি তো আমাকে অফার করেছিলে,,।
— "আরে আপনি তো নিজেই না করে দিলেন তাই আমি খেয়ে নিলাম জুস নষ্ট করলে পাপ হবে!"
​আয়ান এই অদ্ভুত লজিক শুনে নিজের কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল।​ঠিক তখনই মেহু একটু ঝুঁকে হঠাৎ করে আবার একটা প্রশ্ন ছুড়ে বসল,​— "আচ্ছা, আপনার কি বর্তমানে কোনো গার্লফ্রেন্ড-টার্লফ্রেন্ড বা প্রেমিকা টেভিকা টাইপের কেউ আছে নাকি?"
​আয়ান এবার একটু শান্ত গলায় বলল,
​— "না, নেই।"
— "হুম, আমি জানিই তো যে থাকবে না।"
​— "কেন এমন মনে হলো তোমার?"
‎— "আরে বাবা, এত আস্ত রাগী একটা মানুষকে কোন মেয়ে ভালোবেসে টিকতে পারবে বলুন তো? আর যদি কোনোভাবে ভালোবেসেও ফেলত একা একা কথা বলতে বলতেই পাগল হয়ে যেত কারণ আপনি না কথা বলেন আর না হাসেন!"
‎‎আয়ান এবার সত্যিই একটু হেসে ফেলল ‎খুব ছোট্ট একটা হাসি...‎মেহু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
‎‎— "এই তো! হাসতে পারেন তাহলে!"
‎‎আয়ান তাড়াতাড়ি মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
‎‎— "ডোন্ট গেট ইউজড টু ইট."
‎‎মেহু দুষ্টু হেসে বলল,
‎‎— "চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড, মিস্টার আয়ান খান।"
‎কিছুক্ষণ পর সবাই আবার ড্রয়িংরুমে এসে বসল।
​মেহুর বাবা সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জানতে চাইলেন,​— "তাহলে তোমাদের দুজনের কেমন লাগল একে অপরকে?"
‎‎মেহু আর আয়ান আবার একসাথে বলে উঠল,
‎‎— "একদমই ভালো না!"
‎পুরো ঘরে একসাথে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এল... কেউ কোনো কথা বলছে না।​আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নীরবতা ভেঙে রাফাত খলবল করে হেসে উঠে বলে বসল​— "ওহ মাই গড! আপনারা একটু খেয়াল করে দেখেছেন? দুজনের পছন্দ থেকে শুরু করে কথা বলার টাইমিং পর্যন্ত হুবহু এক! এটাই তো ভাই আসল মেড ফর ইচ আদার বা পারফেক্ট কাপল!"
চারপাশের সবাই একসাথে হেসে উঠল আয়ান রাগে গরগর করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে রাফাতের দিকে এমন এক রক্তচক্ষু ফেলে বলল—
— "রাফাত..."
‎‎— "জি, দোস্ত?"
‎— "বাসায় চল।"
‎— "এত তাড়াতাড়ি আমি তো এখনো ডেজার্টই খাইনি!"
‎মেহু তখন নিজের ওড়না দিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসছে।​আর আয়ান মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল,
‎‎"একদিকে এই পাগল বন্ধু... আরেকদিকে এই ডেঞ্জারাস দুষ্টু মেয়ে! আল্লাহ, আমার এই কেমন পরীক্ষা নিচ্ছে?"
__________★★★___________
সন্ধ্যা নেমে এসেছে ‎গাড়ি চালাচ্ছে আয়ান ‎পাশের সিটে বসে আছে রাফাত ‎গাড়ির ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা কেও কোনো কথা বলছে না,,,‎রাফাত আড়চোখে একবার আয়ানের দিকে তাকাল ‎দুইবার তাকাল,,‎তিনবার তাকাল,,‎তারপর আর থাকতে না পেরে বলল—
‎— "দোস্ত..."
‎‎— "হুম?"
‎‎— "তুই কি ভাবির প্রেমে পড়ে গেছিস?"
‎‎কিঁইইইচ...!‎আয়ান এত জোরে ব্রেক করল যে রাফাত প্রায় সামনে গিয়ে পড়ল,,,,।
‎‎— "ইয়া আল্লাহ! আমার জানটাই নিয়ে নিবি নাকি!"
‎আয়ান কটমট করে তাকাল"।
‎— "হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সে?"
‎রাফাত বুকে হাত রেখে বলল,— "আমি শুধু একটা প্রশ্ন করেছি এতো React করার কি আছে ।"
‎— " রাফাত তোর মাথা ঠিক আছে?"
‎‎— "না,,, তার জন্যই তো আমি তোর বন্ধু।"
‎‎আয়ান গভীর শ্বাস নিল,,,‎— "আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড ইন হার."
‎‎রাফাত মাথা নাড়ল‎— "হ্যাঁ হ্যাঁ... এই ডায়লগটা আমি সিনেমায় অনেকবার শুনেছি শেষে হিরো হিরোইনকে ছাড়া বাঁচে না,,,।"
‎‎— "শাট আপ!"
‎‎— "আবার ইংলিশ! তোকে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয় না কেন আমি এটাই বুঝি না!"
‎‎আয়ান বিরক্ত হয়ে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করল,,,
‎
‎--‎অন্যদিকে...
‎‎মেহু নিজের রুমে বসে চুল শুকাচ্ছে ‎ঠিক তখনই তার বান্ধবী তিথি ভিডিও কল করল,,,,
‎‎— "কিরে! ছেলে কেমন?"
‎‎মেহু নাটকীয় মুখ করে বলল—
‎‎— "ফ্রিজ!"
‎‎— "মানে?"
‎— "হাঁটে, মাঝে মাঝে কথা বলে... কিন্তু মনে হয় হাসলে তাকে ফাইন দিতে হয়।"
‎‎তিথি হেসে গড়াগড়ি,, 
‎‎— "এত খারাপ?"
‎‎— "খারাপ না... কিন্তু এত সিরিয়াস মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।"
‎‎ঠিক তখনই মেহুর মা রুমে ঢুকলেন,,,
‎‎— "মেহু, ছেলেটা কিন্তু খুব ভদ্র।"
‎‎মেহু মুখ বাঁকিয়ে বলল—
‎‎— "ভদ্র হোক, কিন্তু একটু হাসলে কী সমস্যা?"
‎
‎---‎এদিকে...‎খান ভিলা,,,‎আয়ান মাত্রই বাসায় ঢুকেছে ‎জুতা খুলতেই তার মা সামনে এসে দাঁড়ালেন,,,গম্ভীর কন্ঠে বলল,,,— "কেমন লাগল মেয়েটা?"
‎আয়ান এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল‎— "ভেরি টকেটিভ!"
‎‎ঠিক তখনই সোফার পেছন থেকে রাফাত লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল,,,,‎— "আন্টি, বাংলায় বলি? দোস্ত বলতে চাচ্ছে—মেয়েটা সারাক্ষণ কথা বলে!"
‎‎আয়ান চোখ বন্ধ করল,,,‎— "রাফাত... তুই এখনো যাসনি?"
‎‎— "ডিনার না খেয়ে যাব দোস্ত আন্টি কষ্ট পাবে?"
‎‎আয়ানের মা হেসে বললেন‎— " হ্যা রাফাত তুই থাক,, , আজ তোর প্রিয় কাচ্চি হয়েছে।"
‎রাফাত দুই হাত তুলে বলল‎— "আন্টি, আল্লাহ আপনাকে সুখে রাখুক!"
‎‎আয়ান বিড়বিড় করল‎— "এই ছেলে খাবারের জন্য একদিন আমাকে বেঁচেও দেবে।"
‎‎রাফাত সঙ্গে সঙ্গে বলল‎— " যদি দাম ভালো পাই তবে ভেবে দেখব।"
‎
‎---‎ডাইনিং টেবিলে...‎রাফাত একের পর এক কাচ্চি খাচ্ছে,,,‎আয়ান তাকিয়ে বলল— " রাফাত এটা তোর কত নম্বর প্লেট?"
‎— "তিন"
‎‎— "তিন?"
‎‎— "হ্যাঁ,, প্রথমটা টেস্ট, দ্বিতীয়টা কনফার্ম, তৃতীয়টা আসল খাওয়া।"‎
‎আয়ানের বাবা হেসে বললেন—
‎— "রাফাত, তুই না থাকলে এই বাড়ির সবাই হাসতেই ভুলে যেত।"
‎‎রাফাত বুক ফুলিয়ে বলল—
‎‎— "আঙ্কেল, আমি জন্মই নিয়েছি মানুষকে হাসানোর জন্য।"
‎আয়ান নিচু গলায় বলল—
‎‎— "আর আমাকে বিরক্ত করার জন্য।"
‎
________‎চলবে______
‎
‎

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন