ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাগি বরের দুষ্টু বউ

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: মারিয়া নুসাইবা মৌ
রাগি বরের দুষ্টু বউ 
লেখিকা ~মারিয়া নুসাইবা মৌ 
____________★★★___________
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। রাতের খাবার শেষ করে রিজিয়া খান আর শামসুজ্জামান খান নিজেদের রুমে চলে গেছেন। আদিবা গুড নাইট বলে ওপরে উঠে গেছে। পুরো বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ।
ড্রয়িংরুমে বসে আছে মাত্র চারজন—দাদু, আয়ান, রাফাত আর আব্রাহাম। সেন্টার টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা চার কাপ কফি। গল্পের আসর জমে উঠেছে পুরোনো দিনের স্মৃতিতে—স্কুলের দুষ্টুমি, কলেজের গল্প, ইউনিভার্সিটির হাজারো কাণ্ড।
রাফাত কফির মগ হাতে নিয়ে হেসে বলল,
— "দাদু, জানেন? ইউনিভার্সিটিতে আমাদের তিনজনকে সবাই তিনটা নামে ডাকত—একজনকে ডিপ ফ্রিজ, একজনকে রেডিও আর একজনকে ভদ্রলোক।"
দাদু ভ্রু তুলে মুচকি হেসে বললেন,
— "বুঝলাম ডিপ ফ্রিজটা হলো আয়ান, ভদ্রলোকটা আব্রাহাম... তাহলে রেডিওটা কে?"
রাফাত বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে বলল,
— "আমি!"
দাদু একদম গম্ভীর মুখে বললেন,
— "তুই তো রেডিও না... লাউডস্পিকার!"
এক মুহূর্তের নীরবতার পর পুরো ড্রয়িংরুম হাসিতে ফেটে পড়ল।
আব্রাহাম হাসতে হাসতে কুটিকুটি, আয়ানের ঠোঁটের কোণেও অজান্তে হালকা হাসি ফুটে উঠল। আর রাফাত বুক চেপে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— "দাদু, আপনি আমার আত্মসম্মানে আঘাত দিলেন!"
দাদু কফিতে চুমুক দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
— "তোর আত্মসম্মান থাকলে তো আঘাত লাগবে।"
আবারও সবাই হেসে উঠল।
হাসি একটু থামতেই রাফাত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— "আচ্ছা দাদু... একটা নিউজ শুনবেন?"
— "কি শুনব বল।"
রাফাত একবার আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
— "আমাদের এই ভদ্রলোকটা কিন্তু এক বছর ধরে একটা মেয়েকে ভালোবাসে।"
দাদু অবাক হয়ে তাকালেন।
— "ওমা! তাই নাকি? আমাদের ভদ্র ছেলেটাও তাহলে প্রেম করে?"
আব্রাহাম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করতেই রাফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "করেই তো বিপদে পড়েছে!"
আব্রাহাম অসহায় মুখে বলল,
— "রাফাত..."
রাফাত আয়ানকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— "চুপ কর! সব কথা বলতে হবে?"
দাদু মুচকি হেসে বললেন,
— "তা মেয়েটার নাম কী?"
রাফাত ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
— "মেহু।"
দাদুর চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।
— "কী রে... কোন মেহু?"
রাফাত ধীরে ধীরে বলল,
— "আপনি যে মেহুর কথা ভাবছেন... সেই আমাদের মেহুই।"
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়ান কফিতে চুমুক দিচ্ছিল।
— "খক! খক! খক!"
হঠাৎ বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল। কফি প্রায় গলায় আটকে গেল।
আব্রাহাম তাড়াতাড়ি পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
— "আরে, আস্তে ব্রো!"
দাদুও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
— "দাদু ভাই, তুই ঠিক আছিস?"
আয়ান পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিল।
রাফাত একদম নিরীহ মুখ করে বলল,
— "কফিটা খুব গরম ছিল নাকি?"
আয়ান কোনো উত্তর দিল না।
রাফাত আবার ধীরে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— "না হলে... 'মেহু' নামটাই হয়তো বেশি গরম?"
দাদু ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলেন।
আয়ান কটমট করে তাকিয়ে শুধু বলল,
— "রাফাত..."
— "হুম?"
— "চুপ কর।"
— "আচ্ছা আচ্ছা... চুপ!"
দুই সেকেন্ড চুপ থেকে রাফাত আবার বলল,
— "দাদু... আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।"
দাদু মাথা নেড়ে বললেন,
— "তোর আইডিয়া শুনলেই ভয় লাগে রাফাত।"
রাফাত এবার খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল,
— "আয়ান মেহুকে বিয়ে করতে চায় না, মেহুও নাকি ওকে পছন্দ করে না আর আব্রাহাম এক বছর ধরে মেহুকে ভালোবাসে তাহলে..."
সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
— "আমরা আব্রাহামের সঙ্গেই মেহুর এনগেজমেন্টটা করে ফেলি?"
— "খক! খক! খক!"
আয়ান আবারও বিষম খেল। এবার কফির মগটা টেবিলে একটু জোরেই রেখে দিল।
রাফাত দুই হাত মাথায় দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ! দাদু, এনগেজমেন্টের নাম শুনেই এই অবস্থা! বিয়ের কথা বললে তো অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হতো!"
দাদু এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারলেন না। হো হো করে হেসে উঠলেন।
— "হা হা হা! রাফাত, তুই একদিন ওর হাতে মার খাবি!"
রাফাত তাড়াতাড়ি দাদুর পাশে গিয়ে বসে পড়ল। মুখে নিরীহ ভাব এনে বলল,
— "দাদু, আপনি আছেন তো? আপনি আমাকে বাঁচাবেন!"
দাদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— "আমি বুড়ো মানুষ। মার খেলে তুই একাই খাবি।"
আব্রাহাম মুচকি হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তোমরা ওকে এত জ্বালাচ্ছ কেন?"
রাফাত অবাক হওয়ার ভান করে দুই হাত তুলে বলল,
— "আমি? আমি তো শুধু একটা বড় প্রবলেমের সমাধান দিচ্ছি!"
এরপর সে ধীরে ধীরে আয়ানের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "কিরে দোস্ত... তুই তো মেহুকে বিয়ে করতে চাস না, তাহলে আব্রাহাম যদি মেহুকে বিয়ে করে... তোর তো কোনো আপত্তি থাকার কথা না, তাই না?"
পুরো ড্রয়িংরুম এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাসির রেশটাও যেন মিলিয়ে গেল। আয়ান ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। একদম শান্ত পায়ে হেঁটে রাফাতের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর নিচু, ঠান্ডা গলায় বলল,
— "রাফাত... আজকে তোকে ছেড়ে দিলাম। কাল যদি আবার একই কথা বলিস... দাদুও তোকে বাঁচাতে পারবে না। Got it."
রাফাত এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দৌড়ে গিয়ে দাদুর পেছনে লুকিয়ে পড়ল।
— "দাদু! আমাকে বাঁচান!"
দাদু হেসে বললেন,
— "আমি নিজেই বাঁচব আগে, তুই সর!"
আবারও পুরো ড্রয়িংরুম হাসিতে ভরে উঠল। রাফাত আস্তে করে দাদুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "দাদু... ডিপ ফ্রিজটা কিন্তু গলতে শুরু করেছে।"
দাদু মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,
— "হ্যাঁ রে... এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।"
ধীরে ধীরে হাসি-ঠাট্টা থেমে গেল। দাদু একটা হাই তুলে লাঠির ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
— "আচ্ছা, অনেক রাত হয়েছে। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।"
রাফাতও উঠে দাঁড়িয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
— "Good Night, Mr. Deep Freeze!"
কথাটা শেষ হতেই আয়ান সোফার কুশনটা তুলে সোজা ওর দিকে ছুড়ে মারল।
রাফাত চমকে উঠে চিৎকার করে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ!"
পরের মুহূর্তেই সে হাসতে হাসতে দৌড়ে পালাতে পালাতে বলল,
— "দাদু! দেখেন! ডিপ ফ্রিজ অ্যাটাক করছে!"
দাদু লাঠি ঠুকতে ঠুকতে হেসে বললেন,
— "আজ বেঁচে গেলি... কাল আর বাঁচবি না!"
দু'জন হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। ড্রয়িংরুমে আবার নেমে এল নীরবতা। এখন সেখানে শুধু দু'জন মানুষ—আয়ান আর আব্রাহাম। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। আব্রাহাম ধীরে ধীরে নিজের কফির মগটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় ডাকল,
— "আয়ান..."
আয়ান ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
— "হুম?"
আব্রাহাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
— "একটা কথা ছিল।"
আয়ান এবারও ফোনের দিকেই তাকিয়ে রইল।
— "বল।"
আব্রাহাম ধীরে ধীরে আয়ানের দিকে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "রাফাত আমাকে একটা কথা বলেছে।"
আয়ানের তখনো ফোন স্ক্রল করছে। মাথা তুলল না। আব্রাহাম স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
— "বলেছে... তুই নাকি এই বিয়েটা করতে চাস না।"
আয়ানের আঙুল থেমে গেল। ফোনের স্ক্রিন নিভে গেল। তবুও সে মাথা তুলল না। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর শুধু ঠান্ডা, ভারী গলায় বলল,
— "তারপর?"
আব্রাহাম ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "আর এটাও বলেছে... মেহুও নাকি এই বিয়েতে রাজি না।"
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আয়ানের হাতে থাকা ফোনটা ধীরে ধীরে আরও শক্ত হয়ে উঠল। আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মুখে রাগ স্পষ্ট ফুটে উঠলেও সে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর, ঠান্ডা গলায় বলল,
— "So...?"
আব্রাহাম এবার সরাসরি আয়ানের চোখে তাকাল।
— "আমি সত্যিই মেহুকে ভালোবাসি। এক বছর ধরে। যদি তুই সত্যিই এই বিয়েটা না করতে চাস, তাহলে আমি একবার মেহুর সঙ্গে কথা বলতে চাই। ওর ডিসিশনটা জানতে চাই। যদি ও না বলে, আমি আর কখনো এই টপিক তুলব না। কিন্তু যদি ওও এই বিয়ে করতে না চায়, তাহলে আমি ওর ফ্যামিলির কাছে প্রপোজাল পাঠাতে চাই।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন