ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাগি বরের দুষ্টু বউ

৫ম পর্ব

লেখক: মারিয়া নুসাইবা মৌ
__________★★★________
আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না আয়ান। বজ্রগতিতে হাঁটতে হাঁটতে সোজা মেহুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ আয়ানকে দেখে সবাই চুপ। মেহু অবাক।
— "আপনি?"
আয়ানের চোখ তখন ফুলটার দিকে। তারপর মেহুর দিকে। ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল,
— "এটা কী?"
মেহু অবাক হয়ে বলল,
— "ফুল।"
— "আমি অন্ধ না। কে দিয়েছে?"
মেহু স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "আমার বন্ধু।"
আয়ান দাঁত চেপে বলল,
— "ফ্রেন্ড?"
— "হ্যাঁ।"
— "হাউ ডেয়ার ইউ?"
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আয়ান এবার এক পা এগিয়ে এল।
— "আর কিছুদিন পর তুমি আয়ান খানের বউ হবে... আর আজই রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে অন্য ছেলের কাছ থেকে ফুল নিচ্ছ?"
— "হাসাহাসি করছ? তোমার সাহস হলো কীভাবে?"
মেহু হতভম্ব।
— "এক মিনিট!"
— "কী এক মিনিট?"
— "আপনি তো আমাকে বিয়েই করতে চান না!"
— "তাহলে আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার কাছ থেকে ফুল নেব... সেটা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন?"
আয়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার গলা আরও শক্ত হয়ে গেল।
— "ননসেন্স!"
— "স্টপ টকিং!"
মেহুও রেগে গেল।
— "কেন?"
— "আপনি তো সবসময় বলেন আমাকে পছন্দ করেন না!"
— "তাহলে এখন এত জেলাস হচ্ছেন কেন?"
"জেলাস" শব্দটা শুনেই আয়ান থমকে গেল। রাফাত পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
"ওফফ... ভাবি তো সরাসরি ছক্কা মারল!"
আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— "আমি জেলাস?"
— "হ্যাঁ!"
— "ড্রিম অন!"
মেহু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "ওহ... তাই নাকি?"
— "তাহলে ফুলটা দেখে এত রেগে গেলেন কেন?"
আয়ান উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে রেডওয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চারপাশ একদম চুপ। রেডওয়ান একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
— "ভাই... কোনো সমস্যা?"
আয়ান ঠান্ডা চোখে তার হাতে থাকা গোলাপটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এই ফুলটা তুমি দিয়েছ?"
— "জি... আমরা ছোটবেলার ফ্রেন্ড..."
আয়ান তার কথা শেষ করতে দিল না।
— "আই ডোন্ট কেয়ার কে তুমি।"
তারপর এক পা সামনে এগিয়ে বলল,
— "একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো..."
— "আজকের পর থেকে মেহুর আশেপাশে তোমাকে যেন আর না দেখি।"
রেডওয়ান একটু সাহস করে বলল,
— "ভাই, আমরা শুধু বন্ধু..."
আয়ান ঠান্ডা হেসে বলল,
— "ফ্রেন্ড?"
— "ওটা তোমাদের কলেজের মধ্যে থাকবে।"
— "বাট... ওর দিকে আর একবারও ওইভাবে তাকানোর চেষ্টা করবে না।"
— "ক্লিয়ার?"
আয়ানের চোখের দৃষ্টি দেখে রেডওয়ান আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মাথা নাড়ল।
রাফাত পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
— "ইসস... ছেলেটার তো জানই বের হয়ে গেল!"
তারপর আয়ান বাকি দুইটা ছেলের দিকেও তাকিয়ে বলল,
— "আর তোমরা..."
— "অনেক হাসাহাসি হয়েছে।"
— "এবার যার যার কাজে যাও।"
তিনজনই চুপচাপ সরে গেল।
মেহু রাগে ফুঁসছে। দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আপনি এটা কী করলেন?"
আয়ান শান্ত গলায় বলল,
— "যেটা করা দরকার ছিল।"
— "আমার বন্ধুদের এভাবে অপমান করার কোনো দরকার ছিল না।"
— "আমার ছিল।"
— "আপনি কে?"
— "সেটা তুমি ভালো করেই জানো।"
আয়ান গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— "মেহু চলো, গাড়িতে ওঠো।"
— "না।"
— "মেহু..."
— "বলেছি না, যাব না!"
রাফাত পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
"ইয়া আল্লাহ... আবার শুরু হলো!"
তিথি আস্তে করে মেহুর কানে বলল,
— "যা না।"
মেহু মাথা নেড়ে বলল,
— "না! আজকে কিছুতেই না।"
তিথি মেহুর হাত ধরে বলল,
— "আরে যা না।"
— "না, আমি যাব না।"
রেয়া বলল,
— "মেহু প্লিজ।"
— "না, মনে না।"
আয়ান এবার ধীরে ধীরে মেহুর একদম সামনে এসে দাঁড়াল। গলাটা আরও নিচু, কিন্তু কঠিন।
— "লাস্ট টাইম বলছি... গাড়িতে ওঠো।"
— "আর আমিও লাস্ট টাইম বলছি... উঠব না।"
— "শিওর?"
— "হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর!"
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশে একদম নীরবতা। হঠাৎ... আয়ান গভীর একটা শ্বাস নিল। তারপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই ঝুঁকে পড়ল।
— "এই...!"
মুহূর্তের মধ্যে এক হাতে মেহুর পিঠ, আরেক হাতে হাঁটুর নিচে হাত রেখে তাকে কোলে তুলে নিল।
— "আআআ...!"
মেহু ভয়ে আর লজ্জায় এক ঝটকায় আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
— "আপনি কী করছেন?"
আয়ান একদম শান্ত।
— "যেটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল।"
— "আমাকে নামান!"
— "নো।"
— "সবাই দেখছে!"
— "দেখুক।"
— "আমার লজ্জা করছে!"
— "আমার না।"
মেহু ছটফট করতে লাগল।
— "আমি নিজে হেঁটে যাব!"
— "এখন আর দরকার নেই।"
— "আপনি খুব খারাপ!"
— "জানি।"
— "অসভ্য!"
— "হুম।"
— "রাগী!"
— "হুম।"
— "জেদি!"
— "সেটাও।"
মেহু এবার রাগে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না!"
আয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
— "গাড়িতে উঠে তারপর সিদ্ধান্ত নিও।"
এই প্রথম... আয়ানের ঠোঁটের কোণে সেই ক্ষীণ হাসিটা দেখে মেহু কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
রাফাত দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ... ডিপ ফ্রিজের মুখে হাসি!"
তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আজকে ইতিহাস লেখা হবে!"
তিথি মুখ চেপে হাসছে। আর রেয়া ফিসফিস করে বলল,
— "উফ কি সিন!"
আয়ান মেহুকে গাড়ির সামনে এনে দাঁড় করাল। দরজা খুলে বলল,
— "ওঠো।"
মেহু এবারও মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
— "না।"
আয়ান ভ্রু তুলল।
— "আবার?"
— "হ্যাঁ।"
— "তাহলে আবার কোলে নেব?"
মেহু চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— "আপনি একদম আর একবারও সাহস করবেন না!"
আয়ান এক পা এগিয়ে এল।
— "ট্রাই করে দেখবে?"
মেহু এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ফট করে গাড়িতে উঠে বসল।
রাফাত হো হো করে হেসে উঠল।
— "ভাবি! এতক্ষণ ধরে যে জেদ করলেন, শেষমেশ এক কথাতেই উঠে গেলেন?"
মেহু লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— "চুপ করুন!"
আয়ান দরজা বন্ধ করতে করতে খুব আস্তে বলল,
— "গুড গার্ল।"
গাড়ি ধীরে ধীরে কলেজের সামনে থেকে বেরিয়ে গেল।
গাড়ির ভেতর একদম নীরব। মেহু জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। মুখটা ফুলে আছে। রাগে, লজ্জায়— দুটোই একসাথে।
আয়ান একবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল। মেহু এখনও তার দিকেই তাকাচ্ছে না। সে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
রাফাত দুজনের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে হাসল।
"এই নীরবতাটা বেশিক্ষণ থাকবে না..."
সে কাশির ভান করে বলল,
— "আচ্ছা..."
কেউ উত্তর দিল না।
— "আমার খুব ক্ষুধা লাগছে।"
চুপ।
— "কেউ কিছু বলবে?"
তবুও কেউ কিছু বলল না।
রাফাত বিরক্ত মুখে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ... আমি কি গাড়িতে বসে আছি, নাকি কবরস্থানে?"
মেহু মুখ ফিরিয়ে হেসে ফেলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল।
আয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
— "চুপ করে বস।"
— "আচ্ছা ঠিক আছে..."
দুই মিনিট পর আবার—
— "ভাবি..."
মেহু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "আমাকে ভাবি বলবেন না।"
রাফাত নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল।
— "এই কথাটা শুনলে আমার দোস্তের হার্ট ভেঙে যাবে।"
আয়ান স্টিয়ারিং ধরেই বলল,
— "রাফাত..."
— "জি?"
— "আর একটা কথা বললে গাড়ি থেকে নামিয়ে রেখে যাব।"
— "ওকে... আমি একদম চুপ।"
পাঁচ সেকেন্ড... দশ সেকেন্ড... পনেরো সেকেন্ড... তারপর আবার—
— "দোস্ত..."
আয়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "এখন কী?"
— "আমি কি বেঁচে আছি?"
মেহু এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।
"হিহিহি..."
হালকা হাসির শব্দটা শুনেই আয়ানের ঠোঁটের কোণেও অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
রাফাত সেটা রিয়ার ভিউ মিররে দেখে চিৎকার করে উঠল,
— "দোস্ত! তুই হাসলি!"
আয়ান মুহূর্তেই মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
— "ননসেন্স।"
— "আমি নিজের চোখে দেখেছি।"
— "ভুল দেখেছ।"
— "ভাবি! আপনি বলেন।"
মেহু মুখ টিপে হেসে বলল,
— "হ্যাঁ... একটু তো হাসছিলেন।"
আয়ান এবার আয়নায় তাকিয়ে বলল,
— "তুমিও?"
মেহু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "আমি সত্যিটাই বললাম।"
গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে থামল মেহুদের বাড়ির সামনে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারপাশে হালকা বাতাস।
গাড়ি থামতেই মেহু দরজা খুলে নেমে গেল। একবারও আয়ানের দিকে তাকাল না। মুখটা এখনও ফুলে আছে।
রাফাত সেটা দেখে হেসে ফেলল।
— "দোস্ত..."
আয়ান স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে বলল,
— "কী?"
— "ভাবি এখনও রাগ করে আছে।"
— "থাকুক।"
— "তুই গিয়ে সরি বল।"
আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— "হোয়াট?"
— "সরি বল।"
— "নো।"
— "আরে বল না!"
— "নট পসিবল।"
রাফাত মাথা নেড়ে বিড়বিড় করল,
— "একটা ইগো পাহাড়, আরেকটা জেদের পাহাড়!"
ঠিক তখনই... মেহু বাড়ির গেট পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল—গাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আর আয়ানও নামেনি। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার গাড়ির কাছে ফিরে এল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাত গুটিয়ে বলল,
— "কী ব্যাপার?"
আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— "কী?"
— "এভাবেই চলে যাবেন?"
— "হুম।"
— "ভেতরে আসবেন না?"
— "দেরি হয়ে গেছে।"
মেহু মুখ ছোট করে বলল,
— "ঠিক আছে... আন্টি যদি পরে জিজ্ঞেস করেন, 'আয়ান কোথায়?', তখন কিন্তু আমি বলে দেব—গেটে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে।"
রাফাত মুখ চেপে হেসে ফেলল।
— "দোস্ত... এবার নামতেই হবে।"
আয়ান বিরক্ত মুখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "তুমি না..."
মেহু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "আমি কী?"
— "অনেক ঝামেলা।"
— "তবুও তো এসেছেন!"
আয়ানের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে বলল,
— "চলো।"
মেহু মনে মনে জিতে যাওয়ার হাসি হাসল।
"হুঁ! এত সহজে ছেড়ে দেব নাকি?"
তিনজন একসঙ্গে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুললেন মেহুর মা। মেহুকে দেখে হাসলেন। তারপর আয়ান আর রাফাতকে দেখে আরও খুশি হয়ে বললেন,
— "আরে! এসো বাবা, এসো।"
রাফাত সালাম করে বলল,
— "আন্টি, আপনার মেয়েকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে গেলাম।"
মেহুর মা হেসে বললেন,
— "শুধু পৌঁছে দিয়ে যাবে? ভেতরে না এসে?"
— "চা না খাইয়ে ছাড়বেন নাকি?"
— "কখনো না।"
এমন সময় মেহুর বাবা ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
— "আরে আয়ান বাবা! কেমন আছো?"
— "আলহামদুলিল্লাহ, আঙ্কেল।"
— "ভেতরে এসো।"
আয়ান ভদ্রভাবে বলল,
— "আঙ্কেল, আজকে উঠি। অনেক রাত হয়ে যাবে।"
— "পাঁচ মিনিট বসলে রাত হবে না।"
রাফাত সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "দেখলি? এখন বসতেই হবে।"
আয়ান আর কিছু বলল না। চুপচাপ সোফায় বসে পড়ল। মেহু একটু দূরে গিয়ে বসল। তবে আড়চোখে বারবার আয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। আয়ানও একবার তাকাল। চোখাচোখি হতেই... মেহু সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
রাফাত সব দেখছে। মনে মনে বলল,
"একজন তাকায়, আরেকজন মুখ ঘুরিয়ে নেয়... তারপর আবার লুকিয়ে তাকায়!"
চা-নাস্তা চলে এল। রাফাত প্লেট হাতে নিয়ে বলল,
— "আন্টি... আপনার হাতের সিঙ্গারা মিস করেছি অনেক দিন!"
মেহুর মা হেসে বললেন,
— "তাহলে আরও খাও।"
— "আন্টি, আপনি আমাকে দত্তক নিয়ে নিন না!"
মেহু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "না! তাহলে সারাদিন আমাদের বাসার ফ্রিজ খালি হয়ে যাবে।"
রাফাত বুক চেপে ধরল।
— "আহ্! ভাবি আবার অপমান করল!"
সবাই হেসে উঠল। শুধু আয়ান ঠোঁটের কোণে চাপা হাসিটা লুকিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
মেহু সেটা দেখে ফেলল। তার মনে হলো...
"এই মানুষটা হাসলে এত সুন্দর লাগে... তাহলে সব সময় এত রাগী হয়ে থাকে কেন?"
কিছুক্ষণ পর... আয়ান উঠে দাঁড়াল।
— "আচ্ছা আঙ্কেল, আন্টি... আমরা উঠি।"
মেহুর বাবা বললেন,
— "আচ্ছা বাবা। সাবধানে যেও।"
মেহুর মা বললেন,
— "আবার কিন্তু আসবে।"
রাফাত হেসে বলল,
— "আন্টি, ডাকলেই হাজির!"
সবাই দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল।
গাড়িতে ওঠার আগে... আয়ান একবার মেহুর দিকে তাকাল। মেহু এখনও মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে। আয়ান শান্ত গলায় বলল,
— "রাগ এখনও যায়নি?"
মেহু ভ্রু তুলে বলল,
— "না।"
— "ও..."
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে খুব আস্তে বলল,
— "সাবধানে থাকবে।"
মেহু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আয়ান গাড়িতে উঠে বসল। গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
মেহু গেটে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেই গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পরও... তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
_________★★★_________
 এইদিকে... ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট মাত্রই ল্যান্ড করেছে। যাত্রীরা একে একে বেরিয়ে আসছে। তাদের মাঝেই কালো টি-শার্ট, ব্লু জিন্স, চোখে সানগ্লাস, কাঁধে ব্যাকপ্যাক আর হাতে একটি ট্রলি নিয়ে বেরিয়ে এল লম্বা, স্মার্ট একটা ছেলে। মুখে হালকা দাড়ি, চোখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। সে আর কেউ নয়—আব্রাহাম খান, আয়ানের ফুফাতো ভাই। গত এক বছর ধরে ব্যবসার কাজে বিদেশে ছিল। বাইরে বের হয়েই গভীর একটা শ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, — "আহ্... নিজের দেশে থাকার অনুভূতিটাই আলাদা!" ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এল। — "এই বিদেশি সাহেব!" আব্রাহাম ঘুরে দাঁড়াতেই মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল। — "আরে রাফাত!" দু'জন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। অনেকদিন পর দেখা হওয়ার আনন্দটা দু'জনের চোখেমুখেই স্পষ্ট। রাফাত হেসে বলল, — "কী রে দোস্ত! এক বছর পর মনে পড়ল দেশের কথা?" আব্রাহামও হেসে উত্তর দিল, — "কাজ শেষ না হলে আসব কীভাবে? কীভাবে বল, অনেক মিস করেছি তোদেরকে!" রাফাত নাটকীয় মুখ করে বলল, — "তোকে তো আমরা একটুও মিস করিনি।" — "মিথ্যা বলিস না!" — "ঠিক আছে... দুই দিন মনে হয় মিস করেছিলাম!" দু'জনেই হো হো করে হেসে উঠল। রাফাত ট্রলিটা হাতে নিয়ে বলল, — "চল, গাড়িতে উঠ।" — "চল।" গাড়ি ধীরে ধীরে এয়ারপোর্ট ছেড়ে শহরের রাস্তায় উঠে এল। কিছুক্ষণ দু'জনেই জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর রাফাত নীরবতা ভেঙে বলল, — "কী রে, এক বছর পর দেশে ফিরে কেমন লাগছে?" আব্রাহাম মুচকি হেসে বলল, — "অনেক ভালো। যত দেশই ঘুরি, নিজের দেশটাই সেরা। নিজের দেশে থাকার শান্তিটাই আলাদা।" রাফাত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। — "একদম ঠিক বলেছিস।" কিছুক্ষণ পর আব্রাহাম আবার বলল, — "আচ্ছা রাফাত... আয়ান কেমন আছে? এখনও কি আগের মতো বরফের টুকরো হয়ে ঘুরে বেড়ায়?" রাফাত হেসে ফেলল। — "হ্যাঁ, আগের মতোই আছে। একটুও বদলায়নি।" দু'জনের হাসির মাঝেই পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে এল। আব্রাহাম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, — "মনে আছে? স্কুলে আমরা তিনজন এক বেঞ্চে বসতাম। তারপর কলেজ... তারপর ইউনিভার্সিটি... ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি, একসঙ্গে পড়েছি, একসঙ্গে কত মারও খেয়েছি!" রাফাত হো হো করে হেসে বলল, — "আর সব দোষ পড়ত আমার ওপর!" আব্রাহাম দুষ্টু হেসে বলল, — "কারণ সব আইডিয়াও তোরই থাকত।" আবারও দু'জনেই হেসে উঠল। মনে আছে, পুরো ইউনিভার্সিটিতে সবাই বলত—"আয়ান, রাফাত আর আব্রাহাম—এই তিনজন একসঙ্গে থাকলে একজন কথা বলে না, আর দুইজন থামেই না!" কথাটা মনে পড়তেই দু'জন আবার হো হো করে হেসে উঠল। হাসি থেমে যাওয়ার পর আব্রাহাম আবার জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। এক বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। তারপর হঠাৎ সে নিজের ওয়ালেট খুলে খুব যত্ন করে একটা ছোট্ট ছবি বের করল। শাড়ি পরা, দুধে-আলতা ফর্সা গায়ের রঙ, কোমর ছাপিয়ে নামা ঘন কালো রেশমি চুল, বড় বড় মায়াবী চোখ আর গোলাপি ঠোঁটে লেগে থাকা দুষ্টু হাসি—একটা মেয়ের ছবি। ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল, — "এক বছর..." রাফাত কৌতূহলী হয়ে তাকাল। — "কী দেখছিস?" আব্রাহাম ছবিটা বুকে চেপে ধরে মৃদু হেসে বলল, — "আমার পরীকে।" রাফাত ভ্রু তুলে অবাক হয়ে বলল, — "পরী? কে রে?" আব্রাহাম কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল, — "এক বছর আগে একদিন ওকে দেখেছিলাম। তারপর সেদিন থেকেই... ভালোবেসে ফেলেছি।" রাফাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। — "মানে?" আব্রাহাম হেসে বলল, — "পাগল ভাবছিস?" — "একটু।" — "সমস্যা নেই। ভালোবাসলে সবাই একটু পাগল হয়।" রাফাতও হেসে ফেলল। — "নাম কী মেয়েটার?" আব্রাহাম মাথা নাড়ল। — "জানি না।" রাফাত প্রায় চিৎকার করে উঠল। — "কীইই? নামও জানিস না? তাহলে ভালোবাসলি কীভাবে?" আব্রাহাম জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, — "নিজের অজান্তে কখন যে ভালোবেসে ফেলেছি, আমি নিজেও জানি না!" রাফাত এবার একটু সিরিয়াস হয়ে গেল। — "তাহলে খুঁজিসনি?" — "খুঁজেছি, পাইনি। তারপর কাজের জন্য বিদেশে চলে যেতে হলো। কিন্তু এবার ফিরে এসেছি। এবার ওকে খুঁজে বের করব। আর যদি ভাগ্যে থাকে... তাহলে ওকেই বিয়ে করব।" রাফাত এবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, — "দেখি তো... সেই ভাগ্যবতী মেয়েটা কে?" আব্রাহাম ছবিটা এগিয়ে দিল। রাফাত এক ঝলক ছবিটার দিকে তাকিয়েই চোখ বড় বড় করে ফেলল। পরের মুহূর্তেই এমন জোরে ব্রেক কষল যে গাড়িটা প্রচণ্ড বেগে ঝাঁকুনি খেল। আব্রাহাম চমকে উঠে বলল, — "এই! পাগল নাকি তুই?" রাফাত ছবিটার দিকেই তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, — "ইন্না লিল্লাহি..." আব্রাহাম ভ্রু কুঁচকে বলল, — "কী হলো?" রাফাত বুকে হাত রেখে বলল, — "দোস্ত... তুই দেরি করে ফেলেছিস!" — "মানে?" — "এই পরীটা এখন আর ফ্রি নেই!" আব্রাহাম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। — "মানে কী বলছিস?" রাফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, — "বুকটা শক্ত কর। যেটা বলব, সেটা তোর জন্য কষ্টের।" — "সোজা কথা বল।" — "পানি খাবি?" — "রাফাত!" — "আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করিস না। এই মেয়েটার নাম মেহু। আর কয়েক দিনের মধ্যেই..." ইচ্ছে করেই থেমে গেল। আব্রাহাম বিরক্ত হয়ে বলল, — "আর কয়েক দিনের মধ্যে কী?" রাফাত মুখ বাঁকিয়ে বলল, — "আমাদের বরফের ড্রাম... মানে আয়ানের সঙ্গে বিয়ে!" আব্রাহাম যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। — "কী...?" — "হ্যাঁ রে।" কিছুক্ষণ চুপ থেকে আব্রাহাম নিচু গলায় বলল, — "আয়ান... ওকে ভালোবাসে?" রাফাত হো হো করে হেসে উঠল। — "ভালোবাসে... কিন্তু ও নিজেই জানে না! সারাদিন বলে—'আই ডোন্ট কেয়ার!' কিন্তু অন্য কোনো ছেলে মেহুর দিকে তাকালেই... গেম ওভার!" আব্রাহামের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। — "মানে?" রাফাত এবার আয়ানের গলা নকল করে বলল, — "বাইরে থেকে বলবে—'আই ডোন্ট কেয়ার।' আর ভেতরে ভেতরে বলবে—'হু ইজ দিস গাই?'" দু'জনেই আবার হেসে ফেলল। হাসি থামতেই আব্রাহাম আবার বলল, — "তাহলে... আমার আর কোনো চান্স নাই?" রাফাত নাটকীয় ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, — "চান্স আছে..." আব্রাহামের চোখে আশার ঝিলিক ফুটতেই রাফাত আবার বলল, — "যদি আগে আয়ানের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারিস!" দু'জনেই আবার হেসে উঠল। আব্রাহাম মাথা নেড়ে বলল, — "আয়ান এখনও আগের মতোই পাগল আছে বুঝি?" রাফাত দুষ্টু হেসে বলল, — "না রে... আগে ছিল ডিপ ফ্রিজ, এখন ডিপ ফ্রিজের মনে 'মেহু ভাইরাস' ঢুকেছে!" হাসির রেশ কেটে গেলে আব্রাহাম হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, — "রাফাত... একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" — "কর।" — "আয়ান... সত্যিই কি মেহুকে ভালোবাসে?" রাফাত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ধীরে বলল, — "এই প্রশ্নের উত্তর আয়ান নিজেও দিতে পারবে না। কিন্তু ও মুখে না বললেও চোখ অনেক কিছু বলে দেয়। আমি ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। ও কখন রাগে, কেয়ার করে, জেলাস হয়... সব বুঝি।" আব্রাহাম গভীর একটা শ্বাস নিয়ে ছবিটা আবার ওয়ালেটে রেখে দিল। — "তবুও... আমি একবার আয়ানের সঙ্গে কথা বলব। যদি ও সত্যিই মেহুকে ভালো না বাসে, তাহলে আমি ওর কাছে মেহুকে চাইব। কিন্তু যদি বুঝি ও সত্যিই ভালোবাসে... তাহলে আর কোনোদিন এই বিষয়টা নিয়ে একটা কথাও বলব না।" রাফাত আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। মনে মনে বলল, "আয়ান দোস্ত... তুই জানিস না, সামনে তোর জন্য কী ঝড় অপেক্ষা করছে!" ঠিক তখনই ওর মাথায় দুষ্টু একটা প্ল্যান এল। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। তারপর বলল, "ডিপ ফ্রিজকে এখন থেকে একটু ভালোভাবে গরম করা যাবে..." ★★ এদিকে গাড়িটা ধীরে ধীরে খান বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। গেট খুলতেই দারোয়ান হাসিমুখে সালাম দিল। — "আসসালামু আলাইকুম, ছোট সাহেব।" আব্রাহাম মুচকি হেসে বলল, — "ওয়ালাইকুম আসসালাম।" এক বছর পর বাড়িতে ফিরে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। সবকিছু আগের মতোই আছে। এই বাড়িটাকে সে খুব বেশি মিস করেছে। ঠিক তখনই ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে এল— — "আব্রাহাম এসেছে!" দু-একজন কাজের লোক দৌড়ে বাইরে চলে এল। রাফাত ট্রলিটা নামিয়ে হেসে বলল, — "চল, ভেতরে চল।" দু'জনে পাশাপাশি হেঁটে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখল, দাদু আর আয়ান পাশাপাশি বসে আছেন। দাদুর হাতে সকালের পত্রিকা, আর আয়ানের সামনে খোলা ল্যাপটপ। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রাফাত। — "দাদু! আপনার বিদেশ ফেরত নাতিকে নিয়ে এসেছি!" দাদু চশমা খুলে তাকাতেই মুখজুড়ে প্রশস্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। — "আব্রাহাম!" আব্রাহাম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সালাম করল। — "আসসালামু আলাইকুম, দাদু।" দাদু ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বললেন, — "ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ... এবার বাড়িটা আবার পূর্ণ হলো।" আব্রাহাম আবেগভরা কণ্ঠে বলল, — "অনেক মিস করেছি আপনাদের।" দাদু স্নেহভরে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, — "আমরাও তোকে কম মিস করিনি, বাবা।" এদিকে আয়ান ধীরে ধীরে উঠে এসে আব্রাহামের সামনে দাঁড়াল। দু'জন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আব্রাহাম মুচকি হেসে বলল, — "আয়ান, কেমন আছিস?" আয়ানের ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে এগিয়ে এসে শক্ত করে আব্রাহামকে জড়িয়ে ধরল। — "ওয়েলকাম ব্যাক, ব্রো।" — "থ্যাংকস।" পাশ থেকে রাফাত বুক চেপে নাটকীয় গলায় বলল, — "ইয়া আল্লাহ! একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে... আর আমি? আমি কি পাশের বাড়ির ছেলে?" আয়ান শান্তভাবে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, — "তুই তো প্রতিদিনই বাড়িতে পড়ে থাকিস। তোকে আবার কিসের ওয়েলকাম করব?" দাদু হো হো করে হেসে উঠলেন। রাফাত মুখ ভার করে বলল, — "দাদু... দেখলেন? এই পরিবারে আমার কোনো মূল্যই নেই!" দাদু গম্ভীর মুখ করে বললেন, — "আছে।" রাফাতের চোখ চকচক করে উঠল। — "সত্যি?" দাদু ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে বললেন, — "হ্যাঁ, তুই না থাকলে বাড়িটাতে শান্তি থাকত!" এক মুহূর্ত নীরবতা... তারপর পুরো ড্রয়িংরুম হাসিতে ফেটে পড়ল। রাফাত মাথায় হাত দিয়ে বলল, — "দাদু! আপনি আমার ইজ্জতের ফেলুদা করে দিলেন!" দাদু হেসে উত্তর দিলেন, — "তোর ইজ্জত থাকলে তো ফেলুদা বানাবো!" ঠিক তখনই উপরতলা থেকে দ্রুত দৌড়ে নিচে নেমে এল আদিবা। — "আব্রাহাম ভাইয়া!" আব্রাহাম ঘুরতেই আদিবা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। — "কেমন আছো তুমি?" — "আলহামদুলিল্লাহ। তুই কেমন আছিস?" — "আমি ভালো আছি।" একটু থেমেই আদিবা চোখ বড় বড় করে বলল, — "আমার জন্য কী এনেছ?" রাফাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, — "দেখেছো? ভাইয়ার খবর পরে, আগে গিফট!" আদিবা জিভ বের করে বলল, — "তুমি চুপ করো!" আব্রাহাম হেসে ব্যাগ খুলে একটা সুন্দর গিফট বক্স বের করে ওর হাতে দিয়ে বলল, — "এই নে, এটা শুধু তোর জন্য।" আদিবার মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। — "থ্যাংক ইউ, ভাইয়া!" ঠিক তখনই রাফাত ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব আস্তে, শুধু আদিবার কানে ফিসফিস করে বলল, — "আদু... আমাকে বিয়ে করলে প্রতিদিন রাতে গিফট পাবা।" আদিবা মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, — "চুপ! কেউ শুনে ফেলবে!" রাফাত ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল, — "শুনুক..." আদিবা ওর হাতে আলতো একটা চিমটি কেটে বলল, — "একদম অসহ্য তুমি!" বলেই গিফটটা বুকে জড়িয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে দাদু পুরো দৃশ্যটাই দেখলেন। গোঁফে হাত বুলিয়ে মনে মনে মুচকি হেসে বললেন, "হুম... কিছু কিছু কথা কানে না এলেও চোখে ধরা পড়ে।" এদিকে রাফাতও দাদুর চোখের হাসিটা দেখে মনে মনে বলল, "ইয়া আল্লাহ... বুড়োটা আবার কিছু বুঝে ফেলল নাকি!" ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলেন রিজিয়া খান। আব্রাহামকে দেখেই তাঁর মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি এগিয়ে এসে নিজের ছেলের মতো জড়িয়ে ধরলেন। — "আব্রাহাম! কেমন আছিস বাবা?" আব্রাহাম মুচকি হেসে বলল, — "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি, আন্টি।" রিজিয়া খান ওর মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, — "এক বছর পর মনে পড়ল আমাদের কথা?" — "অনেক মনে পড়েছে, আন্টি। কাজের জন্য আসতে পারিনি।" — "আর কোনো অজুহাত শুনব না। এবার কয়েকদিন কোথাও যাওয়া হবে না।" — "জি, আন্টি।" ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন শামসুজ্জামান খান। আব্রাহামকে দেখেই এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন, — "ওয়েলকাম হোম, চ্যাম্প!" আব্রাহাম সালাম করতেই তিনি স্নেহভরে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, — "অনেক শুকিয়ে গেছিস মনে হচ্ছে!" রাফাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, — "আঙ্কেল, বিদেশে গিয়ে জিম আর ডায়েট—দুটোই বেশি বেশি করে ফেলেছে!" আব্রাহাম হেসে ওর কাঁধে হালকা ঘুষি মেরে বলল, — "চুপ কর!" রিজিয়া খান সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, — "আচ্ছা, সবাই দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো, আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।" রাফাত তাড়াতাড়ি বলল, — "আন্টি, আজ কিন্তু আমার জন্য চিকেন কাটলেট বেশি রাখবেন!" রিজিয়া খান ভ্রু তুলে হেসে বললেন, — "তুই আবার অতিথি কবে থেকে?" রাফাত বুক ফুলিয়ে বলল, — "আমি তো এই বাড়ির স্পেশাল অতিথি!" দাদু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, — "স্পেশাল না ছাই, ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট ঝামেলা!" এক সেকেন্ড নীরবতা... তারপর আবার পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। রাফাত বুকে হাত দিয়ে বলল, — "দাদু! আপনার মুখে এসব কথা মানায়? বলেন, আপনি আমার আপন দাদু না?" দাদু হেসে উত্তর দিলেন, — "তোকে দেখলেই আমার মুখ দিয়ে এসব কথা বেরিয়ে আসে।" এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা আয়ানের ঠোঁটের কোণায় অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল। সেটা দেখেই রাফাত চিৎকার করে উঠল, — "আব্রাহাম! দেখ, দেখ! আমাদের ডিপ ফ্রিজ হাসছে!" আব্রাহাম অবাক হয়ে তাকাতেই আয়ান শান্ত গলায় বলল, — "রাফাত... ডোন্ট পুশ ইয়োর লাক।" রাফাত সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে বলল, — "ওকে বস! আমি কিছু বলিনি!" সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আদিবা হাসি চাপতে না পেরে হেসে ফেলল। রাফাত ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দিল। আদিবা বড় বড় করে তাকিয়ে চোখ রাঙাল। দাদু সেটাও লক্ষ্য করলেন। গোঁফে হাত বুলিয়ে মনে মনে বললেন, "হুম... এদের হিসাবটা পরে নেব।" ঠিক তখনই রিজিয়া খান ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এলেন। সবাই একসঙ্গে টেবিলে বসল। অনেকদিন পর খান বাড়িটা আবার হাসি-আনন্দে ভরে উঠল। কিন্তু এক কোণে বসে থাকা রাফাতের চোখে তখন অন্যরকম দুষ্টুমি। একবার আয়ানের দিকে তাকাল, আবার আব্রাহামের দিকে। তারপর মনে মনে শয়তানি হেসে বলল, "ডিপ ফ্রিজ... আজ না হোক, কাল তোকে স্বীকার করিয়েই ছাড়ব! তুই মেহুকে ভালোবাসিস—এটা রাফাতের প্রমিজ!" 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন