_________★★★_________
ঠিক তখনই বাইরে থেকে নিহালের গলা ভেসে এল
— "মেহু! তাড়াতাড়ি নিচে আয়!""ওরা এসে গেছে!"
কথাটা শুনেই তিন বান্ধবী একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
— "বরপক্ষ এসেছে!"মেহুর বুকটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল,, সে নিজেই বুঝতে পারল না কেন,,তিথি মুচকি হেসে বলল,— কি রে নার্ভাস লাগছে?"
মেহু সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,— " নার্ভাস লাগবে কেন?"রেয়া চোখ টিপে বলল,— "কারণ নিচে তোর হিটলার বর তোকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।"
ঘরের সবাই হো হো করে হেসে উঠল।ঠিক তখনই মেহুর মা রুমে ঢুকলেন মেয়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো চোখে পানি চিকচিক করছে ,,,, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেহুর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,,,— "মাশাআল্লাহ আমার মেয়েটাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।"মেহু মুচকি হেসে মায়ের হাতটা জড়িয়ে ধরল,,,মা স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,— "আমার মা টা কতো বড় হয়ে গেলো.." "সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে চল মা,,,,মেহু মাথা নাড়ল গভীর একটা শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
______★*★*______
অন্যদিকে...ঠিক সেই সময় একের পর এক কালো গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে।প্রথম গাড়ি থেকে নামলেন শামসুজ্জামান খান, রিজিয়া খান আর দাদু।মেহুর বাবা-মা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সালাম আর কোলাকুলিতে তাদের স্বাগত জানালেন।দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামল আব্রাহাম আর কয়েকজন আত্মীয়,,,এরপর...তৃতীয় গাড়ির দরজা খুলতেই আগে নামল আয়ান, আর ঠিক তার পেছনেই নামল রাফাত সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে ঘড়ি, মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।আর ব্যস তিথি, রেয়া, পিপিয়া, নিহালের দুই কাজিন আর বাড়ির আরও কয়েকজন মেয়ে দৌড়ে এসে দুজনকে একেবারে ঘিরে ধরল — "দুলাভাই, এইদিকে তাকান!"— "একটা ছবি প্লিজ!"— "আয়ান ভাই, একবার হাসেন না!"একটা মেয়ে হেসে বলল,— "উফ! বর তো লজ্জা পাচ্ছে!"চারপাশে হো হো করে হাসি পড়ে গেল,,,আয়ান বিরক্ত গলায় শুধু বলল,— "ননসেন্স ."ঠিক তখনই রেয়া দৌড়ে এসে একদম রাফাতের সামনে দাঁড়াল হেসে ওর পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল,— "রাফাত ভাই! আজকে কিন্তু আপনাকে একদম সিনেমার হিরোর মতো লাগছে!"
রাফাত সানগ্লাসটা খুলে কলার উঁচু করে বলল,
— "শুধু হিরো? আরে, আমি তো পুরো ব্লকবাস্টার! আল্লাহ যখন সৌন্দর্য বিলাচ্ছিলেন... আমি লাইনের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম,, তাই একটু বেশি পেয়ে গেছি!"
সবাই আবার হেসে উঠল দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল আদিবা রাফাতের মুখের হাসি... আর রেয়ার সঙ্গে এত ঘেসাঘেসি করে কথা বলা—একটুও ভালো লাগল না তার,,,,ঠোঁট ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— "হুম... খুব তো হাসাহাসি হচ্ছে তাই না "যেন বলিউডের হিরো!"দাদু পাশেই দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন তিনি হেসে আস্তে করে বললেন,— "হায়রে রাফাত... আজ তোর কপালে আজকে দুঃখ আছে!"রেয়া ইচ্ছে করেই রাফাতের হাত ধরে টান দিয়ে বলল,— "চলুন না, আগে আমাদের সঙ্গে একটা ছবি তুলবেন।"রাফাত ইচ্ছে করেই আড়চোখে আদিবার দিকে তাকাল আদিবার রাগে ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখেই ওর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বলল,"ওহো... আদু পাখি তো দেখি সত্যিই জেলাস!"ওকে আরও একটু জ্বালানোর জন্য রাফাত মুচকি হেসে রেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "অবশ্যই! এত সুন্দর একটা মেয়ে যখন নিজে থেকে ডাকছে... না করলে তো অভদ্রতা হবে!"
রেয়া হেসে ফেলল আর আদিবার রাগে গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেল সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,— "খুব ভালো... "বাসায় চলো আগে... তারপর দেখাচ্ছি, এই হিরোগিরি কতক্ষণ থাকে!"
বলেই গটগট করে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল রাফাত ওর চলে যাওয়া দেখেই মনে মনে হেসে বলল,
"রাগো আদু পাখি বেশি করে রাগো..,,তোমাকে রাগলে আরও বেশি সুন্দর লাগে!"
ঠিক তখনই...বাড়ির ভেতর থেকে নিহাল দৌড়ে বেরিয়ে এল মুখে বড়সড় হাসি নিয়ে বলল,
— "আসসালামু আলাইকুম! অবশেষে বরপক্ষ হাজির!"
শামসুজ্জামান খান মুচকি হেসে বললেন,
— "ওয়ালাইকুম আসসালাম।"নিহাল এগিয়ে এসে সবাইকে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ করল— "চলুন, সবাই ভেতরে আসুন সবাই অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন।"
সবাই একে একে ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু...আয়ানের চোখ তখনও একবার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন কাউকে খুঁজছে।রাফাত সেটা দেখে কাঁধে কনুই ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,— "কী রে ডিপ ফ্রিজ?" "কনেকে না দেখে পা নড়ছে না নাকি?"
আয়ান কোনো উত্তর দিল না রাফাত আবার বলল,
— "চিন্তা করিস না। ভাবি পালিয়ে যায়নি। এই বাড়িতেই আছে!"আয়ান এবার দাঁত চেপে বলল,
— "রাফাত চুপ কর."রাফাত বুক চেপে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,— "দেখলেন দাদু,, প্রেমে পড়া মানুষ সবচেয়ে আগে বন্ধুকেই চিনতে পারে না!"আমি মানুষের প্রেম বাঁচাতে চাই, আর মানুষ আমাকে চুপ থাকতে বলে!"
দাদু মাথা নেড়ে বললেন,— "তুই প্রেম বাঁচাস না, প্রেমে আগুন লাগাস!"আবারও চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।ঠিক সেই মুহূর্তেই...সিঁড়ির ওপর থেকে নূপুরের মৃদু শব্দ ভেসে এল টুন... টুন... টুন...সবাই অজান্তেই সিঁড়ির দিকে তাকাল আয়ানের চোখও ধীরে ধীরে উঠে গেল ওপরে...আর পরের মুহূর্তেই...সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়াল মেহু,,,হলুদ লেহেঙ্গায় আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বসন্ত নিজেই মানুষ হয়ে নেমে এসেছে। গায়ে তাজা ফুলের গয়না, খোলা চুল গুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে,, ঠোঁটে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি...মেহু ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।কিন্তু আয়ানের চোখ?সেটা গিয়ে আটকে রইল মেহুর ওপর।সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে গেয়ে উঠলো,,,,,
"আমি প্রথম দেখে পাগল হইলাম❤️🩹🖤
"মন তো আর মানে না।😩🫶
"কাছে আইসো আইসো রে বন্ধু। ❤️🩹🫶🤌
'প্রেমের কারনে।❤️🩹😩🖤
আয়ান এখনো মেহুর দিকে তাকিয়ে যেন চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—কিছুই তার কানে যাচ্ছে না দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল রাফাত,,সে কয়েকবার ডাকল।
— "দোস্ত..."কোনো উত্তর নেই।আবার ডাকল।— "আয়ান..."তবুও কোনো সাড়া নেই— "ওই ডিপ ফ্রিজ!"
রাফাত মাথা নেড়ে বলল,— "গেলো।"তারপর...ঠাস!আয়ানের কাঁধে একটা হালকা ধাক্কা দিল।আয়ান চমকে উঠল।— "এই!"রাফাত হাসি চেপে বলল,— "ফিরে আসছিস?"আয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— "কী করলি?"রাফাত নিরীহ মুখ করে বলল,
— "কিছু না "পাঁচ মিনিট ধরে ডাকছি আমি "ভাবলাম তোর আত্মা অন্য জগতে চলে গেছে।" 😂
আয়ান চোখ ছোট করে বলল,
— "চুপ কর।"রাফাত মুচকি হেসে বলল,
— "দোষ আমার না।" "তোরই তো কোনো হুঁশ ছিল না।"
ঠিক তখনই মেহু আয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল সে লক্ষ্য করল আয়ান তাকে দেখছিল মেহু সঙ্গে সঙ্গে কোমরে হাত দিয়ে বলল,— "একটা কথা বলব?"
আয়ান বলল,— "বলো মেহু চোখ ছোট করে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,— "আপনি কি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন।"আয়ান শান্ত মুখে বলল,— "No."
মেহু অবাক — "No মানে?"আয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,— "আমি তাকাইনি।"মেহু দুই হাত কোমরে দিয়ে বলল,
— "আচ্ছা তাহলে আপনার চোখ কি নিজে নিজে ঘুরছিল?"আয়ান কিছু বলল না,,,,মেহু আবার শুরু করল,
— "আপনার চোখেরও কি আলাদা ইচ্ছা আছে?" "আপনি না চাইলে চোখ তাকিয়ে ফেলে?"
রাফাত পাশে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছে।
আদিবা আস্তে করে বলল,— "তুমি হাসছো কেন?"রাফাত ফিসফিস করে বলল,— "কারণ আমি জীবনে প্রথমবার দেখছি... "একজন মানুষ নিজের চোখের বিরুদ্ধে মামলা খাচ্ছে।"এইদিকে মেহুর থামার মামই নেই,,,
— "আপনি তাকিয়েছেন।"
— "নো "আমি তাকাইনি।"
— "তাহলে আমি ভুল দেখেছি?"
— "হ্যাঁ।"
— "বাহ!"নিজে তাকাবেন, আবার দিব্যি মিথ্যা বলবেন!" "এত ইগো কেন আপনার?"
— "মেহু, স্টপ ইট।"
— "না, স্টপ করব না।"
— "আপনি তাকিয়েছেন।"
— "তুমি এত শিওর হচ্ছ কীভাবে?"
— "কারণ আমি দেখেছি।"
আয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।
— "ওহ তার মানে তুমিও আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে?"
মেহু এক সেকেন্ড থেমে গেল।
— "আমি... মানে..."
— "বলো।"
— "আমি আপনার দিকে তাকাইনি!"
— "তাহলে আমি তাকিয়েছিলাম, সেটা দেখলে কীভাবে?"
মেহু এবার পুরো রেগে গেল।
— "আপনি কথা ঘুরাচ্ছেন!"
— "এত বড় মিথ্যাবাদী মানুষ আমি জীবনে দেখি নাই।"!"
আয়ানও আর চুপ থাকল না।
— "আর তুমি একটা ননসেন্স মেয়ে!"
— "বাঁদর!"
মেহু চোখ বড় করে বলল,
— "কী বললেন?"
— "বাঁদর!"
— "কমপ্লিট বাঁদর!"
— "আর আপনি?"
— "আপনি একটা রাগী ডিপ ফ্রিজ!"
— "ইডিয়ট!"
— "তুমি একটা ওয়াকিং ডিজাস্টার!"
— "আপনি একটা মিথ্যাবাদী!"
— "তুমি একটা বকবক মেশিন!"
— "আপনি একটা রোবট!"
— "ননসেন্স!"
— "স্টুপিড!
— "বাঁদর!"
— "ইডিয়ট!"
দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
— "আমি আপনাকে বিয়েই করব না!"
— "গুড আমিও তোমাকে বিয়ে করব না!"
— "করবেন না!"
— "করব না!"
— "আমিও করবো না!"
— "গুড!"
দুই পরিবারের সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে কেউ কিছু বলছে না...কারণ সবাই জানে—এই দুজনকে থামানো মানে অসম্ভব কাজ। দুই পরিবারের সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে দাদু আর দেরি না করে এগিয়ে এলেন।
— "এই যে! তোরা দুজন একটু থামবি?"আয়ান আর মেহু দুজনেই একসঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।দাদু দু'জনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,— "গায়ে হলুদ শুরু হওয়ার আগেই যদি এমন যুদ্ধ লাগে, বিয়ের দিন কী করবি? আদালত বসাবি নাকি?"
ঠিক তখনই...রিজিয়া খান মুচকি হেসে বললেন,
— "আচ্ছা, তোদের দুজনের ঝগড়া কি একটু পরে করা যাবে?" "আগে গায়ে হলুদটা শেষ হোক!"
চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল,,,
মেহু লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।আয়ানও গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যদিকে তাকাল, যেন কিছুই হয়নি।
চারদিকে উলুধ্বনি, হাসির শব্দ আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।মেহু আর আয়ানকে পাশাপাশি ফুল দিয়ে সাজানো আসনে বসানো হলো।দুজনের মাঝখানে এতোটা ফাঁকা যেনো আরো ৩ টা মানুষ বসতে পারবে,,,,,,
কিন্তু...রাফাত সেটা কি আর হতে দেয়!সে দৌড়ে গিয়ে মাঝখানের ফুলের কুশনটা সরিয়ে দিল।
— "এই যে!"
— "এত দূরে দূরে বসে আছিস কেন?"
— "এটা গায়ে হলুদ, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া বর্ডার না!"
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— "রাফাত..."
মেহু আর আয়ান পাশাপাশি বসতেই চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল,,,, মেহু একবার আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।আয়ানও চুপচাপ বসে আছে।কিন্তু তার চোখ বারবার গিয়ে আটকে যাচ্ছে মেহুর দিকে।রাফাত সেটা দেখেই মুখে হাত চাপা দিয়ে দাদুর কানে ফিসফিস করে বলল,
— "দাদু ডিপ ফ্রিজের সিস্টেম আবার হ্যাং হয়ে গেছে।"
দাদু হেসে বললেন,
— "চুপ দুষ্টু!"
রাফাত থামার ছেলে নয় হঠাৎ জোরে বলল,
— "আয়ান!" "ভাবির মুখে কি লেখা আছে?"
আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— "কী?"
রাফাত গম্ভীর মুখে বলল,
— "না পাঁচ মিনিট ধরে একই জায়গায় তাকিয়ে আছিস "পড়া শেষ হলে আমাদেরও বলিস!"
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— "তুই এক মিনিট চুপ থাকতে পারিস না?"
রাফাত বুকে হাত দিয়ে বলল,
—"না..
চলবে,,