_____★★★______
" সত্যি খেয়াল করিসনি আায়ান... "আমি ছোটবেলা থেকে তোকে চিনি না, তাই না?"
আয়ান এবার ফাইলে চোখ নামিয়ে বলল,
— "রাফাত..." "অযথা গল্প বানাস না।"
রাফাত ঠোঁট চেপে হাসল।
— "গল্প আমি বানাচ্ছি..." "নাকি তোর মুখটাই সব বলে দিচ্ছে?"
আয়ান এবার ফাইল বন্ধ করে সরাসরি ওর দিকে তাকাল।
— "তুই কী বলতে চাইছিস?"
রাফাত কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
— "কিছুই না।""শুধু একটা কথা মনে রাখিস..."
"কিছু ফিলিংস যত দেরিতে বুঝবি...""তত বেশি কষ্ট পাবি।"
কথাটা বলেই সে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই...ফোন শেষ করে আব্রাহাম আবার ভেতরে ঢুকল,,মুখে আগের মতোই শান্ত হাসি।
— "চল?"
রাফাত সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে বলল,
— "চল।"
দুজন দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।বের হওয়ার আগে...রাফাত একবার ঘুরে আয়ানের দিকে তাকাল।
মুচকি হেসে বলল,
— "বেশি কাজ করিস না, ডিপ ফ্রিজ।" "কখনো কখনো নিজের মনটার কথাও শুনে দেখিস।"
কথাটা বলেই সে আব্রাহামকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
কেবিনে আবার নীরবতা।আয়ান একা।সে ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
রাফাতের শেষ কথাটাই বারবার কানে বাজছে...
*"কখনো কখনো নিজের মনটার কথাও শুনে দেখিস..."*
আয়ান বিরক্ত হয়ে চোখ খুলল।
খুব আস্তে বলল,
— "আমার মন..." "আসলে কী চায়?"
প্রশ্নটার উত্তর...তার নিজের কাছেও নেই,,,,,,
এইভাবেই কেটে গেলো দুই দিন,,,
______★★★______
ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে পুরো শহরটাকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে দিল আজকের দিনটা সাধারণ কোনো দিন নয়...আজ আয়ান আর মেহুর গায়ে হলুদ খান বাড়ি আর মেহুদের বাড়ি—দুই বাড়িতেই সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ,,,।
খান বাড়ি...বিয়ের আর মাত্র একটা দিন বাকি পুরো বাড়ি জুড়ে ব্যস্ততা। কেউ অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করছে, কেউ গাড়ির লিস্ট মিলিয়ে দেখছে, আবার কেউ আগামীকালের বিয়ের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত,,কেউ হলুদের থালা সাজাচ্ছে, কেউ মিষ্টির ট্রে গুছিয়ে রাখছে, আবার কেউ গাড়িতে উপহারের প্যাকেট তুলছে,,, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা রকম খাবারের সুগন্ধ,,
রিজিয়া খান একবার ড্রয়িংরুমে যাচ্ছেন, আবার রান্নাঘরে ফিরে আসছেন।
— "রহিম, হলুদের থালাগুলো সাবধানে ধরো।"
— "জি, ম্যাডাম।"
— "ফুলগুলো ঠিকমতো সাজানো হয়েছে তো?"
— "জি, সব রেডি।"
দাদু সোফায় বসে সবকিছু দেখছিলেন। মুখে তৃপ্তির হাসি
ঠিক তখনই...সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল আয়ান আজ গায়ে হলুদের সাজে যেন রাজপুত্র পরনে সাদা-হলুদের কারুকাজ করা পাঞ্জাবি। দুধে-আলতা ফর্সা গায়ের রঙ, জিম করা সুঠাম শরীর, নিখুঁত ট্রিম করা দাড়ি, বাদামি গভীর চোখ হাতে কালো ঘড়ি...আর সেট করা কালো চুলগুলো হালকা বাতাসে এলোমেলোচুল সুন্দর করে সেট করা— সব মিলিয়ে তাকে দেখে যে কারও চোখ আটকে যাওয়াই স্বাভাবিক।
রিজিয়া খান ছেলের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বললেন,
— "মাশাআল্লাহ... আমার ছেলেটার ওপর যেন কারও নজর না লাগে।"
রাফাত আয়ানের চারপাশে এক চক্কর দিয়ে বলল,
— "ডিপ ফ্রিজ!"
— "আজ তোকে দেখে বরের মতোই লাগছে!"
আয়ান নির্বিকার গলায় বলল,
— "কারণ আজ তো আমি বরই।"
রাফাত নাটকীয়ভাবে বুকে হাত চাপল।
— "ইয়া আল্লাহ!"
— "আজ ডিপ ফ্রিজ নিজে থেকে জোকস বলছে!"
আয়ান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
— "শাট আপ, রাফাত।"
রাফাত নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরল।
— "ইয়া আল্লাহ! সকাল সকাল এত রাগ! ভাবি ছাড়া এই লোকটার চিকিৎসা সম্ভব না।"
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।দাদু হেসে ফেললেন তখনি আব্রাহামও সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল তার চোখ আয়ানের দিকে গেল।
মুখে হাসি ফুটে উঠলো সে এগিয়ে এসে আয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— "আজ তোকে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।"
আয়ানও মৃদু হাসল।
— "থ্যাংকস।"
আব্রাহামের হাসি ছিল...কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য একটা কষ্ট যেটা শুধু রাফাতই বুঝতে পারল।রাফাত একবার আব্রাহামের দিকে তাকাল...তারপর খুব আস্তে ওর কাঁধে হাত রাখল।
আব্রাহামও ছোট্ট করে হাসল,,,
আব্রাহাম মনে মনে বলল,
"সে যে আমার হবে এই ব্যাপারটা
অসম্ভব, আবার সে যে আমার না,এটা
মানতে পারাও অসম্ভব.,,পূর্ণজন্ম আর হবে না,, এই জন্মেও তোমাকে পাওয়া হলো না পরি..!😅❤️🩹
দুপুর গড়িয়ে ধীরে ধীরে বিকেলের আলো ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে খান বাড়িতে তখন সবার মধ্যে ব্যস্ততা তুঙ্গে,,বাইরে তখন একের পর এক গাড়ি প্রস্তুত কাজের লোকেরা একের পর এক গিফট, হলুদের থালা, মিষ্টির বাক্স আর ফুলের ঝুড়িগুলো গাড়িতে তুলে রাখছে রিজিয়া খান শেষবারের মতো সবকিছু দেখে নিয়ে বললেন,
— "সব ঠিকঠাক নিয়েছ তো? কিছু যেন বাদ না পড়ে।"
— "জি ম্যাডাম, সব গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে।"
দাদু নিজের লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশে একবার তাকিয়ে বললেন,— "চলো, আর দেরি না করে বের হওয়া যাক। ওরা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।"
সবাই যখন একে একে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল আদিবা।হালকা হলুদ রঙের লেহেঙ্গায় আজ তাকে যেন অন্যরকম লাগছে,, দুধে আলতা গাঁয়ের রং কমড় ছাপিয়ে খোলা চুলে হালকা কার্ল, কপালে ছোট্ট টিপ, কানে ঝুমকো,চোখে গাড়ো কাজল,,ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক,,
রাফাত গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে হঠাৎই থেমে গেল।তার চোখ গিয়ে আটকে গেলো আদিবার ওপর চারপাশের কোলাহল, মানুষের কথা, গাড়ির শব্দ—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল আদিবার দিকে আদিবা ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসছিল রাফাতও অজান্তেই ওর দিকে হাঁটতে শুরু করল দুজন একেবারে মুখোমুখি হতেই আদিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল
— "কী হয়েছে?"
রাফাত কোনো উত্তর দিল না,,আদিবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, রাফাত আলতো ছোঁয়ায় ওর তুলতুলে হাতটা ধরে এক টানে একদম নিজের বুকের কাছে নিয়ে এল। পরক্ষণেই পেছনে দেয়ালটাতে হাত রেখে ওকে আটকে দিল নিজের একছত্র ভালোবাসার সীমানায়।দুজনের মাঝখানে তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব,,রাফাতের তপ্ত নিঃশ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে আদিবার মুখের ওপর আদিবার বুকের ধুকপুকানি যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে।
রাফাত মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল। তারপর মুগ্ধ গলায় বলল,
— "এভাবে সেজেছ কেন, আদু পাখি?" "তুমি কি জানো না... তোমাকে দেখলেই আমি এমনিতেই পাগল হয়ে যাই?"আজকে তো তুমি আমাকে মেরে ফেলার জন্য এইভাবে সেজেছো,,,..."— "আর এক মুহূর্ত যদি এই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি, আমার বুকের ভেতর থমকে থাকা হার্টবিটটা মনে হয় সত্যিই বন্ধ হয়ে যাবে।"
আদিবার দু'গাল মুহূর্তেই লজ্জার রক্তিম আভায় টকটকে গোলাপ হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে, কোনোমতে হাঁসফাঁস কণ্ঠে বলল,
— "রাফাত ভাই... ছাড়ো প্লিজ... কেউ দেখে ফেলবে..."
রাফাত মুচকি হেসে আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— "দেখুক...""সবাই জানুক, আমি আমার আদু পাখির প্রেমে পাগল।"
ঠিক তখনই দূর থেকে দাদুর গলা ভেসে এল,
— "রাফাত! আর কত রোমান্স করবি? গাড়ি কিন্তু ছেড়ে দেবে!"
রাফাত বিরক্তি আর হতাশায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
— "উফফ দাদু! তোমার এই ভুল টাইমিংয়ের কারণে আমার জীবনটা একটা ট্র্যাজেডি হয়ে গেল!"
কথাটা শুনে আদিবা খিলখিল করে হেসে উঠল, আর সেই হাসিতেই মুগ্ধ হয়ে আবারও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল রাফাত,,,,তারপর সবাই গাড়িতে উঠতে লাগলো,,,,,
রাফাত দু হাত তুলে নাটকি ভঙ্গিতে বলল তাহলে আর দেরি কসের চলো,,সবাই কনের বাড়ি,,,তারপর আস্তে করে আয়ানের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,— "আচ্ছা সত্যি করে বল... ভাবিকে দেখার জন্য তুই খুব বেশি এক্সাইটেড না?"
আয়ান পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুধু একবার তাকিয়ে বলল,
— "রাফাত..."
— "বেশি বাড়াবাড়ি করবি না।"
—ওকে বাবা ওকে চল লেট হয়ে যাচ্ছে,,,,
পরের মুহূর্তেই একের পর এক গাড়ি ধীরে ধীরে খান বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল...গন্তব্য—
মেহুদের বাড়ি,,,,,৷
______★★★______
এইদিকে
মেহুদের বাড়ি...
সকাল থেকেই পুরো বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে বাড়ির মূল গেট থেকে শুরু করে উঠান, বারান্দা—সবখানেই গাঁদা, রজনীগন্ধা আর সাদা ফুলের সাজ। চারদিকে হলুদ আর সোনালি কাপড়ের ডেকোরেশন। উঠানের মাঝখানে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে গায়ে হলুদের স্টেজ আত্মীয়-স্বজনের হাসি, গল্প আর কোলাহলে পুরো বাড়ি মুখর কেউ অতিথিদের আপ্যায়ন করছে, কেউ ছবি তুলছে, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা ঠিক করে দিচ্ছে।
মেহুর রুমে যুদ্ধ চলছে পিপিয়া, তিথি আর রেয়া মিলে মেহুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে,,,মেহুকে আজ গায়ে হলুদের সাজে যেন হলুদ পরীর মতো লাগছে,,,পরনে হলুদ লেহেঙ্গা, গায়ে তাজা ফুলের গয়না দুধে-আলতা গায়ের রঙ, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুল, গালে মিষ্টি টোল আর ঠোঁটে লেগে থাকা দুষ্টু হাসি— সব মিলিয়ে আজ তাকে দেখে চোখ ফেরানোই দায়,,,,
পিপিয়া মুগ্ধ হয়ে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ... আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো পরী ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে!"
তিথি মাথা নেড়ে বলল,
— "আজকে যদি আয়ান ভাই একবার তোকে দেখে... ব্যস! ডিপ ফ্রিজ একদম গলে যাবে।"
রেয়া হেসে বলল,
— "আজকে কিন্তু আয়ান ভাইয়ের চোখ তোর ওপর থেকেই সরবেই না।"
মেহু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "তোরা আবার শুরু করলি!"
পিপিয়া দুষ্টু হেসে বলল,
— "শুরু তো এখনও করিনি রাফাত ভাই আসুক, তারপর দেখবি কি করি ও তো আমাদের আইডল।"