ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ বসন্ত

১ম পর্ব

লেখক: দিশা মনি

বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নিজের প্রিয় বান্ধবী অনন্তাকে দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সুজা। নিজের জীবনের সবথেকে প্রিয় দুই ব্যক্তির এই মিলন যেন তার পুরো অস্তিত্ব ধূলিস্যাৎ করে দিচ্ছে। সুজা নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। দুই তিনবার এটাকে স্বপ্ন ভাবছিল। কিভাবে সে বিশ্বাস করবে যে তার ৪৮ বছর বয়সী বিজনেসম্যান বাবা কিনা তার ২১ বছর বয়সী বান্ধবীকে বিয়ে করেছেন। যাকে কিনা তিনি এতদিন স্নেহের নজরে দেখতেন। আর অনন্তাই বা কিভাবে পারল, যাকে এতদিন আঙ্কেল বলে ডেকেছে তার গলায় বরমাল্য দিতে? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর সুজা খুঁজে পেল না। 

এরমাঝেই সুজার বাবা সাব্বির শেখ বেশ রাসভারী স্বরে বললেন,
"এভাবে দাঁড়িয়ে কি দেখছ? আর কতক্ষণ এভাবে দরজায় থাকব আমরা? যাও বরণ ডালা নিয়ে এসে তোমার নতুন মাকে বরণ করে নাও।"
সুজা কিয়ংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো তার বাবার দিকে। ঠিক দুই দিন আগে লোকটা তাকে বলেছিল, তার জীবন নতুন করে শুরু করতে চায়। নতুন কাউকে জীবনে জড়াতে চায়। সুজা একথা শুনে একটুও প্র‍তিবাদ করে নি। বরং খুশি হয়েছিল। কারণ সে চেয়েছিল তার বাবা তার জীবন নতুন করে শুরু করুক। সুজা যখন মাত্র ৫ বছর বয়সী ছিল তখন তার মা মারা যায়। এরপর থেকে সাব্বির শেখ তাকে একাই বড় করে তোলেন। 
তাই এই বয়সে এসে যখন তার বাবা জীবনটা আবার সাজাতে চেয়েছিল সুজা তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল৷ কিন্তু তাই বলে, এই নতুন শুরুর গুটি কিনা হবে হাটুর বয়সী একটা মেয়ে! তাও আবার সুজার বেস্টফ্রেন্ড অনন্তা। সুজা বিষয়টা মানতে পারল না। নিজের অবাক ভাব কাটিয়ে বিস্ফোরিত স্বরে বলল,
"মানে কি এসবের? তোমরা এভাবে বর বউ সেজে এসেছ কেন। এই অনন্তা, তুই আমায় সত্যিটা বল, এটা কি কোন প্রাঙ্ক করছিস তোরা?"
অনন্তা কিছু বলার আগেই সাব্বির শেখ অনন্তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
 "মজা কেন করতে যাব। অনন্তা তোমার নতুন মা। ওকে আর তুই করে বলবে না। ও আর তোমার বান্ধবী নয়। বুঝতে পেরেছ?"
সুজা কি বুঝলো সে জানে না। এই পৃথিবীতে তার কাছে বিরাট অভিশাপ মনে হচ্ছিল ঠিক যেন এক নি:শেষ ভগ্নাংশ। সে দুই কদম পিছিয়ে বলল,
"এই বিয়ে আমি মানি না। এটা হতে পারে না৷ আই জাস্ট হেইট ইউ বোথ!"
বলেই সে দৌড়ে উপরে চলে গেল। অনন্তা তার পেছনে যেতে নেবে এমন সময় সাব্বির শেখ তার কোমড় জড়িয়ে আটকে রেখে আলতো করে নিজের কাছে টেনে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,
"ও এখন একটু শকে আছে। ওকে একটু সময় দাও।"
"কিন্তু ও তো আমাদের ভুল বুঝলো.."
"একটু সময় দাও, ও ঠিকই বুঝবে৷ ভালোবাসা তো কোন পাপ নয়, ভালোবাসার কোন বয়সও হয় না। কি করবো বলো, যৌবনের এই শেষ সময়ে এসে তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম। নিজের মনের তৃষ্ণা মেটাতে যে তোমায় নিজের করতেই হতো।"
অনন্তাও হালকা হেসে বলল,
"আসলেই! জানি না, কখন কি থেকে কি হয়ে গেল। কিন্তু এখন এটাই চরম বাস্তব যে আমরা একে অপরের জীবনসঙ্গী। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার পরিবারকে এক সুতোয় বেধে রাখব।"
সাব্বির শেখ আলতো করে অনন্তার গালে চুমু খেয়ে বলেন,
"আমি জানি, তুমি তা পারবে! যেভাবে আমায় নিজের মায়ায় ফেলেছ, সেভাবে এই ভাঙাচোরা সংসারটাও সামলে নিও।"
★
অনন্তা সাব্বির শেখের রুমে এসে রুমের চোখ ধাধানো সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে যায়। সে আপন মনেই বলে,
"এত সুখ আমার কপালে ছিল আল্লাহ!"
সে ভালো ভাবে চারপাশে নজর বুলাতে থাকে। একটু পরেই সাব্বির শেখ এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। অনন্তা হাসিমুখে বলে,
"আপনি..এসে গেছেন?"
"হ্যাঁ, বিয়ে করেছি। নতুন বউ ছাড়া আর কতক্ষণ থাকি।"
অনন্তা লাজুক হাসি দেয়।
"আজ থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো অনন্তা৷ সুজার মাকে হারানোর পর পুরো জীবনটা আমি একা কাটিয়ে দিয়েছি। তবুও কেন জানি মনে হলো এই শেষ বয়সে কারো সঙ্গ দরকার।"
"আমি জানি,,,আমাদের ভালোবাসা কতটা পবিত্র ছিল। কিন্তু এই সমাজ...তারা কি আমাদের এই পবিত্র ভালোবাসা বুঝবে?"
"মানে?"
"লোক তো আমাকে গোল্ড ডিগার মনে করতে পারে। ভাবতে পারে যে আমি লোভে পড়ে আপনার সাথে.."
"কে কি ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসে না অনন্তা। আমি জানি, তুমি আমার প্রতি সৎ আর এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।"
★★
সুজা নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। তার দুচোখ ভড়ে গেছে নোনাজলে। তার হাতে তার মায়ের একটা ছবি। ছবিটা বুকে জড়িয়ে সে বলে,
"মা,,,তুমি তো বলছিলে আব্বু তোমায় অনেক ভালোবাসে। তোমার শেষ দিনগুলোয় যখন আমি তোমার কাছে বসে থাকতাম আর এই আশংকা করতাম যে তুমি চলে গেলে আমার কি হবে তখন তুমি আমায় বলেছিলে যে, বাবা আমার জন্য কোন সৎমা কখনোই আনবে না। কারণ সে তোমাকে অনেক ভালোবাসে। এতদিন ধরে তো আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি। তাহলে কেন এই শেষ বয়সে এসে বাবা এভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করল,,,বিয়ে করল এতে আমার কোন আপত্তি নেই, একটা সময় আমিও চেয়েছিলাম বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নিজের জীবন সাজাক। কারণ সে তার পুরো জীবনটা আমার আর ভাইয়ের পেছনে ব্যয় করেছে। কিন্তু তাই বলে আমার বান্ধবীকে...বিষয়টা আমি কিছুতেই হজম করতে পারছি না।"
বলেই সে আবার কাঁদতে লাগল। 
"আব্বুর এতটা অধ:পতন আমি মানতে পারছি না। নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়েকে..."
★★
অনন্তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছেন সাব্বির শেখ। অনন্তা আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সাব্বির শেখ বললেন,
"জানো অনন্তা, যেদিন সুজা প্রথম তোমায় এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল সেদিন তোমায় দেখেই আমার চোখ তোমার উপর আটকে গেছিল। তোমার মুখের সাথে সুজার মায়ের মুখের অনেক মিল আছে।"
"সুজাও আমাকে এটাই বলত। যে আমার মধ্যে নাকি ও নিজের মাকে দেখতে পায়। সেজন্যই তো আমাদের এত ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল।"
"আমি কখনো ভাবিনি, সুমাইয়া(সুজার মা) জায়গাটা অন্য কাউকে দিতে পারব কখনো। কিন্তু তোমাকে দেখার পর কেন জানি..সেই স্থানটা আমি তোমায় দিয়ে ফেলেছি মনের অজান্তেই। শুরুর দিকে নিজেকে অনেক বোঝাতাম জানো যে আমি হয়তো ভুল করছি। আমাদের বয়সের পার্থক্য,,,সমাজ কি বলবে এসব কিছু আমাকেও ভাবাত। কিন্তু.. কিন্তু যখন বুঝলাম তোমার দিক থেকেও আমার জন্য একই অনুভূতি আছে তারপর তুমি যখন নিজে থেকে সেদিন আমার অসুস্থতার সময় আমার সেবা করলে,,,আমাকে নিজের মনের কথা জানালে সেদিন.. সেদিন আমি আর নিজেকে আটকাতে চাইনি।"
"আমার মনে হয়, আমাদের আর কিছু ভাবা উচিৎ না৷ শুধু সুজা যদি আমাদের মেনে নেয় তাহলেই হবে। আমি সুজার সাথে চোখ মেলাতে পারছি না"
"সুজা যথেষ্ট ম্যাচিউর ও মেনে নেবে। তবে আমার ভয় হচ্ছে সোহেল কে নিয়ে। ও কি এত সহজে সব মেনে নেবে?"
"সোহেল মানে আপনার ছোট ছেলে?"
"হুম।"
"ব্যাপার না, সোহেল, সুজা দুজনের মন আমি জিতে নেব। এই পুরো সংসারকে আমি আবার এক সুতোয়া বাধব।"
"তাই যেন হয়! আমার বিশ্বাস আছে তোমার উপর।"
বলেই সাব্বির শেখ শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন অনন্তাকে। অনন্তাও তাকে শক্ত করে আকড়ে ধরে। তাদের মধ্যকার বয়সের পার্থক্য যেন এক মুহুর্তেই মুছে গ্লান হয়ে যায়।
চলবে ইনশাআল্লাহ....✨
#শেষ_বসন্ত
#সূচনা_পর্ব
#লেখিকাঃদিশা_মনি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন