#The villain who loved me
#বুচিবুড়ি
#পর্ব১.
চার্চের ভেতরটা আজ অস্বাভাবিক রকম নীরব।বাইরে টানা ঝুম বৃষ্টি। ছাদের টিনে বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দূরে বাজ পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। মোমবাতির কাঁপতে থাকা মৃদু আলোয় চার্চের স্যাঁতসেঁতে ভেতরটা যেন আরও বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে।ছোট্ট কাঠের কনফেশনাল বক্সের ভেতর চুপচাপ বসে আছে এলেনা।
দু-হাতে নিজের জামার কোণটা শক্ত করে মুচড়ে ধরে রাখা। চোখ দুটো শক্ত হয়ে লাল হয়ে আছে—গত কয়েকদিনের টানা কান্নায় চোখের জলও যেন এখন শুকিয়ে গেছে, রয়ে গেছে শুধু একটা নিঃশব্দ জ্বালা।কাঠের সূক্ষ্ম জালির ওপাশে ফাদারের আবছা অবয়ব।কিছুক্ষণ ভারী নীরবতার পর এলেনা খুব নিচু স্বরে বলল,
—ফাদার... ঈশ্বর কি সত্যিই সবার প্রার্থনা শোনেন?
ফাদার শান্ত, কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন,
—অবশ্যই শোনেন, মা। ঈশ্বর কখনো তাঁর কোনো সন্তানের আকুতি অগ্রাহ্য করেন না।
এলেনা নিজের নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরল। রক্ত জমে ওঠার মতো লাল হয়ে গেল তার ঠোঁট।
—তাহলে আমার মাকে কেন বাঁচালেন না?
কথাটা বলেই তার গলা ভেঙে গেল। বুক চিরে একটা হাহাকার বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল।চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
—আমি প্রতিদিন চার্চে এসে প্রার্থনা করেছি, ফাদার। প্রতিটা রাতে ঈশ্বরের কাছে হাত জোড় করে কেঁদেছি... বলেছি, আমার মাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন না। আমি দুনিয়ার আর কিছু চাইনি। কোনো সুখ চাইনি, কোনো আলো চাইনি। শুধু আমার অসুস্থ মা-টাকে চেয়েছিলাম।
ফাদার নীরবে ওপাশের অন্ধকার থেকে শুনছিলেন।
—কিন্তু ঈশ্বর আমার কথা শুনলেন না।
একটা দীর্ঘ, কাঁপানো নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো এলেনার বুক থেকে।
—গত সপ্তাহে মা-ও আমাকে একা ফেলে চলে গেল। হাসপাতালের ওই ঠান্ডা বিছানায় মা যখন শেষ নিঃশ্বাস ফেলল, আমি বুঝলাম... একটা মানুষ চলে গেলে শুধু মানুষটাই যায় না, ফাদার। তার সঙ্গে বেঁচে থাকার শেষ শক্তি, আলো আর পুরো পৃথিবীটাই এক লহমায় হারিয়ে যায়।
ফাদার ধীরে বললেন,
—তোমার মায়ের আত্মার শান্তির জন্য আমরা সবাই প্রার্থনা করব, মা। ঈশ্বর তাকে শান্তিতে রাখবেন।
এলেনা নিচু হয়ে নিজের হাঁটুর দিকে তাকিয়ে রইল।
—আমার মা-ই তো আমার পুরো পৃথিবী ছিলেন, ফাদার। মা ছাড়া এই পৃথিবীর আলো আমার কাছে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই না।
আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। বৃষ্টির শব্দ যেন কনফেশনাল বক্সের ভেতরের কষ্টটাকে আরও বাড়িয়ে দিল।তারপর ফাদার আলতো করে জিজ্ঞেস করলেন,
—তাহলে এখন তুমি কোথায় থাকবে, এলেনা?
এলেনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা বিষণ্ণ হাসি হাসল। যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে শুধু একরাশ তিক্ততা।
—জানি না।
—তোমার বাবা?
“বাবা” শব্দটা শুনতেই এলেনার মুখের আদল বদলে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার।
—বাবা আছেন।
একটু থেমে, বিষে ভরা গলায় সে যোগ করল,
—কিন্তু আমার আর মায়ের জন্য তিনি কোনোদিন ছিলেন না। আমাদের ছায়াও উনি সহ্য করতে পারতেন না।
ফাদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোমার বাবার তো এখন তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। উনি তো তোমাকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে, তাঁর বাড়িতে রাখতে চান।
এলেনা চোখ দুটি শক্ত করে বন্ধ করল।
—হ্যাঁ। মা মারা যাওয়ার পর এখন উনার হঠাৎ পিতৃস্নেহ জেগে উঠেছে।
—তাহলে যাও, মা। হয়তো এতদিনের জমে থাকা দূরত্বটা এবার কমে যাবে। হয়তো উনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।
এলেনা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
—সব দূরত্ব মেটে না, ফাদার। কিছু দূরত্ব মেটানোর কোনো উপায় থাকে না।
তার কণ্ঠ এবার আরও ভারী, আরও গম্ভীর।
—কিছু দূরত্ব মানুষ নিজের হাতে তৈরি করে। আর আমার বাবা সেই দূরত্বটা তৈরি করেছিলেন যেদিন আমার মাকে একটা ছোট ভাড়া ঘরে বন্দী করে রেখে, লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের আলাদা সংসার সাজিয়েছিলেন।
ফাদার নীরব।এলেনা ওড়না দিয়ে চোখ মুছে আবার বলল,
—মা সারাজীবন ওই লোকটাকে ভালোবেসে গেল। তিল তিল করে নিজেকে শেষ করল। অথচ বাবার জীবনে মা ছিল শুধুই একটা গোপনীয়তা, একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যি। আর আমি?
তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, গলার কাছে কী যেন একটা আটকে গেল।
—আমি ছিলাম সেই ভুল অধ্যায়ের একটা অভিশপ্ত নাম। যাকে সারাজীবন লুকিয়ে রাখতে পারলেই উনি বাঁচতেন।
—এভাবে নিজেকে ছোট কোরো না, এলেনা।
—কিন্তু এটাই আসল সত্যি, ফাদার!
এলেনার চোখ আবার জলে ভরে উঠল।
—এত বছর পর বাবা আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছেন... কারণ আজ মা নেই। আজ আমাকে অনাথ, অসহায় দেখে উনার মনে একটু দয়ার ভিক্ষা জেগেছে। আমি কোনোদিন ওই লোকটাকে ক্ষমা করতে পারব না, ফাদার। কিন্তু আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই...
ফাদার শান্ত গলায় মনে করিয়ে দিলেন,
—তোমার বাবার তো প্রথম স্ত্রী আছেন, তাদের একটি ছেলেও আছে। তাদের সঙ্গে সেই বাড়িতে গিয়ে মানিয়ে নিতে তোমার হয়তো খুব কষ্ট হবে।
এলেনা নিচু গলায় বলল,
—আমি জানি। ওই বাড়িটা আমার জন্য কোনো স্বর্গ হবে না, ওটা একটা নরক।
—তুমি কি খুব ভয় পাচ্ছ?
এবার এলেনা সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ শুনল কিছুক্ষণ।কয়েক মুহূর্ত পর খুব ধীরে, কাঁপা স্বরে বলল,
—ভয় পাচ্ছি। ভেতরটা জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে, ফাদার।
—কীসের ভয়, মা?
—যদি তারা আমাকে একটুও মেনে না নেয়?
কণ্ঠটা অপরাধীর মতো শোনালো।
—যদি বাবার প্রথম স্ত্রী আমাকে কোনোদিন মানুষ বলে গণ্য না করেন? যদি আমাকে শুধু আমার মায়ের অপরাধের শোধ হিসেবে দেখেন... বাবার জীবনের একটা পুরোনো ভুল হিসেবে গালমন্দ করেন?
একটু থেমে সে চোখ দুটি চেপে ধরে বলল,
—আর যদি আমার সৎ ভাই আমাকে বোন তো দূরের কথা, বাবার ভিটেমাটি আর সম্পত্তির ভাগ নিতে আসা একটা উচ্ছিন্নে যাওয়া মেয়ে ভাবে?
ফাদার স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এ প্রশ্নের কোনো সান্ত্বনা তাঁর কাছে ছিল না।
—আমি তো কখনো তাদের কিচ্ছু চাইনি, ফাদার!
এলেনা নিজের বুকের ওপর শক্ত করে হাত রাখল, যেন ভেতরের যন্ত্রণাটা চেপে রাখতে চাইছে।
—আমি বাবার ভালোবাসা চাইনি, উনার টাকা-পয়সা চাইনি, উনার ওই বড় বাড়িটাও না। আমি শুধু মাকে নিয়ে আমাদের ওই ছোট ঘরটায় একটা শান্ত জীবন চেয়েছিলাম।
তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ে ওড়না ভিজে গেল।
—ঈশ্বর আমার কাছ থেকে সেটাও কেড়ে নিলেন।
বাইরে আচমকা এক বিশাল কড়কড় শব্দে বজ্রপাত হলো। চার্চের জানলাগুলো কেঁপে উঠল।এলেনা সামান্য চমকে উঠে নিজেকে সামলে নিল।কিছুক্ষণ পর ফাদার নরম, আশীর্বাদের গলায় বললেন,
—তাহলে আজ তোমার শেষ প্রার্থনা কী, এলেনা?
এলেনা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। বন্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের হাসিমুখটা।তারপর ফিসফিস করে বলল,
—আমি শুধু চাই... আমার মা যেখানেই থাকুক, তিনি যেন জানেন আমি তাঁকে ভুলে যাইনি।
তার কণ্ঠ কান্নায় বুজে এলো।
—আর আমি চাই, ফাদার... আমি যেন ওই অচেনা বাবার বাড়িতে গিয়ে ঘেন্নায় আর অপমানে নিজের আত্মসম্মান আর মায়ের স্মৃতিগুলোকে হারিয়ে না ফেলি। আমি যেন নিজেকে হারিয়ে না ফেলে টিকে থাকতে পারি।
ফাদার ক্রুশের চিহ্ন এঁকে দিলেন।
—প্রভু তোমার সহায় হোন, এলেনা। তোমার পথ আলোকময় হোক।
এলেনা চোখ বন্ধ করে বলল,
—আমেন।
কনফেশনাল বক্স থেকে বেরিয়ে আসার আগে সে শেষবারের মতো চার্চের যিশুর মূর্তির দিকে তাকাল।তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।চার্চের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটার সঙ্গে ভেজা মাটির গন্ধ তার মুখে এসে লাগল।বাইরে চার্চের উঠানে একটা কালো গাড়ি স্টার্ট দেওয়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।তার বাবা তাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ড্রাইভার আর লোক পাঠিয়েছেন। নিজে আসার প্রয়োজনবোধও করেননি।এলেনা গাড়িটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
মায়ের মৃত্যুর পর আজ প্রথমবার সে নিজের ছোট্ট, চেনা পৃথিবীটা ছেড়ে অন্য এক অজানা জগতের দিকে পা বাড়াচ্ছে।কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে?বাবার বাড়িতে?
নাকি এমন এক শত্রুপুরে, যেখানে পা ফেলা মাত্রই তাকে প্রতিনিয়ত অপমান সহ্য করতে হবে আর প্রমাণ করতে হবে—সে কারও অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত সন্তান নয়?
এলেনা জামার ভেতর লুকিয়ে রাখা মায়ের কাঠের ছোট্ট ক্রুশটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।তারপর চোখের জল এক ঝটকায় মুছে ফেলে, মাথা উঁচু করে ধীরে ধীরে গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।ড্রাইভার এলেনাকে সোজা নিয়ে এলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
ড্রাইভার তাকে ডিপার্চার টার্মিনালে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিল।
সেখানে আগেই দাঁড়িয়ে ছিল এলেনার বাবার অফিসের এক বিশ্বস্ত লোক। এলেনাকে দেখেই লোকটা এগিয়ে এলো। এলেনার যাবতীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট আর টিকিট নিজের কাছে নিয়ে চেক করে নিল। ইমিগ্রেশন পার করানো থেকে শুরু করে সিকিউরিটি চেকিং—সব দায়িত্ব সেই লোকটাই সামলাল। এলেনা শুধু যন্ত্রের মতো তার পিছু পিছু হেঁটে গেল।
বিমানের ভেতর ঢোকার পর লোকটা এলেনাকে তার নির্দিষ্ট সিটে বসিয়ে দিল। নিজে গিয়ে বসল ঠিক পেছনের সিটে।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার এই ফ্লাইটজুড়ে এলেনা বিমানের জানলা দিয়ে বাইরের মেঘ আর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। দেশ ছাড়ার কষ্ট আর মায়ের স্মৃতি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
অবশেষে বিমান গিয়ে নামল স্পেনের আদোলফো সুয়ারেজ মাদ্রিদ-বারাজাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।বিমান থেকে নামার পর ঢাকার সেই লোকটি এলেনাকে সঙ্গে করে অ্যারাইভাল লাউঞ্জের দিকে নিয়ে গেল।সেখানে কনভেয়ার বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করার পর, তারা দেখতে পেল বাইরে এক মধ্যবয়সী স্প্যানিশ সুট-পরা লোক প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি এলেনার বাবার ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ড্রাইভার।ঢাকার লোকটা স্প্যানিশ ড্রাইভারটির সাথে কথা বলল এবং এলেনার সব কাগজপত্র ও পাসপোর্ট ড্রাইভারের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
—স্যারের নির্দেশে এলেনা মিসকে আপনার কাছে বুঝিয়ে দিলাম।
দায়িত্ব হস্তান্তর শেষ হলে ঢাকার লোকটি এলেনাকে জানিয়ে বিদায় নিল।এবার নতুন লোকটা খুব ঠাণ্ডা ও গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় স্প্যানিশ টানে ইংরেজিতে বলল,
—ফলো মি, মিস এলেনা। মিস্টার ক্যাস্তিলো ইজ ওয়েটিং ফর ইউ ।
এলেনা নিশব্দে লোকটির পিছু পিছু এয়ারপোর্টের বাইরে এলো। ইউরোপের হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস তার গা স্পর্শ করতেই সে শিউরে উঠল।বাইরে পার্ক করা ছিল এক বিশাল কালচে রঙের বিএমডব্লিউ। লোকটা এলেনার জন্য পিছনের দরজা খুলে দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করল মাদ্রিদ শহরের বুক চিরে।জানলার বাইরে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে ক্ল্যাসিক ইউরোপীয় স্থাপত্যের পুরোনো দালানকোঠা, বর্ষণস্নাত রাজপথ, আর সারি সারি মেপল গাছ। কিন্তু স্পেনের এই অভিজাত সৌন্দর্য এলেনার বুকে কোনো আনন্দ এনে দিল না, বরং অচেনা ভয়টা আরও চেপে বসল।মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থল পার হয়ে গাড়িটি ঢুকাল এক শান্ত, সুরক্ষিত এলাকায়।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল এক বিশাল লোহার গেটের সামনে। গেট পেরিয়ে গাড়ি ঢুকল এক ঐতিহ্যবাহী স্প্যানিশ স্থাপত্যে তৈরি বিশালাকার ভিলা বা বাড়ির সামনে। লালচে ইটের দেয়াল, ক্লাসিক ছাদ আর চারপাশ ঘিরে থাকা ভেলভেটের মতো নিখুঁত সবুজ বাগান।কিন্তু এত বড় বাড়িটার দিকে তাকিয়ে এলেনার মনে হলো—এটা কোনো বাড়ি নয়, এটা পাথরের তৈরি একখানা বরফের খাঁচা।ড্রাইভার এসে দরজাত খুলে দিতেই এলেনা ধীর পায়ে নেমে দাঁড়াল।
বুকের কাছে লুকিয়ে রাখা মায়ের কাঠের ছোট্ট ক্রুশটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে, চোখের জল মুছে সে বিশাল বাড়িটার সদর দরজার দিকে পা বাড়াল।
বিশাল কাঠের ডাবল ডোর ঠেলে এলেনা ভেতরে প্রবেশ করল।ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের রাজকীয় সাজসজ্জা দেখে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা। বিশাল ভিক্টোরিয়ান ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়া উষ্ণ আলো, দামি মার্বেলের মেঝে আর স্প্যানিশ শিল্পকলার চিত্রকর্মে সাজানো বিশাল লিভিং রুম। কিন্তু চারপাশের এই আভিজাত্যের চেয়েও বেশি ভারী হয়ে ছিল ঘরের মধ্যকার নীরবতা।সোফায় বসে ছিলেন এলেনার বাবা—সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো।
এলেনাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে তিনি হাতের কফির কাপটা মার্বেলের টেবিলে রাখলেন। চেহারায় এক গম্ভীর ও গম্ভীর্যপূর্ণ ভাব, কিন্তু চোখ দুটোয় সামান্য দ্বিধার ছাপ।তিনি এলেনার দিকে তাকিয়ে শান্ত, কিন্তু কিছুটা কৃত্রিম গলায় বললেন,
—আসতে কোনো প্রবলেম হয়নি তো?
এলেনা মাটির দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
—না।
কথার সাড়াশব্দ পেয়ে সিঁড়ির পাশ থেকে সামনে এগিয়ে এলেন সেবাস্তিয়ানের প্রথম স্ত্রী, ইসাবেলা ক্যাস্তিলো।
ইসাবেলার পরনে অত্যন্ত দামি স্প্যানিশ সিল্কের গাউন, চোখেমুখে আভিজাত্যের দম্ভ স্পষ্ট। তিনি পা থেকে মাথা পর্যন্ত এলেনাকে চরম বিষাক্ত আর তির্যক চোখে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর এই অনাহূত সৎ মেয়েটাকে তিনি বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারছেন না। মনের ভেতরে একটা তীব্র ক্ষোভ জ্বলছিল—স্বামী তার অতীত ভুলের ফসলকে সোজা নিজের এই রাজপ্রাসাদে তুলে এনেছে!
কিন্তু মনে মনে চরম ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও, এলেনার দিকে তাকিয়ে ইসাবেলা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
মেয়েটার রূপ তাঁর চোখের সামনে যেন আগুন হয়ে জ্বলছে! উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, লম্বা চোখের পাপড়ির নিচে যেন একরাশ বিষাদ মাখানো অসম্ভব মায়াবী এক মুখ। সাধারণ পোশাক আর ভ্রমণের ক্লান্তির পরও তার সৌন্দর্য কোনোভাবেই ঢাকা পড়েনি। এত সুন্দরী যে প্রথম দেখেই যে কেউ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—এলেনার চোখের গঠন, নাকের গড়ন আর মুখের আদল হুবহু সেবাস্তিয়ানের মতো! যেন নিজের স্বামীরই এক তরুণ নারী রূপ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
এই চেহারার মিল দেখে ইসাবেলার মেজাজ আরও তেতে উঠল। স্বামীর প্রতিচ্ছবি এই মেয়ের মুখ থেকে তিনি কিছুতেই মুছে ফেলতে পারবেন না।ইসাবেলা তীব্র কটাক্ষের সুরে সেবাস্তিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোমার রক্তের টান শেষ পর্যন্ত ঘরে এসেই উঠল সেবাস্তিয়ান? দেখে তো মনে হচ্ছে একদম তোমারই ছাঁচে ঢালা!
সেবাস্তিয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে গম্ভীর হয়ে রইলেন।
এলেনা বুঝতে পারল, এই ঘরে তার জন্য ভালোবাসার কোনো জায়গা নেই। এখানে সে শুধুই এক অপ্রত্যাশিত ও অপছন্দের অতিথি।
সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে এলেনার দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে কোনো উষ্ণতা না থাকলেও একটা অলিখিত আদেশের ভাব ছিল স্পষ্ট।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে এলেনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—তুমি ওপরে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও। আজ রাতে আমাদের একটা জরুরি পার্টিতে যেতে হবে। সেখানে সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে।
কথাটা বলেই তিনি এক গৃহপরিচারিকাকে হাঁক দিলেন,
—মারিয়া! এলেনাকে তার ঘরটা দেখিয়ে দাও।
মারিয়া নামের মাঝবয়সী স্প্যানিশ কাজের মেয়েটি বিনয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে বলল,
—ইয়েস, স্যার। মিস এলেনা, প্লিজ কাম উইথ মি ।
এলেনা কোনো কথা বাড়াল না। ইসাবেলার সেই বিষাক্ত আর হিংসাত্মক দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে সে মারিয়ার পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় চলে গেল।মারিয়া দোতলার প্যাসেজ পার হয়ে করিডোরের একদম শেষ মাথার একটা রাজকীয় কাঠের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং আলতো করে দরজাটা ঠেলে দিল।
ভেতরে পা রাখতেই এলেনার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এ যেন কোনো রাজপ্রাসাদের রাজকন্যার ঘর!মেঝেতে পেতে রাখা মোলায়েম হালকা গোলাপি রঙের দামি ভেলভেটের কার্পেট। ঘরের মাঝখানে এক বিশাল কিং-সাইজ ক্যানোপি বেড, যার ওপর ধবধবে সাদা আর প্যাস্টেল পিঙ্ক রঙের সিল্কের চাদর ও তুলতুলে মোটাসোটা বালিশ থরে থরে সাজানো। বিছানার ঠিক ওপরে সিলিং থেকে ঝুলে আছে একটা ছোট কিন্তু চমৎকার ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, যার আলো সারা ঘরে এক অদ্ভুত মায়াবী আবহ তৈরি করেছে।
ঘরের এক কোণে ড্রেসিং টেবিল, যার বিশাল গোল আয়নার চারপাশে নরম ওয়ার্ম-হোয়াইট লাইট জ্বলছে। টেবিলের ওপর সাজানো রকমারি প্রসাধনী আর সুগন্ধি। অন্য কোণে রয়েছে রিডিং এনক্লেভ—একটা সফট ভেলভেটের রিডিং চেয়ার, তার পাশে কফি টেবিল আর একটা ছোট ভিনটেজ বুকশেলফ।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ঘরের পেছনের বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। ধবধবে পর্দা সরাতেই চোখে পড়ে বাইরে বারান্দা, সেখান থেকে পুরো মাদ্রিদ শহরের সৌন্দর্য আর ভিলার পেছনের ফরাসি ধাঁচের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। অ্যাটাচড বাথরুমের দরজা আধখোলা, ভেতর থেকে ভেসে আসছে ল্যাভেন্ডার সুগন্ধি আর মার্বেল বাথটাবের রাজকীয় আভাস।
এতদিন বাংলাদেশে একটা ছোট স্যাঁতসেঁতে ঘরে মায়ের সঙ্গে কাটানো এলেনার জন্য এই রূপকথার মতো ঘরটা যেন এক তীব্র পরিহাস। ঘরটা যতটা সুন্দর ও আরামদায়ক, এলেনার ভেতরের শূন্যতাটা ঠিক ততটাই হা-হা করে উঠল। এত বড়, এত সাজানো ঘরে সে একদম একা।মারিয়া মৃদু হেসে বলল,
—আপনার লাগেজ রাখা হয়েছে মিস। কাপড়ের জন্য ওয়াক-ইন ক্লোজেট প্রস্তুত। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।
মারিয়া চলে যেতেই এলেনা ধপ করে বিশাল বিছানাটার এক কোণে বসে পড়ল।পারিবারিক বিউটিশিয়ান আর স্টাইলিস্টরা মিলে এলেনাকে যখন পার্টিতে যাওয়ার জন্য তৈরি করল, তখন ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের ছায়া দেখে এলেনা নিজেও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
তার পরনে স্প্যানিশ ডিজাইনারের তৈরি একটি গাঢ় লাল রঙের অফ-শোল্ডার রেশমি নাইট গাউন। ড্রেসের পিঠের দিকটা কিছুটা উন্মুক্ত, যা তার সুগঠিত ও মসৃণ পিঠের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। গাউনের একপাশে উরু পর্যন্ত সূক্ষ্ম কাট , যার ভেতর দিয়ে তার সুডৌল লম্বা পা দুটো প্রতি পদে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকের সঙ্গে সেই গভীর লাল রঙের মিলনে এলেনাকে দেখাচ্ছে অসম্ভব হট, আকর্ষণীয়!
মেকআপ ছিল একেবারেই ন্যাচারাল কিন্তু ধারালো—গভীর ডার্ক রেড লিপস্টিক, চোখে স্মোকি আইলাইনার আর হালকা হাইলাইটার যা তার তীক্ষ্ণ গাল ও চিবুককে আরও আবেদনময়ী করে তুলেছে। কালো রেশমি চুলগুলো খোলা রেখে হালকা কার্ল করে একপাশে ফেলে রাখা হয়েছে। গলায় শুধু একটা সরু হিরের নেকলেস, যা তার উন্মুক্ত কলারবোনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। তার দিকে একনজর তাকালেই যে কারো বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যেতে বাধ্য।
গাড়ি থেকে নেমে যখন তারা মাদ্রিদের বিখ্যাত এক ফাইভ-স্টার হোটেলের জমকালো ব্যাঙ্কুয়েট হলে পা রাখল, তখন হলের প্রতিটি চোখ যেন এক লহমায় এলেনার ওপর এসে স্থির হলো। অভিজাত স্প্যানিশ সমাজের বড় বড় ব্যবসায়ী আর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ফিসফিস শুরু করে দিলেন—কে এই আগুন সুন্দরী রূপসী নারী?হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পেনের গ্লাস হাতে সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
—নিক কি আসবে?
ইসাবেলা ক্যাস্তিলো তার দামি ডায়মন্ডের গ্লাসে চুমুক দিয়ে ঠোঁট বাঁকালেন। এলেনাকে নিয়ে চারপাশে সবার এমন মুগ্ধ চাউনি দেখে তাঁর ভেতরের হিংসা ততক্ষণে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তিনি বিরক্তি লুকিয়ে শীতল গলায় জবাব দিলেন,
—বলেছে তো আসবে। এখন জানি না শেষ পর্যন্ত কী করবে। তোমার ছেলে তো জানোই, নিজের খেয়ালখুশি ছাড়া কারোর তোয়াক্কা করে না।
কথাটা শেষ হতে না হতেই ব্যালকনীর পেছনের প্রবেশদ্বারে একটা হালকা শোরগোল পড়ে গেল।হলের এক কোণে যখন এলেনা তীব্র অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই ব্যাঙ্কুয়েট হলের বিশাল ডাবল ডোরজোড়া খুলে গেল। চারপাশের ফিসফিসানি মুহূর্তের মধ্যে এক থমথমে নীরবতায় বদলে গেল।ভেতরে প্রবেশ করল নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
ছয় ফুট দুই ইঞ্চির টানটান, চওড়া শরীর নিয়ে ডোরফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকা নিককে দেখে হলের প্রতিটি নারীর নিঃশ্বাস যেন এক লহমায় আটকে গেল। একাধারে স্পেনের সেরা তরুণ বিজনেসম্যান, আর অন্যদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে রাজত্ব করা এক ভয়ংকর মাফিয়া ডন—তার প্রতিটি পদক্ষেপে সেই দাপট আর রাজকীয় ভাব স্পষ্ট।
তার পরনে ইতালিয়ান টেলরিংয়ের ব্ল্যাক ডাবল-ব্রেস্টেড কাস্টম ট্রুফেল শুট। ফিটেড সুটের ভেতর দিয়ে তার সুগঠিত বুকের চওড়া ছাঁদ আর সুডৌল বডি শেপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, সেখান থেকে তার নিখুঁত কলারবোন আর পোরসিলেনের মতো ফর্সা ত্বকের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত। ডান হাতের কবজিতে দামি রোলেক্স ঘড়ি, আর বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে মাফিয়া ফ্যামিলির সেই সিগনেচার সিগনেট রিং।
তার ফেসকাটিং যেন কোনো দক্ষ ভাস্করের নিখুঁত সৃষ্টি—ধারালো চোয়াল, হালকা ট্রিম করা দাড়ি, আর কপালে এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা কুচকুচে কালো চুল। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক তার চোখ দুটো! বরফের মতো ঠাণ্ডা, ধূসর আর অসীম নীলচে এক চাহনি, যা দিয়ে সে এক পলকে যে কাউকে ভস্ম করে দিতে পারে। তার পুরো অবয়ব থেকে ছড়িয়ে পড়ছে এক তীব্র মেল ফেমেটেল ভাইব, এক বিপজ্জনক আকর্ষণ।
নিক ধীরে ধীরে পা ফেলল হলের ভেতরের দিকে। এক হাতে মদের গ্লাস আর মুখে এক চিলতে বাঁকা, অহংকারী হাসি।
সেবাস্তিয়ান আর ইসাবেলা এগিয়ে গেলেন তার দিকে। কিন্তু নিকের বিষাক্ত ধোঁয়াটে চোখ দুটো সোজা গিয়ে থামল বাবা-মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এলেনার ওপর।এলেনাকে দেখে মুহূর্তের জন্য নিকের হাতের গ্লাসটা স্থির হয়ে গেল।
বারগান্ডি ড্রেসে আগুন সুন্দরী এই মেয়েটি কে? যার উজ্জ্বল শ্যামলা চামড়ার প্রতিটি ভাঁজে ছড়িয়ে আছে এক অজানা মায়াবী মাদকতা? এলেনার উন্মুক্ত উরু আর ধারালো গলার কাটিংয়ের দিকে তাকাল নিক। তার শান্ত ধূসর চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য এক ভয়ংকর কাম আর অধিকারবোধের আগুন জ্বলে উঠল।
এলেনাও নিকের চোখ থেকে চোখ সরাতে পারল না। এত হ্যান্ডসাম, বিপজ্জনক আর ডমিন্যান্ট পুরুষ সে জীবনে দেখেনি। কিন্তু নিকের সেই শিকারি চাহনি এলেনার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল।নিক ধীর পায়ে এলেনার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দামি সিগার আর মার্দানা কোলনের কড়া সুবাস এলেনার নাকে এসে লাগল।
নিক এলেনাকে উপর-নিচ এক পলক দেখে নিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কড়া ও গভীর গলায় বলল,
—তু সিয়েমপ্রে এস তান এরমোসা, ও সলো তে আরেগলাস্তে আসি পারা এস্তা নোচে?
[তুমি কি সবসময়ই এত সুন্দর, নাকি আজ রাতটার জন্যই এমন সেজেছ?]
কথাটা বলেই নিকের ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক মারাত্মক বাঁকা, অহংকারী হাসি।এলেনা পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল! হঠাৎ করে এত কঠিন এক অজানা বিদেশি ভাষা শুনে সে এক মুহূর্তের জন্য হা হয়ে তাকিয়ে রইল। কী বলল লোকটা? প্রশংসা করল, নাকি অপমান? বাঙালি মেয়ে এলেনা স্প্যানিশ ভাষার একবর্ণও বোঝে না!
কিন্তু ভাষা না বুঝলেও, নিকের কথার ক্ষুরধার সুর, চিবুক ছুঁয়ে যাওয়া ভারী নিঃশ্বাস আর সেই বিষাক্ত চাহনি এলেনাকে বুঝিয়ে দিল—এই পুরুষটি তার জন্য চরম বিপজ্জনক!
এলেনা কিছুটা পিছু হটে নিজের ভয়ার্ত চোখ দুটো নিকের ওপর থেকে সরিয়ে নিল।
নিক এলেনার এই হতভম্ব আর ভীতু অভিব্যক্তি দেখে মৃদু হাসল। তারপর এলেনার কানে ঝুঁকে এবার পরিষ্কার ইংরেজিতে খুব নিচু স্বরে বলল,
—Understood, the language must be taught. Anyway... welcome to the family, little sister.
নিকের সেই বিষাক্ত আর ব্যঙ্গাত্মক ‘লিটল সিস্টার’ ডাকটা এলেনার কানে বিষের মতো বিধল।সে আর এক মুহূর্তও এই লোকটার চোখের সামনে থাকতে পারল না। বুক ধড়ফড় করছিল তীব্র ভয়ে আর অপমানে। এলেনা নিজের বারগান্ডি গাউনের ঝুলটা একহাতে সামান্য তুলে ধরে, নিকের পাশ কাটিয়ে হনহন করে হলের পেছনের ফাঁকা বারান্দার দিকে হেঁটে চলে গেল।
হোটেলের ওই ঠান্ডা ওপেন ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই ইউরোপের হিমশীতল বাতাস তার গা স্পর্শ করল।
এলেনা দু-হাতে নিজের উন্মু্ক্ত কাঁধ দুটো জড়িয়ে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
কোথায় এসে পড়ল সে? বাংলাদেশে মায়ের পাশে কাটানো সেই ছোট, অভাবের সংসারটাই তো এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো ছিল! এই জমকালো পার্টি, আলো ঝলমলে রাজপ্রাসাদ, আর ওই বিষাক্ত চোখের মানুষগুলোর মাঝখানে সে নিজেকে চরম একলা আর অসহায় বোধ করছে।
—কবে থেকে এভাবে পালিয়ে যাওয়া শিখলে?
হঠাৎ পেছন থেকে সেই ক্ষুরধার, ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই এলেনা শিউরে উঠে পেছনে তাকাল।
দরজার কাচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিক। তার এক হাত পকেটে, অন্য হাতে জ্বলন্ত একটা সিগার। সিগারের ধোঁয়া বাতাসে উ উড়িয়ে সে ধীর পায়ে এলেনার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
তার প্রতিটা পদক্ষেপে শিকারির হিংস্রতা।এলেনা ব্যাকস্টেপ নিয়ে বারান্দার রেলিংয়ের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। আর পেছনে যাওয়ার জায়গা নেই।নিক একেবারে এলেনার সামনে এসে থামল। সিগারের ধোঁয়াটা এলেনার মুখের ওপর না ছেড়ে অন্যদিকে ছাড়ল, কিন্তু তার ধূসর চোখের দৃষ্টি আটকে রইল এলেনার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটোর ওপর।
—ভয় পাচ্ছ? নাকি এই অচেনা দেশে নিজেকে বড় বেশি অসহায় লাগছে?
নিকের গলায় এক ধরনের নির্মম মাদকতা। সে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিল—এলেনার গালে চেপে বসা একটা কালচে চুলের গোছা আলতো করে সরিয়ে দিল কানে। নিকের ঠান্ডা আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই এলেনা বরফের মতো জমে গেল।
এলেনা জমানো ক্ষোভ আর ভয় একসাথে চেপে রেখে কঠিন গলায় ইংরেজিতে বলে উঠল,
—টাচ করবেন না আমাকে!
নিকের ঠোঁটে এবার এক ভয়ংকর সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। এলেনার এই অবাধ্যতা যেন তার ভেতরের মাফিয়া সত্ত্বাটাকে আরও উসকে দিল।সে একঝটকায় এলেনার চিবুকটা নিজের শক্ত আঙুলের চাপে ধরে সামান্য ওপরে তুলল। তারপর খুব নিচু, বিপজ্জনক ফিসফিসানি স্বরে বলল,
—এই পুরো শহরটা আমার ইশারায় চলে, মেয়ে। আর তুমি এখন আমার বাড়ির ছাদের নিচে আছ। আমাকে 'না' বলার ভুলটা করার চেষ্টা কোরো না... পস্তাতে হবে।
এলেনা ভাবল ছেলেটা তো বাংলায় কথা বলতে পারে তাহলে তখন এমন ভাষায় কথা বলল কেন? সে কি তার সাথে মজা নিল?
নিকের শক্ত আঙুলের চাপে এলেনার চিবুকটা যেন অবশ হয়ে আসছিল। তার ধূসর চোখের সেই হিংস্র চাহনি এলেনার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বারান্দার কাচের দরজার ওপাশ থেকে সেবাস্তিয়ানের ডাক ভেসে এলো,
—নিক! এখানে কী করছ? তোমাকে ভেতরের মেহমানরা খুঁজছে।
কথাটা শুনেই নিকের ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে মুহূর্তের জন্য চোখ না সরিয়ে আস্তে করে এলেনার চিবুক ছেড়ে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা ধবধবে সাদা রুমাল বের করে এলেনার গাল ঘেঁষে আলতো করে মুছে দিল, যেন তার আঙুলের ছোঁয়া লেগে গালটা নোংরা হয়ে গেছে!
নিক এলেনার দিকে ঝুঁকে শেষবারের মতো ফিসফিস করে বলল,
—আমাদের গল্পটা তো মাত্র শুরু হলো, লিটল সিস্টার। খেলা এখনো অনেক বাকি।
কথাটা বলেই নিক ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে ভেতরের জমকালো হলের দিকে হেঁটে চলে গেল।
এলেনা বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে ধরে একহাতে নিজের বুকটা চেপে ধরল। তার হাঁটু দুটো ভয়ে আর অপমানে কাঁপছিল। সে বুঝতে পারল, এই স্পেন, এই রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি—এর কোনোটাই তার জন্য আশীর্বাদ নয়। এটা এক ছদ্মবেশী নরক, আর নিকোলাস ক্যাস্তিলো হলো সেই নরকের সবচেয়ে ভয়ানক শয়তান।
---
পার্টি শেষ হতে হতে রাত প্রায় দুটো বেজে গেল।
গাড়িতে পুরোটা পথ কেউ কোনো কথা বলেনি। সেবাস্তিয়ান নিজের ফোনে গম্ভীর হয়ে মেসেজ টাইপ করছিলেন, আর ইসাবেলা জানলার বাইরে তাকিয়ে ক্ষোভ সামলাচ্ছিলেন। নিক তাঁদের সঙ্গে একই গাড়িতে ফেরেনি—সে তার নিজের স্পোর্টস কারে চেপে অন্য কোথাও চলে গেছে।
বাড়িতে ফিরে এলেনা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা দোতলায় নিজের ঘরে চলে এলো।
ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে সে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। আজ সারাদিনের মানসিক চাপ, ক্লান্তি আর নিকের ওই বিষাক্ত স্পর্শের যন্ত্রণা চেপে রাখা অশ্রু হয়ে একলহমায় বেরিয়ে এলো।
সে অনেকক্ষণ অঝোরে কাঁদল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সেই ভারী বারগান্ডি ড্রেসটা বদলে একটা সাধারণ সুতির নাইটগাউন গায়ে জড়াল। বাথরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে মুখটা ধুয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
আয়নায় ভেসে থাকা নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে এলেনা বিড়বিড় করে বলল,
—মা... তুমি আমাকে এই কোন নরকে ফেলে গেলে? আমি তো এদের কারো কিচ্ছু চাইনি...
সে টেবিল থেকে মায়ের কাঠের ছোট্ট ক্রুশটা হাতে নিল। মায়ের এই শেষ স্মৃতিটুকুই এখন তার একমাত্র সম্বল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির শব্দে ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ভাঙছিল। এলেনা ক্রুশটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার চোখে ঘুম ছিল না। বন্ধ চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল নিকের সেই বরফের মতো ঠাণ্ডা ধূসর চোখ আর কানের কাছে বলা সেই ভয়ংকর হুমকি—“আমাকে 'না' বলার ভুলটা করার চেষ্টা কোরো না... পস্তাতে হবে।”
হঠাৎ!গভীর রাতে, ঘরের পেছনের বারান্দার ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর বাইরে কোনো কিছুর হালকা খটখট শব্দ হলো!এলেনা চমকে উঠে বিছানায় ধড়ফড় করে বসে পড়ল।
বৃষ্টির ঝাপটার মাঝেই সে দেখতে পেল—বারান্দার কাচের দরজার ওপাশে, অন্ধকারের মধ্যে এক বিশাল পুরুষালী অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে! লক করা দরজার বাইরে কেউ একজন খুব শান্ত ভঙ্গিতে সিগারেট টানছে, আর সিগারের লালচে আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সেই চেনা ধোঁয়াটে চোখ দুটো।নিক!এই দুইতলার বারান্দায় সে কীভাবে এলো? আর গভীর রাতে এলেনার ঘরের বাইরে সে কী করছে?এলেনার বুকের ভেতরটা আশঙ্কায় ধক্ করে উঠল!নিক কীভাবে তিন তলার বারান্দায় উঠল, সেটা ভেবে এলেনার হাত-পা জমে বরফ হয়ে যাওয়ার মতো হলো।
বৃষ্টির ফোটাগুলো বারান্দার কাচের দরজায় আছড়ে পড়ছে, আর সেই ঝাপসা কাচের ওপাশেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে নিক। সিগারের শেষ লালচে আলোটুকু এক মুহূর্তের জন্য তার মুখটা স্পষ্ট করে তুলল—সেই চিরচেনা বাঁকা, বিষাক্ত হাসি!
নিক তার দীর্ঘ পকেট থেকে একটা অতিরিক্ত চাবি বের করল। লক করার আগেই হয়তো সে কোনোভাবে এই মাস্টার কী-টার ব্যবস্থা করে রেখেছিল।ক্লিক!
লক খোলার সেই সামান্য শব্দটা এলেনার বুকে যেন একটা তলোয়ারের মতো বিধল। কাচের ফ্রেঞ্চ উইন্ডোটা আলতো করে সরিয়ে নিক ঘরের ভেতরে পা রাখল।
তার পুরো শরীর বৃষ্টিতে ভেজা। ভেজা কালো চুলগুলো কপালে এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে, আর পরনের কালো শার্টটা গায়ের সাথে সেটে গিয়ে তার চওড়া বুকের প্যাকগুলো স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলছে। শার্টের হাতা গুটানো, হাত থেকে বৃষ্টির পানি টপটপ করে নিচে পেতে রাখা গোলাপি ভেলভেটের কার্পেটে ঝরে পড়ছে।নিক ধীর পায়ে ভেতরে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপে একটা হিংস্র পশুর শান্ত দাপট।
এলেনা লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে একদম দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। হাত দুটো কাঁপছে, বুকের ভেতর ক্রুশটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে কাঁপা কিন্তু চাঁচাছোলা গলায় বলে উঠল,
—আ-আপনি এখানে কী করছেন?! এটা আমার ঘর! বের হন এখান থেকে, নয়তো আমি চিৎকার করব!
নিকের পা থামল না। সে এলেনার মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে এসে দাঁড়াল।
ভেজা শরীরের শীতল বাতাস আর সিগারের কড়া গন্ধ এলেনাকে গ্রাস করে নিল। নিক বাঁ হাতটা দেওয়ালে রেখে এলেনার পালাবার সব পথ বন্ধ করে দিল।
নিক এলেনার ভয়ার্ত, লাল হয়ে থাকা চোখ দুটোর দিকে তাকাল। তারপর এক নজর নামিয়ে আনল এলেনার বুকের কাছে শক্ত করে চেপে রাখা কাঠের ক্রুশটার ওপর।
—চিৎকার করবে?
নিকের কণ্ঠস্বর গভীর রাতে ঘরের নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত মায়াবী বিষ ঢেলে দিল। সে এলেনার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো, তার ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা এলেনার উন্মুক্ত কলারবোনে গিয়ে পড়ল।
—এই বাড়ির প্রতিটা কোণ, প্রতিটা নিঃশ্বাস আমার ইশারায় চলে, লিটল সিস্টার। তোমার চিৎকার এই ঘরের বাইরে পৌঁছাবেও না... আর পৌঁছালেও কেউ আমাকে আটকানোর সাহস রাখবে না।
এলেনার নিচের ঠোঁটটা ভয়ে কাঁপছিল।
—আমি আপনার বোন হই! আপনার লজ্জা করে না এভাবে একটা মেয়ের ঘরে মাঝরাতে ঢুকে পড়তে?
“বোন?”
শব্দটা শুনেই নিকের ঠোঁটে এক রূঢ়, ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল। সে এলেনার মুখের আরও কাছে চলে এলো, তাদের নাকের ডগা স্পর্শ করার মতো দূরত্ব। নিকের ঠাণ্ডা, ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস এলেনার ঠোঁটে এসে ধাক্কা খেল।
—রক্তের কোনো সম্পর্ক আমাদের নেই, এলেনা। তুমি শুধুই ওই লোকটার একটা পুরোনো ভুল... আর আমার বাড়ির একজন অনাহূত অতিথি।
নিকের ডান হাতটা ধীরগতিতে ওপরে উঠল। তার ঠাণ্ডা, ভেজা আঙুলগুলো এলেনার গালে আলতো করে ছুঁয়ে নামতে লাগল তার গলার দিকে। এলেনা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, ভয়ে তার নিঃশ্বাস আটকে আসার জোগাড়।নিক এলেনার হাতের মুঠিটা আলতো করে চেপে ধরে তার বুকের কাছ থেকে ক্রুশটা স্পর্শ করল।
—এত ঈশ্বর বিশ্বাস?
নিক এলেনার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—মনে রেখো, এলেনা... স্পেনের এই শহরে ঈশ্বর অনেক দূরে থাকেন। আর আমি খুব কাছে। এখান থেকে বের হতে চাইলে আমার তৈরি করা নিয়মেই তোমাকে বাঁচতে হবে।
এলেনা চোখ মেলল। নিকের বরফের মতো ঠাণ্ডা ধূসর চোখে কোনো দয়া নেই, কোনো স্নেহ নেই... সেখানে আছে এক একছত্র আধিপত্যের নেশা।নিক এলেনার গাল থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর পিছিয়ে গিয়ে ভেজা দরজাটার দিকে পা বাড়াল।বারান্দায় যাওয়ার আগে সে একবার ঘুরে তাকাল এলেনার দিকে।
—আজ রাতে ঘুমাও, লিটল সিস্টার। কাল থেকে তোমার আসল নরকযাত্রা শুরু হবে।
নিক বারান্দার বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, কিন্তু ঘরের বাতাসে রেখে গেল তার কড়া কোলন, সিগারের ধোঁয়া আর এক হিমশীতল আতঙ্ক।এলেনা হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
পরদিন সকালে এলেনা যখন ডাইনিং হলের দিকে নামল, তখন টেবিল জুড়ে সাজানো ডজনখানেক স্প্যানিশ আর কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট। কিন্তু পরিবেশটা খাবারের সুবাসে নয়, বরং এক ভারী বিষাক্ত নীরবতায় থমথম করছিল।
ডাইনিং টেবিলের একপ্রান্তে বসে ছিলেন সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো, তাঁর হাতে সকালের খবরের কাগজ। অন্যপাশে রূপচর্চা ও আভিজাত্যের নিখুঁত মুখোশ পরে বসে আছেন ইসাবেলা ক্যাস্তিলো। আর টেবিলের মাঝখানে—নিজের চিরচেনা রাজকীয় ও অহংকারী ভঙ্গিতে বসে ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিচ্ছে নিক। তার পরনে হালকা ধূসর রঙের শার্ট, চুলগুলো যথারীতি ব্যাকব্রাশ করা।
এলেনাকে দেখে সেবাস্তিয়ান খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখলেন। এলেনা একদম নিঃশব্দে টেবিলের এক কোণে গিয়ে বসল, চোখ দুটি নিচের দিকে রাখা।
সেবাস্তিয়ান গম্ভীর গলায় নিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—নিক, শোনো... এলেনা তোমার বোন। ও এখন থেকে এই বাড়িতেই থাকবে। আমি চাই তুমি ওর যত্ন নাও এবং ওকে মেনে নাও।
কথাটা শোনামাত্রই কফির কাপে চুমুক দেওয়া অবস্থায় থামল নিক।সে কফির কাপটা ধীরে ধীরে প্লেটের ওপর রাখল। কাপের সামান্য ঠোকা খাওয়ার শব্দেই যেন টেবিলের বাতাস আরও জমে বরফ হয়ে গেল।
নিক তার ধূসর চোখ দুটো সেবাস্তিয়ানের দিকে তুলে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম অবজ্ঞাপূর্ণ ও তীতক্ত হাসি। ঠান্ডা, ক্ষুরধার গলায় সে বলে উঠল,
—কিসের বোন? কোনো বোন না ও আমার!
সেবাস্তিয়ানের মুখের আদল এক লহমায় কঠিন হয়ে উঠল। নিজের ছেলের এই স্পষ্ট অবাধ্যতায় তাঁর রাগ চড়ে গেল। তিনি টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু সামনে ঝুঁকে রূঢ় গলায় বললেন,
—বিশ্বাস না হলে DNA টেস্ট করো! ও আমারই মেয়ে, আর সেই সূত্রে তোমার বোন!
নিকের চেহারায় বাবার এই রাগের কোনো প্রভাবই পড়ল না। সে বরং আরও আলতো করে চেয়ারের হেলানে পিঠ ঠেকিয়ে বসল। এক চরম ঔদ্ধত্য আর অহংকার নিয়ে সেবাস্তিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক-একটা শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
—তোমার কথা তুমি তোমার কাছেই রাখো!
কথাটা বলেই নিক টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। সেবাস্তিয়ানের কথা আর এক সেকেন্ডও শোনানোর বা তোয়াক্কা করার প্রয়োজনবোধ সে করল না।
ছেলের এমন মেজাজ আর নিজের পক্ষ নিয়ে স্বামীকে একহাত দেওয়া দেখে ইসাবেলা ক্যাস্তিলোর মনটা খুশিতে ভরে উঠল! তাঁর ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ের হাসির ঝিলিক খেলে গেল। মনে মনে ভাবলেন—যাক, অন্তত তাঁর নিজের ছেলে এই নোংরা মেয়েটাকে মেনে নেয়নি, নিজের পক্ষই টেনেছে! এই বাড়িতে এলেনাকে এক চুল জায়গা না দেওয়ার জন্য নিক-ই তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে চলেছে।নিক টেবিল ছেড়ে যাওয়ার আগে একবার থামল।
সে এলেনার একদম পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষণিকের জন্য দাঁড়াল। নিচে তাকিয়ে থাকা এলেনার ভয়ার্ত মুখটার দিকে নিজের সেই ধোঁয়াটে, শিকারি চোখ জোড়া আটকে রাখল। এলেনার মনে হলো, নিকের এই 'বোন না মানার' ঘোষণার পেছনে শুধু ঘৃণা ছিল না... ছিল এক মারাত্মক অনধিকার চর্চার পূর্বাভাস!নিক আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ডাইনিং হল ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
গাড়ির চাকার শব্দ আর স্পোর্টস কারের ইঞ্জিনের গর্জন বাইরের রাস্তায় মিলিয়ে যাওয়ার পর ডাইনিং হলের থমথমে নীরবতা যেন আরও বেড়ে গেল।
সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো এক তীব্র বিরক্তিতে খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর ছুড়ে মারলেন। তাঁর মুখের রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। নিজের তৈরি সাম্রাজ্যে সবাই তাঁকে ভয় পায়, কিন্তু এই একজন—তাঁর নিজের ছেলে নিকোলাস—যাকে তিনি চাইলেও শাসন করতে পারেন না। নিকের ক্ষমতার শিকড় এখন সেবাস্তিয়ানের চেয়েও গভীরে ছড়ানো।
ইসাবেলা ক্যাস্তিলো অত্যন্ত সুক্ষ্ম আর বিষাক্ত একটা তৃপ্তি নিয়ে জুসের গ্লাসে চুমুক দিলেন। তারপর খুব মিষ্টি, কিন্তু ছুরি বসানো গলায় সেবাস্তিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—দেখলে তো? তোমার নিজের ছেলেই তোমার এই অতীত ভুলকে মেনে নিচ্ছে না। আমার ছেলেকে আমি চিনি সেবাস্তিয়ান, ও কোনোদিন এই অনাথ, পরিচয়হীন মেয়েটাকে ক্যাস্তিলো পরিবারের মেয়ে হিসেবে স্বীকার করবে না। মিছামিছি ওকে এই বাড়িতে এনে কষ্ট দিচ্ছ।
কথাটা বলেই ইসাবেলা এলেনার দিকে এক অপমানজনক দৃষ্টি হানলেন। যেন এলেনা মানুষের বদলে কোনো নোংরা ড্রেনের ময়লা, যা তাঁদের রাজপ্রাসাদে ভুল করে ঢুকে পড়েছে।
এলেনা টেবিলের নিচে নিজের সুতির জামাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতরটা অপমানে, কষ্টে আর ভয়ে তোলপাড় করছিল। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে সে ভেবেছিল কাল রাতের ঘটনাটা হয়তো একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। কিন্তু নিকের ওই ঠাণ্ডা, ক্ষুরধার কথাগুলো—“কোনো বোন না ও আমার!”—আর ইসাবেলার এই বিষাক্ত মন্তব্য তাকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলল।
এলেনা প্লেটের খাবারে এক ফোঁটাও হাত দিল না। খুব ধীরগতিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল,
—আমি রুমে যাচ্ছি।
সেবাস্তিয়ান কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। এলেনা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় নিজের ঘরে চলে এলো।
কাচের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে তখনো বাইরের স্যাঁতসেঁতে বাগানটা দেখা যাচ্ছে। এলেনা দরজায় লক লাগিয়ে দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। নিকের গতকাল রাতের সেই ভয়াল স্পর্শ, কানের কাছে ফিসফিস করে বলা হুমকি, আর সকালে সবার সামনে বোন বলে অস্বীকার করা—সবগুলো ঘটনা তার মাথায় একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
যদি নিক তাকে বোন না-ই মেনে থাকে, তবে গতকাল রাতে তার ঘরে ওভাবে প্রবেশ করার মানে কী ছিল? সেই চাহনি, সেই হিংস্র আধিপত্যের ভয়ংকর নেশা... কিসের আলামত ছিল ওটা?
হঠাৎই ঘরের দরজায় হালকা নক হলো।
এলেনা চমকে উঠে বুক চেপে ধরল। আবার কি নিক এসেছে? ভয়ে ভয়ে সে দরজার কাছে গিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
—ক-কে?
বাইরে থেকে গৃহপরিচারিকা মারিয়ার শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
—মিস এলেনা, আমি মারিয়া। মিস্টার সেবাস্তিয়ান আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনার কিছু দরকারী জিনিসপত্র আর স্টাডি গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এলেনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার লক খুলল। মারিয়া ভেতরে ঢুকে ট্রলিতে করে কিছু নতুন জামাকাপড়, স্প্যানিশ ভাষার কিছু লার্নিং বই এবং একটা নতুন আইপ্যাড রেখে দিল।
মারিয়া মেয়েটার চোখদুটে ইসাবেলা বা নিকের মতো বিষ ছিল না, বরং কিছুটা দয়া ও মায়া মাখানো ছিল। সে নিচু স্বরে এলেনার দিকে তাকিয়ে স্প্যানিশ মেশানো ইংরেজিতে বলল,
—মিস এলেনা, আপনি নিজেকে একা ভাববেন না। এই বাড়ির পরিবেশ খুব একটা ভালো নয়, বিশেষ করে ইয়াং মাস্টার নিকোলাস... উনাকে একটু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন। উনি যা চান, তা হাসিল না করা পর্যন্ত থামেন না।
এলেনা স্থির চোখে মারিয়ার দিকে তাকাল।
—উনি আসলে কী চান, মারিয়া? উনি কি আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতে চান?
মারিয়া এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ইতস্তত করে বলল,
—ইয়াং মাস্টার কাউকে অপছন্দ করলে তাকে এড়িয়ে চলেন বা বের করে দেন। কিন্তু আপনাকে উনি যেভাবে দেখছেন... সেটা অন্য কিছু, মিস। আমি এই বাড়িতে অনেক বছর আছি, ইয়াং মাস্টারের চোখে এই চাহনি আমি আগে কখনো দেখিনি। এটা কোনো বোনকে দেখার চাহনি নয়। আপনি প্লিজ সাবধানে থাকবেন। দরজা সবসময় ভেতর থেকে লক করে রাখবেন।
কথাটা বলে মারিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মারিয়ার কথাটা এলেনার মনের ভেতরের অচেনা আতঙ্কটাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিল। "এটা কোনো বোনকে দেখার চাহনি নয়..."
দিন গড়িয়ে দুপুর পার হয়ে বিকেল নামল মাদ্রিদ শহরে। আকাশ জুড়ে ধূসর মেঘের ঘনঘটা। এলেনা ঘরের বাইরে পা রাখেনি। সে খাটে বসে স্প্যানিশ ভাষার সহজ কিছু শব্দ বোঝার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মন বসছিল না।
সন্ধ্যা নামতেই পুরো ভিলায় আবার যেন এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। সেবাস্তিয়ান অফিসের কাজে শহরের বাইরে গেছেন, ফিরতে দু-দিন সময় লাগবে। আর ইসাবেলাও তাঁর বন্ধুমহলের কোনো এক চ্যারিটি ক্লাবে গেছেন। পুরো বিশালাকার রাজপ্রাসাদ ফাঁকা, শুধু কয়েকজন গৃহপরিচারিকা আর প্রহরী ছাড়া কেউ নেই।
রাত সাড়ে দশটা।বাইরে আবার ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের ছাদ না থাকলেও কাচের জানালায় আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দে চারপাশটা ভারী হয়ে উঠেছে। এলেনা নাইটগাউন পরে বিছানায় শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল!
চারপাশ এক মুহূর্তেই ঘুটঘুট অন্ধকারের সাগরে তলিয়ে গেল।
এলেনার বুকের ধুকপুকানি এক ধাক্কায় বেড়ে গেল। সে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখা মায়ের কাঠের ক্রুশটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। জেনারেটর চালু হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগার কথা, কিন্তু কেন জানি তা হচ্ছে না।
ঠিক তখনই! ঘরের ঠিক বাইরের নিরব করিডোরে কারো ধীর, ভারী আর প্রতিধ্বনি তোলা বুটের শব্দ ভেসে এলো।ঠাস... ঠাস... ঠাস...
প্রতিটা পদক্ষেপ খুব শান্ত, কিন্তু অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। এলেনা বিছানার ওপর শক্ত হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো সে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে,
ঘরের কাঠের দরজার লকটা খুব স্বাভাবিকভাবে বাইরে থেকে চাবি দিয়ে খোলা হলো! অন্ধকারের মধ্যেই ধীরে ধীরে ভারী দরজাটা খুলে গেল।করিডোরের আবছা আলোয় ডোরফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল অবয়ব। তার হাতের সিগারের লালচে আলোটুকু অন্ধকারের মধ্যে এক ভয়ংকর আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।
নিকোলাস ক্যাস্তিলো।নিক ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে পা রাখল। সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে ঘরের জেনারেটর ব্যাকআপের মাস্টার সুইচের মেসেজটা অফ করে দিল—মানে ইচ্ছাকৃতভাবেই সে পুরো ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে!নিক ঘরটার কাঠের দরজা পেছনে ঠেলে একদম বন্ধ করে দিল। লকের শব্দটা অন্ধকারের বুকে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।
—ন-নিক?!
এলেনার গলায় আকুল আতঙ্ক। সে অন্ধকারেই পিছিয়ে গিয়ে ব্যাকরেস্টের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দিল।নিক কোনো কথা বলল না। সিগারের ধোঁয়াটা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সে অন্ধকারের অভ্যস্ত চোখে সোজা বিছানার দিকে হেঁটে এলো। তার দামি কোলন আর বৃষ্টিতে ভেজা কাপড়ের সুবাস আবার পুরো ঘর গ্রাস করে নিল।
নিক বিছানার পাড় ঘেঁষে এসে থামল। তারপর খুব ধীরে ধীরে ঝুকে এলো এলেনার ওপর।
—আজ তো বাবা বাড়িতে নেই, লিটল সিস্টার...
নিকের কণ্ঠস্বর অন্ধকারের বুকে এক ঠাণ্ডা পৈশাচিক বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ল। তার শক্ত হাতটা সোজা গিয়ে আঁকড়ে ধরল এলেনার খামচে ধরা থুতনি।
—সকালে টেবিলের নাটকটা দেখে নিশ্চয়ই খুব ভালো লেগেছে? তুমি ভেবেছিলে তোমার ওই 'বাবা' তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?
এলেনা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিকের হাতটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নিকের লোহার মতো শক্ত আঙুলের সামনে তার জোর ছিল ধূলিকণার মতো। এলেনার চোখের জল অন্ধকারের মধ্যেই গালে গড়িয়ে পড়ল।
—ছাড়ুন আমাকে! আপনি একটা অমানুষ! ঈশ্বর আপনাকে ক্ষমা করবেন না!
নিক এক অদ্ভুত, নিচু ও পৈশাচিক হেসে উঠল। সে এলেনার থুতনি থেকে হাত সরিয়ে হঠাৎ করেই তার বাঁধনমুক্ত চুলগুলো মুঠোর ভেতর চেপে ধরে মুখটা নিজের একদম কাছে টেনে আনল। নিকের ঠাণ্ডা, ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস এলেনার কাঁপা ঠোঁটে এসে ধাক্কা খেল।
—তোমাকে কালকেই বলেছিলাম না এলেনা? স্পেনের এই শহরে ঈশ্বর অনেক দূরে থাকেন... আর আমি খুব কাছে।
নিক তার অন্য হাতটা এলেনার কাঁধের ওপর থেকে নাইটগাউনের সুতি কাপড়টা আলতো করে নিচে নামিয়ে দিল। উন্মুক্ত শ্যামলা ত্বকে নিকের বরফের মতো ঠাণ্ডা আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই এলেনার পুরো শরীর শিউরে উঠল, ভয়ে তার বুক হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল।
—আমার ডেড ভেবেছে তোমাকে এই বাড়িতে এনে এক টুকরো সম্পত্তি দান করবে... আর আমার মম ভেবেছে তোমাকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে।
নিক এলেনার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—কিন্তু তারা কেউ জানে না... আমি তোমাকে এই বাড়িতে কী হিসেবে রেখেছি।
এলেনা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে নিকের বুক ঠেলে চিৎকার করে উঠতে চাইল,
—আ-আমি আপনার বোন! রক্ত না থাকলেও খাতায়-কলমে আমি—
—শাট আপ!
নিকের গর্জন অন্ধকারের বুকেও এলেনাকে স্তব্ধ করে দিল। নিক এলেনার মুখের ওপর ঝুকে এসে এক অত্যন্ত ক্ষুরধার আর রূঢ় গলায় বলে উঠল,
—তুমি আমার কোনো বোন নও! তুমি এই বাড়িতে শুধুই আমার শিকার... আমার বন্দি। যে ভুলটা আমার বাবা আজ থেকে কুড়ি বছর আগে করেছিল, সেই ভুলের মাশুল তুমি আমাকে দেবে, এলেনা। প্রতিদিন... প্রতি রাতে।
নিক এলেনার হাতের মুঠি থেকে মায়ের সেই কাঠের ক্রুশটা টান মেরে ছিনিয়ে নিল।
—না! ওটা ফিরিয়ে দিন! প্লিজ, ওটা আমার মায়ের শেষ স্মৃতি!
এলেনা কেঁদে উঠে হাত বাড়াল, কিন্তু নিক অন্ধকারে ক্রুশটা একপাশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছুড়ে মারল। তারপর এলেনার দুই হাত বিছানার ওপর শক্ত করে চেপে ধরে তাকে সম্পূর্ণ নিজের দেহের নিচে পিষে ফেলল।নিকের ধূসর বরফ-শীতল চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও এলেনার ভয়ার্ত, অশ্রুসজল চোখের দিকে স্থির হয়ে রইল।
—আজ রাতে তোমার কোনো প্রার্থনা কাজ করবে না, লিটল সিস্টার। ওয়েলকাম টু ইয়োর রিয়েল হেল...
চলবে.....