ফন্ট সাইজ:
থিম:
𝐓𝐡𝐞 𝐕𝐢𝐥𝐥𝐚𝐢𝐧 𝐖𝐡𝐨 𝐋𝐨𝐯𝐞𝐝 𝐌𝐞

২য় পর্ব

লেখক: বুচিবুড়ি

#The villain who loved me

#বুচিবুড়ি
#পর্ব২.
পরদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই মাদ্রিদ শহরের ওপর মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ ভেসে উঠল। কিন্তু ক্যাস্তিলো ভিলার ভেতরে রাতের ঘন অন্ধকার কেটে গেলেও থমথমে নীরবতা আর আতঙ্কের পরিবেশ একচুলও কমেনি।

ডাইনিং হলে সকালের নাশতার টেবিল যথারীতি সাজানো। টেবিলের একপ্রান্তে গম্ভীর মুখে বসে আছেন সেবাস্তিয়ান, পাশে রেশমি পোশাকে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন ইসাবেলা। একটু পরেই নিজের চিরচেনা রাজকীয় ও গম্ভীর ভঙ্গিতে এসে সিটে বসল নিকোলাস। তার চেহারায় রাতের সেই কালবৈশাখীর কোনো চিহ্নই নেই, যেন কিছুই ঘটেনি।কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও এলেনা নাশতার টেবিলে নেমে এলো না।সেবাস্তিয়ান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়ে কাজের মেয়ে মারিয়াকে ডাকলেন,
—মারিয়া, এলেনা এখনো নিচে নামেনি কেন? ওরে গিয়ে ডেকে এসো।
—ইয়েস, স্যার। আমি এখনই দেখছি।
মারিয়া ট্রে হাতে দ্রুত দোতলার করিডোর পার হয়ে এলেনার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আলতো করে দরজায় কয়েকটা নক করে বলল,
—মিস এলেনা? ব্রেকফাস্ট রেডি। স্যার আপনাকে নিচে ডাকছেন।
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। মারিয়া আবার নক করল, কিন্তু চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। চিন্তিত হয়ে মারিয়া দরজার হ্যান্ডেলটা ঘোরাতেই অবাক হয়ে দেখল—দরজা লক করা নেই, হালকা খোলা!
মারিয়া আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল, আর পরের মুহূর্তেই তার হাত থেকে ট্রে-টা ছিটকে মেঝেতে পড়ে বিকট শব্দ হলো!
—হে ভগবান! মিস এলেনা!
ঘরের ভেতরে দৃশ্যটা দেখে মারিয়ার গলার আওয়াজ আটকে গেল।বিছানার পাশে চওড়া রাজকীয় পিলারের সাথে এলেনাকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে! তার রেশমি সুতির নাইটগাউন ছেঁড়াফাটা, দুধের মতো ফর্সা হাত দুটো রেশমি দড়ি দিয়ে শক্ত করে শক্ত কাঠের সাথে পেঁচানো, যার ফলে তার কবজিতে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে দাগ পড়ে গেছে। এলেনার ধারালো ও মায়াবী মুখটা একপাশে হেলে আছে—সে পুরো জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
তার উজ্জ্বল শ্যামলা গালে স্পষ্ট আঙুলের কালচে ছাপ, আর শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ। ঘরের মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো প্রসাধনী, আর এক কোণে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে তার মায়ের সেই প্রিয় কাঠের ক্রুশটা। সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে নিকের সেই কড়া কোলনের সুবাস আর এক ভয়াল নির্যাতনের তীব্র চাপ।মারিয়ার চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে নিচে থেকে সেবাস্তিয়ান আর ইসাবেলা দৌড়ে ওপরের তলায় চলে এলেন।
দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলোর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! নিজের একমাত্র মেয়েকে এভাবে পশুর মতো বাঁধা আর নিস্তেজ অবস্থায় দেখে তাঁর চোখের দৃষ্টি জমে বরফ হয়ে গেল।
—এলেনা!
সেবাস্তিয়ান চিৎকার করে ভেতরে ছুটে গেলেন এবং নিজের হাতে এলেনার বাঁধন খুলতে লাগলেন। তাঁর হাত ভয়ে ও রাগে থরথর করে কাঁপছিল।
দরজার কাচে হেলান দিয়ে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে নিকোলাস। পকেটে হাত গুঁজে, ঠোঁটের কোণে সেই পৈশাচিক আর ক্ষুরধার হাসি ফুটিয়ে সে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে এই করুণ দৃশ্যটা দেখতে লাগল।
সেবাস্তিয়ান এলেনার বাঁধন খুলে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সশব্দে ঘুরে দাঁড়ালেন। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি সোজা নিকের শার্টের কলার চেপে ধরলেন!
—তুমি এই কাজ করেছ নিক?! তোমার সাহস হয় কী করে আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার? তুমি একটা পশুকেও হার মানিয়েছ!
নিক তার বাবার ক্ষুব্ধ মুখের দিকে একনজর তাকাল। তারপর চরম অবহেলায় সেবাস্তিয়ানের হাত দুটি নিজের কলার থেকে ঝিটকে সরিয়ে দিল। তার ধূসর চোখে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর হিমশীতল ঘৃণা।
—আমি আগেই বলেছিলাম সেবাস্তিয়ান... ও আমার কোনো বোন নয়। আমার বাড়িতে আমার নিয়মে খেলা হবে। ওকে বাঁচানোর ক্ষমতা তোমারও নেই।
ইসাবেলা একপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন। ছেলের এই নিষ্ঠুরতা দেখে তিনি এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠলেও, এলেনার এই ধ্বংসাত্মক অবস্থা দেখে তাঁর মনে এক পৈশাচিক তৃপ্তি এনে দিল।
ঠিক তখনই বিছানা থেকে একটা হালকা কোঁকানির শব্দ ভেসে এলো। ধীরে ধীরে চোখ মেলল এলেনা। তার ভয়ার্ত, নিস্তেজ চোখ দুটো ঘরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে সোজা গিয়ে আটকালো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিকের ধূসর, শিকারি চোখ দুটোর ওপর।নরকের আসল খেলা যে মাত্র শুরু হলো, এলেনা তা নিজের পুরো অস্তিত্ব দিয়ে টের পেল।
সেবাস্তিয়ান এলেনার বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তাঁর স্বর আকুলতায় আর উদ্বেগে কাঁপছিল। এলেনার ফ্যাকাশে মুখ আর গায়ের রক্তের দাগ দেখে তিনি কোনোভাবেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলেন না।
তিনি এলেনার দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
—এলেনা! আমাকে বলো মা... কে কী করেছে তোমার সাথে? স্পষ্ট করে বলো আমাকে! আমি কাউকে ছেড়ে দেব না!
এলেনা তীব্র ভয়ে কেঁপে উঠল। তার চোখ দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিকের দিকে চলে গেল। নিকের সেই বরফের মতো ঠান্ডা ধূসর চোখ দুটো তখনো এলেনার ওপর নিবদ্ধ, আর ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক ভয়ংকর প্রচ্ছন্ন হুমকি।
এলেনা নিজের থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর নিজের সবটুকু শক্তি জমা করে খুব নিচু ও নিস্তেজ গলায় বলল,
—ক-কেউ কিছু করেনি...
সেবাস্তিয়ান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি আরও একটু সামনে ঝুঁকে বললেন,
—কী বলছ তুমি? কেউ কিছু করেনি মানে?! তোমার এই অবস্থা কে করল? তুমি ওকে ভয় পাচ্ছ? এলেনা, আমাকে ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই! আমি আছি তো!
এলেনা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে একফোঁটা নোনা জল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে দিল। সে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল,
—আমি... আমি ভয় পাচ্ছি না।
—তাহলে এমন কীভাবে হলো?! 
সেবাস্তিয়ান রাগে আর হতাশায় প্রায় গর্জে উঠলেন। 
—বল আমাকে! কীভাবে এমন একটা বীভৎস ঘটনা ঘটল এই ঘরের ভেতরে?!
এলেনার মনের মধ্যে তখন কাল রাতের সেই ভয়াল স্মৃতিটা ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছিল...গতকাল গভীর রাতে যখন জেনারেটর বন্ধ করে নিক অন্ধকারে ঘরে ঢুকেছিল, তখন তার চোখে ছিল পৈশাচিক হিংস্রতা।
নিক যখন অন্ধকারেই এলেনার ওপর চেপে বসে তার গাউনের কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল, তখন এলেনা ভয়ে আর আকুতিতে আত্মহারা হয়ে কেঁদে উঠেছিল। নিকের সেই ঠান্ডা বরফ-শীতল ছোঁয়া আর পৈশাচিক ক্ষমতা তাকে পিষে মারছিল।এলেনা শেষ সম্বলটুকু দিয়ে দু-হাত জোর করে নিকের বুকের ওপর হাত রেখে কেঁদে কেটে মিনতি করেছিল,
—প্লিজ... প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে! এমন করবেন না, আমি হাত জোড় করছি! আমি... আমি এসবের জন্য এখনো অনেক ছোট! প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন...
এলেনার সেই নিষ্পাপ, ভয়ার্ত করুণ আকুতি আর থরথর করে কাঁপা শরীরের মিনতি মুহূর্তের জন্য নিকের ভেতরের হিংস্র সত্ত্বাকে হয়তো থামিয়ে দিয়েছিল। নিকের ধূসর বরফ-চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছিল।নিক এক ধাক্কায় এলেনার ওপর থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। তার মুখ থেকে এক তীব্র হিসহিসানি শব্দ বের হয়ে এসেছিল। সে চরম রাগ আর আক্রোশে ঘরের যা কিছু সামনে পেয়েছিল—ড্রেসিং টেবিলের কাচ, মহার্ঘ্য ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প—সব টেনে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল! ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে এক তাণ্ডব চালিয়েছিল সে।
তারপর এলেনার চুল মুঠোয় ধরে বিছানার কাঠের পিলারের সাথে টেনে এনে রেশমি দড়ি দিয়ে তাকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছিল, যাতে সে সারা রাত একচুলও নড়তে না পারে।
নিক এলেনার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলেছিল,
—আজ রাতে বেঁচে গেলি, লিটল সিস্টার... কিন্তু প্রতিদিন তুই এই নরকে ধুঁকে ধুঁকে মরবি।
কথাটা বলেই নিক পুরো ঘর তছনছ অবস্থায় রেখে তাকে সেভাবে বেঁধে রেখেই সশব্দে দরজা আটকে চলে গিয়েছিল।
স্মৃতির সেই ভয়াল পাতা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো এলেনা। সে তো জানে, সেবাস্তিয়ানকে সত্যিটা বললে নিক হয়তো আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। আর এই ক্যাস্তিলো সাম্রাজ্যে নিককে থামানোর ক্ষমতা কারো নেই।
এলেনা চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের কান্না চেপে রেখে সেবাস্তিয়ানের দিকে তাকিয়ে নীরব রইল।
সেবাস্তিয়ান অত্যন্ত রাগে আর ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে শক্ত চোখে নিকের দিকে তাকালেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেকে উদ্দেশ্য করে তিনি একদম চড়া ও কঠোর গলায় আদেশ দিলেন,
—নিক, তুমি আজই ইতালি যাচ্ছ আমাদের বিজনেসের কাজে! আমি এখনই তোমার টিকিটের ব্যবস্থা করছি। এই মুহূর্তে এই বাড়ি থেকে বের হও!
নিক তার ধূসর চোখে একবিন্দু বিচলিত না হয়ে ঠোঁটের কোণে একটা চরম ঔদ্ধত্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। পকেটে হাত গুঁজে সে ঠান্ডা কিন্তু মারাত্মক ক্ষুরধার গলায় উত্তর দিল,
—Just fuck off, Dad. কোথাও যাচ্ছি না আমি, এখানেই থাকব।
সেবাস্তিয়ান কিছু একটা বলতে যাবেন, ঠিক তখনই ইসাবেলা মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। তিনি সেবাস্তিয়ানের হাতটা ধরে রাগে গজগজ করে উঠলেন,
—ঠিকই তো! ওই সামান্য একটা অনাথ মেয়ের জন্য আমার ছেলে কেন বাড়ি ছেড়ে ইতালি যাবে, অ্যাঁ? আর মেয়েটা তো নিজেই স্পষ্ট বলল যে নিক তাকে কিচ্ছু করেনি! তাহলে মিছামিছি আমার ছেলেকে দোষ দিচ্ছ কেন?
সেবাস্তিয়ান আর কোনো কথা বাড়ালেন না। নিজের স্ত্রী আর ছেলের এই চরম অবাধ্যতা ও বিষাক্ততার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এক তীব্র হতাশায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে শক্ত পায়ে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন। ইসাবেলাও নিজের জয় নিশ্চিত দেখে একটা তৃপ্তির হাসি হেসে সেবাস্তিয়ানের পিছু পিছু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।বাইরে করিডোরে তখনো ভয়ে কাঁপতে থাকা কাজের মেয়ে মারিয়া দাঁড়িয়ে ছিল।
নিক ধীর পায়ে ঘর ভেতর এসে মারিয়ার সামনে গিয়ে থামল। তার গলায় কোনো আবেগ নেই, একদম ঠান্ডা ও রাজকীয় নির্দেশে বলল,
—মারিয়া, ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসো।
মারিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথা নিচু করে বলল,
—ই-ইয়েস, ইয়াং মাস্টার! আমি এখনই আনছি।
নিক আবার ধীর পায়ে এলেনার ছড়াছড়ি ও তছনছ হয়ে থাকা ঘরের ভেতরে পা রাখল।মারিয়া দ্রুত কদম ফেলে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে ঘরে ঢুকে তা ড্রেসিং টেবিলের কোণে রাখল। নিককে দেখে মারিয়ার বুক দুরুদুরু করছিল। নিক হাত উঁচিয়ে অত্যন্ত শক্ত গলায় নির্দেশ দিল,
—বাহিরে গিয়ে দাঁড়াও, মারিয়া। দরজার কাছেও কাউকে দেখতে যেন না পাই।
—ইয়েস, মাস্টার।
মারিয়া এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে বাইরে বেরিয়ে হালকা করে দরজাটা টেনে দিল।ঘরে এখন কেবল তারা দুজন। এলেনা বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকলেও তার শরীর ভয়ে আবার জমে বরফ হতে শুরু করল। নিক ধীরপায়ে ফার্স্ট এইড বক্সটা হাতে তুলে নিয়ে বিছানার একদম পাশে এসে বসল।
ফার্স্ট এইড বক্স খোলার শব্দ হতেই এলেনা ভয়ে নিজেকে পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীরজুড়ে তীব্র যন্ত্রণা—বিশেষ করে দুটো কবজিতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।
নিক এলেনার এই পিছিয়ে যাওয়া দেখে এক হাত বাড়িয়ে এলেনার ফর্সা উরু ও পিঠের বাঁধন সংলগ্ন অংশ চেপে শক্ত করে নিজের দিকে টেনে আনল। তার ধূসর চোখ দুটোয় কোনো দয়া বা ভালোবাসার চিহ্ন ছিল না, ছিল এক চরম নিষ্ঠুর আধিপত্য।
—একচুল নড়ার চেষ্টা করলে পরিণাম ভালো হবে না, এলেনা।
নিকের ক্ষুরধার গলার শব্দে এলেনা একদম স্থির হয়ে গেল।
নিক কটন প্যাডে অ্যান্টিসেপ্টিক লিকুইড লাগাল। তারপর এলেনার ডান হাতটা বেশ শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরে কালচে হয়ে যাওয়া কবজিতে সজোরে ঘষে দিতে লাগল। ক্ষতস্থানে সেই তরল লাগতেই এলেনা ব্যথায় তীব্র এক আর্তচিৎকার করে উঠল!
—আহ্! ছ-ছাড়ুন! খুব জ্বলছে...
—চুপ!
নিক এলেনার অন্য হাতটা নিজের হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রইল। তার চোখ দুটি একদম ভাবলেশহীন, যেন সে কোনো পশুর ক্ষত পরিষ্কার করছে। তবে মলম লাগানোর সময় তার ধীর স্পর্শের পেছনেও রয়েছেনএক আধিপত্যের নেশা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। নিক আলতো করে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে দিতে দিতে খুব নিচু, পৈশাচিক ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,
—কাল রাতে তো কেঁদে কেঁদে মিনতি করছিলে তুমি নাকি খুব ছোট... অথচ ব্রেকফাস্ট টেবিলে ড্যাডের সামনে যখন সত্যিটা গোপন করলে, তখন তো বেশ বড় বুদ্ধিমতীর মতো কাজ করলে?
এলেনা চোখ বুজে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
—আমি... আমি শুধু এই নরক থেকে নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছি...
নিকের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ভয়াল ও বাঁকা হাসি। সে ব্যান্ডেজটা শেষ করে ঝটকা মেরে এলেনার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। নিকের ভেজা কোলনের সুবাস আর কড়া তামাকের গন্ধ এলেনাকে গ্রাস করে নিল।
—ভুল ভাবছ, লিটল সিস্টার। এই বাড়িতে বাঁচতে হলে তোমাকে আমার নিয়মেই চলতে হবে। ক্ষততে মলম আমিই লাগাব, আবার ক্ষতটা দেওয়ার অধিকারও শুধু আমার।
কথাটা বলেই নিক এলেনার গালে নিজের ভারী ও ঠান্ডা বুড়ো আঙুলটা বেশ জোরে ঘষে দিয়ে ফার্স্ট এইড বক্সটা বন্ধ করল।নিক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের কোটের বোতাম ঠিক করল। তারপর এলেনার দিকে এক চরম অবজ্ঞাপূর্ণ ও শিকারি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
—আজ সারাদিন এই রুমের বাইরে এক পা-ও ফেলবে না। আমার অনুমতি ছাড়া এই ভিলার আলো বাতাসেও তোমার কোনো অধিকার নেই।
নিক দরজার দিকে হেঁটে গেল। লকের শব্দে ঘরটা আবার এক হিমশীতল নীরবতায় ডুবে গেল। বিছানায় একা পড়ে থাকা এলেনা উপলব্ধি করল—নিকের এই তথাকথিত 'যত্ন' আসলে কোনো দয়া ছিল না, তা ছিল তার ওপর নিকের একছত্র বন্দিদশা ও মাফিয়ার হিংস্র অধিকারবোধের নতুন এক নিষ্ঠুর অধ্যায়।
রাত আনুমানিক দেড়টা।বাইরে হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর হিমশীতল বাতাসের শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া বিশালাকার ক্যাস্তিলো ভিলা তখন পুরোই নিঝুম, থমথমে অন্ধকারে ডুবে আছে।
এলেনা বিছানায় শুয়ে ছিল। সারাদিনের ধকল, শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক চাপে তার শরীর ভেঙে আসছিল, কিন্তু ভয়ে চোখের পাতা এক করতে পারছিল না। প্রতিটা মুহূর্ত তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি দরজার লকে চাবি ঘোরার সেই ভয়ংকর শব্দটা হবে।
ঠিক তখনই—নীরব করিডোর পার হয়ে একদম নিঃশব্দে এলেনার ঘরের দরজার লকে চাবি ঘোরার হালকা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো।এলেনার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল! সে দ্রুত বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল।অন্ধকার ভেদ করে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ঝাপসা আলোয় দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল নিকোলাস।
তার পরনে এখন কোনো সুট নেই—একটি ঢিলেঢালা কালো শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা, এবং কালো ট্রাউজার। এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, আর অন্য হাতে একটা কাচের গ্লাসে অ্যাম্বার রঙের উইস্কি। নিকের অবয়ব থেকে ছড়িয়ে পড়ছে এক তীব্র, বিপজ্জনক আর ধোঁয়াটে মাদকতা।
নিক ঘরটির ভারী দরজা পেছনে ঠেলে বন্ধ করে লক করে দিল। তারপর খুব ধীর ও শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে।
—ন-নিক... আপনি আবার কেন এসেছেন?
এলেনার গলায় আকুল আতঙ্ক। সে দু-হাতে নিজের সুতির নাইটগাউনের হাতা আঁকড়ে ধরে নিজেকে যতটা সম্ভব ছোট করে ফেলার চেষ্টা করল।
নিক কোনো কথা বলল না। সিগারের ধোঁয়াটা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে গ্লাসের শেষ চুমুকটুকু শেষ করল। তারপর খালি গ্লাসটা পাশের নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখার পর, ধীর পায়ে বিছানায় উঠে এলো।নিকের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক হিংস্র পশুর নিখুঁত শিকারি দাপট।
সে এলেনার খুব কাছাকাছি চলে এলো। নিকের শরীর থেকে আসা কড়া মদের গন্ধ, সিগারের ধোঁয়া আর রাজকীয় কোলন এলেনাকে যেন শ্বাসরোধ করে মারতে চাইল। নিক তার এক হাত এলেনার পেছনের দেওয়ালে রেখে তার সব পালানোর পথ বন্ধ করে দিল।
—তোমাকে না বলেছিলাম, এই ঘরে আমার আসার জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না?
নিকের শাণানো ও নিচু কণ্ঠস্বর রাতের এই নিস্তব্ধতায় এলেনার কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ল।
—প-প্লিজ... আমার কাছে আসবেন না! ঈশ্বরকে ভয় পান!
এলেনা ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিজের মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রূঢ় ও পৈশাচিক হাসির রেখা। সে ডান হাতটা বাড়িয়ে খুব শক্তভাবে এলেনার চিবুকটা চেপে ধরে মুখটা সোজা করে নিজের দিকে নিয়ে এলো। নিকের ধূসর নীলচে চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও আগুনের মতো জ্বলছিল।
—ঈশ্বর? তোমাকে তো কালকেই বলেছি এলেনা... এই শহরে ঈশ্বর আমার ইশারায় চলেন। আর তুমি? তুমি তো এখন শুধুই আমার খাঁচায় বন্দি এক শিকার।
নিকের বাঁ হাতের বরফের মতো ঠান্ডা আঙুলগুলো এবার এলেনার ব্যান্ডেজ করা ডান কবজিতে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। নিক সেখানে খানিকটা চাপ দিতেই এলেনা ব্যথায় কোঁকিয়ে উঠল।
—সকালে খুব ব্যথা পাচ্ছিলে, তাই না?
নিক এলেনার কানের খুব কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
—এই ব্যথাটা মনে রেখো, লিটল সিস্টার। এই ভিলায় তোমার অস্তিত্ব কতটা তুচ্ছ, তা প্রতিদিন এই ব্যথাই তোমাকে মনে করিয়ে দেবে।
এলেনা নিকের শক্ত বুকের ওপর হাত রেখে তাকে ঠেলে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
—আমি আপনার কোনো ক্ষতি করিনি! আমাকে যেতে দিন... আমি বাংলাদেশে মায়ের স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাব, আমি আপনার বাবার সম্পত্তিতে এক পয়সাও চাই না!
—তুমি চাইলে বা না চাইলেও কিছু যায় আসে না।
নিকের গলার স্বর হুট করে কয়েক ধাপ নেমে গিয়ে একদম বরফ-শীতল হয়ে গেল।সে এলেনার চিবুক ছেড়ে দিয়ে এলেনার বাঁধনমুক্ত চুলের মুঠি হালকা চেপে ধরল। নিকের ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস এলেনার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট স্পর্শ করছিল।
—তুমি এই বাড়ি থেকে কোথাও যাচ্ছ না। কারণ আমার ডেড এর সবচেয়ে বড় পাপ তুমি, আর সেই পাপের মাশুল আমি তোমার ওপর থেকেই আদায় করব। প্রতিটা রাতে... এই ঘরে।
কথাটা শেষ করেই নিক এলেনাকে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। কিন্তু কাল রাতের মতো সে আজ কোনো তাণ্ডব চালাল না। কেবল এলেনার ওপর নিজের বিশাল অবয়বের ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে রইল।
নিক পকেট থেকে তার মাফিয়া ফ্যামিলির সিগনেচার রিং পরা হাতটা বের করে এলেনার গাল ঘেঁষে নামিয়ে আনল তার গলার কাছে। এলেনা ভয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, তার চোখ বেয়ে তপ্ত নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
নিক এলেনার কান্নার আওয়াজটা উপভোগ করল কিছুক্ষণ। তারপর এলেনার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে খুব ঠান্ডা ও নির্দয় কণ্ঠে বলল,
—শুভরাত্রি, লিটল সিস্টার। কাল সকাল থেকে তোমার আসল নরকযন্ত্রণা শুরু হতে চলেছে। তৈরি থেকো।
নিক বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে হেঁটে গেল। চাবির লকের সেই ভয়াল শব্দের সাথে সাথে সে আবার অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে গেল।বিছানায় একা পড়ে থাকা এলেনা দুই হাতে বুক চেপে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। সে বুঝতে পারল, এই ভিলায় রাতগুলো যতটা বিপজ্জনক, নিকের রূপ তার চেয়েও হাজার গুণ ভয়ংকর।
পরদিন সকালে ক্যাস্তিলো ভিলার আকাশ হালকা মেঘলা রূপ ধারণ করল। সকালের আলো ভিলার বিশাল জানালায় এসে পৌঁছালেও ভেতরের থমথমে আর ভারাক্রান্ত বাতাসের কোনো পরিবর্তন হলো না।
ডাইনিং হলে সেবাস্তিয়ান একাই নিঃশব্দে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন। কাল রাতের পর থেকে তাঁর চেহারায় গভীর উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। একটু পর ইসাবেলা এসে টেবিলে বসলেন, তাঁর চোখে-মুখে এক ধরনের কুটিল তৃপ্তির রেখা। নিকোলাস যথাসময়ে নিজের স্থানে এসে বসল, পরনে তার গাঢ় রঙের ইতালিয়ান সুতোর স্যুট। চেহারায় নিখুঁত আভিজাত্য, যেন ক্যাস্তিলোর এই বিশাল সাম্রাজ্যের একক অধিপতি সে-ই।
এলেনা আজ নিচে নামার চেষ্টা করল না। কাল রাতের আতঙ্ক আর শারীরিক যন্ত্রণায় তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার ডান কবজির দাগগুলো এখনো স্পষ্ট, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষত তৈরি হয়েছে তার মনে।
---
বেলা ১১টা নাগাদ নিক ধীরপায়ে দোতলার দিকে হেঁটে গেল। এলেনার ঘরের দরজার তালা খুলে ভেতরে পা রাখতেই দেখতে পেল, এলেনা জানালার পাশে একটা ছোট কাঠের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তার দৃষ্টি স্থির, যেন এই বদ্ধ ঘর থেকে মনটা বহু দূরে—কোনো এক শান্ত স্মৃতিতে হারিয়ে গেছে।
নিকের বুটের সশব্দ আওয়াজে এলেনা চমকে উঠে ঘুরে তাকাল। তার চোখে মুহূর্তেই ফুটে উঠল সেই চেনা ভয়।
নিক পকেটে হাত রেখে তার সামনে এসে থামল।
—আজকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছ তুমি।
এলেনা ফ্যাকাশে চোখে নিকের দিকে তাকাল, কিছু বলল না।
—আমার সাথে নিচে চলো, 
নিকের গলা একদম ঠান্ডা ও নির্দয়। 
—ড্যাডের সামনে তোমাকে সুস্থ আর স্বাভাবিক দেখানোর দায়িত্ব তোমার। মনে রেখো, সামান্যতম ভুলের মাশুল কেমন হতে পারে, তা কাল রাতেই বুঝেছ।
এলেনা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার শরীর এখনো দুর্বল, কিন্তু সে ভালো করেই জানে—নিকের আদেশ অমান্য করার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।নিচে লিভিং রুমে সেবাস্তিয়ান কিছু ফাইলপত্র দেখছিলেন। এলেনাকে নামতে দেখে তিনি ব্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
—এলেনা! তুমি কেমন আছ মা? শরীর কি কিছুটা ভালো লাগছে?
এলেনা মাথা নিচু করে খুব ধীর কণ্ঠে বলল, 
—আমি ঠিক আছি।
সেবাস্তিয়ান এলেনার শান্ত আর নিস্তেজ প্রতিক্রিয়া দেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি এগিয়ে এসে এলেনার মাথায় হাত রাখতে চাইলেন, কিন্তু ঠিক তখনই নিক মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
—ড্যাড, আজ বিকেলে বিজনেসের একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। আমি চাই এলেনাও আমার সাথে ক্যাস্তিলো এস্টেটের অফিসে যাক। ডাইরেক্টরদের সাথে ওর পরিচয় হওয়া দরকার।
সেবাস্তিয়ান কঠোর চোখে নিকের দিকে তাকালেন।
—ও এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়, নিক। আজ ও ঘরেই বিশ্রাম নেবে।
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত ক্ষুরধার হাসি।
—ও যাবে, ড্যাড। কারণ ক্যাস্তিলোর সম্পত্তিতে ওর যেটুকু অধিকার আছে, তা বুঝে নেওয়ার প্রথম ধাপ আজ থেকেই শুরু হওয়া উচিত... তাই না, এলেনা?
নিকের শেষ কথাটা ছিল এক সরাসরি হুমকি। এলেনা বুঝে গেল, মিটিংয়ে যাওয়াটা তার জন্য কোনো সুযোগ নয়, বরং নিকের তৈরি করা নতুন এক বন্দিদশার ছক।এলেনা সেবাস্তিয়ানের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, 
—আমি যাব। সমস্যা নেই।
সেবাস্তিয়ান ছেলের এই চাল আর এলেনার বাধ্যতা দেখে ক্ষোভে হাত মুঠো করলেন, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করতে পারলেন না।বিকেলে কালো মার্সিডিজ কারে চেপে নিক আর এলেনা ক্যাস্তিলো কর্পোরেট টাওয়ারের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গাড়ির পেছনের সিটে দুজন পাশাপাশি বসে। এলেনা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল, আর নিক সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল।গাড়ির ভেতরের নীরবতা ভেঙে নিক একদম নিচু ও পৈশাচিক কণ্ঠে বলল,
—আজকের মিটিংটা তোমার জন্য একটা পরীক্ষা, লিটল সিস্টার। সবাই জানবে তুমি ক্যাস্তিলোর নতুন মেম্বার, কিন্তু ভেতরের সত্যিটা কেবল তুমি আর আমিই জানব।
এলেনা কোনো উত্তর দিল না, শুধু হাত দুটো শক্ত করে চেপে রাখল। নরকের এই খেলা যে এত সহজে শেষ হবে না, তা সে প্রতিটা নিঃশ্বাসে বুঝতে পারছে।
ক্যাস্তিলো কর্পোরেট টাওয়ারের পঁয়ত্রিশ তলায় ঝকঝকে কাচে ঘেরা বিশাল বোর্ডরুম। সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনারের কারণে পুরো ঘর হিমশীতল, কিন্তু এলেনার বুকের ভেতরটা আতঙ্কের উত্তাপে থরথর করে কাঁপছিল।
বিশাল ওভাল শেপের কাঠের টেবিলের চারপাশে মাদ্রিদের প্রতাপশালী ব্যবসায়ী এবং ক্যাস্তিলো গ্রুপের শেয়ারহোল্ডাররা বসে আছেন। সবার চোখ টেবিলের একদম মূল সিটে বসে থাকা নিকোলাসের দিকে। নিকের রাজকীয় উপস্থিতি, পরনের নিখুঁত স্যুটের গম্ভীরতা আর চোখের ভয়াল ঔদ্ধত্য পুরো ঘরের পরিবেশকে দমবন্ধ করে রেখেছে।
নিক ধীরপায়ে দাঁড়িয়ে তার ডান পাশে কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকা এলেনার কাঁধে একটা হাত রাখল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে খুব স্নেহশীল ও দায়িত্বশীল এক বড় ভাই, কিন্তু এলেনা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল—নিকের বরফ-শীতল আঙুলগুলো তার কাঁধের হাড় প্রায় পিষে ফেলছে।
নিক অত্যন্ত স্পষ্ট, গমগমে ও আভিজাত্যপূর্ণ গলায় মিটিঙে ঘোষণা দিল,
—জেন্টলমেন, মিট মাই নিউ হাফ-সিস্টার, এলেনা ক্যাস্তিলো। ড্যাডের ইচ্ছে অনুযায়ী আজ থেকে ক্যাস্তিলো এস্টেটের চার শতাংশ শেয়ার ওর নামে ট্রান্সফার করা হলো।
বোর্ডরুমে মৃদু গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত পরিচালকদের অনেকেই এলেনার দিকে বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে তাকালেন। একজন বয়স্ক শেয়ারহোল্ডার সানগ্লাস ঠিক করে হেসে বললেন,
—অভিনন্দন, মিস এলেনা! আপনাকে বেশ শান্ত স্বভাবের মনে হচ্ছে। ক্যাস্তিলো পরিবারের ব্যবসার বিষয়ে আপনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে?
এলেনা কথা বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, কিন্তু ঠিক তখনই নিকের আঙুলের চাপ তার কাঁধে আরও তীব্র হলো। ক্ষতস্থানে যেন নতুন করে যন্ত্রণা চাগাড় দিয়ে উঠল।
নিক শীতল ভঙ্গিতে হেসে শেয়ারহোল্ডারের প্রশ্নের উত্তর নিজে দিল,
—আমার বোন এখনো অনেক ছোট, মিস্টার গঞ্জালেস। ওর এখন শুধু শেখার বয়স। ক্যাস্তিলোর সমস্ত সিদ্ধান্ত, পেপারওয়ার্ক আর ওর শেয়ারের দায়িত্ব—সবকিছু আপাতত আমার অধীনেই থাকবে। তাই না, এলেনা?
এলেনার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সে জানে, এই মুহূর্তে একটু ভুল উত্তর বা প্রতিবাদ মানেই রাতে ভিলার বন্ধ ঘরে নিকের পৈশাচিক শাস্তির মুখোমুখি হওয়া।
সে কোনোমতে ঢোক গিলে, মাথা নিচু করে নিস্তেজ গলায় বলল,
—হ্যাঁ... নিক যা বলছেন, সেটাই ঠিক।
মিটিং শেষে সবাই একে একে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বিশাল বোর্ডরুমে এখন কেবল তারা দুজন।নিক ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়াল। বাইরে থেকে পুরো মাদ্রিদ শহরটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে পকেট থেকে সিগার বের করে আগুন জ্বালালো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে সে এলেনার দিকে ঘুরল।
—ব্রাভো, লিটল সিস্টার। মিডিয়া আর বোর্ডের সামনে বেশ ভালো অভিনয় শিখে গেছ।
এলেনা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে গড়িয়ে পড়া জল আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা। সে নিচু গলায় বলল,
—আপনি যা চেয়েছিলেন তা তো হলো। আমাকে এবার ভিলায় ফিরে যেতে দিন... আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
নিক তার দিকে এগিয়ে এলো। সিগারের ধোঁয়াটা এলেনার মুখের ওপর উড়িয়ে দিয়ে বাঁকা হাসল,
—ফিরে তো যাবোই।আমি বাড়ি ফেরার আগে একটা ছোট জায়গায় থামব। তোমাকে ক্যাস্তিলোর আসল চেহারাটা দেখানো বাকি আছে।
সন্ধ্যা নেমে আসতেই গাড়িটি গিয়ে থামল মাদ্রিদ শহরের এক পুরোনো, আলো-আঁধারিতে ঘেরা শিল্পাঞ্চলে। একটি পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউসের সামনে গাড়ি থামতেই নিক নামল এবং এলেনার হাত ধরে একরকম টেনে হিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেল।
ওয়্যারহাউসের ভেতরে থমথমে অন্ধকার। বাতাসে ভারী রক্তের আর বারুদের গন্ধ। চারপাশে নিকের সশস্ত্র মাফিয়া গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে একটা চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রক্তাক্ত এক লোক পড়ে আছে, যে ক্যাস্তিলো গ্রুপের তথ্য প্রতিপক্ষ দলকে পাচার করার চেষ্টা করেছিল।
এলেনা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু নিক পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরল। নিকের কড়া কোলন আর বিষাক্ত নিঃশ্বাস আবার এলেনার কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ল।
—ভালো করে দেখো এলেনা... যে ক্যাস্তিলো সাম্রাজ্যের অংশ হতে এসেছ, তার আসল ভিত্তি ভালোবাসা নয়, ভয় আর রক্ত।
নিক পকেট থেকে তার সিলভার কালারের পিস্তলটা বের করে একদম ঠাণ্ডা মাথায় লোকটার পায়ে গুলি চালাল,ওয়্যারহাউসে লোকটার তীব্র আর্ত চিৎকার কেঁপে উঠল। এলেনা ভয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিকের কোট আঁকড়ে ধরল। তার পুরো শরীর কাপড়ের মতো কাঁপছিল।
নিক পিস্তলটা পকেটে রেখে এলেনার গালে নিজের ঠাণ্ডা হাতটা রাখল। ফিসফিস করে বলল,
—এই ভয়টাই আমি তোমার চোখে প্রতিদিন দেখতে চাই। ড্যাড তোমাকে শেয়ার দিতে পারে, কিন্তু এই শহরে তোমার মালিক শুধু আমি। মনে থাকবে?
এলেনা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সে কেবল নিঃশব্দে কেঁদে নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে বুঝতে পারল, রাজপ্রাসাদের মতো ক্যাস্তিলো ভিলা আর এই রক্তভেজা ওয়্যারহাউসের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই—দুটোই নিকোলাসের তৈরি করা এক একটি নরককূপ।
ওয়্যারহাউসের রক্তভেজা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর বারুদের তীব্র গন্ধে এলেনার দম প্রায় আটকে আসছিল। লোকটার আর্তচিৎকার আর নিকের পৈশাচিক হিংস্রতা তার মনে চিরদিনের জন্য এক গভীর ক্ষত তৈরি করে দিল।
নিক এলেনার হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে ওয়্যারহাউস থেকে বের করে এনে গাড়ির পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলল। পুরো যাত্রাপথে নিক কোনো কথা বলল না, শুধু সিগারের পর সিগার জ্বালিয়ে গাড়ির বাতাসকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে রাখল। এলেনা পেছনের সিটে নিজেকে একদম ছোট করে গুটিয়ে বসে রইল, তার চোখে তখনো আতঙ্কের নোনা জল।
রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা।কালো মার্সিডিজটি ক্যাস্তিলো ভিলার পোর্টিকোয় এসে থামল। এলেনা গাড়ি থেকে নেমেই দ্রুত দোতলায় নিজের ঘরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সেবাস্তিয়ানের গলার আওয়াজে তাকে থামতে হলো।
—এলেনা! থামো মা।
সেবাস্তিয়ান সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে এলেনার দিকে এগিয়ে এলেন। এলেনার ফ্যাকাশে চেহারা আর ভয়ার্ত চোখ দেখে তাঁর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি নিকের দিকে ফিরে ক্ষুব্ধ গলায় বললেন,
—কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে ওকে, নিক? বিজনেসের মিটিং তো অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা!
নিক কোটটা খুলে হাতের ওপর রাখল। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা রূঢ় ও উদ্ধত হাসি ফুটিয়ে বলল,
—আমার সাম্রাজ্য কীভাবে চলে, তা ছোট বোনকে একটু চিনিয়ে আনলাম, ড্যাড। ও তো এখন ক্যাস্তিলোর একজন শেয়ারহোল্ডার, বাস্তবটা জানা তো ওর দরকার।
—তুমি চরম সীমা লঙ্ঘন করছ, নিক! —সেবাস্তিয়ান গর্জে উঠলেন। —আমি আজই সিভিল ল ইয়ারের সাথে কথা বলব। এলেনাকে এই মাফিয়া এস্টেটের সব ঝামেলা থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করব!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইসাবেলা চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বিষাক্ত কণ্ঠে বললেন,
—আহা সেবাস্তিয়ান, অত চিৎকার করছ কেন? ছেলে তো মেয়েকে ব্যবসায়ী দুনিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তোমার এই কুড়িয়ে আনা মেয়ে তো ক্যাস্তিলোর রক্তের কেউ নয়, তাকে এত মাথায় তোলার কী আছে?
সেবাস্তিয়ান আর কোনো কথা না বলে রাগে শরীর কাঁপাতে কাঁপাতে নিজের স্টাডি রুমের দিকে চলে গেলেন। ইসাবেলেও এক বিজয়ের হাসি নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন।
রাত একটা।বাইরে ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টি জমে উঠেছে। এলেনা ঘরের সব আলো বন্ধ করে বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিল। শরীর আর মনের যন্ত্রণায় তার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।হঠাৎ দরজায় চাবি ঘোরার সেই পরিচিত আর আতঙ্কের শব্দ—ক্লিক।
এলেনা আতঙ্কে দ্রুত সোজা হয়ে বসল। ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে আসা হালকা আলোয় দেখা গেল নিক ঘরের ভেতরে ঢুকছে। তার পরনে কোনো শার্ট নেই, উন্মুক্ত সুঠাম বুকে কিছু পুরনো ক্ষতের দাগ। হাত দুটো পকেটে রেখে সে ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগোতে লাগল।
—ন-নিক... প্লিজ... 
এলেনার গলার আওয়াজ বুজে এলো। 
—আজকে আর না... আমি খুব ক্লান্ত...
নিক জবাব দিল না। সে বিছানার ওপর উঠে এসে এলেনার দুই পাশে দু-হাত রেখে তাকে পুরোপুরি দেয়ালের সাথে আটকে ফেলল। নিকের শরীর থেকে উঠে আসা তামাক, কড়া কোলন আর মদের কড়া গন্ধ এলেনাকে আবার সেই খাঁচায় বন্দি করে ফেলল।নিক আলতো করে হাত বাড়িয়ে এলেনার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল রাখল।
—আজকে ওয়্যারহাউসে তোমার ভয় পাওয়া চোখ দুটো দেখতে দারুণ লাগছিল, এলেনা... 
নিকের কণ্ঠস্বর রাতের নিস্তব্ধতায় এক পৈশাচিক সুরের মতো শোনালো। 
—তুমিও কি বুঝেছ? তুমি চাইলেও এই খাঁচা থেকে কোনোদিন পালাতে পারবে না।
এলেনা নিকের বুকের ওপর হাত রেখে দুর্বলভাবে ঠেলার চেষ্টা করে বলল,
—আপনি... আপনি মানুষ নন... ঈশ্বর আপনাকে কখনো ক্ষমা করবেন না...
নিক বাঁকা হেসে এলেনার চিবুকটা এত জোরে চেপে ধরল যে এলেনা ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
—ঈশ্বর অনেক আগেই ক্যাস্তিলো ভিলার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, লিটল সিস্টার। এখানে প্রতিটা রাতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে নতুন এক নরকযন্ত্রণা।
নিকের বরফের মতো ঠান্ডা হাত এলেনার নাইটগাউনের কলার ধরে সজোরে এক টান দিল... এলেনার করুণ আর্তচিৎকার বৃষ্টির সশব্দ শব্দের আড়ালে বিলীন হয়ে গেল।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি আর বিদ্যুতের চমকানি। ঝড়ের দাপটে জানালায় কাচের পাল্লাগুলো থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল, ঠিক যেমন এলেনার পুরো অস্তিত্ব এক চরম আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল।
নিকের নিষ্ঠুর ছোঁয়া আর বিষাক্ত উপস্থিতিতে এলেনার সমস্ত প্রতিবাদ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কোনো লড়াই করার শক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না। এলেনা শুধু দুই হাতে চোখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। তার ফর্সা গালে গড়িয়ে পড়া অশ্রু নিকের হাতের আঙুল ছুঁয়ে বিছানায় মিশে যাচ্ছিল।
নিক কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে এলেনার এই সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থাটা দেখল। অন্ধকারের মধ্যেও তার ধূসর চোখে এক অদ্ভুত, হিসেবি উন্মাদনা ভাসছিল। এলেনার কান্না আর থরথর করে কাঁপা শরীর নিকের ভেতরের হিংস্র মাফিয়া সত্ত্বাকে যেন এক অদ্ভুত তৃপ্তি দিচ্ছিল।
নিক এলেনার চুল ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে টেবিল থেকে একটা রুমাল নিয়ে নিজের হাতটা সাবধানে মুছল, যেন কোনো অপবিত্র কিছু স্পর্শ করেছিল।
—কান্না থামাও, এলেনা,
নিকের গলার স্বর বরফের চেয়েও ঠান্ডা। 
—তোমার এই চোখের জল আমার হৃদয় গলাতে পারবে না। কারণ ক্যাস্তিলোর পুরুষদের কোনো হৃদয় থাকে না।
এলেনা কাঁপা গায়ে বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে খুব নিচু গলায় বলল,
—আপনি... আপনি আমাকে মেরেই ফেলুন। এভাবে প্রতিদিন তিলে তিলে মারার কোনো অর্থ হয় না...
নিক ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। দরজার হ্যান্ডেল ধরে সে পেছনে ফিরে তাকাল, তার ধূসর নীল চোখে শিকারি চাউনি।
—এত সহজে মুক্তি পাবে না, লিটল সিস্টার। মৃত্যু অনেক সহজ জিনিস। আমি চাই তুমি প্রতিদিন বেঁচে থেকে এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করো। ড্যাডের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে এভাবেই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত করে যেতে হবে।
নিক ঘর থেকে বেরিয়ে সশব্দে দরজা আটকে লক করে দিল।
পরদিন সকাল।বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশ মেঘলা হয়ে রয়েছে। রাতের ঝড়ের পর ক্যাস্তিলো ভিলার বাগান জুড়ে ঝরে পড়া পাতার স্তূপ।
ডাইনিং টেবিলে সেবাস্তিয়ান গম্ভীর হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে সকালের ব্রেকফাস্ট সাজানো থাকলেও তিনি এক লোকমা খাবারও মুখে তোলেননি। পাশে ইসাবেলা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছেন, আর নিকোলাস আগের মতোই নি অবিচল ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিচ্ছে।
হঠাৎ সেবাস্তিয়ান সশব্দে কফির কাপটা টেবিলে রাখলেন। তিনি নিকের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন,
—আজ বিকেলে একটা বড় সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে, নিক। আমি আমাদের পারিবারিক ল ইয়ার মিস্টার ফার্নান্দেজকে ডেকেছি।
নিক এক ভ্রূ উঁচিয়ে বাবার দিকে তাকাল, চেহারায় কোনো বিচলিত হওয়ার চিহ্ন নেই।
—কিসের সিদ্ধান্ত, ড্যাড?
—এলেনার নিরাপত্তার জন্য আমি ক্যাস্তিলো এস্টেটের বড় একটা অংশ ট্রাস্টেড ফান্ডে ট্রান্সফার করছি, 
সেবাস্তিয়ান সোজা নিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন। 
—আর সেই ফান্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে এলেনা এবং মিস্টার ফার্নান্দেজের হাতে। তোমার কোনো অধিকার সেখানে থাকবে না।
ইসাবেলা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
—কী বলছ তুমি, সেবাস্তিয়ান?! ওই অনাথ মেয়েটাকে আমার ছেলের সম্পত্তিতে ভাগ দেবে?! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
নিক কিন্তু একদম শান্ত রইল। সে কফির কাপটা নামিয়ে রেখে ধীরপায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠল। টেবিলের ওপর ঝুঁকে সে সেবাস্তিয়ানের মুখোমুখি হলো।
—তুমি ভুল করছ, ড্যাড, 
নিকের গলায় বিষাক্ত হুমকি। 
—তুমি যার হাতে কাগজ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছ, সে তা ধরে রাখার যোগ্যই নয়। মিস্টার ফার্নান্দেজ যদি আজ এই ভিলায় পা রাখেন, তবে তিনি কেবল নিজের ডেক্সট্রাকশনের দলিলে সই করে যাবেন।
ঠিক তখনই কাজের মেয়ে মারিয়া ভিজিটিং কার্ড হাতে ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
—স্যার, বাইরে মিস্টার ফার্নান্দেজ এসেছেন। উনি আপনার স্টাডি রুমে অপেক্ষা করছেন।
সেবাস্তিয়ান নিকের হুমকির তোয়াক্কা না করে উঠে দাঁড়ালেন এবং স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়ালেন।নিকের ঠোঁটে ভেসে উঠল এক নির্মম ও ভয়াল হাসির রেখা। সে পকেট থেকে নিজের এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করে এক বিশ্বস্ত মাফিয়া হ্যান্ডলারকে ডায়াল করল।
—মার্কোস... ফার্নান্দেজের ফাইলটা বের করো। ক্যাস্তিলো ভিলার খেলাটা এবার অন্য মোড় নেবে।
মিস্টার ফার্নান্দেজ স্টাডি রুমে সেবাস্তিয়ানের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বিকেল নাগাদ ট্রাস্টেড ফান্ডের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে ভিলা ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু নিকের মুখের সেই ঠান্ডা ও আত্মবিশ্বাসী হাসি ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ঘটনা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়।
পরদিন ভোরে পুরো ক্যাস্তিলো ভিলায় এক নজিরবিহীন তাণ্ডব শুরু হলো।
রান্নাঘর থেকে মারিয়া ট্রে হাতে এলেনার ঘরে সকালের নাশতা নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দরজার লক খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে সে দেখে—ঘর একদম ফাঁকা! বিছানার চাদর এলমেলো, কাল রাতের রক্তাক্ত ব্যান্ডেজটা মেঝেতে পড়ে আছে, আর এলেনার ব্যবহারের কিছু জামাকাপড় অনুপস্থিত। সবচেয়ে বড় কথা, জানালার ভারী কাঠের গ্রিলটা ভেতর থেকে কৌশলে আলগা করে ভাঙা অবস্থায় ঝুলে আছে।
এলেনা ক্যাস্তিলো ভিলা থেকে গায়েব হয়ে গেছে!
কাজের মেয়ে মারিয়ার চিৎকারে পুরো ভিলায় হুলস্থুল পড়ে গেল। সেবাস্তিয়ান তড়িঘড়ি করে ওপরের তলায় ছুটে এলেন। ফাঁকা ঘর আর খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখের রঙ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—এলেনা! কোথায় গেল মেয়েটা?!
সেবাস্তিয়ান আতঙ্কে আর দুশ্চিন্তায় প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। তিনি পুরো ভিলার গার্ডদের ডেকে পাঠালেন, সিডিভি ক্যামেরা চেক করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু গত রাতের মুষলধারে বৃষ্টির কারণে সিকিউরিটি সিস্টেমের মূল সার্ভার নাকি কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ ছিল—কোনো ফুটেজই পাওয়া গেল না।
ডাইনিং হলে ইসাবেলা চায়ে চুমুক দিতে দিতে উপহাসের সুরে বললেন,
—আমি তো আগেই বলেছিলাম সেবাস্তিয়ান, ওই মেয়েটার স্বভাব ভালো না। নিশ্চয়ই কাল রাতে চুরিচামারি করে কোনো প্রেমিকের সাথে ভেগেছে! অনাথ মেয়েদের রক্তেই দোষ থাকে।
—আহ্! মুখ বন্ধ করো ইসাবেলা! —সেবাস্তিয়ান গর্জে উঠলেন। —আমার মেয়ে এভাবে না বলে কোথাও যেতে পারে না! ও নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে!
ঠিক তখনই ধীর ও শান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো নিকোলাস। তার পরনে কালো সুট, হাতে পরা মাফিয়া ফ্যামিলির সেই সিগনেচার রিং। তার ফর্সা ও সুপুরুষ চেহারায় কোনো ধরনের উদ্বেগ বা উত্তেজনার ছাপ নেই—একদম হিমশীতল ভাবলেশহীনতা।
সেবাস্তিয়ান নিকের সামনে গিয়ে তার কলার চেপে ধরার মতো উদ্যত হয়ে বললেন,
—তুমি কী করেছ নিক?! বলো আমাকে! এলেনা কোথায়?! তুমি কি ওকে গায়েব করে দিয়েছ?!
নিক অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বাবার হাতটা সরিয়ে দিল। তার ধূসর চোখে ফুটে উঠল চরম ঔদ্ধত্য।
—তোমার ভুল হচ্ছে, ড্যাড। ও যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে, তবে সেটা তোমার এই ভিলার ভয়াবহ পরিবেশের জন্যই গেছে। আমি কেন একটা মেয়েকে গায়েব করতে যাব?
—আমি পুলিশে ফোন করছি! 
সেবাস্তিয়ান পকেট থেকে ফোন বের করতেই নিক পকেট থেকে তার নিজস্ব এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করে টেবিলের ওপর সশব্দে রাখল।
—পুলিশ ডেকে ক্যাস্তিলো সাম্রাজ্যের নাম মিডিয়াতে নষ্ট কোরো না, ড্যাড, 
নিকের গলায় এক ভয়ংকর ও প্রচ্ছন্ন আদেশ।
—ওকে খোঁজার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। আর বিশ্বাস করো... ও যদি পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও লুকিয়ে থাকে, আমি ওকে ঠিক খুঁজে বের করব।
বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম।মাদ্রিদ শহরের সীমানা পেরিয়ে বহুদূরে, এক ঘন পাইন বনের গভীরে ক্যাস্তিলো মাফিয়াদের এক গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড সেফহাউস। বাইরে সশস্ত্র পাহারাদাররা পাহারা দিচ্ছে।
স্যাঁতসেঁতে, আলো-আঁধারিতে ঘেরা এক ছোট্ট ঘরের ভেতরে পাথরের মেঝেতে শুয়ে আছে এলেনা। তার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে, হাত-পা এখনো দড়ি দিয়ে বাঁধা। সে কোনো প্রেমিকের সাথে পালায়নি, কিংবা নিছক ভাগ্যক্রমে ভিলা থেকে বের হতে পারেনি। কাল রাতে যখন ভিলার সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, তখন নিকের নিজস্ব বিশ্বস্ত মাফিয়া হ্যান্ডলার মার্কোস এলেনাকে ক্লোরোফর্ম খাইয়ে বেহুশ করে জানালার গ্রিল ভেঙে নাটক সাজিয়ে এই গোপন আস্তানায় তুলে এনেছে।
ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এলো এলেনার। মাথাটা তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল। সে চোখ মেলে চারপাশের স্যাঁতসেঁতে ইটের দেয়াল দেখে শিউরে উঠল।ঠিক তখনই আস্তানার লোহার ভারী দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। অন্ধকারের মধ্য থেকে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল নিকোলাস।তার বুটের শব্দ ছোট ঘরটিতে প্রতিধ্বনি তুলল। নিক ধীরপায়ে এলেনার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাতের আঙুল দিয়ে এলেনার ফ্যাকাশে গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
—লিটল সিস্টার... তুমি ভেবেছিলে ক্যাস্তিলো ভিলা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে?
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পৈশাচিক ও ভয়াল হাসি। সে এলেনার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—পুরো মাদ্রিদ শহর এখন তোমাকে খুঁজছে। ড্যাড ভাবছে তুমি হারিয়ে গেছ, আর তুমি ভাবছ এটা তোমার নতুন বন্দিশালা। এবার থেকে বাইরের পৃথিবী জানবে তুমি নেই... আর এই অন্ধকার আস্তানায় তুমি থাকবে শুধু আমার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে।
—আমি মুক্তি চাই, নিক! হয় আপনি আমাকে নিজ হাতে মেরে ফেলুন, না হলে আমি নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দেব! কিন্তু আপনার এই পৈশাচিক খাঁচায় আমি আর এক মুহূর্তও বেঁচে থাকব না!
কথাটা আন্ডারগ্রাউন্ড সেফহাউসের পাথরের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। এলেনার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এবার আর শুধু ভয় ছিল না—ছিল এক মরিয়া আত্মত্যাগের জিদ।
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে থাকা বাঁকা হাসিটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার ধূসর চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যে পৈশাচিক হিংস্রতায় আরও গাড় হয়ে উঠল।
সে ঝটকা মেরে এলেনার থুতনিটা এত জোরে চেপে ধরল যে এলেনার দাঁতে দাঁত লেগে গেল। নিক তার মুখটা এলেনার একদম কাছে নিয়ে এলো, তার কড়া তামাক আর মদের বিষাক্ত নিশ্বাস এলেনার মুখে আছড়ে পড়ল।
—মৃত্যু? 
নিকের গলার স্বর হুট করে এক চরম বরফ-শীতল ধাপে নেমে এলো। 
—এত সহজ নয়, এলেনা। আমার অনুমতি ছাড়া এই ঘর থেকে তোমার একটা নিশ্বাসও বাইরে যেতে পারবে না, আর নিজের প্রাণ নেওয়ার অধিকার? সেটা তো অনেক দূরের কথা।
নিক তার পকেট থেকে সিগনেচার রিংসহ হাতটা বের করে এলেনার গলার ধমনীর ওপর চেপে ধরল। এলেনার শ্বাস আটকে আসতে চাইল, কিন্তু নিক তাকে মারল না। শুধু তার হৎস্পন্দনের তীব্র গতিটা অনুভব করল।
—তুমি মরবে না, লিটল সিস্টার।
নিকের কানের লতিতে ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল। 
—তুমি বাঁচবে... প্রতিটা সেকেন্ডে এই যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বাঁচবে। আর তুমি যদি নিজেকে শেষ করার চেষ্টা করো, তবে মনে রেখো—তোমার ওই ভালোবাসার ড্যাড সেবাস্তিয়ানকে আমি নিজের হাতে ধ্বংস করে দেব।
এলেনা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিকের এই ভয়াল হুমকি তার শেষ আত্মরক্ষার পথটাকেও এক মুহূর্তে চুরমার করে দিল। সে বুঝতে পারল, মৃত্যুও এখন তার জন্য এক অপূরণীয় স্বপ্ন, আর নিকোলাস ক্যাস্তিলো—তার পুরো অস্তিত্বের ওপর রাজত্ব করা এক জীবন্ত পৈশাচিক সত্যি।
অন্ধকারের সেই স্যাঁতসেঁতে সেফহাউসে এলেনার নিথর, ভাঙা শরীরটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নিক। তার হুমকির বিষাক্ত প্রভাব এলেনার চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল সে। পকেট থেকে এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করে মার্কোসকে ডায়াল করল নিক।
—গাড়ি বের করো। আমরা ভিলায় ফিরছি, —সংক্ষিপ্ত আদেশের পর ফোনটা পকেটে রেখে দিল সে।
এলেনার হাতের বাঁধন নিজের হাতে খুলে দিল নিক, তবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় সাবধান করে দিল, 
—একটুও চালাকি করার চেষ্টা করলে এর খেসারত সেবাস্তিয়ানকে দিতে হবে, মনে রেখো।
এলেনা কোনো প্রতিবাদ করল না। তার সমস্ত প্রতিরোধ, জীবনের সমস্ত আশা ততক্ষণে স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিস্তেজ পুতুলের মতো সে নিকের পেছনে পেছনে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠল।
রাত তখন আনুমানিক দুটো। ক্যাস্তিলো ভিলার মূল ফটক পেরিয়ে কালো মার্সিডিজটি যখন আবার পোর্টিকোয় এসে থামল, পুরো ভিলায় তখনো উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। সেবাস্তিয়ান বসার ঘরের সোফায় মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন, তাঁর চোখের নিচে গভীর কালি। পুলিশকে খবর না দিলেও নিজের বিশ্বস্ত লোক পাঠাতেন তিনি, কিন্তু কোনো সুসংবাদ পাননি।
গাড়ির শব্দ শুনে সেবাস্তিয়ান একপ্রকার ছুটে দরজার কাছে এলেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নিক, আর তার পেছনে মাথা নিচু করে, ধীরপায়ে হেঁটে ভেতরে এলো এলেনা। তার জামাকাপড় সামান্য নোংরা, চেহারায় চরম ক্লান্তি আর ফ্যাকাশে ভাব।
—এলেনা! 
সেবাস্তিয়ান যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি দৌড়ে গিয়ে এলেনাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে গেলেন, কিন্তু এলেনা ভয়ে সামান্য পিছিয়ে এলো।সেবাস্তিয়ান এবার নিকের দিকে ফিরে গর্জে উঠলেন, 
—কোথায় পেয়েছ ওকে? কী হয়েছিল ওর সাথে?!
নিক অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং চিন্তিত এক অভিব্যক্তি মুখে ফুটিয়ে তুলল, যা কেবল তার মতো পাকা অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব। সে কোটের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
—শান্ত হও, ড্যাড। মাদ্রিদের সীমানার কাছে আমাদের এক প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং ওকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ওরা ক্যাস্তিলো পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। আমার খবরের নেটওয়ার্ক সময়মতো অ্যালার্ট পেয়ে যায় বলেই মার্কোস আর আমি মাঝরাস্তায় ওদের ঘিরে ফেলি।
সেবাস্তিয়ান স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। নিক এলেনার দিকে এক পলক তাকিয়ে বাবার উদ্দেশ্যে আবার বলল,
—ও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে আছে। ওকে আপাতত নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে দাও। ভিলার সিকিউরিটি আমি আরও দ্বিগুণ করে দিয়েছি, এখন থেকে মাছি গলতেও আমার অনুমতি লাগবে।
ইসাবেলা সিঁড়ির ওপর থেকে উপহাসের দৃষ্টিতে সব দেখছিলেন। সেবাস্তিয়ান আর কোনো প্রশ্ন করলেন না, এলেনার মাথায় হাত রেখে বিষণ্ণ গলায় বললেন, 
—ঘরে যাও মা... তুমি নিরাপদ।
নিরাপদ? এলেনা মনে মনে এক তিতা হাসি হাসল। যে খাঁচায় তার আসল শিকারি বাস করে, সেই খাঁচায় সে নিরাপদ!
ঘরে ফিরে এলেনা দরজা আটকে দিল। যদিও সে জানে, এই দরজার লকের কোনো মূল্য নিকের কাছে নেই। ঘরের সব আলো বন্ধ করে সে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরের আকাশ এখনো কালো মেঘে ঢাকা, হালকা টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে আর বেশি দেরি নেই।
শারীরিক যন্ত্রণা আর মনের ভেতরের গভীর ক্ষত তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। তবে এবার চোখে আর জল এলো না; তার অশ্রু যেন শুকিয়ে গেছে। জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে সে বাইরের অন্ধকার পাইন বনের দিকে তাকাল। বাতাসে গাছের পাতার খসখস শব্দ যেন তার নিজের জীবনের এক সুর।অস্ফুট, ভাঙা গলায় এলেনা গুনগুন করে গাইতে শুরু করল—এক বিষণ্ণ সুর, যা তার শৈশবে তার মা তাকে শোনাতেন।
"খোলা চোখখানা করো বন্ধ
বাতাসের ঠান্ডা গন্ধ
বয়ে বেড়ায় ঘরেরও বাহিরে
আসো ছোট্ট একটা গান করি
যাতে ঘুম পাড়ানি মাসি এসে পাশে বসে
হাতখানা দিবে কপাল ভরে
ভয় নেই, আছি আমি পাশে
হাতখানা ধরে আছি হেসে
কোলেতে আমার মাথা তোমার
অন্ধকার রাত, নিশ্চুপ সব
জোনাকির দল আজও জেগে আছে
তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের
হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি
বসে অপেক্ষা করি
কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল
আয়, ঘুম চুম্বন দে তার সারা কপালে
যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ হয়ে যায়
আয়, চাঁদমামা কাছে আয়
যাতে অন্ধকার না হয়
আলোমাখা কপালেতে টিপ টা দে
যাতে কিছু আলোকিত হয়
সে যাতে ভয় না পায়"
অন্ধকারের সেই লালচে আলোয় সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে নিকোলাস নিঃশব্দে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ছায়াটার দিকে চেয়ে রইল। এলেনার গানটা আস্তে আস্তে থেমে গেল, কিন্তু তার করুণ রেশ যেন সেই পাইন বনের ঠান্ডা বাতাসে এখনো থমকে আছে। নিকের ঠোঁটের পৈশাচিক হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে স্থান নিল এক কঠিন, অনুভূতিহীন গাম্ভীর্য। সে খুব ভালো করেই জানে, এলেনার ভেতরের নমনীয়তা আজ রাতে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আর এটাই সে চেয়েছিল—সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।
সেবাস্তিয়ানের পায়ের শব্দে নিক পিছু ফিরল। করিডোরের আলোয় বৃদ্ধ সেবাস্তিয়ানের চেহারা আরও মলিন দেখাচ্ছিল।
—ওর কি সত্যিই কোনো ক্ষতি হয়নি, নিক? —সেবাস্তিয়ানের গলায় সন্দেহ নাকি হাহাকার, তা বোঝা দায়।
নিক কোটের পকেটে হাত গুঁজে শান্ত ভঙ্গিতে বলল, 
—শারীরিক কোনো আঘাত লাগেনি, ড্যাড। তবে মানসিকভাবে ও ভেঙে পড়েছে। আপনি নিচে গিয়ে বিশ্রাম নিন, ভিলার সবকিছু এখন আমার নিয়ন্ত্রণে।
সেবাস্তিয়ান আর কথা বাড়ালেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন। নিক দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ শোনবার চেষ্টা করল ভেতরের কোনো শব্দ। ঘরটা এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, যেন মৃত্যুর নীরবতা নেমে এসেছে সেখানে।
পরদিন সকালে ক্যাস্তিলো ভিলার আকাশটা ধোঁয়াটে কুয়াশায় ঢেকে ছিল। সকাল আটটায় ডাইনিং টেবিলে এক অদ্ভুত টানটান উত্তেজনা। ইসাবেলা চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে নিকের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, 
—খুব চমৎকার নাটক সাজালে কাল রাতে, নিকোলাস। মাদ্রিদের গ্যাং? সত্যি? নাকি নিজের তৈরি কোনো খেলায় ওকেই বাজি ধরলে?
নিক তার কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে শীতল দৃষ্টিতে ইসাবেলার দিকে তাকাল। 
—নিজের সীমায় থাকো, ইসাবেলা। ক্যাস্তিলো পরিবারের ব্যবসায় তোমার নাক গলানোর প্রয়োজন নেই।
ডাইনিংয়ের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হওয়ার আগেই দোতলা থেকে ধীরপায়ে নেমে এলো এলেনা। তার পরনে একদম সাদা রঙের এক সাধারণ ড্রেস, চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দেওয়া। চেহারায় কোনো রক্তিম ভাব নেই, যেন এক হেঁটে চলা লাশ। চোখের নিচে কালি আর বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট।
সেবাস্তিয়ান তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 
—এলেনা, এসো মা। কিছু খেয়ে নাও।
এলেনা কোনো কথা বলল না। নিচু চোখে গিয়ে সোজা চেয়ারে বসল। সে নিকের দিকে একবারও তাকাল না, কিন্তু নিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার প্রতিটি নড়াচড়া অনুসরণ করছিল। এলেনা জুসের গ্লাসে হাত দিতেই তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। নিকের ভয়াল হুমকির প্রতিটি শব্দ তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাজছিল।
নিক টেবিলের নিচ দিয়ে নিজের লম্বা পা সামান্য বাড়িয়ে এলেনার পায়ের সঙ্গে ছোঁয়াল। এলেনা চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল, কিন্তু মুখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না।
নিক একদম স্বাভাবিক গলায় বলল, 
—আজ থেকে এলেনা বাইরে কোথাও একা যাবে না। মার্কোস সব সময় ওর সাথে থাকবে, আর সপ্তাহে তিনদিন ওকে ভিলার নিজস্ব ফিটনেস ও নিরাপত্তার মহড়া দিতে হবে।
—আমার কোনো সিকিউরিটির দরকার নেই... 
এলেনা খুব নিচু গলায় কেবল এইটুকুই বলতে পারল।
নিক তার কফির কাপটা টেবিলে একটু জোরে নামিয়ে রাখল। সেই সামান্য শব্দেই পুরো ঘর নীরব হয়ে গেল। নিক ঝুঁকে এসে এলেনার একদম কাছাকাছি হয়ে নিচু স্বরে বলল, 
—তোমার কী দরকার আর কী দরকার নেই, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব এখন থেকে আমার, এলেনা। ভুলে যেও না... তুমি এখন এই ভিলার সবচেয়ে দামি আমানত।
এলেনার বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, শারীরিক বন্দিদশা থেকে এই মানসিক খাঁচা আরও বেশি ভয়ঙ্কর। নিকোলাস ক্যাস্তিলো তাকে ধ্বংস করছে না, সে তাকে তিলে তিলে নিজের অধীনস্ত করে তুলছে।এলেনা জুসের গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে খুব নিচু, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, 
—আমি কলেজে ভর্তি হতে চাই। ঘরে বন্দি হয়ে বসে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব।
কথাটা শুনেই ডাইনিং টেবিলে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো। নিক কফির কাপে চুমুক দেওয়া থামিয়ে এলেনার দিকে একপলক তাকাল, তবে কিছু বলল না।সেবাস্তিয়ান এলেনার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, 
—কলেজে ভর্তি হতে চাও? ভালো কথা, মা। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা তো চমৎকার উদ্যোগ। কিন্তু এলেনা, একটা বড় সমস্যা আছে।
তিনি গ্লাসটা সরিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে বললেন, 
—তুমি তো স্প্যানিশ ভাষাটা ঠিকমতো জানো না। এটা বাংলাদেশ নয় যে শুধু ইংরেজি জানলেই সব চলে যাবে। স্পেনে মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষাকে খুব সম্মান করে। এখানে পড়াশোনা, শিক্ষা বা সাধারণ যোগাযোগ—সবকিছুতেই স্প্যানিশের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। ভাষাটা না শিখলে তুমি তো ক্লাসে কিছুই বুঝতে পারবে না।
এলেনা চুপ করে রইল। সেবাস্তিয়ানের যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু সে জানত এটা নিকের পাতা খাঁচা থেকে বের হওয়ার একটা বাহানামাত্র।নিকোলাস এবার কফির কাপটা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত ও চতুর হাসি। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ড্যাড একদম ঠিক বলেছেন। তবে এলেনা যখন চাইছই, তখন তার ইচ্ছাটা পূরণ হওয়া দরকার।
নিক এলেনার চোখের দিকে চোখ রেখে ধীরে ধীরে বলল, 
—বাইরের কোনো ল্যাঙ্গুয়েজ একাডেমিতে পাঠানোর ঝুঁকি আমি নেব না। আজ থেকেই ভিলাতেই ওর স্প্যানিশ শেখার ব্যবস্থা হবে। আর ওর ভাষা শেখানোর দায়িত্বটা... আমি নিজেই নিচ্ছি।
এলেনার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। যে মানুষটার হাত থেকে বাঁচার জন্য সে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিল, সেই মানুষটাই এখন চাবুক হাতে তার শিক্ষক হতে চলেছে।
—তোমার আপত্তি নেই তো, এলেনা? 
নিকের কণ্ঠের ঠান্ডা সুরের নিচে স্পষ্ট বার্তা লুকানো ছিল—এক পা-ও এদিক-ওদিক করার উপায় নেই।
বিকেলের দিকে নিক এবং সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো ভিলায় ফিরে আসতেই ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা এক নিমেষে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ভেতরে ঢুকতেই তাঁদের চোখে পড়ল অপমানজনক সেই দৃশ্য—ইসাবেলা উচ্চস্বরে এলেনাকে কটূকথা বলছেন এবং আচমকাই সশব্দে এলেনার গালে একটা কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন!থাপ্পড়ের শব্দে পুরো ঘর যেন থমকে গেল।
—স্টপ ইট, মম! হোয়াট আর ইউ ডুইং?! 
নিকের কণ্ঠে সিংহের মতো গর্জন ফেটে পড়ল। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো।সেবাস্তিয়ানও তীব্র অসন্তোষ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 
—মারলে কেন মেয়েটাকে? ইসাবেলা, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?!
কিন্তু এলেনা... সে একদম শান্ত, নিস্তব্ধ। গালের রক্তিম দাগটার দিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে, চরম অবাক চোখে ইসাবেলার দিকে চেয়ে রইল। কিন্তু সেই স্তব্ধতা ছিল ঝড়ের আগের রূপ।পরমুহূর্তেই এলেনার ভেতর যেন কোনো এক দানব জেগে উঠল। এক হিংস্র আক্রোশে সে ঝাপিয়ে পড়ে সোজাসুজি ইসাবেলার গলা দু-হাতে চেপে ধরল! তার চোখের মনি দুটো যেন হিংস্রতায় ফেটে পড়ছিল।
—কোন সাহসে তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি?! কোন সাহসে?! 
এলেনার গলা দিয়ে যেন মানুষের নয়, অন্য কোনো হিংস্র প্রাণীর হুঙ্কার বের হচ্ছিল।নিক দ্রুত সিঁড়ি ডিঙিয়ে ও পাশ থেকে দৌড়ে এলো। কিন্তু আজ এলেনা যেন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রণযোগ্য! মানসিক আর শারীরিক নির্যাতনের শেষ সীমায় পৌঁছে তার ভেতরের সমস্ত সংযম এক মুহূর্তে ছাই হয়ে গেছে। নিক টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও প্রথম ধাক্কায় তাকে সরাতে পারল না। অমানুষিক শক্তি ভর করেছিল এলেনার শরীরে।
অনেক কষ্টে, পুরো শক্তি প্রয়োগ করে নিক এলেনাকে ইসাবেলার ওপর থেকে টেনে সরাল।কিন্তু এলেনা এখানেই থামল না। সে উন্মাদ হয়ে গেল। ইসাবেলাকে ছাড়তেই সে নিজের গালে নিজে একের পর এক কষে থাপ্পড় মারতে শুরু করল! আঙুলের ধারালো নখ লেগে আর প্রচণ্ড আঘাতে তার গাল কেটে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করতে লাগল, যেন নিজের অস্তিত্বকেই ধূলিসাৎ করে দিতে চায়।
—এলেনা! স্টপ ইট! 
নিক গর্জে উঠে তাকে সামলানোর চেষ্টা করল।অবশেষে কোনো উপায় না দেখে নিক তাকে শক্ত করে ধরে সোজা মেঝের ওপর ফেলে দিল। এলেনার উন্মাদ আঘাত থামাত নিক নিজেই তার ওপর চেপে বসল এবং তার দুটো হাত শক্ত করে ধরে মেঝের দু-পাশে চেপে আটকে রাখল।
এলেনা নিচে শুয়ে হাঁপাচ্ছিল, কাটা গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে মেঝের কাঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর নিক তার বুকের ওপর উঠে দুটো কবজি শক্ত মুষ্টিতে চেপে ধরে তার চোখের দিকে চেয়ে রইল। সেই চোখে ছিল গভীর আতঙ্ক, বিস্ময় আর এক ভয়ঙ্কর নিয়ন্ত্রণের তৃষ্ণা।
এলেনার ধারালো দাঁতগুলো নিকের ঘাড়ের নরম চামড়া ভেদ করে গভীরভাবে বসে গেল। চরম উন্মাদনা আর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সে তার পুরো শক্তি দিয়ে কামড়ে ধরে রইল। রক্তে ভরে উঠল এলেনার মুখ, কিন্তু সে ছাড়ল না। এই কামড়টা শুধু কোনো শারীরিক আক্রমণ ছিল না—এটা ছিল এতদিনের জমে থাকা অত্যাচার, বন্দিদশা আর নিকের পৈশাচিক মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার রক্তাত এক চূলচেরা প্রতিশোধ।
গলার ধমনীর ঠিক পাশেই এলেনার এই হিংস্র কামড়ে নিকের শরীর মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো এক যন্ত্রণাক্ত গর্জন। কিন্তু আশ্চর্য বিষয়, নিক তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল না। গলার অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও সে এলেনার দুটো কবজি আরও শক্ত করে মেঝের সাথে চেপে ধরল।
নিকের ঘাড় থেকে উষ্ণ রক্তের ধারায় এলেনার মুখ ও থুতনি ভেসে যেতে লাগল। নিক মুখ নিচু করে একদম এলেনার কানের কাছে এলো। তার নিজের রক্তে এলেনার গাল ভিজে যাচ্ছিল, আর সেই অবস্থায় নিক এক ভয়ানক, বিকৃত হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে কোনো ব্যথার ছাপ ছিল না, ছিল এক পৈশাচিক তৃপ্তি।
—কামড়ে ধরে রাখো, এলেনা... 
নিকের গলার স্বর রক্তে ভেজা কানের লতির পাশ থেকে খাঁচায় বন্দি পশুর মতো শোনালো। 
—আমাকে শেষ করে দাও! তোমার ভেতরের এই দানবটাকেই তো আমি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। এতদিন তো নিস্তেজ পুতুল হয়ে ছিলে, এবার নিজের আসল রূপটা দেখাও!
ইসাবেলা ভয়ে আর আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে সোফার ওপর পিছিয়ে গেলেন, অন্যদিকে সেবাস্তিয়ান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দৃশ্যটা এতই ভয়ানক আর অবিশ্বাস্য ছিল যে ঘরে থাকা দেহরক্ষীরাও নিকের ইশারা ছাড়া এগোতে পারছিল না।
কয়েক মুহূর্ত পর, এলেনার মুখ থেকে রক্তের তিতা স্বাদ আর নিকের সেই বিকৃত হাসি তার উন্মাদনাকে স্তব্ধ করে দিল। সে বুঝতে পারল, তাকে শারীরিক নির্যাতন করে নিক যে আনন্দ পাচ্ছিল, এলেনাকে তার মতোই এক হিংস্র দানবে রূপান্তর করে সে যেন আরও বেশি তৃপ্তি পাচ্ছে। এলেনা ধীরে ধীরে তার দাঁত আলগা করে দিল।
তার মুখজুড়ে নিকের তাজা রক্ত। নিচে শুয়ে হাঁপাতে থাকা এলেনার চোখের হিংস্রতা ধীরে ধীরে এক গভীর শূন্যতায় বদলে গেল।নিক ধীরপায়ে এলেনার বুকের ওপর থেকে সরে পাশে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটি সাদা রুমাল বের করে সে নিজের রক্তাক্ত ঘাড়ে চেপে ধরল। রুমালটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। কিন্তু নিকের চোখে ব্যথার কোনো চিহ্নই ছিল না; বরং সেখানে জ্বলছিল এক চরম পৈশাচিক বিজয়োল্লাস।
সে এলেনার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—তোমার প্রথম স্প্যানিশ ক্লাস খুব চমৎকার শুরু হলো, লিটল সিস্টার। তুমি শিখলে কীভাবে শিকারি নিজের শিকারকে আঘাত করে। 
নিকের কথা শুনে এলেনা রক্তমাখা মুখে মেঝের ওপর নিথর হয়ে পড়ে রইল। সে বুঝতে পারল, সে নিককে আঘাত করলেও আসলে নিকের বিছানো মানসিক জালেই বারবার জড়িয়ে পড়ছে।
এলেনা মেঝের ওপর স্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইল। তার থুতনি বেয়ে তখনও গড়িয়ে পড়ছে নিকের তাজা রক্ত। ঘরের মধ্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা—শুধুমাত্র এলেনার দ্রুত শ্বাসের শব্দ আর দেয়ালে থাকা পুরোনো ঘড়িটার টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
সেবাস্তিয়ান দ্রুত এগিয়ে এলেন। তিনি নিকের রক্তাক্ত ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে চরম উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
—নিক! তোমার ঘাড়ের অবস্থা খারাপ, মার্কোসকে বলো এখনই ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আসতে!
কিন্তু নিক বাবার কথার কোনো জবাব দিল না। সে রুমাল দিয়ে ঘাড়ে চাপ দিয়ে ধরে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি এলেনার নিথর চেহারার ওপরই আটকে ছিল। ইসাবেলা তখনও ভয়ে ও অপমানে কাঁপছিলেন, গলার কাছে হাত দিয়ে তিনি সিঁড়ির দিকে পিছিয়ে গিয়ে বললেন,
—এই মেয়ে পাগল হয়ে গেছে, সেবাস্তিয়ান! ও একটা বুনো পশুর মতো! ও তোমাকে আর তোমার ছেলেকে যেকোনো দিন খুন করে ফেলবে!
—চুপ করো, ইসাবেলা! 
সেবাস্তিয়ান এবার ধমকে উঠলেন।
—তুমি ওকে আগে আঘাত করেছ বলেই মেয়েটা ভারসাম্য হারিয়েছে!
সেবাস্তিয়ান হাঁটু গেড়ে এলেনার পাশে বসলেন। পরম মমতায় তার রক্তমাখা মুখটা নিজের সুতির রুমাল দিয়ে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
—মা এলেনা... শান্ত হও। ওঠো আমার সাথে।
এলেনা কোনো কথা বলল না। সেবাস্তিয়ান তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করতেই নিক ঠাণ্ডা গলায় বাধা দিল,
—ওর গায়ে হাত দেবেন না, ড্যাড।
সেবাস্তিয়ান নিকের দিকে ফিরে তাকালেন, চোখে রাগ ও বিস্ময়।
—মানে কী, নিক? মেয়েটার চিকিৎসা দরকার!
—চিকিৎসা মার্কোস করবে, 
নিক নিচু কিন্তু আদেশসূচক গলায় বলল।
—ও এখন পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত। আপনি ওকে মাথায় হাত দিলে ও ভাববে আপনি ওর ঢাল। কিন্তু এই ভিলায় আমার সিদ্ধান্তের ওপর কোনো ঢাল কাজ করবে না। এলেনা, সোজা নিজের ঘরে যাও।
এলেনা ধীরে ধীরে মেঝের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল। তার সাদা ড্রেসটায় এখন নিজের ও নিকের রক্তের দাগ লেগে এক বীভৎস রূপ নিয়েছে। সে কিন্তু সেবাস্তিয়ানের দিকে তাকাল না, কিংবা নিকের দিকেও না। এক অদ্ভুত নির্জীব যন্ত্রের মতো সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেল।
সেবাস্তিয়ান হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই ভিলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেছে। নিক তাঁর নিজের ছেলেই বটে, কিন্তু ক্যাস্তিলো পরিবারের এই নতুন প্রধান এখন এক করুণাহীন শয়তানে পরিণত হয়েছে।
নিজের ঘরে ঢুকে এলেনা বাথরুমে গিয়ে বেসিনের আয়নায় নিজেকে দেখল। আয়নায় ভেসে ওঠা চেহারাটা যেন তার নিজের নয়—ঠোঁটের কোণে আর থুতনিতে রক্তের দাগ, গালের ওপর নখের গভীর আঁচড়, আর চোখে এক ভুতুড়ে শূন্যতা। বেসিনের কলটা ছেড়ে দিয়ে সে বরফ-শীতল জল দিয়ে বারবার মুখ ধুতে লাগল। কিন্তু পানির সাথে রক্ত ধুয়ে গেলেও মুখে লেগে থাকা সেই ধাতব তিতা স্বাদ আর নিকের বিষাক্ত হাসির স্মৃতি ধুয়ে মুছে যাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দরজার লকে চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো।
এলেনা তোয়ালে দিয়ে মুখ না মুছেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে মার্কোস, আর তার পেছনেই নিকোলাস।
নিক তার রক্তে ভেজা শার্টটা বদলে একটি কালো শার্ট পরে এসেছে। তার ঘাড়ে একটি সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো। ঘরের ভেতরের আলোটা কমিয়ে দিয়ে নিক মার্কোসকে ইশারা করল। মার্কোস হাতের ফার্স্ট এইড ট্রেইটি টেবিলের ওপর রেখে নিশব্দে বাইরে গিয়ে দরজার পাহাড়ায় দাঁড়াল।
নিক এলেনার একদম সামনে এসে থামল। তার হাতে একটি ছোট কাচের ড্রপার এবং অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম।
—বস, 
নিক একদম নির্ভাবনায় এলেনার বিছানার দিকে নির্দেশ করল।এলেনা সরু চোখে তাকাল,
—ডোন্ট টাচ মি, নিক।
নিকের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা নিষ্ঠুর বাঁকা হাসিটা আবার ফিরে এলো। সে ধীর পায়ে এলেনার গা ঘেঁষে দাঁড়াল, তারপর এক হাত দিয়ে এলেনার কোমর চেপে ধরে এক টানে তাকে বিছানার কানায় বসিয়ে দিল। এলেনা সরে যাওয়ার চেষ্টা করার আগেই নিক তার দুই হাঁটু এলেনার হাঁটু দু-পাশে চেপে ধরে তার নড়াচড়ার পথ বন্ধ করে দিল।
—আমি বলেছিলাম না, এলেনা? 
নিকের কণ্ঠস্বর একেবারে কাছে, তামাকের ঘ্রাণ মিশে থাকা তার নিশ্বাস এলেনার কপালে লাগছে। 
—তোমার শরীরের ওপর তোমার নিজেরও কোনো অধিকার নেই।
নিক এলেনার চিবুকটা শক্ত করে তুলে ধরল। এলেনার কাঁটা গালে যখন সে তুলোয় করে অ্যান্টিসেপ্টিক লাগাতে গেল, জ্বালা করে ওঠার কারণে এলেনা চোখ বুজে তীব্র যন্ত্রণায় একটা ছোট কোঁকানি দিয়ে উঠলো।
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন