#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ০৫
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
🪷🪷🪷
পদ্ম নিজের সাইকেল নিয়ে গ্ৰামের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। আর শামসু জোমাদ্দারের বলে যাওয়া কথাগুলো নিয়ে ভাবছে।
*কাল শহরে থেকে একজন শহুরে মিয়া কে ডেকেছি। তাকে আমি তোমার জমি টা দেখাবো। আমাকে যদি পানির দামেও সেটা বিক্রি করতে হয় না, আমি দুবার ভাববো না।
পদ্মর কানে এগুলো বেজে চলেছে। সত্যিই যদি কেউ ওদের জমি দেখতে এসে থাকে?!..*
আর সত্যি সত্যিই যদি ঐ শামসু জোমাদ্দার ওদের কাছে জমি টা বিক্রি করে দেয়?!.. তাহলে যে ওদের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। ও যে বাবা কে কথা দিয়েছিল, আর আর মাকেও তো ও আশা দিয়েছে যে এই জমিটি ও ছাড়িয়ে আনবেই আনবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই আনমনা হয়ে পদ্ম নিজের সাইকেল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে আরমান নিজের গাড়ি নিয়ে সবে মাত্র গ্ৰামে প্রবেশ করেছে।
“ঐ শহুরে মিয়া কে আমি এমন শিক্ষা দেবো!. আমার জমি কেনা তো দূরের কথা, এই গ্ৰামে ফিরে আসার কথাও আর ভাববে না।..”
পদ্ম মনে মনে এগুলো বলছে। আর এদিকে আরমান গাড়ি নিয়ে কুসুমপুর গ্ৰামের ভিতরের দিকে এগিয়ে আসছে। আরমান আসে পাশে তাকিয়ে দেখছে, গ্ৰাম টা ভীষণ সুন্দর। যেন কল্পনায় আঁকা কোনো ছবির মতন। তবে গ্ৰামের রাস্তাঘাট ঠিক ততটাই শোচনীয়।
“এই কুসুমপুর গ্ৰামটা কি ধরনের?!.. না জিপিএস কাজ করছে, আর না রাস্তার কোনো দিক দিশা পাচ্ছি। আর রাস্তায় কত বড় ছোট গর্ত, এগুলো কি ঠিক করা হয় না?!.. এমন ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ি চলাচল করে কিভাবে?!.. আমিও না কি যে ভাবছি, এটা তো গ্ৰাম , এখানে গাড়ি আসবে কোত্থেকে?!.”
আরমান বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে জিপিএস কাজ করছে কিনা দেখতে লাগল। এদিকে গাড়ির উপর দিক থেকে পদ্ম সাইকেল নিয়ে আনমনে শামসু জোমাদ্দারের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আসছিল। আর তারপর যা যাওয়ার, ঠিক তাই হলো। পদ্ম সাইকেল নিয়ে এসে পড়লো আরমানের গাড়ির উপরে।
আরমান আস্তে আস্তে মাথা টা উঁচু করে দেখলো ওর গাড়ির সামনের কাঁচের উপর একটা মেয়ে পড়ে আছে। ও বুঝতে পারল এই মেয়েটার সাথেই ওর গাড়ির এক্সিডেন্ট হয়েছে। ও সাথে সাথে বলে উঠলো..
“সরি, সরি আমি ঠিক খেয়াল করতে পারিনি। আপনি কি ঠিক আছেন মিস্?!.. আমি.. আমি আসছি, আমি দেখছি।”
এই বলে ও তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। আরমান যেই না গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল..
“সরি সরি মিস!..”
এই বলে গাড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো ওখানে কেউই নেই।
“আরে আজব তো, মেয়েটা তো এক্ষুনি এখানে পড়ে ছিল। কোথায় চলে গেল?!..”
এই বলে আরমান গাড়ির সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর দেখতে পেলো ওখানে একটা সাইকেল পড়ে আছে।
“ম্যাডাম?!.. আপনি কি ঠিক আছেন?..”
আরমান এই বলে গাড়ির চারপাশে তাকিয়ে সাইকেলের মালকিন কে খুঁজতে লাগল। এদিকে পদ্ম আরমান গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার আগেই ওখান থেকে উঠে গাড়ির অন্য পাশে চলে গেছে। এখন পদ্ম আরমানের গাড়ির সাথে ওর সাইকেলের ধাক্কা লেগেছে, এই ভেবে ভয়ে আরমানের থেকে লুকিয়ে আছে।
আর এদিকে আরমানের বেখেয়ালিতে সাইকেলের সাথে ওর গাড়ির ধাক্কা লেগেছে, এই ভেবে সরি বলার জন্য সাইকেলের মালকিন কে খুঁজছে। এভাবে একজন লুকোতে চাইছে, অন্য জন তাকে খুঁজে বের করতে চাইছে। গাড়ির চারপাশে ওদের তিন বার চক্কর কাটা হয়ে গিয়েছে।
“ও আল্লাহ, কার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে দিলাম। এখন কি হবে?!.. লোকটা তো আমাকেই খুঁজে চলেছে। এখান থেকে যেভাবেই হোক আমাকে পালাতে হবে।..”
“ম্যাডাম!.. আপনি কি আছেন?!..”
শেষে পদ্ম আর না পেড়ে আরমানের পেছন থেকে চুপিচুপি এগিয়ে এসে সাইকেল নিয়ে এক ছুটে চলে গিয়েছে। তবে আরমান ততক্ষণাৎ পিছনে ফিরে ওকে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখে নিয়েছে। আরমান ওকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো…
“এই যে মিস্, আপনি ঠিক আছেন?!..”
কিন্তু পদ্ম পিছনে না তাকিয়ে সাইকেল নিয়ে চলে গেল।
“যখন সাইকেল চালিয়ে যেতে পারছে, তারমানে নিশ্চয়ই অতোটা আঘাত লাগেনি। আমি শুধু শুধু এতোটা সময় নষ্ট করলাম। ধ্যাত!!..”
এই বলে আরমান আবার নিজের গাড়িতে উঠে বসলো। আর এদিকে পদ্ম ওখান থেকে বেশ অনেকটা দূরে এসে সাইকেল থামিয়ে দাঁড়ালো। ও দূর থেকে তাকিয়ে দেখলো গাড়ি টা ওখান থেকে ওদের ওদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
“এতো দামি গাড়ি আমাদের গ্ৰামে?!.. এমনটা তো নয় যে ইনিই সেই শহুরে মিয়া?!.. যে আমাদের জমিটা দেখতে এসেছে।..”
পদ্ম বেশ চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগলো।
যদি এটাই শামসু জোমাদ্দারের বলা সেই শহুরে মিয়া হয়ে থাকে?!..
“না না আমি কিছুতেই এই শহুরে মিয়া কে আমার জমির ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেবো না।..”
— — —
এদিকে আরমান আরো বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল। তারপর গাড়ি থামিয়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো। বাহিরে বেরিয়ে এসে দেখলো ওর গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগা সেই সাইকেল টাও এখানেই রাস্তার পাশে রাখা আছে।
“জানিনা কি হচ্ছে?!.. এই সাইকেল টা এখানে কী করে এলো?.. আসে পাশে কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না।..”
এদিকে পদ্ম ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে আরমান ও তার গাড়ি কে লক্ষ্য করছে। আরমান গাড়ি থেকে বেরিয়ে আরো কিছু টা সামনে এগিয়ে গেল।
“এভাবে মাঝ রাস্তায় সাইকেল কে রাখে?!.. এদের কি কোনো কমনসেন্স নেই নাকি?..”
আরমান সাইকেল টার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো। কারণ পদ্মর সাইকেল টা আসলেই রাস্তার মাঝখানে রাখা আছে। আর এমনটা পদ্ম ইচ্ছে করেই করেছে। আরমান কে গাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে যেতে দেখে, পদ্ম চুপিচুপি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো।
তারপর চুপিচুপি আরমানের গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। আর তক্ষুনি আরমানও পিছনে ফিরে তাকালো। পদ্ম তড়িঘড়ি করে গাড়ির পিছনে লুকিয়ে পড়লো।
আরমান আবার সামনে ফিরে গেল। আর সেই সুযোগে পদ্ম আরমানের গাড়ির পিছনের দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসলো। তারপর পিছনের সিটে বসেই সামনে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের কাছ থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে টানাটানি করতে লাগলো। আর তখনই আরমান কিছু ভাবতে ভাবতেই গাড়ির দিকে তাকালো।
আর পদ্ম কে গাড়ির ভিতরে দেখে আরমান হতভম্ব হয়ে গেল। ও দৌড়ে পদ্মর গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আরমান কে দৌড়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখে পদ্ম ঘাবড়ে গেল। এভাবে যে ও ধরা পড়ে যাবে, সেটা তো ভাবতেই পারেনি। ও আরো জোর দিয়ে চাবির রিং টা টানতে লাগলো।
“এইযে খোলো এটা?!.. আর তুমি কে??. আমার গাড়ির ভেতরে কি করছো?!.. বাহিরে বেরিয়ে এসো।…”
আরমান গাড়ির দরজা টানতে টানতে বলে উঠলো। এদিকে পদ্ম তো আরমানের চিৎকার শুনে এবার আরো নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে।
“এই মেয়ে, তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো না??... তুমি আমার গাড়ির ভেতরে কি করছো??!.. আমার গাড়িতে কেনো ঢুকেছো?!...”
পদ্ম এবার দিক বেদিক ভুলে গাড়ির ব্যাক সিট থেকে সামনের ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়লো। এটা দেখে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা আরমান আরও জোরে চিৎকার করে উঠল…
“এই মেয়ে এই?!. কি করছো তুমি?!. আমার গাড়িটা নোংরা করে দিচ্ছো। আরে এই তুমি কি পাগল?.. থামো, আমার গাড়িটা নষ্ট হয়ে যাবে কি করছো তুমি?!..”
আরমান গাড়ির সামনে গিয়ে রাগে কটমট করে চিৎকার করে বলে উঠলো। তবে এতে ভীতু পদ্ম আরো ঘাবড়ে গেল।
“এই মেয়ে তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো না?!.. আরে লক টা খোলো?!.. আমার গাড়ির ভেতরে কি করছো?!..”
আরমান গাড়ির দরজা ধরে টানতে টানতে বলে উঠলো। পদ্ম না জেনে বুঝে গাড়ির বাটন প্রেস করে দরজা লক করে দিয়েছে। তাই আরমান ভিতরেও ঢুকতে পারছে না। পদ্ম আবারো ভুলভাল কিছু বাটন চেপে গাড়ির অন্য পাশের দরজা খুলে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো।
আরমান লক খুলতেই দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। এদিকে পদ্ম তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এসে ওর সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেল। আর তখনই আরমান গাড়ির ড্যাশবোর্ডে তাকিয়ে দেখলো ওর গাড়ির চাবিটা ওখানে নেই। আরমান চমকে উঠে চিৎকার করে উঠল।
“এইইইইই?...!...”
“এই মেয়ে?!.. আমার গাড়ির চাবি নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?!.. আমার চাবি আমাকে দিয়ে যাও বলছি.!...”
কিন্তু পদ্ম আরমানের কোনো কথাই শুনলো না। ও নিজের সাইকেল নিয়ে এগিয়ে চলে যেতে লাগলো। আর যেতে যেতে চিৎকার করে বলল…
“আমি আপনাকে আমার কিচ্ছু নিয়ে যেতে দেবো না। তাই বলছি আপনি ফিরে যান শহুরে মিয়া, এই গ্ৰাম থেকে চলে যান।..”
এই কথা বলতে বলতেই পদ্ম ওখান থেকে অনেক দূরে চলে যায়। আর এদিকে আরমান প্রচন্ড রেগে বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রাগে গজগজ করতে করতে গাড়ির কাছে এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা টা খুললো। তারপর গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের দিকে তাকিয়ে আবার ঠাস করে দরজা টা বন্ধ করে দিল।
“বাহ!. কি সুন্দর ভাবে ওয়েলকাম হলো আমার। এটা তো আমি জীবনে ভুলবো না, কোথায় যে এসে পড়লাম। ধ্যাত, আমার তো মায়ের কথা শোনাই ভালো ছিল। কিন্তু তাহলে তো আমার ডক্টরি লাইফে লাল বাতি জ্বলে যেতো।…”
এই বলে আরমান গাড়িটা থেকে নিজের ছোট্ট ব্যাগটা নিয়ে আর হাতে ফোনটা নিয়ে গাড়ি ওখানেই রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। ফোনের জিপিএস ট্র্যাকিং করে হসপিটালের লোকেশন অনুযায়ী এগিয়ে যেতে লাগলো। তবে এই গ্ৰাম টা যতোটা সুন্দর, গ্ৰামের রাস্তাঘাট আর জিপিএস ততোটাই অকৃতকার্য।
— — —
এদিকে পদ্ম তার সাইকেল নিয়ে ওদের ক্ষেতের পাশে থাকা একচালা ঘরটার কাছে এসে থামল।
“মা..মা..!..”
এই বলে পদ্ম ডাকতে ডাকতে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল। ওর মা বাহিরেই ছিল, তিনি ক্ষেতের মধ্যেই কিছু কাজ শেষ করছিলেন। যাতে তার মেয়ের কষ্ট কিছুটা হলেও কম করতে পারেন।
“কী হয়েছে পদ্ম?!.. এভাবে চিৎকার করছিস কেন?!??.. আজকেও আবার কোথাও থেকে যুদ্ধ করে এলি নাকি?!.. এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন??..”
জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকা পদ্ম কে দেখে ওর মা ওর দিকে এগিয়ে আসলেন।
“হ্যাঁ মা, যুদ্ধের থেকেও কম কিছু না। আর এইযে দেখো এটা হচ্ছে সেটার প্রমাণ। আমাদের জমি রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করে আসলাম।..”
পদ্ম ওর হাতে থাকা চাবিটা মা'কে দেখিয়ে বলে উঠলো।
“আরে মা তুমি বুঝতে পারছ না তো!. কালকে শামসু জোমাদ্দার যে শহুরে মিয়ার কথা বলে গেল!.. এটা সেই শহুরে মিয়ার গাড়ির চাবি, আমি নিয়ে এসেছি।..”
“আরে কি বলছিস!..?.. এটা কি করেছিস তুই?!...”
পদ্মর মা চমকে উঠে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আরে মা তুমি চিন্তা করো না তো। যা করেছি একদম ঠিক করেছি। এই গাড়ির জন্য এখন ও আমাদের জমির দিকে আসতেই পারবে না। তুমি তো জানো না, এক মিনিটের জন্য মনে হচ্ছিল আমার প্রাণটাই বেরিয়ে যাবে। কিন্তু আমিও একজন কৃষকের মেয়ে, কষ্ট করতেও জানি আর তারপর সমাধানটাও জানি। তাই আমি বুদ্ধি করে ওর গাড়ির চাবিটা নিয়ে চলে এসেছি। এবার তো ওনাকে এই গ্ৰাম ছেড়ে যেতেই হবে।..”
“হ্যাঁ তুই খুব বুদ্ধিমতি। সেটা তো বুঝলাম কিন্তু এখন উনি তাহলে গ্ৰাম ছেড়ে যাবে কিভাবে?!.. তুই তো তার গাড়ির চাবিটাই নিয়ে এসেছিস।..”
পদ্মর মা ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো। পদ্ম মায়ের এই কথা শুনে চোরা চোখে মায়ের দিকে তাকালো। আসলেই তো, চাবি তো ওর কাছে রয়েছে।
“তোর এই অতি মাত্রায় চালাকির জন্য যেন আবার কিছু না হয়। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে পদ্ম।..”
পদ্মর মা চিন্তায় অস্থির হয়ে বলে উঠলেন। মেয়েটা উনার কোনো কথাই শোনে না। এমনিতেই উনাদের বিপদের শেষ নেই, তারমধ্যে আবার মেয়েটা কোনো ভবিষ্যৎ চিন্তা না করেই এরকম উল্টো পাল্টা কাজকাম করে আসে।
“এখন চিন্তা তো আমারও হচ্ছে মা। কিন্তু কোন ব্যাপার না, এই জমির আমি কিচ্ছু হতে দেবো না। ও শামসু জোমাদ্দারের হুমকিতেই আমি দমে যাবো না। আর মা চিন্তা করা তো আমার কাজ , তোমার কাজে হচ্ছে ঠিক মতো খাবার খাওয়া আর আমার জন্য দোয়া করা। আমি জানি মা তুমি সকাল থেকে কিচ্ছু খাওনি। চলো চলো এক্ষুনি খাবার খাবে।..”
এই বলে পদ্ম ওর মাকে নিয়ে খাবার খেতে গেল। ওরা মাটিতেই একটা পাটি বিছিয়ে সেখানে মা মেয়ে বসে পড়লো। পদ্ম একটা পেঁয়াজ দু ভাগ করে নিল। তারপর শুকনো রুটি দিয়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে মাকে খাইয়ে দিল। ওর মা মেয়ের এমন যত্ন দেখে একটুখানি হেসে রুটির টুকরো টা মুখে নিলেন। আর পদ্ম একটু রুটি ছিঁড়ে হাতে নিল, এরমধ্যেই পদ্মর মা কেশে উঠলেন।
“কি হলো মা!.. এই এই নাও মা পানি খাও। পানি খাও, আস্তে ধীরে ধীরে খাও।..”
পদ্ম ওর মাকে পানি খাইয়ে দিল। তারপর মন খারাপ করে বললো…
“মা শুকনো রুটি খেলে তোমার কাশিটা বেরে যায়। তাইনা?!..”
“আরে না তুই মন খারাপ করছিস কেন?!.. তেমন কিছু নয় মা।..”
পদ্মর মা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে বলে উঠলো। কিন্তু বুদ্ধিমতি পদ্ম মায়ের কথায় বিশ্বাস করলো না।
“মা তোমার কি মনে হয় আমি কিছু জানি না?!.. তুমি এইজন্যই ডাল রান্না করো না, যাতে সেই টাকা টা দিয়ে আমার ওষুধ কেনা যায়।..”
“আরে এটা শুকনো কোথায়?!.. এতেও তো প্রলেপ আছে না তোর ভালোবাসার, তাও আবার অনেক বেশি।..”
পদ্মর মা মেয়ের গালে টেনে দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠলো। পদ্ম একটুখানি হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল….
“আর যদি তার সাথে ঘি দেওয়া ডাল থাকে, তাহলে অসুবিধা কোথায়?!.. আজ আমি তোমাকে গরম গরম রুটি আর ঘি দিয়ে রান্না করা ডাল খাইয়েই ছাড়বো।…”
“আচ্ছা তাই!!.?!.. তুই কি কোথাও থেকে লটারি পাবি নাকি??!..”
“মা..আমার মা সেই চিন্তা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।..”
এই বলে পদ্ম মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এই মা টা ছাড়া এই ধরণীতে ওর আপন জন বলতে আর কেই বা আছে?!.. মাকে ও রুটি আর গরম গরম ডাল খাওয়াবেই। ইনশাআল্লাহ!.. আল্লাহ ওকে সাহায্য করবেন, তিনি নিশ্চয়ই করবেন।
পদ্ম মাকে জড়িয়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই ওদের গরু ছাগলের খামারের দিকে তাকালো। আর তখনই ও চমকে উঠলো।
এই শহুরে মিয়া আমাদের জমিতে কিভাবে পৌঁছে গেল?!.. আমি তো তার গাড়ির চাবিটা নিয়ে এসেছিলাম। উনাকে আমি আমাদের জমি কিছুতেই নিতে দেবো না। মনে মনে পদ্ম এই ভেবে আতংকিত হয়ে ওদের দিকেই এগিয়ে আসতে থাকা আরমানের দিকে তাকিয়ে রইল।
— — —
আরমান এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে পদ্মদের জমির দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে পদ্ম আরমান কে দেখে ভীষণ চমকে গিয়েছে। ওর মাথায় একটু আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ঘুরেফিরে আসতে লাগলো।
*এই মেয়ে তুমি আমার চাবি নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?!.. আমাকে আমার চাবিটা দিয়ে যাও। আপনাকে এখান থেকে আমার কিচ্ছু নিয়ে যেতে দেবো না। তাই বলছি আপনি ফিরে যান।..*
আরমান কোনো দিকে খেয়াল না করে পদ্মদের জমির পাশেই থাকা টিউবওয়েল থেকে পানি খেতে লাগল। আর পদ্ম সেটা তাকিয়ে দেখতে লাগলো। আরমান পানি খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিল।
পদ্ম ওর মাকে ছেড়ে দিয়ে বলল…
“মা তুমি খাবার খাও, আমি ততক্ষণে আরেকজন কে পানি খাইয়ে আসছি।…”
“আরে তুই এই অসময়ে কোথায় যাচ্ছিস পদ্ম?!...”
“মা তুমি চিন্তা করো না তো। আমি এক্ষুনি আসছি।..”
এই বলে পদ্ম ওখান থেকে উঠে গেল। ওর মা পেছন থেকে ডেকে বললেন…
“আবার উল্টো পাল্টা কিছু করিস না মা।…”
“ঠিক আছে মা, তুমি বেশি চিন্তা করো না তো।…”
পদ্ম এগিয়ে গিয়ে টিউবওয়েলের পাশের ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে আরমান কে ফলো করতে লাগলো। আরমানের ব্যাগটা কলের পাশেই মাটিতে রেখে দেওয়া আছে।
পদ্ম সেটা খেয়াল করে চুপিচুপি সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। পদ্ম ধারনা করছে যে, এই ব্যাগেই জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে। তাই পদ্ম চুপিচুপি এগিয়ে এসে আরমানের পেছন থেকে ব্যাগটা নিয়ে এক দৌড় দিল।
তবে এবার আর আরমানের ধৈর্য কুলালো না। তাই ও নিজেও পদ্ম কে দেখতে পেয়েই এবার ওর পিছনে ছুটতে লাগলো। এই মেয়েটা কে এবার আর আরমানের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ