#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ০৬
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
🪷🪷🪷
পদ্ম ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ক্ষেতের মধ্যে দিয়েই উড়াধুরা দৌড়াতে লাগল। আর আরমান নিজেও ওর পিছনে ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়ালো। পদ্ম দৌড়ে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।
আরমান ওকে আর সামনে দেখতে না পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ওর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, এতোটা শেষ কবে ছুটেছে ও মনে করতে পারছে না। জগিং এ গেলেও বোধহয় এতোটা দৌড় করে না।
পদ্ম একটুখানি জিরিয়ে নিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আরমান কে খুঁজলো। তারপর কোথাও দেখতে না পেয়ে ও গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। আর তারপর যেই না দৌড় দিতে যাবে, ওমনি কোথা থেকে আরমান বেরিয়ে এসে পদ্মর কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে চেপে ধরলো।
পদ্ম যেহেতু দৌড়ের উপরে ছিল, আর আরমান হুট করে ওকে ধরায় কেউই নিজের ভারসাম্য রাখতে পারেনি। যার ফলে ঘুরতে ঘুরতে দুজনেই মাটিতে ধপাস করে পড়লো। তবে আরমানের তুলনায় পদ্ম বেশি ব্যাথা পেল, কারণ পদ্ম একদম নীচে মাটিতে পড়েছে, আর আরমান ওর উপরে পরেছে।
দুজনেই গভীর ভাবে একে অপরের চোখে হারিয়ে গেল। তবে তখনও পদ্ম আরমানের ব্যাগটা শক্ত করে এক হাতে জড়িয়ে ধরে আছে। আরমান ধীর গতিতে পদ্মর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের ব্যাগের দিকে তাকালো।
আরমান পদ্মর দিকে তাকিয়ে ওর উপর থেকে সরে মাটিতে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। আর পদ্ম ছাড়া পেয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু আরমান মাটিতে কাত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই পদ্মর হাতে থাকা ওর ব্যাগের ফিতা টেনে ধরলো।
যার ফলে পদ্ম আর চেয়েও সামনে এগিয়ে যেতে পারলো না। পদ্ম চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকালো। দেখল আরমান আগে থেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তবে আরমানের দৃষ্টি বেশি সুবিধাজনক নয়, মনে হচ্ছে এক্ষুনি পদ্ম কে এক আছার মেরে ভর্তা করে ফেলবে।
“আমি এবার আর তোমাকে কিচ্ছু চুরি করতে দেবো না। ইউ স্টুপিড মেয়ে!.. এভাবে দিনে দুপুরে ডাকাতি করছো।..”
এই বলে আরমান উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক ঝাড়তে লাগলো। এই বলে আরমান নিজের ব্যাগটা ধরে টানতে লাগলো। কিন্তু পদ্ম ছাড়তে চাইছিল না, তবে ওকে চোর বলায় পদ্ম ব্যাগটা ছেড়ে দিল।
আরমান ব্যাগটা নিজের কাছে নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে নিল। পদ্ম মুখটা ছোট করে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি চোর না। একদম উল্টো পাল্টা কথা বলবেন না।..”
আরমান একটুখানি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল…
“প্রতিটা চোর ও একই কথা বলে।..”
“কতোটা মিথ্যুক আপনি?!..সব মিথ্যাবাদীরা এরকমই বলে।”
পদ্ম ভেংচি কেটে বলে উঠলো। আরমান একটুখানি হেসে বলল…
“কি আশ্চর্য, আমার কথা আবার আমাকেই ফেরত দিচ্ছো?!.. আমার চোখের সামনে তুমি আমার গাড়ির চাবি নিয়ে পালিয়ে এলে। আবার এক্ষুনি আমার ব্যাগ নিয়ে দৌড় মেরেছো। আর বলছো যে তুমি চোর নও?!..”
“হ্যাঁ আমি চোর না। আপনি নিজেই একটা চোর শহুরে মিয়া। কারণ আপনি এখানে যেটা কিনতে এসেছেন, সেটা অন্যদের। যে জমির উপর দিয়ে আপনি হেঁটে এসেছেন, সেটা আমাদের জমি। আর যেই টিউবওয়েল দিয়ে আপনি পানি খেয়েছেন , সেটা আমাদের টিউবওয়েল।..”
“থ্যাংক গড তুমি এটা বলনি যে এই হাওয়া বাতাস, এই রোদ সবকিছু তোমাদের।..”
আরমান তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলো। পদ্ম এতে বেশ রেগে গেল। ও রাগে নাক ফুলিয়ে বলে উঠলো…
“আরে অদ্ভুত মানুষ তো আপনি!.. আমি এখানে আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, আর আপনি উল্টে আমার উপরেই চোটপাট দেখাচ্ছেন?!..”
তারপর পদ্ম নাকমুখ কুঁচকে আরমানের দিকে তাকালো।
“এক নম্বরের অহংকারী মানুষ আপনি। আপনাদের শহুরে মানুষেরা বুঝি এমনই অহংকারী হয়ে থাকেন!..”
“এই একদম ফালতু কথা বলবে না। আমি অহংকারী নই, বরং তুমি একটা ঝগরুটে মেয়ে।..”
আরমান বিরক্ত হয়ে কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো।
“ওও আচ্ছা, এবার বুঝতে পেরেছি। দাঁড়াও, ওয়েট…!..”
এই বলে আরমান প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে নিজের মানিব্যাগ বের করলো। তারপর কয়েকটি হাজার টাকার নোট পদ্মর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল…
“এই নাও ধরো। তোমার ক্ষেতের উপর দিয়ে হেঁটে আসার জন্য। আর তোমার টিউবওয়েল থেকে পানি খাওয়ার জন্য।…”
“আরেহ, আপনার বেশি টাকা আছে বলে আমাকে আপনি টাকার গরম দেখাচ্ছেন?!...”
পদ্ম আরমানের বাড়িয়ে দেওয়া টাকা টা দেখে ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো। আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল…
“আচ্ছা এখন আমি তোমাকে টাকার গরম দেখাচ্ছি?!.. আর এতোক্ষণ ধরে যে তুমি তোমার ক্ষেত আর টিউবওয়েল এর জন্য বড়াই করে আমাকে কথা শোনাচ্ছিলে?!.. সেটা?!.. যা দেবে তেমনটাই তো ফেরত পাবে। আর দেখো তোমার জন্য আমার সারা পোশাকে কাঁদা মাটি লেগে গিয়েছে। ইয়াক!..ছিহহহ।… ”
“ইয়াক ছিহহহ মানে?!.. আপনি এমন করছেন যেন আপনার পোশাকে মানুষের মলমুত্র লেগে গিয়েছে। আর শুনুন, আমাদের মতো কৃষক রা এই মাটিতেই দিন রাত অবিরাম পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করে। আর তারপরেই আপনাদের মতো শহুরে মিয়া রা খেতে পান। তাই খবরদার এভাবে ছিহহ করবেন না।…”
পদ্ম নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে উঠলো। আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পদ্মর কথাগুলো শুনলো। আসলেই মেয়েটা বড় অদ্ভুত, ও কি বললো আর এই মেয়ে সেটাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেল।
“আর আপনি বললেন না, যে যা দেবো তাই ফেরত পাবো। এই নিন আপনার টাকা, এগুলো দিয়ে আপনার নষ্ট হয়ে যাওয়া পোশাক ঠিক করে নিবেন। আর পারলে আপনার এমন মন মানসিকতা টাও পাল্টে নিবেন। আর এই নিন আপনার গাড়ির চাবি, আমি চোর নই তবে চাবিটা কেন নিয়েছিলাম?.. যাতে আপনি এই গ্ৰাম থেকে চলে যান। আমার জমির আসে পাশেও যেন আপনাকে না দেখি অহংকারী লোক।..”
এই বলে পদ্ম আরমান কে মুখ ঝামটা মেরে ওখান থেকে চলে গেল। আর বেচারা আরমান পদ্মর বলা কোনো কথাই ঠিকঠাক করে বুঝতে পারলো না। ও বোকার মত দাঁড়িয়ে পদ্মর যাওয়া দেখল।
— — —
এদিকে আরিনা ও তার বান্ধবী নিরা দু'জন সোফায় বসে আড্ডা দিচ্ছে।
“রামু কাকা, আমাদের জন্য দুটো কফি নিয়ে এসো।..”
আরিনা ওদের বাড়ির কেয়ারটেকার রামু কাকা কে ডেকে বলে উঠলো। তারপর ওর সামনের সোফায় বসে থাকা নিরার দিকে তাকিয়ে বলল…
“এই নিরা, তোর বিয়ের জন্য কিছু ছেলেদের ফটো দেওয়া হয়েছিল না?!.. তাদের কাউকে পছন্দ হলো তোর?!..”
এই বলে আরিনা ফোন টেপায় মনযোগ দিল। নিরা ওর সাইড ব্যাগ থেকে একটা ফটো হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বলল…
“হ্যাঁ একজন কে পছন্দ হয়েছে । আর ও একজন ডক্টর, কিন্তু কি যে হ্যান্ডসাম রেএএএ। তুই দেখবি?!..”
“হ্যাঁ কেন দেখবো না। তুই পছন্দ করেছিস বলে কথা, দেখা তো দেখি।..”
এই বলে আরিনা আগ্ৰহ নিয়ে নিরার দিকে তাকালো। নিরা খুশি হয়ে হাতের থাকা ফটো টা ওর দিকে ঘুরিয়ে ধরলো। কিন্তু …
“দেখ কি হ্যান্ডসাম দেখতে, ইস এর সাথে যদি বিয়েটা কোনোরকম হয়ে যায়। খুব দারুণ হবে তাইনা বল দোস্ত?!...”
কিন্তু আরিনা তো ফটো টা দেখেই থম মেরে গিয়েছে। তবে নিরা সেটা খেয়াল না করেই গড়গড় করে বলেই যাচ্ছে তো বলেই যাচ্ছে।
আরিনার মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। ও সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েই হাতে থাকা কফি টা নিরার দিকে ছুড়ে মারলো । তবে কফিটা মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা হওয়ায় নিরার তেমন কিছু হয়নি। নিরা চমকে উঠে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।
“কি করলি এটা?!.. আরিনা তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?!..”
“সেটা তো আমার তোকে জিজ্ঞেস করার কথা। আরমান আর আমি রিলেশনে আছি। আর ক'দিন পরে ওর সাথে আমার বিয়ে হবে।..”
নিরা আরিনার এমন কথা শুনে মুখটা নামিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। আরিনা এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধ চেপে ধরে বলল…
“একটা কথা ভালো করে শুনে রাখ, আরমান হচ্ছে আমার জীবন। আর ওর জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। আই সেইট, আই মিন ইট!.. এখন যা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।…”
নিরা মন খারাপ করে মাথা নিচু করে ওখান থেকে চলে গেল।
— — —
এদিকে কুসুমপুর গ্ৰামের ভিতরে হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছে। আজকে যে গ্ৰামে রেশন দেওয়া হচ্ছে। সবাই সেখানে রেশনের আশায় সিরিয়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মধ্যে পদ্ম নিজেও রয়েছে।
গ্ৰামের স্কুলের পাশেই একটা মাঠে চাল ডাল তেলের রেশন দেওয়া হচ্ছে। পদ্ম নিজেও সেখানে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছে।
“আমার সিরিয়াল কখন আসবে?. না জানি আমার সিরিয়াল আসতে আসতে এই রেশনই শেষ হয়ে যায়। মাকে আমি বলে এসেছি যে আজ গরম গরম ডাল দিয়ে রুটি খাওয়াবো।..”
অবশেষে কিছুক্ষণ পরেই পদ্মর সিরিয়াল আসলো। পদ্ম কার্ড দেখিয়ে রেশন নিয়ে নিল, ও রেশন পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে। এবার মাকে বলা কথা রাখতে পারবে। আজ হয়তো মা পেট ভরে খেতে পারবেন। কিন্তু…
কিন্তু পদ্মর এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ও রেশনের ব্যাগটা নিয়ে যেই না ওখান থেকে চলে আসবে। ওমনি লাল পাড়ের কালো রঙের শাড়ি পরে থাকা শামসু জোমাদ্দারের চ্যালাদের মধ্যে এক মহিলা রেশনের ব্যাগটা টেনে নিয়ে নিল।
“কোনো রেশন পাবি না তুই। দে এটা আমাকে।..”
“আরে কি করছেন, ছাড়ুন এটা। আমার রেশন আমি কেন নিতে পারবো না??!... এটা আমার অধিকার।..”
“কোনো অধিকার নেই তোর, ছাড় এটা। চল তোকে জমিদার মশাই ডেকেছে, চল আমার সাথে।..”
এই বলে সেই মহিলা পদ্ম কে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
“আরে কি করছেন?!.. ছাড়ুন আমাকে, আমি কি ভুল করেছি?!..”
কিন্তু পদ্মর কথা সেই মহিলা শুনলো না। তিনি জোর জবরদস্তি করে পদ্ম কে টেনে জমিদারের বিচার সভায় নিয়ে যেতে লাগল।
— — —
এদিকে আরমান সবে মাত্র ওর পোস্টিং হওয়া কাঙ্ক্ষিত সেই হসপিটাল টা খুঁজে পেয়েছে। আরমান হসপিটালের ভিতরে প্রবেশ করলো। এটা হসপিটাল কম ওর কাছে কোনো স্টোর রুমের থেকে কম কিছু লাগছেনা।
ও একটা রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলো বালি তে কাশতে কাশতে ওর নাজেহাল অবস্থা। আর দরজাগুলোও জং ধরে আছে, খুলতে বেশ ঝামেলা হয়েছে। এটা যে কত মাস ধরে বন্ধ পড়ে আছে, সেটা আর বোঝার বাদ রাখে না।
আরমান নিজের পোশাক ও হাত পা থেকে ধুলো বালি ঝাড়তে লাগলো। আর তখনই ওর পদ্মর তখনকার বলা কথাগুলো মনে পড়লো। আরমান একটুখানি হেসে বলল…
“এই গ্ৰামটা, আর এখানকার মানুষজন সবকিছুই বেশ অদ্ভুত।..”
তারপর ও নিজের ব্যাগটা খুলে একটা বেঞ্চের উপর রেখে দিল। আর তারপর ধুলো বালিতে মাখামাখি হয়ে থাকা চেয়ার টেবিল গুলো দেখতে লাগলো। কিভাবে কি করা যায়?!.. ওকে তো এখন থেকে আগামী এক মাস এখানেই থাকতে হবে।
এদিকে হসপিটালের এক কোনা থেকে লাল শার্ট ও কালো পায়জামা পড়া লোক আরমানের উপর নজর রাখছে। তারপর সে কাউকে ফোন করে বলল…
“হ্যাঁ ভাই, ডাক্তার ক্লিনিকে পৌঁছে গিয়েছে।..”
লোকটার পোশাক ও কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে যে তিনিও শামসু জোমাদ্দারের লোক।
— — —
“ছাড়ো আমাকে, দয়া করে ছেড়ে দাও।..”
পদ্ম করুণ গলায় বলে উঠলো। কিন্তু সেই মহিলার মন গললো না। তিনি পদ্ম কে বিচার সভায় নিয়ে সবার মাঝখানে ছুড়ে ফেলে দিলেন।
সেখানেই সবার সামনে চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে এই গ্ৰামের জমিদার মশাই। তিনি গম্ভীর দৃষ্টিতে পদ্মর দিকে তাকিয়ে আছেন। পদ্ম জমিদারের দিকে তাকাতে গিয়ে জমিদারের পিছনে দেয়ালে বর বউ সাজানো ছবি গুলোর দিকে ওর চোখ পড়লো। আর সেখানে বরের ছবিটা দেখে পদ্ম চমকে উঠলো।
“আরে এটা তো ঐ শহুরে মিয়ার ছবি। যাকে সকালে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তাহলে উনার ছবি এখানে লাগানো হয়েছে কেন??!...”
পদ্ম এবার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো। আর তখনই সেখানে শামসু জোমাদ্দার এগিয়ে এলো। তিনি এই গ্ৰামের জমিদার পুত্র। পদ্ম এবার আরও ভয় পেতে লাগলো।
“কি হয়েছে খুকুমণি?!.. এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো?!.. তুমি যেন জানোই না যে তোমাকে আজকে এই বিচার সভায় কেন নিয়ে আসা হয়েছে। গ্ৰামে এতো কষ্ট করে একজন ডাক্তার এনেছি। তুমি তার গাড়ির চাবি নিয়ে ফুররর করে উড়ে গেলে। যাকে তুমি তাড়ানোর জন্য সকল চেষ্টা করেছো।..”
শামসু জোমাদ্দার জমিদারের চেয়ারের সাথে ঠেস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সভায় উপস্থিত থাকা গ্ৰামের গন্নমান্ন ব্যাক্তি, গ্ৰামের লোকজন সবাই পদ্মর দিকে ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
“ডাক্তার?!.. তারমানে ঐ শহুরে মিয়া আমাদের জমি কেনার জন্য আসেনি। উনি আমাদের গ্ৰামের নতুন ডাক্তার ছিলেন?!..”
মনে মনে পদ্ম এটা বুঝতে পেরেই আরো ঘাবড়ে গেল। এরমধ্যেই শামসু জোমাদ্দার হেঁটে হেঁটে ওর কাছে এসে থামল। পদ্ম নীচে মাটিতে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে। আর শামসু জোমাদ্দারও ঠিক ওর কাছে গিয়ে পায়ে ভর দিয়ে বসে পড়লো। পদ্ম গুন্ডা শামসু জোমাদ্দার কে নিজের এতো কাছে দেখে ভীষণ ভয় পাচ্ছে।
“এই ডাক্তার এখন আমাদের গ্ৰামের নতুন জামাই হবে। আর তাকে তুমি তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছো, বুঝলে?!...”
এই বলে শামসু জোমাদ্দার পদ্মর সামনে থেকে উঠে দাঁড়ালো।
গ্ৰামের বাকি সব পুরুষ মহিলারা পদ্ম কে কথা শোনাতে লাগলো। যেন তাদের হাতে পদ্ম কে ছেড়ে দিলে তারা এক্ষুনি ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এর প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত।
“ও কঠিন অন্যায় করেছে, ওর শাস্তি হওয়া দরকার।..”
“ও এভাবেই মেয়েদের বিয়ে আটকে দিতে চায়।..”
“হ্যাঁ হ্যাঁ ও অন্যায় করেছে ওকে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। আর তবেই ওর শিক্ষা হবে।..”
পদ্ম এবার উঠে দাঁড়িয়ে গেল। আর তারপর বলতে লাগলো যে …
“না না আমি মানছি যে আমি ভুল করেছি। কিন্তু আমি যা করেছি তা না জেনে করেছি। কিন্তু আমার ভুলের জন্য একটা ভালো কাজ তো হয়েছে। আপনারা এটা কি করতে যাচ্ছিলেন?!.. এতো বছর পরে আমাদের এই গ্ৰামে একটা ডাক্তার এসেছিলেন। তাই ছোট খাটো অসুস্থতার কারণে আমাদের শহরে যাওয়ার দরকার হতো না। কিন্তু আপনারা ওনাকেও ধরে বেঁধে জামাই বানানোর মতলব করছিলেন। যদি ডাক্তার সাহেব আমাদের গ্ৰামে থাকতেন , তবে একশতটা জীবন বাঁচতো। কিন্তু যাই হোক, যেহেতু আমার ভুলের কারণে চলে গিয়ে ডাক্তার সাহেব আর ও অভাগীর প্রাণ টা তো বাঁচলো।..”
পদ্ম এই কথা বলে শেষ করতে না করতেই ওর গালে কষে একটা চড় পড়লো। চড়ের তীব্রতায় পদ্মর মুখ অন্যদিকে ফিরে গেল।
ওখানে থাকা গ্ৰামের মহিলাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে পদ্ম কে প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে চড় মেরে দিয়েছে। এতোক্ষণ নিজেকে সামলে নিলেও এবার আর পদ্ম কান্না আটকাতে পারলো না। ওর ব্যাথার চেয়েও লজ্জায় বেশি কান্না পাচ্ছে। এখানে এই ভরা মজলিসে এতো গুলো মানুষের সামনে ওকে চড় মারা হলো। এটা ওর জন্য কতটা লজ্জার বিষয়।
“আরে চাচী, যা হওয়ার হয়ে গেছে তো। তুমি এখন যাও তো, পিছনে গিয়ে দাঁড়াও।..”
এই বলে শামসু জোমাদ্দার ঐ মহিলা কে ওখান থেকে সরিয়ে দিল।
“দেখুন আমরা আসলে গরীবদের সাহায্য করার জন্যই ধরে বেঁধে বিয়ে দিই। আমাদের তো একটাই ইচ্ছে শুধু, যাতে গ্ৰামের গরীব ঘরের মেয়েদের কে যে করেই হোক বিয়ে দেওয়া। আচ্ছা আপনারাই বলুন তো যৌতুক দেওয়া ছাড়া কি গ্ৰামের গরীব মেয়েদের বিয়ে দেওয়া সম্ভব?!.. পসিবল হবে এটা কখনো?!..”
শামসু জোমাদ্দার সবার মাঝে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলো। আর ওখানে থাকা গ্ৰামের সবাইই বলে উঠলো এমনটা কখনো সম্ভব নয়। তারপর শামসু জোমাদ্দার আবার বলতে শুরু করল…
“হ্যাঁ আমিও জানি এটা কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু আপনারা চিন্তা করবেন না, এই গ্ৰামের জমিদার আছেন, আমি আছি , মেয়েদের বিয়ে ঠিক দিয়েই ছাড়বো। আর সুখবর এই যে ডাক্তার এই গ্ৰাম ছেড়ে কোথাও যায়নি। কোথাও পালিয়ে যাননি, উনি নিজের ক্লিনিকে পৌঁছে গেছে।…”
শামসু জোমাদ্দারের এই কথা শুনে সবাই খুশি হয়ে চিল্লাতে লাগলো। কিন্তু পদ্মর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আবার একটা ধরে বেঁধে জোর জবরদস্তি করে বিয়ে হবে?!?...
“আর খুব তাড়াতাড়ি কোন গরীব পরিবারের মেয়ে জামাইও হবেন। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।..”
শামসু জোমাদ্দারের এই কথা শুনে গ্ৰামের সবাই খুশি হয়ে তাদের প্রশংসা করতে লাগলো। সবাই এমন উপকারের জন্য জমিদার ও শামসু জোমাদ্দার কে প্রাণঢালা ধন্যবাদ দিতে লাগলো।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ