ফন্ট সাইজ:
থিম:
পদ্মপাতা

১৯তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#পদ্মপাতা~🪷

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ১৯

🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

🪷🪷🪷

গাড়ি থামতেই যেন পুরো জমিদার বাড়িটা এক মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস চেপে ধরল।

প্রথমে কেউ কথা বলল না।

তারপর—

“আরমান বাবা…?.?..”

জমিদার বাড়ির বৃদ্ধ মালী হারুন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নামটা উচ্চারণ করতেই উঠোনে একটা গুঞ্জন বয়ে গেল।

লোকটা বিশ্বাস করতে পারছে না তাই চোখ কচলাচ্ছে বারবার।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের নারীরা ফিসফিস শুরু করল—

“এই তো সেই ছোট্ট আরমান!..”

“ হ্যাঁ রে একদম বাবার মতো মুখ!..”

“আল্লাহ, ছেলে টা কত বড় হয়ে গেছে!..”

বারান্দার কোণ থেকে আরমানের দাদা মশাই, এই গ্ৰামের জমিদার সৈয়দ আশরাফুল আলমের কড়া চোখ এসে থামল আরমানের মুখে।

ওই দৃষ্টি উষ্ণ নয়, ঠান্ডাও নয়—

ওটা হিসাবি।

যেন বহু বছর আগে লেখা কোনো অধ্যায় হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

দাদার ভ্রু সামান্য নড়ল মাত্র।

এইটুকুই তার রিএকশন।

কিন্তু বাড়ির সবাই জানে—এই নড়াচড়ার মানে গভীর।

ঠিক তখনই—

পদ্ম গাড়ি থেকে নামল।

আর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যটা পাল্টে গেল।

নারীদের চোখ বড় হলো।

কেউ কেউ অবাক, কেউ কৌতূহলী, কেউ আবার সরাসরি সন্দেহে ভরা।

একজন ফিসফিস করে বলল,

“এই মেয়ে?..”

আরেকজন চাপা স্বরে,

“শহরের বউ নাকি?..?.. কিন্তু দেখে তো গ্ৰামের মনে হচ্ছে।…”

পদ্ম এক মুহূর্ত থমকে গেল।

এত চোখ, এত ওজন—সে কখনো কাঁধে নেয়নি।

আরমান তখন অল্প করে এগিয়ে এসে পদ্মর পাশে দাঁড়াল।

শব্দ না করেই নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দিল—

এই মেয়ে আমার।

এই দৃশ্যটা দাদা মশাই দেখলেন।

চোখ সরালেন না।

তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক রেখা ফুটে উঠল—রাগ না হাসি, বোঝা গেল না। বাড়ির ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন—

আরমানের দাদী আম্মা।

তিনি এগিয়ে এসে পদ্মর দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন,

“ভিতরে এসো মেয়ে।”

এই এক লাইনে জমে থাকা টানটা একটু ঢিলে হলো।

কিন্তু নিশিন্দীপুরের জমিদার বাড়ি জানে—

এই আগমন সহজ নয়।

এই দুইজনের আসা মানেই

পুরনো হিসাব খুলে যাবে।

চুপচাপ, একে একে।

আরমান চোখ তুলে বাড়িটার দিকে তাকাল।

মনে মনে বলল—

“আমি ফিরে এসেছি। এবার পালা তোমাদের।”

— — —

জমিদার বাড়ির ভেতরের বড় বৈঠকখানা—

উঁচু ছাদ, মোটা কাঠের বিম, দেয়ালে ঝুলছে পুরনো ছবি।

সব ছবির চোখ এক জায়গায় আরমান।

আরমান চেয়ারে বসেনি।

দাঁড়িয়েই আছে।

যেন সে এখনো এই বাড়ির অংশ কিনা সেটা নিজেই বুঝে নিচ্ছে।

দাদা ধীরে ধীরে সামনে এল।

গলা ভারী, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত।

“ফিরলে ডাক্তার হয়ে… ভালো।”

একটু থেমে যোগ করল,

“কিন্তু বিয়ে করে ফিরলি—তা আশা করিনি। তা বাকিরা জানে তো বিয়ের খবর?!..”

হলঘরে নিস্তব্ধতা।

আরমান শান্ত কণ্ঠে বলল,

“বিয়েটা পরিকল্পনায় ছিল না।..”

এই কথায় দাদার চোখ এবার পদ্মর দিকে গেল।

পদ্ম মাথা নিচু করে আছে।

কিন্তু কাঁধ শক্ত।

“এই মেয়েই?..?..”

শুধু এইটুকু প্রশ্ন।

আরমান এক কদম এগিয়ে এসে বলল,

“হ্যাঁ!..”

এক শব্দে, এক সিদ্ধান্তে।

দাদা মশাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

তারপর ধীরে বলল,

“নিশিন্দীপুরের বউ হওয়া সহজ না। আর জমিদার বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্যতা সবার থাকে না।..”

এই কথাটা আশীর্বাদ না—

সতর্কবার্তা।

পিছন থেকে দাদী আম্মা পদ্মর হাত ধরে বললেন,

“ভয় পেও না মেয়ে… এই বাড়িটা বড়, কিন্তু সবার মন সবসময় বড় হয় না।”

পদ্ম এই প্রথম মাথা তুলে তাকাল।

এই বাড়ি তাকে বউ হিসাবে গ্রহণ করবে কি না—

সেটা এখনো অজানা।

— — —

“আচ্ছা যা হয়েছে হয়েছে, এটা নিয়ে সবার সামনে বসে কথা হবে। এখন ওদের কে অন্দরমহলের ভেতরে নিয়ে যাও।‌…”

এই বলে দাদা মশাই হলঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর দাদী আলেয়া বেগম পদ্ম ও আরমান কে অন্দরমহলের ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলো।

“আমি আমার কামরা চিনি। তাই বুড়ি তোমাকে আমায় নিয়ে যেতে হবে না। এমনিতেই মাথা টা প্রচন্ড গরম হয়ে আছে। তাই খবরদার ওকে কোনো উল্টো পাল্টা কিছু বলবে না।..”

এই কথা বলে আরমান আগে আগে ভেতরে ঢুকে দোতলায় নিজের ঘরে ঢুকে পড়লো। আর পদ্ম আলেয়া বেগমের সাথে কথা বলতে বলতে আসছে।

“তা মেয়ে ও গ্ৰামে তো ধরে বেঁধে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। শুনেছি কুসুমপুর গ্ৰাম এই লাইগ্যা ম্যালা পরিচিত। তোমাদেরও কি জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে?!..”

“না দাদী, আমি তো জানি যে উনি নিজ ইচ্ছায় আমাকে বিয়ে করতে প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এখন উনার অদ্ভুত ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে আমার জানায় কোন ভুল হচ্ছে।..”

কথা বলতে বলতে ওরা দুজনে দোতলায় উঠে এসেছে। আর তারপর পদ্ম কে নিয়ে আরমানের জন্য প্রস্তুত থাকা বিশাল এক কামরায় ঢুকে পড়লো। আরমান তখন লাগোয়া গোসল খানায় ঢুকেছে। পদ্ম এই প্রথম এতো বড় কামরা দেখছে, আর এখানে সবকিছু খুব সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা ।

“এভাবে কি দেখছো মেয়ে তোমার সোয়ামি কিন্তু খুব অগোছালো থাকে। এগুলো সব আমার বড় নাতনি রাইমা গুছিয়ে রাখতো। নাতি আমার বেশ কয়েক বছর পর এখানে এসেছে। কিন্তু সাথে করে যে ঘরনি নিয়ে আসবে, এটা তো অবিশ্বাস্য ঘটনা।..”

পদ্ম চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ির কথাগুলো শুনছে।

“তবে উনার কামরা অন্য মেয়ে কেনো গুছিয়ে রাখতো?!.. এতো বড় জমিদার বাড়ি, এখানে কী কাজের মেয়ে নেই?!.. থাক হয়তো বড় ভাইয়ের কামরা বোন যত্ন করে গুছিয়ে রাখতো। কিন্তু ওরা তো আপন ভাই-বোন নয়। ধুর ধুর আমি এসেই এসব কি ভাবছি।…”

পদ্ম মনে মনে এসব ভাবছিল, আর স্বামীর জন্য হিংসা হচ্ছিল ঐ মেয়েটাকে নিয়ে।

“আরে মেয়ে কথা বলছো না কেন?!. তখন থেকে তো আমি একাই কথা বলে যাচ্ছি। তুমি কম কথা বলো নাকি?!. তাহলে তো মিললো না, আমার নাতিও তো চুপচাপ স্বভাবের। আর তুমিও যদি কম কথা বলো তাহলে তো হবে না। থাক আমার সাথে থাকতে থাকতে তুমি এমনিতেই প্যানাপ্যানি করতে শিখে যাবে।…”

পদ্ম এবার আর চুপ করে থাকতে পারে না। আসলেই বুড়ি এতো পরিমাণ কথা বলতে পারে । আর তারউপর শুদ্ধ অশুদ্ধ সব মিলিয়ে ফেলছে?!..

“দাদী কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?!...”

“আরে একটা কেন অনেক কথা বলো। দেখো মেয়ে বলে কি ?!. বলো কি বলবে।…”

“এই প্যানাপ্যানি টা কি জিনিস?!.

আর আপনি একবার শুদ্ধ করে কথা বলছেন তো একবার গ্ৰাম্য ভাষায় বলছেন।…”

“ওটা এই বুড়ির মুদ্রা দোষ। এক লাইন শুদ্ধ করে পরের লাইন খাটি বাঙ্গালী বলবে। এখনো সেই অভ্যাস যায়নি তোমার বুড়ি?!.”

আরমান গোসল খানা থেকে বেরিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলে উঠলো। এদিকে আরমান কে এমন খোলামেলা অবস্থায় দেখে পদ্মর নাক মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে।

“লোকটার লজ্জা শরম নাই নাকি?!? এভাবে অর্ধনগ্ন হয়ে দু দুটো মেয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমার কপালে শেষমেষ এক এই জিনিস জুটলো?!....”

মনে মনে পদ্ম এগুলো বলে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না না বললো। আর আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কাহিনী দেখছিল।‌

“এই মেয়ে তোমার কি সমস্যা?!. এমন অদ্ভুত বিহ্যেব করছো কেন??..”

পদ্ম আরমানের কথা শুনে চমকে উঠলো। আর তারপর দেখলো দাদী আর আরমান ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।‌

“আরে না কিছু না কিছু না। আসলে আপনি এভাবে অর্ধনগ্ন হয়ে দু দুটো মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।..”

“দু দুটো মেয়ে?!.. তা কোথায় দুটো মেয়ে?!.. আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।..”

“কেন এইযে আমি আর দাদী। আমাদের দেখে কি আপনার ছেলে মনে হচ্ছে?!..”

পদ্ম নাক মুখ ফুলিয়ে আরমান কে জিজ্ঞেস করল।

“ওও আচ্ছা। এই বুড়ি কে তোমার মেয়ে মনে হচ্ছে?!..”

“কেন দাদী বুড়ি হয়ে গেছে বলে কি আর মেয়ে নেই?!.. ছেলে হয়ে গেছে?!.”

দাদী ওদের ঝগড়া দেখে বেশ মজা পাচ্ছেন। আর আরমান কপালে হাত রেখে পদ্মর দিকে তাকালো। মানে এ কে ?!. কি বলছে ও আর এ কি বুঝাতে চাইছে?!.

“আমি বলছি বুড়ির আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তাই ঐ বুড়ির সামনে এভাবে থাকতে আমার একটুও লজ্জা লাগছে না। আর আমার নীচে এখনো তোয়ালে জড়িয়ে রেখেছি। সো এখানে লজ্জা পাওয়ার কি আছে?!.. তুমি কি কিছু দেখেছো?!. দ্যাখোনি, তাহলে আমি লজ্জা পাবো কেন?!.. আর ওটা মেয়েদের ভূষণ বুঝলে। এখন সরো আমার সামনে থেকে।…”

“হ্যাঁ রে আরমান তুই কবে থেকে এতো কথা বলতে শিখলি?!..”

“এই বুড়ি একদম মেজাজ খারাপ করার মতো কথা বলবে না। এমনিতেই কিন্তু মটকা গরম হয়ে আছে। আমার আসলে এখানে আসাই ভুল হয়েছে।…”

“তা এতো মেজাজ কেন?!.. নতুন বিয়ে হয়েছে, এমন সুন্দরী টসটসে একখানা বউ পাইছো। তাও তোর মটকা গরম কেন?!...”

“বউয়ের গুষ্টির তুষ্টি করি। আমার গলায় জোর করে এই মেয়ে কে ঝুলিয়ে দিয়েছে। আরে আমি কি ওখানে বিয়ে করতে গেছি নাকি হ্যাঁ?!..”

পদ্ম আরমানের কথায় চমকে উঠে এগিয়ে আসলো।

“এই এই একদম ফালতু কথা বলবেন না। জোর করে ঝুলিয়ে দিয়েছে মানে?!.. আপনিই বলেননি যে আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান।…”

“আরে ওটা তো আমি তোমাকে ঐ শালা কোপা শামসুর থেকে বাঁচানোর জন্য বলেছিলাম। আর সেটা মেনে তোমার পরিবার জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল। আর তোমাকে আমি মালার সাথে চিরকুট দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো আমার মতো সুন্দর হ্যান্ডসাম ছেলে থেকে লাফিয়ে পড়ে বিয়ে করে নিয়েছো।…”

“কিন্তু আমি তো কোনো চিরকুট পাইনি। আর মা আমার সাথে এতো বড় প্রতারণা করতে পারলো?!.. আমাকে তো বলেছে আপনি নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।..”

পদ্ম মুখটা নামিয়ে নীচু গলায় বলে উঠলো। আরমান সেটা দেখেও কিছু বললো না। মেয়েটা বেশ মন খারাপ করেছে।

“হ্যাঁ তোমাকে বলেনি , কারণ তুমি তো জোর করে বিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে। আর তখন তুমি বিয়ে করতে না , তাই ছলবল করে কোনো রকমে তোমাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিল।…”

“আচ্ছা তোরা এবার থাম তো বাপু। আমি একজন মুরুব্বি এখানে আছি আর তোরা ঝগড়া করেই যাচ্ছিস করেই যাচ্ছিস।..”

“এহ আসছে তিনি মুরব্বি। এই যাও তো এখান থেকে। আর সাথে এটাকেও নিয়ে যাও। আমকে একটু একা থাকতে দাও।…”

আরমানের কথায় পদ্মর বেশ খারাপ লাগলো।‌ লোকটাকে ও কত ভাল ভেবেছিল, আর ইনি নিজের বাড়ি এসে ওকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে?..

“হ্যাঁ আমি তো যাচ্ছি। কিন্তু ও কেন যাবে ?!.. এটা আজকে থেকে ওরও ঘর। আমি ওর জন্য জামা কাপড় আনিয়ে দেবো। ও তো দেখছি কিছুই নিয়ে আসেনি। আর তুই ভাল করে তৈরি হ , শহরে থেকে সেই গুষ্টি আসলো বলে।…”

“মানে!.. বাড়িতে বলে দিয়েও?!.. সবকিছু বলে দিয়েছো?!..”

আরমান চমকে উঠে বলে উঠলো। দাদী আলেয়া বেগম বললেন..

“আমি বলি নাই। তোর দাদা মশাই বলে দিয়েছে। আর তারা রওয়ানা দিয়েছে, এই এলো বলে।…”

“এই বুড়ো সব জায়গায় আমাকেই ফাঁসাবে। এবার আমি সবাইকে কি বলবো?!..”

“সে আমি কি জানি। তোদের টা তোরা বুঝবি। আমি এখন আসছি। তোদের খাবার টা এখনকার জন্যে ঘরেই পাঠিয়ে দিচ্ছি।…”

এই বলে আলেয়া বেগম চলে গেলেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও মহিলা ভালোই শক্তপোক্ত আছেন। পদ্ম মন খারাপ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ও তো ভেবেছিল ডাক্তার মশাই ওকে পছন্দ করে। আর তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু এখন তো সবকিছুই উল্টো পাল্টা হয়ে গেলো। ওকে তো আর ডাক্তার মশাইয়ের পছন্দ নয়, ও তার থেকে দূরে থাকলেই তিনি বেশ ভালো থাকবেন।

“এই তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?!.. কোনো কাজ নেই তোমার?!..”

“কি কাজ?!..”

“যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। তোমার শরীর থেকে পঁচা গন্ধ বের হচ্ছে।..”

পদ্ম আরমানের এমন কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল। ও তড়িঘড়ি করে নিজের গন্ধ শুঁকে দেখলো।

“এই একদম বাজে কথা বলবেন না। জানি আমাকে আপনার পছন্দ নয়, তাই বলে এভাবে মিথ্যা অপবাদ দেবেন না।…”

এই বলে পদ্ম গোসল খানায় ঢুকে গেল। আর আরমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলো…

“যা বাবা আমি কি এমন বলে ফেললাম যে ওর কাছে অপবাদ হয়ে গেল। এই মেয়েটা আসলেই একটা মাথামোটা পাগল।…”

আরমান আলমিরার দিকে এগিয়ে গেল। আর তারপর নিজের পোশাক বের করে পড়ে নিল। আগামী ঝড়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। বাকিরা যখন বিয়ের বিষয়টি জানতে পারবে, তখন কি হবে সেটাই ভাবছে ও।

আর দাদা মশাইও তেমন কোন রিয়্যাক্ট করলো না। নিশ্চয়ই এই বুড়োর মাথায় কিছু চলছে। আর ও আসার পর বাড়িতে তেমন কাউকেই দেখতে পেল না। সবাই গেল কোথায়?!. আরমান এসব ভাবছে বসে বসে। আর তখনই পদ্ম হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো। আরমান ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটা দেখতে আসলেই সুন্দর, ভীষণ সুন্দর। কিন্তু আরমান এই মাথামোটা মেয়ে কে একটুও পছন্দ করে না। ওর মুখটা হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে গেল।

আর তখনই ওদেরকে কে রাতের খাবার দিয়ে যাওয়া হলো। আরমান চুপচাপ খেতে বসে গেল। পদ্ম কে একবারও সাধলো না। পদ্মর নিজেরও বেশ ক্ষিদে পেয়েছে। কিন্তু এভাবে হুট করেই তো আর খেতে বসে পড়া যায় না। ও মন খারাপ করে বসে আছে। লোকটা ওকে রেখেই একা একাই খাচ্ছে। এখানে যে আরো একজন আছে সেটা তিনি ভুলেই গেছেন।

আরমান আর চোখ তাকিয়ে পদ্ম কে দেখছে। যে এই মুহূর্তে ওর উপর রেগে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। মেয়েটাকে ভীষণ আদুরে লাগছে। ওর ইচ্ছে করলো ফুলো ফুলো গাল টিপে দিতে।

“কি হলো খাচ্ছ না কেন?!.. তোমাকে কি কার্ড পাঠাতে হবে খাওয়ার জন্য?!..”

“খাবো না। আপনি একা একাই খেতে থাকেন। আমার তো ক্ষিদেই নেই।..”

“আমাদের প্রেমের বিয়ে নয় যে তুমি রাগ করবে। আর আমি আদর করে চুমু দিয়ে তোমার রাগ ভাঙাতে যাবো। তাই চুপচাপ খেতে বসো। পড়ে কিন্তু আর পাবে না।…”

আরমানের কথা শুনে লজ্জায় পদ্মর পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে।

“ছিঃ মুখের কি ভাষা। আপনাকে কে বললো আমি রাগ করেছি। আর এভাবে কে রাগ ভাঙায়!?...”

“না তুমি যেভাবে গাল ফুলিয়ে বসে আছো। তাতে আমার তো সেটাই মনে হয়েছে।…”

এরপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পদ্ম খাবার খেতে শুরু করলো। এতো এতো খাবার দেখে পদ্ম বেশ অবাক হলো। ওদের দুজনের জন্য প্রায় চার পাঁচ পদের খাবার পাঠিয়েছে। আর বাড়িতে থাকতে পদ্ম এক মুঠো ভাতের জন্য কতটা পরিশ্রম করেছে। পদ্ম চোখে পানি চলে এলো। আরমান ভ্রু কুঁচকে সেটা তাকিয়ে দেখলো।

“এতোক্ষণ তাও গাল ফুলিয়ে বসে ছিলে। এখন দেখছি আবার কাঁদছো। এই তুমি কি আমি চুমু দিয়ে রাগ ভাঙাইনি সেজন্য কাঁদছো?!.. আহারে বেচারি টা , এসো এসো তোমাকে চুমু দিচ্ছি তাও কেঁদো না। জানোই তো ডাক্তারের অনেক মায়া থাকে। আর সেই মায়া থেকে তোমাকে চুমু দিতেই পারি। তাহলে যদি তোমার কান্না থামে।..”

“পদ্ম আরমানের এমন কথায় নাক মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল…

আপনার জন্য দেখছি এখন শান্তিতে কাঁদতেও পারবো না। আর কে চেয়েছে আপনার কাছে ওটা?!. আমার একদমই কারো দয়ার দরকার নেই। ওটা তো আমি খাবার দেখে একটু কেঁদে ফেলেছি।…”

পদ্মর কথা শুনে আরমানের ভ্রু কুঁচকে গেল। খাবার দেখে কেঁদেছে মানে?!..

“এই খাবার দেখে কাঁদছ মানে?!.. খাবার কি পছন্দ হয়নি?!. এগুলো পাল্টে অন্যকিছু বানিয়ে দিতে বলবো?..!..”

আরমান ভাবছে মেয়েটার হয়তো খাবার পছন্দ হয়নি। আর ওর ভয়ে সেটা বলতেও পারছে না। তাই আরমান নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল। আর পদ্ম আবারো নিজের জন্য আরমানের এমন চিন্তা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

“আব্ কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?!.. আমি কাউকে ডেকে এই খাবার পাল্টে দিতে বলছি। বলো কি খাবে?!.. ওরা বানিয়ে দিবে।…”

“আরে আপনি ভুল বুঝছেন। আমরা এই খাবার গুলো ঈদ কোরবানির দিন ছাড়া সারা বছরে চোখেও দেখতে পাইনা। আর খাওয়া তো দূরের কথা। এখানে এসেই এতো এতো খাবার দেখে খুশিতে কেঁদে ফেলেছি। আর আপনি বলছেন এগুলো পছন্দ হয়নি?!..”

পদ্মর এমন কথা শুনে আরমান শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ওরা এতো কষ্ট করে দিন পার করতো?!.. আরমান বেশ অবাক হয়ে গেল। ওরা তো ছোট থেকেই এভাবে এতো আরাম আয়েশে বড় হয়েছে। আসলেই সবার জীবন একরকম কাটে না। পদ্মর দিকে তাকিয়ে আরমান এগুলো ভাবছিল।

“পদ্ম আনমনে তাকিয়ে বলল..

জানেন এমন অনেক দিন গিয়েছে। যে আমরা খাবার না পেয়ে রোজা রেখে দিন পার করেছি। আর সারাদিন শেষে ইফতারে কেবল একমুঠো চিঁড়ে আর পানি জুটতো। এই এক মুঠো ভাতের জন্য আমাকে যে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে!..”

পদ্ম একটুখানি থেকে গিয়ে আবারো বলতে শুরু করল…

“কাজ করতে করতে দুহাতে কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছে। আর এতো কষ্ট সহ্য করতে না পেরেই আপনাকে পেয়ে মা আমাকে আপনার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। তবে আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে একটুও বিরক্ত করবো না। শুধু আমাকে একটু থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেই হবে। গ্ৰামের মেয়ে হওয়ায় আমি অনেক কাজ জানি। আমি সারাদিন কাজ করবো , শুধু আমাকে এক মুঠো খাবার আর থাকার জায়গা দিলেই হবে। আমি আপনাকে একটুও বিরক্ত..…”

পদ্ম কে আর কিছু বলতে না দিয়েই আরমান ওকে একহাতে টেনে নিয়ে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা এতোটা কষ্ট করে বড় হয়েছে!!. ওর পদ্মর বলা কথাগুলো শুনে ভীষণ খারাপ লাগছে।

“আজকের পর থেকে আর কখনোই তোমাকে এক মুঠো খাবারের জন্য কষ্ট করতে হবে না। এমনকি আমি যদি নাও থাকি, তাহলেও আজকের পর থেকে কখনো তোমাকে খাবারের জন্য কষ্ট পেতে হবে না। এটা আমি সৈয়দ আরমান আলভীর তোমাকে কথা দিলাম।…”

আরমানের এই কথা শুনে পদ্মর চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো। আসলেই মা জোর করে হলেও ওকে একজন সঠিক আর ভালো মনের মানুষের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। আল্লাহ এতো সুখ বুঝি ওর কপালে রেখেছিল!.. পদ্ম মনে মনে কতশত বার আলহামদুলিল্লাহ উচ্চারণ করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন