ফন্ট সাইজ:
থিম:
পদ্মপাতা

২০তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#পদ্মপাতা~🪷

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ২০

🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

🪷🪷🪷

রাত প্রায় আটটা নাগাদ নিশিন্দীপুরের বিশাল জমিদার বাড়িতে হুড়োহুড়ি চলছে। কারণ জমিদার বাড়ির শহুরে থাকা ছেলে মেয়েরা তাদের স্ত্রী সন্তান নিয়ে জমিদার বাড়ি এসেছে।

আরমান তখনও বাহিরে। লোকটা খাবার খেয়েই কোথায় বেরিয়েছে পদ্ম সেটা জানে না। ও একা একাই কামরায় বসে আছে। নীচে থেকে বেশ হইহুল্লোড়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। পদ্ম একবার ভাবলো নীচে গিয়ে দেখবে যে কি হয়েছে। তাই ও ধীর পায়ে কামরা থেকে বেরিয়ে নীচের সিঁড়ির দৌড় গোড়ায় এসে দাঁড়ালো।

“আব্বাজান আপনি ওকে কিছুই বলেননি?!.. আমরা আরো আরমানের সাথে এই মেয়েটার বিয়ে ঠিক করেছি। আপনার অনুমতি পেলে বিয়ের কাজ এখানে সম্পন্ন হবে বলে এসেছি। আর আপনি এসব কি বলছেন?!..”

আরিনা কে দেখিয়ে নায়লা সৈয়দ আশরাফুল আলম কে বলে উঠলেন। তিনি গম্ভীর হয়ে মেয়ের কথাগুলো শুনে যাচ্ছেন। ভাই-বোনের মধ্যে নায়লা সৈয়দ বর্তমানে সবচেয়ে বড়।

নিশিন্দীপুরের সম্মানিত জমিদার সৈয়দ আশরাফুল আলমের পাঁচটি ছেলেমেয়ে ছিল। প্রথম সন্তান সৈয়দ ইকবাল, মেয়ে নায়লা সৈয়দ, তারপর ছেলে আমিন সৈয়দ, তারপর সামিউল সৈয়দ, তারপর শফিকুল সৈয়দ সবার ছোট।

প্রথম সন্তান সৈয়দ ইকবাল, তার স্ত্রী ইয়াসমিন সৈয়দ। তাদের দুই সন্তান একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। বড় ছেলে সৈয়দ ইয়াসিন আরাফাত, ছোট মেয়ে রাইমা সৈয়দ। তবে সৈয়দ ইকবাল আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে প্রতিবারের মতো গ্ৰামের বাহিরে বানিজ্য করতে গিয়েছিলেন। আর সেখান থেকে কখনো ফিরে আসেননি। তাই এতো বছর কেটে যাওয়ার পরও ফিরে না আসায় তাকে সবাই মৃত বলে জানেন।

নায়লা সৈয়দ, তিনি একজন কে ভালোবেসে কঠোর ধোঁকা পেয়ে জীবনে আর বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হননি। এভাবেই বাবার বাড়িতে সবার উপর হুকুম চালানোই যার কাজ। আর বাড়ির সবাই সৈয়দ আশরাফুল আলমের পর তাঁকেই বেশ ভয় পায়। তাকেই সবাই মেনে চলে।

আমিন সৈয়দ , তার স্ত্রী আয়লা বেগম। তাদেরও দুই সন্তান সৈয়দ আরমান আলভীর, ছোট মেয়ে সৈয়দ আলিশা আশা। সাত বছর আগে আশা এই নিশিন্দীপুরে থেকেই মারা গিয়েছে। আর তারপর থেকেই আরমান ও তার পরিবার ঢাকায় চলে গিয়েছিল।

কারণ তখন গ্ৰামে থেকে ওর মায়ের অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আর তখনই দাদা মশাই ওদের কে ঢাকায় গুলশানে পাঠিয়ে দেন। আর তারপর ওরা কেউই আর গ্ৰামে আসেনি। আর আরমান তো ডাক্তারি পড়াশোনার জন্য আমেরিকা চলে গিয়েছিল। আর এতো গুলো বছর, প্রায় সাত বছর পরে এই গ্ৰামে ফিরেছে।

তারপর সামিউল সৈয়দ, তার স্ত্রী স্বপ্না সৈয়দ। তাদের তিনজন ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে শিলা সৈয়দ, মেজো ছেলে শাফিন সৈয়দ, আর ছোট মেয়ে শিরিন সৈয়দ।

তারপর সবার সোবহান সৈয়দ, তার স্ত্রী সাবিনা সৈয়দ। তাদের দুই মেয়ে সাবিহা সৈয়দ আর সাবরিনা সৈয়দ।

সামিউল সৈয়দ আর সোবহান সৈয়দ তারা দুজনেই স্বপরিবারে নিশিন্দীপুরে থাকে।

এখন সবাই একসাথে জমিদার হলঘরে জরো হয়েছে। পদ্ম উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে কে কি বলছে। আর ও তো এখানের কাউকেই চিনতে পারছে না। তাই নীচে যেতেও ভয় পাচ্ছে, আর আরমান এখানে নেই।

“কোথায় সেই মেয়েটা ডাকো তাকে।..”

পদ্ম নায়লা সৈয়দ এর কথায় বেশ ঘাবড়ে গেল।‌ তবে তাও সাহস করে ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসলো। আর তখনই আরমান বাড়ীতে প্রবেশ করলো। পদ্মর পরনে একটা নীল রঙের শাড়ি পড়া। যেটা দাদী আলেয়া বেগম এনে দিয়েছিল। আরমান এই প্রথম পদ্ম কে শাড়িতে দেখে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।‌

“আসসালামুয়ালাইকুম!..”

পদ্ম গিয়ে দাদীর একপাশে দাঁড়িয়ে নায়লা সৈয়দের উদ্দেশ্যে সালাম প্রদান করলো। তিনি ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“ওয়ালাইকুমুস সালাম। এই মেয়ে তুমি কে??.. তোমাকে তো আগে কখনো দেখিনি। এবাড়িতে নতুন নাকি?!..”

“ও এই বাড়ির নতুন বৌ ফুফু আম্মা।..”

আরমান হলঘরে প্রবেশ করতে করতে বলে উঠলো। নায়লা সৈয়দ পিছনে ঘুরে আরমান কে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন।

আরিনা আরমান কে দেখেই ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো। আরিনা যেহেতু শহরে বড় হয়েছে, তাই ওদের কাছে এভাবে জড়িয়ে ধরা টা স্বাভাবিক বিষয়।‌ কিন্তু জমিদার বাড়ির বাকিরা ভয়ে ভয়ে দাদা মশাইয়ের দিকে তাকালো। তিনি বেশ গম্ভীর মুখে আরিনা ও আরমানের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বাবার দিকে লক্ষ্য করে নায়লা সৈয়দ আরিনা কে টেনে আরমানের থেকে সরিয়ে দিলেন। আর হঠাৎ করেই এমন হওয়ায় আরমানও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারলো না। আরিনা সরে যেতেই আরমান দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পদ্মর দিকে তাকালো। যে কিনা এখন মুখ কালো করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

“আরমান আমি এসব কি শুনছি!?!.. তুমি নাকি বিয়ে করে নিয়ছো?!.. তাও আবার এই গ্ৰাম্য মেয়েটাকে?!.. তোমার মতো শিক্ষিত একটা ছেলের কাছে এমনটা আশা করিনি।..”

নায়লা সৈয়দ গম্ভীর হয়ে রাগী গলায় বলে উঠলেন। আয়লা বেগম ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন।

“আরমান বাবা এসব কি বলছে?!.. তুই বিয়ে করেছিস?!.. আমাদের সবাইকে রেখেই?!.. এভাবে বিয়ে হয়না আরমান।..”

“মা, আমি বুঝতে পারছি যে যেটা হয়েছে সেটা ঠিক হয়নি।‌ কিন্তু যেটা হয়েই গিয়েছে, সেখানে আর কি করার আছে?!.. আমিও ভাবিনি এমন কিছু হবে, কিন্তু হয়ে গিয়েছে।..”

“সবার কথা শেষ হয়েছে?!.. এবার আমি কি কিছু বলবো?!.. নাহলে তোমরা বলো আমি শুনছি।…”

আশরাফুল আলম গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন। নায়লা সৈয়দ বুঝতে পারছে বাবা রেগে গিয়েছেন।

“না না আব্বাজান ভুল হয়ে গিয়েছে। আপনি বলুন আমরা শুনছি, আসলে এতো বড় একটা ঘটনা ঘটেছে, তাই নিজের আটকাতে পারিনি। ওকে দেখেই বলতে শুরু করে দিয়েছি।..”

নায়লা সৈয়দ বাবাকে নিল নিজের সাফাই দিয়ে বলে উঠলো। আশরাফুল আলম গম্ভীর গলায় বললেন…

“দেখো কিভাবে হয়েছে, কেন হয়েছে?!. এসব আমিও কিছু জানিনা আর তোমরাও জানো না। কিন্তু বিয়েটা হয়ে গিয়েছে এটাই মূল বিষয়। আর সৈয়দ বংশে কখনো তালাকের ঘটনা ঘটেনি। তাই এক্ষেত্রেও তেমন কিছু হবে না। তোমরা আশা করি ওদের মেনে নিতে আপত্তি করবে না।…”

“কিন্তু আব্বাজান আমি…”

“দেহো নায়লা তুমি ওর বিয়া এই মাইয়ার সাথে ঠিক করেছো। সেটা না তো আমাকে জানাইছো, আর না যার বিয়ে তার থেকে পছন্দ অপছন্দ জানতে চাইছো। আর তুমি কেবল বিয়ে ঠিক করছিলা, কিন্তু এখানে বিয়া হইয়া গেছে। তাই আমি তোমার কোনো কথা হুনতে চাই না। আর এইডা মনে রাখবা যে তুমি আরমানের অভিভাবক নও। আরমান আমার সাথে এসো।..”

এই বলে দাদা মশাই হলঘর থেকে উঠে নিজের কামরার দিকে চলে গেলেন। আরমান উনার পিছু পিছু এগিয়ে গেল। আর পদ্ম ভয় পেয়ে চুপচাপ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। ও বুঝতে পারছে এখানে ওর দিনগুলো সহজ হবে না। উনারা কেউই হয়তোবা ওকে মেনে নিতে পারছেন না। মা যে কেন জোর করে বিয়ে টা দিল?..

পদ্ম মাথা নিচু করে এইসব ভাবছিল। আর তখনই নায়লা সৈয়দ ওর সামনে এসে দাঁড়ালো।

“তুমি হয়তো সুন্দর কিন্তু অশিক্ষিত। তোমার কোন যোগ্যতা নেই এই সৈয়দ বংশের পুত্রবধূ হওয়ার। আমি তোমাকে কখনই মেনে নেবো না। আর এটাও দেখবো যে তুমি কিভাবে এবাড়িতে টিকে থাকো। চলো আরিনা।…”

এই বলে নায়লা সৈয়দ মুখ ঘুরিয়ে ওখান থেকে উঠে দোতলায় চলে গেলেন। আর আরিনাও মুখ ঝামটা মেরে পদ্মর পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আয়লা বেগম পদ্মর দিকে এগিয়ে আসলেন।‌ তারপর ওর থুতনি ধরে বললেন…

“মাশআল্লাহ মেয়ে তুমি তো খুব সুন্দর। নাম কি তোমার?!.. এই রুপেই আমার ছেলে কে বস করেছো?!.. চিন্তা করো না, ধীরে ধীরে সবাই মেনে নিবে। আর আমি তোমাকে আমার পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিচ্ছি। আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে আর আমি তোমার মা , ঠিক আছে মেয়ে?!..”

“জী মা, ঠিক আছে। আমাকে ভরসা দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আর আমার নাম প্রাণেশা রহমান পদ্ম। আপনি আমাকে পদ্ম বলে ডাকবেন মা।…”

পদ্ম বেশ খুশি হয়ে বলল। শাশুড়ি হিসেবে উনাকে ওর ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কিন্তু উনি তো আর এটা জানেন না যে ওনার ছেলেই এখনো মন থেকে ওকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেনি। এটা ভাবতেই পদ্মর মন খারাপ হয়ে গেল।

তারপর বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় সবাই যে যার ঘরে চলে গেল। তবে এবারেও সবার সাথে পদ্মর দেখা হলেও পরিচয় হলো না।

— — —

পদ্ম দোতলায় উঠে কামরায় গিয়ে পায়চারী করছে। আরমান এখনো ঘরে আসেনি। এদিকে ওর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, যদি ও বিছানায় শুয়ে পড়ে। আর তারপর ডাক্তার মশাই রেগে যায়?!.. সেই ভয়েই পদ্ম গিয়ে কামরায় থাকা বড় সোফায় শুয়ে পড়ল। আর তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

আরমান কামরায় এসেছে তখন প্রায় রাত বারোটা বেজে গেছে।‌ ও ঢুকে দেখলো পদ্ম সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরমান ওকে এতো বড় বিছানা ছেড়ে এই সোফায় ঘুমুতে দেখে আবারও ওকে মাথামোটা বললো।‌ আর তারপর ফ্রেশ হতে চলে গেল।‌

ফ্রেশ হয়ে এসে হাত মুখ মুছে সোফার দিকে এগিয়ে গেল। পদ্ম একেবারে কিনারে এসে পড়েছে। আর একটুখানি এদিক ওদিক হলেই ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে যাবে। তারপর আবার শাড়ির একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে‌ আছে। আঁচলটা কাঁধ থেকে গড়িয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে। অথচ শাড়ির মালিকের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

“এই মেয়ে মানুষ সবসময় বেশি বেশি। যেটা সামলাতে পারো না, সেটা পড়তে হবে কেন?!..”

এই বলে পদ্ম কে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার একপাশে শুইয়ে দিল। আর তারপর একটা শুকনো ঢোক গিলে ওর শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিল।

“মাইন্ড টা দিন দিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছে। ছিঃ ছিঃ আমি একজন ডাক্তার, মানুষের সেবা করাই আমার কাজ। তাই বলে তাদের ঘুমের সুযোগ তো নিতে পারি না।…”

এই বলে লাইট অফ করে বিছানার অন্যপাশে শুয়ে পড়ল। তবে ওর নজর তখনো পাশেই শুয়ে থাকা মেয়েলি কায়ায় আবদ্ধ।

আরমান অন্যদিকে ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। আবারও পদ্মর দিকে ফিরে শুয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। আর তারপর ওর মুখের সামনে হাত নাড়িয়ে দেখে নিল যে ঘুমিয়ে আছে ??. নাকি আবার ঘুমের ভান ধরে আছে। নাহ এতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এটা বুঝতে পেরেই আরমান একটুও সময় নষ্ট না করে একটানে পদ্ম কে নিজের বুকের উপর এনে ফেললো।

“প্রাণ, আমার প্রাণ!..”

এই বলে ঘুমন্ত পদ্মর সারা মুখ চুমুতে ভরিয়ে দিল। যেন কতদিনের সাধনা আজ পূর্ন হয়েছে।

আর তারপর দুহাতে আদুরে ভঙ্গিতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে চোখ বন্ধ করলো। আর তারপর একটা সময় ঘুমিয়ে পড়লো। পদ্মও ঘুমের ঘোরে আরমান কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরমান সেটা দেখে মিটি মিটি হাসলো।‌ আর তারপর নিজেও পদ্ম কে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

— — —

“একি তোমাদের নতুন বৌ কোথায়?!.. এখনো ঘুমাচ্ছে নাকি?!..”

নায়লা সৈয়দ খাবার টেবিলে বসতে বসতে বলে উঠলো। আলেয়া বেগম মেয়ের কথায় বেশ বিরক্ত হলেন।

“আহা নায়লা তুই কি এখনো ছোট আছিস?!.. সবার বড় বোন হয়েও তুই বাচ্চাদের মতো ঐটুকু মেয়ের সাথে ঝগড়া করতে চাইছিস?.!..”

নায়লা সৈয়দ মায়ের ধমকে রাগ করে চুপ হয়ে গেলেন। জমিদার বাড়ির নিয়ম হচ্ছে আগে পুরুষেরা খাবার খায়, আর তারপর সব মহিলারা একসাথে খায়। আর তারপর জমিদার বাড়ির সকল কাজের লোকেরা খাবার খায়। তাই আরমান বাকিদের সাথে খাবার খেয়ে আগেই বেরিয়ে গিয়েছে।

পদ্ম রান্নাঘর থেকে একে একে খাবার এনে কাজের মেয়ে লতার সাহায্যে টেবিলে পরিবেশন করছে।

“আমি গ্ৰামের মেয়ে তো?!. তাই এতো বেলা অব্দি ঘুমানোর অভ্যাস আমাদের নেই। আমি আরো অনেক আগেই উঠে গিয়েছি ফুফু আম্মা।..”

পদ্ম এই কথা শুনে নায়লা সৈয়দ রাগে কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

“হ্যাঁ এটাই তোমার কাজ। আর এখানেই তোমার জায়গা, এই বাড়িতে এটাই তোমার স্থান।..”

পদ্ম কে টেবিলে খাবার পরিবেশন করতে দেখে আরিনা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলো। যেন ও পদ্ম কে এভাবে সবার সামনে অপমান করতে পেরে ভীষণ খুশি হয়েছে। কিন্তু পদ্ম তো চুপ করে এই অপমান মেনে নেওয়ার মতো মেয়ে নয়।

“কি জানেন তো নিজের বাড়িতে আর নিজের পরিবার লোকেদের নিজ হাতে খাবার বেড়ে খাওয়ানোতে একটা যত্ন আছে। আর নিজের বাড়িতে কাজ করলে কেউ চাকরাণী হয়ে যায় না। আর আমি এই বাড়ির পুত্রবধূ এইটাই আমার প্রথম পরিচয়। কিন্তু আপনি কে?!.. আপনার পরিচয়?!.. দু'দিনের জন্য বেরাতে আসা অতিথি মাত্র। তাই অতিথি অতিথির মতোই থাকুন।…”

পদ্মর এমন মুখোমুখি জবাব শুনে বাকিরা তো মুখ টিপে হাসছে। আর আরিনা ও নায়লা সৈয়দ রাগে কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

“এই মেয়ে এই, অশিক্ষিত মূর্খ আমাকে অপমান করার সাহস কীভাবে হয় তোমার??!.. ফুফু আম্মা আপনি কিছু বলবেন না?!..”

আরিনা নায়লা সৈয়দের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো। এবার আলেয়া বেগম বললেন…

“ও কি বলবে?!. পদ্ম তো ঠিকই বলেছে। আর তুমিই তো শুরুতে ওরে অপমান করতাছিলা। এহন ও মুখের উপর জবাব দেওয়ায় হেইডা তোমার লাইগ্গা অপমান হইয়া গেছে?!..”

“থাক না আম্মা। এসব এখন বাদ দিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি খাবার খাই। খাবার টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে‌। পদ্ম মা তুমিও এসে বসে পরো।…”

আয়লা বেগমের কথা শুনে পদ্ম উনার পাশের চেয়ারে ভদ্র মেয়ের মতো বসে পড়লো।

“এখন কি এই মেয়েটাও আমাদের সাথে টেবিলে বসে খাবার খাবে?!..”

নায়লা সৈয়দ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন। এবার যেন সবাই বিরক্ত হচ্ছে।

“নায়লা, এইহানে কোনো সিনেমা হইতাছে না। যে ও এই টেবিলে বইয়া খাইতে পারবো না। তুমি ভুইলা যাইওনা যে ও তোমার মতোই এই বাড়ির একজন সদস্য। আর একটাও কথা না, সবাই খাও।…”

এরপর পুরো খাবার টেবিলে আর কেউ কোনো কথা বলেনি। নায়লা সৈয়দ গম্ভীর হয়ে চুপচাপ নাস্তা করে চলে গেলেন। আর তারপর বাকিরাও একে একে সবাই উঠে পড়লো।‌

পদ্ম খাবার খেয়ে নিজের ঘরে গেল। ওর এখন আর কোনো কাজ নেই, সবকিছুর জন্য এখানে কাজের লোক আছে। আরমানের সাথে পদ্মর সকালে দেখা হয়নি। ও ওঠার আগেই লোকটা উঠে চলে গিয়েছে। আর এটা জমিদার বাড়ি, তাই এখানে যে কতশত নিয়ম আছে। পদ্ম তো কিছুই মনে রাখতে পারছে না। তবে ও এখনো ভাবছে রাতে ও সোফায় থেকে বিছানায় কি করে গেল?!..

“আমার তো ঘুমের ঘোরে হাঁটাচলার অভ্যাস নেই। তাহলে আমি ওখান থেকে এখানে কিভাবে এলাম?!.. নাকি ডাক্তার মশাই আমাকে বিছানায় নিয়ে এসেছে?!?? ধূর ধূর উনি তো আমাকে পছন্দই করেন না। আমারই বোধহয় ঘুমের ঘোরে হাঁটাচলার বদঅভ্যাস হয়েছে। ছিঃ ছিঃ এটা কেমন অভ্যাস হলো?!..”

পদ্ম একা একাই ঘরজুড়ে পায়চারী করছে আর কথা বলছে। হঠাৎ করেই ও ঘরের একপাশে একটা দরজা দেখতে পেলো। পদ্ম কৌতুহল নিয়ে দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল।

“আরে এখানে তো সুন্দর একটা বারান্দা আছে। এটা তো খুব বড় আর এখানে তো চেয়ারও রাখা আছে।‌…”

এই বলে পদ্ম গিয়ে সেই রকিং চেয়ারটায় বসলো। এখানে থেকে নীচের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জমিদার বাড়ির পূর্ব দিকে একটা বড়সড় পুকুর আছে। আর সেখানে বড় বড় পদ্ম ফুল ফুটে আছে। পদ্ম ফুলগুলো দেখে ভীষণ খুশি হলো। ওর তো ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে তুলে নিয়ে আসতে।

“ইস্ ফুলগুলো কত সুন্দর। আমার তো ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে তুলে আনি। কিন্তু পদ্ম পুকুরের ওপাশেও তো একটা দোতলা বাড়ি। ওটা কাদের বাড়ি?!.. আমি বরং বাহিরে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করি।‌ আর এই ফাঁকে পুরো বাড়িটা ঘুরেও দেখা যাবে।…”

এই বলে পদ্ম কামরা থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে আসলো। পুরুষেরা কেউই এখন বাড়িতে নেই।‌ পদ্ম হলঘরে আসতেই বাড়ির মেয়েদের বসে থাকতে দেখলো। ও নিজেও সেদিকে এগিয়ে গেল।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন