#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ২৩
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
🪷🪷🪷
নিশিন্দীপুরের সন্ধ্যাগুলো নীরব হলেও ভেতরে ভেতরে কিছু যেন সবসময় নড়ে ওঠে।
পদ্ম জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। জমিদার বাড়ির বিশাল উঠোন। আলো ঝলমল। চাকর চাকরানীদের যাতায়াত। অথচ এই আলোয়ও তার বুকের ভেতর এক ধরনের অচেনা শীতলতা।
এই বাড়ি সুন্দর। এই বাড়ি বিশাল।
কিন্তু এই বাড়ির দেয়ালগুলো যেন কিছু লুকিয়ে রাখে।
পদ্মর কানে দ্বিতীয় বার দোতলা বাড়ির নাম আসে একেবারে হঠাৎ।
রান্নাঘরে দুই কাজের মেয়ে ফিসফিস করছিল।
“ওদিকে কেউ যায় না।..”
“কেন?..”
“ওটা ভালো জায়গা না। ওদিকে কেউ একবার গেলে আর ফিরে আসে না।..”
পদ্ম ওদের এই কথোপকথন শুনে থমকে গেল। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল..
“কোন দিকে?!..”
সে নিজেই জিজ্ঞেস করে ফেলল।
দুটো মেয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। একজন নিচু গলায় বলল—
“পুকুর পেরিয়ে যে পুরোনো দোতলা বাড়ি… এই বাড়ির বউদের ওদিকে যেতে মানা।..”
“বউদের।..”
এই শব্দটা পদ্মর বুকে কাঁটার মতো বিঁধল।
“কেন মানা?...”
মেয়েটা মাথা নিচু করল।
“আমরা জানি না ভাবি। বড়রা বলে ওদিকে কেউ গেলে সে আর ফিরে আসে না।…”
এদিকে সেই রাতেই…হাসপাতালে।
আরমানের সামনে সেই মেয়েটার খালি বেড।
C-11.
সকালবেলায় রাউন্ড দিতে এসে আরমান থমকে দাঁড়াল।
বেড খালি, চাদর গুছানো, নামের কার্ড নেই। আরমান নার্স কে ডেকে জিজ্ঞেস করল…
“এই বেডের মেয়েটা কোথায়??..”
নার্স চোখ নামিয়ে বলল—
“গতকাল রাতেই রিলিজ হয়েছে, স্যার।..”
আরমান জানে এটা মিথ্যে।
সে হসপিটালের রেজিস্টার খাতা খুলল। C-11 নাম্বারটা কাটা।
কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া।
মনে হলো যেন কেউ ইচ্ছা করেই নাম টা মুছে ফেলেছে। আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
এদিকে একই সময়ে—
পদ্ম পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে। বাড়ির সবার থেকে লুকিয়ে এখানে চলে এসেছে। এমনিতেও ওর দিকে খেয়াল দেওয়ার মতো মানুষ কোথায়?!. এতে অবশ্য ওর জন্য বেশ ভালোই হয়েছে।
দূরে সে দেখল একটা কালো গাড়ি। ধীরে ধীরে দোতলা বাড়ির দিকেই যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে একটা মেয়ের ছায়া। মেয়েটা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে আছে।
পদ্মর বুক কেঁপে উঠল।
এই ছায়াটা…
এই অবয়বটা…
তার চেনা লাগছে।
হঠাৎ মেয়েটার চোখের দিকে আলো পড়ল।
দুটো ছলছল চোখ, ভয়ে ভরা। কিন্তু পদ্মর বেশ চেনা।
পদ্মর ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
“শিরিন…??...”
শিরিন কুসুমপুরের মেয়ে।
যাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
যাকে নিয়ে সবাই বলেছিল—
“সে নাকি ভালো আছে।…”
বিয়ের পর শিরিন কখনো আর গ্ৰামে যায়নি। হয়তোবা যাওয়ার মত সুযোগই পায়নি?!..
গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
পদ্ম সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। ওর পায়ের নিচে মাটি যেন সরে যাচ্ছে।
পদ্মর মনে হচ্ছে এখানে যা ইচ্ছে সেটা ঠিক নয়। কিছু একটা হচ্ছে যেটা অন্যায়। এবার পদ্ম কঠিন ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল যে ও ঐ বাড়িতে ঢুকে দেখবে ওখানে আসলে হচ্ছে টা কী?!.. আর কেনই বা বাড়ির মহিলাদের ওখানে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একদিকে আরমান—
নামহীন ফাইলের ভেতর সত্য খুঁজছে।
আরেকদিকে পদ্ম—
নিজের চোখে নরকের দরজা দেখে ফেলেছে।
দুজনেই জানে না—
তারা এখন একই যুদ্ধের ভেতর।
একটা যুদ্ধ, যেখানে শত্রু শুধু বাইরের কেউ না।
শত্রুতা…এই বাড়ির রক্তেও মিশে আছে।
— — —
রাতের নিশিন্দীপুর আলাদা রকম।
জমিদার বাড়ির ভেতরে আলো ঝলমল, কিন্তু পুকুরের ওপাশে অন্ধকারটা যেন ঘন হয়ে জমে থাকে। সেই অন্ধকারের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছে দোতলা বাড়িটা—ভাঙা, নির্জীব, অথচ ভয়ংকরভাবে জীবন্ত।
পদ্ম নিজের শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরল। তার বুকের ভেতর শুধু একটাই নাম ঘুরছে—
শিরিন।
সে নিশ্চিত। সে ভুল দেখেনি।
যে মেয়েটাকে গাড়িতে দেখেছে, সে শিরিনই। ওদের গ্ৰামের মেয়ে শিরিন।
পদ্ম ধীরে ধীরে পুকুরপাড় ধরে হাঁটতে লাগল। চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু ব্যাঙের ডাক আর দূরে কুকুরের হাহাকার।
দোতলা বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সে থেমে গেল।
বাড়িটার জানালায় লালচে আলো।
ভেতর থেকে চাপা শব্দ।
হাসি না..কান্না না।
কেমন যেন ক্লান্ত, ভাঙা আওয়াজ।
পদ্মর গলা শুকিয়ে গেল।
এই বাড়ি…এটা পরিত্যক্ত না।
এটা লুকিয়ে বেঁচে থাকা নরক।
কিন্তু হঠাৎ করেই পিছন থেকে একটা ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো—
“ক'দিনের বউ হয়ে এখানে আসা উচিত ছিল না।…”
পদ্ম চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
এক বুড়ি। চোখে ভয় আর অভ্যাসের ক্লান্তি।
“কেন??...” পদ্ম জিজ্ঞেস করল।
বুড়ি চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“এই বাড়ি যাদের নেয়… তারা আর আগের মতো ফেরে না।..”
“কারা নেয়??..”
বুড়ি মাথা নাড়ল।
“যাদের নাম কখনো নেওয়া যায় না।..”
এই কথাটাই যেন সব বলে দিল। আর তারপর বুড়ি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। পদ্ম এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বেশ খুঁজলো, কিন্তু সেই বুড়ি কে আর কোথাও দেখতে পেলো না।
একই সময়ে হাসপাতালে।
আরমান একটা মেয়ের অপারেশন শেষ করেছে। মেয়েটার শরীরে পুরোনো সেলাইয়ের দাগ।
নতুন ক্ষত , চোখে অসীম ভয়।
আরমান ধীরে বলল,
“তুমি যদি আমাকে বলো… আমি সাহায্য করতে পারি।..”
মেয়েটা কাঁপা গলায় বলল—
“ডাক্তার সাহেব…
আমাকে আবার পাঠাবেন না… ওখানে…”
“কোথায়?..?..”
আরমান এগিয়ে এল।
মেয়েটার চোখ ভিজে উঠল।
“দোতলা বাড়ি….”
Upstairs.
এই শব্দটা আবার।
আরমান দাঁত শক্ত করল।
“তুমি নিরাপদ। যতক্ষণ আমি আছি।…”
কিন্তু সে জানে—
এই কথাটা বলা সহজ , রাখা ভয়ংকর কঠিন। হঠাৎ দুজন লোক ঢুকে পড়ল।
পরনে সাধারণ পোশাক। কিন্তু চোখের নীচে ক্ষমতার ছায়া।
“কেসটা আমরা নিয়ে যাবো।…”
“কেন??..”
আরমান ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।
লোকটা মুচকি হাসল।
“উপর থেকে অর্ডার আছে। আপনি এখানকার নতুন নাকি?!..”
“অর্ডার।”
এই শব্দটাই প্রমাণ।
আরমান মেয়েটার সামনে দাঁড়াল।
“সে এখন আমার পেশেন্ট। ওর দিকে এক পাও এগোবে না। আর উপর থেকে কারা এই অর্ডার দিয়েছে?!..”
লোকটার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“ডাক্তার সাহেব… আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি কোথায় বসে আছেন। এটা শহর নয়, তাই কথা একটু চিন্তা করে বলবেন।…”
এই মুহূর্তে আরমান বুঝে গেল—
এই লড়াই শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে না।
এই লড়াই তার নিজের পরিবারের ক্ষমতার বিরুদ্ধেও।
— — —
পদ্ম জানে না সে ভুল করছে, নাকি ঠিক করছে। তবুও ওর পা থামে না।
দোতলা বাড়ির ভাঙা গেট ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ভেতরের বাতাস ভারী। যেন নিশ্বাস নিলেই বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধে যায়। করিডোর অন্ধকার। দেয়ালে ম্লান আলো। কোথাও কোথাও লালচে বাল্ব জ্বলছে।
হঠাৎ—
একটা দরজার ফাঁক দিয়ে শব্দ।
নরম কান্না, ক্লান্ত শ্বাস।
একজন না!.. প্রায় অনেকজন।
পদ্মর হাত কাঁপতে লাগল।
সে জানালার ফাঁকে চোখ রাখল।
আর ভেতরে যা দেখল, তার বুকের ভেতর কিছু ভেঙে গেল।
এক সারি মেয়ে, কারো চোখ ফাঁকা।
কারো গালে আঘাতের দাগ।
কারো কোলে রক্তমাখা কাপড়।
আর কোণের দিকে— সেই পরিচিত মুখ শিরিন।
পদ্ম নিজের মুখ চেপে ধরল যেন চিৎকার বের না হয়ে যায়। ও ভেবেছিল এখানে কোন অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু সেটা যে এতোটা ভয়ানক আর এতোটা গভীর হবে সেটা ও ধারণা করেনি।
শিরিনের চোখ জানালায় পড়তেই শিরিন থমকে গেল। মেয়েটা বুঝতে পারল না পদ্ম এখানে এই সময়ে কীভাবে এলো??.. কিন্তু ওকে যেহেতু ওদের মতো আটকে রাখা হয়নি, তারমানে ওকে এখানে কেউ ধরে আনেনি।
শিরিন নামের মেয়েটি এক মুহূর্ত চুপ থাকলো।
আর তারপর—
চোখ ভরে জল।
শিরিন খুব ধীরে কাঁদতে কাঁদতে দুদিকে মাথা নাড়ল।
“না না…”
মানে শিরিন ইশারায় পদ্মকে চলে যেতে বলছে। এখানে থাকলে পদ্মও আর ফিরতে পারবে না। ওকেও ঐ নিকৃষ্ট জমিদারদের খেলার গুটি হতে হবে।
ঠিক তখনই পেছনে ভারী পায়ের শব্দ।
পদ্ম ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই কেউ তার হাত চেপে ধরল। একজন মহিলা।
মুখ শক্ত। চোখ ঠান্ডা। পদ্ম ভালো করে দেখতে পেলো না, তবে ওর মনে হলো এটা সেজো চাচী শাশুড়ি।
“এই মেয়ে ক'দিন হলো এই গ্ৰামে এসেছো। আর এরমধ্যেই নিয়ম ভঙ্গ করে এখানে ঢুকেছো কেন??!..”
গলায় কোনো রাগ নেই।
তার থেকেও ভয়ংকর—অভ্যাস।
পদ্ম কাঁপা গলায় বলল,
“ওরা… ওরা আমার গ্রামের মেয়ে। আর আপনি সেজো চাচী না?!. আপনি তাহলে এখানে কী করছেন?!..”
মহিলার ঠোঁট বাঁকা হাসিতে কেঁপে উঠল।
“এখানে গ্রাম বলে কিছু নেই।
এখানে শুধু মাল আর ক্রেতা। আর আমার এখানে আসার অনুমতি আছে। তুমি যদি ওদের মতো বন্দি হতে না চাও, তাহলে এখান থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে যাও। আর প্রাণে বাঁচতে চাইলে নিজের মুখটা বন্ধ রাখবে। তোমার জন্য এটাই শেষ সুযোগ।…”
এই কথাটাই ছিল ছুরির মতো। পদ্ম বুঝতে পারলো যে এটা ওর জন্য একটা হুমকি আর সেই সাথে সতর্ক বার্তাও। এরপর সেই মহিলা পদ্ম কে জোর করে টানতে টানতে বাহিরে বের করে দিল। আর তারপর ভেতরে থেকে গেট বন্ধ করে দিল।
একই সময়ে হাসপাতালে।
আরমান সেই মেয়েটাকে ধরে রেখেছে।
“ওকে আমি কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবো না। তোমরা কারা?!.. কার আদেশে এসব অন্যায় করছো?!.. কী হচ্ছে এখানে?!?.”
তার গলা এবার কাঁপছে না। শক্ত দৃঢ় কন্ঠস্বর।
লোক দুটো এগিয়ে এলো।
“ডাক্তার সাহেব, বেশি নায়ক হতে যাবেন না। যদি নিজের ভালো চান, তাহলে মেয়েটাকে চুপচাপ আমাদের হাতে তুলে দিন। আর আমরা কার আদেশে কাজ করছি সেটা আপনাকে বলতে বাধ্য নই।…”
আরমান প্রথমবার নিজের পরিচয় ছুড়ে দিল—
“আমি সৈয়দ আরমান আলভীর।
নিশিন্দীপুর জমিদার বাড়ির নাতি। তোরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?!...”
ঘরটা থমকে গেল।
লোক দুটো একে অপরের দিকে তাকাল।একজন নিচু গলায় বলল—
“তাহলে তো আরও সাবধানে চলা উচিত, স্যার।..”
এই সাবধান কথাটার ভেতরে ছিল হুমকি। ঠিক তখনই আরমানের ফোন বেজে উঠল।
নাম্বার!?. সেজো চাচা সামিউল সৈয়দ।
সে রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে ঠান্ডা কণ্ঠ—
“আরমান…
কিছু দরজা খোলা ভালো না।
তুমি যেটা দেখছো… ওসব তোমার জন্য না। এখনো সময় আছে শহরে ফিরে যাও। আর ওদের কে ভালোয় ভালোয় ওদের কাজ করতে দাও।…”
রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল আরমানের।
সে বুঝে গেল সে শুধু তদন্ত করছে না।
সে নিজের পরিবারের সবচেয়ে নোংরা গোপন দরজায় হাত দিয়েছে।
পদ্ম দোতলা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে।
আরমান হাসপাতালের করিডোরে।
দুজনেই আলাদা জায়গায়।
কিন্তু একই সত্যের মাঝখানে।
আর সেই সত্যের নাম—
নিশিন্দীপুরের আসল ইতিহাস।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ