ফন্ট সাইজ:
থিম:
পদ্মপাতা

২৫তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#পদ্মপাতা~🪷

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ২৫

🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

🪷🪷🪷

চিৎকারটা বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

কিন্তু তার রেশ থেকে গেছে দেয়ালে, মেঝেতে, পদ্মর বুকের ভেতরে।

রক্তের দাগ।

আর সেই কাগজ—

“পরেরজন কে??..”

আরমান কাগজটা হাতে নিয়ে চেপে ধরল। তার আঙুলের নিচে কাগজটা কাঁপছে।

না কাগজ না, ওর নিজের হাত কাঁপছে।

“ওরা ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।..”

আরমান ফিসফিস করে বলল।

“আমাদের ভয় দেখানোর জন্য।…”

পদ্ম চারপাশে তাকায়।

অজ্ঞাত সেই নারী, সাদা শাড়ি—

কোথাও নেই। এই উপলব্ধিটা আসতেই পদ্মর বুকের ভেতর শূন্যতা নেমে এলো।

“ওনাকে নিয়ে গেছে!?!..”

পদ্মর গলা ভেঙে গেল।

আরমান চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য। সে জানে— এই প্রথম না, আবার হয়তোবা এই শেষও না।

আরমান হঠাৎ থেমে গেল।

“এই করিডোরটা স্বাভাবিক না,‌ মনে হচ্ছে এখানে কিছু একটা আছে।..”

সে ধীরে বলল।

“মানে??..”

পদ্ম চমকে উঠে তাকায়।

আরমান দেয়ালে হাত বুলিয়ে দেয়।

একটা জায়গায় শব্দ বদলে যায়।

ফাঁপা‌ শব্দ ভেসে আসে, সে চাপ দেয়।

ক্লিক… দেয়ালের একটা অংশ সরে যায়।

ভেতরে—

একটা সরু সিঁড়ি।

অন্ধকারের দিকে নেমে গেছে।

পদ্মর বুক ধুকপুক করে ওঠে।

“এই বাড়ির ভেতরেও…??...”

তার কণ্ঠে অবিশ্বাস।

আরমানের চোখ কঠিন।

“দোতলা বাড়ি একা না।

এই বাড়িটাও নেটওয়ার্কের অংশ।…”

জমিদার বাড়ি নিজেই

অপরাধের ঘাঁটি।

নিচের ঘরের দিকে তারা ধীরে ধীরে নামতে থাকে।

সিঁড়ির শেষ মাথায় একটা ছোট ঘর।

ভেতরে— পুরোনো ফাইল।

লক করা আলমারি।

একটা টেবিল। টেবিলের ওপর—

সাদা শাড়ির একটা টুকরো।

রক্তমাখা। পদ্ম চিনে ফেলে। এই কাপড় অজ্ঞাত সেই মহিলার ছিল।

পদ্মর হাত কাঁপতে থাকে।

“উনি বেঁচে নেই…??...”

পদ্মর গলা প্রায় শোনা যায় না।

আরমান জবাব দেয় না।

সে আলমারি খুলে ফেলে।

ভেতরে—বেশ পুরোনো কিছু ছবি।

কুসুমপুর। নিশিন্দীপুর।

একই মেয়েরা। বছরের পর বছর ধরে।

কিছু ছবিতে মেয়েদের পাশে

জমিদার পরিবারের পুরুষদের ছায়া।

কিছু ছবিতে নারীদের চোখ কালো করে ঢেকে রাখা।

এই মানে এই অপরাধ নতুন না।

এই অপরাধ বংশানুক্রমে চলছে!..

আরমান একটা ফাইল টেনে বের করে। আর তখনই তার মুখ সাদা হয়ে যায়। ফাইলের কভারে লেখা—

“Emergency Bride Transfers”

ভেতরে তালিকা। তারিখ।গ্রাম।নাম।

পদ্মর চোখ থেমে যায়।

একটা নামের ওপর।

নিজের নাম।

“পদ্ম”

তার পাশে ছোট করে লেখা—

“Risk. Silence required.”

পদ্মর দম আটকে যায়।

সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে।

“আমি… তালিকায়…?!..”

তার ঠোঁট কাঁপে। আরমানের চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।

“মানে ওরা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?..!??..”

সে গর্জে ওঠে।

“তুমি শুধু বউ না। তুমি একটা ঝামেলার গোডাউন। আমি সবকিছু ধীরে ধীরে দেখছিলাম তো। তোমাকে আবার কে বলেছিল ওখানে যেতে?!..”

একই রাতে হাসপাতালে।

ওয়ার্ডবয় দৌড়ে আসে।

হঠাৎ আরমানের ফোন বেজে ওঠে।

“স্যার…

C-Block ফাইলগুলো…

সব উধাও।…”

আরমানের চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়।

প্রমাণ মুছে ফেলা হচ্ছে।

মানে— সময় শেষ হয়ে আসছে।

পদ্ম আরমানের দিকে তাকায়।

তার চোখে ভয় নেই। শুধু বন্দি মেয়েগুলো কে মুক্ত করার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সিদ্ধান্ত।

“ওরা যদি আমাকে টার্গেট বানায়…

পদ্ম ধীরে বলে,

“তাহলে আমি তাদের ভেতরে ঢুকেই লড়বো।…”

আরমান ধীরে মাথা নাড়ে।

“মানে??!.. অসম্ভব তোমাকে আমি কিছুতেই ওদের মধ্যে যেতে দেবো না।..”

পদ্ম এক শব্দে উত্তর দেয়—

“আমি যাচ্ছি দোতলা বাড়ি।..”

“একদম না। আমি তোমাকে একা কিছুতেই যেতে দেবো না। আরে আমার বউ আমি নিজেই এখনো আনবক্সিং করিনি। তুমি ওখানে যাবে না।…”

আরমান চিৎকার করে বলে উঠলো। পদ্ম ওর কথা শুনে কপালে হাত দিল। এমন একটা সিরিয়াস মূহুর্তেও লোকটাকে ফাজলামো করতে হবে?!..

“আপনাকে আনবক্সিং করতে নিষেধ করেছিল কেউ?!.. আর আপনি তো ভালোবাসেন না, তাহলে কিসের আনবক্সিং?!.. আমি যাচ্ছি ওখানে।..”

“দেখো, তুমি বুঝতে পারছ না। তুমি যতটা সহজ ভাবছো বিষয়টা কিন্তু অতোটাও সহজ নয়। আমি অন্য কোন উপায় বের করবো। তুমি কিছুতেই যাবে না।….”

“আবেগ রেখে বিবেক দিয়ে ভাবুন। ওরা যেহেতু আমাকেই টার্গেট করেছে, তাহলে আমিই যাবো। আর তারপর আমরা জানতে পারবো কারা কারা জড়িত আছে এতে।…”

পদ্মের এমন কথায় আরমান চুপ করে রইলো। তবুও ওর মন পদ্ম কে ওখানে পাঠাতে সায় দিচ্ছে না।

ঠিক তখন বাড়ির বাইরে

কালো গাড়ির শব্দ। ব্রেকের কর্কশ চিৎকার। হেডলাইটের আলো

জানালায় পড়ে।

আরমান ফিসফিস করে বলে—

“ওরা চলে এসেছে।..”

এইবার— প্রশ্ন শুধু এটা নয় যে কে যাবে কে যাবে না।

প্রশ্ন— কে আবার ফিরবে?..

— — —

কালো গাড়ির আলো নিভে যায়।

নিশিন্দীপুর আবার নীরব।

কিন্তু এই নীরবতা আর আগের মতো না। এটা শিকারির নীরবতা।

পদ্ম ধীরে শ্বাস নেয়।

“ওরা যদি আমাকে চায়..”

সে ফিসফিস করে বলে,

“তাহলে আমি লুকাবো না।..”

আরমান ঘুরে তাকায়।

“তুমি পাগল হয়েছ??.. আমি বলছি তো আমরা অন্য কোন উপায় ঠিক খুঁজে বের করবো। তোমাকে আমি এতে জড়াতে চাইনি, কিন্তু তুমি তো বেশি পাকামো করতে ভালোবাসো।…”

“না জড়িয়ে যেহেতু গেছিই, তাহলে এবার এর শেষটাও দেখে ছাড়বো। তাতে আমার যা হয় হোক, কেউ তো আর ভালোবাসে না যে তার জন্য থাকবো। আমাকে নিয়ে কারো চিন্তা নেই।…”

পদ্ম চোখে চোখ রেখে বলে,

“হয়েছে আমি বুঝে গেছি। আমাকেই খোঁচাচ্ছো। শোন ওরা আমাদের পিছনে টানবে। আমরা যদি সামনে না যাই— তাহলে ওরা আমাদের ঘরেই আসবে। আর বাড়িতে মেয়েরা আছে, ওদের আতঙ্কে ফেলতে চাইনা।…”

এই কথাটার ভেতরে ছিল ভয়ংকর বুদ্ধি। আরমান এক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর ধীরে বলে—

“ঠিক আছে, কিন্তু একা কিছু করার চিন্তাও করবে না।…”

আরমান সেই রাতেই কাজ শুরু করে।

হাসপাতালের ভেতরে এমন কিছু মানুষ আছে— যারা এখনো ভয় পায়… কিন্তু ওরা চুপ থাকতে আর পারে না।

একজন পুরোনো কম্পাউন্ডার।

একজন পুরনো গ্ৰামবাসী।

একজন আয়া—

যার মেয়ে বছর তিনেক আগে গায়েব হয়েছে।

তারা সবাই চুপচাপ এক জায়গায় বসে। আরমান নিচু গলায় বলে—

“আমি জানি কারা জড়িত।

আমি জানি কোথায় মেয়েরা যায়।

কিন্তু একা আমি কিছু করতে পারবো না।..”

আয়ার চোখে আগুন।

“আমাকে যা করতে বলবেন করবো,

সে বলে।

আর চুপ করে থাকবো না।..”

এই মুহূর্তে একটা গোপন রেসকিউ নেটওয়ার্ক জন্ম নেয়।

পরদিন ইচ্ছা করেই পদ্ম বাড়ির কাজের মেয়েদের সামনে কথা বলে—

“আমি আবার পুকুরপাড়ে যাবো”

সে জোরে বলে।

“ দোতলা বাড়ির কাছে। পদ্মফুল তুলতে।…”

এই কথাটা বাতাসে না। এই কথাটা কানে কানে যাবে। আর ঠিক তাই হয়।

সন্ধ্যার আগেই একজন অচেনা লোক

দোতলা বাড়িতে খবর দেয়—

“নতুন বউ আবার নড়ছে।”

এরপর?!.. এরপর ফাঁদ সেট হয়ে গেছে। আরমানের হাতে প্রথম অস্ত্র হসপিটালের ভেতরে পুরোনো ক্যামেরা। ডিক্টাফোন।

ফাইল কপি করার যন্ত্র।

সে জানে—

এই যুদ্ধে বন্দুক না।

এই যুদ্ধে দরকার প্রমাণ।

“এইবার ওরা শুধু ভুল করবে না,”

আরমান নিজের সাথে কথা বলে,

“এইবার ওরা ধরা পড়বেই।..”

— — —

রাত। পদ্ম ইচ্ছা করেই একা বের হয়।

পুকুরপাড়…অন্ধকার।

দোতলা বাড়ির ছায়া।

সে জানে— এই রাস্তায় কেউ না কেউ তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ।

পদ্ম থামে না। সে যেন কিছুই টের পায়নি— এই অভিনয়টাই ফাঁদ।

একটা কালো ছায়া এগিয়ে আসে।

একটা হাত তার কবজি চেপে ধরে।

“চুপ”

একটা পুরুষ কণ্ঠ।

পদ্ম চিৎকার করে না।সে ধীরে চোখ তোলে।এই প্রথম— সে শত্রুর মুখ দেখে। লোকটার চোখে কোনো আবেগ নেই।শুধু কাজ।

এই মানে— এটা ব্যক্তিগত না।

এটা ব্যবসা। তবে পদ্ম এগুলো আর হতে দেবে না। ঐ বন্দি মেয়েগুলো ওর আশায় বসে আছে। তাদের কে ন্যায় ওকে দিতেই হবে।

পদ্মকে কালো গাড়ির দিকে টেনে নেওয়া হয়।

ঠিক তখন— দূরে হাসপাতালের দিক থেকে একটা আলো জ্বলে ওঠে।

আরমান।

সে দূর থেকে সব দেখে। কিন্তু সে দৌড়ায় না। সে অপেক্ষা করে।

কারণ সে জানে— এই অপহরণটাই

এই সিস্টেমের কবরের প্রথম পেরেক।

গাড়ির দরজা বন্ধ হয়।

পদ্ম ভেতরে বসে।

শেষবার জানালার বাইরে তাকায়।

তার চোখে ভয় না।

তার চোখে একটাই কথা—

“আমি ভেতরে ঢুকে পড়লাম।”

ও জানে ডাক্তার মশাই ওকে দেখছেন। কোনো বিপদ তিনি হতেই দিবেন না।

— — —

দরজাটা ভাঙার শব্দে করিডোর কেঁপে উঠল। ধুলো উড়ে গেল বাতাসে।

আরমান এক পা ভেতরে রাখতেই গন্ধটা নাকে লাগল— ওষুধ, পুরোনো রক্ত আর পচা ভয়ের গন্ধ।

ঘরটার ভেতরে হালকা হলুদ আলো।

একটার পর একটা লোহার বেড।

কয়েকটা খালি… কয়েকটায় মেয়েরা শুয়ে আছে , চোখ ফাঁকা, মুখে কোনো ভাষা নেই।

আরমান ফিসফিস করে বলল—

“এরা তো পাগল না… এরা…”

হঠাৎ…

একটা বেড থেকে পরিচিত কণ্ঠ—

“আরমান ভাই…”

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল সে।

সেটা একটা মেয়ে, চুল কেটে ছোট করে দেওয়া হয়েছে।

হাতের শিরায় ইনজেকশনের দাগ।

চোখে আতঙ্কের ঘুম।

“তুমি… তুমি তো মরে গেছ!..”

আরমানের গলা কেঁপে উঠল।

মেয়েটা হাসার চেষ্টা করল।

কিন্তু হাসিটা ভেঙে পড়ল।

“মরিনি… আমাকে মেরে ফেলার আগেই ওরা আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে…”

আরমান এগিয়ে গেল।

হাত ধরতেই মেয়েটা আঁতকে উঠল।

“নাহ… ক্যামেরা আছে…”

আরমান চারদিকে তাকাল।

কোণের দিকে ছোট লাল আলো জ্বলছে।

CCTV.

ঠিক তখনই…

করিডোর থেকে ভারী বুটের শব্দ।

ঠক… ঠক… ঠক…

কারো গলা—

“আরমান ডিউটিতে থাকার কথা…

তাহলে সে এখানে কী করবে??...”

মেয়েটা আরমানের হাত চেপে ধরল।

“ওরা জানলে… তোমাকেও শেষ করে দেবে। এখান থেকে পালিয়ে যাও, নাহলে লুকিয়ে পড়ো।…”

আরমান দরজার দিকে তাকাল।

তার হাতের মুঠো শক্ত হলো।

এই মুহূর্তে— সে শুধু একজন ডাক্তার না। সে এখন টার্গেট।

দরজার হ্যান্ডেলে হাত পড়ল…

ক্লিক… আরমান ঘুরে দাঁড়াতেই

সামনে দাঁড়িয়ে যায় সে ডাক্তার , এভাবে লুকানোর প্রয়োজন নেই।

আর সামনে তাকিয়ে দেখলো

জমিদার বাড়ির লোক।

যার হাসিতে ঠাণ্ডা মৃত্যু।

“তুমি অনেক বেশি জেনে ফেলেছ, আরমান…”

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন