#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৩৪
⛔🚫কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।🚫⛔
পদ্মর এই অসম সাহস দেখে লিন্ডা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গুদামের ভেতর জ্বলন্ত লণ্ঠনের শিখাটা লকেটের গায়ে কাঁপছে। লিন্ডা ভালো করেই জানে, এই লকেটের ভেতরের ডাটা নষ্ট হওয়া মানে ‘ব্ল্যাক রোজ’ অর্গানাইজেশনের বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট ধুলোয় মিশে যাওয়া।
“পদ্ম!. কী করছ তুমি??.. পাগল হয়েছ?!...”
আরমান চিৎকার করে উঠল। তার চোখে জল, সে বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার শান্ত-শিষ্ট গ্রাম্য স্ত্রী আজ এক দুর্ধর্ষ বাঘিনীর মতো লিন্ডার চোখের দিকে তাকিয়ে দরাদরি করছে।
পদ্ম আরমানের দিকে ফিরেও তাকালো না। সে লণ্ঠনটা আরও উঁচিয়ে ধরল।
“লিন্ডা, সময় খুব কম। আমার আব্বা, শাশুড়ি মা আর শায়ান ভাইকে নিয়ে ডাক্তার মশাই এখনই এই গুদাম থেকে বেরিয়ে যাবে। ওরা মেইন রাস্তায় পৌঁছালে আমি লকেটটা লণ্ঠন থেকে সরাবো। এক চুল এদিক-ওদিক হলে আমি লকেটটা আগুনের ভেতরে ফেলে দেব!..”
লিন্ডা দাঁতে দাঁত চিপে তার হাতের গানটা নিচু করল। সে বুঝতে পেরেছে এই মেয়েটি মরতে ভয় পায় না, আর যে মরতে ভয় পায় না তাকে হারানো অসম্ভব।
“ওকে!... গো!.. গেট আউট অফ হেয়ার!...”
লিন্ডা তার গার্ডদের ইশারা করল।
শায়ান আরমানকে টেনে ধরল। “আরমান, চল!..পদ্ম আমাদের সময় করে দিচ্ছে। আমরা বাইরে গিয়ে ব্যাকআপ ডাকছি। তাড়াতাড়ি চল!..”
আরমান একটুও যেতে চাইলো না কিন্তু শায়ান জোর করে ওকে বের করে আনলো।
“না শায়ান!.. ওকে একা রেখে আমি যাব না!...”
আয়লা বেগম ছেলের হাত ধরলেন। “বাবা, পদ্মর চোখের দিকে তাকা। ও আজ শুধু আমাদের না, পুরো গ্রামের ইজ্জত বাঁচানোর লড়াই করছে। ওর ওপর ভরসা রাখ।…”
করিম রহমান কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন…
“মা আমার, সাবধানে থাকিস। আল্লাহ তোকে রক্ষা করবেন।…”
ওরা ধীরে ধীরে গুদামের ভাঙা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। আরমান শেষবার পেছন ফিরে তাকালো। দেখল ধোঁয়ার আড়ালে পদ্ম একাই দাঁড়িয়ে আছে লণ্ঠন হাতে, আর তার চারপাশ ঘিরে আছে লিন্ডার সশস্ত্র কমান্ডোরা।
মিনিট পাঁচেক পর। লিন্ডা ঘড়ির দিকে তাকালো।
“অনেক সময় হয়েছে। ওরা নিশ্চয়ই মেইন রাস্তায় পৌঁছে গেছে। এখন লকেটটা দাও!...”
পদ্ম একটু হাসল। এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি। সে লণ্ঠন থেকে লকেটটা সরিয়ে নিল। লিন্ডা দ্রুত হাত বাড়িয়ে লকেটটা ছিনিয়ে নিল। কিন্তু লকেটটা হাতে নিতেই লিন্ডার ভ্রু কুঁচকে গেল। লকেটটা আগুনের তাপে বেশ গরম, কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। লিন্ডা দেখল লকেটের পেছনের সেই নীল কিউআর কোডটা উধাও!... আগুনের তাপে নীল অপরাজিতার সেই বিশেষ রস বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে গেছে।
“হোয়াট?!. এটা ব্ল্যাঙ্ক কেন?.. কোড কোথায়?!..”
লিন্ডা চিৎকার করে উঠল।
পদ্ম শান্ত গলায় বলল…
“আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওটা আগুনের তাপে নষ্ট হয়ে যাবে। নীল অপরাজিতার রস ছাড়া ওই কোড আর কোনোদিন দেখা যাবে না। আর ওই বিশেষ গাছ শুধু আমাদের গ্রামেই পাওয়া যায়। আপনি তো লকেট চেয়েছেন, আমি দিয়েছি। কোড দেওয়ার কথা তো বলিনি!...”
লিন্ডা রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পদ্মর গালে সজোরে এক চড় কষাল।
“ইউ লিটল বিচ!.. তুই আমায় ঠকিয়েছিস?!... লোগান!... একে গাড়িতে তোল!... একে টর্চার করে বের করতে হবে ফর্মুলা কোথায়!...”
সেই লম্বা খুনি লোকটা, যার নাম লোগান, সে পদ্মকে জাপটে ধরল। ঠিক তখনই গুদামের বাইরে থেকে এক বিকট শব্দ হলো। ‘বুম!’
গুদামের পেছনের দেওয়ালটা ধসে পড়ল। একদল স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডো ভেতরে ঢুকল। তাদের নেতৃত্বে শায়ান আর আরমান।
“হ্যান্ডস আপ!... ড্রপ ইউর ওয়েপনস!...”
শায়ানের গর্জন শোনা গেল।
লিন্ডা বুঝতে পারল সে ফাঁদে পা দিয়েছে। আরমান দৌড়ে এসে লোগানকে ধাক্কা দিয়ে পদ্মকে সরিয়ে নিল। লোগান গুলি চালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু শায়ান তার হাতে নিখুঁত নিশানায় গুলি করল। লিন্ডা পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মহিলা পুলিশ অফিসাররা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল।
সবাই যখন লিন্ডাকে নিয়ে ব্যস্ত, আরমান তখন পদ্মকে জড়িয়ে ধরে মেঝের ওপর বসে পড়েছে।
“তুমি ঠিক আছ প্রাণ?.?.. তোমার গালে রক্ত!..”
আরমান কাঁপছে। পদ্ম হাসল। তার চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরছে।
“আমি বলেছিলাম না ডাক্তার মশাই, আমি সামলে নেব?.?.. লকেটের পেছনে কোনো চিপ ছিল না। ওটা ছিল শুধু এক ধরণের খোদাই করা নকশা, যাতে নীল রস লাগালে রিফ্লেকশন তৈরি হয়। আসল ফাইল তো আপনার ফোনেই আছে!...”
আরমান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “তার মানে তুমি লিন্ডাকে স্রেফ একটা রূপোর টুকরো দিয়ে বোকা বানালে?!..”
“হ্যাঁ। ও তো টাকার লোভে অন্ধ, ও কি আর শিল্প বোঝে??..?..”
শায়ান এসে হাসিমুখে দাঁড়ালো। “আরমান, লিন্ডা আর লোগান—দুজনেই অ্যারেস্ট। লিন্ডার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে তোর বাবাকেও রেসকিউ করা হয়েছে। তিনিও এখন সেফ আছেন।…”
আয়লা বেগম আর করিম রহমানও ভেতরে ঢুকলেন। আয়লা বেগম পদ্মকে জড়িয়ে ধরলেন।
“তুই আজ আমার মান রাখলি মা। এই জমিদার বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্যতা শুধু তোরই আছে।…”
এক সপ্তাহ পর।
সব ধকল কেটে গেছে। আরমানের বাবা আমিন সৈয়দ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে তার সেই দম্ভ আর নেই। তিনি এখন হুইলচেয়ারে বসে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আয়লা বেগম তার পাশে বসে ধর্মগ্রন্থ পড়েন। আমিন সৈয়দ আর মুখ ফুটে অবহেলা করেন না, বরং মাঝেমধ্যে আয়লা বেগমের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন।
পদ্ম আর আরমান ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য ডুবছে। সারা গ্রাম এখন শান্ত।
“ডাক্তার মশাই,!.”
পদ্ম ডাকল।
আরমান তার দিকে ফিরল।
“আবার ডাক্তার মশাই?.?.. এখন তো আমরা ঘরে ফিরে এসেছি। এখন আমাকে অন্য নামে ডাকতে পারো।…”
পদ্ম দুষ্টুমি করে হাসল।
“কী নামে ডাকব?.?.. সাগর বাবু?..?..”
আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“না। আমি চাই তুমি আমাকে শুধু তোমার ‘আরমান’ বলে ডাকো। যে আরমান সব বাধা পেরিয়ে শুধু তার পদ্মের কাছে ফিরে আসবে।…”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল। লিন্ডা জেলে গেছে, ‘নীল বিষ’-এর ল্যাব ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু তারা জানে, জীবন মানেই নতুন লড়াই। তবে সেই লড়াইয়ে এখন আর ভয় নেই। কারণ পদ্ম জানে, তার সাথে আরমান আছে, আর আরমান জানে—তার জীবনের ধ্রুবতারা হলো এই পদ্মপাতা।
— — —
শহরে লিন্ডা ধরা পড়ার পর মনে হয়েছিল সব বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু আরমান জানত, লিন্ডা ছিল কেবল এই বিশাল বিষবৃক্ষের একটা ডাল। মূল শিকড় অনেক গভীরে। পুলিশ লিন্ডাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে আরমানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গিয়েছিল—
“আরমান, বাঘ যখন খাঁচায় ঢোকে, তখন বনের বাকি বাঘেরা আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। তোমার লকেটের কোডটা ডিলিট করেছ ঠিকই, কিন্তু এর ব্যাকআপ কপি যেখানে আছে, সেখানে পৌঁছানোর ক্ষমতা তোমার নেই।…”
আরমান আর পদ্ম গ্রামে ফিরে এসেছে। কিন্তু জমিদার বাড়ির সেই পুরোনো জৌলুস এখন আর নেই। সেজো চাচা মৃত, ছোট চাচা পলাতক, আর বাবা আমিন সৈয়দ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায়। আশরাফুল আলম চোখের সামনে ছেলেদের এমন দুর্দশা দেখে নিজেও বোবা বনে গেছে। সারাদিন নিজের ঘরেই বন্দী থাকেন, কেউ খাবার দিয়ে আসলে খায় আর নাহলে না খেয়েই থাকে।
আরমান এখন এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে সব গড়ার চেষ্টা করছে।
“কী ভাবছেন ডাক্তার মশাই?.?..”
পদ্ম এক গ্লাস শরবত নিয়ে আরমানের পাশে দাঁড়াল।
আরমান জানলা দিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“ভাবছি লিন্ডার সেই শেষ কথাগুলো। পদ্ম, নীলকুঠির সেই ল্যাবটা ধ্বংস হওয়ার সময় কি আমরা সব ফাইল উদ্ধার করতে পেরেছিলাম?.?..”
পদ্ম ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কেন?.?.. শায়ান ভাই তো বললেন সব পুলিশ নিয়ে গেছে।…”
“না পদ্ম। শায়ানও সবটা জানে না। লিন্ডা বলেছিল একটা ব্যাকআপ কপির কথা। আমি যতদূর জানি, আমার সেজো চাচা একটা 'ব্ল্যাক বক্স' তৈরি করেছিলেন, যা মাটির নিচে নয়, বরং এই বাড়ির কোনো এক গোপন দেওয়ালে লুকানো আছে। আর ওটা খুলতে হলে শুধু কিউআর কোড নয়, দরকার হবে এক বিশেষ মানুষের কণ্ঠস্বর।…”
পদ্ম চমকে উঠল।
“কণ্ঠস্বর??.?..কার কণ্ঠস্বর?.?..”
“আমার বাবার।..”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিন্তু বাবা তো এখন কথা বলতে পারেন না। স্ট্রোক করার পর থেকে তার জবান বন্ধ।…”
ঠিক সেই সময় নিচতলা থেকে আয়লা বেগমের আর্তনাদ শোনা গেল। আরমান আর পদ্ম দ্রুত নিচে নামল। দেখল আমিন সৈয়দের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে কোনো নার্স নেই, পাহারাদার পুলিশ কনস্টেবল মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। আর আমিন সৈয়দের বিছানা খালি!..
“বাবা কোথায়?!.. মা, বাবা কোথায়?!.?..”
আরমান পাগলের মতো চিৎকার করল। আয়লা বেগম দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঁদছেন।
“একদল কালো মুখোশধারী লোক এল আরমান। তারা জানালা দিয়ে ঢুকল। কেউ কিছু বোঝার আগেই ওনার হুইলচেয়ারসহ ওনাকে তুলে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল— 'রাজাকে দরকার, সিন্দুক খুলতে হবে'।…”
পদ্মর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তার মানে লিন্ডার দল নয়, এবার সরাসরি 'ব্ল্যাক রোজ'-এর মেইন টিম হানা দিয়েছে। তারা জানে আমিন সৈয়দের কণ্ঠস্বর ছাড়া সেই গোপন সিন্দুক বা ব্ল্যাক বক্স খোলা অসম্ভব।
আরমান মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা ছোট কার্ড পড়ে আছে। কার্ডে একটা কালো গোলাপের ছবি আর নিচে লেখা— "মিশন: রিবার্থ (Rebirth)"।
“ওরা বাবাকে দিয়ে ওই নীল বিষের ফর্মুলা আবার সচল করতে চায় পদ্ম। ওরা বাবাকে সুস্থ করবে, কথা বলানোর ব্যবস্থা করবে, তারপর তাকে দিয়ে সিন্দুক খুলিয়ে নেবে।…”
আরমান নিজের চুল খামচে ধরল।
পদ্ম আরমানের হাত ধরল।
“আমরা কি চুপ করে থাকব?.?.. আপনি তো ডাক্তার, আপনি জানেন বাবা কোথায় থাকতে পারেন।…”
আরমান হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। “শহর থেকে দূরে পাহাড়ের ওপাড়ে একটা পরিত্যক্ত মেন্টাল অ্যাসাইলাম আছে। আমার দাদা ওটা একসময় লিজ নিয়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছে ওরা বাবাকে ওখানেই নিয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে যাওয়া মানে সরাসরি মৃত্যুর মুখে পড়া।…”
পদ্ম স্থির গলায় বলল,
“একসাথে মরব বলেছিলেন না?.?.. চলুন, আজ ওই অ্যাসাইলামের অন্ধকার দূর করি।…”
আরমান আর পদ্ম তৈরি হলো। কিন্তু বের হওয়ার সময় পদ্ম দেখল জানলার বাইরে সেই রহস্যময় শিস আবার শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এবার শিসটা শায়ানের নয়, শিসটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ এবং ভীতিপ্রদ।
হঠাৎ বারান্দার থামের আড়াল থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এল। লোগান!.. লিন্ডার সেই খুনি লোকটা, যে আগের বার আহত হয়েছিল। তার এক হাত ব্যান্ডেজ করা, অন্য হাতে একটা ইনজেকশন।
“পদ্ম বিবি, আপনার ডাক্তার মশাইকে যেতে দিন। বসের নির্দেশ—আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। কারণ সিন্দুকটা শুধু মোজাফফর আলীর কণ্ঠস্বরে খুলবে না, ওটা খুলতে হলে আপনার চোখের মণির (Iris) স্ক্যানও লাগবে।…”
পদ্ম স্তম্ভিত।
“আমার চোখের স্ক্যান?.?. কেন?!..”
লোগান ক্রুর হাসল।
“কারণ আপনার দাদী যখন ওই সিন্দুক সেট করেছিলেন, তখন তিনি জানতেন জমিদার বংশ বেইমানি করবে। তাই তিনি তার উত্তরসূরীর চোখের মণির ছাপ ওটাতে লক হিসেবে বসিয়েছিলেন। লিন্ডা বোকা ছিল, তাই লকেট খুঁজেছে। কিন্তু আমাদের বস বুদ্ধিমান।…”
আরমান রিভলভার বের করার আগেই লোগান একটা স্মোক গ্রেনেড ছুড়ল। ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল। পদ্ম চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু লোগান তার মুখ চেপে ধরল।
পরক্ষণেই আরমান দেখল পদ্ম উধাও। মেঝেতে শুধু পড়ে আছে পদ্মর সেই ছেঁড়া ওড়না।
— — —
পদ্ম যখন চোখ খুলল, তখন ওর নাকে একটা তীব্র রাসায়নিক ওষুধের গন্ধ ধাক্কা দিল। আবছা আলোয় সে দেখল তাকে একটা লোহার স্ট্রেচারের সাথে চেইন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারপাশের দেওয়ালগুলো শ্যাওলা ধরা, ছাদ থেকে চুইয়ে চুইয়ে জল পড়ছে। এটা কোনো সাধারণ হাসপাতাল নয়, এটা সেই পরিত্যক্ত পাহাড়ি অ্যাসাইলাম।
“জেগে উঠেছ বৃষ্টি?.?..”
লোগানের কর্কশ গলা শোনা গেল।
পদ্ম নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু হাত-পায়ের চেইনগুলো চামড়ায় বসে যাচ্ছে।
“আমার ডাক্তার মশাই কোথায়?.?.. লিন্ডা কোথায়?..?..”
হঠাৎ অন্ধকারের ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর পায়ের শব্দ এগিয়ে এল। একজন লম্বা চওড়া মানুষ, যার অর্ধেক মুখ একটা রুপালি মাস্ক দিয়ে ঢাকা। লিন্ডা তার পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে—যেন এক বাধ্য দাসী।
“লিন্ডা এখন আমার অধীনে পদ্ম। ও বড্ড বেশি ভুল করছিল।…”
মাস্ক পরা লোকটা শান্ত গলায় বলল। “আমি 'ব্ল্যাক রোজ'-এর মেইন চ্যান্সেলর। আমাকে সবাই 'দ্য সার্জন' বলে চেনে।…”
দ্য সার্জন পদ্মর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। একটা ছোট লেজার লাইট দিয়ে পদ্মর চোখের মণি পরীক্ষা করল সে।
“অসাধারণ!.. তোমার দাদী সত্যিই প্রতিভাশালী ছিলেন। তিনি জানতেন এই জমিদাররা একদিন সব দখল করবে, তাই তিনি সিন্দুকের বায়োমেট্রিক লকে নিজের রক্তের উত্তরসূরীর আইরিস (Iris) স্ক্যান সেট করে গেছেন। তোমার ওই চোখ দুটো ছাড়া সিন্দুকটা খুললে ভেতরের সব ফাইল নিজে থেকেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।..”
পদ্ম থুতু ছিটিয়ে দিল সার্জনের দিকে। “পিশাচ!... আপনি আমার আব্বাকে আর ডাক্তার মশাইয়ের আব্বাকে ব্যবহার করছেন। আপনাদের এই পাপের শেষ হবেই!...”
সার্জন পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে মুখ মুছল।
“পাপ আর পুণ্য—সবই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। লোগান, নিয়ে এসো ওনাকে।…”
লোগান একটা হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে এল। সেখানে বসে আছেন সৈয়দ মোজাফফর আলী। তার মুখ দিয়ে লালা ঝরছে, কিন্তু তার চোখে আজ এক অদ্ভুত আতঙ্ক। সার্জন তার গলায় একটা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস চেপে ধরল।
“কথা বলো আমিন সৈয়দ!... তোমার গলার স্বরের স্যাম্পলটা দাও, নাহলে তোমার আদরের ছেলের বউয়ের চোখ দুটো আমি এখনই উপড়ে নেব!...”
আমিন সৈয়দ গোঙাতে লাগলেন। তিনি পদ্মর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না।
এদিকে আরমান পাহাড়ের নিচে তার জিপটা থামিয়েছে। তার সাথে শায়ান আর একদল কমান্ডো। শায়ান থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে অ্যাসাইলামের ম্যাপ দেখছে।
“আরমান, ভেতরে অন্তত বিশজন সশস্ত্র কমান্ডো আছে। মেইন গেট দিয়ে ঢোকা মানে আত্মহত্যা। আমাদের পেছনের পানির পাইপ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে।…”
শায়ান পরামর্শ দিল।
আরমানের চোখে আজ শুধু রক্ত। সে তার কাঁধের ব্যান্ডেজটা টাইট করে বেঁধে নিল।
“শায়ান, তুই পুলিশ নিয়ে গেট সামলা। আমি একাই ভেতরে যাব। পদ্ম ওখানে আছে, ও আমাকে ছাড়া কাউকেই বিশ্বাস করবে না।..”
“পাগলামি করিস না আরমান!.. তোর এক হাত এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি!...”
“পদ্ম যখন লণ্ঠন নিয়ে লিন্ডার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন সে ভাবেনি সে বাঁচবে কি না। আজ আমার ফেরার পালা।…”
আরমান অন্ধকারে ছায়ার মতো পেছনের পাইপ বেয়ে ওপরে উঠল। সে যখন তিনতলার ল্যাবরেটরির জানলা দিয়ে উঁকি দিল, তখন তার বুকটা কেঁপে উঠল। পদ্মকে চেইন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর সার্জন একটা সিরিঞ্জ নিয়ে পদ্মর চোখের দিকে এগোচ্ছে।
“রেডি হও পদ্ম। সিন্দুকটা তোমার চোখের আলো কেড়ে নিয়ে তবেই খুলবে!..”
সার্জনের অট্টহাসি ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
আরমান আর দেরি করল না। জানলার কাঁচ ভেঙে সে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। 'ঝনঝন!' কাঁচের টুকরো লোগানের পিঠে বিঁধে গেল।
“আরমান!..”
পদ্ম চিৎকার করে উঠল।
আরমান দ্রুত লোগানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের মধ্যে শুরু হলো জীবন-মরণ লড়াই। আরমান এক হাতে লোগানের টুঁটি চেপে ধরল, অন্য হাতে মেঝের একটা কাঁচের টুকরো নিয়ে লোগানের উরুতে বসিয়ে দিল।
সার্জন শান্তভাবে পিস্তল বের করল। “ডক্টর আরমান, আপনি বড্ড দেরি করে ফেললেন।…”
ঠিক সেই সময় আমিন সৈয়দ হুইলচেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার ভান করে সার্জনের পা জাপটে ধরলেন। আমিন সৈয়দের গলায় লাগানো সেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসটা এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ করল।
সার্জন ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে গেল। আরমান এই সুযোগে পদ্মর চেইন খোলার জন্য লোগানের পকেট থেকে চাবি ছিনিয়ে নিল।
“তাড়াতাড়ি চলো পদ্ম!.. শায়ান নিচে এসে গেছে!..”
কিন্তু পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। লিন্ডা একটা সুইচ টিপতেই ঘরের চারপাশ থেকে লোহার গ্রিল নেমে এল। ওরা খাঁচায় বন্দি হয়ে গেল।
সার্জন উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়ল।
“খুব ভালো চেষ্টা আরমান। কিন্তু এই ল্যাবে একটা সেলফ-ডিস্ট্রাকশন মোড আছে। সিন্দুক না খুললে তিন মিনিটের মধ্যে এই পুরো তলাটা গ্যাসে ভরে যাবে। এবার বলো, পদ্মর চোখ দেবে নাকি সবাই মিলে মরবে?.?..”
আমিন সৈয়দ হঠাৎ অদ্ভুত এক স্বরে কথা বলে উঠলেন। যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই তার মুখ থেকে একটা শব্দ বেরোল—
“আরমান... সিন্দুকটা... সিন্দুকটা ভাঙিস না... ওটা... ওটা একটা বোমা!..”
আরমান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মানে সিন্দুকের ভেতরে কোনো হীরে জহরত বা ফর্মুলা নেই? .?..ওটা কি তবে পুরো গ্রাম ধ্বংস করার একটা নীল নকশা?...?..
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ