#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৩৫
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
আমিন সৈয়দের ভাঙা গলার ওই সতর্কবাণী যেন পুরো ঘরের বাতাস হিম করে দিল। 'দ্য সার্জন' নামের ওই মাস্ক পরা লোকটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। লিন্ডার চোখেমুখেও তখন এক পৈশাচিক উল্লাস।
“বোমা?!.. হা হা হা!... আমিন সৈয়দ, আপনি মরার আগে বোধহয় পাগল হয়ে গেছেন।…”
সার্জন পিস্তলের বাঁট দিয়ে আমিন সৈয়দের মাথায় আঘাত করল। বৃদ্ধ মানুষটা হুইলচেয়ার থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
“বাবা!...”
আরমান চিৎকার করে উঠল। সে লোহার গ্রিলের ওপার থেকে হাত বাড়িয়ে বাবাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
পদ্ম চেইন থেকে মুক্ত হয়ে আরমানের হাত জাপটে ধরল।
“ডাক্তার মশাই, শান্ত হোন!.. ওরা আমাদের দুর্বল করতে চাইছে। আব্বা ঠিক আছেন।…”
সার্জন এবার পদ্মর দিকে ফিরল। “পদ্ম, সময় শেষ। ওই যে দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা কালো বক্সটা দেখছ?.?.. ওটাই সেই সিন্দুক। যাও, ওটার সেন্সরে তোমার চোখের মণি রাখো। নাহলে এই ঘরটা এখন বিষাক্ত সায়ানাইড গ্যাসে ভরে যাবে। আমি আর লিন্ডা মাস্ক পরে বেঁচে যাব, কিন্তু তুমি আর তোমার এই রাজপুত্র তড়পাতে তড়পাতে মরবে।…”
লোগান একটা রিমোট টিপল। ঘরের কোণা থেকে হিসহিস শব্দে হালকা সবুজ রঙের গ্যাস বের হতে শুরু করল। আরমান নিজের গায়ের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ভিজিয়ে পদ্মর নাকে চেপে ধরল।
“পদ্ম, ও যা বলছে করো!... আমাদের হাতে সময় নেই। আমি তোমাকে মরতে দেব না!...”
আরমানের গলায় এক অমানুষিক হাহাকার।
পদ্ম কাঁপতে কাঁপতে সেই কালো বক্সটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বক্সটা কোনো সাধারণ ধাতু নয়, এক অদ্ভুত কালো পাথরের মতো বস্তু দিয়ে তৈরি। মাঝখানে একটা নীল লেন্স জ্বলছে।
“চোখ বড় করো পদ্ম!.. স্ক্যান শুরু হচ্ছে!....”
লিন্ডা পাশ থেকে চিৎকার করল।
পদ্ম চোখ বড় করে লেন্সের দিকে তাকালো। একটা লাল রশ্মি পদ্মর চোখের মণি স্ক্যান করতে শুরু করল। 'বীপ... বীপ... বীপ...' যান্ত্রিক শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।
হঠাৎ দেওয়াল থেকে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “বায়োমেট্রিক ম্যাচড। আইরিস আইডেন্টিফাইড। ভয়েস কমান্ড রিকোয়ার্ড (Voice command required).”
সার্জন হাসল। "আমিন!.. এবার তোমার পালা। সেই পাসওয়ার্ডটা বলো যা তোমার বাবা তোমাকে শিখিয়েছিলেন!...”
আমিন সৈয়দ মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় মাথা তুললেন। তার ঠোঁট কাঁপছে। তিনি আরমানের দিকে তাকালেন। আরমানের চোখে আকুতি— 'বাবা, বলো!.. পদ্মকে বাঁচাও!..’
আমিন সৈয়দ অস্ফুট স্বরে বললেন, “পদ্ম...পাতা... চিরস্থায়ী….”
যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর আবার বলল— “ভয়েস ম্যাচড। এক্সেস গ্র্যান্টেড (Access Granted).”
হঠাৎ কালো বক্সটার ঢাকনা ধীরে ধীরে খুলে গেল। লিন্ডা আর সার্জন পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল বক্সটার ওপর। কিন্তু ভেতরে যা দেখল, তাতে তাদের চোখ কপালে উঠল।
সেখানে কোনো হীরে নেই, কোনো সোনার মোহর নেই, এমনকি কোনো ফর্মুলাও নেই! সিন্দুকের ভেতরে রাখা আছে শুধু একটা পুরোনো মাটির পাত্র আর একটা ছোট ডায়েরি। আর সিন্দুকের নিচের অংশে একটা টাইমার দ্রুত কমছে— ০০:৪০... ০০:৩৯...
“এটা কী?!... জহরত কোথায়?!...”
লিন্ডা সিন্দুকের ভেতর হাত ঢোকালো।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাটির পাত্রটা থেকে এক অদ্ভুত দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হতে লাগল। আরমান চিৎকার করে উঠল,
“পদ্ম!... পালাও!.. ওটা সায়ানাইড নয়, ওটা হলো সেই আসল 'নীল বিষ' যা বাতাসে ছড়ালে কয়েক সেকেন্ডে মানুষ পঙ্গু হয়ে যায়!...”
সার্জন বুঝতে পারল সে ঠকেছে। দাদী বা আরমানের দাদারা কেউ চাননি এই পাপের উত্তরাধিকার কেউ পাক। তারা সিন্দুকটাকে একটা 'ডেথ ট্র্যাপ' (Death Trap) বানিয়ে রেখেছিলেন।
আরমান গ্রিলের একটা আলগা রড দিয়ে সজোরে আঘাত করে গ্রিলটা সামান্য ফাঁক করল।
“পদ্ম!.. এই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসো!... জলদি!...”
পদ্ম কোনোমতে বেরিয়ে এল। কিন্তু লোগান আর লিন্ডা তখন ধোঁয়ার চোটে কাশতে কাশতে অন্ধ হয়ে গেছে। সার্জন তার মাস্ক ঠিক করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আরমান এক লাথিতে তার মাস্কটা খুলে ফেলল।
মাস্ক খোলার পর আরমান স্তব্ধ হয়ে গেল।
চাচা?!.. ছোট চাচা?!...আপনি বেঁচে আছেন?!...”
হ্যাঁ, সেই ছোট চাচা যাকে সবাই মৃত ভেবেছিল, সেই আসলে 'দ্য সার্জন' সেজে এই আন্তর্জাতিক চক্র চালাচ্ছিল।
“হ্যাঁ আরমান!.. আমি মরিনি!.. আমি ফিরে এসেছি সব দখল করতে!...” ছোট চাচা কাশির মধ্যে দিয়েও গর্জে উঠলেন।
“আরমান!.. পালাও!... ছাদ ধসে পড়ছে!...”
শায়ানের গলা শোনা গেল বাইরে থেকে।
আরমান তার বাবাকে কাঁধে তুলে নিল। পদ্মর হাত ধরে সে ভাঙা জানলা দিয়ে পাশের পানির পাইপ ধরে নিচে নামতে শুরু করল। পেছনে ল্যাবে এক বিশাল বিস্ফোরণ হলো। 'বুম!'
আগুনের লেলিহান শিখা রাতের আকাশকে লাল করে দিল। নীলকুঠির শেষ অভিশাপ নীল বিষের সাথেই ছাই হয়ে গেল।
নিচে পাহাড়ি ঢালে আরমান আর পদ্ম বসে আছে। শায়ান আর পুলিশ বাহিনী ছোট চাচা আর লিন্ডাকে দগ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল।
আমিন সৈয়দ আরমানের হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
“ক্ষমা করে দিস বাবা। আমি তোকে আর তোর মাকে চিনতে ভুল করেছিলাম। এই পদ্মই আসলে আমাদের বংশের মান বাঁচালো।…”
পদ্ম আকাশের দিকে তাকালো। ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। নীল অপরাজিতা ফুলের মতো নীল আকাশ।
“ডাক্তার মশাই..”
পদ্ম ডাকল।
আরমান তার কপালে কপাল ঠেকালো।
“বল প্রাণ।..”
“অভিশাপ কি সত্যিই শেষ হয়েছে?.?..”
আরমান একটু ম্লান হাসল।
“জানি না পদ্ম। তবে আমাদের ভালোবাসা এই বিষের চেয়েও শক্তিশালী। এখন চলো, তোমার আব্বা আর মায়ের কাছে ফিরি।..”
হঠাৎ শায়ান দৌড়ে এল।
“আরমান!.. খবর আছে!.. ছোট চাচার ফোন থেকে একটা শেষ মেসেজ গেছে দুবাইয়ের কোনো এক নাম্বারে। মেসেজে লেখা ছিল— 'দ্য গেম হ্যাজ জাস্ট বিগ্যান (The game has just begun)'।…”
পদ্ম আর আরমান একে অপরের দিকে তাকালো। তার মানে এই মহাকাব্যে শত্রু এখনও শেষ হয়নি। দুবাই থেকে কে এই খেলা পরিচালনা করছে?...?..
— — —
ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ। পাহাড়ের ওপারে কুয়াশা সরিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। মেন্টাল অ্যাসাইলামের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি আর বারুদের গন্ধ এখন অনেক পেছনে। শায়ান আর পুলিশ বাহিনী লিন্ডা আর ছোট চাচাকে নিয়ে শহরের দিকে রওনা দিয়েছে। আরমান তার বাবাকে একটা সেফ হাউসে পাঠিয়ে দিয়েছে, যেখানে আয়লা বেগম আর করিম রহমান আগেই অপেক্ষা করছেন।
কিন্তু আরমান আর পদ্ম ফিরল না। আরমান চাইল কিছুটা সময় এই পাহাড়ের শান্ত কোলে কাটাতে। পাহাড়ের ঢালে একটা ছোট কাঠের বাংলো, যা এক সময় বনবিভাগের ছিল—এখন জনশূন্য। চারিদিকে শুধু পাইন গাছের সারি আর বুনো ফুলের সুবাস।
পদ্ম বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ভোরের শীতল হাওয়া ওর ভেজা চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। কাল রাতের সেই ধস্তাধস্তিতে ওর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে গেছে, গালে একটা ছোট আঁচড়। কিন্তু ওর চোখে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া উষ্ণ হাত পদ্মর কোমর জড়িয়ে ধরল। পদ্ম চমকে উঠল না, কারণ এই স্পর্শ ওর খুব চেনা। আরমান ওর কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিস করে বলল,
“ভয় পেয়েছ প্রাণ?.?....”
পদ্ম মাথা নেড়ে আরমানের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
“ভয় নয় ডাক্তার মশাই, মায়া লাগছে। কাল রাতে মনে হচ্ছিল হয়তো আর আপনার এই সান্নিধ্য পাব না।…”
আরমান পদ্মকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। আরমানের চোখের সেই তীক্ষ্ণতা আজ নেই, সেখানে আজ শুধু টলটলে ভালোবাসা। সে পদ্মর গালের সেই আঁচড়টাতে আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালো।
“এই দাগটা আমার অপরাধবোধের সাক্ষী পদ্ম। আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি।…”
“ধুর!... কী যে বলেন!...”
পদ্ম মুচকি হাসল।
“আপনি না থাকলে তো আমি ওই গ্যাসের চেম্বারেই শেষ হয়ে যেতাম। আল্লাহর উছিলা হয়ে আপনিই তো আমাদের রক্ষা করেছেন।…”
আরমান পদ্মর কপালের অবাধ্য চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। “রক্ষক নই পদ্ম, আমি তোমার অর্ধাঙ্গ। জানো, কাল যখন তুমি ওই লণ্ঠন হাতে লিন্ডার সামনে দাঁড়িয়েছিলে, তখন তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল—আমি কত ভাগ্যবান যে তোমার মতো এক বীরঙ্গনাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছি।…”
পদ্ম লজ্জা পেয়ে আরমানের বুকের ভেতর মুখ লুকালো। আরমানের হৃদস্পন্দন ও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। আরমান ওর চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচিয়ে ধরল। ভোরের সেই মায়াবী আলোয় পদ্মর মুখটা কোনো অপার্থিব সুন্দরীর মতো লাগছে।
“পদ্ম…”
আরমানের গলাটা আজ অন্যরকম ভারী।
“উমম…”
পদ্ম চোখ বুজে ফেলল।
আরমান ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে পদ্মর কপালে একটা দীর্ঘ তপ্ত চুম্বন আঁকল। তারপর ওর দু গালে আর চোখের পাতায়। পদ্মর নিশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। আরমান ফিসফিস করে বলল,
“সবাই তো তোমাকে জমিদার বাড়ির বউ ভাবে, কেউ 'পদ্মপাতা' বলে ডাকে। কিন্তু আমার কাছে তুমি শুধুই আমার 'প্রাণ'। তুমি না থাকলে এই আরমান আলভীর কবেই রোবট হয়ে যেত।…”
পদ্ম আরমানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“আমিও আপনাকে ছাড়া ছায়াহীন কায়ার মতো ডাক্তার মশাই। আমাদের এই পথ চলা যেন কোনোদিন শেষ না হয়।…”
আরমান হাসল।
“শেষ হবে না। তবে একটা শর্ত আছে।…”
“কী শর্ত?.?...”
পদ্ম চোখ মেলে তাকালো।
“আজ থেকে আমাকে আর 'ডাক্তার মশাই' বলে ডাকবে না। নাম ধরে ডাকবে। পারবে?.?..”
পদ্ম একটু ইতস্তত করে নিচু স্বরে ডাকল— “আরমান..”
নামটা উচ্চারণ করতেই আরমানের মনে হলো ওর কানে মধু বর্ষণ হলো। সে পদ্মকে কোলে তুলে নিল। পদ্ম ভয়ে আরমানের গলা জড়িয়ে ধরল।
“এ কী!.. নাম ডাকলাম বলে কি আপনি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন নাকি?.?..”
“নিয়ে তো যাবই। তবে নীলকুঠিতে নয়, আমার মনের কুঠিরে।…” আরমান হাসতে হাসতে পদ্মকে নিয়ে বাংলোর ভেতরে ঢুকে পড়ল।
বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়ের কোলে এই নির্জন বাংলোয় আরমান আর পদ্ম যেন এক অন্য ভুবনের বাসিন্দা। যেখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, কোনো নীল বিষ নেই—আছে শুধু দুটো মনের গভীর মিলন।
কিন্তু এই সুখানুভূতি কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?.?.. বাংলোর ঠিক নিচেই জঙ্গলের আড়ালে কেউ একজন দূরবীন দিয়ে ওদের দেখছে। তার হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে দুবাইয়ের সেই রহস্যময় নাম্বারটা আবার ফুটে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে হুকুম এল—
“ওদের কিছু সময় সুখে থাকতে দাও। কারণ এই সুখই হবে ওদের জীবনের শেষ পাওনা। মিশন: ব্লু ডায়মন্ড (Blue Diamond) শুরু করো!...”
— — —
পাহাড়ের সেই নির্জন বাংলোয় ভোরের আলো যখন আরও গাঢ় হলো, আরমান আর পদ্মর চারপাশের পৃথিবীটা যেন থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্নিগ্ধ আবেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিল না ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস। হঠাৎ বাংলোর নিচতলায় কাঁচ ভাঙার একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হলো।
আরমান ঝট করে পদ্মকে বিছানা থেকে নামিয়ে দেয়ালের আড়ালে নিয়ে এল। ওর হাতের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল।
“নিচে কেউ আছে পদ্ম। আওয়াজ করো না।…”
পদ্ম ভয়ে আরমানের শার্টের হাতা খামচে ধরল।
“ডাক্তার মশাই... আবার ওরা?.?...”
আরমান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে ঘরের কোণে থাকা নিজের জ্যাকেটটা টেনে নিল, যার পকেটে সেই ছোট্ট রিভলভারটা সবসময় থাকে। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই জানলা দিয়ে একটা ছোট ড্রোন ভেতরে ঢুকে পড়ল। ড্রোনটা মৌমাছির মতো ভোঁ ভোঁ শব্দ করছে আর ওর গায়ে লাগানো লাল আলোটা পদ্মর মুখে এসে পড়ছে।
ড্রোন থেকে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“ডক্টর আরমান আলভীর, অভিনন্দন। আপনার বিয়ের উপহারটি গ্রহণ করুন। তবে সাবধান, প্যাকেজটি খুললে আপনার 'প্রাণ' চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।…”
আরমান এক গুলিতে ড্রোনটাকে ধ্বংস করে দিল। কিন্তু নিচ থেকে একটা ভারি বুটের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসছে। আরমান দরজার আড়ালে পজিশন নিল। দরজাটা সজোরে খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকল একজন সুবেশা মহিলা। লিন্ডার মতো উগ্র নয়, বরং অত্যন্ত মার্জিত তার সাজপোশাক। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, শুধু একটা নীল রঙের ছোট মখমলের বাক্স।
“কে আপনি?.?..”
আরমান বন্দুক তাক করে গর্জে উঠল।
মহিলাটি হাসল।
“শান্ত হোন ডক্টর। আমি শায়ানের রিপ্লেসমেন্ট। শায়ান এখন হাসপাতালে, গতরাতের হামলায় ওর অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমি এসপি অফিসের স্পেশাল এজেন্ট—নীলাঞ্জনা।…”
পদ্ম আরমানের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
“শায়ান ভাই হাসপাতালে?!.. কেন?.?.. কী হয়েছে ওনার?.?..”
নীলাঞ্জনা বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখল।
“লিন্ডাকে নিয়ে যাওয়ার পথে ওদের ভ্যানে হামলা হয়েছে। লিন্ডাকে ছিনিয়ে নিয়েছে দুবাইয়ের সেই 'ব্লু ডায়মন্ড' গ্রুপ। আর শায়ানকে ওরা রাস্তার ওপর ফেলে রেখে গেছে এক বার্তা হিসেবে। আরমান, এই বাক্সের ভেতর যা আছে, সেটা আপনার পরদাদীর সেই ডায়েরির শেষ পাতা।…”
আরমান অবাক হয়ে বাক্সটা খুলল। ভেতরে ডায়েরির সেই হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাটা। তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “নীল বিষ কোনো ওষুধ নয়, এটা একটা আদিম অভিশাপের চাবিকাঠি। যা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে লুকানো এক ব্রিটিশ আমলের গুপ্তধন— 'ব্লু ডায়মন্ড' উদ্ধার করা সম্ভব।…”
আরমান মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। “তার মানে এই সব মারামারি, পাচার—সবই ছিল এক বিশাল হীরে খোঁজার নাটক?.?.. আমার পরিবারের রক্ত দিয়ে ওরা এই পথ পরিষ্কার করতে চাইছে?.?..”
নীলাঞ্জনা গম্ভীর গলায় বলল,
“হীরেটা সাধারণ নয় আরমান। ওটা একটা রাসায়নিক তেজস্ক্রিয় পাথর। ওটা যার হাতে থাকবে, সে পুরো দেশের ওপর রাজত্ব করতে পারবে। আর লিন্ডা এখন সরাসরি সেই পাহাড়ের দিকে রওনা দিয়েছে যে পাহাড়ের ম্যাপ আপনার পরদাদীর ডায়েরিতে লুকানো আছে।…”
পদ্ম ডায়েরির পাতার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল,
“ডাক্তার মশাই!.. দেখুন!.. এই পাতায় আমার পরদাদীর হাতের একটা বিশেষ চিহ্ন আছে। এটা তো আমাদের সেই পুরোনো নীলকুঠির পুকুরপাড়ের শিব মন্দিরের নকশা!...”
আরমান চমকে উঠল।
“পদ্ম, তুমি ঠিক দেখেছ?.?..তার মানে আসল গুপ্তধন এই পাহাড়ে নয়, বরং আমাদের গ্রামের সেই মন্দিরের নিচেই রয়ে গেছে?.?..”
নীলাঞ্জনা ইশারা করল।
“আমাদের এখনই বেরোতে হবে। লিন্ডার দল ভুল পাহাড়ে খুঁজছে, ওরা ভুল বুঝতে পারলেই গ্রামে ফিরে আসবে। আমাদের তার আগেই মন্দিরের গোপন রাস্তাটা খুঁজে বের করতে হবে।…”
বৃষ্টির মধ্যে জিপটা যখন গ্রামের দিকে ছুটছে, আরমান পদ্মর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
“পদ্ম, হয়তো এটাই আমাদের শেষ লড়াই। তুমি কি ভয় পাচ্ছ?.?..”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,
“যেখানে জীবনের এত বড় জট খুলে গেছে, সেখানে মরতে আর ভয় কী?.?.. তবে একটা কথা আরমান…”
আরমান তাকালো। পদ্ম প্রথমবারের মতো ওর নাম ধরে ডেকেছে 'আরমান'। আরমানের বুকটা গর্বে ভরে উঠল।
“বল প্রাণ।…”
“যদি আমরা বেঁচে ফিরি, তবে কি এই সব হাঙ্গামা ছেড়ে আমরা কোনো দূরে পাহাড়ে গিয়ে ছোট একটা ঘর বাঁধব?.?.. যেখানে কোনো নীল বিষ থাকবে না, কোনো হীরে থাকবে না?.?...”
আরমান পদ্মর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“কথা দিলাম পদ্ম। ওই মন্দিরের রহস্য শেষ হলেই আমি আর তুমি হবো এক নতুন গল্পের শুরু।…”
হঠাৎ জিপের চাকা পাংচার হয়ে গেল। জিপটা রাস্তার ধারে একটা গর্তে ছিটকে পড়ল। আরমান মাথা বাঁচাতে গিয়ে স্টিয়ারিংয়ে আঘাত পেল। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার।
অন্ধকারের ভেতর থেকে অনেকগুলো মশাল এগিয়ে আসছে। ওরা গ্রামের মানুষ নয়। ওরা 'ব্লু ডায়মন্ড'-এর ভাড়াটে খুনি। তাদের নেতৃত্বে সেই লিন্ডা, যার মুখটা এখন ব্যান্ডেজে মোড়ানো।
“আরমান!... তোমার প্রেম আর কতদূর?.?.. আজ সেই মন্দিরের চাবি আমি তোমার বুক চিরে বের করব!...”
লিন্ডার পৈশাচিক হাসি বনের স্তব্ধতা ভেঙে দিল।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ