#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৪১
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
বৃষ্টির ঝাপটায় নীলকুঠির সদর দরজার কপাটগুলো সশব্দে আছড়ে পড়ছে। দরজায় দাঁড়ানো জরাজীর্ণ মানুষটার মুখ থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। বড় চাচা সৈয়দ ইকবাল!... সাড়ে চার বছর আগে যিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন, আজ তিনি এক প্রেতাত্মার মতো ফিরে এসেছেন।
রাইমা আর বড় চাচি ইয়াসমিন সৈয়দ চিৎকার করে ওনার কাছে দৌড়ে গেলেন। ইয়াসমিন সৈয়দ ওনার গায়ে লুটিয়ে পড়লেন।
“আপনি ফিরেছেন?.?.. আমি জানতাম আপনি মরেননি!..”
কিন্তু নায়লা সৈয়দ টেবিল থেকে এক চুলও নড়লেন না। ওনার হাতে থাকা রুপোর চামচটা থালার ওপর সজোরে আছড়ে পড়ল।
“থামো সবাই!... আগে নিশ্চিত হতে দাও উনি সত্যিই আমার বড় ভাই কি না।...”
আরমান বড় চাচার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। টর্চের আলো ওনার মুখে ফেলতেই আরমান শিউরে উঠল। বড় চাচার একদিকের গাল পুড়ে গেছে, আর ওনার চোখের মণি দুটো স্থির।
“বড় আব্বা... আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?.?..”
আরমান ওনার হাত ধরল। ওনার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।
সৈয়দ ইকবাল কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বললেন,
“আরমান... ওরা আমাকে মাটির নিচে এক অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে রেখেছিল। কিন্তু আজ... আজ নিশিন্দীপুরের আকাশ যখন লাল হয়ে উঠল, আমি পালিয়ে এলাম।..."
পদ্ম পর্দার আড়াল থেকে সব দেখছিল। ও লক্ষ্য করল, বড় চাচার গলার স্বরে সেই জমিদারী আভিজাত্য থাকলেও ওনার চাহনিতে এক গভীর ষড়যন্ত্রের ছাপ। ঠিক সেই সময় আশা দোতলার রেলিং ধরে নিচে উঁকি দিল। আশার যান্ত্রিক মস্তিস্ক যেন কোনো বিপদ সংকেত পেল। ও নিচু গলায় বলল,
“ভাইয়া... সাবধান!... ওনার শরীরে কোনো হৃদস্পন্দন নেই!...”
আরমান চমকে আশার দিকে তাকালো। আশা তো ভুল বলে না!... আরমান ঝট করে বড় চাচার কব্জি ধরল পালস দেখার জন্য।
“ছাড়ো আমায়!...”
সৈয়দ ইকবাল এক ঝটকায় আরমানকে সরিয়ে দিলেন। ওনার গায়ে অমানুষিক শক্তি।
“আমি জমিদার আশরাফুল আলমের বড় ছেলে। আজ থেকে এই বাড়ির চাবির থোকা আমার হাতে থাকবে।...”
নায়লা সৈয়দ উঠে দাঁড়ালেন। ওনার পরনের সাদা ধপধপে শাড়িটা আজ যেন আরও শুভ্র লাগছে।
“বড় ভাই, আপনি ফিরেছেন ভালো কথা। কিন্তু আব্বা এখন পুলিশের হেফাজতে। এই বাড়ির নিয়ন্ত্রণ এখন আমার হাতে। আপনি আগে নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন।...”
রাইমা পদ্মর দিকে এক পৈশাচিক দৃষ্টিতে তাকালো।
“দেখেছ ভাবি?.?.. আমার বাবা ফিরে এসেছেন। এবার বুঝবে এই বাড়িতে কার হুকুম চলে। তোমার ওই ডাক্তার বরের ডেমাক আর থাকবে না।...”
পদ্ম কিছু বলল না। ও আরমানের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। আরমান খুব নিচু স্বরে পদ্মকে বলল,
“পদ্ম, বড় আব্বার গায়ের গন্ধটা খেয়াল করেছ?.?.. ফরমালিন আর বারুদের গন্ধ। মানুষ তো এমন গন্ধ দেয় না!...”
রাতের শেষ প্রহর। পুরো বাড়িতে সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আরমান আর পদ্ম জাগছে। ওরা দোতলার বারান্দায় বসে নিচু স্বরে কথা বলছিল।
হঠাৎ লাইব্রেরি ঘর থেকে একটা গোঙানির শব্দ এল। আরমান রিভলভার হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল। পদ্ম লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরল।
ভেতরে ঢুকে ওরা দেখল, বড় চাচা সৈয়দ ইকবাল দাদাজান আশরাফুল আলমের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
বড় চাচার হাতে একটা ছোট নীল রঙের ডিভাইস।
“বড় আব্বা!... ওটা কী?.?..” আরমান গর্জে উঠল।
সৈয়দ ইকবাল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। ওনার চোখের মণি এখন পুরোপুরি নীল হয়ে গেছে।
“আরমান... তোর দাদা আমাকে মরতে দিয়েছিল যাতে আমিন এই জমিদারী পায়। কিন্তু আমি মরিনি। আমি এখন এক উন্নত সৃষ্টি। আমি এসেছি এই বংশের সেই শেষ হীরেটা নিতে যা দাদাজান গিলে ফেলেছেন!...”
আরমান আর পদ্ম স্তব্ধ হয়ে গেল। দাদাজান হীরেটা গিলে ফেলেছেন?!...
ঠিক সেই সময় নায়লা সৈয়দ ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে এলেন। ওনার হাতে একটা ছোট রিমোট।
“আমি জানতাম ইকবাল, তুমি ফিরে আসবে। কিন্তু তুমি জানো না, এই সাড়ে চার বছরে আমি তোমার চেয়েও ভয়ংকর শত্রু হয়ে উঠেছি।...”
নায়লা সৈয়দ রিমোটের একটা সুইচ চাপলেন। সাথে সাথে বড় চাচা সৈয়দ ইকবাল যন্ত্রণায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। ওনার কৃত্রিম চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এল কয়েকটা তার।
“পদ্ম!... আশাকে ডাকো!... বড় আব্বাকে ওরা একটা জ্যান্ত রিমোট কন্ট্রোল বোমা বানিয়ে পাঠিয়েছে!..”
আরমান চিৎকার করল।
রাইমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। ওর বাবার এই অবস্থা দেখে ও পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।
“ভাইয়া!... বাবাকে বাঁচাও!... ফুফিজান, আপনি এটা কী করছেন?.?..”
নায়লা সৈয়দ ঠান্ডা গলায় বললেন, “রাইমা, তোর বাবা সাড়ে চার বছর আগেই মারা গেছেন। এটা একটা যান্ত্রিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। একে ধ্বংস না করলে পুরো নীলকুঠি আজ উড়ে যাবে।...”
পদ্ম লণ্ঠনটা টেবিলে রেখে বড় চাচার কাছে গেল। ও দেখল বড় চাচার বুকের কাছে একটা লাল বাতি জ্বলছে। টাইমার শুরু হয়ে গেছে।
আরমান কাঁপতে কাঁপতে বড় চাচার মাথায় হাত রাখল।
“বড় আব্বা... আপনি কি আমাদের শুনতে পাচ্ছেন?.?..”
সৈয়দ ইকবাল এক মুহূর্তের জন্য স্বাভাবিক হলেন। ওনার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা রক্তরঙা জল পড়ল।
“আরমান... আমার পকেটে একটা ম্যাপ আছে... ওটা তোর বড় চাচি ইয়াসমিনকে দিস না... ও লিন্ডার সাথে হাত মিলিয়েছে...”
বড় চাচার কথা শেষ হওয়ার আগেই নায়লা সৈয়দ ওনার রিমোট দিয়ে বড় চাচাকে নিস্তেজ করে দিলেন। পুরো ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে গেল।
পরদিন সকালে।
সৈয়দ পরিবারের অন্দরমহলে কান্নার রোল। বড় চাচাকে আবার মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু রাইমার চোখে এখন এক অদ্ভুত প্রতিশোধের নেশা। ও মনে করছে পদ্ম আর আরমান মিলে ওর বাবাকে সরিয়ে দিয়েছে যাতে জমিদারী ওদের হাতে থাকে।
রাইমা রান্নাঘরে গিয়ে পদ্মর চায়ের কাপে একটা ছোট নীল রঙের লিকুইড মিশিয়ে দিল। “অনেক তো সেবা করেছ আরমান ভাইয়ার, এবার একটু নিজের সেবা করো পদ্ম।...”
পদ্ম যখন সেই চায়ের কাপটা হাতে নিল, আশা পেছন থেকে ওর হাতটা চেপে ধরল।
“পদ্ম ভাবী!... এই চা খাবেন না। এতে 'নীল বিষ' মেশানো আছে!...”
পদ্ম আর রাইমা—দুজনেই স্থির হয়ে গেল। রাইমার মুখোশ কি আজই খুলে যাবে?.?...
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ