#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৪২
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
বিকেলের মরা রোদে সোনার চাবিটা আশার হাতের তালুতে আগুনের মতো ঝিকমিক করছে। আরমান আর পদ্ম দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। আশার চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিস্ময়। ও দাদাজান আশরাফুল আলমের সেই বিশাল মেহগনি কাঠের সিন্দুকটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটা পুলিশ তল্লাশির সময়ও খুলতে পারেনি।
“ভাইয়া, দেখ!... এই চাবিটা দাদাজানের তসবিহ রাখার মখমলের ব্যাগের ভেতর লুকানো ছিল। একদম তলার দিকে সেলাই করা।..."
আশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
আরমান চাবিটা হাতে নিল। ওটার মাথায় খোদাই করা আছে একটা রাজকীয় ঈগল—যা সৈয়দ ইকবালের (বড় চাচা) ব্যক্তিগত সিলমোহর ছিল। আরমান পদ্মর দিকে তাকাল। পদ্মর মনে হলো, এই চাবিটা ঘোরানোর সাথে সাথেই হয়তো এমন কিছু বেরিয়ে আসবে যা আবার তাদের জীবন তছনছ করে দেবে।
“খুলুন আরমান। যা আছে সামনে আসুক।..."
পদ্ম শক্ত গলায় বলল।
আরমান চাবিটা সিন্দুকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘোরাতেই একটা ভারি যান্ত্রিক শব্দ হলো। 'ক্লিক!' সিন্দুকের পাল্লাটা খুলতেই দেখা গেল ভেতরে কোনো টাকা-পয়সা বা গয়না নেই। আছে কেবল একটা পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ড আর একটা হাতে আঁকা ম্যাপ, যাতে নিশিন্দীপুরের মাটির নিচের সুড়ঙ্গগুলোর পূর্ণাঙ্গ নকশা দেওয়া।
কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল একটা সিল করা খাম, যার ওপরে লেখা— 'সৈয়দ আরমান আলভীর জন্য, আমার মৃত্যুর পর।'
আরমান খামটা খুলল। ভেতরে একটা চিরকুট, যাতে দাদাজান আশরাফুল আলমের কাঁপা কাঁপা হাতের লেখা:
“আরমান, তুই যখন এই চিঠি পড়বি, আমি হয়তো অন্ধকার কুঠুরিতে। কিন্তু জেনে রাখিস, লিন্ডা বা আমিন কেউ আসল শত্রু নয়। আসল শত্রু হলো সে, যে তোর বড় চাচা ইকবালকে সাড়ে চার বছর আগে সরিয়ে দিয়েছিল। আরমান, এই বাড়িতে একজন 'অদৃশ্য জমিদার' আছে, যে পর্দার আড়াল থেকে সব কলকাঠি নাড়ে।...”
আরমানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। “অদৃশ্য জমিদার?..?.. তবে কি বড় আব্বাকে লিন্ডা নয়, ঘরেরই কেউ আটকে রেখেছিল?.?..”
ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির ভারি পর্দাটা নড়ে উঠল। ফুফিজান নায়লা সৈয়দ ভেতরে ঢুকলেন। ওনার পরনে আজ গাঢ় কালো পাড়ের এক সাদা শাড়ি, হাতে সেই চাবির গোছাটা নেই। ওনার চাহনি আজ কেমন যেন পাথুরে।
“সিন্দুকটা খুলেই ফেললে আরমান.?..? আমি ভেবেছিলাম তুমি আরও বুদ্ধিমান।...”
নায়লা সৈয়দ শান্ত গলায় বললেন।
পদ্ম এক পা এগিয়ে গেল। “ফুফিজান, আপনি কি জানতেন এই সিন্দুকে কী আছে?.?.. অদৃশ্য জমিদার বলতে দাদাজান কাকে বুঝিয়েছেন?.?..”
নায়লা সৈয়দ একটা তিক্ত হাসি হাসলেন।
“জমিদারী কোনো খেলা নয় বউমা। এই বাড়ির ছেলেরা যখন ব্যবসার নামে বাইরে গিয়ে আমোদ-প্রমোদে মত্ত থাকতো, তখন এই জমিদারি আমি এক হাতে সামলেছি। কিন্তু ইকবাল... ইকবাল চাইল সব অধিকার কেড়ে নিতে। সে চাইল নীল বিষের ফর্মুলা বিদেশের কাছে বেচতে। আমি তা হতে দিইনি।...”
আরমান স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তবে কি আপনিই বড় আব্বাকে সাড়ে চার বছর গায়েব করে রেখেছিলেন?.?.. আপনিই লিন্ডার সাথে আপোষ করেছিলেন?.?..”
“আপোষ নয় আরমান, আমি লিন্ডাকে ব্যবহার করেছি।...”
নায়লা সৈয়দ জানলার দিকে তাকালেন।
“কিন্তু লিন্ডা বড্ড বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠল। আর তোমার ওই পদ্ম... ও বড্ড বেশি নাক গলাতে শুরু করল।...”
হঠাৎ বারান্দায় ছোট চাচা সোবহান সৈয়দের স্ত্রী সাবিনা সৈয়দ দৌড়ে এলেন। ওনার হাতে একটা ওয়াকিটকি।
“আপা!... মেজো ভাই (আমিন সৈয়দ) জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন!.. পুলিশ ভ্যান পাহাড়ে উল্টে গেছে!...”
পুরো ঘরটা এক নিমেষে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। আরমান রিভলভারটা হাতে নিল।
“শোনো ফুফিজান, আপনি যা করেছেন তার বিচার পরে হবে। এখন আমাদের আমিন সৈয়দকে থামাতে হবে। ও যদি ওই নকশাটা পেয়ে যায়, তবে পুরো নিশিন্দীপুর উড়ে যাবে।...”
রাত নেমেছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে নিশিন্দীপুরে।
আরমান আর পদ্ম জিপ নিয়ে বর্ডারের কাছের সেই পাহাড়ের দিকে ছুটছে। পেছনে শায়ান আর নীলাঞ্জনা। আশাকেও সাথে নেওয়া হয়েছে কারণ ওর সেন্সর আমিন সৈয়দকে ট্র্যাক করতে পারে।
পাহাড়ের একটা গোপন গুহার মুখে দেখা গেল আমিন সৈয়দ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। ওনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন দীর্ঘকায় পুরুষ, যার মুখটা রেইনকোটে ঢাকা।
“আমিন, তুমি বড্ড দুর্বল। নীল বিষ তোমার মস্তিস্ক খেয়ে ফেলেছে।...”
লোকটা কর্কশ গলায় বলল।
আরমান জিপ থেকে নেমে চিৎকার করল,
“থামো!... কে তুমি?.?..”
লোকটা রেইনকোটের হুডটা নামাল। আরমান আর পদ্ম—দুজনেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। এ কি সম্ভব?.?..
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সৈয়দ ইকবাল!... কিন্তু ওনার গলার সেই নীল দাগটা নেই, ওনার চাহনি একদম সজাগ। তবে কি সেদিন যে ফিরে এসেছিল সে ক্লোন ছিল?.?.. আর এই মানুষটাই কি আসল বড় চাচা?.?..
“আরমান... আমার সুযোগ্য ভ্রাতুষ্পুত্র।..."
সৈয়দ ইকবাল হাসলেন।
“আমি সাড়ে চার বছর গায়েব ছিলাম না। আমি দুবাইয়ে বসে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছি। নায়লা ভেবেছিল সে আমাকে বন্দি করেছে, কিন্তু ওটা ছিল আমারই দেওয়া এক খেলনা। আমিই সেই অদৃশ্য জমিদার।...”
পদ্ম আরমানের হাত ধরল। “আরমান, তার মানে রাইমার বাবা মরেনি। সে এতদিন সবার সাথে খেলা করেছে!...”
সৈয়দ ইকবাল ওনার পকেট থেকে একটা রিমোট বের করলেন।
“আরমান, আশার ভেতরে যে চিপটা আছে, ওটার মাস্টার কন্ট্রোল এখন আমার হাতে। আমি এক টিপেই ওকে আমার দাসী বানিয়ে ফেলতে পারি।...”
সারাহর চোখের মণি আবার নীল হতে শুরু করল। ও যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল।
“ভাইয়া!... আমার মাথায় আগুন জ্বলছে!... আমাকে বাঁচাও!...”
আরমান দেখল ওর সামনে দুই পথ—হয় নিজের বোনকে বাঁচানো, নয়তো এই খুনি বড় চাচাকে ধরা।
ঠিক সেই মুহূর্তে গুহার ওপর থেকে একঝাঁক পাথর গড়িয়ে পড়ল। আর সেই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল রাইমা সৈয়দ। রাইমার হাতে একটা ইনজেকশন গান।
“বাবা!.. তুমি ফিরেছ!..”
রাইমা পাগলের মতো হাসছে। “এবার দেখো, আমি আরমান ভাইয়াকে তোমার হাতে তুলে দেব।....”
রাইমা আরমানের দিকে লক্ষ্য করে ইনজেকশনটা ছুঁড়ল, কিন্তু পদ্ম বিদ্যুৎবেগে সামনে এসে আরমানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ইনজেকশনটা গিয়ে লাগল পদ্মর বাহুতে।
“পদ্ম!...”
আরমান চিৎকার করে উঠল।
পদ্মর চোখ দুটো বুজে এল। ওর শরীর নীল হতে শুরু করল। নীল বিষ!....
— — —
পদ্মর শরীরটা যখন আরমানের কোলের ওপর ঢলে পড়ল, তখন চারপাশের বৃষ্টির শব্দ যেন এক মরণ চিৎকারে পরিণত হলো। রাইমার ছোঁড়া সেই ইনজেকশনে ছিল 'নীল বিষের' কনসেনট্রেটেড ডোজ।
পদ্মর ফর্সা ত্বক দ্রুত নীল হতে শুরু করেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে।
“পদ্ম!... চোখ খোলো!... আমার দিকে তাকাও!...”
আরমান আর্তনাদ করে উঠল। ওর ডাক্তারী মস্তিস্ক জানে, আর মাত্র দশ মিনিট। এর মধ্যে অ্যান্টিডোট না দিলে পদ্মর হার্ট চিরতরে থেমে যাবে।
সৈয়দ ইকবাল (বড় চাচা) পাথরের মতো দাঁড়িয়ে হাসছেন। ওনার রেইনকোটের ওপর বৃষ্টির জল পিছলে পড়ছে।
“বড্ড দেরি হয়ে গেল আরমান। রাইমা যেটা করেছে, সেটা আমিই ওকে শিখিয়েছিলাম। যে মেয়ে আমার সাম্রাজ্যের পথে কাঁটা হবে, তাকে এভাবেই সরতে হয়।...”
রাইমা পাগলের মতো হাসছে। “দেখলে আরমান ভাইয়া?.?.. তোমার আদরের বউ এখন নীল হয়ে মরছে!... এবার আমার কাছে ফিরে আসো, আমি তোমাকে বাঁচাব!...”
“চুপ কর হারামি!...”
আরমান গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। ও ঝট করে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট ভায়াল বের করল। এটা ও ল্যাবে সবসময় সাথে রাখত—একটি নিউট্রালাইজার।
ও কাঁপা হাতে পদ্মর ঘাড়ে ওটা পুশ করল।
পদ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খিঁচুনি দিয়ে উঠল। ওর জ্ঞান ফেরেনি, কিন্তু শরীরটা নীল হওয়া আপাতত থামল।
আশা তখন যন্ত্রণায় গুহার দেওয়ালে মাথা ঠুকছে। সৈয়দ ইকবালের হাতের রিমোটটা ওর মস্তিস্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠাচ্ছে।
“ভাইয়া... আমাকে মেরে ফেলো... আমার কষ্ট হচ্ছে!...”
আরমান দেখল ওর সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে মৃতপ্রায় স্ত্রী, অন্যদিকে যন্ত্রণাকাতর বোন। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এই বংশের সবচেয়ে বড় শয়তান—তার নিজের বড় চাচা।
ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে এল নায়লা সৈয়দ। ওনার হাতে একটা পুরোনো দোনলা বন্দুক। ওনার শাড়ি ছিঁড়ে গেছে, কপালে রক্তের দাগ।
“ইকবাল!... তোর খেলা আজ আমি শেষ করব!...” নায়লা সৈয়দের কণ্ঠস্বর পাহাড়ের গুহায় প্রতিধ্বনি হলো।
সৈয়দ ইকবাল ভ্রু কুঁচকালেন। “নায়লা.?..? তুই জেল থেকে পালানো ভাইকে না বাঁচিয়ে এখানে কী করছিস?.?.. তোর তো উচিত ছিল আমিনের পাশে থাকা।...”
“আমিন ভুল করেছে, কিন্তু তুই পিশাচ হয়ে গেছিস!...”
নায়লা সৈয়দ বন্দুক তাক করলেন।
“তুই সাড়ে চার বছর আমাকে ধোঁকা দিয়েছিস। আমি ভেবেছিলাম তোকে বন্দি করেছি, অথচ তুই বাইরে থেকে লিন্ডাকে দিয়ে সব করাচ্ছিলি!...”
রাইমা দৌড়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“ফুফিজান!... বন্দুক নামান!... আমার বাবাকে মারলে আমি আপনার সব গোপন কথা পুলিশকে বলে দেব!...”
হঠাৎ গুহার ভেতর থেকে একটা বিকট শব্দ হলো। দাদাজান আশরাফুল আলমের সেই সিন্দুকের সোনার চাবিটা যা আরমানের পকেটে ছিল, সেটা থেকে একটা নীল আলো বিচ্ছুরিত হতে শুরু করল।
সৈয়দ ইকবাল চমকে উঠলেন।
“ওটা কী?.? ওই চাবিটা তো আমার সিন্দুকের ছিল!..”
আরমান দেখল চাবিটা আসলে একটা 'প্রক্সিমিটি ডিটেক্টর'। মানে এই গুহার ভেতরেই কোথাও সেই আসল 'ব্লু ডায়মন্ড ২' এর খনি বা ভল্ট আছে।
গুহার দেয়ালটা আপনাআপনি সরে যেতে শুরু করল। ভেতরে দেখা গেল এক বিশাল ল্যাবরেটরি, যা আমিন সৈয়দের ল্যাবের চেয়েও দশগুণ বড়। সেখানে শত শত কাঁচের জারে মানুষের মস্তিস্ক সংরক্ষিত করা আছে।
“স্বাগতম আরমান, আমার আসল ল্যাবে!...”
সৈয়দ ইকবাল দুহাত ছড়িয়ে দিলেন।
“এখানেই আমি আশাকে বানিয়েছি। এখানেই আমি তোর অ্যান্টিবডি নিয়ে গবেষণা করব।...”
আশা হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। ওর চোখ দুটো লাল থেকে কালচে হয়ে এল। ও যান্ত্রিক গলায় বলল,
“মাস্টার কন্ট্রোল ওভাররাইড। চাবি শনাক্ত হয়েছে। সেলফ-ডিস্ট্রাকশন সিকোয়েন্স শুরু হচ্ছে।...”
সৈয়দ ইকবাল আতঙ্কিত হয়ে রিমোট টিপতে শুরু করলেন। “না!... আশা থামো!... আমি নির্দেশ দিচ্ছি!...”
পদ্ম হঠাৎ চোখ খুলল। ওর চোখে এক অমানুষিক তেজ। ও আরমানের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো।
“আরমান... ওই চাবিটা... ওটা ঘুরালে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। আপনি ওটা ঘোরান!... এই অভিশপ্ত বংশ আজই শেষ হোক!...”
রাইমা লিন্ডার মতো একটা ছুরি বের করে পদ্মর দিকে ধেয়ে এল।
“তুই মরবি না কেন?.?.. তোর জন্য সব শেষ হচ্ছে!...”
পদ্ম রাইমার হাতটা ধরে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে দিল।
“জমিদার বাড়ির বউ হতে গেলে শুধু গয়না পরলে হয় না রাইমা, সাহসও থাকতে হয়!...”
আরমান চাবিটা গুহার দেওয়ালে থাকা সেই খাজে ঢুকিয়ে দিল। পুরো পাহাড় কাঁপতে শুরু করল।
“পালাও সবাই!... এই পাহাড় ধসে পড়বে!...”
শায়ানের গলা শোনা গেল নিচ থেকে।
আরমান এক হাতে পদ্মকে আর অন্য হাতে আশাকে জড়িয়ে ধরল। নায়লা সৈয়দ বন্দুকটা নামিয়ে ইকবালের দিকে তাকালেন।
“তুই হারলি ইকবাল। সৈয়দ বংশের পাপ আজ এই ধুলোয় মিশবে।...”
সৈয়দ ইকবাল পাগলের মতো ওনার ল্যাবের দিকে দৌড়ে গেলেন হীরেগুলো বাঁচাতে। রাইমাও বাবার পিছু নিল। ঠিক সেই সময় এক বিশাল পাথরের চাঁই খসে পড়ল গুহার প্রবেশপথে।
“নাআআআ!...”
সৈয়দ ইকবালের শেষ চিৎকার শোনা গেল।
আরমানরা কোনোমতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এল। চোখের সামনে পুরো পাহাড়টা এক বিশাল বিস্ফোরণে ধসে পড়ল। নিশিন্দীপুরের সেই অভিশপ্ত 'নীল বিষের' কারখানা চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল।
পরদিন সকালে।
নীলকুঠির বারান্দায় রোদ উঠেছে। আশা এখন শান্ত হয়ে বসে আছে, ওর মস্তিস্কের সেই চিপটা চিরতরে নিস্ক্রিয় হয়ে গেছে। ও এখন শুধুই আরিশা আশা। নায়লা সৈয়দ পুলিশের কাছে নিজেকে সোপর্দ করেছেন—নিজের ভাইয়ের অপরাধের সাক্ষী দিতে।
পদ্ম বারান্দায় আরমানের পাশে এসে দাঁড়ালো। ওর শরীরে এখনো বিষের কিছুটা রেশ আছে, কিন্তু ও হাসছে।
“আরমান, বড় চাচা আর রাইমা কি বেঁচে আছে?.?..”
পদ্ম নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
আরমান আকাশের দিকে তাকালো।
“পাহাড়ের ওত গভীরে যারা পাপের ঘর বাঁধে পদ্ম, প্রকৃতি তাদের ক্ষমা করে না। আজ থেকে নিশিন্দীপুর মুক্ত।...”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল।
“এখন আমাদের পরিবারে কোনো হীরে নেই আরমান। আমরা কি খুব গরিব হয়ে গেলাম?.?..”
আরমান পদ্মকে জড়িয়ে ধরল। “আমাদের সবচেয়ে বড় হীরে তো তুমি পদ্ম। আর আমাদের এই ভালোবাসা। হীরে দিয়ে ঘর সাজানো যায়, কিন্তু সংসার সাজাতে লাগে একটা পরিষ্কার মন।...”
হঠাৎ বারান্দার নিচে শায়ান জিপ নিয়ে এল।
“আরমান!... শোনো!... দাদাজান আশরাফুল আলম জেল থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে লেখা আছে— 'আরমান, বড় চাচার ল্যাবে একটা গোপন লকার ছিল, যেটার চাবি তোমার কাছেই আছে। ওটাতে হীরে নয়, ওটাতে আছে তোমার বড় আম্মার (সৈয়দ ইকবালের স্ত্রী) আসল পরিচয়।.."
আরমান আর পদ্ম একে অপরের দিকে তাকালো। রহস্য কি তবে এখনো বাকি?.?...
— — —
নিশিন্দীপুরের সেই অভিশপ্ত পাহাড়টা এখন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। ধোঁয়ার কুণ্ডলী এখনো আকাশের দিকে উঠছে। আরমান আর পদ্ম নীলকুঠির বারান্দায় দাঁড়িয়ে শায়ানের আনা সেই চিঠিটা পড়ল। দাদাজান আশরাফুল আলমের হাতের লেখা এখন অনেক বেশি কাঁপাকাঁপা, যেন তিনি মৃত্যুর খুব কাছ থেকে এই সত্যটা লিখে পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে লেখা ছিল:
“আরমান, সৈয়দ ইকবাল যাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিল, সেই ইয়াসমিন আসলে কোনো সাধারণ ঘরের মেয়ে নয়। সে ছিল লিন্ডার আপন বড় বোন!... সাড়ে চার বছর আগে ইকবাল যখন নিঁখোজ হয়, তখন ইয়াসমিনই লিন্ডাকে এই বাড়িতে ঢোকার গোপন পথ বাতলে দিয়েছিল। ইয়াসমিনই সেই আসল বিষ, যে আমার ছেলেদের একে অপরের শত্রু বানিয়েছে।...”
আরমান আর পদ্ম—দুজনেই যেন বজ্রাহত হলো। তবে কি বড় চাচি ইয়াসমিন সৈয়দই এই সবকিছুর মূল হোতা?.?.. তিনি কি রাইমার মা হয়েও নিজের মেয়ের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেললেন?.?...
“আরমান!... বড় চাচি কোথায়?.?.. ওনাকে তো আজ সারাদিন দেখা যায়নি!...”
পদ্ম আর্তনাদ করে উঠল।
ঠিক সেই সময় অন্দরমহলের ভেতর থেকে এক বিকট হাসির শব্দ শোনা গেল। হাহা... হাহা...।
আরমান আর শায়ান রিভলভার হাতে নিয়ে অন্দরমহলে ঢুকল। গিয়ে দেখল, নায়লা সৈয়দের সেই বিশাল ঘরটায় ইয়াসমিন সৈয়দ বসে আছেন। ওনার চুলে আজ কোনো সিথান নেই, পরনে এক রক্তবর্ণের শাড়ি। ওনার কোলে রাখা সেই সোনার চাবির লকারটা, যা পাহাড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
“এসো আরমান!... আব্বাজান তো বড্ড বেশি মুখ খুলে ফেলেছেন।..."
ইয়াসমিন সৈয়দ শান্ত গলায় বললেন।
ওনার কণ্ঠস্বরে এখন আর সেই অসহায় বিধবার সুর নেই, আছে এক শীতল কাঠিন্য।
“বড় চাচি!... রাইমা কোথায়?.?.. ও কি পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছে?.?.”
আরমান চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।
ইয়াসমিন সৈয়দ একটা নিস্পৃহ হাসি দিলেন।
“রাইমা বড্ড বোকা ছিল। ও ভেবেছিল ওর বাবা ওকে ভালোবাসে। কিন্তু ইকবাল তো কাউকেই ভালোবাসত না, এমনকি আমাকেও না। আমি লিন্ডার বোন হতে পারি, কিন্তু আমি ইকবালের চেয়েও বড় খেলোয়াড়।...”
পদ্ম এক পা এগিয়ে গেল। “আপনি কি জানতেন বড় চাচা ল্যাবে কী করছেন?.?.. আপনি কেন ওনাকে থামালেন না?.?..”
“থামাব কেন?.?.. আমিই তো ওনাকে আইডিয়া দিয়েছিলাম।...”
ইয়াসমিন সৈয়দ লকারটা খুললেন।
ভেতরে হীরে নেই, আছে একগুচ্ছ দলিল।
“নিশিন্দীপুরের এই পুরো জমিদারি এখন আমার নামে। আশরাফুল আলম সাহেব যখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন, তখন আমি ওনার টিপসই নিয়ে সব নিজের নামে করে নিয়েছি। আরমান, এই নীলকুঠি এখন আমার!...”
শায়ান গর্জে উঠল।
“আইন কি এতই সহজ ইয়াসমিন বেগম?.?.. জালিয়াতির দলিলে জমিদারি পাওয়া যায় না। পুলিশ আপনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।....”
ইয়াসমিন সৈয়দ পকেট থেকে একটা রিমোট বের করলেন। “পুলিশ.?..? তোমরা ভুলে যাচ্ছ আরমান, এই বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আমার শ্বশুর, কিন্তু এটার নিচে বিস্ফোরক বিছিয়েছি আমি। যদি এই দলিলগুলো নিয়ে আমি বর্ডার পার হতে না পারি, তবে পুরো নীলকুঠি আজ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।...”
আশা পেছন থেকে এসে আরমানের হাত ধরল।
“ভাইয়া... ওনার হার্টবিট অস্বাভাবিক। ওনার শরীরেও সেই একই মেকানিজম আছে যা লিন্ডার ছিল!...”
আরমান দেখল ইয়াসমিন সৈয়দের কানের নিচে একটা ছোট চিপ জ্বলছে। ও বুঝতে পারল, এই পুরো পরিবারটাই এক বিচিত্র সাইবর্গ প্রযুক্তির জালে আটকা পড়েছে।
“চাচি, দয়া করে থামুন। রাইমা হয়তো বেঁচে আছে, আপনি কি ওকে দেখতে চান না?.?..”
পদ্ম মিনতি করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে এক বীভৎস অবয়ব ভেতরে ঢুকল। ধুলো আর রক্তে মাখা শরীরে রাইমা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসছে। ওর এক হাত অবশ হয়ে ঝুলছে।
“মা... তুমি আমাকে ফেলে চলে এলে?.?..”
রাইমার গলায় এক অমানুষিক হাহাকার।
“বাবা তো পাথরের নিচে চাপা পড়ল, তুমি একবারও তাকালে না?.?..”
ইয়াসমিন সৈয়দ রাইমার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকালেন। ওনার সেই পাথুরে হৃদয়ে কি মাতৃত্বের কোনো ছিটেফোঁটা আছে?
“রাইমা... তুই ফিরেছিস?.?.” ইয়াসমিন সৈয়দের হাত থেকে রিমোটটা আলগা হয়ে গেল।
রাইমা ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর চোখে এখন আগুনের লেলিহান শিখা।
“মা, তুমি আর বাবা মিলে আমাকে শেষ করে দিলে। আজ আমি তোমাকে একা মরতে দেব না!...”
রাইমা এক ঝটকায় ইয়াসমিন সৈয়দের হাতের রিমোটটা কেড়ে নিয়ে সেটা সজোরে মেঝের ওপর আছড়ে ফেলল। পুরো বাড়িতে এক তীব্র সাইরেন বাজতে শুরু করল। বিস্ফোরণের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে!...
“সবাই বেরোও!.. জলদি!...” শায়ান চিৎকার করল।
আরমান এক হাতে পদ্মকে আর অন্য হাতে আশাকে নিয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু রাইমা আর ইয়াসমিন সৈয়দ অন্দরমহলেই রয়ে গেলেন। মা আর মেয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল—একজন ক্ষমতার লোভে অন্ধ, অন্যজন প্রতিশোধে পাগল।
এক বিশাল বিস্ফোরণে নীলকুঠির পেছনের অংশ ধসে পড়ল। আগুনের শিখা রাতের আকাশকে গ্রাস করল।
পরদিন সকালে।
নীলকুঠির ধ্বংসস্তূপের সামনে আরমান আর পদ্ম দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসমিন সৈয়দ আর রাইমার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। হয়তো মাটির তলার সেই পাপের গহ্বরেই তারা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
পুলিশের গাড়িগুলো একে একে বিদায় নিচ্ছে। নিশিন্দীপুরের আকাশ আজ অদ্ভুত নীল।
আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল।
“পদ্ম, আমাদের সব অতীত আজ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই বাড়ির জমিদারি আজ আমি সরকারের হাতে তুলে দেব। এখানে একটা বড় হাসপাতাল আর স্কুল হবে।...”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল।
“এটাই সবচেয়ে ভালো হবে আরমান। এই জমি থেকে সব বিষ মুছে ফেলতে হবে।...”
আশা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসছে। ও এখন একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো হাসতে পারে। ওর সেই যান্ত্রিকতা এখন শুধুই এক দুঃস্বপ্ন।
শায়ান জিপ থেকে হাত নাড়ল। “আরমান!... শহরের ল্যাব থেকে রিপোর্ট এসেছে। তোর অ্যান্টিবডি থেকে আমরা সফলভাবে প্রতিষেধক তৈরি করতে পেরেছি। হাজার হাজার মানুষ এবার বাঁচবে!...”
আরমান হাসল। ও পদ্মর কপালে একটা চুমু খেল। “দেখলে পদ্ম?.!.. শেষ পর্যন্ত নীল বিষ হেরে গেল, আর আমাদের ভালোবাসা জিতে গেল।...”
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ