#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৪৬
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
সাত দিন পর।
ঢাকার গুলশানের সেই বিশাল ড্রয়িংরুমে আজ রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। তবে আজকের রান্নায় কোনো বাবুর্চি নেই। অন্দরমহলের সব বউরা আজ এক হেঁশেলে।
সেজো চাচি স্বপ্না সৈয়দ (সেজো চাচার স্ত্রী) আর সাবিনা সৈয়দ (ছোট চাচার স্ত্রী) মিলে বিশাল এক হাঁড়ি পোলাও দমে বসিয়েছেন। আর তাদের সাহায্য করছে পদ্ম। পদ্ম একমনে সালাদ কাটছিল, ঠিক তখনই সাবিনা চাচি এসে পদ্মর মাথায় হাত রাখলেন।
“পদ্ম রে, সেদিন নিশিন্দীপুরের ওই মরণফাঁদ থেকে তুই আর আরমান না থাকলে আজ আমার সাবিহা-সাবরিনাকে হারাতাম। তোকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নেই।…”
সাবিনা সৈয়দের চোখে কৃতজ্ঞতার জল।
পদ্ম হেসে ওনার হাত ধরল।
“চাচি, ধন্যবাদ কেন?.?.. আমরা তো একই বৃন্তের ফুল। সাবিহা-সাবরিনা আমারও বোন। এখন থেকে ওদের কোনো নীল বিষ নয়, শুধু ভালোবাসার টিকা দেওয়া হবে।…”
স্বপ্না সৈয়দ পাশ থেকে মশলা পেষাতে পেষাতে হাসলেন।
“ঠিক বলেছিস মা। আমাদের সামিউল আর সোবহান হয়তো ভুল পথে গিয়েছিল, কিন্তু ওদের সন্তানরা আজ এক হয়েছে এটাই বড় পাওয়া। এই যে শাফিন আর শিরিন সারাদিন আশার পেছনে ঘুরঘুর করছে, এটাই তো আসল জমিদারি।…”
ওদিকে বসার ঘরে দাদাজান আশরাফুল আলম আর দাদী আলেয়া বেগম পাশাপাশি বসেছেন। দাদী আজ অনেকদিন পর ওনার সেই রুপোর পানদানিটা বের করেছেন। ওনার সামনে গোল হয়ে বসে আছে সৈয়দ বংশের বর্তমান প্রজন্ম—আরমান, শিলা, শাফিন, শিরিন, সাবিহা, সাবরিনা আর রাইমা।
“দাদাজান, একটা গল্প বলুন না!...” ছোট সাবরিনা আবদার করল।
আশরাফুল আলম সাহেব ওনার চশমাটা ঠিক করে নিয়ে আরমানের দিকে তাকালেন।
“গল্প তো তোরাই তৈরি করলি দাদুভাই। আমি শুধু এই ধ্বংসস্তূপের ওপর এক নতুন প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর দেব। আমি ঠিক করেছি, নিশিন্দীপুরের সেই ধসে পড়া নীলকুঠির জায়গায় আমরা একটা 'সৈয়দ ফ্যামিলি চ্যারিটেবল কমপ্লেক্স' করব। যেখানে স্কুল, হাসপাতাল আর বৃদ্ধাশ্রম—সব থাকবে।…”
আরমান মাথা নেড়ে সায় দিল। ও বড় আব্বা সৈয়দ ইকবালের কাঁধে হাত রেখে বসল।
“আর দাদাজান, ওই হাসপাতালের প্রধান দায়িত্বে থাকবে আমাদের এই পরিবারের সবাই। শিলা মেডিকেলে ভর্তি হবে, শাফিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে—সবাই মিলে আমরা ওই এলাকাটাকে পাল্টে দেব।…”
রাইমা এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল। ওনার এক হাত এখনো কিছুটা অবশ, কিন্তু মনের সব বিষবাষ্প ধুয়ে গেছে। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাদীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
“দাদী, আমি কি ওই কমপ্লেক্সের আর্ট স্কুলে বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাতে পারি?.?.. আমার এই হাতটা হয়তো এখন আর ল্যাবরেটরির কাজ করতে পারবে না, কিন্তু রঙ-তুলি তো ধরতে পারবে।…”
রাইমার কণ্ঠে এক স্নিগ্ধ মিনতি।
আলেয়া বেগম রাইমাকে টেনে পাশে বসালেন।
“অবশ্যই পারবি দিদিভাই। তোর আঁকা ছবিতেই তো এই বাড়ির দেওয়ালগুলো আবার সেজে উঠবে।…”
এমন সময় আরমান ইশারায় পদ্মকে বাগানে ডেকে নিল। শরতের বিকেলের মিষ্টি রোদ বাগানের প্রতিটি পাতায় চিকচিক করছে। নীল অপরাজিতার ঝাড়গুলো বাতাসে দুলছে, কিন্তু সেই ফুলে আর কোনো বিষ নেই—আছে শুধু সৌন্দর্য।
আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল।
“পদ্ম, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এই মোহনায় পৌঁছালাম। এখন পরিবারটা আবার এক হয়েছে। সাবিনা চাচি আর স্বপ্না চাচিরা এখন আমাদের পরম আত্মীয়।…”
পদ্ম আরমানের চোখের দিকে তাকালো।
“হ্যাঁ আরমান। এই বন্ধনটাই তো চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি কি লক্ষ্য করেছেন?.?.. দাদী আজ আপনার জন্য একটা বিশেষ আঙটি বের করে রেখেছেন।…”
আরমান হাসল। ও পকেট থেকে একটা ছোট মখমলের কৌটা বের করল। ভেতরে সেই দাদীর দেওয়া হীরেটা বসানো একজোড়া আঙটি।
“পদ্ম, এই হীরেটা দাদী আমাকে দিয়েছেন আমাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য। আমি চাই, আমরা শুধু এই পরিবারের অভিভাবক হয়েই থাকব না, আমরা আমাদের নিজেদের ছোট এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখব।….”
আরমান নিচু স্বরে বলল।
পদ্ম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। আরমান আলতো করে পদ্মর আঙুলে আঙটিটা পরিয়ে দিল।
ঠিক সেই সময় অন্দরমহল থেকে দাদী আলেয়া বেগমের হাকডাক শোনা গেল—
“ওরে আরমান, পদ্ম! তোরা কোথায়?.?.. খাবার ঠান্ডা হয়ে গেল!.. সবাই মিলে এক টেবিলে না বসলে আজ তোর দাদাজান খাওয়া শুরু করবেন না!..”
আরমান আর পদ্ম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। ওরা দৌড়ে ভেতরে গেল। বিশাল খাবার টেবিলে আজ দশ-বারোজন মানুষ। সামিউল সৈয়দের ছেলেমেয়েরা আর সোবহান সৈয়দের মেয়েরা মিলে হৈচৈ করছে। রাইমা আর আশা মিলে সবাইকে প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে।
দাদাজান আশরাফুল আলম খাবারের থালা সামনে নিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হলেন। ওনার চোখ ভিজে এল।
“আজ আমার পাঁচ ছেলের ঘর আবার এক হলো। আয়লা (আরমানের মা) যেখানেই থাকুক, ও আজ খুব খুশি হবে।…”
সৈয়দ পরিবারের এই সুন্দর বন্ধন যেন শরতের আকাশের মেঘের মতো নির্মল হয়ে উঠল। বিষের নীল আভা মুছে গিয়ে সেখানে এখন ভালোবাসার রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
— — —
সৈয়দ ভিলা আজ কানায় কানায় পূর্ণ। যে অন্দরমহলে এক সময় বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের ফিসফাস শোনা যেত, আজ সেখানে ছোট ছোট ভাইবোনদের খিলখিল হাসি আর বড়দের তৃপ্তির নিঃশ্বাস। আলেয়া বেগম দাদী আজ বড্ড খুশি, ওনার দুই দুই ছেলের বউ স্বপ্না আর সাবিনা আজ ওনার দুই হাতের মতো পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রাতের খাবারের পর সব ভাইবোন মিলে ছাদে উঠেছে। বিশাল গোল চাঁদটা আজ আকাশের ঠিক মাঝখানে। রাইমা এখন অনেক শান্ত, ও আশার চুলে বিনুনি করে দিচ্ছে। শাফিন আর সাবিহারা মিলে গোল হয়ে বসে ল্প করছে। আরমান আর পদ্ম ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল।
“আরমান ভাইয়া!...”
শাফিন (সেজো চাচার ছেলে) হঠাৎ ডাকল।
“আমরা ঠিক করেছি নিশিন্দীপুরের সেই কমপ্লেক্সে আমরা একটা বিশাল লাইব্রেরি করব। যেখানে শুধু বিজ্ঞানের বই নয়, আপনার আর পদ্ম ভাবির এই বীরত্বের গল্পও লেখা থাকবে।…”
আরমান হেসে শাফিনের মাথায় হাত রাখল।
“বীরত্ব আমাদের নয় রে শাফিন, বীরত্ব এই পরিবারের। আমরা শুধু পচনটা সরিয়ে দিয়েছি, গাছটা তো তোরাই।…”
পদ্ম দেখল সাবিনা চাচি (ছোট চাচার স্ত্রী) এক বাটি কাটা ফল নিয়ে ছাদে এলেন। উনি পদ্মর পাশে এসে দাঁড়ালেন। ওনার মুখটা আজ খুব উজ্জ্বল।
“পদ্ম, আরমান... তোমাদের একটা কথা বলতে এলাম। জেল থেকে সোবহানের (ছোট চাচা) চিঠি এসেছে। ও ওর সব অপরাধ স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে। ও লিখেছে— ও যেন ফিরে এসে এই নতুন পরিবারে ঠাঁই পায়।…”
আরমান গম্ভীর হয়ে বলল,
“চাচি, সোবহান চাচা যদি সত্যিই অনুতপ্ত হন, তবে এই বাড়ির দরজা ওনার জন্য সবসময় খোলা। আমরা আইনকেও সহযোগিতা করব ওনার সাজা কমানোর জন্য।…”
সাবিনা সৈয়দের চোখে কৃতজ্ঞতার অশ্রু চিকচিক করে উঠল। উনি পদ্মকে জড়িয়ে ধরলেন।
“তুই এই বাড়ির লক্ষ্মী রে মা।…”
রাত গভীর হলো। সবাই একে একে নিচে নেমে গেল। শুধু আরমান আর পদ্ম রয়ে গেল ছাদের নির্জনে। বাতাসের ঝাপটায় পদ্মর শাড়ির আঁচলটা বারবার উড়ছে। আরমান পদ্মর হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে এক অদ্ভুত মায়া নিয়ে তাকালো।
“পদ্ম, তুমি কি খুব ক্লান্ত?.?..”
আরমান নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
পদ্ম মাথা নাড়ল।
“না আরমান। বরং আজ আমার নিজেকে খুব হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে একটা বিশাল পাহাড় বুক থেকে নেমে গেল। কিন্তু….”
“কিন্তু কী?.?..”
আরমান ভ্রু কুঁচকালো।
পদ্ম একটু ইতস্তত করে বলল, “আজকাল আমার খুব মাথা ঘোরে, আর সব খাবারে কেমন যেন বিস্বাদ লাগে। দাদী বলছিলেন শহরের ডাক্তার দেখাতে। আমার কি আবার সেই নীল বিষের রিঅ্যাকশন হচ্ছে?.?..”
আরমান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ও একজন ডাক্তার, পদ্মর এই লক্ষণগুলো ওর অভিজ্ঞ কানকে অন্য এক সংকেত দিচ্ছে। ও পদ্মর কপালে হাত রাখল। জ্বর নেই, কিন্তু পদ্মর মুখটা আজ চাঁদের আলোর চেয়েও বেশি মায়াবী দেখাচ্ছে।
“পদ্ম... তুমি কি শিওর যে এটা বিষের রিঅ্যাকশন?.?...”
আরমান রহস্যময়ভাবে হাসল।
পদ্ম অবাক হয়ে তাকালো।
“তবে কী?.?.. আমি কি আবার অসুস্থ হয়ে পড়ব?.?..”
আরমান পদ্মকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। “না পাগলী!... তুমি অসুস্থ নও। আমার মনে হয়, সৈয়দ বংশের পরবর্তী উত্তরাধিকারী আসার সময় হয়েছে। আমাদের পদ্মপাতায় এবার এক ফোঁটা নতুন শিশির জমতে শুরু করেছে।…”
পদ্ম থমকে গেল। আরমানের কথার অর্থ বুঝতে ওনার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। যখন বুঝল, তখন ও লজ্জায় আরমানের বুকে মুখ লুকালো। ওর দুহাত দিয়ে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“আরমান... এটা কি সত্যি?.?..”
পদ্ম ফিসফিস করে বলল।
“আমি ডাক্তার, আমার ডায়াগনোসিস ভুল হয় না প্রাণ!...”
আরমান হাসল।
“কালই আমরা টেস্ট করাব। কিন্তু আজ এই চাঁদটা সাক্ষী থাকুক— আমাদের এই নতুন প্রাণের আগমনেই সৈয়দ বংশের সব কালিমা ধুয়ে যাবে।…”
পরদিন সকালে।
সৈয়দ ভিলায় আনন্দের ধুম পড়ে গেল। দাদী আলেয়া বেগম যখন খবরটা শুনলেন, তিনি খুশিতে কেঁদে ফেললেন। তিনি তৎক্ষণাৎ পুরো বাড়িতে মিষ্টি বিতরণের হুকুম দিলেন।
“ওরে স্বপ্না!.. সাবিনা!.. তোরা কই?.?.. আমার আরমান-পদ্মর ঘরে নতুন মেহমান আসছে!.. আজ বাড়িতে রাজকীয় ভোজন হবে!...” দাদী লাঠি ঠকঠক করে সারা বাড়ি মাথায় তুললেন।
রাইমা আর আশা খুশিতে নাচতে শুরু করল।
“আমরা ফুপি হব!... আমরা ফুপি হব!..”
দাদাজান আশরাফুল আলম ওনার তসবিহটা ব্যাগে রেখে মুচকি হাসলেন। ওনার জমিদারি সার্থক হয়েছে। তিনি আরমানকে জড়িয়ে ধরলেন।
“আরমান, তুই আমাকে শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিলি রে দাদুভাই।…”
পদ্ম বারান্দায় বসে সবার এই আনন্দ দেখছিল। ওর মনে হলো, জীবনটা সত্যিই পদ্মপাতার মতো— জলের ওপর ভেসে থাকলেও কখনো ভিজে যায় না, বরং টলটলে মুক্তোর মতো আনন্দ ধরে রাখে।
হঠাৎ গেটে একটা কুরিয়ার এলো। আরমানের নামে। আরমান খামটা খুলতেই দেখল ভেতরে একটা ছোট রুপোর নূপুর আর একটা চিরকুট— “সৈয়দ পরিবারের নতুন সদস্যের জন্য অগ্রিম শুভেচ্ছা। ইতি— লিন্ডা (বর্ডার থেকে)।…”
আরমান আর পদ্ম একে অপরের দিকে তাকালো। লিন্ডা এখনো নজর রাখছে?.?.. কিন্তু এবার আরমানের মনে কোনো ভয় নেই। ও চিরকুটটা ছিঁড়ে ফেলল। শত্রু যেখানেই থাকুক, এই ইস্পাতদৃঢ় পরিবারের ওপর আঁচড় দেওয়ার ক্ষমতা এখন আর কারো নেই।
— — —
সৈয়দ ভিলায় ভোরের আলো ফুটেছে এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে। অন্দরমহলের সেই ভারি পর্দাগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেন দক্ষিণের হাওয়া অনায়াসে ঢুকতে পারে। দাদী জোহরা বেগম আজ ফজরের নামাজের পর থেকেই ব্যস্ত। তিনি সাবিনা আর স্বপ্নাকে নিয়ে রান্নাঘরের তদারকি করছেন।
“ওরে স্বপ্না, মাছের ঝোলটা যেন বেশি ঝাল না হয়। পদ্মর এখন শরীরটা বড্ড কাঁচা, ও ঝাল সইতে পারবে না।…”
দাদী খুন্তি নাড়তে নাড়তে নির্দেশ দিচ্ছেন।
সাবিনা সৈয়দ এক বাটি ভেজানো বাদাম নিয়ে হাসলেন।
*মা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আর স্বপ্না মিলে পদ্মর ডায়েট চার্ট বানিয়ে ফেলেছি। আরমান ডাক্তার হলে কী হবে, বাড়ির বড়দের অভিজ্ঞতার তো একটা দাম আছে!...”
ওদিকে দোতলার বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে বসে ছিল পদ্ম। ওর কোলের ওপর একটা গল্পের বই আধখোলা পড়ে আছে। সকালের কাঁচা রোদ ওর মুখে পড়ে এক মায়াবী আভা তৈরি করেছে। ও নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল। এক বিচিত্র অনুভূতি—ভেতরে যেন এক সমুদ্র প্রশান্তি দানা বাঁধছে।
আরমান ট্রে-তে করে এক গ্লাস দুধ আর আপেল নিয়ে ঘরে ঢুকল। ও পদ্মর পায়ের কাছে টুল টেনে বসল।
“পদ্ম, বই পড়া বন্ধ করে আগে এই নাস্তাটা শেষ করো। তোমার ব্লাড প্রেসারটা আজ একটু চেক করতে হবে।…”
আরমান পেশাদার ডাক্তারের মতো বললেও ওর চোখে একরাশ ভালোবাসা।
পদ্ম একটু মুখ কুঁচকালো।
“আবার সেই দুধ আর ফল?.?.. আরমান, আমার খুব ঝাল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। অন্তত একটু আচার?.?..”
আরমান হাহা করে হেসে উঠল। ও পদ্মর হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল।
“আচার পাবে, তবে আজ নয়। দাদী আমসত্ত্ব বানাচ্ছেন তোমার জন্য। আর শোনো, আজ থেকে তোমার সিড়ি দিয়ে ওঠা-নামা একদম বারণ। শাফিন আর শিলাকে বলেছি তোমার সব কাজ করে দিতে।…”
পদ্ম হাসল।
“ওরা তো সারাক্ষণ আমার দরজার সামনে পাহারা দিচ্ছে। রাইমা আপা আজ সকালে এসে আমার ঘরটা সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিয়ে গেল। আশা তো আবার আমার জন্য উল দিয়ে সোয়েটার বোনা শুরু করেছে!....”
আরমান জানলা দিয়ে নিচে তাকালো। দেখল দাদাজান আশরাফুল আলম আর বড় আব্বা সৈয়দ ইকবাল বাগানে হাঁটছেন। দাদাজানের হাতে একটা ম্যাপ—নিশিন্দীপুরের সেই কমপ্লেক্সের নকশা।
“জানো পদ্ম, দাদাজান ওই কমপ্লেক্সের ভেতরে একটা বিশেষ বাগান করার কথা ভাবছেন। ওটার নাম হবে 'পদ্ম বাগান'। সেখানে শুধু নীল পদ্ম আর শ্বেত পদ্ম থাকবে। উনি বলছেন, আমাদের এই অনাগত সন্তান যেন প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠে।…”
আরমান মুগ্ধ হয়ে বলল।
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল।
“সবাই কত খুশি আরমান!... আমার মাঝে মাঝে ভয় হয়, এই সুখটা কি সত্যি?.?.. আমরা কি সত্যিই সেই কালরাত্রি পার করে এলাম?.?..”
আরমান পদ্মর চিবুক ছুঁয়ে বলল,
“ভয় পেও না পদ্ম। অতীত আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শক্ত হতে হয়, আর বর্তমান আমাদের দেখাচ্ছে কীভাবে ভালোবাসতে হয়। আমাদের এই সন্তান হবে সৈয়দ বংশের সেই আলোকবর্তিকা, যে কোনোদিন অন্ধকারকে ভয় পাবে না।…”
বিকেলের দিকে শিলা আর সাবিহা (সেজো আর ছোট চাচার মেয়েরা) পদ্মর ঘরে এল এক গাদা নতুন জামার ক্যাটালগ নিয়ে।
“ভাবি!... দেখো তো, এই রংটা কি ভালো লাগবে?.?...”
শিলা একটা প্যাস্টেল গ্রিন কালারের কাপড় দেখালো।
সাবিহা পাশ থেকে ফিসফিস করল, “আমি তো ঠিক করেছি ওর নাম রাখব 'রোদেলা'। কারণ ও আমাদের জীবনে রোদ নিয়ে আসছে!...”
পদ্ম মেয়েগুলোর এই নির্মল আনন্দ দেখে চোখ ভেজালো। এই সেই পরিবার, যারা কিছুদিন আগেও একে অপরের শত্রু ছিল। নীল বিষের অভিশাপ কাটিয়ে তারা আজ এক প্রাণ।
রাতের নিস্তব্ধতায় দাদী আলেয়া বেগম আরমানের ঘরে এলেন। ওনার হাতে একটা পুরোনো তামাটে কৌটা। তিনি ওটা পদ্মর হাতে দিলেন।
“এটা কী দাদী?.?..”
পদ্ম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
দাদী মৃদু হাসলেন। ওনার ঝুলে পড়া চামড়ার ভাঁজে এক গভীর মমতা। “এটা হলো নিশিন্দীপুরের আম । তুই না আচার খেতে চেয়েছিলি?!.. আমি চাই, তোর মনের কোন ইচ্ছে যেন অপূর্ণ না থাকে।…”
হঠাৎ বারান্দার দিক থেকে একটা মিউ মিউ শব্দ হলো। সেই পুরোনো কালো বিড়ালটা, যা ল্যাবে মরে গিয়েছিল বলে সবাই ভেবেছিল—সেটা জানলা দিয়ে ঢুকে পদ্মর পায়ের কাছে এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল।
আরমান অবাক হয়ে বলল,
“আরে!... এটা তো সেই বিড়ালটা!... ও তো বেঁচে আছে!....”
পদ্ম বিড়ালটাকে কোলে তুলে নিল। “আরমান, যে প্রাণ টিকে থাকতে জানে, তাকে কেউ মারতে পারে না। আমাদের এই বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।….”
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ