#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৪৭
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
সৈয়দ ভিলায় এখন নিয়ম বদলেছে। আগে যেখানে ড্রয়িংরুমে বসে দাদাজান রাজনীতির চাল চালতেন, এখন সেখানে দাদী আলেয়া বেগম আর সেজো চাচি স্বপ্না সৈয়দ মিলে উলের কাঁথা আর ছোট ছোট মোজা বোনার আসর বসান।
পদ্ম এখন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওর চেহারায় এক অদ্ভুত লাবণ্য ফুটে উঠেছে। আরমান এখন আর ওকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দেয় না। এমনকি ও চেম্বার থেকে ফেরার সময় রোজ নিয়ম করে পদ্মর প্রিয় কোনো না কোনো টক ফল বা ফুল নিয়ে আসে।
“আরমান, আপনি কি পাগল হলেন?.?.. রোজ রোজ এত ফুল দিয়ে ঘর ভরানোর কী দরকার?...?”
পদ্ম বিছানায় আধশোয়া হয়ে হাসতে হাসতে বলল। ও আজ একটা বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ি পরেছে, যাতে ওকে দেখতে ঠিক ভোরের শিউলি ফুলের মতো লাগছে।
আরমান ওর পায়ের কাছে বসে একটা গোলাপের পাপড়ি পদ্মর চিবুকে ছোঁয়াল।
“পদ্ম, ডাক্তার হিসেবে জানি তোমার এখন মন ভালো রাখাটা সবচেয়ে জরুরি। আর এই যে তোমার ভেতরে যে আমাদের ছোট্ট প্রাণটা বড় হচ্ছে, ও তো আমার আর তোমার ভালোবাসার ফসল। ওর চারপাশটা সুবাসিত থাকা চাই।...”
ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ল আশা। ওর হাতে এক গ্লাস ডাবের জল।
“পদ্ম ভাবী!.. দাদী পাঠালেন। বললেন এটা খেলে তোমার শরীর ঠান্ডা থাকবে।...”
আশা এখন একদম স্বাভাবিক যুবতী। ওর সেই যান্ত্রিক চোখের চাহনি এখন মায়ায় ভরা। ও পদ্মর পেটের ওপর আলতো করে কান পাতল।
“ভাইয়া, ও কি এখন কথা বলে.?..? আমি কি ওর সাথে গল্প করতে পারি.?..?”
আরমান আর পদ্ম একে অপরের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল। আরমান আশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। “এখনই না রে পাগলি!..
আরও কিছুদিন যাক, ও যখন নড়াচড়া করবে তখন তুই ওর সাথে লুকোচুরি খেলিস।...”
বিকেলের দিকে সাবিনা চাচি (ছোট চাচার স্ত্রী) আর রাইমা ঘরে ঢুকল। রাইমার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
“পদ্ম, এটা লিন্ডার ল্যাবের ডায়েরি নয়, এটা আমার ছোটবেলার কবিতার খাতা।...” রাইমা একটু ইতস্তত করে বলল।
“আমি ঠিক করেছি, আমাদের এই ছোট সোনামণি যখন আসবে, আমি ওকে রোজ একটা করে কবিতা শুনিয়ে ঘুম পাড়াব। আমি চাই ও যেন ল্যাবরেটরির কেমিক্যাল নয়, বরং ছন্দের জাদুতে বড় হয়।...”
পদ্ম রাইমার হাতটা জড়িয়ে ধরল।
“আপা, আপনি পাশে থাকলে আমার আর কোনো ভয় নেই। আমরা সবাই মিলে ওকে আগলে রাখব।...”
সাবিনা সৈয়দ এক বাটি তেঁতুলের আচার এগিয়ে দিলেন। “এই নাও পদ্ম, তোমার স্বপ্না চাচি নিজে হাতে বানিয়েছেন। তবে সাবধানে খেও, আরমান দেখলে আবার রক্তচাপ মেপে অস্থির করে তুলবে!...”
রান্নাঘরে তখন দাদাজান আশরাফুল আলম আর বড় আব্বা সৈয়দ ইকবাল নিচু স্বরে কথা বলছেন। দাদাজান এখন অনেক বেশি নমনীয়।
“ইকবাল, আমি ঠিক করেছি নিশিন্দীপুরের সেই কমপ্লেক্সের নাম দেব 'সৈয়দ প্যালেস অব হোপ'। আর ওই অনাগত সন্তানই হবে এর প্রথম উত্তরাধিকারী। আমি চাই আমাদের বংশের বদনাম ও যেন ওর হাতের জাদুতে ধুয়ে ফেলে।...”
দাদাজান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
বড় আব্বা হাসলেন।
“আব্বা, আরমান আর পদ্ম যেভাবে পরিবারটাকে এক করেছে, তাতে আমার বিশ্বাস আমাদের এই নাতি বা নাতনি হবে এক দেবদূত।...”
রাতের বেলা।
জানলা দিয়ে দখিনা বাতাস ঢুকছে। আরমান পদ্মর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিল। হঠাৎ পদ্ম আরমানের হাতটা চেপে ধরল।
“আরমান... একটা কথা বলব?.?..”
পদ্ম নিচু স্বরে ডাকল।
“বলো প্রাণ।...”
“আমার কেন জানি মনে হয়, আমাদের এই সন্তান বড় হয়ে আপনার মতো ডাক্তার হবে। ও মানুষের শরীর নয়, মানুষের মন সারাবে। আর ও কোনোদিন নীল বিষের নাম শুনবে না।...”
পদ্মর চোখে এক উজ্জ্বল স্বপ্ন।
আরমান পদ্মকে আরও কাছে টেনে নিল।
“অবশ্যই প্রাণ। ও হবে মুক্ত বাতাসের মতো স্বাধীন।...”
হঠাৎ বাগানের সেই পুরোনো আমগাছটার নিচে একটা ছায়া দেখা গেল। আরমান জানলা দিয়ে তাকালো। অন্ধকারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যার হাতে একটা লাঠি। ও দাদাজান বা বাড়ির কেউ নয়।
আরমান ভ্রু কুঁচকালো।
“কে ওখানে?.?..”
ছায়াটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আরমান নিচে নামতে চাইল, কিন্তু পদ্ম ওনার হাত ছাড়ল না।
“থাক আরমান, আজ এই পূর্ণিমার রাতে আমরা কোনো অশান্তি চাই না। হয়তো কোনো পথচারী।....”
কিন্তু আরমানের মনে খটকা রয়ে গেল। তবে কি জাবেদ খানের কোনো লোক এখনো পিছু ছাড়েনি?.?.. নাকি লিন্ডার সেই উপহারের পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত ছিল?.?...
--- --- ---
সৈয়দ ভিলায় এখন ভোরের শুরুটা হয় সুমধুর আজানের ধ্বনিতে। দাদী আলেয়া বেগম তাহাজ্জুদ পড়ে জায়নামাজে বসে তসবিহ পাঠ করেন আর পরম করুণাময়ের কাছে তাঁর বংশের গুনাহ মাফের জন্য মোনাজাত করেন।
পদ্ম এখন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওর প্রতিটি সকাল শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াত শুনে। আরমান ফজরের নামাজ পড়ে এসে পদ্মর শিয়রে বসে নিচু স্বরে সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করে শোনায়।
“আরমান, তিলাওয়াত শুনলে মনটা কত শান্ত হয়ে যায় না.?!..?”
পদ্ম তসবিহটা হাতে নিয়ে ধীর স্বরে বলল। ওর মুখে এক জান্নাতী নূরানি আভা ফুটে উঠেছে।
আরমান হাসিমুখে আলমারি থেকে একটা পাতলা সুতি চাদর বের করে পদ্মর গায়ে জড়িয়ে দিল।
“আলহামদুলিল্লাহ্!... আমাদের সন্তান যেন জন্মের আগে থেকেই এই পবিত্র শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হয়, এটাই আমার চাওয়া। আল্লাহ যেন ওকে একজন নেককার মানুষ হিসেবে কবুল করেন।...”
সকাল দশটার দিকে স্বপ্না চাচি আর সাবিনা চাচি পদ্মর ঘরে এলেন। তাঁদের হাতে এক বাটি গরম স্যুপ আর কিছু ফল।
“পদ্ম মা, এই যে গরম গরম খেয়ে নাও। মা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমার জন্য দুপুরের খাবারে লাউ দিয়ে খাসির মাংস রান্নার ব্যবস্থা করছেন। ওটা হজমের জন্য খুব ভালো।...” স্বপ্না সৈয়দ পরম মমতায় পদ্মর মাথায় হাত রাখলেন।
পদ্ম হাসল।
“চাচি, আপনারা আমার জন্য কত কষ্ট করছেন!... আল্লাহ আপনাদের নেকি দান করুন।...”
সাবিনা সৈয়দ পাশ থেকে বললেন,
“কষ্ট কিসের রে মা?.?.. তুই তো এই ঘরের সম্মান বাঁচিয়েছিস। আব্বাজান তো আজ সকালে আরমানের আব্বার জন্য অনেকক্ষণ দোয়া করলেন। উনি চাচ্ছেন জেলের ভেতরেও যেন আমিনের তওবা কবুল হয়।...”
নিচে ড্রয়িংরুমে দাদাজান আশরাফুল আলম আর বড় আব্বা সৈয়দ ইকবাল বসে ছিলেন। তাঁদের সামনে রাখা আছে সেই নিশিন্দীপুর কমপ্লেক্সের নকশা।
“ইকবাল, আমি ঠিক করেছি কমপ্লেক্সের একদম মাঝখানে একটা বড় মসজিদ আর একটা হাফেজিয়া মাদ্রাসা করব। যে জমিতে একদিন বিষের চাষ হতো, সেখানে যেন এখন আল্লাহর কালাম প্রতিধ্বনিত হয়।...”
দাদাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
বড় আব্বা মাথা নাড়লেন। “চমৎকার সিদ্ধান্ত আব্বা। এটাই হবে আমাদের তওবা করার শ্রেষ্ঠ উপায়।...”
বিকেলে রাইমা আর আশা পদ্মর ঘরে এল। রাইমা এখন নিয়মিত নামাজ পড়ে এবং ওর আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। ও পদ্মর পায়ের কাছে বসে নিচু স্বরে গজল গাইছিল।
হঠাৎ বাগানের সেই আমগাছটার নিচে আবার সেই ছায়াটা দেখা গেল। আরমান জানলা দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এবার লোকটা লুকাল না। সে ধীর পায়ে ড্রাইভওয়ে দিয়ে এগিয়ে এল। লোকটার গায়ে একটা জুব্বা আর মাথায় টুপি।
আরমান নিচে নেমে গেল। “আসসালামু আলাইকুম। আপনি কাকে খুঁজছেন?..?"
লোকটা টুপিটা একটু ঠিক করে নিয়ে আরমানের দিকে তাকালো। ওনার মুখে দাড়ি, আর চোখে এক করুণ আর্তি। “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি এই বাড়িরই এক অভাগা সন্তান। আমি সোবহান সৈয়দের (ছোট চাচা) এক সময়ের সাথী ছিলাম, কিন্তু এখন আমি তওবা করে দ্বীনের পথে চলছি। আমি শুধু চাচাজানকে একটা আমানত পৌঁছে দিতে এসেছি।...”
আরমান লোকটিকে ভেতরে নিয়ে এল। দাদাজান আর বড় আব্বা লোকটিকে দেখে চমকে উঠলেন। সে ছিল লিন্ডার সেই ল্যাবরেটরির এক পুরোনো কর্মচারী, যে অনেক বছর আগে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।
সে তার ঝোলা থেকে একটা পুরোনো চামড়ার বাঁধাই করা কোরআন শরীফ বের করল।
“চাচাজান, আরমানের মা আয়লা বেগম মারা যাওয়ার আগে এই কোরআনটা আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যখন এই বাড়িতে আবার শান্তির সুবাতাস বইবে, তখন যেন এটা তাঁর নাতি বা নাতনির হাতে তুলে দেওয়া হয়।...”
দাদী কোরআনটা হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
“আমার আয়লা কত ধৈর্যশীল ছিল!... আল্লাহ ওকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।...”
পদ্ম বারান্দা থেকে এই দৃশ্যটা দেখে দুহাত তুলে দোয়া করল। সৈয়দ পরিবারে এখন আর নীল বিষের কোনো জায়গা নেই; সেখানে এখন শুধুই আল্লাহর রহমত আর মা-বাবার দোয়া।
--- --- ---
গভীর রাত। পুরো সৈয়দ ভিলা নিস্তব্ধ। জানলার বাইরে দিয়ে হালকা জ্যোৎস্নার আলো এসে আরমান আর পদ্মর খাটের ওপর পড়েছে। আরমান একমনে একগাদা মেডিকেল জার্নাল পড়ছিল, আর পদ্ম পাশে বসে তসবিহ গুনছিল। হঠাৎ পদ্মর চেহারায় এক অদ্ভুত ভাব ফুটে উঠল। ও তসবিহ রেখে আরমানের পাঞ্জাবির হাতা ধরে টান দিল।
“শুনছেন?.?.. ওগো ডাক্তার সাহেব!...”
পদ্মর কণ্ঠে এক আবদার মেশানো সুর।
আরমান চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তাকালো।
“জি, সৈয়দ বাড়ির ছোট গিন্নি!... এত রাতে কোনো জরুরি কল?.?.. প্রেসার চেক করতে হবে নাকি?.?..”
পদ্ম মুখটা একটু ফুলিয়ে বলল, “আপনার ওই প্রেসার মেশিন আর স্টেথোস্কোপ ওখানেই রেখে দিন তো!... আমার খুব টক কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। একদম ঝাল ঝাল কাঁচা আম। কাসুন্দি মাখা হলে খুব ভালো হতো।....”
আরমান ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত একটা। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল।
“পদ্ম, এখন আমি কাঁচা আম কোথায় পাব?.?.. এটা তো আমের সিজন না। ফ্রিজে আপেল আছে, ওটাই একটু চাট মশলা দিয়ে মেখে দেব?.?..”
“না!... আপেল নয়, আমার আম-ই চাই!...”
পদ্ম এবার একটু জেদ ধরল। “নয়তো আপনার ওই মেডিকেল বইগুলো আমি সব লুকিয়ে ফেলব বলে দিলাম!..."
আরমান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। যে শান্ত পদ্মকে ও সারাজীবন দেখল, সে এখন এমন আবদার করছে!... ও উঠে দাঁড়িয়ে শার্ট টা টা গায়ে দিল।
“আচ্ছা বাবা, হার মেনে নিলাম। কিন্তু এখন বাগানের অন্ধকারে আমি আম খুঁজব কীভাবে?.?.. যদি জিনে ধরে?.?..”
পদ্ম খিলখিল করে হেসে উঠল। “আপনি না বড় ডাক্তার?.?.. জিনদেরও ইঞ্জেকশন দিয়ে দেবেন!...”
আরমান টর্চ নিয়ে চুপিচুপি নিচে নামল। অন্দরমহলের কেউ যেন না জাগে, বিশেষ করে দাদী। দাদী জানলে আবার আরমানকে বকুনি দেবেন যে কেন সে পদ্মকে এত রাতে বিরক্ত হতে দিচ্ছে।
বাগানের পুরোনো আমগাছটার নিচে গিয়ে আরমান ঘাড় উঁচিয়ে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ একটা ডাল নড়ে উঠল। আরমান চমকে গিয়ে টর্চ মারল। দেখল শাফিন (সেজো চাচার ছেলে) গাছের ডালে বসে আম পাড়ছে!....
“শাফিন!... তুই এখানে কী করছিস?..?...”
আরমান ফিসফিস করে ধমক দিল।
শাফিন লজ্জা পেয়ে গাছ থেকে নেমে এল। ওর পকেটে দুটো ছোট কচি আম।
“ভাইয়া, আসলে শিরিন বলছিল ওর খুব টক খেতে ইচ্ছে করছে। তাই ভাবলাম দু-একটা আম পেড়ে দিই। আপনি এখানে কেন?.?..."
আরমান কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আরে আমার অবস্থা তো আরও খারাপ!... তোর ভাবি তো আম না পেলে আজ আমায় ঘরেই ঢুকতে দেবে না।...”
দুই ভাই অন্ধকারে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হোহো করে হেসে ফেলল। আরমান আম দুটো নিয়ে ঘরে ফিরল। পদ্মকে যখন পরম মমতায় আমগুলো ধুয়ে কাসুন্দি দিয়ে মেখে দিল, পদ্মর চোখের উজ্জ্বলতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
“এই নিন আপনার আম!... এখন খুশি তো?.?...”
আরমান একটা টিস্যু দিয়ে পদ্মর চিবুকের কাছে লেগে থাকা কাসুন্দি মুছে দিল।
পদ্ম এক টুকরো আম আরমানের মুখে জোর করে পুরে দিল।
“একলা খেলে হবে না, ডাক্তার সাহেবকেও ভাগ নিতে হবে।...”
আরমান টক খেয়ে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল।
“উফ!... এটা খাওয়ার পর তো আমার পেট খারাপ হবে নিশ্চিত। কিন্তু তোমার ওই হাসিটার জন্য আমি বিষ খেতেও রাজি, আম তো সামান্য!...”
পদ্ম আরমানের হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল।
“আল্লাহর শোকর আরমান, আমাদের এই আনন্দগুলো যেন কোনোদিন শেষ না হয়। আমাদের অনাগত সন্তান যেন বাবার মতো এমন পাগল আর মায়ের মতো এমন জেদী হয়।...”
আরমান পদ্মর কপালে একটা হালকা চুমু খেয়ে বলল,
“পাগল হোক আপত্তি নেই, কিন্তু তোমার মতো এমন মায়াবী আর দ্বীনদার যেন হয়। এখন ঘুমাও, কাল সকালে দাদাজান কিন্তু সবাইকে নিয়ে ফজরের পর হালকা জিকিরের মজলিস করবেন বলেছেন।...”
পরদিন সকালে।
সৈয়দ ভিলায় এক অন্যরকম আমেজ। দাদী আলেয়া বেগম খবর পেয়েছেন যে রাতে আরমান আর শাফিন আম চুরি করেছে। তিনি সকালের নাস্তার টেবিলে মুচকি মুচকি হাসছেন।
“ওরে স্বপ্না, দেখলি তো?.?.
এই সৈয়দ বাড়ির পুরুষরা বাইরে যত বড়ই লাটসাহেব হোক না কেন, বউএর আবদারের কাছে সবাই শিশু!...”
দাদীর কথায় পুরো টেবিলে হাসির রোল উঠল।
দাদাজান আশরাফুল আলম ওনার গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ওনার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তিনি আরমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আরমান, আজ জোহরের নামাজের পর একটা ছোট ঘরোয়া মিলাদের আয়োজন করেছি। বাড়ির সব আত্মীয়রা আসবে। পদ্মর জন্য দোয়া করা হবে।....”
পদ্ম মাথা নিচু করে লজ্জা পেল। ও আরমানের দিকে তাকাতেই দেখল আরমান ওকে এক চোখ টিপে ইশারা করছে। সৈয়দ পরিবারে এখন আর নীল বিষের রেশ নেই; সেখানে এখন শুধুই এক টুকরো পবিত্র ভালোবাসা আর নির্মল খুনসুটি।
--- --- ---
সৈয়দ ভিলায় আজ শরতের সকালটা এসেছে এক অন্যরকম বারতা নিয়ে। বাগানের শিউলি ফুলের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। দাদাজান আশরাফুল আলম আজ অনেকদিন পর সাদা রেশমি পাঞ্জাবি পরে বসার ঘরে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। ওনার সামনে বড় আব্বা সৈয়দ ইকবাল আর আরমান বসা।
“ইকবাল, অনেক তো হলো শোক আর কান্নাকাটি। এবার এই বাড়িতে একটু আলোর দরকার।...”
দাদাজান তসবিহটা হাতে নিয়ে ধীর স্বরে বললেন।
“আমি ঠিক করেছি, আমাদের রাইমার বিয়ে দেব। ওর জীবনের সেই কালো ছায়াটা মুছে দিয়ে ওকে এক নতুন ঘর উপহার দিতে চাই।....”
আরমান আর বড় আব্বা একে অপরের দিকে তাকালেন। রাইমার বিয়ে!... রাইমা এখন অনেক শান্ত, নিয়মিত পর্দা করে এবং ঘরের কাজে মন দিয়েছে। ওর জন্য একজন সৎ ও দ্বীনদার জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া এখন সময়ের দাবি।
ঠিক তখন শায়ান (আরমানের বন্ধু ও ডিবির অফিসার) ভেতরে ঢুকল। ওনার পরনে আজ পুলিশের ইউনিফর্ম নেই, বরং একটা সাধারণ নীল পাঞ্জাবি।
“আসসালামু আলাইকুম দাদাজান,”
শায়ান বিনয়ের সাথে সালাম দিল।
দাদাজান হাসলেন।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। শায়ান, তুমি তো আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছ। রাইমার জন্য আমি তোমার এক বন্ধুর কথা ভাবছিলাম না.?..?”
শায়ান একটু ইতস্তত করে বলল, “দাদাজান, আমার বন্ধু সাফওয়ান—যে এখন সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার এবং খুব পরহেজগার মানুষ—ও রাইমাকে চেনে। ও আমাদের সেই অভিযানে রাইমার সাহস দেখেছিল। ও নিজেই রাইমার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে বলেছে।...”
পুরো ঘরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। আরমান খুশিতে শায়ানের কাঁধে চাপড় দিল। “শায়ান!... এটা তো দারুণ খবর। সাফওয়ানকে আমি চিনি, ও সত্যিই হীরের টুকরো ছেলে।...”
পদ্ম দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিল। ও দ্রুত অন্দরমহলে গিয়ে দাদী আলেয়া বেগম আর চাচিদের খবরটা দিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে বিয়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
“ওরে স্বপ্না!... সাবিনা!... তোরা কই?... আমার রাইমার বিয়ের সানাই বাজবে এবার!...”
দাদী খুশিতে জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
রাইমা তখন রান্নাঘরে ছিল। খবরটা শুনে ওর হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ও লজ্জা আর সংকোচে মাথা নিচু করে নিজের ঘরে দৌড়ে গেল। পদ্ম ওর পিছু নিল।
“রাইমা আপা, পালানোর পথ নেই আজ!...”
পদ্ম রাইমাকে জড়িয়ে ধরে হাসল।
“সাফওয়ান ভাই অনেক ভালো মানুষ। আল্লাহ তোমাদের জোড়া কবুল করুন।...”
রাইমা পদ্মর বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করল,
“পদ্ম, আমি কি এই সুখের যোগ্য???.. আমার অতীত তো...”
পদ্ম ওর মুখ চেপে ধরল। “অতীত তওবা দিয়ে ধুয়ে গেছে আপা। এখন শুধু ভবিষ্যৎ। দাদাজান বলেছেন বিয়ের অনুষ্ঠানটা একদম সুন্নতি তরিকায় হবে, কিন্তু ধুমধাম কম হবে না!...”
শুরু হলো বিয়ের প্রস্তুতি। সৈয়দ ভিলায় এখন আর নীল বিষের ভয় নেই, আছে বেনারসি শাড়ির খসখস শব্দ আর মেহেদির ঘ্রাণ। আরমান আর শাফিন মিলে পুরো বাড়ি আলোকসজ্জা করার দায়িত্ব নিল। তবে দাদাজানের কড়া নির্দেশ—কোনো গানবাজনা নয়, শুধু হামদ-নাত আর মেহমানদারী।
পদ্ম এখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওর শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে আরমান ওকে বেশি খাটতে দিচ্ছে না। কিন্তু পদ্ম কি আর বসে থাকার পাত্রী?.?.. ও সোফায় বসে রাইমার বিয়ের শাড়িতে পাথরের কাজ তদারকি করছে।
“আরমান, শুনুন!..
রাইমা আপার হলুদে আমি নিজে হাতে মেহেদি বেটে দেব।...”
পদ্ম আবদার করল।
আরমান ভ্রু কুঁচকালো।
“বেশি নড়াচড়া করবে না কিন্তু!... তোমার ওই ক্ষুদে মেহমান আবার বেশি হৈচৈ পছন্দ করে না।...”
পদ্ম হেসে আরমানের হাতে একটা মিষ্টি ধরিয়ে দিল।
“এই নিন, বিয়ের খুশিতে মুখ মিষ্টি করুন। আমাদের বাড়িতে এবার সত্যি একটা বড় উৎসব হতে যাচ্ছে।...”
বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। গেটে নহবত বসানো হয়েছে। গ্রামের মানুষজনও দাওয়াত পেয়েছে। দাদাজান ঠিক করেছেন এই বিয়ের উসিলায় গ্রামের গরিবদের একবেলা পেট ভরে খাওয়াবেন।
সৈয়দ বাড়ির বিশাল আঙিনায় আজ উৎসবের মহোৎসব। দাদাজানের কড়া শাসনের মধ্যেও আরমান আর শাফিনরা মিলে চুপিচুপি এক এলাহি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। ইসলামি শরিয়াহ মেনে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান হবে ঠিকই, কিন্তু আজ রাইমার গায়ে হলুদে বাড়ির ছোটরা মিলে আনন্দ-উল্লাসের কোনো কমতি রাখেনি।
হলুদ গাঁদা ফুল আর সোনালি কাপড়ে পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে। অন্দরমহলে নারীদের আলাদা প্যান্ডেলে সাউন্ড বক্সে বাজছে বিয়ের ধুমধাম গান।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ