#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৫৬
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
নিশিন্দীপুর ভিলার ছাদটা আজ কৃত্রিম নীল আর সাদা আলোর মালায় সাজানো। নিচে আশার গায়ে হলুদের তোড়জোড় চলছে, ইয়াসিন আর শাফিন মিলে মেহমানদের তদারকি করছে। কিন্তু আরমান আজ কৌশলে পদ্মকে নিয়ে ছাদে উঠে এসেছে।
ছাদের এক কোণে দোলনাটা রাখা। চারপাশে রাখা হয়েছে পদ্মর প্রিয় রজনীগন্ধা আর বেলী ফুলের টব। ফাল্গুনের হালকা হাওয়া পদ্মর শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছে। ও আজ একটা বাসন্তী রঙের জামদানি পরেছে, লম্বা চুলের বেনীটা পেছনে দুলছে।
“আরমান!.. সবাই নিচে আমাদের খুঁজছে, আর আপনি এখানে আমায় নিয়ে এলেন?.?..”
পদ্ম মৃদু হেসেই অনুযোগ করল।
আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর চোখে আজ এক গভীর তৃপ্তি।
“পদ্ম, গত কয়েকটা বছর আমরা শুধু লড়াই করেছি। লিন্ডার বিষ, আমানের অসুস্থতা, ইয়াসিনের ফিরে আসা—সবকিছুর মাঝে আমি আমার 'পদ্ম'কে সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ এই মুহূর্তে আমি শুধু তোমার আরমান হয়ে থাকতে চাই।….”
আরমান পকেট থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স বের করল। ভেতরে হীরের নয়, বরং মাটির তৈরি একটা সুন্দর লকেট, যাতে একটা ছোট নীল অপরাজিতা ফুল খোদাই করা।
“এটা দামী কোনো গয়না নয় পদ্ম। এটা আমাদের এই মাটির টান। তুমি এই পরিবারের সেই শক্ত ভিত, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমি আজ ডক্টর আরমান হতে পেরেছি।…”
আরমান লকেটটা পদ্মর গলায় পরিয়ে দিল।
পদ্ম আবেগে আরমানের বুকে মাথা রাখল।
“আরমান, আমি তো শুধু আপনার ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছি। বিষের সেই দিনগুলোতে যখন আপনি ভেঙে পড়তেন, আমার খুব ভয় হতো। আজ দেখুন, আমাদের আমান সুস্থ, আশার বিয়ে হচ্ছে, রাইমার কোলে নতুন প্রাণ আসছে—সবই তো আপনার ধৈর্যের ফল।…”
আরমান পদ্মর চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচু করল। চাঁদের আলোয় পদ্মর মুখটা আজ কোনো অপার্থিব পরীর মতো লাগছে।
“পদ্ম, একটা কথা বলবে?.?.. যদি আবার কোনোদিন কোনো ঝড় আসে, তুমি কি এভাবেই আমার হাতটা ধরে থাকবে?.?..”
পদ্ম আরমানের চোখের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসল।
“পদ্মপাতা কি জলকে ছেড়ে থাকতে পারে আরমান?.?.. জল যত উত্তালই হোক, পদ্মপাতা তাকে নিজের পিঠে বয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি মরার আগ পর্যন্ত আপনার ওই জেদী মনটার পাহাদার হয়ে থাকব।…”
আরমান আলতো করে পদ্মর কপালে একটা চুমু খেল। ঠিক তখন নিচ থেকে আমানের আধো আধো ডাক শোনা গেল— "মা-মা! পা-পা!"
দুজনই হেসে উঠল। আমানকে নিয়ে ইয়াসিন ছাদে উঠে এল। ইয়াসিনের চোখে এখন আর সেই দুশ্চিন্তা নেই। ও আরমানকে দেখে বলল,
“আরমান ভাই, জোহানাকে শায়ান হ্যান্ডেল করছে। ও আর এগোতে পারবে না। এবার চলুন নিচে, আশার হলুদ মাখানো শুরু হবে!...”
আরমান পদ্মকে ইশারা করল। পদ্ম আমানকে কোলে তুলে নিল। আরমান দুই ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে নিচে নামার সিঁড়ির দিকে এগোল।
নিচে উঠোনে তখন বিয়ের সানাই বাজছে। দাদী আলেয়া বেগম কুলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আশা পিঁড়িতে বসে হাসছে, ওর দুগালে হলুদের ছোঁয়া। রাইমা আর সাফওয়ান মিলে ফটো সেশন করছে।
সৈয়দ ভিলায় আজ কোনো নীল বিষের দহন নেই। আছে শুধু হলুদ আলোর রোশনাই আর এক সুখী পরিবারের গল্প। এই প্রহরে যেন এক নতুন ভোরের সূচনা করল, যেখানে ভালোবাসা জয়ী হয়েছে সব ষড়যন্ত্রের ওপর।
— — —
সানাইয়ের সুর আজ বাতাসে এক অদ্ভুত ভালোলাগা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আরমান নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে গেটে আগত অতিথিদের। ইয়াসিন ওর পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। দুই ভাইয়ের এই মিলন দেখে গ্রামের মানুষ মুগ্ধ—সৈয়দ বংশের সেই পুরনো প্রতাপ যেন আজ এক নতুন মৈত্রীতে রূপ নিয়েছে।
“বড় ভাই, বরযাত্রী কিন্তু চলে এসেছে!...”
ইয়াসিন উত্তেজিত হয়ে বলল।
আরমান হাসল।
তাহলে দেরি কেন?.?.. গেট ধরার জন্য শাফিন আর আমানকে রেডি কর।…”
ছোট্ট আমান আজ একটা নীল রঙের শেরওয়ানি পরেছে, মাথায় একটা ছোট্ট পাগড়ি। ও শাফিনের হাত ধরে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বর আরাফাত গাড়ি থেকে নামতেই আমান ওর পা জড়িয়ে ধরল।
“ফুপা... টাকা!...”
সবাই হোহো করে হেসে উঠল। আরাফাত আমানকে কোলে তুলে নিয়ে পকেট থেকে একটা চকচকে নোট বের করে দিল। গেট খোলার পর বরপক্ষকে রাজকীয় সম্মানে ভেতরে নিয়ে আসা হলো।
অন্দরমহলে তখন আশা-কে সাজিয়ে বসানো হয়েছে। লাল বেনারসি, কপালে টিকলি আর ভারী গয়নায় আশাকে চেনাই যাচ্ছে না। ও আজ সত্যিই এক রাজকুমারী। পদ্ম ওর পাশে বসে শেষ মুহূর্তের টাচ-আপ দিচ্ছে।
“ভাবি, আমার খুব ভয় করছে। আমি কি ঠিকমতো সব সামলাতে পারব?.?..”
আশা কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল।
পদ্ম আশার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“শোনো আশা, সংসার মানে শুধু দায়িত্ব নয়, এটা হলো বিশ্বাসের একটা সুতো। আরাফাত তোমাকে খুব ভালোবাসে, আর আমরা তো সবসময় তোমার পেছনে আছি।…”
রাইমা এক বাটি জাফরান শরবত নিয়ে ঘরে ঢুকল। ও আজ খুব সাবধানে চলাফেরা করছে।
“আশা, তোর বিদায়ের সময় কিন্তু আমি কাঁদব না বলে দিচ্ছি!... মেজ ভাই (ইয়াসিন) তো অলরেডি রুমাল হাতে রেডি হয়ে আছে।…”
বিয়ের আসনে বসল আরাফাত আর আশা। কাজী সাহেব যখন তিনবার 'কবুল' বলালেন, তখন পুরো ভিলা এক আনন্দধ্বনি আর উল্লাসে ফেটে পড়ল। দাদাজান আশরাফুল আলম দাদী আলেয়া বেগমের হাত ধরলেন—ওদের চোখে আজ সার্থকতার জল।
খাওয়াদাওয়ার পর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল। শাফিন সত্যিই নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও বোনকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। “আশা, তুমি চলে গেলে এই বাড়িতে আর কার সাথে ঝগড়া করব রে?.?..”
আরমান এসে দুই ভাই-বোনকে শান্ত করল। ও আরাফাতের হাত ধরে বলল,
“আরাফাত, আমাদের আদরের বোনকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। ও যেমন জেদী, তেমনি নরম মনের। আগলে রেখো ওকে।…”
গাড়ি যখন গেট পার হয়ে চলে গেল, পুরো বাড়িতে এক শূন্যতা নেমে এল। কিন্তু সেই শূন্যতা বিষাদের নয়, বরং এক নতুন শুরুর।
রাত গভীর হয়েছে।
বারান্দায় আরমান আর পদ্ম পাশাপাশি বসে আছে। আমান এখন পদ্মর কোলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে। আরমান আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলল।
“পদ্ম, আজ মনে হচ্ছে আমাদের সব দায়িত্ব শেষ। লিন্ডার সেই নীল বিষ থেকে শুরু করে আজকের এই লাল সানাই—সফরটা কত লম্বা ছিল, তাই না?.?..”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল।
“হ্যাঁ আরমান। কিন্তু এই সফরেই আমরা চিনেছি আমাদের আপনজনদের। লিন্ডা চেয়েছিল আমাদের ধ্বংস করতে, কিন্তু ও আমাদের আরও বেশি এক করে দিয়েছে।…”
আরমান পকেট থেকে সেই পুরনো স্টাইলিশ ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির শেষ পাতায় ও আজ বড় করে লিখল—
“ভালোবাসা যখন ঢাল হয়, তখন বিষও অমৃত হয়ে যায়।…”
“আরমান, কাল সকালে কিন্তু আপনার সেই হাসপাতালে যাওয়ার কথা। নতুন ওপিডি বিল্ডিং উদ্বোধন হবে।…”
পদ্ম মনে করিয়ে দিল।
আরমান হাসল।
“হ্যাঁ। কাল থেকে নিশিন্দীপুরে আর কোনো বিষের কথা কেউ মনে রাখবে না। সবাই জানবে এটা হলো নীলপদ্মের গ্রাম।…”
দিঘির জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি কাঁপছে। নিশিন্দীপুর ভিলা আজ এক শান্ত, সুখী নীড়। লিন্ডার ছায়া নেই, জোহানার চক্রান্ত নেই—আছে শুধু আরমান-পদ্মর ভালোবাসা আর আমানের সোনালী ভবিষ্যৎ।
— — —
রাত তখন প্রায় দুইটা। নিশিন্দীপুর ভিলার মেহমানরা সবাই বিদায় নিয়েছেন। ইয়াসিন বাগানের এক কোণে অন্ধকারে একা বসে আছে। ওর হাতে সেই পুরনো ফাইলটা, যা জোহানা ওকে দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল। জোহানা ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ফাইলটা এখন ইয়াসিনের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“ফাইলটা কি অনেক ভারী হয়ে গেছে ইয়াসিন?.?..”
পেছন থেকে আরমান-এর শান্ত কণ্ঠস্বর শুনে ইয়াসিন চমকে উঠে দাঁড়ালো। ও ফাইলটা লুকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আরমান ওর হাত ধরে ফেলল।
“আরমান ভাই... আপনি ঘুমাননি?.?..”
ইয়াসিন মাথা নিচু করল।
“তোর চোখে ঘুম ঘুম নেই আর আমি শান্তিতে ঘুমাব কী করে?.?.. বল তো, দুবাইতে ঠিক কী হয়েছিল?.?.. জোহানা তোকে কী দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছিল?.?..”
আরমান ওর ছোট ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল।
ইয়াসিন আর লুকাতে পারল না। ও ধপ করে ঘাসের ওপর বসে পড়ল।
“ভাইয়া, দুবাইতে যখন লিন্ডা আমায় আটকে রেখেছিল, তখন ও জোর করে আমার সই নিয়েছিল কিছু ড্রাগ সাপ্লাইয়ের কাগজে। আমি জানতাম না ওগুলো কী। পরে যখন বুঝলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জোহানা সেই কাগজগুলো দিয়ে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল যে আমি যদি ওকে টাকা না দিই, তবে ও আপনাকে আর পুলিশকে সব জানিয়ে দেবে। আমি ভয় পেয়েছিলাম, আপনি জানলে আমাকে ঘৃণা করবেন।…”
আরমান ফাইলটা হাতে নিল। ও একবার চোখ বুলালো কাগজগুলোতে। তারপর হঠাৎ পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে ফাইলটাতে আগুন ধরিয়ে দিল।
“ভাইয়া! এটা কী করলেন?.?..”
ইয়াসিন আঁতকে উঠল।
আগুনের শিখায় ইয়াসিনের পাপ আর ভয় পুড়তে শুরু করল। আরমান শান্ত গলায় বলল,
“ইয়াসিন, তুই লিন্ডার ষড়যন্ত্রের শিকার ছিলি, অপরাধী নোস। তুই আমাদের পরিবারের জন্য লড়েছিস। এই কাগজগুলো আজ থেকে ভস্ম। আর শোন, শায়ানকে আমি সব আগেই জানিয়েছি। দুবাই পুলিশের সাথে কথা বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে ওই সইগুলো জাল ছিল এবং তোকে ড্রাগ দিয়ে অচেতন করে নেওয়া হয়েছিল।…”
ইয়াসিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। বড় ভাইয়ের এই বিশাল হৃদয়ের কাছে ও নিজেকে খুব ছোট মনে করল। “আপনি সব জানতেন?.?..”
“বড় ভাই মানে শুধু হুকুম করা নয় ইয়াসিন, ছোট ভাইয়ের পিঠ আগলে রাখাও বড় ভাইয়ের কাজ। তুই আমাদের জন্য অনেক করেছিস। এখন থেকে আর কোনো লুকোচুরি নেই।…”
আরমান ইয়াসিনকে বুকে টেনে নিল।
ইয়াসিন ডুকরে কেঁদে উঠল। ওর বুক থেকে আজ এক বিশাল পাথর নেমে গেল। জোহানার সেই শেষ অস্ত্রটিও আজ ছাই হয়ে বাতাসে মিশে গেল।
ঠিক তখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল পদ্ম। ওর কোলে আমান। চাঁদের আলোয় পদ্মকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন এই পরিবারের সব অন্ধকার মুছে দেওয়া এক পবিত্র সত্তা।
“আরমান, মেজ ভাই!.. অনেক তো হলো দুই ভাইয়ের গল্প, এবার একটু ঘরে আসুন। আমান তার চাচুর সাথে খেলবে বলে বায়না ধরছে।…”
পদ্ম হাসিমুখে ডাকল।
ইয়াসিন চোখের জল মুছে হাসল। ও আমানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “আয় বাবা আমান!.. আজ তোকে আমি দুবাইয়ের গল্প শোনাব, যেখানে কোনো বিষ নেই, আছে শুধু সোনার মরুভূমি।…”
রাইমা আর সাফওয়ানও তখন ড্রয়িংরুমে বসে হাসাহাসি করছিল। রাইমার হবু সন্তানের জন্য সাফওয়ান আজ এক গাদা খেলনা কিনে এনেছে। পুরো সৈয়দ পরিবারে আজ কোনো রহস্য নেই, কোনো অন্ধকার নেই।
পরদিন সকালে।
নিশিন্দীপুর ভিলার ফটকে নতুন নেমপ্লেট লাগানো হলো— 'সৈয়দ প্যালেস: শান্তির নীড়'।
আরমান আর পদ্ম গেটে দাঁড়িয়ে হাসছিল। আরমান পদ্মর কাঁধে হাত রাখল। "
“পদ্ম, আমাদের এই গল্পটা তো শেষ হয়ে গেল, তাই না?.?..”
পদ্ম মাথা নাড়ল।
“না আরমান, এটা তো কেবল শুরু। আমাদের আমান বড় হবে, রাইমার সন্তান আসবে, আশা সুখী হবে। আমাদের ভালোবাসা তো প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয়।…”
নিশিন্দীপুর ভিলার নীল দিঘির ওপর দিয়ে একটা সাদা বক উড়ে গেল। আকাশটা আজ অনেক বেশি পরিষ্কার। বিষের দহন শেষ, ভালোবাসার জয়গান আজ পুরো দিগন্তে অনুরণিত হচ্ছে।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ