#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৫৭
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
আশার বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই সৈয়দ ভিলায় আবার সানাই বাজার তোড়জোড় শুরু হলো। আরমান এবার উঠেপড়ে লেগেছে মেজ ভাই ইয়াসিন-এর ঘর বাঁধার জন্য। ইয়াসিন তো লাজুক মুখে হেসেই উড়িয়ে দিতে চায়, কিন্তু আরমানের কড়া শাসন—
“ইয়াসিন, এই সংসার সামলাতে একজন শক্তপোক্ত সঙ্গিনী তোর দরকার!...”
অবশেষে পাত্রী পাওয়া গেল। পাত্রীর নাম মেহরিন। সে পেশায় একজন সাইকোলজিস্ট, খুব শান্ত আর বুদ্ধিমতী মেয়ে। আরমান আর পদ্ম মিলে যখন মেহরিনকে প্রথম দেখল, তখনই ওরা বুঝেছিল—বিক্ষুব্ধ ইয়াসিনের জন্য এই মেয়েটিই হবে প্রশান্তির ছায়া।
নিশিন্দীপুর ভিলা আবার সাজানো হলো। এবার ইয়াসিনের বিয়েতে কোনো জাঁকজমকের কমতি নেই। লাল পাগড়ি পরে ইয়াসিন যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসল, আরমান ওর পিঠে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“দেখলি তো ইয়াসিন?.?.. অন্ধকার কাটলে আলো কত উজ্জ্বল হয়!...”
বিয়ে সম্পন্ন হলো। মেহরিন যখন ঘোমটা মাথায় দিয়ে এ বাড়িতে পা রাখল, বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠল। পদ্ম আর মেহরিন-এর বন্ধুত্ব হতেও সময় লাগল না। দুই জা মিলে ঘরদোর সামলাতে শুরু করল।
এরই মাঝে কেটে গেল কয়েক মাস।
বাড়িতে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা। রাইমা-কে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আরমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করছে। সাফওয়ান তো টেনশনে বারান্দায় পায়চারি করতে করতে ঘামিয়ে একাকার।
“ভাইয়া!.. রাইমা ঠিক আছে তো?.?..”
সাফওয়ান আরমানকে দেখলেই আর্তনাদ করে উঠছে।
আরমান হেসে ওর কাঁধে হাত রাখল। “শান্ত হ সাফওয়ান!.. তুই তো এখনই ভয় পাচ্ছিস, পরে যখন মেয়ে সামলাতে হবে তখন কী করবি?.?..”
ঠিক তখনই লেবার রুম থেকে এক মিষ্টি কান্নার শব্দ ভেসে এল। নার্স বেরিয়ে এসে হাসিমুখে খবর দিল— “শুভাগমন!... ফুটফুটে এক রাজকুমারী এসেছে!...”
সাফওয়ান তো খুশিতে কেঁদেই ফেলল। আরমান আর ইয়াসিন কোলাকুলি করল। দাদাজান আশরাফুল আলম লাঠিতে ভর দিয়ে এসে কোলে নিলেন নাতনিকে।
“ঠিক যেন আমাদের মেজো বৌমা ইয়াসমিনের মতো দেখতে হয়েছে রে!...”
দাদাজান আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন।
পদ্ম আমানকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকল। আমান তার ছোট বোনকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ও ওর ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাচ্চার গালে ছুঁয়ে বলল,
“বুনু... বুনু!"
রাইমা তখন বেডে শুয়ে হাসছে। ওর গায়ের সেই নীল বিষের কোনো চিহ্ন নেই, বরং ওর মুখটা আজ এক অপার্থিব মাতৃত্বের আলোয় উদ্ভাসিত। বাচ্চার নাম রাখা হলো 'আনায়া'।
নিশিন্দীপুর ভিলা এখন শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত। একদিকে আমানের দুষ্টুমি, অন্যদিকে আনায়ার মিষ্টি কান্না। আরমান বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল ওর সাজানো সংসারটা। ইয়াসিন আর মেহরিন বাগানে হাঁটছে, সাফওয়ান আনায়াকে কোলে নিয়ে নাচছে, আর পদ্ম সবাইকে চা দিচ্ছে।
পদ্ম আরমানের পাশে এসে দাঁড়াল। “কী ভাবছেন ডক্টর সাহেব?.?..”
আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“ভাবছি পদ্ম, বিষ দিয়ে শুরু হওয়া এই গল্পটা আজ কতগুলো সুন্দর প্রাণে গিয়ে মিশল। লিন্ডা চেয়েছিল আমাদের বংশ মুছে দিতে, কিন্তু আল্লাহ আমাদের বংশকে আরও বাড়িয়ে দিলেন।…”
পদ্ম মাথা নাড়ল।
“সত্যিই আরমান। বিষের ওপর যখন নীলপদ্ম ফোটে, তখন সেই সৌন্দর্য সহ্য করার ক্ষমতা সবার থাকে না। আমরা লড়েছি, আর আজ আমরা জিতে গেছি।…”
সৈয়দ প্যালেসের গেটে আজ কেউ আর ভয় পায় না। গ্রামের ছোট বাচ্চারা এসে আমানের সাথে খেলে। বিষের সেই ল্যাবরেটরিটা এখন এক বিশাল অনাথ আশ্রম আর হাসপাতাল।
নিশিন্দীপুরের নীল দিঘির জলে আজ আর কোনো অন্ধকার নেই। আছে শুধু শরতের সাদা মেঘের প্রতিচ্ছবি আর এক সুখী পরিবারের অটুট ভালোবাসার মহাকাব্য।
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলায় এখন যেন ঈদের আনন্দ প্রতিদিনের সঙ্গী। আমান এখন দিব্যি দৌড়ে বেড়ায়, আর রাইমার ছোট্ট আনায়া দোলনায় শুয়ে হাত-পা ছুড়ে খেলা করে। ইয়াসিন আর মেহরিনের বিয়ের পর বাড়িতে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। মেহরিন খুব দ্রুতই বাড়ির সবার মন জয় করে নিয়েছে।
আজ আনায়ার আকিকা। মেজ ভাই ইয়াসিন পুরো গ্রামকে দাওয়াত দিয়েছে। আরমান আজ খুব ভোরে উঠে নিজের হাতে হাসপাতালের রোগীদের মিষ্টি মুখ করিয়েছে। বাড়ি ফিরে দেখল পদ্ম আমানকে গোসল করিয়ে নীল একটা ছোট পাঞ্জাবি পরিয়ে দিচ্ছে।
“আরমান!... দেখুন তো, আপনার ছেলে কি এখনই হিরো সেজে বসে আছে না?.?..”
পদ্ম হাসিমুখে বলল।
আমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করার চেষ্টা করছে আর বলছে,
“পা-পা... আমি বুনুকে দেখব!..”
আরমান আমানকে কোলে তুলে নিয়ে ওর কপালে চুমু খেল।
“হ্যাঁ বাবা, চলো। বুনু তো আজ রাজকুমারী সেজে বসে আছে।..”
নিচে ড্রয়িংরুমে রাইমা আনায়াকে নিয়ে বসে আছে। আনায়ার পরনে লাল একটা রেশমী ফ্রক, মাথায় ছোট একটা ফুলের ব্যান্ড। ও ওর বড় বড় চোখ দিয়ে সবাইকে দেখছে আর মাঝে মাঝে ফোকলা হাসছে। সাফওয়ান তো মেয়ের পাশ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরছে না।
“সাফওয়ান!.. মেহমানদের নাস্তা দেবে কে?.?.. তুমি কি সারা জীবন মেয়ের পাহাদার হয়েই থাকবে?.?..”
ইয়াসিন হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমে ঢুকল।
মেহরিন ট্রে হাতে পেছনে আসছিল। ও হাসল।
“মেজ ভাই, সাফওয়ান ভাই তো অলরেডি আনায়ার জন্য বিদেশের ইউনিভার্সিটি দেখা শুরু করে দিয়েছেন!.. উনি তো এখনই মেয়ের বিরহ ব্যথায় কাতর।…”
হাসির রোলে পুরো ঘর ফেটে পড়ল। দাদাজান আশরাফুল আলম আজ খুব তৃপ্ত। তিনি আমান আর আনায়াকে দুই পাশে নিয়ে বসলেন। “আমিন, দেখ!.. আমাদের সৈয়দ বংশের নতুন প্রজন্ম। বিষের সেই কালো অধ্যায় শেষ করে আজ এই ছোট ছোট চারাগাছগুলো বড় হচ্ছে।..”
সৈয়দ আমিন সাহেবের চোখে জল। তিনি মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালেন।
বিকালে বাগানের এক কোণে আরমান আর ইয়াসিন বসে ছিল। ইয়াসিন একটা প্রস্তাব দিল।
“বড় ভাই, আমি ভাবছি আমাদের এই নিশিন্দীপুর ভিলার পাশে একটা বড় খেলার মাঠ আর লাইব্রেরি করব। আমান আর আনায়ারা যখন বড় হবে, ওরা যেন শুধু পড়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ না থাকে।…”
আরমান সায় দিল।
“চমৎকার আইডিয়া ইয়াসিন!... আমি হাসপাতালের ফান্ড থেকে কিছুটা অনুদান দেব।…”
ঠিক তখন পদ্ম আর মেহরিন হাসতে হাসতে ওদের কাছে এল। পদ্মর হাতে এক গুচ্ছ তাজা পদ্মফুল। ও আরমানের হাতে ফুলগুলো দিয়ে বলল,
“আজকের এই শুভ দিনে আপনার প্রিয় ফুলটা দিতে ভুলিনি।…”
আরমান ফুলগুলো হাতে নিয়ে পদ্মর চোখের দিকে তাকালো।
“পদ্ম, আজ মনে হচ্ছে আমাদের সেই নীল বিষের দিনগুলো কোনো এক দুঃস্বপ্ন ছিল। আজ এই রোদ ঝলমলে বিকেলে দাঁড়িয়ে আমি শুধু ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।…”
আমান হঠাৎ দৌড়ে এসে আরমানের পা জড়িয়ে ধরল।
“পা-পা! বুনু কাঁদছে!..”
সবাই দ্রুত ভেতরে গিয়ে দেখল আনায়া কাঁদছে না, বরং ও আমানের খেলনা গাড়িটা খামচে ধরে আছে। আমান ওটা নিতে গেলেই ও কেঁদে ওঠার ভান করছে।
“দেখুন!.. এখনই ভাই-বোনের খুনসুটি শুরু হয়ে গেছে!...”
মেহরিন হেসে ফেলল।
সাফওয়ান রাইমার কানে কানে বলল, “রাইমা, আমাদের মেয়ে তো দেখছি আমানকে টেক্কা দেবে বড় হয়ে!..”
নিশিন্দীপুর ভিলার এই নতুন অধ্যায়ে কোনো চক্রান্ত নেই, কোনো নীল বিষ নেই। আছে শুধু এক ঝাক শিশুর হাসি আর এক যৌথ পরিবারের অটুট বন্ধন। সৈয়দ ভিলা এখন আক্ষরিক অর্থেই 'শান্তির নীড়'।
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলার সেই অভিশপ্ত নীলকুঠির দিনগুলো এখন কেবলই রূপকথার গল্প মনে হয়। সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলেছে, আর সেই সাথে পাল্টে গেছে সৈয়দ পরিবারের অবয়ব। আজ সকাল থেকেই বাড়িতে এক অন্যরকম উত্তেজনা, কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ মেহরিনের ঘর আলো করে নতুন অতিথি আসার দিন।
সকাল থেকেই ইয়াসিন অস্থির হয়ে পায়চারি করছে বারান্দায়। ও এমনিতে খুব ধীরস্থির মানুষ, কিন্তু আজ ওর সব গাম্ভীর্য হাওয়া হয়ে গেছে। আরমান ওর কাঁধে হাত রেখে হাসল।
“কিরে ইয়াসিন! তুই তো দেখছি সাফওয়ানের চেয়েও বেশি ঘাবড়ে গেছিস। শান্ত হ, আমি তো আছি।..”
ইয়াসিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আরমান ভাই, ভয় লাগছে। আমাদের বংশের ওপর দিয়ে কত ঝড় গেল! মেহরিন আর বাচ্চাটা সুস্থ থাকবে তো?.?..”
আরমান দৃঢ় স্বরে বলল, “ইনশাআল্লাহ! লিন্ডার সেই বিষের ছায়া আমি অনেক আগেই উপড়ে ফেলেছি। আজ শুধু খুশির দিন।…”
নিচে বাগানে আমান আর আনায়ার খুনসুটি চলছে। আমান এখন পাঁচ বছরের চঞ্চল বালক, আর আনায়া টলমল পায়ে ওর পেছনে 'ভাইয়া... ভাইয়া' বলে চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে। আমান ওর ছোট বোনকে খুব আগলে রাখে।
“বুনু, দৌড়াস না!.. পড়ে যাবি!...”
আমান আনায়ার হাত ধরে থামাল।
ঠিক তখন দোতলা থেকে এক নবজাতকের কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। আরমান দ্রুত ভেতরে ঢুকল। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে ইয়াসিনকে জড়িয়ে ধরল।
“অভিনন্দন ইয়াসিন! আল্লাহ তোকে এক রাজপুত্র দিয়েছেন!...”
ইয়াসিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের অশ্রু। ও দ্রুত ঘরে ঢুকে দেখল মেহরিন হাসিমুখে শুয়ে আছে, আর ওর পাশে একটা ছোট্ট তুলতুলে শিশু। ইয়াসিন ওর ছেলের কপালে চুমু খেয়ে নাম রাখল— 'আরিয়ান'।
সৈয়দ ভিলায় আজ খুশির হাট বসেছে। পদ্ম আর রাইমা মিলে পুরো বাড়িকে আজ নতুন করে সাজিয়েছে। দুপুরে মেহমানদের বিশাল ভোজের আয়োজন। ঠিক তখনই সদর দরজায় হর্ন বাজল। গাড়ি থেকে নামল আশা আর আরাফাত।
আশা এখন বেশ ঘরনী হয়েছে। ও এসেই আরমান আর পদ্মকে জড়িয়ে ধরল।
“বড় ভাই, ভাবি!.. আরিয়ানকে দেখতে আসব বলে কাল রাত থেকে আরাফাতকে তাড়া দিচ্ছিলাম।…”
আরাফাত হাসল।
“হ্যাঁ ভাইয়া, আপনার বোন তো আমাকে শান্তিতে ঘুমাতেও দেয়নি!...”
সবাই ড্রয়িংরুমে হাসাহাসি করছে। দাদাজান আজ অনেকদিন পর ওনার সেই পুরনো আরামকেদারায় বসে আছেন। ওনার দুই পাশে আমান আর আনায়া। আরমান দেখল দাদাজানের চোখে এক গভীর তৃপ্তি।
“প্রাণ…”
আরমান ইশারায় পদ্মকে বারান্দায় ডাকল।
পদ্ম কাছে আসতেই আরমান ওর হাতে একটা ছোট্ট ডায়েরি দিল।
“এটা কী আরমান?.?...”
আরমান হাসল।
“এটা আমাদের 'পদ্মপাতা'র শেষ পাতা। আজ আরিয়ান আসাতে আমাদের এই যৌথ পরিবারের বৃত্তটা পূর্ণ হলো। আমি চাই আমাদের এই লড়াই আর ভালোবাসার গল্পটা আমান, আনায়া আর আরিয়ানরা যখন বড় হবে, তখন যেন ওরা পড়ে।..”
পদ্ম ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখল শেষ পাতায় আরমান লিখেছে—
“বিষ দিয়ে শুরু হলেও, বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আজ আমরা এক বিশাল মহীরুহ। আমাদের শাখা-প্রশাখা এখন ছায়া দিচ্ছে পুরো নিশিন্দীপুরকে।”
রাতের বেলা।
পুরো ভিলা নীল-সাদা আলোয় ঝলমল করছে। বাড়ির ছাদে সবাই মিলে একসাথে ডিনার করছে। ইয়াসিন মেহরিনকে খাইয়ে দিচ্ছে, সাফওয়ান আনায়াকে কোলে নিয়ে গান শোনাচ্ছে। আরমান পদ্মর দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি বিনিময় করল।
হঠাৎ আমান চিৎকার করে উঠল, “বাবা! আকাশ দেখ!...”
সবাই তাকিয়ে দেখল আকাশে আতশবাজি ফুটছে। নীলকুঠির সেই অভিশপ্ত আকাশে আজ আতশবাজির রঙ। আরমানের মনে হলো, ওর মা ইয়াসমিন আজ জান্নাত থেকে দেখছেন যে তাঁর স্বপ্নের পরিবার আজ কতটা সুখী।
নিশিন্দীপুর ভিলা এখন আর কোনো ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র নয়, এটি এখন ভালোবাসার এক সুরক্ষিত দুর্গ। লিন্ডার সেই বিষাক্ত স্মৃতি আজ ইতিহাসের ধুলোয় মিশে গেছে। সৈয়দ বংশের নতুন প্রজন্ম আজ ডানা মেলছে এক নির্মল বাতাসে।
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলার বারান্দায় এখন রোদের ঝিলিক, আর সেই সাথে চলছে এক অম্লমধুর যুদ্ধ। আমান আর আনায়ার খুনসুটি এখন বাড়ির সবার বিনোদনের প্রধান খোরাক। ৫ বছরের আমান যেমন গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে, ৩ বছরের আনায়া ঠিক ততটাই দাপুটে।
সকালবেলা। আমান ড্রয়িংরুমে বসে খুব মন দিয়ে ওর স্কুলের হোমওয়ার্ক করছিল। ওর সামনে রাখা একটা নীল রঙের কলম, যেটা আরমান ওকে উপহার দিয়েছে। আমান একটু পানি খেতে ভেতরে যেতেই ঘটে গেল বিপত্তি।
পিছু পিছু টলমল পায়ে হাজির হলো আনায়া। ওর পরনে গোলাপি ফ্রক, চুলে দুটো ঝুটি। ও দেখল ভাইয়ার সেই সুন্দর কলমটা টেবিলের ওপর একা পড়ে আছে। আনায়া খপ করে কলমটা ধরল আর আমানের খাতার সাদা পাতায় মনের সুখে আঁকিবুঁকি শুরু করল।
আমান পানি খেয়ে ফিরেই থমকে দাঁড়ালো।
“আনা!.. এটা কী করলি?.?.. আমার হোমওয়ার্ক সব নষ্ট করে দিলি!...”
আনায়া কলমটা পেছনে লুকিয়ে দাঁত বের করে এক গাল হাসল।
“ভাইয়া... আমি পাখি এঁকেছি!.. দেখো, কত সুন্দর পাখি!...”
"পাখি না ছাই!.. এটা তো হিজিবিজি!.. সর এখান থেকে, তুই খুব পচা!...”
আমান রাগের ভান করে খাতাটা টেনে নিল।
আনায়া দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও উল্টো ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদার উপক্রম করল।
“আমি পচা?.?.. আচ্ছা, আমি বড় আম্মুকে (পদ্ম) গিয়ে বলব তুমি আমায় বকেছ!...”
“বল গে যা!.. আমি ডক্টর হবো, আর তুই আমার খাতা নষ্ট করিস।…”
আমান গাল ফুলিয়ে আবার লিখতে বসল।
ততক্ষণে পদ্ম আর রাইমা রান্নাঘর থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল। রাইমা ওর মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“কিরে আনায়া?.?.. ভাইয়াকে আবার জ্বালাচ্ছিস?.?..”
আনায়া রাইমার কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল।
“আম্মু, ভাইয়া আমায় পচা বলেছে। আমি আর ভাইয়ার সাথে খেলব না!...”
আমান তখন কলমটা ড্রয়ারে তালা মেরে রেখে গটগট করে বাগানে চলে গেল। কিন্তু ৫ মিনিটও পার হলো না, আমান দেখল বাগানে একটা বড় প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। ও ভুলেই গেল যে ও আনায়ার ওপর রাগ করেছিল।
“আনা!..জলদি আয়! দেখ, কত বড় একটা নীল প্রজাপতি!...”
আমান বাগান থেকেই চিৎকার করে ডাকল।
আনায়া চোখের জল এক নিমেষে মুছে রাইমার কোল থেকে নেমে দৌড় দিল।
“ভাইয়া!.. আমি ধরব ওটাকে!...”
দুই ভাই-বোন মিলে এখন প্রজাপতির পেছনে ছুটছে। আমান বারবার আনায়ার হাত ধরছে যাতে ও পড়ে না যায়। একটু আগেই যে ঝগড়া ছিল, এখন সেখানে শুধু হাসির রোল।
আরমান আর ইয়াসিন ওপরের বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখছিল। আরমানের হাতে এক কাপ চা। ও মুচকি হেসে বলল,
“দেখ ইয়াসিন, আমাদের ছোটবেলাটাও কি এমন ছিল না?.?.. আমি আর তুই কত ঝগড়া করতাম, আবার এক থালায় ভাত খেতাম।…”
ইয়াসিন হাসল।
“হ্যাঁ আরমান ভাই। তবে আমান তো একদম আপনার মতো জেদী, আর আনায়া হয়েছে ঠিক রাইমার মতো ডানপিটে। আমাদের বাড়ির প্রাণ তো এই ছোটরাই।…”
মেহরিন তখন ছোট্ট আরিয়ান-কে নিয়ে রোদে বসে ছিল। আরিয়ান এখন কেবল হাত-পা ছুড়তে শিখেছে। ও বড় ভাই-বোনের দৌড়াদৌড়ি দেখে খিলখিল করে হাসছে।
বিকালে রাইমা আনায়াকে গোসল করিয়ে দিচ্ছিল। আনায়া হঠাৎ বলল,
“আম্মু, ভাইয়া যখন বড় ডক্টর হবে, আমি তখন ভাইয়ার কম্পাউন্ডার হবো! ভাইয়াকে সব কলম এগিয়ে দেব।..”
রাইমা হেসে ফেলল।
“তোর ভাইয়া তোকে অনেক ভালোবাসে রে মা। তোরা এভাবেই সারাজীবন একসাথে থাকিস।..”
সৈয়দ ভিলার প্রতিটি দেয়ালে এখন শুধু সুখের প্রতিধ্বনি। বিষের নীল ছায়া মুছে গিয়ে এখন সেখানে ছোট ছোট শিশুদের হাসির রামধনু খেলা করে। আরমান আর পদ্ম আজ সত্যিই এক সার্থক দম্পতি, যারা এক ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে তুলেছে এক চিরস্থায়ী ভালোবাসার প্রাসাদ।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ