#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৫৮
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
নিশিন্দীপুর ভিলার বারান্দায় ভোরের রোদটা আজ বেশ ঝকঝকে। চায়ে চুমুক দিয়ে আরমান দেখল, বাড়ির উঠোনে এক এলাহি কাণ্ড চলছে। আজ পুরো সৈয়দ পরিবার মিলে সমুদ্রের টানে কক্সবাজার যাচ্ছে। বিয়ের পর আরমান আর পদ্মর সেই অস্থির দিনগুলোর পর এই প্রথম সবাই মিলে একসাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়া।
সকাল সাতটা। বাড়ির সামনে দুটো বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে। ইয়াসিন আর সাফওয়ান মিলে ডিকিতে ব্যাগপত্র তুলছে। ওদিকে আমান একটা ছোট পিঠব্যাগ কাঁধে নিয়ে মহা ব্যস্ত। ওর ব্যাগে কী আছে কেউ জানে না, তবে ও সেটা কাউকে ছুঁতেও দিচ্ছে না।
“আমান!.. ব্যাগটা নামাও বাবা, গাড়িতে উঠলে ঘেমে যাবে তো।.."
পদ্ম ছেলেকে আদর করে বলল।
আমান মাথা নাড়ল।
“না আম্মু!.. আমার ব্যাগে আনায়ার জন্য চকলেট আর আমার দূরবীন আছে। আমি সমুদ্রের বড় মাছ দেখব!...”
আনায়া তখন রাইমার কোলে বসে একটা বড় সানগ্লাস পরে পোজ দিচ্ছে। ওর বয়স মাত্র তিন, কিন্তু স্টাইলে ও সবাইকে হার মানাবে। ও আমানের দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কাটল।
“ভাইয়া... মাছ তো জলে থাকে, দূরবীনে কেন?.?..”
সবাই হোহো করে হেসে উঠল। আরমান এসে আমানকে কোলে তুলে নিল।
“বড় মাছ দেখতে হলে তো লঞ্চে উঠতে হবে বাবা। চলো, আজ আমরা সবাই মিলে সমুদ্রের ঢেউ গুনব।…”
গাড়িতে ওঠার সময় শুরু হলো আসল যুদ্ধ। আমান আর আনায়া—দুজনেই জানলার ধারে বসবে। শেষে মেহরিন এসে সমাধান করল।
“আমান বাবা, তুই তো বড় ভাই। বুনুকে একটু জায়গা দে, তুই আমার কোলে বোস।…”
আমান একটু গম্ভীর হয়ে গেল। “আচ্ছা, আনা তো ছোট, ও জানলা দিয়ে দেখুক। আমি ডক্টর হবো তো, আমাকে বড় মন রাখতে হবে।…”
সাফওয়ান হাসতে হাসতে বলল, “রাইমা, আমাদের আমান তো এখনই ফিলোসফার হয়ে গেছে!...”
ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম হয়ে গাড়ি যখন কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে ঢুকল, তখন বিকেলের নরম রোদ সমুদ্রের লোনা জলে ঝিলিক দিচ্ছে। নীল জলরাশি দেখে আমান আর আনায়া চিৎকার করে উঠল।
“পা-পা!... কত জল!.. এটা কি আমাদের দিঘির চেয়েও বড়?.?..”
আনায়ার চোখ ছানাবড়া।
হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরমান পদ্মর কাঁধে হাত রাখল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। সমুদ্রের গর্জন যেন জীবনের সব জয়গানের প্রতিধ্বনি।
“পদ্ম, মনে আছে?.. লিন্ডার সেই ল্যাবে যখন আমরা বন্দি ছিলাম, তখন আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম—একদিন আমরা নীল আকাশ আর নীল জল দেখব। আজ সেই নীল আমাদের রক্তে নেই, আমাদের চোখের সামনে।…”
আরমান আবেগজড়িত গলায় বলল।
পদ্ম আরমানের বুকে মাথা রাখল।
“হ্যাঁ আরমান। তখন ভাবিনি যে আমরা এই দিনটা দেখতে পাব। আজ আমাদের সাথে আমাদের সন্তানেরা আছে। এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী হতে পারে?.?..”
সন্ধ্যার দিকে সবাই বিচে নামল। ইয়াসিন আর আরমান মিলে বাচ্চাদের নিয়ে বালুর ঘর বানাচ্ছে। আমান খুব যত্ন করে একটা দুর্গ বানাচ্ছে, আর আনায়া সেটা এক লাথিতে ভেঙে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে।
“আনা!.. পচা মেয়ে!... আমি এত কষ্ট করে বানালাম!...
আমান গাল ফুলিয়ে বসে পড়ল।
আনায়া দৌড়ে গিয়ে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরল।
“ভাইয়া... ওটা তো বালু। আমি তোমাকে আমার সব খেলনা দেব, রাগ করো না!..”
আরমান আর ইয়াসিন একে অপরের দিকে তাকালো। ওদের ছোটবেলার ছবি যেন ফিরে এসেছে এই দুই শিশুর মাঝে। রাইমা আর মেহরিন দূরে বসে ওদের এই খুনসুটি দেখছিল আর হাসছিল।
হঠাৎ ইয়াসিন পকেট থেকে একটা খাম বের করে আরমানের হাতে দিল। “বড় ভাই, এটা আমাদের সবার পক্ষ থেকে আপনার আর ভাবির জন্য একটা গিফট।…”
আরমান খামটা খুলে দেখল—ভেতরে মক্কার দুটো টিকেট। ইয়াসিন বলল,
“আমরা চাই আগামী মাসে আপনি আর ভাবি মিলে হজ করে আসুন। দাদাভাই যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তো হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিন্তু আপনারা ওনার প্রতিনিধি হয়ে যান।…”
আরমানের চোখ ভিজে এল। ও ইয়াসিনকে জড়িয়ে ধরল। সৈয়দ ভিলার বন্ধন আজ সমুদ্রের চেয়েও গভীর। বিষের জ্বালা সয়ে সয়ে আজ এই পরিবারটি এক শীতল শান্তির ছায়ায় এসে পৌঁছেছে।
সমুদ্রের ঢেউ এসে আমান আর আনায়ার পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। ওরা হাসছে, দৌড়াচ্ছে। লিন্ডার সেই অভিশপ্ত অধ্যায় আজ বিস্মৃতির অন্তরালে। আজ কেবল শুরু এক নতুন মহাকাব্যের।
— — —
কক্সবাজারের নীল সমুদ্রের গর্জন আর বাচ্চাদের কলকাকলিতে সৈয়দ পরিবারের আনন্দ যেন উপচে পড়ছে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই আরমানের মনে হজের সেই সফরের কথা এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনছে। লিন্ডার বিষে নীল হওয়া শরীরটা আজ পবিত্র কাবা শরীফ ছোঁয়ার অপেক্ষায় উন্মুখ।
সমুদ্র থেকে ফেরার পর নিশিন্দীপুর ভিলায় এক গম্ভীর অথচ পবিত্র আমেজ বিরাজ করছে। আরমান আর পদ্ম হজে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করেছে। ইয়াসিন আর সাফওয়ান মিলে সব ডকুমেন্টস গুছিয়ে দিয়েছে। আরমান যাওয়ার আগে তার 'আমান চিলড্রেন হসপিটাল'-এর দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে ইয়াসিন আর মেহরিনকে।
“ইয়াসিন, হাসপাতালের ফার্মেসি আর ল্যাবের ওপর কড়া নজর রাখিস। লিন্ডার সেই ল্যাবে তৈরি হওয়া কোনো ধ্বংসাত্মক ফর্মুলা যেন আর কোনোদিন মাথাচাড়া না দেয়।…”
আরমান ছোট ভাইয়ের হাত ধরল।
ইয়াসিন মাথা নাড়ল।
“আরমান ভাই, আপনি নিশ্চিন্তে যান। আমি আর মেহরিন মিলে আপনার এই ত্যাগের ফসলকে আগলে রাখব। আপনি শুধু আম্মা ইয়াসমিনের জন্য দোয়া করবেন।…”
এদিকে প্যাকিং করতে গিয়ে পদ্ম-র নাজেহাল অবস্থা। কারণ আমান আর আনায়া কোনোভাবেই মানতে নারাজ যে আব্বু-আম্মু তাদের ছেড়ে যাচ্ছে। আমান তো ওর ছোট ব্যাগটা গুছিয়ে পদ্মর সুটকেসের ওপর বসে আছে।
“আম্মু!.. আমিও যাব!.. আমি ওখানে গিয়ে কাবা ঘরের পাশে দৌড়াব!...”
আমান জেদ ধরেছে।
পদ্ম ওকে আদর করে কোলে নিল। “বাবা, এবার না। তুমি তো এখন বড় ভাই, তোমার ছোট বোন আনায়া আর আরিয়ানকে পাহারা দেবে কে?.?. তুমি না থাকলে আনায়া তো শুধু কাঁদবে।…”
আমান একটু ভাবল। ও আড়চোখে আনায়ার দিকে তাকালো, যে তখন মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমান বড় মানুষের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আচ্ছা, আমি বুনুর কাছে থাকব। কিন্তু তুমি আমার জন্য জমজম পানি আর খেজুর নিয়ে আসবে তো?.?..”
“অবশ্যই বাবা!.. অনেক অনেক দোয়া নিয়ে আসব তোমার জন্য।…”
পদ্ম ছেলের কপালে চুমু খেল।
পরদিন ভোরে বিদায়ের সময়। পুরো সৈয়দ পরিবার এয়ারপোর্টে। আরমান আর পদ্ম যখন এহরামের পোশাকে দাঁড়ালো, তখন ওদের চেহারায় এক অলৌকিক নূর ফুটে উঠল। লিন্ডার দেওয়া সেই ক্ষতগুলো আজ যেন একে একে মুছে যাচ্ছে।
রাইমা আর আশা পদ্মকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
“ভাবি, আমাদের জন্য অনেক দোয়া করবেন। আমাদের এই নতুন প্রজন্ম যেন ইসলামের আলোয় বড় হয়।…”
আরমান দাদাজান আশরাফুল আলম-এর পা ছুঁয়ে সালাম করল। দাদাজান থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত দুটো আরমানের মাথায় রাখলেন।
“আরমান, তুই আমার বংশের মুখ উজ্জ্বল করেছিস। যা বাবা, মা ইয়াসমিন ও আয়লার রুহের মাগফেরাত কামনা করিস।…”
আমান তখন আম্মুর ওড়না খামচে ধরে আছে। ওর চোখে জল, কিন্তু ও কাঁদছে না। ও ওর পকেট থেকে একটা ছোট প্লাস্টিকের খেলনা বের করে আরমানের হাতে দিল।
“আব্বু, এটা রাখো। এটা তোমাকে পাহারা দেবে।…”
আরমান হাসিমুখে ছেলের দেওয়া সেই উপহারটা পকেটে নিল। পদ্ম আর আরমান যখন গেটের ভেতরে ঢুকে গেল, তখন আমান চিৎকার করে উঠল—
“আল্লাহ হাফেজ আব্বু!.. আল্লাহ হাফেজ আম্মু!...”
কয়েক ঘণ্টা পর।
আরমান আর পদ্ম মক্কা শরীফে। কাবার কালো গিলাফটা প্রথমবার চোখের সামনে দেখে আরমান ডুকরে কেঁদে উঠল। ও মাটিতে সেজদায় পড়ে গেল।
“হে আল্লাহ!.. তুমি আমাকে বিষের নীল অন্ধকার থেকে বের করে আনলে। তুমি আমার পরিবারকে বাঁচালে। আমি তোমার দরবারে আমার সব গুনাহের তওবা করছি।…”
পদ্ম পাশে দাঁড়িয়ে শুধু চোখের জল মুছছে। ওর মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আরমান ল্যাবে মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল। আজ সেই আরমান সুস্থ শরীরে আল্লাহর ঘরে।
এদিকে নিশিন্দীপুর ভিলা এখন বাচ্চাদের রাজত্ব। আমান, আনায়া আর আরিয়ান মিলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে। ইয়াসিন আর সাফওয়ান মিলে ওদের সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
“ভাইয়া!.. আনায়া আমার চশমা নিয়ে পালিয়েছে!...”
ইয়াসিন চিৎকার করে উঠল।
সাফওয়ান হাসতে হাসতে বলল, “আরমান ভাই নেই, এখন বুঝো কত ধানে কত চাল!.. বাচ্চারা তো আমাদের নাচিয়ে ছাড়ছে।…”
সৈয়দ ভিলায় এখন খুশির জোয়ার। কোনো ষড়যন্ত্র নেই, কোনো বিষ নেই। আছে শুধু এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি আর আগামীর স্বপ্ন। আরমান আর পদ্ম যখন ফিরবে, তখন তারা আর কেবল এক দম্পতি থাকবে না, তারা হবে এক শুদ্ধ আত্মার পথিক।
— — —
মক্কা-মদিনার পবিত্র সফর শেষ করে আরমান আর পদ্ম যখন দেশে ফিরল, নিশিন্দীপুর ভিলা তখন যেন চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে। এয়ারপোর্ট থেকে বাড়িতে ঢোকা পর্যন্ত আমান আর আনায়ার সে কী উত্তেজনা! ওরা গেটের কাছে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আব্বু-আম্মুকে বরণ করতে।
গাড়িটা ভিলার সামনে থামতেই আমান চিৎকার করে উঠল,
“আব্বু এসেছে! আম্মু এসেছে!...”
আরমান আর পদ্ম গাড়ি থেকে নামল। দুজনের পরনেই সাদা পোশাক, মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। আরমান নিচু হয়ে আমানকে কোলে তুলে নিল আর পদ্ম জড়িয়ে ধরল ছোট্ট আনায়াকে।
“কেমন ছিল আমার আব্বুটা?.?.. ভাই বোনকে দেখে রেখেছ তো?.?..”
আরমান আমানের কপালে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমান গম্ভীর হয়ে বলল,
“হ্যাঁ আব্বু!.. আমি আরিয়ান আর আনায়াকে রোজ চকলেট দিয়েছি। কিন্তু মেজ চাচ্চু (ইয়াসিন) খুব বকা দেয়, ওনাকে বলো আমি পচা নই!..”
পেছন থেকে ইয়াসিন হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল।
“বড় ভাই, ভাবি! ওয়েলকাম ব্যাক। আপনাদের ছাড়া এই কয়েকদিন বাড়িটা একদম মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল। যদিও এই বাঁদরগুলো আমায় এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয়নি।..”
সবাই ড্রয়িংরুমে বসল। আরমান সবার জন্য জমজম পানি আর মদিনার খেজুর বের করল। দাদাজান আশরাফুল আলম তসবিহ হাতে নিয়ে ওদের পাশে বসলেন। ওনার চোখে আজ সার্থকতা।
“আরমান, আল্লাহর ঘর জিয়ারত করে এলি, এখন মনটা কেমন লাগছে বাবা?.?..”
দাদাজান জিজ্ঞেস করলেন।
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “দাদাজান, কাবার গিলাফ ছুঁয়ে যখন দোয়া করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল দুনিয়ার সব বিষ, সব হিংসা কত তুচ্ছ। লিন্ডা আমাদের যা ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি রহমত আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।…”
পদ্ম তখন রাইমা আর মেহরিনকে তসবিহ আর জায়নামাজ উপহার দিচ্ছিল। ও মুচকি হেসে বলল, “জানো , ওখানে গিয়ে শুধু তোমাদের সবার চেহারা চোখে ভাসছিল। বিশেষ করে আরিয়ানের জন্য আমি একটা ছোট জুব্বা নিয়ে এসেছি।…”
ঠিক তখনই শাফিন দৌড়ে এল একটা খাম হাতে।
“বড় ভাই! আমানের স্কুলের রেজাল্ট দিয়েছে! আমান তো ফাটিয়ে দিয়েছে!...”
আরমান খামটা খুলে দেখল—
আমান নার্সারি ক্লাসে প্রথম হয়েছে!.. সব বিষয়ে ও স্টার মার্কস পেয়েছে।
“সাবাস আমার বাঘের বাচ্চা!...”
আরমান আমানকে আবার কোলে তুলে নিল।
“তুমি তো আমাদের মুখ উজ্জ্বল করলে। বড় হয়ে তুমিও কি ডক্টর হবে?.?..”
আমান বুক ফুলিয়ে বলল,
“"না আব্বু! আমি ডক্টর হবো না, আমি আর্মি হবো! আমি সব পচা মানুষ আর লিন্ডাদের মারব, যাতে কেউ আমাদের আর বিষ দিতে না পারে!...”
৫ বছরের শিশুর মুখে এই সাহসের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল। আরমান পদ্মর দিকে তাকালো। পদ্মর চোখে তখন গর্বের জল।
বিকালে বাগানের সেই শিউলি তলায় সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। আরমান আর ইয়াসিন পাশাপাশি বসা। আরমান পকেট থেকে একটা ছোট নীল রঙের পাথর বের করল, যেটা ও মক্কা থেকে কুড়িয়ে এনেছে।
“ইয়াসিন, এই পাথরটা আমাদের ল্যাবে রেখে দিস। এটা আমাদের মনে করাবে যে সত্য সবসময় সুন্দরের মতো অটল থাকে। আমাদের ল্যাব এখন থেকে শুধু জীবন বাঁচানোর ওষুধ বানাবে, কোনো বিষ নয়।…”
আরমান ঘোষণা করল।
সাফওয়ান আর রাইমা আনায়াকে নিয়ে দোলনায় দুলছিল। আনায়া হঠাৎ বলল,
“আব্বু, আমি বড় হয়ে পাইলট হবো!.. আমি প্লেন চালিয়ে সবাইকে মক্কায় নিয়ে যাব!...”
সৈয়দ ভিলার আকাশ আজ কত বিশাল মনে হচ্ছে। লিন্ডার সেই বিষাক্ত ছায়া এখন আর কারো স্বপ্নেও আসে না। বিষের সেই ল্যাবরেটরি এখন এক পবিত্র চিকিৎসালয়।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ভিলা শান্ত হয়ে এল। আরমান আর পদ্ম বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আমান তখন ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে আছে।
“পদ্ম, আমাদের এই 'পদ্মপাতা'র গল্পটা কি তবে এখানেই পূর্ণ হলো?.?..
আরমান ফিসফিস করে বলল।
পদ্ম মাথা নাড়ল।
“না আরমান, এটা তো কেবল শুরু। আমাদের সন্তানদের হাত ধরে এই ভালোবাসা আর সত্যের জয়গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়বে।…”
নিশিন্দীপুরের নীল দিঘির ওপর দিয়ে একটা শীতল হাওয়া বয়ে গেল। কাল সকালে এক নতুন সূর্য উঠবে, যেখানে কোনো ভয় নেই, শুধু আছে এক বুক ভালোবাসা আর প্রশান্তি।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ