#পারমিতা ২
#পর্ব_২
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ
তিন মাস পর। সাল ২০১৪।
পড়ার টেবিলে বসে আছে অরিয়ন। সামনে বায়োলজির বই খোলা, পাশে প্র্যাকটিক্যাল খাতা। একাগ্রচিত্তে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে, চিত্রটা বোঝার চেষ্টা করছে। পরক্ষণে দৃষ্টি ফেরায় খাতার দিকে।টেবিলের একপাশে কফির কাপ রাখা, তা থেকে গরম গরম ধোঁয়া উঠছে। হাত বাড়িয়ে কফির কাপ নিয়ে তাতে চুমুক দেয় অরিয়ন। গতকাল রাত থেকে জেগে আছে সে। চিত্র আঁকা ও লেখা শেষ করার জন্য ঘুমোতে পারেনি। আর মাত্র দুটো চিত্র বাকি, তারপর একটা শান্তির ঘুম দেবে অরিয়ন। কফির কারণে এখনো জেগে থাকতে পারছে, তবে চোখেমুখে শুধুই ঘুমের ছায়া। পিরিচের উপর কাপ রেখে আবার চিত্র আঁকতে শুরু করে।
অরিয়নের এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। আগামীকাল বায়োলজির প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। তাই এত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে তাকে।
“অরিয়ন?” আনিকা চৌধুরীর কণ্ঠস্বর শুনতেই লেখা বন্ধ করে অরিয়ন। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে রুমের দরজা খোলে।
“জি, মা?”
“খাবারের সময় হয়ে গেছে। ফ্রেশ হয়ে নাও। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
“আমার একটু লেখা এখনো বাকি আছে। খাবারটা রুমে পাঠিয়ে দাও।”
“তোমার ছোট চাচ্চু এসেছেন তার পরিবারসহ। বাড়িতে মেহমান এলে নিয়ম তো তোমার জানা।”
“একসঙ্গে খেতে হবে” বিরক্ত হয়ে বলে অরিয়ন।
“হ্যাঁ, এখন যাও, ফ্রেশ হয়ে নাও।”
“ওকে।” আনিকা চৌধুরী আর কিছু না বলে চলে যান। অরিয়ন সরাসরি নিজের আলমারির কাছে গিয়ে পড়ার জন্য কাপড় বের করতে শুরু করে। কাপড় বাছা হলে ওয়াশরুমে ঢোকে।
*********************
“এভাবে বল ছুড়াছুড়ি করবে না, মিতা।”
“মা, দেখো, আমি এক লা'থিতে কতদূর নিয়ে যেতে পারি!” মায়া চৌধুরীর কথায় কান দিল না মিতা।
“দেখেছি। তবে এভাবে লা'থি মা'রতে নিষেধ করেছি তোমাকে। কোথাও লাগলে জিনিস ভেঙে যাবে।”
“আহ, মায়া, ছোটো মানুষ, খেলতে দেও মনের মতো” হাবিব চৌধুরী বলে ওঠেন।
হাবিব চৌধুরী, বয়স ৪৮। গম্ভীর মুখের চাহনি, বয়সের তুলনায় একটু বেশি তরুণ মনে হয় তাকে। বলিষ্ঠ দেহ নিয়ে এখনো যুবকদের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারেন।
সকলে মিলে ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সকলে বলতে শুধু বাড়ির বড়রা। আফরিন আজও আবরারের রুমে গিয়ে বসে আছে। আর মিতা? সে নিচে নিজের নতুন বল নিয়ে খেলতে ব্যস্ত। তার বড় চাচ্চু তাকে এই নতুন বলটা আজ উপহার দিয়েছেন।
“মেয়েটা একদম কথা শোনে না” হতাশা নিয়ে বলে ওঠেন মায়া চৌধুরী।
“আমাদের কারো মতো হয়নি, একদম বেশি চঞ্চল” পাশে বসা আনিকা চৌধুরী বলেন। মায়া চৌধুরী কিছু বললেন না, আনিকার কথায় মৃদু হাসলেন। তাকিয়ে রইলেন মিতার দিকে।
“মিতা?” ডাক দেন আনিকা চৌধুরী।
“জি, আন্টি?”
“আবরার ভাইয়া আর আফরিন আপুকে ডেকে নিয়ে এসো।”
“আচ্ছা, আন্টি” বলটা কুড়িয়ে নিয়েই মিতা দৌড়ে সিঁড়ির দিকে যায়। মৃদু পায়ে প্রতিটি সিঁড়ি পার করে।সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বল মাটিতে রাখে মিতা। ডান পায়ে জোরে লা'থি মে'রে বল নিক্ষেপ করে। মিতা বলকে বামে পাঠাতে চেয়েছিল, কিন্তু বল ডান পাশে গড়িয়ে যায়।
“ধুর” বলেই দৌড় দেয় মিতা। লম্বা করিডর হওয়ায় ভালোই খেলতে পারছে সে। প্রতিবার বল গড়িয়ে দূরে গেলে খিলখিল করে হাসছে মিতা। আবার লা'থি মা'রতেই বল উড়ে গিয়ে একটি রুমে ঢুকে পড়ে। থতমত খায় মিতা। পরক্ষণেই দৌড়ে রুমে ঢোকে।
রুমটা পুরো খালি, কেউ নেই। সুন্দর করে গোছানো রুম। মিতা চোখ বুলিয়ে বল খুঁজতে শুরু করে। পড়ার টেবিলের এক কোণে বলটা দেখা যাচ্ছে। বল দেখতেই মিতার ঠোঁটে হাসি ফোটে। দৌড়ে গিয়ে বল তুলে নেয়। গুঁজো হয়ে বল নিয়ে ফিরতেই মিতার চোখ পড়ে পড়ার টেবিলের দিকে। হরেক রকমের খাতা আর সুন্দর সুন্দর কলম। এগিয়ে যায় সবকিছু দেখার জন্য। টেবিলটা মিতার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা, ঠিকমতো সব দেখতেও পারছে না। বল হাতে নিয়েই চেয়ার টেনে তাতে উঠে দাঁড়ায় মিতা। এখন সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পারছে।
সামনে রয়েছে ড্রইং খাতা, তাতে অদ্ভুত রকমের চিত্র আঁকা। মিতার কাছে চিত্রগুলো একটুও সুন্দর লাগছে না। টেবিলে রাখা পেন্সিল হাতে তুলে নেয় মিতা। প্র্যাকটিক্যাল খাতায় ফুল আঁকতে শুরু করে। দুই মিনিটেই একটা ফুল এঁকে ফেলে। ফুলটা বেশ সুন্দর হয়েছে। ফুল দেখে মিতার ঠোঁটে বিজয়ের হাসি। যে দেখবে, সে খুশিতে পাগল হয়ে যাবে।
খাতার পৃষ্ঠা উলটায় মিতা। এবার আঁকতে শুরু করে ডোরেমন।
“বাহ” নিজের আঁকা ছবি দেখে নিজেই বিরবির করে বলে মিতা। কিন্তু পরক্ষণে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। ডোরেমনের ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কিছু একটা কম মনে হচ্ছে। হঠাৎ কলমের দিকে হাত বাড়ায় মিতা। বুকের সঙ্গে মিশে থাকা বলটা টেবিলে রাখা কফির কাপের ওপর পড়ে। নিমেষেই কফিতে তলিয়ে যায় প্র্যাকটিক্যাল খাতা। মিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“কী করছিস এখানে?” অরিয়নের কঠোর কণ্ঠ শুনতেই লাফিয়ে ওঠে মিতা। চেয়ারের ওপর এখনো দাঁড়িয়ে আছে সে। অরিয়নকে দেখামাত্র কাঁচুমাচু করে মিতা। এই ছেলেকে একদম পছন্দ না তার। এই ছেলে তাকে মে'রেছিল। অরিয়নের চোখ টেবিলে রাখা বলের দিকে পড়তেই বড় হয়ে যায়। দুই পা এগিয়ে মিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
অরিয়নের সারারাতের পরিশ্রম নিমেষে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। প্র্যাকটিক্যাল খাতায় কফি পড়ে ভিজে গেছে। দ্রুত পৃষ্ঠা উলটায় অরিয়ন। চিত্রের সঙ্গে ফুল আর গোল কী যেন আঁকা। তার ওপর কফি পড়ে খাতা নষ্ট। দাঁতে দাঁত চেপে অরিয়ন। সারারাতের পরিশ্রম এভাবে বিফলে যেতে দেখে তার মাথা যেন খারাপ হয়ে যায়। কিছু না ভেবেই মিতার মাথায় ঠাস করে থা'প্পড় মা'রে।
“বেয়াদব মেয়ে, কী করেছিস এসব?” দাঁতে দাঁত চেপে ধমক দিয়ে বলে অরিয়ন। মিতাকে মা'রতেই কাঁদতে শুরু করে সে। মিতাকে কেউ কখনো মা'রেনি, আর এই ছেলে প্রতিবার তাকে মা'রে। মিতার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্নার আওয়াজ অরিয়নের মাথা আরও খারাপ করে দিচ্ছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সে।
“চুপ কর” চেঁচিয়ে বলে মিতার দিকে তাকায়। ধমকে মিতা কান্না থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। দৃষ্টি তার টেবিলে রাখা বলের ওপর। কোথায় তাকিয়েছে, তা লক্ষ করতেই অরিয়ন হাতে কলম তুলে নেয়। পরমুহূর্তে বলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। বলটা ফুটো হয়ে যায়। মিতা হু হু করে কাঁদতে শুরু করে আবার। অরিয়নের বিরক্ত লাগছে। ইচ্ছে করছে আরেকটা থাপ্পড় মারতে, কিন্তু খিঁচে থাকে।
কাঁদতে কাঁদতে চেয়ার থেকে নেমে আসে মিতা। অরিয়নের দিকে ফিরে তাকায়। ছোট্ট মিতার চোখে পানি, ঠোঁট ভাঙছে একটু পর পর। এরপর কী যেন ভর করে তার মাথায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় অরিয়নের দিকে। কিছু না ভেবেই থুতু নিক্ষেপ করে অরিয়নের দিকে।
“কুত্তা” কথাটা বলেই দৌড়ে রুম থেকে পালিয়ে যায় মিতা। অরিয়ন নিজের কালো রঙের হাফহাতা শার্টে জমে থাকা থুতুর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
“বেয়াদব মেয়ে, দাঁড়া বলছি,” বলেই মিতার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করে অরিয়ন। মিতা দৌড়াচ্ছে, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কয়েক মিনিটে ড্রইংরুমে পৌঁছে যায়। মায়া চৌধুরীকে অতিক্রম করে হাবিব চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে।
“কী হয়েছে? এভাবে কাঁদছো কেন?” প্রশ্ন করেন মায়া চৌধুরী।
“কী হয়েছে, মামুনি? কাঁদছিস কেন?” কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন হাবিব চৌধুরী।
“অনিয়ন ভাইয়া আমাকে মে'রেছে” ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে মিতা।
“অনিয়ন?” ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন মায়া চৌধুরী।
“হ্যাঁ, ঐ যে ঐ লম্বু ভাইয়া।”
“লম্বু কেমন শব্দ, মিতা?” কঠোর কণ্ঠে বলেন হাবিব চৌধুরী।
অরিয়ন এসে সকলের মাঝে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে বোমা ফাটিয়ে দেবে, নয়তো নিজেই ফেটে পড়বে।
“চাচ্চু, তোমার এই মেয়ে এত বেয়াদব কেন?” রাগান্বিত কণ্ঠে বলে অরিয়ন।
“কী করেছে ও?” জিজ্ঞেস করেন ওয়াহিদ চৌধুরী।
“কী করেছে? এই দেখো, কী করেছে,” শার্টে জমে থাকা থুতু দেখিয়ে বলে অরিয়ন। সকলে অবাক হয়ে তাকায়।
“তার ওপর আমার প্র্যাকটিক্যাল খাতা, সব কিছু নষ্ট করে দিয়েছে। কাল আমার পরীক্ষা। আমার ফাইনাল পরীক্ষা।”
“কী বলছিস এসব?” চিন্তিত কণ্ঠে বলেন আনিকা চৌধুরী। মায়া চৌধুরী দ্রুত নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ান। হাবিব চৌধুরী থেকে মিতাকে একটু সরিয়ে আনেন।
“অরিয়ন ভাইয়া যা বলছে, তা কি সত্যি?” জিজ্ঞেশ করেন মায়া চৌধুরী। মিতা কিছু বলল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রাখল।
“তোমাকে বলিনি এত দুষ্টুমি করবে না? কথা শোনো না কেন, হ্যা?” কথাটা বলেই মিতার গালে দুটি চড় মা'রেন মায়া চৌধুরী। ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে আবার কাঁদতে শুরু করে মিতা।
“মায়া, কী করছো এসব?” মিতাকে টেনে নিয়ে বলেন হাবিব চৌধুরী।
“কী করবো ভাই? মেয়েটা একদম কথা শোনে না। আর অরিয়ন…” অরিয়নের দিকে ফিরে তাকান মায়া চৌধুরী।
“আফরিন খুব ভালো ছবি আঁকে। তুমি সবকিছু দাও, ও তোমার সব আজকের মধ্যে রেডি করে দেবে” বিনয়ী সুরে বলেন মায়া চৌধুরী।
“লাগবে না” কথাটা বলেই ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে যায় অরিয়ন। অরিয়নের এভাবে মুখের ওপর প্রত্যাখ্যানে মায়া চৌধুরী একটু লজ্জাবোধ করেন। তার দ্বিধা বুঝতে পারেন আনিকা চৌধুরী।
“আসলে অরিয়ন জন্ম থেকেই এরকম। ওর রাগের ওপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তোমাকে কষ্ট দিতে এভাবে কথা বলেনি, মায়া।”
“ওহ” বলেন মায়া চৌধুরী।
“চলো, সবাই খেতে যাই। দেরি হয়ে গেছে। অরিয়ন না হয় রুমেই খেয়ে নেবে” হঠাৎ বলে ওঠেন হাবিব চৌধুরী।
মিতা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে এখনো কাঁদছে। যদিও কান্নার শব্দ এখন অনেকটাই কম। কিন্তু তার দৃষ্টি হাঁটতে থাকা অরিয়নের দিকে। আজ আরও স্পষ্ট হলো মিতা।
না, মিতা এই লম্বুকে অপছন্দ করে না। মিতা এই লম্বুকে ঘৃণা করে। প্রচুর ঘৃণা। জিয়ানকে যেমন ঘৃণা করে, তার থেকেও বেশি।
***********************
সাল ২০১৭।
পারমিতা-১০। অরিয়ন-২১।
এই তিন বছরে চৌধুরী মেনশনে মিতা খুব কম এসেছে। চৌধুরী বাড়িতে আসার কথা শুনলেই এটা-সেটা বাহানা করে নিজের বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে থেকে গেছে। ঐ লম্বুর জন্য এই বাড়িতে এখন আসতে ইচ্ছে করে না তার। যদিও এখন অরিয়নকে এই বাড়িতে খুব কম দেখে মিতা।
তবে আজ মহা মুশকিলে পড়েছে সে। সকাল থেকেই মুখ ভার করে রেখেছে মা-বাবার সঙ্গে। আজ হাবিব চৌধুরীসহ সবাইকে দাওয়াত করেছেন ওয়াহিদ চৌধুরী। হাবিব চৌধুরীর সঙ্গে যে সবাই আসবে, তা ভালো করেই জানে মিতা। অরিয়নকে তার পছন্দ না, তবু কেন সবাই তাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসছে, তাই রাগ করেছে।
“তোমার মেয়ের জ্বালায় এখন বাড়িতে থাকাও মুশকিল হয়ে গেছে” বলে ওঠেন মায়া চৌধুরী।
“কেন, কী করেছে ও?”
“কী করেছে? অরিয়নকে বাড়িতে দেখার পর থেকেই মুখ ভার করে রেখেছে। অরিয়ন কেন ওর বাসায় আসবে, তাই বারবার জিজ্ঞেস করে আমার মাথা খেয়ে নিচ্ছে” হতাশ হয়ে বলেন মায়া চৌধুরী।
“মেয়েটা অরিয়নকে একদম সহ্যই করতে পারে না” আবারও বলেন তিনি।
“আহা, মায়া, এখনো ছোট। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে” সান্ত্বনা দেন ওয়াহিদ চৌধুরী।
“তাই যেন হয়। নইলে তোমার মেয়ে একটা বদমেজাজি মেয়ে হয়ে উঠবে।”
“তোমার মতো হবে আর কি” দুষ্টুমি করেন ওয়াহিদ চৌধুরী।
“কী বললে? তোমাকে তো!” নিজেদের মধ্যে হাসি-তামাশায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন দুজন।
*********************
ভার্সিটিতে ক্লাস শেষ করে সরাসরি বসন্তভবনে চলে এসেছে অরিয়ন। খুব ক্লান্ত লাগছে। প্রেজেন্টেশন ছিল বলে গত দুই দিন বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। তার ওপর হাবিব চৌধুরীর সঙ্গে ব্যবসার এটা-সেটা দেখা শুরু করেছে। গেস্ট রুমের বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে অরিয়ন। একটু বিশ্রাম নিলে শান্তি পাবে। চোখ বন্ধ করে সে।
“ফনশি”
“হুনো হুনো হুনোও”
“দিবা দিবা, কে তুমি?.. লা লা লা লালা”
“দেস্পা-সিটো” ভুলভাল গানের লিরিক্স শুনে চোখ খোলে অরিয়ন। ছোট কোনো বাচ্চা ভাইরাল গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। মাথা তুলে দরজার দিকে তাকায়। যেমনটা ভেবেছিল, তেমনটাই। মিতা দুই হাত তুলে নাচতে নাচতে হাঁটছে, একসঙ্গে গান গাইছে। কিছু একটা ভাবে অরিয়ন।
“ওই” চেঁচিয়ে ওঠে অরিয়ন। তার কণ্ঠ শুনতেই থমকে দাঁড়ায় মিতা। ভ্রু কুঁচকে তাকায় অরিয়নের দিকে। তাকে দেখে যে একটুও খুশি নয়, তা চেহারায় স্পষ্ট।
“কী?” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ গোমড়া করে বলে মিতা।
“এদিকে আয়” বলেই শোয়া থেকে উঠে বসে অরিয়ন।
“কেন আসব? যা বলার, ওখান থেকে বলেন।”
“আসবি, নাকি চাচ্চুকে বলব তুই আবার বেয়াদবি করেছিস?” অরিয়নের কথায় রাগ হয় মিতার। ইচ্ছে করছে কামড়ে দিতে। মিটমিট করে এগিয়ে যায় মিতা। অরিয়নের একটু কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়।
মিতার পরনে সাদা রঙের ফ্রক, তাতে কালো রঙের ছোট ছোট পাতার নকশা। চুল একটা বেণি করা, তবু অগোছালো। অরিয়ন হাত বাড়িয়ে মিতার হাত ধরে। মিতা এখনো মুখ গম্ভীর করে রেখেছে। ইচ্ছে করছে হাত সরিয়ে দিতে, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। হাত ছেড়ে দেয় অরিয়ন, আবার হাত রাখে মিতার মাথায়। এবারও মিতা কিছু বলে না। এবার হাত এগিয়ে দেয় মিতার পেটের দিকে। অরিয়নের হাত মিতার পেট স্পর্শ করার আগেই ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দেয় মিতা। নিজেও সরে আসে অরিয়ন থেকে।
“ব্যাড টাচ” চেঁচিয়ে ওঠে মিতা।
“লুইচ্চা” বলেই দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মিতার কথা শুনে প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে যায় অরিয়ন। পরক্ষণে মুখে হাসি ফোটে। আবার গা এলিয়ে দেয় বিছানায়।
ফ্ল্যাশব্যাক:
সাল ২০১৪। আবরারের জন্মদিন।
ছাদে বসে আছে অরিয়ন। সকলে নিচে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু তার একটুও ইচ্ছে করছে না কারো সঙ্গে আড্ডা দিতে। তাই ছাদে একা বসে আছে। কেউ ছাদে আসছে টের পেতেই দরজার দিকে তাকায়। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আফরিন। অরিয়নকে দেখামাত্র নিচে নামার জন্য ঘুরে যায়।
“এদিকে এসো” আফরিনের উদ্দেশ্যে ডাকে অরিয়ন। আফরিন ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল অরিয়ন, আফরিনও সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।
“বড় বোনের দায়িত্ব কি শুধু সাজিয়ে দেওয়া?” একটু কঠোরভাবে বলে অরিয়ন। আফরিন অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই অরিয়ন আবার কথা শুরু করে।
“বড় বোনের দায়িত্ব ছোট বোনকে গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে শেখানো।” অরিয়নের দৃষ্টি খোলা আকাশের দিকে। আফরিনের দিকে একবারও ফিরে তাকায় না। যেন কথাগুলো নিজে নিজেই বলছে।
“নেক্সট টাইম যেন ও সবকিছু শিখতে পারে।”
“আচ্ছা।”
“ছাদে থাকবে কিছুক্ষণ?” প্রশ্ন করে অরিয়ন।
“জি।”
“ওকে।” অরিয়ন আর অপেক্ষা করে না। সোজা ছাদ থেকে নেমে যায়। আফরিন একাই ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে।
ফ্ল্যাশব্যাক শেষ।
------------------
মিতার আজকের এই প্রতিবাদ দেখে খুশি হয় অরিয়ন। অবশেষে বেয়াদব মেয়েটাও গুড আর ব্যাডের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শিখেছে।
চলবে…
তুমি অদ্বিতীয়া ( বিয়ে স্পেশাল পর্ব) আজ রাতে আসবে।