#পারমিতা_২
#পর্ব_৪
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ
২২শে আগস্ট, ২০২৫।
পারমিতা—১৮, আফরিন—২৬, অরিয়ন—২৯।
বসন্ত ভবনে আজ উৎসবের রঙে মেতে উঠেছে গোটা পরিবেশ। আফরিনের জন্মদিনের আনন্দে বাড়িটি যেন আলোয় ঝলমল, হাসিতে মুখরিত। মানুষের আনাগোনায় প্রতিটি কোণ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিকেলের আলো কমতেই হাবিব চৌধুরী তার পরিবার নিয়ে এসে পৌঁছেছেন। আনিকা চৌধুরী এসেই মায়া চৌধুরীর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আয়োজনের তোড়জোড়ে। মিতা তার বন্ধুদের ঘিরে আনন্দে মশগুল, তার ছোট্ট জগৎ হাসি-গল্পে ভরে উঠেছে। আবরার এক কোণে নিঃশব্দে বসে মোবাইলে আঙুল চালাচ্ছে, যেন তার নিজস্ব দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে। আর অরিয়ন? সে আফরিনের বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে, তার কথায়, হাসিতে সবাই মুগ্ধ।
আফরিন আর অরিয়নের বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে আগামী মাসের ৪ তারিখ। হাবিব চৌধুরীর কথা দেওয়ার মাত্র দু’মাসের মাথায় তাদের এনগেজমেন্ট সম্পন্ন হয়েছিল। সবাই মিলে ঠিক করেছিল, ২০২৫ সালেই তাদের বিয়ে হবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগিয়ে চলেছে সবকিছু। বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছে, বাড়িতে ব্যস্ততার ধুম ততই বাড়ছে। কেউ প্ল্যান করছে এটা, কেউ সাজাচ্ছে সেটা—সবাই যেন এক উৎসবের জোয়ারে ভাসছে।
মিতার দিনগুলো কাটছে বোনের বিয়ের উৎসবে কী পড়বে, কীভাবে সাজবে—এই ভাবনায়। আফরিনের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক কেনা, রঙের ম্যাচিং, সবকিছু ঠিকঠাক করার নেশায় যেন তার দিনগুলো মুখরিত। তবু, এই ব্যস্ততার মাঝেও তার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাসের হাসি। বিয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্তে, মিতার মনেও যেন নতুন স্বপ্ন একটু একটু করে জন্ম নিচ্ছে। নিজের জন্য দেখা স্বপ্ন।
কিন্তু আফরিনের জন্য খুশি হলেও, অরিয়নের কথা মনে পড়তেই মিতার গা শিউরে ওঠে। গত এক বছর ধরে সে চেষ্টা করেছে অরিয়নের প্রতি তার অনুভূতি বদলাতে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। কেন সে পারেনি, তা সে নিজেও জানে না। হয়তো তার মন অরিয়নকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে।
“আপু...” আফরিনের কাছে ছুটে আসে মিতা। জন্মদিনের আয়োজনে সে আজ সেজেছে অপরূপ। রোজ গোল্ড রঙের ঘারারায় তার সৌন্দর্য যেন আরও ফুটে উঠেছে। খোলা চুল কোমর ছাড়িয়ে বাতাসে দুলছে। কানে একজোড়া দুল, গলা খালি, বাম হাতে একটি ঘড়ি। হালকা মেকআপে মিতার রূপ হাজার গুণ বেড়েছে।
“কী হয়েছে?” আফরিন প্রশ্ন করে।
“কেক কাটার সময় হয়ে গেছে” মিতার ঠোঁটে আলতো হাসি।
“আচ্ছা” বলে আফরিন আর মিতা কেক রাখার টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। মায়া চৌধুরী ও ওয়াহিদ চৌধুরী আফরিনের পাশে এসে দাঁড়ান। সবাই টেবিলের কাছে জড়ো হয়। হাবিব চৌধুরী তার ব্যবসায়িক পার্টনারদের সঙ্গে পাশেই দাঁড়িয়ে। আনিকা চৌধুরী নিজের টেবিলে বসে, আবরার তার পাশে। কিন্তু অরিয়নকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
“তাহলে আর অপেক্ষা না করে কেক কাটা শুরু করি” বলেন ওয়াহিদ চৌধুরী। আফরিন ছু'রি হাতে কেকের দিকে এগিয়ে যায়। মিতার দিকে তাকিয়ে ইশারায় নিজের সঙ্গে কেক কাটতে বলে। কিন্তু মিতা আলতো হাসি দিয়ে না করে দেয়। আজ একান্তই আফরিনের দিন, মিতা চায় না মনোযোগ তার দিকেও ভাগ হয়ে যাক। আফরিন কেক কেটে প্রথম টুকরো ওয়াহিদ চৌধুরীর মুখের কাছে নিয়ে যায়। তিনি নিজে খেয়ে মেয়েকেও খাওয়ান। তারপর আফরিন মায়া চৌধুরী ও মিতাকেও কেক খাওয়ায়।
“অরিয়ন কোথায়?” খুঁজতে খুঁজতে প্রশ্ন করেন ওয়াহিদ চৌধুরী।
“মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাইরে গেছে” জবাব দেয় আফরিন।
“ওহ। আচ্ছা, আমরা আর অপেক্ষা না করি। বাচ্চারা তাদের আনন্দ-ফুর্তি শুরু করুক” বলেন ওয়াহিদ চৌধুরী। বড়রা সবাই খাবারের দিকে চলে যান। বাকিরা মিলে গান-বাজনার আয়োজন করে।
“আবরার ভাইয়া!” মিতা আবরারের কাছে যায়।
“কী হয়েছে?” বলে আবরার।
“চলো, গান গাইবে।”
“আমি?”
“হ্যাঁ, তুমি। তুমি তো অনেক সুন্দর গান গাও।”
“আজ পারব না। তুই গা, আমি অন্যদিন গাইব।”
“না, না, আজ তোমাকে গান গাইতেই হবে” বলে মিতা আবরারের হাত ধরে টেনে ছাদে নিয়ে যায়। ছাদে গান-বাজনার আসর সাজানো হয়েছে। বিছানা পাতা, বালিশ রাখা, চারপাশে সুন্দর আলোর ঝালকে আলোকিত। সবাই গোল হয়ে বসেছে, গানের আনন্দে মেতে উঠেছে।
“এইতো, গায়ককে নিয়ে এসেছি” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে মিতা। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়রান হয়ে গেছে সে, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। আফরিন সবার সঙ্গে একপাশে বসে আছে।
“নিয়ে আয়, এই বেয়াদব, এদিকে আয়” আফরিন আবরারকে ডাকে। আবরার জিভে কামড় দেয়।
“কী সমস্যা তোর? একা একা থাকিস কেন? নাকি সুন্দর গান গাস বলে পার্ট অনেক?” ভ্রু কুঁচকে বলে আফরিন।
“তেমন কিছু না, আপু” আফরিনের পাশে বসে বলে আবরার।
“নাইস হার” আফরিনের গলার হারের দিকে তাকিয়ে বলে আবরার।
“অরিয়ন দিয়েছে” হেসে বলে আফরিন। অরিয়নের নাম শুনতেই মিতার মনে রাগ জাগে।
“গান কী গাইবে? নাকি আলাদা করে লোক এনে তেল ডলতে হবে?” মিতা রাগ করে বলে।
“দেখেছো, আসল বেয়াদব ও। কথাবার্তা একটুও সুন্দর না। এইজন্যই অরিয়ন ভাইয়া ওকে পছন্দ করে না” বলে আবরার।
“আচ্ছা, এই টপিক বাদ। এখন তুই গান গা” বলে আফরিন।
“আচ্ছা, বাবা” বলে আবরার আরাম করে বসে। মিতা দৌড়ে গিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে বসে।
আয় রে আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা,
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।
সূর্য তারা নাচরে তোরা, তাদিন তাদিন,
খুকু মনির শুভ জন্মদিন।
খুকু মনির আজ জন্মদিন।
খুকু মনির শুভ জন্মদিন।
সবাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে আবরারের দিকে তাকায়। আফরিন আর মিতা রাগে ফুঁসছে। আবরারকে এনেছিল কী জন্য, আর সে করল কী!
“আমাকে তোর খুকু মণি মনে হয়?” দাঁতে দাঁত চেপে বলে আফরিন।
“আবরার ভাইয়া, তুমি ভালো হবে না, তাই না?” দৌড়ে গিয়ে আবরারের চুল টেনে ধরে মিতা। তার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে।
“আউচ, ছাড়! চুল ছাড়, মিতা!” আবরার চেঁচায়।
“তোমার চুল ছাড়া হবে না, ভাইয়া!” মিতা টানাটানি করে। কয়েকজন বন্ধু দৌড়ে এসে মিতাকে থামায়।
“আচ্ছা, ভালো গান গাইব এখন। ছাড়!” অনুরোধ করে আবরার। মিতা চুল ছেড়ে সরে আসে, নিজের চুল ঠিক করতে করতে বড় বড় শ্বাস ফেলে।
“ওকে যে বিয়ে, তার কপাল নিশ্চিত পুড়বে” মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে বলে আবরার।
“আবার শুরু করলে?” মিতা এগিয়ে যায়।
“এই, থাম! আসিস না!” পিছিয়ে যায় আবরার। শার্ট টেনে ঠিক করে আবার বসে।
তুমি বৃষ্টি চেয়েছো বলে
কত মেঘের ভেঙেছি মন,
আমি নিজের বলতে তোমায় চেয়েছি।
তুমি যাওনি কিছুই বলে
আজও পাল্টে ফেলিনি মন,
শুধু নিজের বলতে তোমায় চেয়েছি,
তুমি জানতেই পারো না তোমায়
কত ভালোবেসেছি।
আবরারের গানের সুরে ছাদ মেতে ওঠে। সবাই সুরে দুলছে। গান শেষ হতেই হাততালিতে মুখরিত হয় চারপাশ। আবরার লজ্জা পায়।
“এই যে, সবার জন্য পায়েশ আর শরবত!” আফরিনের বয়সী এক মেয়ে, ট্রে হাতে হাজির হয়। তার পিছনে আরেকজন।
“শায়লা আপু, আমাকে দেও” মিতা এগিয়ে যায়।
“না, মিতা, লাগবে না। আমি দিতে পারব” বলে শায়লা সবাইকে শরবত আর পায়েশ এগিয়ে দেয়। সবাই গানের কলি খেলায় মেতে ওঠে।
***************
রাত ১০টা।
বন্ধু-বান্ধবরা সবাই নিজ নিজ বাড়ি ফিরে গেছে। হাবিব চৌধুরী তার পরিবার নিয়ে আজ এখানেই থাকবেন। ওয়াহিদ চৌধুরীর বারবার অনুরোধে তিনি ছোট ভাইয়ের আবদার ফেলতে পারেননি।
“পায়েশের বাটিগুলো কোথায়? সবাইকে একটু আইসক্রিম দিতাম” বলে শায়লা।
“সেগুলো তো ছাদে। আনতে ভুলে গেছি” জবাব দেয় এক কাজের মেয়ে।
“আচ্ছা, তুমি আইসক্রিম আর ফল বের করে রাখো। আমি ছাদ থেকে নিয়ে আসছি” বলে শায়লা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই মিতার সঙ্গে দেখা। মিতা তড়িঘড়ি নিচে নামছিল।
“শায়লা আপু, তোমাকেই খুঁজছি” প্রাণবন্ত কণ্ঠে বলে মিতা।
“কী হয়েছে?”
“মা তোমাকে ডাকছে, আরজেন্ট।” শায়লার মনে দ্বিধা জাগে। কোনোকিছু না ভেবেই নিচে নামতে শুরু করে, অন্য কাজের মেয়েকে ছাদে পাঠানোর উদ্দেশ্যে।
“কী হয়েছে? আবার কোথায় যাচ্ছ?” প্রশ্ন করে মিতা।
“নিচে। নাছিমাকে বলতে হবে বাটিগুলো আনতে।”
“এই কথা? আমি নিয়ে আসছি” মিতার কথায় শায়লা স্বস্তি পায়।
“ভয় পাবে না তো?” চিন্তিত সুরে বলে শায়লা।
“ধুর, আপু, কী যে বলো! আমার বাড়ি, আমি ভয় পাব?” বলে মিতা তৃতীয় তলায় উঠে যায়।
********************
ছাদ খালি। কেউ নেই। আলোয় সব ফকফকা হলেও, মিতার গা কেমন ভার হয়ে আসে। বাটিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
আমি মিস ক্যালকাটা নাইনটিন সেভেনটি সিক্স,
এখনো তো কেউ জানে না আমার স্ট্যাটিসটিক্স,
আমি হরিয়ানা থেকে মেলে ডানা,
হয়ে চণ্ডীগড়ের রাণী,
উড়ে এসে জুড়ে বসি...
মনের ভয় কাটাতে গান গাইতে গাইতে বাটি তুলতে শুরু করে মিতা। একপাশের বাটি তুলে ঘুরে দাঁড়ায়।
“আ........” হাতের ট্রে ফেলে চিৎকার করে ওঠে মিতা। ছাদের রেলিংয়ের সঙ্গে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অরিয়ন। হাতে জ্বলন্ত সি'গারেট। কালো স্যুটে অরিয়নকে ভয়ঙ্কর গম্ভীর দেখাচ্ছে। মিতার শরীর কাঁপছে, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। অরিয়নের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে নিজের মনে নিকোটিনের ধোঁয়া টেনে চলেছে। মিতা দ্রুত ট্রে তুলে নেয়।
অরিয়ন ইচ্ছে করে তাকে ভয় দেখাতে এসেছে, এটা মিতা জানে।
❝খবিশ❞ মনে মনে বলে মিতা দ্রুত বাটি তুলতে থাকে। বাটি তুলা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মৃদু পায়ে দরজার দিকে এগোয়। আড়চোখে অরিয়নের দিকে তাকায়—অরিয়নকে ভয়ঙ্কর, গম্ভীর মনে হচ্ছে। যেন যে-কোনো মুহূর্তে কাউকে খু'ন করে ফেলবে। মিতা দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। দরজা থেকে এক পা বাইরে রাখতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ঠোঁটে হাসি ফোটে—অরিয়নের সামনে থেকে বেরিয়ে এসেছে তাই।
“পরী!” পিছন থেকে অরিয়নের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে।
চলবে......