#পারমিতা_২
#পর্ব_৬
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ
পাখির কলকাকলিতে ভোরের আগমন ঘোষিত হচ্ছে। সূর্যের আলো চারপাশ আলোকিত করে দিয়েছে। পাখিরা খাদ্যের সন্ধানে ছুটছে। সকলেই যার যার কাজে বেরিয়ে পড়েছে। জনশূন্য রাস্তায় ধীরে ধীরে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। সকালের এই শান্ত পরিবেশ ধীরে ধীরে শব্দে নিজের মাধুর্যহীন হয়ে যাচ্ছে।
কাজের লোকজন সকাল হতেই বাড়িঘর পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। শায়লা সকলকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। সবাই মনোযোগ দিয়ে কাজে ব্যস্ত, কারণ গতকালের পার্টির জন্য অনেক কাজ জমে আছে। তাই শায়লা সকাল সকাল সবাইকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।
“ঠিকমতো কাজ করো, কোথাও যেন ধুলোবালি না থাকে” কড়া কণ্ঠে সবাইকে বলে শায়লা। সকলেই দ্রুত হাত চালায়। শায়লা ড্রয়িংরুম থেকে রান্নাঘরে যায়। একজন কাজের মহিলা চুলায় কিছু নাড়তে ব্যস্ত।
“হয়েছে?” প্রশ্ন করে শায়লা।
“হ্যাঁ এই তো, এখনই দিচ্ছি” দ্রুত চুলা থেকে পাতিল নামায় সে। কেটলিতে চা ঢেলে দুধ ও চিনির পাত্র একপাশে রাখে।
“এই নাও” শায়লার দিকে ট্রে এগিয়ে দিয়ে বলে কাজের মহিলা।
“ধন্যবাদ, আপা” বলে শায়লা। কাজের মহিলার নাম সুবর্ণা, শায়লার চেয়ে বয়সে বড়। ধন্যবাদ শুনে সুবর্ণার মুখে হাসি ফোটে।
ট্রে হাতে শায়লা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে আনিকা চৌধুরীর রুমের দিকে যায়।
“ঠকঠক” দরজায় কড়া নাড়ে শায়লা।
“ঠকঠক।”
“ঠকঠক।” অপেক্ষা করে শায়লা। সকালে আনিকা চৌধুরীর ঘুম ভাঙতে একটু সময় লাগে, তাই শায়লা কয়েকবার কড়া নেড়ে অপেক্ষা করতে থাকে। দরজা খোলেন আনিকা চৌধুরী, চোখে তার ঘুমের ছাপ।
“গুড মর্নিং, ম্যাম। আপনার চা” ট্রে এগিয়ে দিয়ে বলে শায়লা।
“গুড মর্নিং। মায়ার রুমে পাঠিয়েছ?” ট্রে হাতে নিয়ে প্রশ্ন করেন আনিকা চৌধুরী।
“এই তো, এখনই দিতে যাব” উত্তর দেয় শায়লা।
“ওকে” বলে আনিকা চৌধুরী দরজা বন্ধ করেন। শায়লা তড়িঘড়ি নিচে নেমে আসে। গেস্টরুমে গিয়ে একে একে আত্মীয়-স্বজনদের চা দিতে হবে।
-------------
সকাল নয়টা।
সকলেই নাস্তার টেবিলে বসে আছে। শায়লা ও অন্যরা মিলে সবার প্লেটে নাস্তা দিচ্ছে।
“মিতা কোথায়? ও এখন নাস্তা খাবে না?” প্রশ্ন করেন মায়া চৌধুরী। মায়া চৌধুরীর পাশে কিছুক্ষণ আগে এসে বসেছে আফরিন। হাবিব চৌধুরী, ওয়াহিদ চৌধুরী ও বাকি পুরুষরা ড্রয়িংরুমে আড্ডায় ব্যস্ত। অন্যরা নাস্তার টেবিলে বসেছে।
“মিতাকে তো আমি এখনও ডাকার সময় পাইনি” বলে শায়লা।
“তুমি ডাকোনি?” আফরিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন মায়া চৌধুরী।
“ডাকব কীভাবে? ও কোথায় ঘুমিয়েছে, তা তো জানি না” সরল কণ্ঠে উত্তর দেয় আফরিন।
“কোথায় ঘুমিয়েছে মানে? তোমার সাথে ঘুমানোর কথা ছিল না?” ভ্রু কুঁচকে বলেন মায়া চৌধুরী।
“আমার সাথেই তো কথা ছিল, কিন্তু ও আর এল না। সবার সাথে আড্ডা দিতে দিতে খেয়াল ছিল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, পাশে নেই” জবাব দেয় আফরিন।
“এই মেয়েটাকে নিয়ে শান্তি নেই। কোথাও এক মিনিট নিরিবিলি বসতে পারে না” বিরক্তি নিয়ে বলেন মায়া চৌধুরী।
“শায়লা, তুমি একটু দেখো তো, ও কোথায়!”
“জি, আচ্ছা” বলে শায়লা আর দেরি না করে নিচের গেস্টরুমগুলো চেক করতে শুরু করে। একে একে নিচের তলার সব রুম চেক করে শায়লা, কিন্তু মিতা কোথাও নেই।
“কোথায় ঘুমিয়েছিস?” নিজে নিজে বলে শায়লা। দ্বিতীয় তলার রুমগুলোও চেক করা শেষ। প্রতিটি রুম খুঁজতে খুঁজতে শায়লা ক্লান্ত। সকাল সকাল এত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে তার ইচ্ছে করছে না। অবশেষে তৃতীয় তলায় পৌঁছায় সে। সামনের দিকের রুমগুলোর দরজা প্রায় সবই খোলা। মিতার ওপর শায়লার রাগ হচ্ছে—কে জানে, কোথায় গিয়ে ঘুমিয়েছে!
আফরিনের রুমের সামনে এসে দরজার হাতল মোচড় দেয় শায়লা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
“ঠকঠক।”
“ঠকঠক।” শায়লা কড়া নাড়তে থাকে।
“ঠকঠক।”
“আ........” রুমের ভেতর থেকে মিতার চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। ঘাবড়ে যায় শায়লা। ভয়ে দ্রুত দরজায় কড়া নাড়তে থাকে।
“মিতা?”
“মিতা? কী হয়েছে?” চিন্তিত কণ্ঠে ডাকে শায়লা, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসে না। দ্রুত দৌড়ে নিচে নামে শায়লা।
সকলেই নাস্তার টেবিলে কথায় ব্যস্ত। অনেকে এখনও রয়ে গেছেন, নাস্তা শেষ করে যার যার বাড়ি ফিরে যাবেন।
“ম্যাডাম, ম্যাডাম!” দৌড়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে হাজির হয় শায়লা। তৃতীয় তলা থেকে দৌড়ে আসায় সে হাঁপাচ্ছে।
“কী হয়েছে, শায়লা? এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন?” প্রশ্ন করেন আনিকা চৌধুরী। শায়লা বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে।
“মি... মিতা। মিতা...”
“মিতার কী হয়েছে? মিতা কোথায়?” চেয়ার থেকে উঠে আসেন মায়া চৌধুরী। তার মুখে চিন্তার ছাপ। সকলে একে অপরের দিকে তাকায়। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না।
“মিতাকে কোথাও পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আফরিনের রুমে গিয়ে দেখি, দরজা বন্ধ” হাঁপাতে হাঁপাতে বলে শায়লা। তার গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না।
“তারপর? তারপর কী হলো?” গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করেন মায়া চৌধুরী। আনিকা চৌধুরী ও বাকিরা সকলে শায়লা ও মায়া চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
“হঠাৎ মিতা বিকট শব্দে চিৎকার করে ওঠে। আমি কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু দরজা খুলল না” বলে শায়লা।
“কী বলছ এসব?” বলেন আনিকা চৌধুরী।
“মিতা...” মনমরা কণ্ঠে বলেই দ্রুত হাঁটা শুরু করেন মায়া চৌধুরী। হাবিব চৌধুরী, ওয়াহিদ চৌধুরী, আনিকা চৌধুরী, আফরিনসহ বাকি যারা একসঙ্গে বসেছিল, সকলে মায়া চৌধুরীর পিছু নেয়। সবার মুখে ভয়ের ছাপ।
-------------
মিটমিট করে চোখ খোলার চেষ্টা করে মিতা। মাথাটা যেন কেমন করছে। চোখ ঠিকমতো খুলতে পারছে না। মনে হচ্ছে, চোখের পাতায় কেউ আঠা লাগিয়ে দিয়েছে। মিটমিট করে চোখ খুলতেই আফরিনের রুমের সিলিং নজরে আসে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গলা ও ঠোঁটে অসহ্য যন্ত্রণা। মাথায় হাত দিয়ে উঠে বসে মিতা। চোখ ফোলা মনে হচ্ছে। অজান্তেই গলায় হাত দেয় সে। কী হয়েছে, জানে না। শুধু জানে, যেখানে হাত দিচ্ছে, সেখানেই ব্যথা।
“ক...” কর্কশ কণ্ঠে কিছু বলতে গিয়ে ঠোঁটে ব্যথা অনুভব করে মিতা। মনে হচ্ছে, ঠোঁট ফুলে গেছে। ঠোঁটে হাত দিতেই গোঙানি বেরিয়ে আসে। কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না।
❝বিছানায় এলাম কীভাবে? কখন এলাম? কিছুই মনে পড়ছে না কেন?❞ মনে মনে ভাবে মিতা। গতকাল রাতের কিছুই মনে নেই। শায়লা বাটি আনতে পাঠিয়েছিল, ছাদে অরিয়ন ছিল, হাতে ব্রেসলেট পরিয়ে দিয়েছিল। কথাটা ভাবতেই থমকে যায় মিতা। অরিয়ন কেন ব্রেসলেট পরিয়ে দেবে? দ্রুত হাতের দিকে তাকায়।
আশ্চর্য, হাতে কিছুই নেই! তবে কি সবটাই মিতার স্বপ্ন?
“ঠকঠক” দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনে মিতা।
“ঠকঠক” আবার শব্দ হতেই দরজার দিকে তাকায় সে। অজান্তেই চোখ চলে যায় বাম পাশে। থমকে যায় মিতা। নজরে আসে একজোড়া পা। পুরুষের পা। মনে হচ্ছে, ভয়ানক স্বপ্ন দেখছে সে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে মুখের দিকে তাকায়। অজান্তেই পিছিয়ে পড়ে মিতা। কে তার পাশে শুয়ে আছে, জানে না। তার মুখ অন্যদিকে ফেরানো, তবে যে শুয়ে আছে, সে খালি গায়ে। পরনে কিছু নেই, প্যান্ট নিতম্বের কাছাকাছি নেমে আছে।
“ঠকঠক।”
“আ......” চিৎকার করে ওঠে মিতা। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে যায়। মিতার চিৎকার শুনে ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে অরিয়ন। চোখাচোখি হয় দুজনের। মিতার মনে হচ্ছে, কেউ তার পা থেকে মাটি সরিয়ে নিয়েছে। তার সামনে অর্ধনগ্ন অরিয়ন। ঠোঁট ফুলে আছে, কেটে গেছে। গলায় দাগ। মিতা জানে, এগুলো লাভ বাইট।
“মিতা?”
“মিতা? কী হয়েছে?”
“মিতা?” শায়লার কণ্ঠ শুনেও যেন মিতা শুনতে পায়নি। কিছুই তার কানে যাচ্ছে না। শুধু একটা জিনিস তার সামনে ভাসছে—অরিয়ন। যাকে সে সারাজীবন ঘৃণা করে এসেছে, সেই অরিয়ন। যে তার বোনের হবু স্বামী, সেই অরিয়ন। মিতার চোখের কোণে জল জমতে শুরু করে। কাঁপা কাঁপা শরীরে সবকিছু ভালো করে দেখে সে। চোখ আটকে যায় বিছানার এক জায়গায়। রক্তের দাগ।
“না, না, না, না,” মাথা নাড়িয়ে বিরবির করে মিতা।
“তুই এখানে কেন?” গম্ভীর কণ্ঠে বলে অরিয়ন। অশ্রুসিক্ত নয়নে অরিয়নের দিকে তাকায় মিতা। অরিয়নকে দেখে মনে হচ্ছে, সেও মিতার মতো অবাক। তারা একে অপরের সঙ্গে ছিল, তা কেউ তারা কেউ জানে না।
“না, না, না, এটা হতে পারে না। আমি এখানে এলাম কীভাবে? আপনি... আপনি এখানে কেন?” কাঁপা কণ্ঠে বলে মিতা। মনে হচ্ছে, তার শরীরে এক ফোঁটা শক্তি নেই। দ্রুত পাশের চেয়ার ধরে সোঁজা হয়ে দাঁড়ায়।
“তুই আফরিনের রুমে কী করছিস? এটা আফরিনের রুম। আর আমি ওর রুমে আসতেই পারি” বলে অরিয়ন। মিতা হতবাক হয়ে অরিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। এ কি দুঃস্বপ্ন? তাও আবার অরিয়নের সঙ্গে?
“তার মানে, গতকাল যা হয়েছে, তা তোর সা...”
“না, না, না, কিছু হয়নি” পাগলের মতো মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে মিতা। অরিয়ন মিতার দিকে তাকিয়ে আছে। মিতার জন্য তার খারাপ লাগছে। হয়তো এটা করা ঠিক হয়নি। কিন্তু মিতার এভাবে সবকিছু অস্বীকার করা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। মিতার চোখে তার প্রতি ঘৃণা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। অজান্তেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে অরিয়ন।
“মিতা?”
“ মিতা? দরজা খোল মা!” বাইরে থেকে মায়া চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে আসে। কণ্ঠে মিতার জন্য দুশ্চিন্তা। মিতা থমকে যায়। তার দুনিয়া থেমে গেছে।
“মা” হতাশ কণ্ঠে নিম্নস্বরে বলে মিতা। সবাই জানতে পারলে কী হবে, তা সে বুঝতে পারছে না। আর আফরিন? আফরিনকে মুখ দেখাবে কীভাবে?
“মিতা, দরজা খোল মা, কী হয়েছে? মিতা?” মায়া চৌধুরীর কণ্ঠে মনে হচ্ছে, যে-কোনো মুহূর্তে তিনি কেঁদে ফেলবেন। মিতা কাঁপা পায়ে এক পা এগোতে নিতেই অরিয়ন দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যায়। কিছু না ভেবে দরজা খোলে। মিতা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
দরজা খুলতেই অরিয়নের চোখ প্রথমে মায়া চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানো আফরিনের দিকে যায়। সবাইকে উপেক্ষা করে আফরিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অরিয়ন।
“বেব, আমি যা করেছি, সব তোমাকে ভেবে করেছি। আমি নেশাগ্রস্ত ছিলাম, কিছুই খেয়াল করিনি” আফরিনের দুই গাল ধরে বলে অরিয়ন। তার কণ্ঠে দ্বিধা, যেন এসব বলতে তার কষ্ট হচ্ছে। সকলের চোখ চলে যায় রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতার দিকে।
চলবে...
নেক্সট পর্ব বড় করে দিবো❤️❤️।