#পারমিতা_২
#পর্ব_২৮
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ (সেহরিশ)
“যদি বলি আমি তোকে ভালোবাসি, তাহলে?” এক নিশ্বাসে বলে ফেলল অরিয়ন।
“আপনিও না, এরকম দুষ্টুমি করে কী মজা পান?” মিতা দাঁত বের করে হাসল। অরিয়ন সত্যি সত্যি তাকে ভালোবাসবে? কথাটা ভাবতেই অস্বস্তি লাগছে মিতার। ক্ষণিকের জন্য মনে হচ্ছে নিশ্বাস নিতে পারছে না সে। হঠাৎ করেই গরম লাগছে তার। সিলিং-এর দিকে তাকাল মিতা। ফ্যান পুরোদমে চলছে, তবু গরম লাগছে তার।
অরিয়নের দিকে মিতা আবার তাকাল। অরিয়ন একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, পলক ফেলছে না। মিতা আবার দাঁত বের করে হাসল। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
অরিয়ন চুপ করে আছে। তার চেহারায় ফুটে ওঠা গম্ভীরতা একটুও কমেনি। মিতা নিজে নিজেই হাসছে। আবার তাকাল অরিয়নের দিকে। অরিয়ন তখনো সিরিয়াস মুডে তার দিকে তাকিয়ে। মিতার হাসি মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই মুখ মলিন হয়ে গেল।
“আপনি মজা করছেন, তাই না?” এক পা এগিয়ে গেল মিতা। তার চেহারায় অস্বস্তি স্পষ্ট।
অরিয়ন এবারও জবাব দিল না। তার চুপ থাকাই মিতার মুখে উত্তর হয়ে পড়ল।
“আপনার সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল, আপনি তাকে ভালোবাসতেন” মিতা এক নিশ্বাসে বলে ফেলল। নিশ্বাস নিতে পারছে না মিতা, মনে হচ্ছে এখনই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু তার তো শ্বাসকষ্ট নেই, তবু কেন দম নিতে পারছে না সে?
“বাসিনি। কখনো বাসিনি” অরিয়ন জবাব দিল।
“অরিয়ন...” চিৎকার করে উঠল মিতা। পরক্ষণেই বুঝতে পারে কি করেছে সে, নিজের মুখে হাত দিয়ে এক পা পিছিয়ে যায়। এতক্ষণের অস্থিরতা অরিয়নের জবাব শুনতেই রাগে পরিণত হয়েছে।
প্রায় এক বছর ধরে এনগেজড ছিল আফরিন আর অরিয়ন। ভালো না বাসলে বা আফরিনকে ভালো না লাগলে কেনই বা বিয়েতে হ্যাঁ বলবে অরিয়ন? তখন তো এরকম কিছুই হয়নি।
“সরি, ভুলে...” মিতা মুখে হাত ঘষল।
বিছানায় বসে থাকা অরিয়ন আলতো করে নামে। মিতার মনে হল, হঠাৎ করেই অরিয়ন যেন তার থেকে অনেক বেশি লম্বা হয়ে গেছে। আজ হঠাৎ অরিয়নকে বড় মনে হচ্ছে। যদিও অরিয়ন মিতার থেকে অনেক লম্বা।
অরিয়নের দৃষ্টি প্রখর। এগিয়ে গিয়ে মিতার সামনে দাঁড়াল।
“কী বললি? আবার বল” মিতা ভ্রু কুঁচকাল।
“সরি, ভুলে ব...”
“না, না, তার আগে” অরিয়ন এক পা এগিয়ে এল। তার চাহনি শিকারীর মতো। পলকহীন নয়নে মিতার দিকে শুধু তাকিয়েই রইল।
মিতা বুঝতে পারল অরিয়ন কোন কথাটার কথা বলছে। বড় করে নিশ্বাস নিল মিতা। ভয় করছে তার, অরিয়নের নাম ধরে ডেকেছে বলে হয়তো রেগে গেছে অরিয়ন।
“সত্যি বলছি, রাগের মাথায় বলে ফেলেছি” নিম্নস্বরে বলল মিতা।
“আবার ডাক, নাম ধরে ডাক” অরিয়ন মিতার আরও কাছে এগিয়ে আসে। মিতা পিছিয়ে গেল। তার পিঠ গিয়ে ঠেকল কাঠের আলনার সঙ্গে। অরিয়ন আবার এগোল। আলতো করে নিজের হাত দিয়ে মিতার হাত স্পর্শ করল। মিতা হাত এক ঝটকায় সরিয়ে নেয়।
মিতা অবাক হচ্ছে। অরিয়নের মুখের চাহনি তার ভালো লাগছে না। অদ্ভুত এক অনুভূতি ফুটে উঠছে অরিয়নের চোখে। এর আগে তো কখনো এসব দেখেনি মিতা। অরিয়নকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন মিতাকে গ্রাস করে নিতে চায়।
“নাম ধরে ডাক, পরী” নামটা শুনতেই মিতার বুকের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল।
“আ... আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আপনি আমার থেকে বড়। আমি নাম ধরে কেন ডাকব?” অরিয়নকে পাশ কাটিয়ে চলে এল মিতা। অরিয়ন দাঁতে দাঁত চাপে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে বড় করে নিশ্বাস ছাড়ল। ঘুরে দাঁড়াল মিতার দিকে।
মিতা অন্যদিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে।
“জবাব দিলি না কিন্তু” অরিয়ন বলল। মিতা জানে অরিয়ন কীসের কথা বলছে। অরিয়নের দিকে ফিরল সে।
“কী জবাব দেব?”
“যদি বলি তোকে ভালোবাসি, তাহলে?”
“তাহলে কিছু না” দ্রুত জবাব দিল মিতা। অরিয়ন ভ্রু কুঁচকাল।
“কিছু না?”
“না, কিছু না” মিতা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তার চোখে পানি ছলছল করছে, যেন যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যাবে।
পুরো রুমে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। দুজন দুপাশে দাঁড়িয়ে রইল আপন মনে। মিতার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। দ্রুত হাত দিয়ে মুছে ফেলল মিতা, তবু থামছে না। কান্না পাচ্ছে তার, ভীষণ কান্না পাচ্ছে। বুকের মধ্যে যন্ত্রণা শুধু বেড়েই চলেছে।
অরিয়ন আবার মিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মিতা হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে, চোখের এই পানি কাউকে দেখাতে চায় না সে।
“আই অ্যাম সরি, লাভ” মিতাকে জড়িয়ে ধরে অরিয়ন। শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।
“আ... আপনি বলুন আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। বলুন না, প্লিজ” অনুনয় করল মিতা।
“এটা বললে তোর ভালো লাগবে?” অরিয়ন দুই হাতে মিতার গাল ধরল। চোখাচোখি হল দুজনের। মিতার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। মিতা কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়াল।
“ঠিক আছে। আমি তোকে ভালোবাসি না” অরিয়ন বলে। মিতা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পেল না। এক মুহূর্তে অরিয়ন কথাটা বলল, আর পরমুহূর্তে তার ঠোঁট গিয়ে স্পর্শ করল মিতার চোখের কোণে জমে থাকা পানিতে। নিজের মুখে নিয়ে নিল সেই নোনতা পানি।
“একটুও বাসি না” মিতার নাকে নিজের নাক ঘষল অরিয়ন। মিতা কতটা ভেঙে পড়েছে, তা অরিয়ন নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে। তবু মিতাকে না ছুঁয়ে থাকতে পারছে না সে। তার মনের মধ্যে থাকা জা'নোয়ারটা বারবার বলছে এই ভঙ্গুরতার সুযোগ নিতে। কিন্তু তার পরীকে সে কীভাবে কষ্ট দেবে এই মুহূর্তে?
“কাপড় সব গোছানো হয়েছে? কাল তো আমরা চলে যাব” মিতার থেকে একটু সরে এল অরিয়ন।
“হুম” কোনোরকম হ্যাঁ বুঝিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল মিতা। অরিয়ন নিজের জায়গায় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
মিতা যখন ওয়াশরুম থেকে বের হল, তখন তার অবস্থা আরও খারাপ। চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। তার অবস্থা বুঝিয়ে দিচ্ছে সে ওয়াশরুমে বসে কতটা কেঁদেছে।
অরিয়ন বিছানায় আধশোয়া হয়ে মোবাইল টিপছিল। মিতাকে দেখামাত্র সোজা হয়ে বসল। মিতা চুপচাপ গিয়ে রুমের লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মিতাকে শুতে দেখে অরিয়নও বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
মিতা কাত হয়ে অন্যদিকে শুয়ে আছে। অরিয়ন পাশ ফিরে মিতার দিকে তাকিয়ে। যদিও মিতার পিঠ আর চুল ছাড়া কিছুই দেখতে পারছে না সে। একটু পর কিছু ভেবে মিতা সোজা হল। অরিয়ন আগের মতোই রইল।
অরিয়নের দিকে ফিরল মিতা। অন্ধকারে কেউ কাউকে ভালো করে না দেখলেও তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, তা নিজেরাও জানে।
“আমি... আমি এই সম্পর্ককে এক... একধাপ এগিয়ে নিতে চাই” মিতার কথাগুলো কাঁপা কাঁপা শোনাল।
“ক... কী করতে হবে আমাকে? লাইট অন করব?” শোয়া থেকে উঠতে যেতেই অরিয়ন মিতার কোমরে হাত রেখে বাধা দিল। আবার শুয়ে পড়ল মিতা।
এই অন্ধকার রুমে অরিয়নের মুখের অভিব্যক্তি দেখতে পেল না মিতা। শুধু অপেক্ষা করতে থাকল। অপেক্ষা করতে থাকল সব কিছু শুরু হওয়ার। যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই সে বেঁচে যাবে।
মিতার কোমর ধরে নিজের দিকে টান দিল অরিয়ন। না চাইতেও চলে যায় মিতা। নিজের পরনের জামা খামচে ধরে সে।
অরিয়ন দুই হাত দিয়ে মিতাকে আগের মতো করে কাত করে শোয়াল। মিতার পিঠের সঙ্গে অরিয়নের বুক স্পর্শ করে। আরও কাছে টেনে নিল অরিয়ন। মিতার চোখের কোণে জমে থাকা পানি পড়তে চাইলেও সে বাধা দিল, কান্নার একটি শব্দও বের হতে দিল না।
অরিয়ন নিজের মুখ গুঁজল মিতার কাঁধে। মিতা খিঁচ মে'রে থাকে। চায় না, তার মন এসব কিছুই চায় না। তবে সে এসবেরই যোগ্য। এসব হওয়া উচিত তার সঙ্গে। অরিয়ন আলতো করে মিতার গলায় চুমু খেল। অন্য হাত দিয়ে মিতার কোমর জাপটে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। অরিয়নের উষ্ণ নিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ল মিতার শরীরজুড়ে।
“এভাবে কেন নিজেকে কষ্ট দিতে চাইছিস?” মিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল অরিয়ন।
“কষ্ট ছাড়া আর কিছু নেই এই জীবনে” মিতা জবাব দিল।
“কে বলেছে কেউ নেই? আমি আছি। তোর অরিয়ন আছে।”
“আপনি আমার নন।”
“বিশ্বাস কর। আমার নিজের ওপর নিজেরও এতটা অধিকার নেই, যতটা তোর আছে। পুরো আমিটাই শুধু তোর। আমার নিশ্বাস-প্রশ্বাস সব তোর। তুই জানিস না আমি তোর জন্য কী করতে পারি।” মিতা চুপ করে রইল। অরিয়নের কথার উত্তর তার কাছে নেই। সে তো এসেছিল নিজেকে শাস্তি দিতে। না চাইতেও অন্য কারও স্পর্শ সহ্য করে নিজেকে শাস্তি দিতে। অরিয়ন কেন তাকে সেই শাস্তি দিচ্ছে না? কেন তাকে এভাবে ট্রিট করছে অরিয়ন?
“আমায় একবার ভালোবেসে দেখ। তোর জীবন আমি বদলে দেব” মিতার কানের লতি ভিজিয়ে দিল অরিয়ন। শিহরণ বয়ে গেল মিতার শরীরে। এরকম অদ্ভুত অনুভূতি এর আগে কখনো হয়নি তার।
“ভালোবাসা জোর করে হয় না” মিতার কথাগুলো যান্ত্রিক শোনাল, যেন মূর্তির মতো। কোনো অনুভূতি ছিল না তাতে।
“ওকে এখনো ভুলতে পারিসনি তুই,ল” অরিয়ন দাঁতে দাঁত চাপল। রাগ লাগছে তার।
“আমাকে একটা সুযোগ দে, আমি তোকে সব ভুলিয়ে দেব। আমার ভালোবাসার সামনে আর কিছুই দেখতে পারবি না তুই।” মানুষের কথায় যদি ভালোবাসা হয়ে যেত, তাহলে হয়তো সবাই খুব ভালো থাকত। কিন্তু না, মানুষের জীবনটা যে খুব জটিল। অনুভূতির ওপর কারও কোনো জোর খাটে না।
“আমি ঘুমাব” মিতা বলল।
“হুম” অরিয়ন আর কিছু বলল না। আলতো করে মিতার থেকে সরে এল। মিতা আবার নিজের জায়গায় ফিরে এল। অন্ধকার রুমের সিলিং-এর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অপেক্ষা করতে লাগল দুই চোখ বন্ধ হওয়ার, এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার।
চলবে.....
গল্পের আসল কাহিনিতে আমরা সবে মাত্র প্রবেশ করবো, তাই যারা এখনো ফলো দেন নি পেইজটি দ্রুত ফলো দিয়ে দিন।
আর হ্যাঁ, পর্ব ছোট হলেও আমি এখন থেকে রেগুলার দেওয়ার চেষ্টা করবো।