#পর্ব_২
গল্প:#টক_ঝাল_নাকি_মিষ্টি?
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শ্রিয়ন্তী ভার্সিটি শুরু হয়েছে বেশ ক'দিন হচ্ছে।প্রথম কয়দিন একটু হেলাফেলায় ক্লাস হলেও এখন কড়াকড়ি ক্লাস হয়।ভার্সিটি দৌড়াতেই দিন যায় মেয়েটার।যেমন এই বিকেল সময়টা কেবলই ভার্সিটি থেকে ফিরল সে।বাসার ভিতর ঢুকতেই নজর পড়ল ড্রইং রুমেই দিকে।সেখানে নয়ন সাহেব আর রাত্রির বাবা নিবিড় সাহেব বসে আছেন।নয়ন সাহেব ফোনে কথা বলছেন।চেহারা তার বেশ হাসিখুশি।কিন্তু ফোন কাটার পরপরই যেন উপস্থিত দুই ব্যক্তিকে একটু চিন্তিত দেখালো।
সেদিকে নজর রেখেই শ্রিয়ন্তী রুমে না গিয়ে আগে রান্নাঘরে গেল। রুমি বেগম ও রাত্রির মা আয়শা বেগম রাতের খাবারের প্রস্তুতি করছে।
"কি ব্যাপার?বাবা আর চাচুকে এত টেনশনে কেন লাগছে? "
শ্রিয়ন্তীর কথা শুনে রুমি বেগম আর আয়শা বেগম দুজনে যেন একটু চমকে উঠলেন।
আয়শা বেগম জোর পুর্বক মুখে হাসি এনে বললেন,
"কি আবার হয়েছে,তাদের চিন্তার শেষ আছে?তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে"
বাইরের দুই ব্যক্তির মতো রান্নাঘরের দুই ব্যক্তির ব্যবহার কেন জানি স্বাভাবিক মনে হলো না শ্রিয়ন্তীর।কোনো না কোনো তো ব্যাপার অবশ্যই আছে।
আজকের রাতে ডাইনিং টেবিলে গত দিনগুলোর থেকে একটু বেশিই নীরবতা।শুধু রাত্রির ছোট বোন মিলি পুটুর-পুটুর করে কথা বলে যাচ্ছে ।
রাত্রির শ্রিয়ন্তীর পাশেই বসেছে।শ্রিয়ন্তীর দিকে মাথা হেলিয়ে বলল সে,
"আপু, বাসায় কি কিছু হয়েছে?স্কুল থেকে আসার পর থেকেই দেখছি সবাই কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে "
শ্রিয়ন্তী মাথা তুলে তার সামনে বসে থাকা শিশিরের দিকে দেখল। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সেও আশেপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে কিছুটা।
শ্রিয়ন্তী এবার গলা পরিষ্কার করল,
"চাচু,অফিসে কি কিছু হয়েছে?তোমাদের কেন জানি একটু টেনশনে লাগছে"
শ্রিয়ন্তীর কথায় নয়ন সাহেব আর নিবিড় সাহেব দুজনেরই ঘোর কাটল যেন।
শ্রিয়ন্তীর কথার পরপরই নিবিড় সাহেব বলে উঠলেন,
"না না,তেমন কিছু না "
আবারো যেন আগে নীরবতায় চলে গেল।
খাওয়া প্রায় শেষের দিকে।এমন সময় নয়ন সাহেব বলে উঠলেন,
"শ্রিয়ন্তী,শিশির আর রাত্রি তোমরা তিনজন খাওয়া শেষে একটু ড্রয়িং রুমে এসো। কিছু জরুরী কথা আছে "
বাড়ির তিন বাচ্চা যেন ভালোই ভড়কালো নয়ন সাহেবের থমথমে কন্ঠে।তিনজনের কেউই জানে না কেন তাদের ডেকেছে।
খাওয়া শেষে বাড়ির তিন বাচ্চা সোফার দিকেই এগুচ্ছে।শ্রিয়ন্তী শিশিরের মাথায় টালা দিয়ে বলল,
"এই পাজি, কি আবার অকাজ করেছিস?"
মাথায় হাত বোলাতে নিয়ে বলল শিশির,
"আমাকে কেন বলছো? তুমিই তো এই বাসার মাথা ব্যথা "
"একদম আমার নামে গুজব ছড়াবি না "
"গুজব কই?সত্যিই তো বলছি"
"তোর ইঞ্জিনিয়ারিং এডমিশনের রেজাল্ট এসেছে নাকি? "
"না, এখনো আসেনি। আর টেনশন নিও না। বাবার ওটাতে মন খারাপ হবে না। আমার জন্য বুয়েটে একটা সিট বরাদ্দ হয়েই আছে।বাবা-চাচু অন্য কোনো কারণে ভাবনায় পড়েছে"
তিনজন এসে নিবিড় সাহেব আর নয়ন সাহেবের সামনের সোফায় বসে।নিবিড় সাহেব আর নয়ন সাহেব কেমন যেন আমতা-আমতা করছেন।কে বলবে কে বলবে না এমন অবস্থা।
নিবিড় সাহেব ও নয়ন সাহেবের এমন করাটা শ্রিয়ন্তীকে অস্থির করছে যেন,
"বাবা,চাচু,কিছু তো বলো।আমার খুব টেনশন হচ্ছে "
দুই ভাই একে অপরের দিকে দেখে শ্রিয়ন্তীর দিকে দেখলেন।ভারী শ্বাস ফেলে নয়ন সাহেবই মুখ ফুটে বললেন,
"তোমাদের একটা চাচা আছে "
নয়ন সাহেবের কথা সামনের সোফায় বসা তিনজনের মাথার উপর দিয়ে কাকের মতো উড়ে গেল যেন।নিবিড় সাহেব তাদের মনোভাব বুঝতে পারলেন বুঝি।একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন তিনি,
"আমার এই বাসায় আসার কারণ তোমাদের সেই চাচা "
সামনের সোফার পরিবেশ আগের মতোই।বাসার সবাই জানে নিবিড় সাহেব এ বাড়ির আসল ছেলে নন।নিবিড় সাহেব যখন অনেক ছোট ছিলেন তখন নয়ন সাহেবের মা তাকে অ্যাডপ্ট করেছিলেন।কেন করেছিল বাড়ির এই তিন শিশু জানে না।জানার কখনো প্রয়োজন পড়েনি।সেই বিষয় নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। নিবিড় সাহেবকে নয়ন সাহেব আর রুমি বেগম কখনোই পর করে দেখেননি।নয়ন সাহেব নিবিড় সাহেবকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো আদর দিয়েছেন।কারো পক্ষে চিন্তা করা অনেক দূরের বিষয় হবে যে তারা এক মায়ের পেটের না।লালন-পালন তো হয়েছে এক মায়ের কাছে।ওটা তো কম না নিজের ভাই দাবি করা।
শ্রিয়ন্তী তার নীরবতা ভাঙলো,
"তোমরা কি বলতে চাচ্ছো পরিষ্কার করে বলো।আমরা কিছু বুঝছি না"
নয়ন সাহেব এক বড় শ্বাস ভেতরে নিলেন,
"এখন আমি যেটা বলব সেটা হয়তো অনেক আগেই তোমাদের বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু কেন জানি বলা হয়ে ওঠেনি। তোমরা এটা প্রথম থেকেই জানো যে আমি যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন তোমাদের দাদু-দাদির ডিভোর্স হয়ে যায়। কিন্তু কেন হয় এটা তোমরা জানো না।তোমাদের দাদু যে আমার মায়ের সাথে এমনটা করবে সেটা এখন চিন্তা করেই আমার র'ক্ত গরম হয়ে ওঠে। আমার মায়ের যে কি দোষ ছিল যে তাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের কাছে সে গিয়েছিল?"
নয়ন সাহেবের কন্ঠ যেন ভারী হয়ে এলো হঠাৎ।তিনি জোরে শ্বাস ফেলে আবার বললেন,
"যাইহোক,গত বছরেই তিনি মা'রা গিয়েছেন।আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাত নসিব করুক "
রাত্রি বলে উঠলো,
"বড় আব্বু,তুমি যে চাচার কথা বললে,উনি কে?"
নয়ন সাহেব পরিবেশ স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যেই একটু হেসে উঠলেন,
"দেখেছো,যার কথা বলার জন্য বসেছি তার কথাই ভুলে গিয়েছি। যেটা বলছিলাম,আমি তোমাদের দাদীর একমাত্র ছেলে ছিলাম না। আমার থেকে দেড় বছরের বড় আরও একটা ছেলে ছিল। তোমাদের দাদু-দাদির ডিভোর্স হওয়ার সময় সিদ্ধান্ত হয় যে দুই ছেলে দুজনকার কাছে থাকবে।আমি যেহেতু ছোট ছিলাম তাই আমি তোমাদের দাদীর কাছে থেকে যাই। আর আমার বড় ভাই মানে নাহিদ ভাই আব্বার কাছে থেকে যায়।আলাদা হওয়ার পরে নাহিদ ভাই আমাদের প্রায়শই কল দিতো।মার সাথে কথা বলতো, আমার সাথে কথা বলতো।তোমাদের দাদু সেটা একদম পছন্দ করত না।তাকে নাকি অনেকবার বারণ করেছিল আমাদের সাথে যোগাযোগ না করতে।কিন্তু আমার ভাই সরাসরি না দেখা করলেও আমাদের খোঁজখবর নেয়া চালু রেখেছে।১০ বছর আগে তারা আমেরিকায় সেটেল হয়। তোমাদের ছোট দাদির একটা মেয়েও আছে।সেও বিয়ে করে আমেরিকায় আছে।তোমাদের দাদু মারা যাবার পর তোমাদের ছোট দাদি তোমাদের ফুপির সাথেই আছেন।নাহিদ ভাইয়ের সাথে আমার আজ সন্ধ্যায় কথা হলো।তার বিজনেস নাকি এখন সে দেশে এসে করবে।আগে থেকেই তার বিজনেস এর ব্রাঞ্চ দেশে আছে। এখন শুধু সে সরাসরি দেশে উপস্থিত থাকবে।সমস্যা হলো তারা তো ভেবেছিল দেশে আর ফেরা হবেনা।তাই তারা দেশের বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু তোমাদের দাদু মা'রা যাওয়ার পর থেকে নাহিদ ভাই দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে"
নয়ন সাহেব কথা থামালেন।রুমি বেগমের পাশে দেখে আবার শ্রিয়ন্তীদের পাশে চোখ ঘুরালেন,
"আমি চাচ্ছি...মানে আমি,নিবিড়,রুমি,আয়শা,আমরা চারজনই চাচ্ছি নাহিদ ভাই ও তার বউ সহ দুই ছেলে-মেয়ে আমাদের এখানেই থাকুক।একটি ব্যক্তির জন্য এত বছর তোমাদের দাদি আর আমি তার কাছ থেকে দূরে আছি। তাই আমি এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাচ্ছি না। তোমাদেরকে এটা বলার কারণ হলো তোমরা তিনজন এখন যথেষ্ট বড় হয়েছো।ভালো-মন্দ তোমরাও বুঝো।তাই তোমাদের মতামতটাও এখানে ম্যাটার করে"
শ্রিয়ন্তী, শিশির ও রাত্রি তিনজনই এতক্ষণ হা করে নয়ন সাহেবের কথা শুনছিল।নয়ন সাহেবের কথা শুনে বোঝাই যাচ্ছে সে তার বাবাকে অপছন্দ করলেও যথেষ্ট সম্মান করে।আর আমেরিকায় যে পরিবারটি আছে তাদেরকে সে আপন করে নেয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত।
শ্রিয়ন্তী শিশির ও রাত্রির দিকে দেখল।চোখে চোখে কি যেন ইশারা করলো তিনজনই।বড়রা কেউই বুঝে না এরা একে অপরের সাথে কমিউনিকেট করে কেমন করে।
শ্রিয়ন্তী নয়ন সাহেব ও নিবিড় সাহেবের দিকে ঘুরে মৃদু হেসে উঠল,
"একজন আপনজনকে ফেরত পাওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যাপার বাবা।আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই"
হঠাৎ রাত্রি বলে উঠল,
"আব্বু তুমি যে বললে তোমার আসার কারণ নাহিদ চাচু,সেটার মানেটা বুঝলাম না "
হাসলেন নিবিড় সাহেব।অতঃপর বললেন,
"ছোটতে নাকি আমি দেখতে একদম নাহিদ ভাইয়ের মতো ছিলাম। তাই তোমাদের দাদি আমাকে অ্যাডপ্ট করে।তার জন্যই তো আমি এক আদর্শ মায়ের কাছে পালিত হয়েছি।আমার ভাগ্যটা মনে হয় একটু বেশিই ভালো "
রাত্রি মুখে হাসি নিয়ে বলল,
"পরিবারের সদস্য যত বেশি তত মজা।ভালোই তো হবে, মিলির আদর করার মানুষ বেড়ে যাবে "
রাত্রির কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।আর বাড়ির চারজন সিনিয়র সিটিজেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন যেন।বাচ্চারা তাহলে গ্রহণ করবে তাদের নতুন পরিবারের সদস্যদের।
নয়ন সাহেব রাতে রাবেয়া বেগমের কাছে গেলেন।দরজা ঠেলে দেখলেন মা বিছানায় বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন।নয়ন সাহেব গিয়ে বিছানায় মায়ের সামনে বসলেন।
রাবেয়া বেগম চশমার ফাঁক দিয়ে সামনে বসে থাকা ছেলের দিকে নজর ফেললেন,
"কিছু বলবি? "
নয়ন সাহেব কোনো উত্তর দিলে। না।ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে মায়ের দিকে দেখে আছেন তিনি।
রাবেয়া বেগম এবার কোরআন শরীফ বন্ধ করলেন,
"এমন হাসছিস কেন?কোনো সুখবর আছে নাকি?"
মায়ের দুই হাত চেপে ধরলের নয়ন সাহেব,
"নাহিদ ভাই আসছে "
ছেলের কথায় রাবেয়া বেগমের গম্ভীর মুখটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো হলো।দু'ফোটা লবণাক্ত পানিও গাল বেয়ে পড়ল।মাথা নিচু করে বললেন তিনি,
"তোকে অনেক ধন্যবাদ "
মায়ের কান্না দেখে নয়ন সাহেবও আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।
রাবেয়া বেগম ভাঙা গলা নিয়েই বলে উঠলেন,
"আল্লাহ তায়ালা আমার দোয়া কবুল করেছেন।শেষ বয়সে আমি আমার তিন ছেলের সেবাই তাহলে পাচ্ছি"
✿এই পর্বের নৈতিক বাক্য:
ভঙ্গুর পরিবার আবার জোড়া লাগানো সম্ভব।
#চলবে