ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৮ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক, ড্রামা

(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)

পর্ব- ৮

সব জায়গায় খুশি, শুধু আমার মাঝেই চলছে বিষাদের এক অধ্যায়। বার‌বার মন বলছে, ছুটি কোন ভাবেই সম্ভব না। ছুটির কথায় যেন চিৎকার করে কান্না পাচ্ছে।

আমার একদম চুপ হয়ে যাওয়া দেখে মেঘ জিজ্ঞেস করলো, "কিছু কি হয়েছে রুশা?"

আমি মুখে একটা লোক দেখানো হাসি টেনে বললাম, "না তো, কিছুই না। কাল হয়তো আমি আসতে পারবো না।"

মেঘ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "কেনো?"

আমি ধির গলায় বললাম, "আড্ডা দেয়া, এভাবে ঘুরে বেড়ানো মা পছন্দ করে না। এই মাসে মায়ের কাজ অনেক বেশি তাই মা রাত পর্যন্ত অফিসে থাকে আর তাই আমি বিকেলে ক্যাফেতে আড্ডা দিতে পারি। তাছাড়া সব সময় মা-ই আমাকে কলেজে দেয়া নেয়া করেন।"

রাফি আমার কথা শুনে বললো, "এতো নজরদারি কেনো? তুমি তো স্কুলের বাচ্চা না।"

মেঘ ভারি কন্ঠে রাফিকে বললো, "রাফি, সমস্যা থাকতেই পারে। বেশি সমস্যা হলে আসার প্রয়োজন নেই।"

আমি মেঘের কথায় শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। মাঝে মাঝে নিজেকে একটা ডানাকাটা পাখির মতো মনে হয়। যে রোজ উড়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ঝাপটানোর জন্য তার কাছে ডানা নেই। তার স্বপ্ন আকাশের গহীনে মেঘের দেশে যাওয়া। তবে, তার না আছে আকাশ ছোঁয়ার সামর্থ্য আর না আছে ডানা বিহীন উড়ার দূরসাহস। কিন্তু এখন যা আছে আমার কাছে, এর থেকে বেশি চাওয়া হয়তো বোকামিই হবে। অন্ততঃ চারদেয়ালে বন্দি জীবনের মাঝে একটা মুক্ত জানালা তো পেয়েছি, যেখানে লুকিয়ে হলেও নিঃশ্বাস তো নেয়া যায়।

কলেজ শেষে চার ঘণ্টা কখন যেন হারিয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। সময় শেষ হয়ে গেলেও কথা শেষ হয় না, যেন গল্পের এক অনন্ত স্রোত বইতে থাকে। অরুপের গিটারের মূর্ছনায় আড্ডার পরিবেশ মোহময় হয়ে ওঠে, আর সেই সুরে মেঘের কণ্ঠ মিলিয়ে যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। মেঘের কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত মায়া আছে, যা সবাইকে এক নিমেষে মুগ্ধ করে দেয়। পুরো পরিবেশ আনন্দের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যেন এক উৎসবের আমেজে আড্ডার আকাশ রঙিন হয়ে যায়।

রাফির মজার কথা যেন ফুরোয় না, ওর সহজ-সরল মনটাই ওকে আলাদা করে তোলে। কেউ যা-ই বলুক, ওর যেন কিছুই এসে যায় না সব মেনে নেয় এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতায়। আর এ কারণেই সবাই ওকে মজার নিশানা বানায়, কিন্তু ও হাসিমুখেই সব গ্রহণ করে। ইমরানও কম যায় না, মজার মানুষ সে, তবে রুবাইয়ের সামনে এসে যেন খানিকটা শান্ত হয়ে যায়। তবু মাঝে মাঝে ওর এমন কথা বের হয় যে হাসতে হাসতে আমাদের পেট ব্যথা হয়ে যায়!

অরুপকে এক কথায় বলা যায়, “এক প্যাকেটে পাঁচফোড়ন” গিটার, কৌতুক, ভাবুকতা সবকিছুতেই তার দখল। তবে আড্ডার প্রাণ যে মেঘ, তা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। ওর হাসিমুখ যেন কখনো ক্লান্ত হয় না, ওর প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি অভিব্যক্তি আমার কাছে অমায়িক মনে হয়।

আর রুবাই? ওর আড্ডার মূল উদ্দেশ্যই যেন ইমরানকে খোঁচানো! অন্য কেউ হয়তো তা বুঝে না, কিন্তু আমি আর প্রীয়তা সেটা বেশ উপভোগ করি। তবে প্রীয়তার সবচেয়ে বড় গুণ তার অদম্য বকবক করার ক্ষমতা! কে শুনছে, কে শুনছে না, তাতে কিছু যায় আসে না; ওর কথা চলতেই থাকে এক নিরবচ্ছিন্ন ধারায়, যেন নদীর মতো বয়ে চলা এক অদম্য উৎস।

এই বৈচিত্র্যময় চরিত্রগুলো মিলে তৈরি হয় আমাদের আড্ডার আসর, যেখানে সবাই আলাদা হলেও কোথাও যেন একসূত্রে বাঁধা। যেন একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।

কিন্তু কাল আমি থাকবো না এই ভাবনাটা সবাইকে অস্থির করে তুলেছে। কীভাবে আমাকে আনা যায়, তা নিয়ে আজ হাজারো পরিকল্পনা হয়েছে, তবে সবই বিফল।

সত্যিই বুঝতে পারছি না—আমার জন্য সৌভাগ্যবান আসলে কে! এই কলেজ, মেঘ, নাকি সানন্দপুরের এই চেনা রাস্তা? কখনো কি এতটা ভালো ছিলাম আমি? মা আমাকে কোনো কিছুর অভাব হতে দেননি, কিন্তু কখনো জানতে চাননি আমার চাওয়া-পাওয়া। আমিও আবদার করার সাহস পাইনি। অথচ প্রতিদিনের আড্ডায় আমি টের পাই—আমার অস্তিত্ব সত্যিই আছে।

কিন্তু এই উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ থাকে না। সন্ধ্যা ঘনায়, আড্ডা ভাঙে, আর আমি ফিরে আসি সেই চার দেয়ালের নিঃসঙ্গতায়, যেখানে আমারই প্রতিধ্বনি কানে বাজে। একাকিত্ব যখন অস্থির করে তোলে, ছাদে যাই। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মেঘেদের সাথে নীরব সংলাপ করি, যেন ওরাও আমার মতো বাউণ্ডুলে, দিগন্তের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। তবে আজ সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। ছাদে যাওয়া অসম্ভব। মা যদি দেখে ফেলেন, অকারণে বকবেন, তাই নিজেকে বন্দি করলাম ঘরের কোণেই। টিভির পর্দা একঘেয়ে, উপন্যাসের পৃষ্ঠা অর্থহীন। যখন মনের ভেতর কোনো অনুভূতি দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নেয়, তখন বাকি সব কিছুই নিষ্প্রাণ মনে হয়।

কালকের দিনটার কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়। ওদের সবার সঙ্গ আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আর মেঘের সাথে কাটানো মুহূর্ত? সেটার তো একটাও ছাড়তে চাই না! বারবার মনে হচ্ছে যদি কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে, যদি কোনো জাদুর ছোঁয়ায় আমি আবার ওদের মাঝে ফিরে যেতে পারতাম!

শুনেছি, ভালোবাসার গন্ধ নাকি আশপাশের সবাই আগে টের পায়, ভালোবাসার মানুষ নিজে তা না জানলেও। সাহিত্যে পড়েছি অনেক, কিন্তু কোথাও পড়িনি যে ভালো লাগারও একটা গন্ধ থাকে। অথচ এই অনুভূতির সত্যতা আমি নিজেই টের পাচ্ছি। প্রথমে রুবাই আর প্রীয়তার চোখে ধরা পড়লাম, এখন রাফিও টের পেয়ে গেছে। রুবাই আর প্রীয়তার সন্দেহ পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু রাফির ব্যাপারে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ছেলেটা সহজ-সরল, উল্টোপাল্টা কিছু বলে দিলে মুশকিলে পড়তে হবে! আজ তো বারবার বলছিল আমি নাকি মেঘকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখছি। এমনকি বলল, সাহস করে যেন মেঘকে বলে দিই, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।“

কিন্তু সত্যিই কি আমি মেঘকে ভালোবাসি? জানি না। শুধু এটুকু জানি, ওকে দেখলে ভালো লাগে, কোথাও যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। যেন ওর উপস্থিতিতে চারপাশের সব কিছু রঙিন হয়ে ওঠে, ঠিক জাদুর মতো।

ভাবতে ভাবতে কোন দুনিয়ায় চলে গিয়েছিলাম, আল্লাহই জানেন! হঠাৎ চেতনা ফিরে এলো ঘড়ির কাঁটায় মায়ের ফেরার সময় হয়ে গেছে। আর আমার ঘর? যেন এক অগোছালো জঙ্গল! ছোটবেলা থেকে আমি সব কিছু পরিপাটি রাখতে অভ্যস্ত, অথচ এই শহরে এসে যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি। এমন বিশৃঙ্খল ঘর দেখে নিজেকেই অবাক লাগছে!

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন