ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৯ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা।

(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)

পর্ব- ৯

ভাবছিলাম, মায়ের ফেরার আগে সব গুছিয়ে ফেলবো ঘর পরিষ্কার করবো, কাপড় ড্রয়ারে ভাঁজ করে রাখবো, পড়ার টেবিলটাও পরিপাটি করবো। কিন্তু তালিকা শেষ করার আগেই দরজার সামনে পরিচিত কড়া নাড়ার শব্দ। মা ফিরে এসেছে। আর আমি এখনো অগোছালো... শুধু ঘর নয়, মনও।

আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার সম্পূর্ণ ঘরে তাকিয়ে বললো, "তোমার ঘরের এই অবস্থা কেনো?"

আমি হাতে ঝাটাটা তুলে বললাম, "মা সব পরিস্কারই করছিলাম। পড়তে বসেছিলাম তাই দেরি হয়ে গেছে। তোমার এতো দেরি হলো আজ আসতে!"

মা ক্লান্ত মুখে বললো, "অনেক কাজ ছিল। তুমি সবার আগে রুম পরিষ্কার করো, আমি গোসল করে এসে কথা বলছি।"

আমি অনায়াসেই বললাম "ঠিক আছে মা। তুমি কি সরবত খাবে?"

মা আমার দিকে না তাকিয়ে, ঘরটায় আবারো চোখ বুলিয়ে বললো, "না । তুমি সবার আগে তোমার এই ঘরটাকে পরিষ্কার করো। এটাকে দেখতে খুব বাজে লাগছে।"

আমি বোকার মত হেসে বললাম, "তুমি যাও গোসল করে নাও। তোমার গোসল করতে করতে গোছানো হয়ে যাবে।"

মা তার ঘরে চলে গেলেন।

বর্তমানে জীবনের প্রতিটি ঘটনাই যেন আমি "পড়ছিলাম" নামক এক জাদুকরী বাক্যে চালিয়ে দিচ্ছি। ক্ষুধা পেয়েছে? কারণ পড়ছিলাম। কারও কথা শুনছি না? কারণ পড়ছিলাম। কিছু মনে নেই? তারও কারণ পড়ছিলাম। এ যেন আমার জীবনের নাপা এক্সট্রা, সব সমস্যার একটাই সমাধান! দিনে যতবার মা আমাকে "পড়তে বসো" বলেন, আর আমি যতবার উত্তর দিই "পড়ছিলাম," সত্যি যদি ততবার পড়তাম, তাহলে হয়তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরে ইতিহাসে আমার নামই লেখা হতো।

সাধারণত অন্য বাড়িগুলোতে রাতের খাবারের সময়টা কেমন কাটে, জানি না। তবে আমাদের বাড়িতে এটা "জেরা টাইম"। আগে এতে এতটা টেনশনে থাকতাম না, কারণ লুকানোর কিছু ছিল না। কিন্তু এখন? এখন আমার জীবনের অর্ধেকটাই যেন রহস্যে মোড়া।

খাবারে প্রথম চামচ তুলতে না তুলতেই মা জিজ্ঞেস করলেন,

"রুশা, দিন কেমন কাটলো?"

আমি অভ্যস্ত গলায় উত্তর দিলাম, "ভালো ছিল মা, তোমার?"

মা যেন জমে থাকা হতাশা উগড়ে দিলেন, "অনেক বাজে! অফিসের কাজের চাপ বেড়েছে, কী বলবো! তোমাদের কলেজে তো সোমবার শিক্ষা সফরে যাচ্ছে শুনলাম?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ মা, আমিও নোটিশ বোর্ডে দেখলাম, পাঁচ দিনের সফর।"

মা যেন মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, "ভালোই হলো, আমিও অফিসের কাজে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো। কিন্তু তুমি সাবধানে থাকবে, ঠিক আছে? স্যার-ম্যামদের ছাড়া কোথাও যেও না। আর কলেজে কারও সঙ্গে পরিচিত হয়েছো?"

আমি এক মুহূর্ত ভাবলাম। মা যদি জানতে পারেন, আমার কলেজজীবন শুধু "পড়ছিলাম" দিয়ে চলছে না, বরং আড্ডা, বন্ধুদের হাসি, মেঘের সুর, রুবাই-রাফিদের মজার কথায় মিশে গেছে, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে? একটু নিরাপদ উত্তর দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আমি বললাম, "হ্যাঁ মা, দুটো মেয়ে আছে। বন্ধুত্ব করিনি, শুধু কলেজে গেলে কথা হয়।"

মা সন্তুষ্ট হলেন না। বরং আরও খুঁটিনাটি খোঁজার মুডে চলে গেলেন, "নাম কী? বাবার নাম জানো? বাসা কোথায়?"

আমি বুঝলাম, মা আজ সহজে ছাড়বেন না। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, ‘পড়ছিলাম’ শব্দটা কি এই পরিস্থিতিতেও কাজে লাগানো যায়?’

পরিচিত হয়েছি বলেও যেন মহা বিপদে পড়ে গেলাম। প্রশ্নের পর প্রশ্ন যেন বুলেট ট্রেনের মতো ছুটেই চলেছে। আমার মনে হচ্ছে যে এখন থেকে যে কারো সাথে পরিচিত হতে হলে আগে তার বায়োডাটা নিতে হবে। ওদের বিষয়ে যতটুকু জানি মাকে তাও বলা যাবে না, তাহলে রোজ জিজ্ঞেস করবে।

আমি বললাম, "আমি কিছুই জানি না। শুধু জানি যে ওরাও নতুন এই শহরে।"

মা যেন এক অজানা স্বস্তি পেয়ে বললেন, "ওহ্ এই শহরের না। তাহলে ঠিক আছে। নাম কি ওদের?"

আমি একটু দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে বললাম, "প্রীয়তা …"

মা আমার কথা থামিয়ে দিয়ে বললো,"আচ্ছা ঠিক আছে। আর হ্যাঁ... তুমি তোমার কলেজের স্নিগ্ধা ম্যাম কে কি বলেছো?"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "আমি! স্নিগ্ধা ম্যাম আবার কে?"

মা আমার দিকে বাঁকা নজরে তাকিয়ে বললো, "তোমাদের কলেজের, আমাকে কল করেছিলেন"

মাথার ভেতর কেমন ঝিম ধরে গেল। আমি তো কোনো স্নিগ্ধা ম্যামকে চিনি না! “আমি তো চিনতেই পারছি না মা! কীভাবে কিছু বলবো?”

মা ধীর কণ্ঠে বললেন, “তোমার ম্যাম বললেন, কাল কলেজ ছুটি। দুপুরে একটা সেমিনার আছে, গ্রুপ প্রজেক্টের কাজ হবে, কিছু কেনাকাটাও আছে। তুমি নাকি বলেছো, ‘মা যেতে দেবে না’?”

এবার সত্যি সত্যি গলা শুকিয়ে গেল। কণ্ঠ কাঁপতে লাগল, “আমি? আমি তো জানিই না এসব!”

মায়ের চোখে বিরক্তির ঝিলিক। “রুশা, আমি তোমাকে আগলে রাখতে চাই। তার মানে এই নয় যে তোমাকে বেঁধে রাখতে চাই।“

মায়ের কথায় বুকের ভেতর এক অজানা কষ্ট ছড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। “মা, এভাবে বলছো কেন?”

মা এবার খুব শান্ত গলায় বললেন, “রুশা, তোমাকে আমি অনেক যত্নে বড় করেছি। সবাই থেকে লুকিয়ে। তোমার বাবা কী করেছিলেন, তুমি জানো। আমি চাই না তুমি তোমার জীবনে কোনো কষ্ট পাও। এই দুনিয়া খুব খারাপ, তাই তোমাকে সবার সঙ্গে মিশতে মানা করি, কোথাও একা যেতে দিই না। তবে তোমার শিক্ষা সফরের জন্য কি আমি মানা করেছি? তাহলে একটা সেমিনারের জন্য কেন করতে যাবো?”

আমি নিভে আসা কণ্ঠে বললাম, “মা, আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না।“

মা আমার কথায় কর্ণপাত না করে বললেন, “রুশা, আমি কেন বন্ধু পছন্দ করি না, কেন বারবার শহর বদলেছি, তা তুমি জানো। তোমার বাবা আমাদের কোথাও রাখেনি। শুধু তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি শহর পাল্টেছি বারবার।“

আমি মাথা নিচু করে ফিসফিস করলাম, “জানি মা।“

মা এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “‘মা যেতে দেবে না’ এভাবে যেন আর কোনো কল না আসে আমার কাছে। তুমি এই কলেজ থেকে খুব ভালো রেজাল্ট করবে। আমার স্বপ্ন, একদিন তোমাকে এই কলেজের গবেষণাগারে গবেষণা করতে দেখবো।“

আমি নিঃশব্দে মাথা নিচু করে বললাম, “আমি আমার সবটুকু চেষ্টা করবো, মা। আর তুমি এভাবে বলো না, আমার কষ্ট হয়। আমি তোমার সবকিছু জানি, বুঝি, সম্মান করি।“

মায়ের চোখে অশ্রুর ছায়া নেমে এলো। “সারা দুনিয়া যদি আমাকে খারাপ ভাবে, তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি শুধু তোমার মায়ের ওপর বিশ্বাস রেখো।“

আমি চেয়ারের ওপর থেকে উঠে গিয়ে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। “তুমি খুব ভালো মা। আমি কাউকে তোমাকে খারাপ ভাবতে দেবো না।“

মা চোখের কোণ মুছে বললেন, “রুশা, তুমি আমার সব।“

আমি মায়ের হাত ধরে বললাম, “মা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।“

মা আমার কপালে চুমু খেয়ে বললেন, “যাও, রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে। আর হ্যাঁ, কাল দুপুর ২টায় কলেজে চলে যাবে, ঠিক আছে?”

আমি আস্তে হাসলাম। “ঠিক আছে, মা।“

অতীতের অন্ধকার ছায়ারা হয়তো আমৃত্যু আমাকে তাড়া করে বেড়াবে।

আল্লাহ হয়তো এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাবা আমার কপালে লিখে দিয়েছিলেন। মা সবকিছু সয়ে নিয়েও শক্ত থাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু যখনই ভেঙে পড়েন, আমার ভিতরটা যেন ছটফট করে ওঠে। তারও তো একটা জীবন ছিল, একটা স্বপ্ন ছিল! অথচ ধোঁকাবাজ একজন নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে নির্লজ্জের মতো আল্লাহর কাছে চলে গেল, আর আমাদের জন্য রেখে গেল এক বুক অভিমান, এক ঝুলি কষ্টের স্মৃতি।

আমি জানি না, বাবা সেই মহিলার মাঝে কী এমন পেলেন যে আমাকে একটিবারও চোখে পড়লো না। আমি তো মাত্র দুই বছরের ছিলাম, আমাকে কি একটুও ভালোবাসতেন না? যদি সত্যিই টাইম মেশিন থাকতো, আমি অতীতে ফিরে গিয়ে বাবাকে একটাই প্রশ্ন করতাম, “বাবা মানে কী?”

আমি এই অধ্যায়টাকে ভুলে যেতে চাই, অথচ এই অতীতের ছায়া আজও আমাকে ভয় ধরিয়ে দেয়। আমি জানি, একবার মনে পড়লেই সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার উপর। আমি সে ভুল করতে চাই না।

কিন্তু এই স্নিগ্ধা ম্যাম আবার কে? সেমিনারই বা কিসের? নোটিশ বোর্ডে তো কিছুই ছিল না! তবে মায়ের কণ্ঠে যে একরকম হতাশা ফুটে উঠেছিল, সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি। নিশ্চয়ই প্রিয়তা আর রুবাই এর পেছনে আছে। এই দুইজন ছাড়া আমার কথা ম্যামের কানে পৌঁছাবে কীভাবে? শপিংয়ে যেতে না পারার যতো রাগ, সব বুঝি এভাবেই উগরে দিলো!

আজ কেন জানি ভাবার শক্তিটাও পাচ্ছি না, সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মাঝেও এক ধরনের অদ্ভুত আনন্দ কাজ করছে আমার ভেতর! ওদের পরিকল্পনাতেও এবার বাধা পড়েছে! আমি যেতে পারবো না বলে কেউ যাবে না। এতে আমার খুব একটা আপত্তি নেই।

তবে কিসের সেমিনার?

তাহলে কি সত্যিই গ্রুপ প্রজেক্টের জন্য কিছু হচ্ছে? নাকি অন্য কিছু? এসব ভাবতে ভাবতেই মনে পড়লো, যদি গ্রুপ প্রজেক্ট হয়, আর যদি সেখানে মেঘ থাকে, তাহলে কালকের দিনটা হয়তো বেশ ভালোই কাটবে!

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন