ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

১৩তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, ডিটেকটিভ, পারিবারিক, ড্রামা

(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)

পর্ব-১৩

আজকের সকালটা অন্যসব দিনের মতোই, অথচ কোথাও যেন এক নতুন অনূভূতি লুকিয়ে আছে। প্রথমবার মাকে ছেড়ে দূরে যাওয়ার অনুভূতি এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে আমার ভেতর। একদিকে বুকের গভীরে টান, অন্যদিকে মেঘের সঙ্গ পেতে যাওয়ার উত্তেজনা। জানি, মাকে ভীষণ মিস করবো, কিন্তু এই নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানিও অস্বীকার করা যায় না।

কলেজের সামনে পৌঁছাতেই মায়ের চোখের জল টলমল করে উঠল। বুঝতে পারলাম, আমাকে ছাড়তে তার মন একেবারেই সায় দিচ্ছে না। পাঁচটা দিন কেমন করে কাটাবেন তিনি? হয়তো প্রতিটি মুহূর্তেই আমার কথা ভাববেন, আমার শূন্যতা অনুভব করবেন। সত্যি বলতে, আমিও কি কম কষ্ট পাচ্ছি? মাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না মোটেও।

মা যে বেশ লম্বা চওড়া একটা লেকচার দিলেন, সেটা আমি বুঝতে না পারলেও আমার অসহায় পা গুলো ঠিকই বুঝতে পারছিল। আর বেচারা প্রীয়তা যে মনে মনে কি বদ দোয়া দিচ্ছিলো তা আল্লাহ্ই জানেন। আমি বাসে উঠতেই তার অবস্থা ছিল হিংস্র ভাল্লুকের মতো। যেন চোখ দিয়ে আমাকে গিলে খাবে।

আমি প্রীয়তার পাশে দাঁড়াতেই প্রীয়তা রাগে বললো, "আল্লাহ্ রে! এতো বড় কি রচনা পড়িয়ে গেল তোর মা?"

আমি প্রীয়তার রাগ দেখে একটু হেসে বললাম, "মা আমাকে কোথাও একা ছাড়ে না। এইবার প্রথম একা এতো দূর যাচ্ছি, তাই একটু ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলো।"

প্রীয়তা বিরক্তি নিয়ে বললো, "তুই জানিস, সেই কখন থেকে তোর জন্য জায়গা ধরে বসে আছি। আর কিছু সময় হলে ২ নম্বর বাসেও জায়গা পেতিস না।"

আমি হেসে বললাম, "আমি তাহলে তোর মাথায় বসে যেতাম।"

প্রীয়তা নিজের মাথায় হাত দিয়ে বললো, "আমার মাথা কি দোষ করলো আবার! তোকে তো মেঘের ঘাড়ে উঠিয়ে দিতাম।"

রুবাই প্রীয়তাকে খোঁচা দিয়ে বললো, "আরে আস্তে বল, সামনের সিটেই মেঘ আর ইমরান।"

প্রীয়তা রুবাইয়ের দিকে শয়তানি নজরে তাকিয়ে বললো, "আরে বাহ্! ইমরান ও!"

রুবাই কপট রাগ দেখিয়ে বললো, "এখন দয়াকরে ওকে নিয়ে পড়িস না।"

প্রীয়তা জোরে হেসে বললো, -"আচ্ছা ঠিক আছে। রুশা তুই রুবাইয়ের পাশে বস। আমি আসছি একটু।"

রুবাই ভ্রু কুঁচকে বললো, "একবার গেলে আর সিট পাবি না কিন্তু, পেছনে গিয়ে বসতে হবে।"

প্রীয়তা রুবাইয়ের কথা গাঁয়ে না মাখিয়ে বললো, "ঠিক আছে। আমি একটু অরুপের সাথে কথা বলে আসি, একা বসে আছে বেচারা।"

প্রীয়তার এই কথা আর মুখের লাজুকতা দেখে আমি আর রুবাই দুজনই দুজনের মুখের দিকে বোকার মত তাকিয়ে রইলাম।

আমি রুবাইয়ের পাশে বসে বললাম, "প্রীয়তার কাহিনী কিন্তু গন্ডগোল লাগছে।"

রুবাই আমার দিকে অবাক নজরে তাকিয়ে বললো, "তোর আজ লাগছে! আমার তো প্রথম দিন থেকেই গন্ডগোল লাগছে।"

আমার আর রুবাইয়ের গবেষণার মাঝেই রাফি যেন ঝড়ের মতো এসে হাজির। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুক্ষণ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল, “হেই রুবাই, হ্যালো রুশা।“

আমি তাকিয়ে বললাম, “হাই, এতো হাঁপাচ্ছো কেন? দৌড়ে এসেছো?”

ওর কপালজোড়া ঘামের বিন্দুগুলো দেখে আমি ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে এগিয়ে দিলাম। “খুব ঘেমে গেছো, এই নাও টিস্যু। পানি খাবে?”

রাফি টিস্যু নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল, “ঠিক আছি! দৌড়ে এসেছি। ভেবেছিলাম খুব দেরি হয়ে গেছে। এখন দেখি, না, সামান্য হলেও সময় আছে।“

আমি ওর হাতে পানির বোতল দিয়ে বললাম, “আগে বসে শান্ত হয়ে নাও।“

রাফি একটা সিটে ধপ করে বসে বলল, “হ্যাঁ...”

আমি একটু গম্ভীর স্বরে বললাম, “রাফি, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার।“

রাফি বোতলটা আমার হাতে ফেরত দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, বলো?”

আমি চারপাশে একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “না, একটু গোপন।“

রুবাই তখনই চোখ বড় বড় করে বলল, “ওরে বাবা! এতো গোপন যে আমার সামনেও বলা যাবে না!”

আমি মুচকি হেসে বললাম, “জ্বি, রুবাই ম্যাডাম, সময় হলে আপনাকেও বলে দেবো। আপাতত না হয় গোপনই থাক।“

রুবাই আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “আল্লাহই জানে, তোরা আলাদা আলাদা চুলায় ঠিক কী খিচুড়ি পাকাচ্ছিস! তুই একজন, প্রিয় একজন!”

আমি ওর কথায় হাসতে হাসতে বললাম, “খিচুড়ি পাকানো শেষ হলে সবার আগে তোমাকেই খাওয়াবো, ঠিক আছে?”

রুবাই মুখ ভেংচি মেরে বলল, “ওকে, তোরা কথা বল, আমি পানি নিয়ে আসছি। এর মাঝে কথা শেষ না হলে কিন্তু আমার সামনেই বলতে হবে!”

“ঠিক আছে, যা,” আমি চোখ টিপে বললাম।

রুবাই চলে যেতেই রাফি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “মেঘকে নিয়ে কিছু বলবে?”

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না, তুমি ইমরানকে কয়দিন ধরে চেনো?”

ইমরানের নাম শুনে রাফি কপাল কুঁচকে তাকাল। “ইমরান!! কেন?”

আমি গম্ভীর স্বরে বললাম, “আগে বলো, তারপর সব বলছি।“

রাফি একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আমরা একসাথে ভর্তি কোচিং করেছিলাম। আমি আর মেঘ একই কলেজে ছিলাম, কিন্তু ইমরান আর অরূপের সঙ্গে বন্ধুত্ব কোচিং থেকে। তবে ইমরান তো মেঘের কাজিনও হয়, আর খুব ভালো বন্ধুও বলা যায়।“

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, “আচ্ছা, ইমরান কেমন মানুষ? মানে চরিত্র কেমন? কোনো বাজে অভ্যাস আছে? প্রেমিকা আছে?”

রাফি এবার সত্যিকারের বিস্ময়ের চূড়ায় পৌঁছে গেল। “মেয়ে বিয়ে দেবে নাকি!”

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “না রে, বোন বিয়ে দেবো।“

রাফি ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “মানে মেঘের শালী! বাহ, আমাকে তো কেউই পাত্তা দেয় না! আমিও যে এক সুদর্শন কুমার পুরুষ!”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “উফ্ রাফি! আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি, একদম মজা কোরো না!”

রাফি এবার একটু সিরিয়াস হয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা। আমি যতদূর জানি, ইমরান চরিত্রের দিক থেকে খুব ভালো ছেলে। প্রেমের ব্যাপারে কখনও আগ্রহ দেখায়নি, অন্তত শুনিনি। ও একটু গোপন স্বভাবের, রিজার্ভ টাইপের। কারো সঙ্গে বেশি মিশতে চায় না, শুধু আমাদের তিনজনের সঙ্গেই থেকেছে সবসময়। অন্যদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।“

আমি এবার গভীর মনোযোগ দিলাম। “ওহ্... আর পরিবার?”

রাফি একটু চুপ থেকে বলল, “ওর বাবাকে তো চেনোই, আমিনুল স্যার। আর মা সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানি না। হয়তো মারা গেছেন। তবে এটা জানি, বাবার সঙ্গে ওর সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়।“

আমি কিছুটা হতাশ কণ্ঠে বললাম, “তুমি ওর মায়ের নাম জানো?”

রাফি মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, এটা আমি জানি না। তুমি মেঘ বা অরূপকে জিজ্ঞেস করো। ওরা বিস্তারিত বলতে পারবে।“

আমি এক মুহূর্ত ভাবলাম, তারপর দৃঢ় স্বরে বললাম, “ঠিক আছে। আর শুনো, তুমি ইমরান বা অন্য কাউকেই কিছু বলবে না যে, আমি এসব জিজ্ঞেস করেছি।“

রাফি একটু দ্বিধান্বিত হয়ে বলল, “কিন্তু ঘটনা কী?”

আমি ঠোঁটে রহস্যময় হাসি এনে বললাম, “ওটা পাহাড়তলীতে গিয়েই বলবো।“

আমাদের কথাও শেষ, আর ঠিক তখনই রুবাই ফিরে এলো। হাতে পানির বোতল নিয়ে বলল, “শেষ হলো গোপন বৈঠক?”

আমি হেসে বললাম, “জ্বি, ম্যাডাম, শেষ হলো।“

রুবাই চোখ কুঁচকে বলল, “কি এমন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করলি শুনি?”

আমি গলা ঝেড়ে বললাম, “গোপন বিষয়, বুঝলি!”

রুবাই ভেংচি কেটে বলল, “থাক, বলতে হবে না।“

আমি জানি না, রুবাই আর ইমরানকে নিয়ে যা করতে যাচ্ছি, সেটা ঠিক হবে কিনা। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে, আমি সঠিক পথেই হাঁটছি। তবু মেঘের সঙ্গে এ ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলা উচিত কিনা, বুঝতে পারছি না।

প্রিয়তাকে বললে ও নিশ্চয়ই অরূপের কাছ থেকে সব জেনে নেবে। ওর ওপর এই ভরসা আছে। কিন্তু মেঘকে কিভাবে বলবো? যদি ও ইমরানকে জানিয়ে দেয়? তাহলে তো পুরো ব্যাপারটাই উল্টে যাবে!

না, কিছু একটা করতেই হবে। এভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না!

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন