ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

১৭তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)

পর্ব-১৭

ব্যঞ্জনপুরের দীর্ঘ পথচলার পর আজ আমি ক্লান্ত পাখিদের দলে। তবে তাদের গন্তব্য শেষ বিকেলের আকাশ ছুঁয়ে আপন নীড়ে ফেরা, আর আমি ফিরছি হোটেলের চার দেয়ালে বন্দি হতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সময় যেন এক অদৃশ্য তরঙ্গের মতো বয়ে গেছে, আর আমি টের পেয়েছি, শুধুমাত্র নাম শুনে কিছু বিচার করা কতটা অবিবেচকের কাজ!

কালোপুল নামটা শুনে মনে হয়েছিল কোনো পুরনো পুল বা ছোট্ট জলাশয়, কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি, এটি এক অকৃপণ ঝর্ণার নাম। প্রকৃতি যেন এ সৌন্দর্যকে নিজ বুকের গভীরে লুকিয়ে রেখেছিল, কেবল ভাগ্যবান পথিকের জন্যই তার দ্বার উন্মুক্ত করে। শীতল জলধারা, নিঃশব্দ সবুজের আলিঙ্গন আর পাথরের বুক চিরে ধাবমান স্ফটিকধারা। এ এক মোহময় দৃশ্য! সারাদিনের ভ্রমণ, খণ্ডকালীন মনোমালিন্য, কোনো কোনো মুহূর্তের আনন্দ, কিছু বিষাদের ছায়া। সব মিলিয়ে আজকের দিন যেন এক কাব্য হয়ে রইল।

তবে ক্লান্তি সবার শরীরে থাকলেও হারুন স্যার যেন ক্লান্তিহীন এক অভিযাত্রী। বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার উদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর বেজে উঠল,

"কাল সকাল ৭টার মধ্যে সবাই নাস্তা শেষ করে প্রস্তুত থাকবে। আমাদের গন্তব্য নীল পাহাড়, তিন ঘণ্টার পথ, আর সেখানেই কাটবে আমাদের পরবর্তী দিনগুলো।"

বাসভর্তি কণ্ঠ একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হলো, "জ্বি স্যার!"

কিন্তু স্যারের নজর তখন রাফির দিকে,

"ইমরান কোথায়?"

পেছনের সিট থেকে ইমরান হাত উঁচু করে জানালো, "স্যার, এখানে!"

হারুন স্যার ধীর পায়ে তার কাছে গিয়ে বললেন,

"আমিনুল স্যার চারবার আমাকে কল করেছেন। তুমি নাকি ধরছো না?"

ইমরান গলায় একটু দ্বিধা নিয়ে বলল,

"স্যার, হয়তো শুনতে পাইনি। আমি এখনই কল করবো।"

স্যার এবার আমার খোঁজ করলেন।

"আর রুশা কোথায়?"

আমি স্যারের ঠিক পেছনেই ছিলাম। শান্ত কণ্ঠে জানালাম, "জ্বি স্যার, আমি এখানে!"

স্যার ঘুরে আমার দিকে তাকালেন, চোখেমুখে একরকম কোমল অথচ দৃঢ় অভিব্যক্তি নিয়ে বললেন, "তোমার আম্মু কল করেছিলেন। বলছিলেন, তোমার সঙ্গে যেন কথা বলিয়ে দেই। আমার ফোন থেকে কল করে নাও।"

আমি এক মুহূর্ত ভেবে বললাম,

"না স্যার, আমি হোটেলে ফিরে কথা বলে নেবো।"

স্যার একচিলতে হাসলেন, মাথা নাড়লেন,

"ঠিক আছে।"

তারপর বাসের জানালার বাইরে তাকালাম। স্নিগ্ধ রাতের অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে আছে, বাতাসে ক্লান্ত দিনের স্মৃতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগামীকাল আমাদের নতুন পথচলা নীল পাহাড়ের দিকে...

হোটেলে ফিরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বারান্দার চেয়ারে বসলাম। দিনের ক্লান্তি শরীরে বয়ে বেড়ালেও মনের ভেতর যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কোথায় যেন কিছু একটা হারিয়ে গেছে, অথচ ঠিক কোথায়, সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা এমন নয় যে, মাকে খুব মনে পড়ছে। আবার এমনও নয় যে, এমন কিছু ঘটেছে, যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। মনে হচ্ছে, খাঁচায় বন্দি থাকতে থাকতে হয়তো উড়তেই ভুলে গেছি, তাই মুক্ত আকাশ দেখে একরকম ভয় পাচ্ছি!

এই শহরটা আলাদা। দিনভর নতুন গল্প শোনায়, অজানা অনুভূতিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে রাতের শহর সেটা যেন আরেক বিস্ময়! চারপাশের নরম হলুদ আলোর আভা, দূরের পাহাড়ের কালো অবয়ব, আর নিস্তব্ধতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা গোপন কোলাহল সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াজাল।

এমন সময় রুবাই এসে আমার পাশে দাঁড়ালো।

"এখানে একা বসে কি করছিস?"

আমি হালকা হাসলাম,

"শহরটাকে দেখ। কতো সুন্দর, তাই না?"

রুবাই আমার পাশে বসল, চোখ মেলে তাকাল দূরের দিকে।

"পাহাড়তলী অনেকের স্বপ্নের শহর। স্বপ্নের মতো সুন্দর না হলে কিভাবে চলবে?"

আমি জানালার গ্রিলের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে বললাম,

"নীল পাহাড় নাকি অসাধারণ?"

"হ্যাঁ, শুনেছি ঠিক স্বপ্নের মতো সুন্দর।"

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম,

"কিন্তু রুবাই, আমাদের তাঁবুতে থাকতে হবে কেন? এখানে কি হোটেল নেই?"

"ওটা খুব পুরনো এক গ্রাম, তাই সেখানে থাকার ব্যবস্থা সবার জন্য সমান। যারাই যায়, তাঁবুতেই থাকে। তবে এখন কি আছে, সেটা তো গিয়েই দেখতে হবে!"

এই বলে রুবাই চুপ হয়ে গেল। তবে তার চোখে একটা দ্বিধার ছায়া খেলা করছে। কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু শব্দের বাঁধনে আটকানো। শেষমেশ, একটু ইতস্তত করে বললো,

"রুশা, একটা প্রশ্ন করবো তোকে?"

আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,

"হুম, বল।"

রুবাই একটু থেমে বললো,

"তোরও কি মনে হয়, ইমরান আমাকে ভালোবাসে?"

ওর কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর রুবাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

"এটার উত্তর দেয়ার আগে তুই আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিবি?"

রুবাই কৌতূহলী হয়ে বললো,

"কি প্রশ্ন?"

আমি গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,

"ইমরান তোর সাথে যা যা করেছে, তারপরও তুই এখনো ওকে ঘৃণা করতে পারিস না কেন?"

রুবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। ওর চোখে একরাশ অনুভূতি খেলা করছে, কিন্তু শব্দে রূপ পাচ্ছে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন উত্তরটা তার নিজের কাছেও অজানা। আমি ওর হাতের উপর হাত রাখলাম।

"চুপ কেন?"

রুবাই ধীর কণ্ঠে বললো,

"উত্তর একটাই, আমি জানি না।"

আমি মৃদু হাসলাম।

"তুই জানিস, আমার উত্তর কি?"

রুবাই এবার আমার দিকে তাকালো।

"কি?"

আমি নরম স্বরে বললাম,

"ইমরান তোকে যতটা না ভালোবাসে, তার থেকেও বেশি তুই ওকে ভালোবাসিস।"

আমার কথায় রুবাই যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

"ভুল বলছিস, ভালোবাসতাম, কিন্তু এখন আর না।"

আমি হাসলাম।

"তুই ভুল বোঝাচ্ছিস নিজেকে। ভালোবাসার কোনো অতীত বা ভবিষ্যৎ হয় না। 'ভালোবাসতাম' বা 'ভালোবাসবো' বলার সুযোগ নেই, ভালোবাসা শুধু 'ভালোবাসি'। জোর করে কেউ ভালোবাসতে পারে না, আর জোর করেও ভালোবাসাকে ভোলা যায় না।"

আমরা এতটাই কথার গভীরে ডুবে গিয়েছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি প্রীয়তা কখন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার কথা শেষ হতেই সে এগিয়ে এলো, রুবাইয়ের পাশে বসল।

"ভালোবাসা সবাইকেই ডুবিয়ে দিল, তাই না?"

আমি অবাক হয়ে বললাম,

"তুই লুকিয়ে শুনছিলি?"

প্রীয়তা মুচকি হেসে বললো,

"তোরা এত জোরে বলছিলি, লুকানোর দরকার ছিল না!"

রুবাই এবার বললো,

"একটা স্রোত সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।"

প্রীয়তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,

"কিছু সময় স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে দেয়া উচিত। স্রোতের বিপরীতে চলার লড়াইটা অনেক সময় অযথা হয়ে যায়।"

রুবাই একমত হয়ে বললো,

"শুধু ক্লান্তিই আনে।"

আমি একটু থেমে বললাম,

"কিন্তু কিছু সময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্রোতের বিপরীতেও চলতে হয়। ভাবিস!"

তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম।

"আমি নিচে যাচ্ছি, পুলসাইডে একটু বসবো।"

আমার কথায় প্রীয়তা এক মুহূর্ত চুপ থেকে আমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রুবাইকে বললো,

"রুশা কি আমাদের উদ্দেশ্য করেই বললো শেষ কথাটা?"

রুবাই দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

"হুম, তাই মনে হলো।"

প্রীয়তা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

"যা আছে কপালে দেখা যাবে সব। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাই।"

রুবাই অবাক হয়ে বললো,

"৮টা বাজে মাত্র! এত তারাতাড়ি?"

প্রীয়তা হাসলো।

"হুম, শুভরাত্রি!"

এমন নয় যে বারান্দা থেকে আকাশ‌ সুন্দর দেখায় না। আসলে ঘটনাটা এমন যে, আমি একটু একা থাকতে চাইছিলাম। এখানকার পুল সাইডটা বেশ সুন্দর। রাতের আকাশে বাঁকা চাঁদ, তারাভরা গম্ভীর নীলিমা, আর তার নিচে নিস্তব্ধ জলের আয়না। দিনের কোলাহলে ভরা পুলসাইড, রাতের বেলায় যেন রহস্যময় নির্জনতায় মিশে গেছে। আমি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। কালোপুলের সেই দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই ঝর্ণার রূপ, সেই একাকী মুহূর্ত, আর সেই পরিচিত ছায়া...

সে চেয়েছিল বৃষ্টি হোক।

মেঘের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ বুজে এসেছে, বুঝতে পারিনি। হঠাৎ অর্ধ-ঘুমের ভেতর অনুভব করলাম কেউ যেন গভীর দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। ভারী চোখ খুলতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। ঠিক তখনই, এক নরম শুষ্ক ছোঁয়া আমার কপালে স্পর্শ করলো।

আমার শরীর মুহূর্তে শিউরে উঠলো। ধড়ফড় করে উঠে চারপাশে তাকালাম কেউ নেই! কিন্তু এই অনুভূতি... এতটা বাস্তব, এতটা গভীর! কেউ তো ছিলোই! খুব পরিচিত কেউ!

কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক মুহূর্ত দেরি না করে আমি দৌড়ে রুমের দিকে ছুটে গেলাম...

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন