#রুশ_রহস্য
#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি
গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা
(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)
পর্ব- ১৮
শহরটা আজও নতুন লাগছে, যেন অন্য কোনো দুনিয়ায় চলে এসেছি। চেনা গণ্ডির বাইরে এই জায়গাটা আমার বাস্তবতা থেকে কল্পনার এক রাজ্যে নিয়ে গেছে, যেখানে একাকিত্ব নেই, নেই নিরবতার কোনো অন্ধকার। চোখ খুলতেই শুধু ভালোবাসার হাসি মুখ চারপাশে, যেন সকালের আলোয় এক সোনালি উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে। মা থাকলে, এই কল্পনা আরও সুন্দর হতো।
গত রাতের ঘটনাটা হঠাৎই স্মৃতির দেয়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। হাতটা সোজা কপালে চলে গেল। অনুভূতিটা এখনো গায়ে লেগে আছে। একটা নরম, শুষ্ক ছোঁয়া, কোনো ঠোঁটের স্পর্শ! কিন্তু বাস্তব নাকি স্বপ্ন, সেটাই বুঝতে পারছি না। স্পষ্ট মনে আছে, খুব পরিচিত কারো অস্তিত্ব অনুভব করেছিলাম। কিন্তু সে কে? প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঝড়ের মতো বয়ে যাচ্ছে।
চিন্তাগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে চোখ খুলতেই দেখি, রুবাই ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হাতে মেকআপ করছে। ওর এই এলাহী আয়োজন দেখে আমি ধপ করে বিছানা থেকে উঠে বসে বললাম, “এতো সকাল সকাল মুখে এসব কী রঙ মাখছিস?”
আমার কথা শুনে রুবাই একদম ক্ষেপে গেল, “রুশার বাচ্চা! মেকআপকে সম্মান দিতে শেখ।“
আমি হেসে বললাম, “ও আচ্ছা! তো, কার বিয়েতে যাচ্ছিস?”
ঠিক তখনই প্রীয়তা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে হাসতে হাসতে বললো, “ও নিজের বিয়েই ঠিক করতে যাচ্ছে! ভোর চারটা থেকে শুধু ঘষছে আর ঘষছে!”
প্রীয়তার কথা শুনে রুবাই রাগে চোখ কপালে তুলে তাকাল, “একদমই মিথ্যে বলবি না! আমি তো মাত্রই আসলাম! আমার মেকআপে তোদের ঠিক কোথায় জ্বলে বল তো?”
আমি দাঁত ব্রাশ করতে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বললাম, “সত্যি কথা কী জানিস? এখানে আসার আগে প্রীয়তা যেভাবে কেনাকাটা করেছে, আমি ভেবেছিলাম ২৪ ঘণ্টা জামা বদলাবে আর সাজগোজ করবে। কিন্তু এখন দেখছি, সে এক পোশাকে সফর শেষ করার প্ল্যান করছে, আর তুই রঙ মিস্ত্রি হয়ে গেছিস!”
প্রীয়তা হেসে গড়িয়ে পড়লো, “রঙ মিস্ত্রি!”
রুবাই মুখ ভেংচি কেটে বললো, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নে আরও মজা নে! কিন্তু আমি তোদের কথায় কান দিয়ে আমার কষ্টের মেকআপ নষ্ট করবো না। তোরা যা মন চায় বল, আমি আমার কাজ করি!”
প্রীয়তা তখনই বললো, “মন ভরে কর ভাই, কিন্তু তাড়াতাড়ি শেষ কর, দয়া করে!”
আমি ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানার ওপর বসতেই প্রীয়তা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুই এলোমেলো চুল নিয়ে বসছিস কেনো? ঠিক করে বাঁধ আগে।“
আমি আয়নায় তাকিয়ে বললাম, “বুঝতে পারছি না চুল কী করবো!”
প্রীয়তা আমার পাশে এসে চুলে আঙুল চালিয়ে বললো, “তুই সব সময় চুল খুলে রাখিস। আয়, আমি তোকে উঁচু করে একটা স্টাইল করে দেই, তোর সাথে খুব মানাবে।“
ঠিক তখনই রুবাই আমার দিকে তাকিয়ে কপট গম্ভীর গলায় বললো, “প্রীয়, ওকে একটু মেকআপও করিয়ে দে, যেন মেঘের চোখ আর না সরে!”
আমি সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নেড়ে বললাম, “না! আমার ভূত হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। তুই নিজের সাজগোজ কর, প্রীয়তা তুই শুধু আমার চুল ঠিক করে দে।“
প্রীয়তা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো, “রুশা, শোন!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “হঠাৎ তোর গলার কী হলো? ফিসফিস করে বলছিস কেনো?”
প্রীয়তা নিজের মাথায় হাত দিয়ে বললো, “গোপন কথা!”
আমি চোখ কুঁচকে বললাম, “কি গোপন কথা?”
প্রীয়তা ফিসফিসিয়ে বললো, “তোর কি মনে হয়, রুবার এই অতিরিক্ত ঘষা-মাজার কারণ কী?”
আমি একটু ভেবে রুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললাম, “ওহ্! আমার তো মনে হয় ইমরানের জন্য!”
প্রীয়তা মাথা নাড়িয়ে বললো, “কিন্তু এতটা? একটু বেশিই মনে হচ্ছে না?”
আমি হেসে বললাম, “ও খুশি আছে, ওকে খুশি থাকতে দে। তুই চুল ঠিক কর।“
আসলে আর বলবোই বা কী? একটা মানুষ যদি নিজের মনের মতো সাজতে চায়, তা তো সাজুক! ভালোবাসার মানুষের সামনে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছাটা দোষের নয়, তাই না?
এই শহরটা নতুন, অনুভূতিগুলোও নতুন। আমাদের কল্পনার বাইরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো যেন ধীরে ধীরে সত্য হয়ে উঠছে...
চলবে....