ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

১৯তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

(বিঃদ্রঃ: বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না)

পর্ব-১৯

সম্পূর্ণ ব্যস্ত একটা দিন। ব্যঞ্জনপুর থেকে বাসের লম্বা যার্নি। তারপর পাহাড়ে পাহাড়ে হেঁটে এই সমতল জায়গায়। সিঁড়ির মতো সাজানো নীল পাহাড়, নীচে ছড়িয়ে থাকা এক বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। সবকিছুই যেন কোনো রূপকথার অংশ। ছোটবেলায় গল্পে পড়া জাদুর পাহাড়ের মতোই এখানকার মাটি, এক অপার্থিব নীল আভা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। এতো সুন্দর এক জায়গা, অথচ কত গুজব ঘিরে রেখেছে তাকে! মানুষের বিশ্বাসের সীমা সত্যিই বিস্ময়কর!

আমাদের তাঁবুগুলো নিজেরাই টানিয়েছি। ক্লান্তি শরীরে জমে ছিল, কিন্তু উত্তেজনা এতোটাই প্রবল যে কারো চোখে ঘুম নেই। একদিকে আগুন জ্বলছে আপন মনে, জেনারেটরের আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে, অন্যদিকে চলছে আড্ডার সুরেলা কোলাহল। কেউ ব্যস্ত ফোনের পর্দায়, কেউ আবার রান্নার স্বাদ গ্রহণের গুরুদায়িত্ব পালন করছে। অরূপ গিটারের তারে সুর তুলেছে, মেঘ তার কণ্ঠে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, বাকিরা গানের কলি খেলায় মেতে উঠেছে। ইমরান আর রুবাই লুকিয়ে লুকিয়ে একে অপরকে খুঁজছে, যেন এই বিশাল পাহাড়েও একে অপরের চোখের গভীরে হারিয়ে যেতে চায়। হাসির শব্দে আকাশ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তারাদের পাশে একা এক চাঁদ আমাদের সঙ্গী।

আমি দূরে বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই দৃশ্য কল্পনার থেকেও সুন্দর, যেন কোনো স্বপ্নের ভেতরে প্রবেশ করেছি। সময়ের হিসেব এখানে অর্থহীন, মুহূর্তগুলো যেন স্থির হয়ে গেছে। অথচ আমার মনে এক অদ্ভুত ভয়। যদি এই সময়টা হারিয়ে যায়?

আমার ভাবনার সঙ্গী হয়ে এলো মেঘ। চুপিচুপি কাছে এসে বললো, "তারা গুনছো?"

আমি হেসে বললাম, "না, চাঁদ দেখছিলাম। কিন্তু তুমি এখানে কেনো? গানের কলি শেষ?"

মেঘ হেসে বলল, "না, চলছে। কিন্তু তোমাকে অনেকক্ষণ দেখছিলাম না, তাই খুঁজছিলাম।"

আমি আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমি এমন প্রকৃতি আগে কখনো দেখিনি। সবটাই স্বপ্নের মতো, তাই ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম।"

মেঘ আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, "কিন্তু রুশা, স্বপ্নকে ছোঁয়া যায় না। এটাকে নিজের করে নিতে হয়।"

তার কথায় আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, "আমি এমন এক জায়গা থেকে এসেছি, যেখানে ফিরে যেতে চাই না। ভয় লাগছে। এই মুহূর্ত যদি ফসকে যায়! এই জায়গা, এই সময় কিছুই তো আমার না। হয়তো ভাগ্যের থেকে একটু সুখ চুরি করে নিয়েছি মাত্র।"

মেঘ আমার সামনে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বললো, "এই সময়ও তোমার, এই জায়গাও তোমার। তুমি কিছু চুরি করোনি, রুশা। এটা তোমাকে আল্লাহ্‌ দিয়েছেন।"

আমি একটা তিক্ত হাসি হেসে বললাম, "তুমি জানো না মেঘ, আমি চার দেয়ালের মাঝে বড় হয়েছি। জীবনে প্রথমবার আমি এত দূরে এসেছি।"

মেঘ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, "তাহলে তো আরও বেশি করে বর্তমানকে অনুভব করা উচিত। রুশা, অতীত বদলাতে পারবে না, ভবিষ্যতও জানতে পারবে না। কিন্তু আজকের দিনটাকে তুমি নিজের মতো করে সাজাতে পারো। দেখো চারপাশ, সবাই কত হাসিখুশি! সবাই নিজের মতো করে সুখ কুড়িয়ে নিচ্ছে। অথচ তুমি? নিজের ভেতর বন্দী হয়ে আছো। এই মুহূর্তগুলো যদি হারিয়ে যায়, আগামীকাল তোমার কাছে কি থাকবে?"

আমি মেঘের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম, "তাহলে এখন কী করা উচিত?"

মেঘ হাসলো, তার চোখের তারায় যেন নক্ষত্রের আলো ঝলসে উঠলো। "নিজেকে প্রশ্ন করো, তুমি কী চাও? যদি উত্তর না পাও, তাহলে তাকিয়ে দেখো চারপাশে। সময় থেমে নেই, সবাই নিজেদের আনন্দ নিজেরাই ছিনিয়ে নিচ্ছে। আমরাও কি একটু স্মৃতি কুড়িয়ে নিতে পারি না?"

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মেঘ যেন আমার ভেতরের জমে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিছু বলতে পারলাম না।

মেঘ মৃদু হাসলো, "এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?"

আমি চোখ সরিয়ে বললাম, "কিছু না।"

মেঘ বলল, "তোমার চোখ বলছে তুমি নিজের সাথে যুদ্ধ করছো, রুশা।"

আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "মানে?"

মেঘ হাসলো আমি ওর গাঢ় টোল পড়া গালে বেরিয়ে আসা গজ দাত গুলো গভীর ভাবে পর্যালোচনা করলাম, মেঘ অনায়াসে বলল, "মানে হলো, সময় চলে যাচ্ছে। সবাই আনন্দ করছে, আর আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দেখছি। আমাদের ঝুড়িতেও কিছু সুখের স্মৃতি দরকার, তাই না? চলো, স্মৃতি কুড়াই!"

মেঘের প্রতি আমার দুর্বলতা যে ভয়ংকরভাবে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আজ সে যেন শব্দের জাদুকর হয়ে উঠেছে, তার প্রতিটি বাক্য যেন আমাকে এক নতুন জগতে প্রবেশ করাচ্ছে।

কীভাবে একটা মানুষ এত নিখুঁত হতে পারে? হয়তো ভালোবাসাই মানুষের চোখে মানুষকে নিখুঁত করে তোলে। হয়তো এই অনুভূতিটাই ভালোবাসা।

আমি জানি না। সত্যিই জানতেও চাই না। শুধু জানি, দুঃস্বপ্নেও মেঘকে হারাতে চাই না। ওর প্রতিটি কথা, প্রতিটি হাসি যেন এক মায়াবী বাঁধনে আমাকে বেঁধে ফেলেছে। যদি এই মুহূর্তকে থামিয়ে রাখা যেত, আমি আজীবন বর্তমানে বাঁচতাম।

আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে অনুভব করলাম, হারিয়ে গেলে খুঁজে নেওয়ার মতো কেউ আছে। মন ভালো করার দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ আছে। আমি এতক্ষণ অকারণেই মন খারাপ করছিলাম।

যা আছে, এখন আছে, এখানেই আছে।

আমার মেঘ আছে।

সারারাত একা বসে থাকতেও রাজি আমি। চারপাশের নিস্তব্ধতা, হিমেল বাতাসের আলতো ছোঁয়া, আর ক্লান্ত আগুনের ক্ষীণ শিখা। এ যেন এক অন্য জগৎ। মেঘ যদি পাশে থাকত, তবে জন্মান্তর কাটিয়ে দিতে পারতাম এখানে। জায়গাটা অদ্ভুত, আধুনিক সব সুবিধা থাকলেও থাকতে হয় তাঁবুতেই। তবে প্রকৃতির এত কাছে আসার অনুভূতিটাই অন্যরকম।

সবাই তাঁবুর মধ্যে, গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ হয়তো প্রিয়জনের সঙ্গে ফোনে ব্যস্ত। আমি হাতে একটা ছোট লাঠি নিয়ে জ্বলন্ত কয়লার রহস্য বোঝার চেষ্টা করছি, উপরে ঝুলছে ক্ষীণ আলোয় জ্বলা বাতি। প্রকৃতিও যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, এমন সময় পেছন থেকে শোনা গেল রাফির তীক্ষ্ণ আওয়াজ, "এই মেয়ে এই! রাত বাজে দুটো আর তুমি এভাবে বাইরে কি করছো?"

সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ রাফির স্বর শুনে আমি এতটাই চমকে উঠলাম যে নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম,

“আল্লাহ! রাফি! ভয় পেয়ে গেছিলাম! এই রাতে তোমার কী কাজ বাইরে?”

রাফি ঠাণ্ডা গলায় চশমা ঠিক করে বলল,

“আমি তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে এসেছি। কিন্তু তুমি একা এখানে কী করছো?”

আমি একটু হাসি চেপে বললাম,

“তাঁবুর মধ্যে প্রথমবার ঘুমানোর অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তাই একটু দম বন্ধ লাগছিল। বাইরে এসে হাওয়া খাচ্ছিলাম।“

রাফি খুশি হয়ে বলল,

“ভালোই হয়েছে। রুশা, আমার সঙ্গে একটু যাবে? টয়লেটের বাইরে দাঁড়াবে, আমি দুই মিনিটেই চলে আসব।“

রাফির কথা শুনে চোখ কপালে তুললাম,

“রাফি! তুমি তো ছেলেমানুষ! একটা মেয়েকে টয়লেটের বাইরে দাঁড়াতে বলছো?”

রাফি মুচকি হেসে বলল,

“কেন? মেয়েরা টয়লেটের বাইরে দাঁড়াতে পারে না? নাকি ছেলেদের ভূতে ধরে না?”

আমি হেসে বললাম,

“ভূত? এখানে ভূত! ভূত তো জানি না, তবে একটা পেত্নি আছে, শুধু তোমার জন্য!”

রাফি মুখ গম্ভীর করে বলল,

“ভূতদের নিয়ে মজা করতে নেই, যদি রেগে যায়!”

আমি হাসতে হাসতে বললাম,

“হ্যাঁ, ভূত তো তোমার শ্বশুর। যদি রেগে যায়, তাহলে তার মেয়ে পেত্নির সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে না!”

রাফি হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

“তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল! প্লিজ, চলো না রুশা।“

চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই আমি ছাড়া কেউ নেই। আর রাফির যে ভূতের ভয়, ওকে একা ছাড়া ঠিক হবে না। তাই উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,

“কি ঝামেলা! ঠিক আছে, চলো!”

টর্চ লাইট হাতে নিয়ে রাফির সঙ্গে হাঁটা শুরু করলাম। টয়লেটটা একটু উঁচুতে, প্রায় ষোলোটা সিঁড়ি ভাঙতে হয়। মাত্র তিরিশ সেকেন্ড হাঁটার পরই রাফি ফিসফিস করে বলল,

“রুশা, তুমি চুপ থেকো না! কিছু না কিছু বলো, যাতে আমি বুঝতে পারি তুমি আছো!”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,

“উফ্, রাফি! তুমি কী যন্ত্রণা, আল্লাহ!”

টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়াতেই রাফি আবার বলল,

“রুশা, চুপ থেকো না! আমার ভয় লাগবে!”

আমি মাথায় হাত দিলাম। কী বিপদ! কে জানত, জীবনে একদিন একটা মেয়ে একজন ছেলেকে ভূতের হাত থেকে রক্ষা করতে পাহারা দেবে!

হঠাৎ টয়লেটের ভেতর থেকে আবার রাফির চিৎকার—

“রুশা! কোথায় তুমি? কিছু বলো!”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,

“আমি আছি! আচ্ছা, রাফি, তোমার একটা সাহায্য দরকার ছিল আমার!”

ভেতর থেকে রাফি অবাক কণ্ঠে বলল,

“আমার! কী সাহায্য?”

আমি বললাম,

"আগে বাইরে এসো বলছি তারপর।"

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন