ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

১ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

১.

পৃথিবীর সব সখ, চাহিদা, সৌন্দর্য ফিকে পড়ে যায় আমাদের মনের অসুস্থতার কাছে। যখন অবসন্নতা আমাদের তাদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়, প্রকৃতি তার অপার্থিব সৌন্দর্য দিয়েও আমাদেরকে অকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। রুশা তার ভঙ্গুর প্রায় অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সব থেকে অমিমাংসিত রুপের সামনে। সমুদ্র গর্জনে তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাইলেও তার মনের আকাশের কালো মেঘ কোন অনুভূতি গ্রহনে প্রস্তুত নয়।

হঠাৎই আরো ঝরো হাওয়া ছুটে এলো, সমুদ্রের বুক কাঁপিয়ে দিয়ে। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নেমে এল নিঃশব্দ অভিমান নিয়ে। তবে রুশা অনুভূতিহীন ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সমুদ্রের শেষ বালুকায়। বৃষ্টি রাশি তার হিস্রতা বাড়ালো। এই জলধারা রুশার শুভ্র শরীরকে আরও শুভ্র করে তুলেছে। শীতের কাঁপনও তার মনের জঞ্জালকে শান্ত করতে ব্যর্থ। ঠিক সেই মুহূর্তে, এক অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি নীরবে এগিয়ে এলো বৃষ্টির তীক্ষ্ণতার মাঝে। রুশার মাথার উপর সে যেন আশ্রয় হয়ে দাঁড়ালো। রুশা ফিরে তাকায়। একেবারে কাক ভেজা হয়ে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অপ্রত্যাশিত পুরুষটাই তার সব থেকে প্রত্যাশিত পুরুষ মেঘ‌। রুশা শুধু এক নজরে তাকিয়ে রইল মেঘের মুখাবয়কের দিকে।

মেঘ ঠান্ডা চাহনিতে বলল, “জীবনের সব থেকে বড় সুখের বিষয় কি জানো? … কোন দুঃখই চিরস্থায়ী নয়। এই সময়টাও কেটে যাবে। কিছু সময় আমাদের পরীক্ষা নিতে আসে। মেনে নাও, না হয় মানিয়ে নাও‌‌।”

রুশা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েই দাঁড়িয়ে থাকলো। হয়তো কিছু বলার শব্দ গোছালো। এরপর ভঙ্গুর স্বরে বলল, “আমি খুব পাখি হতে চাইতাম। পিঞ্জর থেকে মুক্তি চাইতাম। আজ আমি মুক্ত। তবে এ কেমন চাহিদা যা আমি আজ চাই না! আমি কোন মুক্ত জীবন চাই না‌!”

মেঘ ছাতাটা শক্ত হাতে ধরে রাখে রুশার মাথার উপর। রুশার চোখ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে অবাধ্য। বৃষ্টির গতি আরো বাড়তেই দূর থেকে দৌড়ে ছাতা মাথায় এগিয়ে এলো রুবাই। রুশা অবাক হয়ে তাকায়। রুবাই সামান্য চেঁচিয়ে বলল, “তোর কি মরার সখ জেগেছে? হাসপাতাল থেকে সোজা এখানে এসেছিস। শরীরের দূর্বলতাও যায় নি। আর এখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিস?”

রুশা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “তুই এখানে?”

রুবাই বলল, “আমি একা না। বাবা-মা ও এসেছেন। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।” রুবাই এবার মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাকে না রুশাকে আনতে পাঠালো সবাই। তুমি দেখি বৃষ্টি বিলাসে ব্যস্ত!”

মেঘ রুবাইয়ের কথার কোন প্রতি উওর করলো না। রুশা কদম বাড়িয়ে বলল, “আয়ু থাকতে কেউ মরে না রুবাই। আমিও মরবো না।”

রুবাই হেসে বলল, “আমি চাই আল্লাহ তোর লম্বা জীবন দান করুক।”

রুশা শুধু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সমুদ্রের কিনারা ছেড়ে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে। মেঘ শক্ত কদমে এগোলা রুশা আর রুবাইয়ের পিছু। সমুদ্র থেকে বাড়িটা দূরত্ব পঁচিশ তিরিশ কদম। বাড়িটার দিকে তাকাতেই আবারো রুশার কদম নড়বড়ে হলো। এই বাড়িটা কেবল চার দেওয়ালের নয়, এটা তার বাবা-মায়ের অসম্পূর্ণ জীবনের একমাত্র সাক্ষ্য। এ বাড়িই তার সমুদ্র-প্রেমী মায়ের শেষ নিশানা। রুশা যেন সদ্য জন্ম নেয়া এক শিশু। সে মাত্র পরিচয় হচ্ছে তার প্রকৃত জীবনের সাথে। সব নতুন। এ যেন পুরোনো জীবনের সব মুছে এক নতুন জন্ম। রুশা তার জীবনের সব হারিয়ে নিজের এই পরিচয় টুকু পেয়েছে। তার জীবনের কাটানো মিথ্যে কুড়ি বছর ধোঁয়াশায় মিলিয়ে গেছে।

রুবাই এগিয়ে গিয়ে দরজা ঠেলে দিল। পুরোনো কাঠের দরজাটা আওয়াজ করে খুললো। রুশা নিঃশব্দে থেমে গেল দোরগোড়ায়। মেঘ একটু দূরে খুব ধীরে এগোচ্ছে। রুশা কদম বেশি সময় থামলো না। দোরগোড়া পেরিয়েই আবার থমকে দাড়ালো সে। নিচতলার বসার ঘরটা পরিচিত অপরিচিত ভিড়ে জমে উঠেছে। উপস্থিত ব্যক্তি বর্গের মাঝে শাফিন আহমেদ আর শাহরিয়ার শেখকে চিলনেও বাকি কাউকেই চেনে না রুশা।

রুশা সদর দরজা পেরোতেই সোফা থেকে উঠে এগিয়ে এলেন একজন মহিলা। গায়ে সনাতনী ঢঙে শাড়ি, কানে বিশাল কানপাশা, হাতে মোটা সোনার বালা, আর নাক-গলায় সোনার এমন ছড়াছড়ি যে, চোখ সরিয়ে নেওয়া দায়। তার ভঙ্গিমা, সাজসজ্জা দেখে যে কেউ প্রথমেই ভাববে সম্ভবত কোনো হারিয়ে যাওয়া জমিদারবাড়ির গিন্নি, যিনি হঠাৎ সময়ের দেয়াল ভেঙে এই বসার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছেন। মহিলার ঠোঁটে স্নেহের হাসি, চোখে অনাবিষ্কৃত রহস্য। তিনি ধীর পায়ে রুশার দিকে এগিয়ে এলেন, যেন বহুদিনের অচেনা কোনো দাবি মিটিয়ে নেওয়ার সময় এসে গেছে। রুশার ভেজা গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বললেন, “নীলিমা? শাহ্জিন ভাইয়ের মেয়ে?”

মহিলাটির চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম হলো। রুশা অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে রইল এই পঞ্চাশের ঘরের নারীটির চোখের দিকে। রুবাই পেছন থেকে এগিয়ে বলল, “রুশা এনি আমার মা। সম্পর্কে তোর বড় চাচি। তোর বড় মা।”

মহিলাটা আর কোনো কথা না বলে রুশাকে জড়িয়ে ধরলেন শক্ত ভাবে। রুশা কিংকর্ত্যব্যবিমূর্ত হয়ে তাকিয়ে রইল। সে যে, এই সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মাকড়সার জালের মত সম্পর্কে জড়িয়ে আছে তার খোঁজ তো তার জানাই ছিল না। মহিলাটি শাহরিয়ার শেখের সহধর্মিণী আনজুম আরা বেগম। শুধু রুপ কিংবা সাজে নয় তিনি প্রকৃতি অর্থেও জমিদার গিন্নি। রুশা কক্ষজুড়ে থাকা প্রতিটা মানুষের দিকে চোখ মেলে দেখলো। তার ঠিক বরাবরের সোফায় বসে আছেন শাফিন আহমেদ। সম্পর্কে এই মানুষটা তার মামা। পরিপাট্য রুপ সম্পূর্ণ আধুনিক। সুট প্যান্টের জ্যান্টালম্যান। এই লোকের পাশের সোফায় বসে আছে সেই নারীটি যাকে সে কিছু প্রহর আগে সমুদ্রের কোনটায় দেখেছিল। যে তাকে কাঁদার জন্য ছেড়ে এসেছিল। বয়স যেন তার মুখাবয়বকে স্পর্শ করেও করতে পারেননি। তার শাড়ির ভাঁজে পর্যন্ত আধুনিক ছোঁয়া ছড়িয়ে আছে। ঠিক তার পাশের সোফায় বসা একজন সওর কিংবা পঁচাত্তরের ঘরের বৃদ্ধা। তূখর চোখ ধাঁধানো রুপ ছিল বোধহয় বয়স কালে। এখনও তার রুপের ভঙ্গুর প্রায় রেশ রয়ে গেছে। ধূসর সাদা মোটা পাড়ের শাড়িতে মোড়ানো তিনি। কানে হাতে সোনার স্পর্শ দৃশ্যমান। বয়স যতই হোক, চোখে মুখে এক দৃঢ়তার আভাস এখনো স্পষ্ট। এই বৃদ্ধ নারীটির পিছে দু'জন অল্প বয়স্কা মেয়ে দাড়িয়ে আছে। খুব সাদামাটা পোশাকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়ে দুটি হয়তো এই নারীটির দেখাশোনা করার জন্যই রাখা। এই বৃদ্ধার পাশের সোফায় বসে আছেন সাদা পাঞ্জাবিতে একজন অপরিচিত ব্যাক্তি। চোখ মুখে চরম চতুরতা দৃশ্যমান। রুশা এনাদের কাউকেই চেনে না। রুশার এই নিরীহ দৃষ্টিতে চেনার চেষ্ঠার মাঝেই শাহরিয়ার শেখ তার ভারি আওয়াজে বললেন, “গিন্নি সাহেবা ছাড়ো এবার রুশাকে। আমার মেয়েকে এদিকে পাঠাও। বসতে দাও একটু।”

আনজুম আরা বেগম নিজের চোখটা মুছে বললেন, “মেয়েটা একেবারে ভিজে গেছে। আগে কাপড় বদলে আসুক।” রুশাকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই তিনি রুবাইকে বললেন, “ওকে নিয়ে যাও। পোশাকটা বদলিয়ে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো।”

রুবাই হুকুম মানার মতো রুশাকে নিয়ে এগোলো। কয়েক মিনিট পেরোতেই পোশাক বদলে রুশা নিচে নেমে এলো। বসার ঘরের একটা সোফার পাশে নিশ্চুপ বসলো। একে একে পরিচয় পর্ব শুরু হলো। শাহরিয়ার শেখ নিজেই পরিচয় করিয়ে দিলেন সকলের সাথে। উপস্থিত সত্তর থেকে পঁচাত্তরের ঘরের নারীটি সম্পর্কে রুশার দাদি হয়, রুপমনি বেগম। তার বাবার সৎ মা এবং শাহরিয়ার শেখের মা। এই বৃদ্ধা নারীর পাশে রয়েছেন পঞ্চাশের ঘরের ব্যক্তি আশরাফ আলী। তিনি সম্পর্কে রুবাইয়ের মামা। একই সাথে শাফিন আহমেদের পাশের সুন্দরী নারীটি কাঁকন সুলতানা। সম্পর্কে রুশার মামি এবং মেঘের মা। রুশা শুধু চুপচাপ বসে রইলো। সম্পর্কের এই ওজন গুলো তার কাছে বড্ড ভারি লাগলো। সে বার বার নিজের চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। রুশার বন্ধ চোখে যেন বারবার খেলে যাচ্ছে তার সমগ্র মিথ্যে জীবন। সে তার মিথ্যে জীবনে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, এই সত্য জীবনের আড়ম্বর বিষাক্ত লাগছে। সব আপন মানুষের মাঝেও সবাই যেন অচেনা, খুব পর। উপস্থিত সবাই ব্যস্ত রুশা এখন কার কাছে থাকবে যেই তর্ক বিতর্ক নিয়ে। একটা ছোট মাংস পিন্ডকে নিয়ে যেন তারা লড়াই চালাচ্ছে। তবে রুশা সে কোথাও যেতে চায় না। সে থাকতে চায় যে মা আদরে বড় করেছে সেই মায়ের ভাড়ার দুই কামরার ফ্লাটে আর না হয় তার আসল বাবা মায়ের সাজানো এই বাড়িটাতে। তবে তার এই চাহিদা আজ কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়।

রুশা আজ ঠিক কার কাছে অভিযোগ করবে? জীবনটা তো এমন হবার প্রয়োজন ছিল না। সব কিছু গোছানো সাজানো হতে পারতো। সে এখন যে বাড়ির বসার ঘরে বসে আছে। এই বাড়ির আঙ্গিনায় তার বেড়ে ওঠা হতে পারতো। শশী রহমান তো তার খালার পরিচয়ে থেকে যেতে পারতেন। তাহলে দুটো বাচ্চা তাদের আসল বাবা মায়ের ভালোবাসা পেয়ে যেতো। কি প্রয়োজন ছিল এই গুপ্তধন রহস্যের উন্মোচন! রুশা যদি আগে থেকেই জানতো এই রহস্য ভাঙ্গার ফলে তার নিজের জীবনটাই এভাবে বিছিয়ে যাবে, তবে কি সে এই রহস্যের উন্মোচন চাইতো?

রুশের রহস্য সমাধান হয়ে গেল। শাফিন আহমেদের ঘাড় থেকে খুনী হবার তকমা চলে গেল। রুশা প্রকৃত পরিচয় পেল, এ ছাড়া আর কি? আর কিচ্ছু না‌। ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এলো হারিয়ে যাবার ষোল বছর পর। তবে সে ঘর কোথায়? ঘরই তো হারিয়ে গেছে।

সকলের চেঁচামেচি আরো উচ্চস্বরে বাড়লো। রুশা ঘোর কাটিয়ে উঠে নড়েচড়ে বসলো। শাহরিয়ার শেখ আর শাফিন আহমেদের মাঝে তুমুল কথা কাটাকাটি চলছে। শাফিন আহমেদ বললেন, “হামজা রুশার কাস্টাডি আমার উপরে দিয়ে গিয়েছিল। রুশা আমার সাথে ওর নানার বাড়ি ফিরবে।”

শাহরিয়ার শেখ চেঁচিয়ে বললেন, “সে কেমন তুমি তা পালন করেছো তা তো দেখেছি। তোমার আরেক বোন চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল রুশাকে। আমার ছোট ভাইয়ের এক মাত্র আমানত রুশা। আমি কিছুতেই সেই আমানত আর খেয়ানত করতে পারবো না‌। আর তাছাড়া হামজার শেষ ওয়াদা অবশ্যই তোমার মনে আছে শাফিন‌।”

শাফিন আহমেদ একেবারে চুপ করে যান। তার জুবানে যেন তালা লাগিয়ে দিয়েছেন শাহরিয়ার শেখ রুশার বাবার শেষ ওয়াদার কথা মনে করিয়ে। তিনি একবার শুধু তার সহধর্মিণী কাঁকন সুলতানার চোখে তাকান। এতো চেঁচামেচির মাঝেও কাঁকন সুলতানা একটি শব্দ কাটেনি দাঁতে।

রুপমনি বেগম এতো সময় সকলের বক্তব্য, চেঁচামেচি শুনছিলেন মাত্র। এবার তিনি একপ্রকার বলে শক্ত জবানে বলে উঠলেন, “রুশা শেখ বংশের মেয়ে, শাহ্জিনের এক মাত্র উত্তরসূরী। এত বছর পর বাড়ির মেয়ে বাড়ি ফিরেছে। রুপমহলের থেকে বেশি সুরক্ষিত জায়গার রুশার জন্য আর কোনোটিই নয়। সে তার বাপের ভিটায় ফিরবে। আমি রুশার দাদী জীবিত আছি যতদিন, ততদিন এসব নিয়ে কোন বিতর্ক চাইছি না।”

রুশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রুপমনি বেগম কড়া নজরে তাকিয়ে বললেন, “এখন অব্দি আমি বেঁচে আছি। তোমার বাবা কোনদিন আমার মতামতের উপরে দ্বি-মত পোষণ করার সাহস দেখায় নি মেয়ে। সম্পর্কে আমি তোমার দাদী হই। অন্ততপক্ষে এতোটুকু সম্মান তোমার কাছে আশা করতে পারি।”

রুশা একেবারে চেপে গেল। চুপটি করে নিজের স্থানেই মাথা নিচু করে বসে রইল। কিছু সময় পর মাথা তুলে তার ঠিক সোজা বরাবর সোফায় বসা মেঘের চোখের দিকে তাকালো। মেঘ এক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুশার দিকে। হয়তো সে তার দৃষ্টি দিয়ে ধাতস্থ করতে চাইছে রুশাকে, সমগ্র পৃথিবী রুশার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই মানুষটা শুধু তার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকবে।

শাহরিয়ার শেখের কণ্ঠে আর কোনো দ্বিধা রইল না। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে দৃঢ় স্বরে বললেন, “চল রুশা, তোমার জায়গা এখানে নয়। এবার তোমার বাবার বাড়িতে ফেরার পালা।”

রুপমনি বেগমের কড়া বাক্যব্যয়ের পর আর কারো সাহস হলো না আপত্তি করার। শাফিন আহমেদ শুধু চুপ করে বসে রইলেন। কাঁকন সুলতানা এবার উঠে দাঁড়ালেন। একটু এগিয়ে এসে রুশার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, "আমি তোমার মামনি হই। ছোট বেলায় তুমি আমাকে মামনি বলতে। নিজের দাদার বাড়িতে যাচ্ছো সে যাও। তবে মনে রেখো তোমার মামা আর মামনি তোমার জন্য আছে‌। শুধু একটাবার স্বরন করলেই তোমাকে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবো। তুমি একা নও ছোট রাজকুমারী।"

রুশা অপলক তাকিয়ে শুধু শুনলো কাঁকন সুলতানার আদুরে শব্দ। তার মস্তিষ্কে এই নারীটিকে নিয়ে কোন অতিত স্মৃতি নেই। তাও একটা আপন ব্যপার আছে। এই আপন ব্যপারের কারন কি মেঘ? সে কি এই নারীটাকে তার ভালোবাসার মানুষের মায়ের রুপে বিচার করছে? নাকি এই নারীর মায়ায়? রুশা কোন কথা না বলে একবার মেঘের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসলো।

হাসপাতালের দীর্ঘ সাতদিনে ভেঙে পড়া শরীরটা এখনো ভঙ্গুর, তবুও গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার জন্য চোখ মেলে তাকালো রুশা। শহরের ভিড়, পেরিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি এগিয়ে গেল জনমানবহীন পথে। চারদিকের দৃশ্যপট ক্রমে বদলে যেতে লাগল। উঁচু দালান বদলে গেল শতবর্ষী বটগাছ। কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি থামল এক বিশাল লোহার ফটকের সামনে। দুজন দারোয়ান দৌড়ে ফটক খুলতেই সামনে উদ্ভাসিত হলো এক বিরাট প্রাসাদসদৃশ বাড়ি। পুরোনো গাঁথুনি হলেও নতুন রঙে ঢেকে গেছে শতবর্ষী ক্ষত, খিলানওয়ালা জানালা, প্রাচীন কারুকার্যময় বারান্দা। বাড়ির বাইরেটায় বিশাল বাগান। গাড়ি থেকে নেমেই রুশা অবাক বিস্ময়ে একেবারে থমকে রইল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠেছে। এমন রাজ প্রাসাদের দেখা সে শুধু টিভি সিনেমায় পেয়েছে। রুশার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে শাহরিয়ার শেখ মৃদু হেসে পাশে দাঁড়িয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, “এটাই তোমার বাড়ি, রুশা।”

রুশা শুধু থমকে তাকিয়ে রইল মহলের দিকে। তার মুখে চোখে কোন খুশি নেই। এই মহল তাকে বিলাসিতা দিয়ে আকৃষ্ট করতে পারলেও সুখ অনুভব দিচ্ছে না। তখনই পেছন থেকে রুবাই এগিয়ে এসে হেসে বলল, “কি রে, এতো অবাক হলে চলবে নাকি? এখন তো জমিদারির কিছুই নেই। দাদিআম্মার কাছ থেকে শুনেছি, আগের দিনে নাকি এখানে বেশ জমজমাট ছিল। সাদা ঘোড়ার গাড়ি, উৎসব, মেহমান সবকিছুতেই টইটম্বুর থাকত এই রুপমহল।”

রুশা নির্বাক দৃষ্টিতে শুধু দেখতে থাকল। ধিরে ধিরে সকলে মহলের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করল। রুশাও বাকি সকলের পিছু এগোলো। বিশাল দরজার মাথায় সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা পাথরের ফ্রেম, আর ভেতরে পা রাখতেই তার চোখ আটকে গেল ঝাড়বাতির দিকে। পুরোনো কাচের তৈরি ঝাড়বাতি, এখনো মাথা উঁচু করে ঝুলছে ছাদের মাঝখানে। কিছু কাচ ভেঙে গেছে, তবুও এর আভিজাত্য যেন লুকোনো যায় না। মেঝেটা পুরো সাদা-কালো মার্বেলের নকশায় সাজানো, যদিও কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা দাগ স্পষ্ট। বড় বড় কাঠের দরজা, ভারী পর্দা, আর সিঁড়ির ধাপে ধাপে পিতলের রেলিং। ভেতরের একপাশে বিশাল ড্রয়িংরুম, দেয়ালে পুরোনো ছবির ফ্রেম। সেখানে ঝোলানো আছে অনেক ছবি, তার বাবা মায়ের ছবিও দৃশ্যমান। রুশা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুধু দেখে গেল। তার মনে হচ্ছে সে এ বাড়ির আভিজাত্যের কাছে খুব বেমানান। তার জীবন কেটেছে ছোট একটা দু কামরার ফ্লাটে। হুট করে তার এই জমিদার বাড়ির মেয়ে হয়ে ওঠাটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না সে। তার জীবনের, তার সাথে করা তামাশাটা সে ঠিক কিভাবে গ্রহণ করবে সেটাই বুঝে উঠছে না রুশা। তখনই শাহরিয়ার শেখ গম্ভীর কর্তৃত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে গলা তুললেন, “কোথায় সবাই।”

এই বজ্রের মতো গর্জন শুনে উপস্থিত সবাই তার দিকে ফিরে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ভরে গেল কয়েকটা অপরিচিত মুখে। শাহরিয়ার শেখ সোজা দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন,

“শুনে রাখো সবাই, এ হচ্ছে তোমাদের ছোট বিবি। এ বাড়ির ছোট ছেলে, আমার ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে। আমাদের ছোট রাজকুমারী। ওর যত্নে সামান্যতম অবহেলা আমি সহ্য করবো না।"

সমগ্র উপস্থিত লোকেরা আঙ্গা পালনের মতোই দাঁড়িয়ে থাকলেন। শাহরিয়ার শেখ একবার কঠোর দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রুশার কামরা কি পরিষ্কার করা হয়েছে?”

একজন বয়স্ক ব্যক্তি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “জি… হুজুর, সব প্রস্তুত। ছোট বিবির ঘর তৈরি।”

শাহরিয়ার শেখ হাত তুলে ইশারা করলেন, “তাহলে নিয়ে যাও ওকে। ওর জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখো। বছর পেরিয়ে বাড়ির মেয়ে বাড়িতে ফিরেছে।”

কাজের লোকেরা তৎপর হয়ে উঠল। রুশা রুবাইয়ের দিকে ফিরে তাকাতেই রুবাই দৌড়ে এসে রুশার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "ভয় পাস না। আমি আছি তো।"

রুবাইয়ের এই সামান্য ভরসাটুকুই যেন রুশাকে কদম বাড়ানোর শক্তি দিল। রুশা কয়েক কদম ফেলতেই রুবাই আবার বলল, "সবাই আমাকে বড় বিবি বলে। তাই তুই ছোট বিবি‌। এ বাড়িতে কারো নাম ধরে কেউ ডাকে না। বিষয়টা একটু অদ্ভুত কিন্তু তারপরও তোর অভ্যাস হয়ে যাবে।"

রুশা চুপচাপ শুধু শুনতে থাকলো। তার কোন জ্ঞান বুদ্ধিই কাজ করছে না যে, তার এখন ঠিক কি করা উচিত।

________________

চলবে........

#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ

#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)

#সাদিয়া_তিন্তি

__________________

যারা এখনো রুশ রহস্যের প্রথম পরিচ্ছেদ পরেন নি, তাদের জন্য লিংকটা থাকলো- https://www.facebook.com/share/p/1EHEBeGRuL/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন