ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৩১তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৩১.

রুশা ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ এভাবেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। ঘরের বাতাসটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠেছে। শেহতাজ লোকটা বিপজ্জনক, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন রুশার কাছে বড় প্রশ্ন, বড় আতঙ্ক শেহতাজ নয়, মেঘ। এখন সব রহস্য থেকে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে মেঘ নিজে।

মেঘ থানায় গিয়েছে ভালো কথা, সেটার পিছে কি এমন থাকতে পারে যেটা সে লুকাচ্ছে? মেঘের প্রতিটা প্রতিক্রিয়া রুশার চেনা। রুশার এখন ভয় হচ্ছে। রুশার তো মেঘ ছাড়া কেউ নেই। ওর ভাগ্য যে ওর সব থেকে বড় শত্রু। রুশার গলা শুকিয়ে এলো। পৃথিবীর সব একদিকে সরে গেলো আর একা মেঘ অন্য দিকে দাঁড়িয়ে পড়লো যেন। রুশা ফোনটা উঠিয়ে মেঘকে কল লাগালো কিন্তু কলটা রিং হবার আগেই রুশা কেটে দিলো। মেঘের যদি বলার থাকতো তবে মেঘ লুকাবে কেন?

রুশা বেশ কিছুক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে রইলো। তার বুকের মাঝে অদ্ভুত একটা চাপা কাঁপুনি, এমন কাঁপুনি যে শেহতাজ, প্রীয়তার বাবার সতর্কতা, এসবও সব অমিমাংসিততা ঢেকে দেয়। পুরো পৃথিবীর সব রহস্য মিলেও তার মনের মেঘটাকে ছাপাতে পারে না। মেঘ… সে কি লুকাচ্ছে?

রুশা মেঘকে বছর ধরে চেনে। মেঘের প্রতিটা বিরক্তি, প্রতিটা হাসি, প্রতিটা মুখভঙ্গি, প্রতিটা ভালোবাসা তার মুখস্থ। রুশার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। রুশা আরো একবার কল দিলো মেঘকে। কিন্তু রিং হওয়ার আগেই আবারো কেটে দিলো।

কিছুক্ষণ নির্বিকার হয়ে বসে থাকার পর ইমরানের নাম্বার ডায়াল করলো। মেঘের সব ছায়া সঙ্গি তো ইমরান। তবে মেঘের অনিচ্ছায় ইমরান যে একটা শব্দও উচ্চারণ করবে না, এসব রুশার অজানা নয়। তবে, ইমরানের নাম্বার ব্যস্ত। রুশার বুকের অস্থিরতা আরো চেপে ধরলো ওকে। ঠিক তখনই, রুবাই ঘরের দরজায় নক করলো। রুশা কিছু না ভেবেই উঠে দরজা খুলে দিল। রুবাই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই ফিসফিসিয়ে বলল, “কাজ হয়ে গেছে।”

রুশা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রুবাই জামার পকেট থেকে একটা পুরোনো রুপালি চাবির গোছা বের করলো।

রুশা বিস্ময়ে বলল, “এটা…?”

রুবাই একটা চতুরতার হাসি দিয়ে বলল,“দাদা সাহেবের ঘরের চাবি। কোনটা ওই ঘরের চাবি, তা তো জানি না তাই পুরো গোছাটাই নিয়ে এসেছি।”

রুশা অবাক হলো। রুবাই যে এই চাবির গোছাটা আনতে পারবে এটা নিয়ে রুশার সন্দেহ তো ছিলই। রুশা জিজ্ঞেস করল, “চাবিটা আনলি কি করে?”

রুবাই গলা নামিয়ে নাটকীয়ভাবে বলতে শুরু করলো, “শোন টাকার নাম ওস্তাদ। ভাইয়া বলে, টাকা নাকি ভালো ভালো মানুষকে বেইমান করে দেয়। আর আমি শুধু সেই উপায়টাই কাজে লাগিয়েছি। দাদিআম্মা নামাজ কক্ষে ছিলেন। উনারই এক বিশ্বস্ত সাহায্যকারীকে একটা চাবির গোছা আনার জন্য নগদ ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। দুই মিনিটে কাজ শেষ। তবে এটা ফজরের আগে আবার রেখে আসতে হবে। কারণ এটা মাঝে ঠিক কোথার কোথার চাবি আছে সেটা তো বলতে পারছিনা।”

রুশা রুবাইয়ের কথা শুধু শুনলো, তবে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। এক ধ্যানে রুপোর চাবির ছড়ার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। এরপর সোজা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো, রাত সাড়ে এগারোটা বাজছে। এখনো রুপ মহলের কেউ ঘুমায়নি। যা করার আজই করতে হবে। রোজ রোজ তো আর চাবি পাওয়া সম্ভব নয়! আবার এতো রিস্ক নেয়াও যাবে না। আর মহলের সবাই না ঘুমালে কিছু সম্ভব নয়। তার মানে… মাঝরাতের অপেক্ষা করতে হবে।

রুবাই হালকা উদ্বেগ নিয়ে বলল, “কিরে কিছু বলছিস না যে, বুঝতে পেরেছিস আমার কথা।”

রুশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, বুঝেছি। মাঝরাতে যাব। মহলের কাকপক্ষীকেও টের পেতে দেয়া যাবে না।”

রুবাই চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রুশা বিছানায় বসে রইল চাবির গোছাটা হাতে নিয়েই। ধাতব ঠাণ্ডা অনুভূতি তার তালুতে লাগছিল, কিন্তু তার ভেতরের অশান্তি এর থেকেও ঠাণ্ডা, আরও গভীর। আজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার থেকে মেঘ একবারও ফোন করেনি। রুশা নিজেও কল করতে পারেনি, সে তো মেঘের একটা কলের অপেক্ষায় ছিল। তবে নীরবতাই যেন আজ সবচেয়ে জোরে উত্তর দিল।

ঘড়ির কাঁটা যখন আড়াইটা ছুঁলো, রুপ মহলের বড় বড় বারান্দা আর লম্বা করিডোরগুলো গভীর অন্ধকারে ডুবে পড়লো। ঘুমের দেশেও কোনো নড়াচড়ার শব্দ নেই। রুশা তাড়াতাড়ি ফোন তুলে রুবাইকে কল দিল, “বের হয়ে আয়।”

ওপাশে উত্তর এলো, “কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি! আসছি আসছি শব্দ করিস না।”

দুজনেই একে একে রুম থেকে বের হলো। পা টিপে টিপে তারা এগিয়ে গেল দাদাসাহেবের বদ্ধ কক্ষের সামনে। দরজাটা রাতের আঁধারে যেন আরও বিশাল, আরও ভয়ংকর মনে হলো। তালা খুলতে গিয়ে রুশা খুব আস্তে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, “এই ঘরটা কি কখনোই খোলা হয় না?”

রুবাই মাথা নাড়ল, “না। দাদাসাহেব মারা যাওয়ার পর থেকে কেউই ঢোকে না। দাদিআম্মা নিজেও না। বলে, যা ছিল তাই থাকবে। কয়েকবার পরিষ্কার করিয়ে আবার রেখে দেয়া হয়েছে।”

তালাটা বহু বছরের পুরোনো। গোছা থেকে পর পর কয়েকটা চাবি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে একটু নাড়াতেই হাল্কা আওয়াজ হলো। তালাটা খুলে গেল। অক্ষের ভেতরে ঢুকতেই যেন ধুলো আর পুরোনো সময়ের গন্ধ তাদের গায়ে লেগে গেল।

ঘরটা রাজকীয়, কিন্তু পরিত্যক্ত। চারদিকে মাকড়সার জাল, ফ্যানের ব্লেডে ধুলো জমে গাঢ় হয়ে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ফার্নিচারগুলো সব গোছানো, সোজাভাবে সাজানো। মনে হয় যেন কেউ যত্ন করে রেখে গেছে, আর তারপরই একেবারে সময় থেমে গেছে।

রুবাই নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “এত বছরেও কেউ একবারও ঢোকেনি… অবাক লাগে।”

রুশা তাকিয়ে আছে শুধু। তার চোখ ছবিগুলোর দিকে আটকে গেল। দেয়ালের মাঝখানে বিশাল এক ফ্রেম দাদাসাহেব আর রিদা চৌধুরীর বড় একটা ছবি। রুশা আরও কাছে গিয়ে ছবিটাকে খুঁটিয়ে দেখলো। এরপর দুজনেই পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলো, ড্রয়ার, আলমারি, পুরোনো কাপড়, সিন্দুকের ওপরে জমে থাকা ধুলো…

কিন্তু কিছু নেই। কোনো চিঠি, নোট, ছবি, কোনো সূত্র কিছুতেই নেই।

রুবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আমরা আসলে খুঁজছি কী?”

রুশা থমকে রইল। সত্যি কথা হলো, সে নিজেও জানে না। তবে সে এমন এক সত্য জানতে চাইছে যা কেউ জানাচ্ছে না। রুশা কিছু না বলে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। রিদা চৌধুরীর মুখে এক ধরনের অদ্ভুত স্থিরতা… যেন উত্তর আছে, কিন্তু বলা নেই। ঘরের প্রতিটি জিনিস নিখুঁতভাবে সাজানো, পরিত্যক্ত তবুও অস্বাভাবিকভাবে গোছানো। এত বছর কেউ ঢোকেনি অথচ ধুলোর নিচেও একটা অদ্ভুত শৃঙ্খলা।

রুশা খুব ক্লান্ত, খুব হতাশ স্বরে ধীরে ধীরে বলল , “যা খুঁজছি… সেটা এখানে নেই। সব আছে চন্দ্রমহলে। এখানে কিছুই নেই। একেকটা ইট পর্যন্ত কেউ পরিষ্কার করে রেখে গেছে।”

রুবাই কিছু বলতে পারলো না। দুজনেই আবার পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল। তালাটা আবার আগের মতো লাগিয়ে দিল রুশা।

রুবাইকে চাবিটা হাতে দিয়ে রুশা খুব নিচু গলায় বলল, “নিয়ে যা। সাবধানে। ফজরের আগে রুমে রেখে দিস।”

রুবাই মাথা নাড়ল। দুজনেই আলাদা দিকে হাঁটতে শুরু করলো। কিন্তু রুশা নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেমে গেল। দরজা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু ভেতরে যেতে মন চাইলো না। ধীরে সে ঘুরে দাঁড়ালো, আর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বাবার কক্ষের দিকে। রুশা আস্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরটা অন্ধকার, কিন্তু পরিচিত। দেয়ালের ঘড়িটা মৃদু টিক টিক শব্দ করছে। রুশা ভেতরে ঢুকেই দরজাটা ধীরে বন্ধ করে দিল। আজ তার ঘুম হবে না। তার মস্তিষ্ক তাকে ঘিরে ধরেছে। লাইটটাও জ্বালাতে মন চাইলো না আর। অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল রুশা। দু'চোখ ভরে এলো তার। সে বোধহয় কাদার জন্য এমন এক নিস্তব্ধতাই চাইছিল। মনটা জঞ্জালে ভরে উঠেছে, সামান্য বিন্দু জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে সব অমিমাংসিততা নিয়ে। সে এগুলোকে বাঁধ সাধলো না।

চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন একটু হলেও শান্ত করল তাকে। সে তার বাবার চেয়ারটায় এগিয়ে গিয়ে বসলো।

চলবে.... 💝

#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ

#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)

#সাদিয়া_তিন্তি

বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন