ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৬০তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৬০.

“শেহতাজ সব করতে পারে। ওর সোর্স, লোকবল, আর বিশ্বাসী মানুষদের নিয়ে চোখ বন্ধ করে প্রশংসা করা যায়। একেবারে কাল কেউটে পুষে রেখেছে। একটা গাছের পাতা নড়লেও ওর কাছে সবার আগে খবর চলে যায়।”
ইমরান এবার এগিয়ে এলো, “তাহলে ওর বাড়ি থেকে জলজ্যান্ত রুশা কে তুলে নিয়ে আসা হলো ও কি করে বুঝল না?”
মেঘ ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “অন্য কিছু আছে। এমনতো নয় যে, শেহতাজ‌ নিজেই চাইতো আমরা রুশাকে নিয়ে আসি! আর এই সুযোগে ও প্রীয়তাকে বিয়ে করতে পারে?”
ইমরান এবার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিচের দিকে ছুড়ে মারল। “সব দোষ আমার। কেন আমি শুধু রুশাকে নিয়ে এলাম! প্রীয়তাকেও নিয়ে আসতে পারতাম ওই রাক্ষস পুরি থেকে।”
ইমরানের কথাটা শেষ হতেই যেন ঘরের ভেতরকার বাতাস থমকে গেল। “সব দোষ আমার… আমি শুধু রুশাকে নিয়ে এলাম…”
এই স্বীকারোক্তি যেন ছুরির মতো গিয়ে বিঁধল অরূপের বুকে। অরূপের চোখের ভেতরের ঠান্ডা অন্ধকারটা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল। সে যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ল সে।
সাথে সাথেই রাফি ছুটে গেল। ইমরানও এগিয়ে এল দ্রুত। অরূপের মুখ ফ্যাকাশে। চোখদুটো ফাঁকা… সে দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে গেছে, “না… না… না…এটা… এটা হতে পারে না…”
তার চোখে জল এসে ভরল। তবে তা গড়িয়ে পড়ার আগেই সে যেন নিজের ভেতরেই ডুবে যাচ্ছে। “প্রীয়তা…!” নামটা উচ্চারণ করতেই তার গলা আটকে গেল। সে আবার বলল, “ও… ও এমন না…ও এমন কিছু করতে পারে না… ও তো…”
কথাটা শেষ করতে পারল না। সে নিজেই জানে, সে কি বলতে চেয়েছিল। সে ভালোবাসত। ভালোবাসে, প্রচন্ড ভালোবাসে। আজ এই ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বড় আঘাত করছে। দম বন্ধ করে দিচ্ছে। ওর ভালোবাসায় তো কোন খাদ ছিল না। ইমরান তার কাঁধে হাত রাখল, ‘‘নিজেকে সামলা…”
অরূপ সাথে সাথেই হাতটা ঝেড়ে ফেলল। “আমি পারছি না…আমি পারছি না…কি করে হতে পারে এটা!!”
রাফি এবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অরুপকে। অরুপের অবস্থা খুবই খারাপ হতে লাগলো। তার আর্তনাদ ঘরটাকে কাপিয়ে তুলছে। মেঘ রুশা কেউই যেন সামলে উঠতে পারছে না অরুপকে। একটু সময় যেতেই রাফি জোর করে ধরে তুলল অরুপকে। অরূপ নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। পারভেজ সওদাগর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে এক ঝলক বোঝাপড়া ফুটে উঠল। অরুপের পরিস্থিতিসহ উপস্থিত সকলের প্রীয়তার প্রতি এই আকুতি তাকে খুব করে ছুলো। মেঘ পরিস্থিতি সামলাতে বলল, “আঙ্কেল… ওর শরীর খারাপ লাগছে… প্রীয়তার বিষয়টা আমাদের কারোরই মেনে নেয়ার মতো নয়। সবাই প্রীয়তাকে খুব ভালোবাসে।”
মেঘ রাফিকে ইশারায় অরুপকে সরিয়ে নিতে বলল। রাফি মাথা নাড়ল। সে অরূপকে ধীরে উঠিয়ে অন্য ঘরে নিয়ে গেল। 
ওদিকে রুপমহলের বিশাল অন্ধকার ঘরের ভেতর ভারী পর্দা টানা। ঘরে ম্লান আলো। এক কোণে বসে আছে শেহতাজ। তার সামনে টেবিল। টেবিলের ওপর খোলা একটা দামি ম/দের বোতল। গ্লাসে অর্ধেক ভরা কালো তরলে। সে গ্লাসটা তুলে এক চুমুক নিল। তার চোখে একই ঠান্ডা রহস্যময়তা। কোন ক্লান্তি নেই। অনুশোচনা নেই। শুধু… এক ধরনের অদ্ভুত শীতলতা। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন কালো পোশাকধারী লোক। তাদের মাঝে একজন মাথা নিচু করে বলল, “স্যার…ওরা এখন পাহাড়তলীর একটা ফার্মহাউজে আছে।”
শেহতাজের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। লোকটা আবার বলল, “সব… আপনার প্ল্যান মতোই চলছে।”
তারপর শেহতাজ গ্লাসটা নামিয়ে রাখল।
“গুড।”
অন্যজন শেহতাজকে সেই পিতলের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার এটা উদ্ধার করেছিলেন তিনি।”
শেহতাজ খুব সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “ল্যাবে পাঠাও।”
দুজন লোকই সম্মতি দিয়ে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হল। ঘরে শুধু দুইজন রয়ে গেল, শেহতাজ আর আরফি। এটা শেহতাজের কাজের জায়গা। সে রুপমহলে নিজের কাজের জন্য এই স্টাডি রুমটা নতুন করে গড়েছে। আরফি এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল একেবারে পেছনে অন্ধকারের দিকে। এবার সে ধীরে এগিয়ে এল। তার চোখে দ্বিধা আর প্রশ্ন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
শেহতাজ তাকাল না। গ্লাসে আবার কালো তরল কাচের বোতল থেকে ঢেলে নিয়ে বলল, “কর।”
“প্রীয়তাকে কেন বিয়ে করলি? এটা তো প্ল্যানে ছিল না…”
শেহতাজ ধীরে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঘুরাল। গ্লাসের ভেতর আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। তার চোখ সেই আলোতেই আটকে রেখে খুব শান্ত গলায় বলল,
“সবকিছু প্ল্যান অনুযায়ী হয় না আরফি।…কিছু জিনিস… হিসেবের বাইরেও হয়। 
তাছাড়া এটা ওর বাবার কর্মফল। এসব বিয়ে, সম্পর্ক আমার কাছে মূল্যহীন। প্রীয়তাকে আমার দরকার। দরকার শেষ হলেই উড়িয়ে দেবো।”
“নীলিমাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত তোর ছিল। আবার ওকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তও তোর। এটাও ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
“নীলিমার সাথে যা ভালো হবে সব ওর বাবার কর্মফল। আর প্রীয়তার সাথে যা খারাপ হবে…
সেটাও তার বাবার কর্মফল।”
“মানে…?”
শেহতাজ গ্লাসটা শেষ করে টেবিলে রাখল। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল, “মানেটা খুব সহজ…”
সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দা সরাল না।
অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে রইল, “ওরা কেউই নিজেদের ভাগ্য লেখে নি…আমি লিখেছি ওদের জন্য। ওরা আমার লেখা নিয়তির খেলায় আটকে পড়া… দু’টো পুতুল।”
ঘরের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠল। সেই অন্ধকারের মাঝেই দাঁড়িয়ে রইলো শেহতাজ। 
রুপমহলের করিডোরগুলো এই মধ্যরাতে অদ্ভুত নিস্তব্ধ। যেন পুরো প্রাসাদটা এক গভীর, অস্বস্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে থেমে আছে। সেই নীরবতার ভেতর দিয়েই ধীরে নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল শেহতাজ। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সে। ঘরটায় আজ আলোয় ভরা, বিছানাটা ফুলে সাজানো, গোলাপের পাঁপড়ি ছড়ানো, সাদা চাদরের ওপর লাল রঙের ছোঁয়া। আর সেই বিছানার মাঝখানে বসে আছে প্রীয়তা। ঠিক যেমন বসে ছিল কিছুক্ষণ আগে। একই ভঙ্গিতে। একই স্থিরতায়। লাল শাড়ি, ভারী গয়না, মাথার ওড়না আধখানা নেমে এসেছে কপালের ওপর। চোখ দুটো ফাঁকা। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন সে মানুষ না… একটা সাজানো প্রতিমা। শেহতাজ একবারও তার দিকে তাকাল না। চেহারাটা দেখলো না। সে যেন এই দৃশ্যটাকে গুরুত্বই দিল না। সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের পোশাক বের করল। সবকিছু যেন রুটিন, আজকের দিনটা আর দশটা দিনের মতোই। সে কোনো কথা না বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
জলের শব্দ ভেসে এলো দীর্ঘ সময় ধরে।
ঘরের ভেতর শুধু বসে রইল প্রীয়তা। নড়ল না। চোখ পিটপিট করল না। যেন সে সময়ের বাইরে আটকে গেছে। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা খুলল। শেহতাজ বেরিয়ে এল। ভেজা চুল, হালকা পোশাক। তার চোখ একবার ঘরের ওপর দিয়ে ঘুরল… তারপর থামল প্রীয়তার ওপর। এবার সে এগিয়ে এল। নির্লিপ্ত পায়ে। প্রীয়তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা ব্যঙ্গ নিয়ে বলল, “এই শাড়িটা কি এতই পছন্দ হয়েছে… যে খুলতে মন চাইছে না?”
প্রীয়তা ধীরে চোখ তুলল। তার চোখে ক্লান্তি। অপমান। ভাঙা এক আত্মসমর্পণ। মৃদু গলায় বলল, “আমার… কিছু নেই।”
একটা ছোট বাক্য। কিন্তু সেই কথার ভেতর লুকিয়ে আছে সব হারানোর ভার। শেহতাজ সোজা হয়ে দাঁড়াল। “তো কী হয়েছে? তোমার বান্ধবী কিছু দিতে পারেনি?”
প্রীয়তা আর কিছু বলল না। শুধু চুপ করে তাকিয়ে রইল। শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ ঘুরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। প্রীয়তা তাও নড়ল না। শেহতাজ এবার সোজা চলে গেল রুশার ঘরের দিকে।
দরজাটা খুলতেই দেখলো অগোছালো ঘরটা একা পড়ে আছে। সাহায্যকারীরা অবশ্য সামান্য ঘষে মেজে ফ্লরের সব ভাঙা কাঁচ সরিয়ে নিয়েছে। তবে এই ঘরটা… এই আলমারি… এগুলোর ওপর যেন শেহতাজের এক অদৃশ্য অধিকার আছে।
সে ধীরে আলমারির দরজা খুলল। ভেতরে সাজানো শাড়ি, কাপড়, গয়না সব নিখুঁতভাবে গুছানো। তার হাত এগিয়ে গেল। একটা… দুইটা… তিনটা শাড়ি নামাল। এগুলো বিয়ের জন্যই আনা হয়েছিল। তারপর কিছু নতুন পোশাক নামিয়ে নিল। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই। এই জিনিসগুলো কার সেটা যেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। যা দরকার, সেটাই সে নেবে। আলমারি বন্ধ করে ফিরে এল সে। নিজের কক্ষে ফিরে দরজা খুলে ঢুকল। প্রীয়তা তখনো একইভাবে বসে আছে। শেহতাজ কোনো কথা না বলে কাপড়গুলো বিছানার পাশে রেখে বলল, “যাও। ফ্রেশ হয়ে নাও।”
একটা আদেশ। কোনো আবেগ নেই। তারপর সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সোজা বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল। যেন কিছুই হয়নি। যেন এই বিয়ে… এই নাটক… এই ভাঙন কিছুই তার জীবনের অংশ না।
প্রীয়তা ধীরে নড়ল। অনেকক্ষণ পর। তার চোখ পড়ল সেই কাপড়গুলোর দিকে। রুশার কাপড়।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে যেন ইচ্ছে করে রুশার সবটায় নিজের করে নিচ্ছে। নাকি তার ভাগ্যই রুশার অস্তিত্বে বাঁচা?
প্রীয়তা উঠে দাঁড়াল। গয়নার ভার যেন তাকে নিচের দিকে টেনে ধরছে। তবু সে এগিয়ে গেল। ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। মুখের মেকআপ, চোখের কাজল সব ধুয়ে গেল। আজ জীবনে প্রথম তার এই মেকআপ অসহ্য লাগছে। যেন এসব এক আতঙ্ক। সব ধুয়ে নিচ্ছে জোর করে। এগুলো কিছু চায় না সে। কোন রঙ প্রয়োজন নেই। সব যেন অত্যাচার করে ধুয়ে নিল। 
কিন্তু ভেতরের দাগ? সেটা কি এত সহজে মুছে যায়?
লম্বা সময় শাওয়ার নেয়ার পর সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। পরনে একটা পাতলা, সাদামাটা সালোয়ার কামিজ। চুল ভেজা। মুখ ফ্যাকাশে। চোখ লাল। সে একবার তাকাল বিছানার দিকে। শেহতাজ গভীর ঘুমে। নিশ্চিন্ত। যেন পৃথিবীর কোনো ভার তার ওপর নেই। প্রীয়তা ধীরে ঘরের একপাশে রাখা ডিভানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ল। চুপচাপ। দুই হাত কোলে রাখা। পিঠ সোজা। চোখ সামনে স্থির। এসব কি সত্যি তার সাথে হচ্ছে? এটা কোন বাজে দুঃস্বপ্ন কি? সে কি রুশাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করে বলেই এসব হচ্ছে তার সাথে? 
প্রীয়তা নিজেকে চিমটি লাগালো। ব্যথায় নিজেই আর্তনাদ করে উঠলো। এসব সত্যি হচ্ছে তার সাথে। তার চোখে ঘুম নেই। মাথায় চলছে মুক্তি। শুধু সে মুক্তি চায়। এ মহল নয়,‌ সে সুখ চায়। 
ওদিকে রাতটা বাড়তেই ফার্মহাউসের ঘরটা আরো স্পর্শকাতর হয়ে উঠলো। এ যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে লড়ছে না, অথচ প্রত্যেকে নিজের ভেতরের ভয়, সন্দেহ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। দূরে পাহাড়ি হাওয়ার শব্দ এসে জানালায় ধাক্কা দিচ্ছে। মেঘ বসে আছে সোফায়। ইমরান সামনে পায়চারি করছে। মাঝে মাঝে থেমে মেঘের দিকে তাকাচ্ছে, আবার হাঁটা শুরু করছে। রুশা বসে আছে সোফার এক কোণে। তার পরনে এখনো তার বিয়ের শাড়ি। তার আঙুলগুলো একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছে শক্ত করে। চোখ লাল, কান্না থেমেছে কিন্তু ভেতরের ঝড় থামেনি। পারভেজ সওদাগর একটু দূরে বসে আছেন। তার চোখেও ক্লান্তির রেখা আরও গভীর হয়েছে। অরুপ রুপমহলে যাবার জন্য অনেক বার জিদ করে‌ছে। একেবারে ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে সে। কোনরকম ভাবে তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছে। সে ভেতরের কক্ষের এক কোনায় পড়ে আছে অসহায়ের মত। রাফি তার ছায়া সঙ্গি। 
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। কারো চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তি নেই শুধু হিসেব। অদ্ভুত ঠান্ডা, নির্মম হিসেব। রুশাকে নিয়ে আসার খুশি যেন ঠান্ডা আবহাওয়ায় মিলিয়ে উঠেছে। 
মেঘ ধীরে নিরবতা ভেঙ্গে বলল, “সবকিছু একসাথে মিলছে না…”
ইমরান থেমে গেল, “কী মিলছে না?”
“সব অদ্ভুত। প্রীয়তাকে বিয়েই কেন করলো? কিডন্যাপ করতে পারত। আটকে রেখে ব্লাকমেইল করতে পারত। কিন্তু বিয়ে কেন?”
ইমরান নরম আওয়াজে বলল, “প্রীয়তাকে রাজি করালো কি করে?”
“এটা বড় কোন বিষয় নয়। প্রীয়তা নরম মনের মানুষ। দেখিয়েছো হয়তো কোন একটা ভয়। বিপদে পড়ে রাজি হয়ে গেছে।”
পারভেজ সওদাগর ভাঙা গলায় বললেন, “আমি বাড়িতে এখনো যায়নি। আমি বুঝতে পারছি না প্রীয়তার মাকে কি করে মুখটা দেখাবো। এগুলো জানলে রানু অসুস্থ হয়ে পড়বে। প্রীতমকেও কিছু জানাই নি।” 
মেঘ শান্ত। ওর নিজের খুব অসহায় লাগছে। এই মুহূর্তে কি করা উচিত তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মেঘের কাছে সব কিছু গন্ডগোল লাগছে। কিছু একটা অদ্ভুত অগোছালো। আজ সে তার জীবনের চরম ব্যর্থতা নিয়ে বসে আছে। পারভেজ সওদাগর রুশা আর মেঘের মুখে একবার করে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা এখন কি করবে? রুশাকে এখানে এভাবে তো রাখা যাবে না।”
রুশা মৃদু স্বরে বলল, “রুপমহলে ফিরে যাবো আমি আঙ্কেল। প্রীয়তা আমার অভিশাপ নিজের করে নিয়েছে। আমি যে তার এই পরিস্থিতির ভাগিদার।”
মেঘ কিছু বলল না। ইমরান কড়া আওয়াজে বলল, “তোকে ওই মহলে আবার ফেরত পাঠাতে নিয়ে আসিনি। দরকার পড়লে আমি আবার যাবো। প্রীয়তাকেও নিয়ে আসবো। তবে তার আগে সকাল হতেই তোর আর মেঘের বিয়েটা হওয়া জরুরি।”
পারভেজ সওদাগর সায় টেনে বললেন, “এটাই সব থেকে ভালো হয়। নাহলে রুশাকে নিয়ে কেসটা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।”
মেঘ কিছুই বলল না। সে শুধু রুশার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে শুধু একবার সম্মতি চায় রুশার। তার ভালোবাসা কোন পিঞ্জর নয়। তার ভালোবাসা আকাশ। সেখানে রুশার ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর দুনিয়া।
রাতটা যেন কেউ থামিয়ে দিয়েছে। সময় এগোচ্ছে তবু কারো জীবনে ভোর আসছে না। রুপমহলের এক প্রান্তে, ফুলে সাজানো কক্ষে… আর পাহাড়তলীর নির্জন ফার্মহাউজে দুই ভিন্ন জায়গায় থেকেও সবাই যেন একই দুঃস্বপ্নের ভেতর বন্দী।
প্রীয়তা কখন যে ডিভানের উপর বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও জানে না। ভোর পেরিয়ে সকাল হতেই ধীরে তার চোখ খুলল। কিছুক্ষণের জন্য সে বুঝতেই পারল না সে কোথায়। তারপর সব মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ চেপে ধরল কেউ। সে উঠে বসতে গিয়েই থেমে গেল।
তার গায়ে একটা চাদর। সে তো… চাদর দেয়নি!
তার চোখ সোজা বিছানার দিকে গেল। বিছানা ফাঁকা। শেহতাজ নেই। ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন কেউ ছিলই না কখনো এখানে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকাতেই সে দেখল সকাল ৯টা। এতক্ষণ… সে ঘুমিয়েছিল?
না, এটা ঘুম না… এটা ছিল ক্লান্তি, ভাঙন, আর এক অসহায় আত্মসমর্পণের অজ্ঞানতা। প্রীয়তা ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার শরীর ভারী লাগছে, মাথা ঝিমঝিম করছে। তবু সে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। গত রাতেই রাখা একটা শাড়ি বের করল। খুব তাড়াহুড়ো করে পরে নিল। আজ কোনো সাজ নেই। কোনো আয়না দেখা নেই। আজ সে শুধু একটা রোবট… যার ভেতরটা সম্পূর্ণ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। তার চোখ একবার দরজার দিকে গেল।
মুক্তি? না… এই মহলে সেই শব্দটার কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে সে এই মহলে আটকে থাকবে না। পালিয়ে যাবে। এতো দূরে পালাবে যে তার ছায়াকেও ধরা যাবে না।
ফার্মহাউজে ঘরের ভেতর সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। কেউ সোফায়, কেউ দেয়ালে ঠেস দিয়ে, কেউ মাথা নিচু করে। রুশা এক কোণে নিঃশব্দে। তার চোখ শুকিয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরের কান্না এখনো থামেনি। মেঘ অন্যপাশে বসা। চোখে লালচে ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টি এখনো তীক্ষ্ণ। ইমরান রাতভর পায়চারি করেছে। তার ভেতরে অপরাধবোধ আর রাগ মিশে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করেছে। পারভেজ সওদাগর যেন এক রাতেই বুড়িয়ে গেছেন কয়েক বছর। বাবা হওয়া কি এতো সহজ?
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন