৬১.
ফার্মহাউজে ঘরের ভেতর সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। কেউ সোফায়, কেউ দেয়ালে ঠেস দিয়ে, কেউ মাথা নিচু করে। রুশা এক কোণে নিঃশব্দে। তার চোখ শুকিয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরের কান্না এখনো থামেনি। মেঘ অন্যপাশে বসা। চোখে লালচে ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টি এখনো তীক্ষ্ণ। ইমরান রাতভর পায়চারি করেছে। তার ভেতরে অপরাধবোধ আর রাগ মিশে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করেছে। পারভেজ সওদাগর যেন এক রাতেই বুড়িয়ে গেছেন কয়েক বছর। বাবা হওয়া কি এতো সহজ?
রুশার ভেতরে এক অন্য তোলপাড়। সে যে মেঘকে ভালোবাসে এখানে তো কোন বিতর্ক নেই। তবে বিয়েটা কি এভাবে হওয়া উচিত? শেহতাজ তো বিয়ে করেই ফেলেছে এবার কি সব অন্য ভাবে করা সম্ভব নয়! রুশার ভেতরে শুধু ভাংচুর। মুহুর্তে মুহূর্তে তার ভাবনারা বদলাচ্ছে। তার বাবার সকল শত্রু পক্ষের মাঝে কি তবে তার আপন চাচাও এক পক্ষ ছিল? এতো সব কি মিথ্যে? কক্ষে উপস্থিত একটা মানুষের চোখের ঘুম নামলো না। রাতের শেষভাগে সকলেই একটু গড়িয়ে নিল।
তবে ভোরের প্রথম আলো পড়তেই সকালটা শুরুই হলো এক অশুভ পূর্বাভাস নিয়ে। পাহাড়তলীর নির্জন ফার্মহাউসটায় হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল গাড়ির একের পর এক শব্দে। একটার পর একটা ইঞ্জিনের গর্জন, টায়ারের ঘর্ষণ, ধুলো উড়ে আকাশ ঢেকে যাওয়া। উপস্থিত কেউই প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সকলের চোখে সতর্কতায় ফিরে এল। মেঘ এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল, “ইমরান…”
ইমরান জানালার দিকে ছুটে গেল। পর্দা সরাতেই তার মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল, “শেষ…”
মেঘ এগিয়ে এসে তাকাতেই তার বুকটাও কেঁপে উঠল। ফার্মহাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক গাড়ি পুলিশ, র্যাব, প্রতিরক্ষা বাহিনীর কালো গাড়ি। চারপাশ ঘিরে ফেলেছে তারা। লাল-নীল আলো জ্বলছে নির্দয়ভাবে। আলো গুলো যেন সরাসরি মুখের উপর আছড়ে পড়ছে নির্মম সত্যের মতো। এই পরিস্থিতিতেই নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নামলেন শাহরিয়ার শেখ। তার মুখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা হাসি। রাফি ভয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমরা… আমরা ঘিরে গেছি…”
অরূপ ভেতরের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো। তার চোখ লাল, চেহারায় ক্লান্তি আর উন্মাদনার মিশ্রণ, “ওরা কেন এসেছে…? প্রীয়তাকে এনেছে…?”
কিন্তু তার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় জোরে ধাক্কা পড়তে শুরু করল, “ওপেন দ্য ডোর! পুলিশ!”
ইমরান দাঁত চেপে ধরল। তার হাত মুষ্টিবদ্ধ, “চুপচাপ থাকো সবাই…”
কিন্তু আর সময় ছিল না। দরজা ভেঙে ঝড়ের মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল তারা। সশস্ত্র বাহিনী মুহূর্তেই পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেলল। বন্দুক তাক করে নিল, তাদের চোখে সন্দেহ, আচরণে কঠোরতা। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে গেল। উপস্থিত প্রতিটি মানুষ বন্দি। পেছন থেকে সাংবাদিকদের কণ্ঠ ভেসে এলো, “এই যে! এই যে! ছবি নিন!”
“নববধূ অপহরণ কেস!”
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠতে লাগল। আলো এত তীব্র যে চোখ মেলাই কঠিন হয়ে উঠল। রুশা হতবিহম্বল হয়ে পড়লো। তার বুক কাঁপছে। “এরা… এরা কেন…?” তার উত্তর এল পরের মুহূর্তেই।
শাহরিয়ার শেখ ভেতরে ঢুকলেন। তার পদচারণায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন সবকিছু তারই নিয়ন্ত্রণে। তার চোখ সরাসরি গিয়ে থামল রুশার ওপর। এক মুহূর্তের জন্য… সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যা দেখে রুশার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি ধীরে বললেন, “আমার মেয়েকে… অনেক কষ্ট দিয়েছেন আপনারা।”
মেঘ এগিয়ে এল, “আঙ্কেল, আপনি.”
“স্টপ।” একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দেই যেন চারপাশ থেমে গেল।
শাহরিয়ার শেখ হাত তুলে ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে দুইজন অফিসার এগিয়ে এসে মেঘ আর ইমরানকে আটকে দিল।
শাহরিয়ার শেখ এবার চতুর চাহনিতে তাকালেন পারভেজ সাহেবের দিকে, “ডিআইজি পারভেজ সওদাগর।”
হঠাৎ করেই সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল। পারভেজ সওদাগর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনিও যেন এসব ধারণা করতে পারেননি। কয়েক মুহূর্ত পরেই কয়েকজন অফিসার তাকে ঘিরে ফেলল, “স্যার আপনাকে যেতে হবে। শেখ বাড়ির নববধূকে অপহরণের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে থানায় অপহরণের মামলা দায়ের করা হয়েছে আপনার বিরুদ্ধে।”
“কি?!”
রুশা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “না! না! আঙ্কেল কিছু করেননি…”
কেউ শুনল না। কেউ শুনতে চাইল না। ক্যামেরার সামনে ইতিমধ্যেই গল্প তৈরি হয়ে গেছে। রিপোর্টারদের কণ্ঠে উত্তেজনা, চোখে লোভ একটা বড় খবর পেয়ে যাওয়ার লোভ। একের পর এক লাইভ সংবাদ চলছে।
“দেশের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাই অপহরণের সঙ্গে জড়িত!”
“মেয়ের বিয়ের আড়ালে ষড়যন্ত্র! সানন্দাপুরে রাজ পরিবারে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতেই এই ষড়যন্ত্র করেছেন তিনি।”
মেঘ অসহায়, ছটফট করতে লাগল, “আপনারা ভুল করছেন! এটা …”
একজন অফিসার ঠান্ডা গলায় বলল, “কোর্টে গিয়ে বলবেন।”
ইমরান গর্জে উঠল, “এই নাটক বন্ধ করুন! আমরা…” তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকে আরো শক্ত করে চেপে ধরা হলো।
অরূপ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। তাকেও এই অপহরণ মামলার চার নম্বর আসামি রুপে ফাঁসানো হয়েছে। রুশা এবার ছুটে গেল শাহরিয়ার শেখের দিকে। “বড় আব্বু! প্লিজ… এটা ভুল হচ্ছে! আমি…”
শাহরিয়ার শেখ তার কথা শেষ হতে দিলেন না। তিনি খুব ধীরে তার আরো কাছে এগিয়ে এসে অদ্ভুত মায়া নিয়ে রুশার মাথায় হাত রেখে বললেন, “চলো, ছোট রাজকুমারী বাড়ি চলো। খুব কষ্ট হয়েছে তোমার তাই না!”
রুশা কোন প্রতিউত্তর করার আগেই দুইজন মহিলা পুলিশ এগিয়ে এসে রুশাকে ঘিরে ধরল। রুশা হাত ছাড়িয়ে বলতে লাগল, “আমি যাচ্ছি না! এটা কিডন্যাপিং না! আপনারা আমাকে…”
কেউ শুনল না। এই মুহূর্তে সত্য আর মিথ্যার কোনো পার্থক্য নেই। যে গল্পটা ছড়িয়ে পড়েছে সেটাই এখন সত্য। রুশাকে প্রায় জোর করেই গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সে বারবার পিছনে তাকালো মেঘ, ইমরান, অরূপ… পারভেজ সওদাগরের দিকে। তার চোখে আতঙ্ক, অসহায়তা। এই খেলায় সে নিজেই এখন বন্দি।
গাড়িতে বসানোর পরও সে থামেনি। বারবার মিনতি করে শাহরিয়ার শেখকে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা চালিয়ে গেল, “প্লিজ! বিশ্বাস করুন! আমি অপহৃত হইনি…”
তবে রুশার এই মিনতি নিছকই শব্দের ব্যায়। ড্রাইভার শক্ত হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। গাঢ় শব্দটা যেন রুশার শেষ চেষ্টাটুকুকেও বন্ধ করে দিল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
ফার্ম হাউজের বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়, ক্যামেরা, চিৎকার, “নববধূ উদ্ধার!” “অপহরণকারী গ্রেফতার!”
শহরের প্রতিটা কোণে, প্রতিটা স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়তে লাগল একটাই খবর- ‘ডিআইজি পারভেজ সওদাগর নিজের প্রভাব খাটিয়ে শত্রুতা মেটাতে শেখ বাড়ির সদ্য বিবাহিত নববধূ অপহরণ করেছেন।’ আর সেই গল্পের ভেতরই চাপা পড়ে গেল আসল সত্যটা।
গাড়িটা সামান্য এগোতেই গাড়ির এসির টেম্পারেচার কমলো বাড়লো। ঠান্ডা সকালে যান্ত্রিক ঠান্ডায় রুশার সব প্রতিরোধ যেন ঝিমিয়ে গেল। কেমন এক রকম অবস হয়ে এলো তার শরীর। যেন এই মহাবিশ্বের সমস্ত ক্লান্তি সব তার। কথা বলা কিংবা কোন আওয়াজ করার সামান্য অগ্রহ টুকু আর জন্মালো না। বেশ সময় পেরিয়ে গাড়িটা পৌঁছালো রুপমহলে। বিশাল লোহার ফটকটা পেরিয়ে শাহরিয়ার শেখ রুশাকে নিয়ে মহলে প্রবেশ করলেন। রুশার যেন নিজের শরীরের ভার বহন করার ক্ষমতাটুকু নেই। সে কোন এক অচেতন বাস্তবতায় হেঁটে চলেছে। মহলের পরিবেশ নিস্তব্ধ, ভারী… চাপা উত্তেজনায় টগবগ করছে প্রতিটা ইট।
খাবার টেবিলে রুপমনি বেগম, শেহতাজ, আরফিসহ আরো কিছু মেহমান বসে আছেন। সাহায্যকারীরা খাবার পরিবেশন করছেন। গতকাল থেকে আনজুম আরা বেগম কোন আয়োজনে নেই। সকাল থেকে নামাজের ঘরেই বসে আছেন। রুবাই গৃহবন্দি, গতকাল তার রুশাকে বাইরে বের করে দেয়া কাজের ফল স্বরুপ নিজের বাড়িতেও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে তাকে। এইতো বন্দিত্বের দশা চলবে ঠিক ততদিন যতদিন না রুশা এই বাড়িতে ফেরত আসে। বাড়িতে একটা থমথমে পরিবেশ। এই বাড়িতে যে নতুন একজন বউ বিয়ে করে ঢুকেছে তার প্রতি যেন কারোই কোন আগ্রহ নেই। প্রীয়তা নিজেই একটা লাল জামদানি শাড়ি পড়ে তৈরি হয়ে নিচে নামার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে।
এর মাঝেই রুশাকে নিয়ে হাজির হলেন শাহরিয়ার শেখ। এটা যেন অপ্রত্যাশিত। শেহতাজের চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল রুশাকে দেখে। রুপমনি বেগম ছুটে এলেন রুশার কাছে। প্রীয়তার কদমও জমে উঠলো রুশাকে দেখে।
রুশার শরীরে এখনো সেই একই গাঢ় খয়েরী শাড়ি, গলায় গয়না, বউয়ের সাজটা একেবারেই একইরকম রয়ে গেছে। রুপের কোন পরিবর্তন নেই। প্রীয়তা আজ যে শাড়িটা পড়েছে, এটাও অবশ্য রুশার। সে রুশাকে দেখেই ছুটে নিচে নেমে এসে তার সামনে দাঁড়ালো । তারা দুইজন। একই রঙে। একই গল্পের দুই ভিন্ন অধ্যায় হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।
রুশার চোখ ধীরে উঠল। প্রীয়তার চোখের সঙ্গে মিলল। কোনো কথা নেই। কোনো বিস্ময় নেই।
শুধু এক অদ্ভুত নীরবতা যেখানে হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা উত্তর চাপা পড়ে আছে।
ঠিক তখনই, “নীলিমা!” নাম ধরে চিৎকার করে ছুটে এলেন আনজুম আরা বেগম। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এসে জড়িয়ে ধরলেন রুশাকে শক্ত করে। “মা… তুই কোথায় ছিলি…! কী অবস্থা করেছে তোকে…!” তার কণ্ঠ কাঁপছে। চোখে জল। তিনি যেন রুশার জন্যই বসে ছিলেন। তবে রুশা কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। তার হাত দুটো পাশেই ঝুলে রইল। যেন সে এই আলিঙ্গনটাও অনুভব করার মতো অবস্থায় নেই। একে একে বসার ঘরে সকলে তাকে ঘিরে ধরতেই রুশা আচমকাই পড়ে যেতে নিল। তাও একেবারে প্রীয়তার উপরে। শেহতাজ বেশি দূরে না থাকায় সাথে সাথেই ছুটে এসে ধরে বসল রুশাকে। একই সাথে প্রীয়তা আর শেহতাজ জড়িয়ে নিল তাকে। রুশা একেবারেই অচেতন, মূহূর্তেই শরীরের সব ভার ছেড়ে পড়ে গেল। উপস্থিত সকলেই ঘাবড়ে উঠলো। শাহরিয়ার শেখ এগিয়ে এসে চিৎকার করে বললেন, “তাড়াতাড়ি ডাক্তার সাহেবকে খবর দাও। আমার মেয়েটার উপর অনেক অত্যাচার গেছে।”
প্রীয়তা রুশাকে পুরোপুরি শেহতাজের হাতে দিয়ে দৌড়ে টেবিল থেকে পানির গ্লাস এনে কয়েক ফোঁটা পানি ছিটালো। তবে এতেও কোন লাভ হলো না। আনজুম আরা বেগম শেহতাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওকে জলদি ওর ঘরে নিয়ে চলো। আল্লাহ জানে মেয়েটার উপর কি ঝড় গেছে।”
শেহতাজ এক মুহূর্তও দেরি না করে রুশাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। এই মেয়েটাকে তার মানুষ মনে হল না। একটা সামান্য ছোট বাচ্চার থেকেও হালকা এই মেয়ে। এর এই রক্তশূন্য ফ্যাকাশে শুভ্র মুখ দেখলে যে কেউ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নেবে এই মেয়ের উপর খুব অত্যাচার হয়েছে। তাছাড়া গতকালের একই শাড়ি গয়না তার শরীরে। রুশাকে তুলতেই শাহরিয়ার শেখের সাথে শেহতাজের একবার চোখাচোখি হল। তবে সে দাঁড়ালো না।
শেহতাজ ধীরে… অত্যন্ত সতর্কভাবে রুশাকে তার কক্ষের বিছানায় শুইয়ে দিল। যেন একটু অসাবধান হলেই লেগে যাবে রুশার। তার হাত ছাড়তেই রুশার শরীরটা নিথর হয়ে পড়ে রইল একেবারে প্রাণহীন। তার ঠিক পেছনেই এসে দাঁড়ালেন আনজুম আরা বেগম, রুপমনি বেগম… আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে প্রীয়তা। আনজুম আরা বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বিছানার পাশে বসে পড়লেন। তার মাঝে রুশাকে নিয়ে আগে কখনোই কোন আবেগ কিংবা ভালোবাসা এবাড়ির কেউই দেখেনি। তবে আজ যেন তার অন্য রুপ। শুধু আজ বললে ভুল হবে, গতদিন থেকে। তিনি যেন রুশার প্রতি অত্যাধিক স্নেহময়ী হয়ে উঠেছেন। তিনি ধীরে রুশার গয়নাগুলো খুলতে শুরু করলেন। এক এক করে ভারী নেকলেস, কানের দুল, চুড়ি… সব খুলে পাশের ছোট টেবিলে রেখে দিলেন।
প্রীয়তা কিছু বলল না। দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল শুধু। তার চোখ স্থির রুশার দিকে। তার এই পরিস্থিতির জন্য তার ভাগ্য দায়ি তবে রুশার এই পরিস্থিতিতেও কি ভাগ্যকে দোষারোপ করা যায়? এই মেয়েটাকে সে খুব ভালোবাসে। অকারণেই।
বেশি সময় লাগলো না। একটু কিছু সময় যেতেই ডাক্তার সাহেব এসে পৌঁছালেন। তিনি দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন। সাথে একজন সহকারী। শাহরিয়ার শেখও তার সাথেই রুশার কক্ষে ঢুকল। ডাক্তার সাহেব এক মুহূর্ত দেরি না করে রুশার পাশে বসে পড়লেন। নাড়ি দেখলেন… চোখের পাতা তুললেন… স্টেথোস্কোপ বুকে রাখলেন।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা… তারপর ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বললেন, “ওর শরীর খুব দুর্বল। হার্টবিট খুব স্লো… অনেকক্ষণ কিছু খায়নি হয়তো। তার ওপর ” তিনি একটু থামলেন।
শাহরিয়ার শেখ এগিয়ে এলেন, “তার ওপর কি, ডাক্তার?”
ডাক্তার এবার সরাসরি তাকালেন, “ওকে অজ্ঞান করার জন্য খুব কড়া ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে। সেটা শরীরে রিঅ্যাক্ট করেছে। তাই শরীরটা এভাবে শাট ডাউন করে গেছে।”
ঘরের ভেতর যেন হিম নেমে এল। আনজুম আরা বেগম ফিসফিস করে বললেন, “ইয়া আল্লাহ…”
ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন, “চিন্তার কিছু নেই এখন। আমি স্যালাইন দিচ্ছি। একটু সময় লাগবে। বিশ্রাম দরকার।”
সহকারী দ্রুত স্যালাইনের ব্যবস্থা করতে লাগল। সূচ ঢুকতেই রুশার হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল… কিন্তু সে জেগে উঠল না। সে এখনো অচেতন ঘুমে বন্দি।
শেহতাজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব শুধু দেখে যেতে লাগল। তার পাশেই আরফি দাঁড়ানো। শেহতাজ অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ। তার চোখ রুশার মুখে স্থির। সেই ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য মুখ, নিঃশ্বাসের ধীর ওঠানামা, হাতের শিরা স্পষ্ট হয়ে ওঠা সব দেখতে লাগলো। খুব সামান্য এক মুহূর্তের জন্য। শেহতাজের ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠল। একটা অদ্ভুত, অচেনা অনুভূতি। এটা কি অপরাধবোধ? না, সেটা শেহতাজের ভেতরে থাকার কথা না!
তবুও তার মস্তিষ্কে হঠাৎ একটা প্রশ্ন ভেসে উঠল,
“আমি কি… ভুল করলাম?”
সে নিজেই থমকে গেল। এই প্রশ্নটা তার জন্য নতুন। খুবই নতুন। সে কখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু আজ… এই মেয়েটাকে এই অবস্থায় দেখে… তার হিসেবের খাতায় যেন কোথাও একটা অজানা ভুল ধরা পড়েছে। তার চোখ ধীরে সরল। এক ঝলক প্রীয়তার দিকে গেল। প্রীয়তা এখনো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। নিঃশব্দ। কিন্তু তার চোখে জমে থাকা কষ্টটা শেহতাজের কোথাও গিয়ে ঠোক্কর খেল। কয়েক সেকেন্ড পর সে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার মুখ আবার আগের মতোই শক্ত হয়ে গেল। শীতল। নিয়ন্ত্রিত। কোনো আবেগ নেই। ডাক্তার সাহেব বেরিয়ে যেতেই শেহতাজও শাহরিয়ার শেখের পিছু চলল। করিডোর এগিয়ে আসতেই। শাহরিয়ার শেখ থেমে গেলেন। ফিরে তাকালেন শেহতাজের দিকে। শেহতাজ শক্ত চোখে শুধু তাকিয়ে রইলো। শাহরিয়ার শেখ কয়েক কদম এগিয়ে বললেন, “কাজটা তুমি ঠিক করো নি।”
“কি করেছি আমি?”
“তোমার মাথায় রাখা উচিত বাবারও বাবা থাকেন।”
এই একটা কথায় শেহতাজ সব বুঝে গেল। তার করা সব গুলো কাজের কালো খাতা তার বাবার সামনে খুলে গেছে। শাহরিয়ার শেখ খুব ঠান্ডা আওয়াজে বললেন, “তোমাকে আমি কখনো মাফ করবো না। আমার ভাইয়ের শেষ কথার মান তুমি পায়ে পিষে দিলে। এখন দেখো মেয়েটার অবস্থা।”
শেহতাজ শুধু চুপ করে থাকলো। তার কাছে এই কথার জবাব দেবার মতো শব্দ নেই।
ওদিকে সানন্দাপুর থানার ভেতর ভারী লোহার গেটের ভেতরে মেঘ, ইমরান, অরূপ আর রাফিকে বন্ধ রাখা হয়েছে। তাদের সাথেই পারভেজ সওদাগর। অপহরণের মামলা সহ আরো ভারী ভারী মামলায় তাদের নাম সারিবদ্ধ করে সাজিয়েছেন শাহরিয়ার শেখ। সমগ্র খেলাটাই শেখরা খেলছিল। বাবা ছেলে পুরো খেলা শেষে অপরাধির তকমা ঘষে দিলো গুটির গায়ে।
মেঘ দেয়ালে হাত মেরে উঠল, “ড্যাম ইট!” জীবনে সব থেকে বড় খেলায় এতো বড় হার মেনে নেয়ার মত নয়।
ইমরান দাঁত চেপে আছে, “সব প্ল্যান করা ওদের একদম নিখুঁতভাবে…”
রাফি ভয়ে কুঁকড়ে আছে। অরূপ চুপ। একদম চুপ। তার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সকলের বাড়ির লোকদের খবর দেয়া হয়েছে। কেউই এখনো এসে পৌঁছাইনি।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}