৬৫.
মেঘ সমগ্র ঘরে আবারো চোখ বুলাল। টেবিলের পাশে পড়ে থাকা কিছু পুরোনো খবরের কাগজ তার চোখে পড়ল। ধুলোর নিচে চাপা পড়ে আছে। কিছু ফাইল, কিছু কাটা আর্টিকেল, যেন কেউ ইচ্ছে করে তথ্য জমিয়ে রেখেছিল। সে এক পা এগিয়ে আবার থেমে গেল। না… সে নিজেকে থামাল। আগের কাজ আগে। সে নোটবুক, ফর্মুলার কাগজ, আর কোডের বইটা আলাদা করে গুছিয়ে নিল। ফোনে কয়েকটা ছবি তুলে রাখল ঘরের এবং কিছু কাগজপত্রের। যেন কিছুই হারিয়ে না যায়।
মেঘ কাগজগুলো গুছিয়ে নিতে নিতেই হঠাৎ থেমে গেল। তার মাথায় রুশের বিষক্রিয়ার বিষয়টাই বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল। যদি প্রীয়তার হাতে সত্যিই রুশের বিষক্রিয়া হয়ে থাকে, তাহলে অরূপের কিছু হলো না কেন?
মেঘের ভ্রু কুঁচকে উঠল। সে হিসেব মিলাতে লাগল। যদি ওই আংটিটা রুশের হয়, আর ওটার জন্যই প্রীয়তার হাতে বিষক্রিয়া হয় তাহলে অরুপের হাতে কেন বিষক্রিয়া হয় নি? অরূপই তো সেই আংটিটা দিয়েছিল। অরূপেরও স্পর্শে আসার কথা আংটিটা। তাহলে কেন ওর কিছু হলো না?
তবে কি অরুপ জানত এটা বিষাক্ত? নিজেকে প্রটেক্ট করে নিয়েছে? না… অরূপ এমন নয়। অন্তত এতটা নির্মম না। সে কাউকে ইচ্ছে করে বিষ দেবে এটা অস্বাভাবিক। তার উপরে প্রীয়তাকে তো অসম্ভব। তাহলে?
অরূপ কি জানত না এটা বিষাক্ত? নাকি… সে জানত, আবার নিজেকে বাঁচানোর উপায়ও জানত? এতো এতো প্রশ্ন, উত্তর কোথায়?
হয়তো অরূপের কাছে আগে থেকেই প্রতিষেধক ছিল। হয়তো সে গ্লাভস ব্যবহার করেছিল। হয়তো সে শুধু পাথরটাকে “হীরা” ভেবে দিয়েছে, না জেনেই। হয়তো হয়তো আর হয়তো। কিন্তু এই ‘হয়তো’ গুলোই এখন মেঘকে সবচেয়ে বেশি পাগল করে দিচ্ছে। সে বিরক্ত হয়ে হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল। রাত ৩টা ৪০। এতটা সময় পেরিয়ে গেছে, অথচ তার মাথার ভেতরের জট একটুও খুলছে না। বরং আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মস্তিষ্কের জঞ্জাল যেন শরীরেও প্রভাব পড়তে শুরু করলো। দম বন্ধ লাগতে লাগল এই পুরোনো ধুলোর মাঝে। সে আর এক মুহূর্তও ভেতরে থাকতে পারল না। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। এ বাড়ির একপাশে রয়েছে একটা মস্ত এক খোলা বেলকনি। মেঘ সেদিকে এগিয়ে কাচের দরজাটা ঠেলে খুলতেই বাইরে থেকে ঠান্ডা, নোনা বাতাস এক ঝাপটায় তাকে ছুঁয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এ যেন এক মুক্তির বাতাস। সোজা সামনে সমুদ্র। অন্ধকার আকাশের নিচে ঢেউগুলো একটার পর একটা এগিয়ে আসছে, ভেঙে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে।
বেলকনিতে একটা ছোট গোল টেবিল, তার পাশে দুটো কাঠের চেয়ার। ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে।
মেঘ ধীরে এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে একটু ঝেড়ে বসে পড়ল। তার হাত দুটো টেবিলের ওপর রেখে মাথা নিচু করল। চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করলো।
এখানে যা কিছু চলছে, সব কিছু তার ধারণার বাইরে। এতো রহস্যের সমাধান কোথায়? সবকিছু যেন একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। কিন্তু সেই সুতোর গিঁটটা কোথায় সে খুঁজে পাচ্ছে না। সমুদ্রের বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল সে। লবণাক্ত সেই বাতাস বুকের ভেতর ঢুকে একটু স্বস্তি দিল বটে, কিন্তু মাথার ভেতরের ঝড় থামল না। মেঘ ধীরে মাথা তুলে তাকাল সামনে।
অন্ধকার সমুদ্র… অথচ অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার।
সমুদ্রের মতোই এই রহস্য। উপরে শুধু ঢেউ দেখা যায়, কিন্তু আসল গভীরতা লুকিয়ে থাকে নিচে।
সে চেয়ারে হেলান দিল। এতো এতো প্রশ্নের জবাব কোথায়? রুশ আসলে ঠিক কতটা বিষাক্ত? অরুপ ঠিক কতটা সত্য লুকিয়ে আছে? রুশের ফর্মুলা অরুপ কোথায় পেল? তসবিহ আর কাগজে আসলে কি আছে?
…রুশা?
রুশার নামটা মাথায় আসতেই মেঘ একটু সোজা হয়ে বসল। সব ঝামেলার মাঝে আরেকটা রহস্য তো সে এড়িয়ে যাচ্ছিল। শশী রহমান সানন্দাপুরে রুশার নামে ফ্লাট কেন কিনেছিলেন? উনি তো লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন রুশাকে। তবে কেন সানন্দাপুরেই?
মেঘ মাথা চেপে ধরলো। এসব রহস্য এবার তাকে বিরক্ত করছে। সে আর বসে থাকল না। মাথার ভেতরের এই বিশৃঙ্খলা নিয়ে আর এক মুহূর্তও এখানে আটকে থাকা সম্ভব না। সে উঠে দাঁড়াল। শেষবারের মতো সমুদ্রের দিকে তাকাল অন্ধকার কেটে ভোর ফুটেছে। মেঘ ভেতরে ফিরে এলো। স্টাডি রুমে ঢুকেই সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে তার বাছাই করে রাখা বই গুলো তুলে নিল। তারপর নোটবুক। ফর্মুলার কাগজটা ভাঁজ করে সাবধানে নিজের পকেটে রাখল। একটু থেমে ড্রয়ারের দিকে তাকাল। ভেতরে রাখা কালো পাথরের ছোট ছোট কয়েকটা স্যাম্পল তুলে নিল কন্টেইনারসহ। সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার পর একবার চারপাশে তাকাল। এই বাড়িতে তাকে আবার ফিরতেই হবে।
এই রহস্য এখানেই শেষ নয়, এখানে কেবল শুরু। মেঘ দ্রুত নিচে নেমে এলো। দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে। ভোরের আগের অদ্ভুত নীরবতা চারপাশে। দূরে সমুদ্রের গর্জন এখনো থামেনি। গেট টপকে বাইরে এসে গাড়িতে উঠল মেঘ। একবারও পেছনে তাকাল না।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আজ সবার আগে ঘুম ভাঙলো প্রীয়তার। চোখ খুলতেই সে কয়েক সেকেন্ড ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
গত রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে উঠল। পাশ ফিরে বিছানার দিকে তাকাতে দেখল শেহতাজ গভীর ঘুমে। সে অদ্ভুতভাবে শান্ত। মুখে কোনো কঠোরতা নেই, নেই রহস্যময়তা। বরং এতটাই নিরীহ লাগছে, যেন পৃথিবীর কোনো পাপ তাকে ছুঁয়েই দেখেনি। প্রীয়তা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা মুখ ভেংচি কাটল। এরপর উঠে বসলো। পা টিপে টিপে ডিভান ছেড়ে নেমে এসে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। দেয়াল ঘড়ির সময় বলছে ফজরের আজান হয়েছে প্রায় কুড়ি মিনিট আগে। প্রীয়তা সোজা রুশার কক্ষের দিকে গেল। মেয়েটার কাল সকাল থেকে অচেতন। এ কেমন অসুস্থতা! একটা সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে এক রাতে এতোটা অসুস্থ কিভাবে হতে পারে! রুশার ঘরের দরজা খুলতেই ভেতরের দৃশ্যটা দেখে তার বুকটা আবারো কেঁপে উঠল। রুশা এখনো একইভাবে শুয়ে আছে। নিথর। তার পাশেই রুবাই, তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। এমন কি ক্যামিকেল ব্যবহার করেছে ইমরান, যার প্রভাব কাটছেই না!!
প্রীয়তা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। রুশা কোনো ভাবেই নামাজ মিস দেয়া মেয়ে নয়। যতোই অসুস্থতা থাকুক না কেন সে নামাজ পড়বেই। আজ কি প্রচন্ড অসুস্থতা যে সে আজানের শব্দেও অচেতন!
প্রীয়তা আর ভেতরে এগোল না। কারো ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে হলো না তার। চুপচাপ দরজাটা টেনে বেরিয়ে এল। নিজের ঘরে ফেরার ইচ্ছে নেই। অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে। সে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। তার নামাজে বড্ড অনিয়মিত। একদিন পড়ে তো বাকি দিন খোঁজ নেই। তবে এসব অন্যায়। তার সব গুছিয়ে নিতে হবে। সে নামাজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকতেই দেখল, বাড়ির বেশ কয়েকজন নারী ইতোমধ্যে নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রীয়তা ওযু করে চুপচাপ এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের মতো করে নামাজ শুরু করল। কেউ তার দিকে তাকাল না। কিছু বলল না। এই বাড়িতে সে যেন এক অদৃশ্য মানুষ। থাকলেও নেই। নামাজ শেষে সবাই ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। তবু কেউ একবারও ফিরে তাকাল না তার দিকে। এবাড়ির তেমন কেউই তার সাথে কথা বলে না। কেন বলে না তা সে জানে না। তবে হয়তো সবাই নিজেদের ছেলের দোষ লুকিয়ে তাকে দোষী করতে চায়।
প্রীয়তা নামাজের ঘর থেকে বেরিয়ে একই পথ ধরে উপরে উঠে গেল। রুশার কক্ষের সামনে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত রুশার কপালে দোয়া পড়ে ফু দিয়ে সোফার দিকে এগিয়ে গেল।
চুপচাপ বসে পড়ল সেখানে। তবে তার চোখ এবার রুশার দিকেই স্থির রইল।
সকালটা ধীরে এগোতে লাগল। বাড়ির ভেতরে আলো বাড়ল। সবকিছুতেই একটা চাপা অস্বস্তি, এক ধরনের অদৃশ্য ভার ঝুলে আছে। প্রীয়তা সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছে। তার চোখ একদৃষ্টিতে রুশার মুখের দিকে। হঠাৎ, খুব ধীরে… রুশার আঙুলটা কেঁপে উঠল।
প্রীয়তা সোজা হয়ে বসল, “রুশা…?” আরেকটু নড়ল সে। তারপর খুব কষ্ট করে চোখ খুলল রুশা। চোখদুটো আধখোলা, দৃষ্টি ঝাপসা। যেন সে জেগেছে, আবার জেগেও নেই। প্রীয়তা সোফা ছেড়ে ছুটে গিয়ে রুশার পাশে বসে বলল, “রুশা… শুনতে পাচ্ছিস?”
রুশা অস্বাভাবিক ভাবে তাকাল। চোখে ফাঁকা ভাব। চিনতে পারছে, আবার পারছেও না। প্রীয়তার এই উদ্বেগের মাঝেই রুবাইয়ের ঘুমও ভেঙে গেল। রুশা ফিসফিস করে বলল, “মাথাটা ব্যথা করছে। খুব ভারি লাগছে।”
রুশা একটু উঠার চেষ্টা করলো। তবে পারলো না।
প্রীয়তা দ্রুত উঠে এক গ্লাস পানি এনে ধরল, কিন্তু রুশার হাত কাঁপছে এতটাই যে গ্লাসটা ঠিকমতো ধরতেও পারছে না। প্রীয়তা আর রুবাই দুজনই দুজনের দিকে তাকিয়ে পড়লো। এই অবস্থাটা স্বাভাবিক না। একদমই না। রুবাই দ্রুত বাড়ির সবাইকে খবর দিল। শাহরিয়ার শেখ আবার ডাক্তার তলব করলেন। ডাক্তার এসে বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলেন। চোখ, পালস, রেসপন্স সবকিছু খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “অবস্থা স্টেবল… কিন্তু পুরোপুরি স্বাভাবিক না। মাথা ব্যথা, দুর্বলতা কিছুদিন থাকবে। চিন্তার খুব বড় কারণ নেই আপাতত।”
একটা প্রেসক্রিপশন লিখে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই ওষুধগুলো নিয়ম করে দিতে হবে।”
রুবাই চুপচাপ কাগজটা নিয়ে গুছিয়ে রাখল। কিন্তু প্রীয়তা ঠিক গ্রহণ করতে পারলো না ডাক্তারের কথাটা। এই অসুস্থতা কিছুদিন থাকবে! কিন্তু এটা কি শুধু অসুস্থতা? নাকি অন্য কিছু? ক্যামিকেলের এতো বাজে সাইড ইফেক্ট!
প্রীয়তাকে একপ্রকার এবাড়িতে গৃহ বন্দি রুপেই ধরা যায়। তার কাছে কোন ফোন নেই। এই বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর অনুমতি নেই। বাড়ির কেউ কথা বলে না। তার নিজের পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ নেই তার। তার মা-বাবা অবশ্য পাগলের মতো হয়ে উঠেছেন। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও শেহতাজ বা শাহরিয়ার শেখ কেউই যোগাযোগ করতে দেয়নি।
এদিকে অন্য অস্থিরতা রুপমহলের গেটে আটকে আছে। ভোরটা ফুটতেই অরুপ এসে হাঙ্গামা শুরু করলো। সে সোজা গেটের সামনে এসে জোর করে চেঁচাতে লাগলো, “আমি প্রীয়তার সাথে দেখা করতে চাই।”
সিকিউরিটি গার্ড অনেক আটকানোর চেষ্টা করে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে কল করল শেহতাজকে,
“স্যার। একজন এসেছে নাম অরূপ। প্রীয়তা ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চায়…”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “আচ্ছা… দাঁড়াতে বলো।” এটুকু বলে কল কেটে দিয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চোখে সেই একই চেনা শীতলতা। শেহতাজ রুশার কক্ষে গিয়ে একবার দেখল। রুশার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি নেই। বাড়ির প্রায় সকলেই সেখানে। শেহতাজ সোজা প্রীয়তার সামনে এসে দাঁড়াল। খুবই ধীর আওয়াজে বলল, “তোমার জন্য কেউ এসেছে।”
প্রীয়তা কিছু না বলে তাকিয়ে রইল। শেহতাজ কোন কথা না বলে প্রীয়তার হাতটা ধরে কক্ষ থেকে বাইরে নিয়ে গেল। সকলের নজরের আড়াল করতে চাইল যেন। করিডোরে চলতে চলতেই বলল, “নাটকটা মনে আছে তো?”
প্রীয়তার গলা শুকিয়ে গেল। কে এসেছে? তার বাবা কি? ভাই আর মা? পরিবারের কেউ? প্রীয়তা দ্বিধা দন্দ ছেড়ে প্রশ্ন করলো, “কে এসেছে?”
শেহতাজ থামল, প্রীয়তাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলল, “যেই আসুক। তোমার শব্দ একই থাকবে।”
শেহতাজ প্রীয়তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ণ এক আধিপত্য নিয়ে। প্রীয়তা শক্ত ভাষায় বলল, “আমাকে এতোটাও ভয় দেবেন না যে ভয়টাই জড় থেকে উপড়ে যায়।”
এই কথাটায় শেহতাজের চোখের রঙ বদলালো। সে তার একই শয়তানী বাঁকা হাসি এঁকে প্রীয়তার কোমর জড়িয়ে একেবারে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তাকে খুব কাছে ধীর কন্ঠে বলল, “সো মাই ডিয়ার বাটারফ্লাই। বলো ভয়টা তোমার ভেতরে স্থায়ী করতে কি করতে হবে? কারো মৃ/ত্যু চাও? নাম নাও। আমি কথা দিচ্ছি মাত্র ৫ মিনিট সময় নেবো। দুনিয়ার যে কোন প্রান্তে থাকুক। তোমার কদমে লা/শ এনে ফেলবো।”
প্রীয়তার দৃঢ়তা ভেঙে গেল। সে অবশ্য শেহতাজের তেমন কোন হিংস্রতা দেখেনি। তবে তারপরেও তার মাঝে কিসের ভয় এটা!
শেহতাজ মুহূর্তেই এক ঝটকায় প্রীয়তাকে দূরে ঠেলে দিল। এরপর আবারো ঠাণ্ডা স্বরে বলল, “বাইরে গেটে তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কেউ। তোমার আমার সবকিছু যে সত্য সেটা বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব তোমার। যদি সে বিশ্বাস না করে তবে দুই পায়ে এসেছে চার পায়ে যাবে।”
প্রীয়তার চোখে ভয় নেমে এলো। সে আর একটা শব্দও উচ্চারণ না করে। গেটের দিকে এগিয়ে গেল। পিছে এগিয়ে চলল শেহতাজ। অরূপ অপেক্ষা করছিল প্রধান ফটকের কাছে। সিকিউরিটি গার্ড তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। প্রীয়তা সেখানেই এগিয়ে চলল, প্রীয়তাকে দেখতেই অরুপের চোখে এক ঝলক স্বস্তি জ্বলে উঠল। আর প্রীয়তার চোখে আর্তনাদের মত যন্ত্রণা। অরুপ পাগলের মত ছুটে প্রীয়তার কাছে আসার চেষ্টা করলো, সে বলল, “প্রীয়তা…! তুমি…” কথাটা শেষ করতে পারল না। সিকিউরিটি গার্ড তাকে আটকে দাঁড়ালো। প্রীয়তা এবার হাত দিয়ে থামিয়ে দিল। তার মুখ শক্ত। চোখ ঠান্ডা। সে এক প্রকার রাগ নিয়ে বলল, “কেন এসেছ?”
অরূপ থমকে গেল, “আমি… তোমার জন্য এসেছি। তুমি…”
“তোমাকে কেউ কিছু বলেনি? আমি বিয়ে করে নিয়েছি শেহতাজকে। এখন কি দেখতে এসেছ?” কথাগুলো ধারালো। ইচ্ছাকৃত। যেন শরীরটা জ্বালিয়ে দিতে বলছে। অরূপের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, “কি বলছ তুমি…? আমি জানি ওরা তোমাকে জোর করে এখানে আটকে রেখেছে। প্রীয়তা একবার মুখ খোলো। মিডিয়াতে আমরা সব ফ্লাশ করে দেব। এদের মুখ টেনে খুলে দেবো। আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব।”
প্রীয়তা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল, “তারপর?”
“যা হয়েছে আমরা অতীত মুছে ফেলব। আমরা বিয়ে করে নেব। দরকার হলে দেশের বাইরে সেটেল হয়ে যাব।”
প্রীয়তা হাত উঠিয়ে অরুপকে থামালো, “মহলটা দেখছো? এটা এখন আমার বাড়ি। এ বাড়ির একমাত্র রাজকুমার আমার স্বামী। আমার বাবা নিজে সম্বন্ধ করে বিয়ে দিলেও এত রিচ ফ্যামিলিতে আমাকে বিয়ে দিতে পারতেন না। ওই সরকারি চাকরিজীবী, কিংবা কোন বড় ব্যবসায়ী। এই তো বিয়ে দিতেন! তাই আমি নিজের ভাগ্য নিজে লিখেছি। সানন্দপুরের সব থেকে রিচ ফ্যামিলিতে বিয়ে করে নিয়েছি। তোমার সঙ্গে আমি কি পেতাম অরূপ? প্রথমত ধর্ম আলাদা। আমি কি জাহান্নামে যাবো মরার পর? যেখানে আমি সব পেতে পারছি। সেখানে এসব ঠুমকো ভালোবাসা দিয়ে আমি কি করবো? আমাকে ভুলে যাও। মানুষজন জীবনে অনেক রকম ভুল করে। তুমি আমার জীবনে ঠিক তেমনই একটা ভুল। তুমি বয়সে এখন অনেক ছোট। যাও আগে নিজে বড় হও তারপর দাবি করতে এসো। ”
অরূপ স্তব্ধ। প্রীয়তা আরো এক পা এগিয়ে গেল। “তুমি আমাকে কি দিতে পারো, অরূপ? বলো? এই জীবন? এই নিরাপত্তা? এই ক্ষমতা?”
শেহতাজ দূরে বাড়িতে প্রবেশের মেইন ফটকের সামনে দাঁড়ানো। প্রীয়তা হাত বাড়িয়ে শেহতাজের দিকে ইশারা করল। “ও যা দিতে পারে… তুমি তার অর্ধেকও পারবে না। অর্ধেক তো দূরে থাক, এক কানাকড়িও দিতে পারবে না। আমার এই এক জীবনের সব চাই। অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা সব মানে সব। তোমার কি মনে হয় রুশা কে ওরা এমনি নিয়ে যেতে পেরেছে? আমি নিজে বের করে দিয়েছি রুশাকে শুধু শেহতাজকে বিয়ে করার জন্য।”
অরূপের চোখ ভিজে উঠছে, “প্রীয়তা। তুমি কি বলছ, তুমি …”
“আমি ওকে ভালোবাসি। আমি শেহতাজকে ভালোবাসি। আমার বাবা একদমই পছন্দ করতেন না আমি শেখ বাড়ির কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব পর্যন্ত রাখি। তারপরও কেন রেখেছি? তোমার কি মনে হয়?”
প্রীয়তা প্রতিটি শব্দ এত নিখুঁতভাবে বলে চলল যেন এগুলোই সত্য। শব্দগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধল। অরূপ এক পা পিছিয়ে গেল। তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। তারপরও কেন সত্যের মত লাগছে? তার চোখে মুখে অবিশ্বাস। “না… এসব সত্য না।”
প্রীয়তা মুখ ফিরিয়ে নিল। “প্লিজ… আর আসবে না। যদি আসো তবে আমি সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে বের করে দেব।” দরজার পাশে দাঁড়ানোর সিকিউরিটি গার্ডের দিকে তাকিয়ে প্রীয়তা আদেশের স্বরে বলল, “ছেলেটাকে চিনে রাখুন আর যদি মহলে প্রবেশের চেষ্টা করে তবে বের করে দেবেন। আমাকে কিংবা শেহতাজকে জানানোর কোন প্রয়োজন নেই।”
সিকিউরিটি গার্ডগুলো বাধ্য মানুষের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অরূপের সব শব্দ যেন জমে গেছে। সেকিছুই বলল না আর। চোখের ভেতরের সবকিছু চাপা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ভারি কদমে এগিয়ে চলল প্রীয়তার দৃষ্টি সীমার আড়ালে। সিকিউরিটি গার্ড গেটটা ভারি আওয়াজে বন্ধ করে দিল গেট বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন প্রীয়তার বুকের ভেতর গিয়ে লাগল। সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। শেহতাজকে এড়িয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
হঠাৎ করে ভেঙে পড়ল। বিছানার পাশে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}