ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৬৬তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৬৬.

প্রীয়তার কান্না থামলো না। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। যেন এই ঘরের দেয়ালগুলো তাকে চেপে ধরছে।
সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল জোরে। এক মুহূর্ত দেরি না করে শাওয়ারটা চালু করল। ঠান্ডা পানি ঝরতে শুরু করল মাথার ওপর। চুল ভিজে গেল, মুখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। পানি, নাকি চোখের জল, আলাদা করা গেল না। প্রীয়তা দুহাতে দেয়াল আঁকড়ে ধরল। তারপর চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
“আল্লাহ! আমি কি দোষ করেছিলাম? কেন… কেন আমার সাথে এমন হচ্ছে! কোন পাপের শাস্তি এসব? কোন ভুল আমার জীবন ধ্বংস করে দিল?”
সাওয়ারের পানি ঝরছে অবিরাম। তার সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে প্রীয়তার কান্না। প্রীয়তা দাঁতে দাঁত চেপে, ভেজা ঠোঁট কাঁপিয়ে অভিশাপ ছুড়ে দিতে লাগলো, “শেহতাজ তুই শেষ হয়ে যা। তোর জীবন ধ্বংস হয়ে যাক! তোর মৃ/ত্যু না। আজ আমি যেই যন্ত্রণার মাঝ দিয়ে যাচ্ছি এই একই যন্ত্রনা তোর হোক। আমার জীবনের দায় নিতে হবে তোকে। তুই আমাকে যেভাবে ভাঙছিস, আমার আল্লাহ তোকে ঠিক সেভাবে ভাঙুক। আল্লাহ তোকে ছাড়বে না…!” এটুকু বলেই শরীরটা ছেড়ে নিচে বসে পড়ল টাইলসের ওপর। পানি পড়ছে… পড়েই যাচ্ছে। প্রীয়তা ছোট বাচ্চাদের মতো কেঁদেই চলল লম্বা সময়। 
সময় কেটে গেল কতক্ষণ সে জানে না! ধীরে তার কান্না স্তিমিত হলো। শ্বাসগুলো ভারী থেকে স্বাভাবিক হতে লাগল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মাথা তুলল। ফ্লর থেকে উঠে বেসিনে এগিয়ে গিয়ে দুহাতে মুখের পানি সরিয়ে নিল। চোখ দুটো লাল, ফুলে গেছে। ঠিক তখনই তার মাথায় স্পষ্ট প্রশ্ন উঠল। “কেন…?”
প্রীয়তা আয়নার দিকে ভালো করে তাকাল। নিজের ভেজা, ভাঙা মুখটার দিকে। শেহতাজ কেন এমন করছে? বাড়ির কেউ এই বিয়ে চায় না। সবাই চায় রুশার সাথে শেহতাজের বিয়ে হোক। তবুও সে জোর করে কেন বিয়ে করল। কেন? 
প্রীয়তার চোখ সরু হয়ে এল, “এর মানে… আমি দরকার। আমাকে দরকার ওর??” এক ঝটকায় শাওয়ার বন্ধ করে দিল সে। পানি পড়া থেমে গেল। তার কাছে জটলা পাকানো সব প্রশ্নরা ভীড় জমালো। কেউ তো তার জন্য লড়বে না। তার নিজের পথ নিজেকেই খুঁজতে হবে। সে আয়নায় নিজের চোখে চোখ রেখে বলল, “আগে জানতে হবে… কেন আমি?”
সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ভেজা পোশাকেই বেরিয়ে এলো। আলমারি খুলে একটা শাড়ি বের করল। হাত কাঁপছে না আর। ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিল। ভেজা চুল পিঠে পড়ে রইলো। চোখে আর কান্না নেই। তাকে নিজেকে মুক্ত করতেই হবে। এই কালকুঠরি থেকে তার মুক্তি চাই। আর কিছুই চাই না। শুধু মুক্তি লাগবে‌। 
সকালটা কোলাহলে চলমান। মেঘ বাংলো থেকে বেরিয়ে আর নিজের বাড়িতে ফেরেনি। তার মাথায় এখন শুধু একটাই জিনিস রুশ। গাড়িটা নিয়ে সোজা পৌঁছালো সে গবেষণাগারে। অনেক দিন কলেজে যাওয়া হয় না। জীবনটা বড্ড বাজে পথে হাটছে। মেঘ নিজের আইডিকার্ড খুঁজল। গাড়ির বক্সেই ছিল। এখানেই রাখে সে সব সময়। গাড়িটা পার্ক করে গবেষণাগারের ভিতরে ঢুকেই সে সোজা উপর তলায় ল্যাবরেটরির দিকে গেল। রুশের স্যাম্পল সহ সব কাজ এই ল্যাবরেটরিতে হয়। মেঘ সরাসরি ডাটা সেকশনে গিয়ে পুরোনো রিপোর্টগুলো খুলে বসলো। পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগল। বেশ কয়েকপাতা পরে একটা রিপোর্টে তার চোখ থেমে গেল। “ফিল্ড এক্সপোজার রিপোর্ট…” সে পড়তে লাগল দ্রুত। খনিতে যারা সরাসরি রুশ সংগ্রহ করেছে। তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক এলার্জি, চর্মরোগ, ফুসকুড়ি, ত্বক পুড়ে যাওয়া এমনকি কয়েকজনের মৃত্যু। মেঘ থমকে গেল। এটা সে আগে কেন দেখিনি…?
মেঘের মাথায় আরো প্রশ্ন নেমে এলো। “তবে ল্যাবে যারা কাজ করেছে তাদের কিছুই হয়নি কেন? কারণ কি?”
মেঘ পাশেই একজন গবেষকের দিকে তাকালো। তার হাতে সাদা গ্লাভস। গবেষণাগারের বেশ কিছু নিয়মের মাঝে তো এটাও একটা নিয়ম যে গ্লাভস ছাড়া কোথাও হাত দেয়া যাবে না। নিয়ম মেনে গ্লাভস, প্রোটেকশন। তাহলে এ কারনেই কোন রিয়েকশন হয় নি কারো! মানে সরাসরি স্পর্শেই সমস্যা।
মেঘ নিজের আনা স্যাম্পল কন্টেইনার থেকে ছোট কালো পাথরটা বের করে কাচের ট্রেতে রাখল। পাশেই আরেকটা পুরোনো
নরমাল রুশ স্যাম্পল। যেটা দিয়ে তারা এতদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে এই গবেষণাগারে।
প্রথমে সাধারণ টেস্ট। pH টেস্ট। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। ডিস্টিলড ওয়াটারে কোনো রিঅ্যাকশন নেই। সে কন্টেইনারের লিকুইডটাও পরীক্ষা করল। হালকা অবাক হলো, এটা তো একেবারে সাধারণ বৃষ্টির পানি। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে এবার গবেষণাগারে সুরক্ষিত রুশ স্যাম্পলের পরীক্ষা চালালো। তবে রেজাল্ট একই। কোন অস্বাভাবিকতা নেই। মেঘ এবার একের পর এক কেমিক্যাল। Ethanol। Acetone। Hydrochloric acid (HCl)। Nitric acid (HNO₃) দিয়ে পরীক্ষা চালানো। কিন্তু কোনো রিঅ্যাকশন নেই। একেবারে নিষ্ক্রিয়। 
মেঘ দাঁত চেপে ধরল, “না এটা ঠিক না। বিষ থাকলে কিছু না কিছু রিঅ্যাক্ট করবেই। করছে না কেন?”
সে এবার আরও গভীরে গেল। স্পেকট্রোমেট্রি সেট করল। তবুও রিডিং অস্বাভাবিক না। ধরা যাচ্ছে না। গবেষণাগারে উপস্থিত রুশ এবং তার আনা রুশ দুটোতেই কোন বিষ নেই। অন্ততঃ পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না। তাহলে? এটা কি সাধারণ কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন নয়?
সে ধীরে তাকাল ল্যাবের অন্য সেকশনের দিকে।
একটা শক্তিশালী, প্রায় ব্যবহার না করা কেমিক্যাল। Oxidizing agent। Potassium permanganate (KMnO₄)। আরেকটা Hydrogen peroxide (H₂O₂), উচ্চমাত্রার। এগুলো তাদের মতো মাত্র ইন্টার্নদের ধরতে পর্যন্ত দেয়া হয় না। এগুলো মারাত্মক ভয়াবহ ক্যামিক্যাল। তবে এর সঠিক মাত্রা ব্যবহারে বেশ কাজের।
মেঘ থামল। গভীর শ্বাস নিল। সে তার হাতের গ্লাভসের উপর আরেকটা মোটা গ্লাভস পরে নিল। চোখে গগলস ঠিক করল। যদি এটায় জৈব-অজৈব মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয় তবেই ধরা যাবে কিছু। ছোট্ট পরিমাণ স্যাম্পলের ওপর ফোঁটা ফোঁটা করে দিল সলিউশন। কিন্তু কিছুই হলো না। তারপর সে যোগ করল ঘনীভূত হাইড্রোজেন পারক্সাইড। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করতেই পাথরের চারপাশে হালকা ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। রঙ বদলাতে লাগল। গাঢ় কালো থেকে একটা অদ্ভুত সবুজাভ-নীল আভা ফুটে উঠল। মেঘের চোখ বড় হয়ে গেল। এটাই…! সে আরও কাছে ঝুঁকল। হালকা বুদবুদ। মৃদু তাপ। সে ফিসফিস করে বলল। রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। “Reactive under oxidative stress…
মানে সাধারণ অবস্থায় নিষ্ক্রিয়। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিবেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই বিষ। তাহলে… মানবদেহে?
তার মানে রক্ত, অক্সিডেশন, এনজাইম, এটাগুলোর ভিতরে গিয়ে সক্রিয় হয়…”
তারমানে রুশ বাইরে নয় ভেতরে গিয়ে বিষ হয়ে ওঠে। মেঘ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। কাচের ট্রের ওপর রাখা পাথরটার দিকে তাকিয়ে তার চোখে এক ধরনের তীব্র মনোযোগ জমে উঠল। চারপাশের সব শব্দ যেন মিলিয়ে গেছে। শুধু ল্যাবের হালকা মেশিনের গুঞ্জন… আর তার নিজের শ্বাসের ওঠানামা। তারপর সে ধীরে টেবিলের পাশে রাখা নোটপ্যাডটা টেনে নিল। কলমটা শক্ত করে ধরে দ্রুত লিখতে শুরু করল, 
“পর্যবেক্ষণ ১: বাহ্যিকভাবে নিষ্ক্রিয়। সাধারণ রাসায়নিক সংস্পর্শে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না।
পর্যবেক্ষণ ২: তীব্র রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আইডেন্টিফাই করা যায় বিষ।
সিদ্ধান্ত: সম্ভাব্য জৈব-সক্রিয় যৌগ। মানবদেহের অভ্যন্তরে (রক্ত/এনজাইম দ্বারা) এর সক্রিয়করণ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।).”
মেঘের হাত থামছে না। যেন মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো একসাথে কাগজে ঝরে পড়ছে।
কিন্তু হঠাৎই সে থেমে গেল। কলমটা মাঝ বরাবর স্থির হয়ে রইল। তার ঠোঁট নড়ল খুব ধীরে, “তাহলে যারা সরাসরি এটা স্পর্শ করে তাদের রিয়েকশন হয় না কেন? রুয়ানাই সম্প্রদায়…!”
মেঘের মস্তিষ্কে একে একে জমে উঠলো হিসেব। তবে সেই আদিবাসী রুয়ানাই যারা রুশ পাথরের দেবতার পূজা করে। তাদের কোন রিয়েকশন কেন হয় না? স্পর্শ করে নাই তাই? কেউই কি স্পর্শ করে না? নাকি ওরা জানে কিভাবে পাথরের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে হয়? 
মেঘ ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। চোখ বন্ধ করল।
সে পুরো দৃশ্যটা আবার মনে মনে দেখতে লাগল। একেবারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। “ওরা তো সরাসরি স্পর্শ করে দিনের পর দিন। তবুও তাদের কিছু হয় না। মানে… পাথরটা বিষাক্ত নয়। কিন্তু কিভাবে?”
রুয়ানাইদের সেই উৎসবের রিচুয়াল মনে করলো মেঘ। সিঁদুর, হলুদ, কাঁচা দুধ এগুলা দিয়ে পাথরটাকে মাখিয়ে শেষে পদ্মার পানি দিয়ে স্নান করানোর পর পূজা দেয়া হয়। তার কলম আবার কাগজে ছুটল। “Turmeric (হলুদ): natural anti-oxidant, anti-inflammatory. Milk: casein protein সম্ভাব্য binding agent।
Sindoor: (mercuric sulfide/lead based compound) heavy metal interaction.”
সে থামল। মাথা একটু কাত করল, “না… এগুলো আলাদা আলাদা কিছু না… এটা একটা layered process…” 
তার দৃষ্টি এবার সোজা পড়ল কন্টেইনারে থাকা সেই স্বচ্ছ তরলের দিকে। সে খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল, “Distilled almost mineral-free, slightly acidic depending on environment. ”
সে দ্রুত নিজের আনা স্যাম্পলটা আবার পরীক্ষা করতে লাগল। একই প্রক্রিয়া। একই শক্তিশালী অক্সিডাইজিং টেস্ট। কিন্তু কিছুই হলো না। না ধোঁয়া। না রঙের পরিবর্তন। না তাপ। পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। মেঘ স্থির হয়ে গেল। তার ঠোঁট ধীরে নড়ল “এই স্যাম্পলটা… already neutralized…”
মেঘ এবার শেষ পরীক্ষার দিকে এগোলো। তার পকেট থেকে একটা সাদা টিস্যু বের করল। চন্দ্রমহলের সেই পিতলের বোতলের থেকে সে এই স্যাম্পল টুকু আলাদা করেছিল গোপনে। এর মাঝে ঠিক কি লিকুইড ছিল এটা তাকে জানতেই হবে। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় টেস্ট করার পর মেঘ জানতে পারলো এটায়ও বৃষ্টির পানি রয়েছে। 
তার মাথার ভেতর যেন একের পর এক সমীকরণ তৈরি হতে লাগল। “দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টির জলের সংস্পর্শে থাকলে বিক্রিয়াশীল যৌগসমূহের ধীরে ধীরে লিচিং হয়। জারণজনিত অস্থিতিশীলতা কমে যায় পৃষ্ঠের বিষাক্ততা প্রশমিত হয়…”
সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। আস্তে বলল, “Continuous immersion… slow deactivation…”
মেঘ এবার যেন হিসেবটা মিলিয়ে উঠলো। ওই ধাঁধার আসল উদ্দেশ্য রুশের বিষক্রিয়া মুক্তি। 
“হামজা আংকেল সব জানতেন। এই পাথরের বিষ কিভাবে কাজ করে আর কিভাবে নিষ্ক্রিয় করতে হয়। আর সবটা গুছিয়ে উনি জানিয়েও গিয়েছেন।”
মেঘ থামল। বাকি টুকু নোট নিয়ে খুব ধীরে কলমটা নামিয়ে রাখল। তার মাথার ভেতর এখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু সবটুকু সত্য অরুপের। ও কি করে আলাদা করেছে রুশ থেকে কালো হীরে। অরূপ কেনই বা প্রীয়তাকে ওই আংটিটা দিয়ে আবার ফেরত নিয়ে গিয়েছিল? কার ভয়ে? আমরা জেনে যাব তাই? নাকি বিষক্রিয়া যাতে বেশি না হয়? অরুপ কি তবে প্রীয়তাকে দিয়ে হিউম্যান টেস্ট চালালো? যে বিষটা ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে? না না মেঘ এতটা অবিশ্বাস করতে চায় না অরুপকে। 
ওদিকে রুপমহলে প্রীয়তা নিজের ঘরের দরজাটা আস্তে খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। করিডোরটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ। বড় বড় জানালা দিয়ে সকালের আলো ঢুকে মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলেছে। এই বাড়িটা এই বিশাল, বিলাসবহুল মহল কেমন যেন তার কাছে অচেনা এক গোলকধাঁধা মনে হলো আজ। তার পায়ের শব্দ খুব মৃদু। যেন সে নিজেই নিজের উপস্থিতি লুকিয়ে রাখতে চাইছে। আজ সে থামবে না। আজ সে খুঁজবে। সে করিডোর ধরে এগোতে লাগল। এই বাড়ির অনেকগুলো ঘর সে চেনে। প্রথম যখন এ মহলে সে এসেছিল তখন রুশা, রুবাই ওরাই ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল এ মহল। কিন্তু এই বাড়ির প্রতিটা দেয়ালের আড়ালে যেন আরও অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। শেহতাজ সাধারণত এই সময় বাড়িতে থাকে না। তার বিষয়ে অনুসন্ধানের এইটাই মূখ্য সময়। একটার পর একটা করিডোর পেরিয়ে হঠাৎই প্রীয়তা থেমে গেল। দ্বিতীয় তলার শেষ প্রান্তে। একটা ভারী দরজা, দরজার সামনে ঝুলছে বড়সড় একটা তালা। প্রীয়তার চোখ সরু হয়ে এল। এই ঘরটা সে চেনে। নাম না জানলেও কাজটা জানে, এটা শেহতাজের স্টাডি। তার কাজের জায়গা। যেখানে সে কাউকে ঢুকতে দেয় না। কিন্তু নিজের বাড়ির ভেতরে নিজের কাজের ঘরে তালা?
প্রীয়তা একটু ঠোঁট বাঁকলো, “ঘরে কি গুপ্তধন আছে? নিজের বাড়িতেই তালা!” সে ধীরে এগিয়ে গেল দরজার কাছে। হাত বাড়িয়ে তালাটাকে ছুঁয়ে দেখল। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো তালাটা ভেঙে ভেতরে তল্লাশি চালাতে। কিন্তু না। এখনই না। তার সত্য চাই। অনুসন্ধান করতে হবে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে সরে গেল, নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল, “চাবি লাগবে। যেভাবেই হোক চাবি প্রয়োজন।” 
প্রীয়তা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলল এই কক্ষের সামনে থেকে পা ঘুরিয়ে এবার সে এগিয়ে গেল পাশের আরেকটা কক্ষে। এটা রুশার বাবার ঘর। সে খুব ভালো করেই চেনে এ ঘর। এই একটা মানুষ যাকে সে না দেখেও শ্রদ্ধা করে। কেন জানি এই মানুষটাকে সম্মান করতে ইচ্ছে হয়। এই জঘন্য শেখ বংশে কি করে হামজা জন্মাতে পারে এই হিসেবই যেন প্রীয়তার মেলে না। 
এই ঘরটা এখনো আগের মতোই আছে। যেন সময় এখানে থেমে আছে। প্রীয়তা ধীরে ঘরের ভেতর হাঁটতে লাগল। টেবিল, বুকশেলফ, দেয়ালের ছবি সবকিছুতে চোখ বুলিয়ে নিল। একটা অদ্ভুত ভারি নীরবতা এখানে। তারপর আর দাঁড়াল না। সোজা বেরিয়ে রুশার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আগের মতোই দৃশ্য, রুশা ঘুমিয়ে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে, নিঃশ্বাস ধীর। পাশেই বসে আছে রুবাই। প্রীয়তা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে এগিয়ে এসে রুবাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে একদম সোজা, নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করলো, “উত্তর দিকের ঘরটা তালা দেওয়া কেন?”
“কোন ঘরটা?”
“হামজা আংকেলের ঘরের পাশের ঘরটা। যেটা তোর ভাইয়ের স্টাডি রুম।”
রুবাই একটু চমকে তাকাল। প্রশ্নটা যেন সে আশা করেনি। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “ভাইয়া পছন্দ করে না… কেউ ওর কাজের জায়গায় যাক। তাই সবসময় তালা দিয়ে রাখে।”
প্রীয়তা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “এসব মুখস্থ কথা আমাকে বলিস না, রুবাই। তোর ভাইয়ের ওই ঘরে ঢোকার ডুপ্লিকেট চাবি কোথায় পাবো?”
রুবাইয়ের মুখের রঙ পাল্টে গেল, “তোর কি মরার শখ হয়েছে?”
প্রীয়তা এবার সত্যি করে হেসে উঠল, “তোর ভাই আর যাকেই মারুক, আমাকে মারবে না। অন্তত ততদিন না, যতদিন আমি ওর কাজের।”
“মানে?”
“ওসব ভারী জিনিস তোর বুঝতে হবে না। তোর কাছে ওঘরে ঢোকার কোনো উপায় জানা থাকলে বল।”
“ওই তালাটা ভাইয়া নিজে এনে লাগিয়েছে। ওটার কোনো ডুপ্লিকেট চাবি নেই। তবে তুই তো একই ঘরে থাকিস। বিছানার পাশে যে ছোট টেবিলটা আছে, তার ফাস্ট ড্রয়ারে ভাইয়া সব চাবি রাখে। দেখে নিতে পারিস সেখানে থাকতেও পারে। শুধু ধরা পড়িস না।”
প্রীয়তার ঠোঁটে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল, “দেখা যাক…” এটুকু বলেই সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিল, “রুশার কি অবস্থা?”
“উন্নতি হচ্ছে না তেমন। কেমিক্যালটা ওভারডোজ ধীরে কাজ করেছে। বেচারি মেয়েটা। এখন শুধু দোয়া কর। মেয়েটা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায়।”
“সুস্থ হলেই বা কি…? তোর বাপ- ভাই মেয়েটাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে এ বাড়িতে মমি হিসেবে সাজিয়ে রাখবে।”
রুবাই এই কথার প্রতি উত্তরে কিছুই বলতে পারলো না। সে কি বা বলতে পারে। সে সব জানে, বোঝে। তাও দেখে চলেছে এ খেলা। 
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন