৭৭.
রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি। নিজের ঘরের বারান্দায় বসে মেঘ। সামনের অন্ধকার আকাশে মেঘ জমেছে। দূরে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা বাইরের আবহাওয়ার চেয়েও ভয়ংকর।
ইলিয়ানা ডিসুজা। শেহতাজ শেখ, কিং কোবরা, রুপমহল সবকিছু একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। কিন্তু সেই সুতোটার মাথা খুঁজে পাচ্ছে না সে। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল দেয়ালের ঘড়িতে। রাত ১১:৫৮।
মেঘ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ফোনটা হাতে তুলে দ্রুত একটা নম্বরে কল করল। দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো,
“হ্যালো?”
“আঙ্কেল, আমি মেঘ।”
ডিআইজি পারভেজ সওদাগর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন “এত রাতে? কী হয়েছে?”
মেঘ গভীর শ্বাস নিল, “আমি যা বলব, অনুগ্রহ করে মাঝখানে বাঁধা দেবেন না।”
তারপর একে একে সব বলতে শুরু করল। শেহতাজের স্টাডি রুম, গোপন নথি, কিং কোবরা স্কেচ, জন্মসনদ, ইলিয়ানা ডিসুজা, অজ্ঞাত কিছু মানুষের ছবি, সব বর্ননা করলো। প্রায় বিশ মিনিট ধরে একটানা কথা বলল সে। ওপাশে পুরো সময়টাই নীরবতা।
শেষে মেঘ থামতেই পারভেজ সওদাগরের ভারী নিঃশ্বাস শোনা গেল।
“তুমি নিশ্চিত?”
“পুরোপুরি না। কিন্তু যতটুকু পেয়েছি, সেটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।”
ওপাশে আবার নীরবতা। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নয়। একজন বাবা হিসেবে। এই মুহূর্তে পারভেজ সওদাগরের মাথায় একটাই নাম ঘুরছে। প্রীয়তা। তার মেয়ে। যে এখন সেই বাড়ির ভেতরে।
“প্রীয়তা নিরাপদ তো?”
“এখন পর্যন্ত হ্যাঁ। আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ও খুব সাবধানে আছে। ওর কাছে ফোন আছে। সুযোগ পেলে আপনার সাথেও যোগাযোগ করবে।”
কথাটা শুনে কিছুটা শান্ত হলেন তিনি। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, “কাল সকাল থেকেই আমি কাজ শুরু করব।”
“কিন্তু আপনি তো…”
“সাসপেন্ড আছি, জানি।”
“তাতে কী হয়েছে? ইউনিফর্ম খুলে নেওয়া যায়। অভিজ্ঞতা না। সম্পর্ক না। তথ্যসূত্র না।”
মেঘ চুপ করে শুনে গেল। পারভেজ আরো বললেন, “অফিশিয়ালি কিছু করতে পারব না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে পারব। আর আমি করবও।”
“আমি আপনার সঙ্গে আছি আঙ্কেল।”
“জানি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর পারভেজ নরম গলায় বললেন, “মেঘ?”
“জি?”
“আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।”
মেঘ জানালার বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কলটা কেটে গেল।
কয়েক মিনিট মেঘ চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিচ্ছিল না। বরং আরও দ্রুত কাজ করছিল। হঠাৎ সে সোজা হয়ে বসল। দ্রুত ফোন তুলে প্রীয়তাকে মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল, "কাল একটা কাজ করতে হবে। রুপমহলের ইলেকট্রনিক লাইনে যে করেই হোক গড়মিল তৈরি করবি। এমন সমস্যা করতে হবে যাতে বাইরের টেকনিশিয়ান ডাকতে হয়। কিন্তু সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে যখন কোনো পুরুষ থাকবে না, তখন। কাউকে সন্দেহ করার সুযোগ দিবি না। আর কিছু করিস না। শুধু সুযোগ তৈরি কর। বাকিটা আমি দেখব।"
মেসেজটা পাঠিয়ে মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আর একটু সময়, প্রীয়।”
রাত গভীরে ছুটছে। বাথরুমের ভেতর শাওয়ারের শব্দ হচ্ছে। প্রীয়তা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাত দুটো কাঁপছে। মনের ভেতর অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। আজকের রাতটা ভয়ংকর। খুব ভয়ংকর। শেহতাজ তাকে কখনো এভাবে স্পর্শ করেনি। এভাবে কাছে আসেনি। এভাবে তাকায়ওনি। প্রীয়তা ডিভানের কোণায় গিয়ে বসে পড়ল। অজান্তেই নখ কামড়াতে শুরু করল। তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে। কেন এমন করছে এই মানুষটা? আজ কী হবে? স্টাডি রুমে ঢোকাটা কি ভুল ছিল? শেহতাজ কি সত্যিই কিছু জানে না? নাকি জানে, কিন্তু প্রকাশ করছে না? এটা কি তার শাস্তি দেবার পথ?
না না না প্রীয়তা আর ভাবতে পারছে না। এসব ভাবনা তাকে পাগল করে দিচ্ছে। আজও তাকে গতকালের নাটকটাই চালিয়ে যেতে হবে। ঘুমের থেকে বড় নাটক আর কি হতে পারে! সে আজও ঘুমিয়ে পড়ার অভিনয় করবে। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ। সঙ্গে সঙ্গে ডিভানের ওপর গা এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করল। শ্পাতলা কাঁথাটা টেনে এমন নাটক করলো যেন গভীর ঘুমে ডুবে আছে। এ ছাড়া যে তার বেঁচে থাকার উপায় নেই। সে এই মানুষটাকে ফেস করবে কিভাবে?
কয়েক মিনিটের মাঝেই বাথরুমের দরজা খুলল। শেহতাজ ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। তার ভেজা চুল থেকে এখনো পানি ঝরছে। সে একবার ঘরটা দেখল। তারপর চোখ গিয়ে থামল ডিভানের ওপর।
প্রীয়তা ঘুমন্ত। শেহতাজের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। সে ধীরে এগিয়ে গেল। ডিভানের পাশে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার ভেজা চুল থেকে একফোঁটা পানি প্রীয়তার গালে পড়লো। প্রীয়তার চোখের পাতা অতি সূক্ষ্মভাবে কেঁপে উঠল। এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। শেহতাজ বুঝে গেল। সে ঘুমায়নি। নাটক করছে। তার হাসিটা আরও গভীর হয়ে উঠল। খুব নিচু স্বরে একেবারে প্রীয়তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “অভিনয়টা খারাপ না।”
প্রীয়তা ভেতরে ভেতরে জমে গেল। কিন্তু চোখ খুলল না। পরের মুহূর্তেই সে বুঝতে পারল শেহতাজ আরো বেশি ঝুঁকেছে। তারপর আচমকা তাকে দুহাতে তুলে নিল। পাঁজাকোলা। প্রীয়তা চমকে উঠে চোখ খুলে ফেলল, “আপনি!”
শেহতাজ নির্বিকার। তার বাহুর ভেতর প্রীয়তা যেন একেবারে বন্দি। সে একেবারে মাদকতা ভরা কণ্ঠে বলল, “মিসেস শেহতাজ। নাটকে আপনি বড্ড কাঁচা।”
প্রীয়তার বুক ধক করে উঠল। শেহতাজ হাঁটতে হাঁটতে বিছানার দিকে এগোল।
“তুমি না গতকাল বললে, তুমি আইনগতভাবে আমার স্ত্রী? তোমার অধিকার আছে। কিছু অধীকার তো আমারও আছে।”
প্রীয়তা কিছু বলার আগেই সে তাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল, “তবে তোমার জায়গা ডিভানে কেন?”
প্রীয়তা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল, “আ…পনি … আপনি না বলেছিলেন দূ…রত্ব রাখতে। এখন এমন ব্যবহার কেন করছেন।”
“দূরত্ব কি তুমি রেখেছো? নাকি আমাকে রাখতে দিচ্ছো?”
“আপনি এসব কী…?”
শেহতাজ দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে সেই অদ্ভুত হাসি, “এখনো তো শুরুই করিনি আমি কিছু।”
প্রীয়তার শরীরের সমস্ত স্নায়ু যেন একসঙ্গে টনটন করে উঠল। সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে এল। এক মুহূর্তও দেরি না করে ডিভানের দিকে এগোতে লাগল, “আমি ডিভানেই শোব।”
পেছন থেকে শেহতাজের শান্ত গলা ভেসে এলো,
“কাল তো বেশ জোর গলায় বললে তুমি আমার ওয়াইফ লিগ্যালি এন্ড সোস্যালি। তাহলে ডিভানে শোবার কি আর প্রয়োজন আছে? নাকি ওসব নাটক ছিল? তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো বাটারফ্লাই?”
প্রীয়তা থামল। একবার দোয়া ইউনুস পড়লো। তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বের হতেই হবে। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, “আমি আপনার বাড়িতে বন্দি। আমার তো নিজের নিঃশ্বাসটাও আপনার কাছে বন্দি। আমি কি লুকাবো? আমার নিজের বলতে কি আছে?”
শেহতাজ কিছুক্ষণ স্থির চোখে প্রীয়তার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রীয়তা তুঁতলে বলল, “আমি…আমি বুঝতে পারছি না আপনি ব্যাপারগুলোকে কিভাবে নিয়ে যাচ্ছেন! হ্যাঁ আমার হিং…সে হয়।
তবে আ…আপনি আমাকে ভয় দিচ্ছেন।”
“আসলেই তুমি কি ভয় পাওয়ার মেয়ে?”
প্রীয়তা শুধু তাকিয়ে রইলো শেহতাজের মুখের দিকে। সে সত্যিই এই মানুষটাকে ভয় পায়। তবে এ ভয়টা ঠিক কেমন যেন!
প্রীয়তা অনেক সাহজ যোগার করে বলল, “আমি ডিভানেই শোবো।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। কোন শব্দ নেই। প্রীয়তা নিজের কথাগুলো বলেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এখনো থামেনি। আশ্চর্যজনকভাবে শেহতাজ আর কিছু বলল না। তার চোখের গভীরে ক্ষণিকের জন্য যেন একটা অস্পষ্ট ছায়া খেলে গেল। তারপর সে মুখ ফিরিয়ে নিল। এ যেন নিরব সম্মতি। এই প্রথমবার শেহতাজ তাকে কোনো বিষয়ে জোর করল না। কেন করলো না?
প্রীয়তা এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত ডিভানের দিকে এগিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল। শেহতাজের মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। সে প্রীয়তার এই ব্যবহারে যেন খুশি হলো। এদিকে প্রীয়তা চোখ বন্ধ করলেও ঘুম এল না। আজ যা যা হলো! সে সব অত্যাধিক। শেহতাজ এখন থেকে শুধু ভয় দেখাচ্ছে না। অধিকার বোধ ফলাচ্ছে। এটা বাড়ছে আর বাড়ছেই।
রাতটা কেটে গেল আতঙ্কে। কখন যে ভোর হয়েছে, কখন সূর্যের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে কিছুই টের পায়নি সে।
প্রীয়তার ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। মাথাটা ভারী লাগছে। সে আধখোলা চোখে ঘরের দিকে তাকাল। বিছানা গুছানো। শেহতাজ নেই। ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার বুক ধক করে উঠল। সকাল অনেক গড়িয়ে গেছে। ঠিক তখনই একটা চিৎকার দরজার ফাঁক দিয়ে আসছে। তীক্ষ্ণ। যন্ত্রণায় ভরা। রুশার আওয়াজ। প্রীয়তা প্রায় লাফিয়ে উঠে বসল। পরের মুহূর্তেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে করিডোরে চলে এল। রুশার ঘরের সামনে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে আরও অসংলগ্ন চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো। প্রীয়তা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দৃশ্যটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
বিছানার উপর আধশোয়া অবস্থায় ছটফট করছে রুশা। চুলগুলো এলোমেলো। মুখ লাল হয়ে আছে। দুই হাত শক্ত করে মাথার দুই পাশে চেপে ধরেছে সে। আর পাশে দাঁড়িয়ে নার্স ইনজেকশন প্রস্তুত করছে।
প্রীয়তা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “কি হয়েছে?”
“আবার অ্যাটাক শুরু হয়েছে, ম্যাডাম।”
কথা শেষ করেই নার্স দ্রুত ইনজেকশনটা রুশার হাতে পুশ করে দিল। যে ইনজেকশনের ভায়ালে প্রীয়তা নিজ হাতে ওষুধের বদলে পানি ভরেছিল। প্রীয়তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এটাই সেই মুহূর্ত। এটাই। সে নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
সাধারণত ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রুশা শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু এবার… না। কিছুই হলো না। রুশা আগের মতোই কাঁপছে। বরং আরও জোরে মাথা চেপে ধরল।
“আহ...! মাথা... মাথাটা ছিড়ে যাচ্ছে…”
নার্সও স্পষ্ট অস্বস্তিতে পড়ে গেল, “অদ্ভুত...”
প্রীয়তা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসে পড়ল। তারপর আলতো করে রুশার মাথাটা নিজের কোলে টেনে নিল, “শান্ত... শান্ত… হ।”
সে আঙুলের ডগা দিয়ে রুশার মাথায় মালিশ করতে লাগল। রুশার শরীর শক্ত হয়ে আছে। মুখ বিকৃত হয়ে গেছে যন্ত্রণায়। প্রীয়তার চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু এখন কাঁদলে চলবে না। এখন তাকে অভিনয় করতে হবে। সে মাথা তুলে নার্সের দিকে তাকাল।
“একজন সাহায্যকারীকে ডাকুন তো। একা সামলানো যাবে না।”
নার্স ইতস্তত করল। তারপর মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, “আমি কাউকে পাঠাচ্ছি।”
নার্স দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যেতেই প্রীয়তা বিদ্যুতের গতিতে ঝুঁকে পড়ল। রুশার মাথাটা আরও কাছে টেনে নিল। তার ঠোঁট এসে ছুঁল রুশার কানের কাছে, “চুপ...”
রুশার শরীর কেঁপে উঠল। প্রীয়তা বলল, “একদম আওয়াজ করবি না।”
“ব্যথা...” দাঁত চেপে ফিসফিস করল রুশা। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
প্রীয়তার নিজের গলাও কেঁপে উঠল, “জানি। খুব মাথা ব্যথা করবে। আরও করবে। কিন্তু একটু সহ্য কর।”
রুশার আঙুলগুলো চাদর খামচে ধরল। প্রীয়তা বলল, “মেঘ...মেঘ বলেছে”
নামটা শুনেই রুশা একটু তাকিয়ে পড়লো। কত যুগ পর এই নামটা তার কান অব্দি পৌঁছালো!
প্রীয়তা দ্রুত বলল, “মেঘ ওষুধটা দিতে মানা করেছে। আমি ভায়াল পরিবর্তন করে দিয়েছি। মেঘ বলেছে তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। খুব তাড়াতাড়ি। তুই শুধু এখন কোনো রিয়েক্ট করিস না। প্লিজ। তোকে এসব ওষুধ দিয়ে আরও অসুস্থ বানানো হচ্ছে।”
রুশার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরের যন্ত্রণাটা যেন তাকে ছিঁড়ে ফেলছে। তবুও...অদ্ভুতভাবে সে নিজেকে সামলে নিল। মেঘের নামটা যেন তার ভেতরের উন্মত্ত ঢেউকে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল।
সে চোখ বন্ধ করল। দাঁতে দাঁত চেপে রইল। কোনো শব্দ করল না। ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। নার্স ফিরে এসেছে। সঙ্গে একজন সাহায্যকারী মহিলা। এক সেকেন্ডের মধ্যে প্রীয়তা নিজের মুখের ভাব বদলে ফেলল। যেন কিছুই হয়নি। সে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত স্বরে বলল, “রুশা ঘুমিয়ে গেছে। এই ঘরটার অবস্থা দেখেছেন? এভাবে কেউ রোগীর ঘর রাখে? পরিষ্কার করছেন না কেন?”
সাহায্যকারী মহিলা তড়িঘড়ি মাথা নিচু করল। “জি ম্যাডাম... এখনই করছি।”
নার্স এগিয়ে এসে রুশার দিকে তাকাল। রুশা তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। নড়ছে না। নার্স স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে।”
প্রীয়তা ধীরে মাথা নাড়ল, “হুম।”
কিন্তু সে জানে। এটা ঘুম না। এটা যুদ্ধ। ভয়ংকর এক যুদ্ধ। নিজের শরীরের বিরুদ্ধে। নিজের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে। প্রীয়তা নিচু হয়ে রুশার কপালে হাত রাখল। তারপর খুব আস্তে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে ফেলল। মনে মনে বলল, “তোকে যে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। আমি তাকে খুঁজে বের করব। যে তোকে এই বিষ খাইয়ে খাইয়ে ধ্বংস করছে, তাকে আমি ছাড়ব না। তোকে এ বাড়ি থেকে বের করবই। এটা আমারও ওয়াদা রইল, রুশা।”
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে রয়ে গেল রুশা। তার ভেতরে তখন তাণ্ডব চলছে। মাথার ভেতর যেন হাজারটা হাতুড়ি একসঙ্গে আঘাত করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুক ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে যাবে। তবুও সে চিৎকার করল না। কাঁদল না। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগল। প্রীয়তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে রইল। রুশার চোখ দুটোর কষ্ট যেন আটকে রইলো প্রীয়তার চোখে। মেয়েটা কী অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করছে!
প্রীয়তা দাঁত চেপে ফেলল। মাথাব্যথা কমানোর কোনো উপায় কি নেই? এই বাড়িতে থাকা কোনো ওষুধকেই তার এখন বিশ্বাস হয় না। উল্টো ভয় হয়।
ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত আলমারির নিচের তাকে হাত ঢুকিয়ে কাপড়ের ভাঁজের ভেতর লুকিয়ে রাখা ফোনটা বের করল। ফোন অন হতেই স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল। একগাদা নোটিফিকেশনের মাঝে মেঘের মেসেজটা ওপরে ভেসে উঠল।
প্রীয়তা তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলল। রুপমহলের ইলেকট্রনিক লাইনে সমস্যা তৈরি করতে হবে। বাইরের টেকনিশিয়ান আনতে হবে। পুরুষ কেউ যেন বাড়িতে না থাকে।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️