৭৮.
প্রীয়তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে রইল। রুশার চোখ দুটোর কষ্ট যেন আটকে রইলো প্রীয়তার চোখে। মেয়েটা কী অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করছে! প্রীয়তা দাঁতে দাঁত চেপে ফেলল। মাথাব্যথা কমানোর কোনো উপায় কি নেই? এই বাড়িতে থাকা কোনো ওষুধকেই তার এখন বিশ্বাস হয় না। উল্টো ভয় হয়।
ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত আলমারির নিচের তাকে হাত ঢুকিয়ে কাপড়ের ভাঁজের ভেতর লুকিয়ে রাখা ফোনটা বের করল। ফোন অন হতেই স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল। একগাদা নোটিফিকেশনের মাঝে মেঘের মেসেজটা ওপরে ভেসে উঠল। প্রীয়তা তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলল। রুপমহলের ইলেকট্রনিক লাইনে সমস্যা তৈরি করতে হবে। বাইরের টেকনিশিয়ান আনতে হবে। পুরুষ কেউ যেন বাড়িতে না থাকে।
প্রীয়তা কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল। তারপর দ্রুত রিপ্লাই টাইপ করতে শুরু করল।
"রুশার অবস্থা ভালো না। আজ ইনজেকশন দেওয়ার পরও ঘুমায়নি। খুব তীব্র মাথাব্যথা হচ্ছে। আমি ওকে সামলেছি কোনোভাবে। ওকে জানিয়েছি তোমার কথা। প্লিজ কিছু একটা করো। আর আল্লাহকে ডাকো যেন মাথা ব্যথাটা সহ্য করে নিতে পারে।"
কিছুক্ষণ থেমে আবার লিখল, "আমি খুঁজছি বাসার মেইন সার্কিট আর ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল কোথায়। পেলে তোমাকে জানাবো। সুযোগ বুঝে লাইন কেটে দেব।"
মেসেজ পাঠিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট মুছে ফেলল। তারপর ফোনটা আবার বন্ধ করে আগের জায়গায় লুকিয়ে রাখল। সবকিছু ঠিকঠাক। কেউ বুঝবে না।
দরজার দিকে এগোতেই আচমকা তার পা থেমে গেল। দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। প্রীয়তার বুক ধক করে উঠল। ওর ঘরে তো এ সময়ে কেউ আসার কথা না! তাছাড়া শেহতাজের তো কাজে বেরিয়ে যাবার কথা!
প্রীয়তা দরজা খুলতেই দেখল আরফি দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার মুখে স্বাভাবিক হাসি। প্রীয়তা অজান্তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সেও হালকা হাসল, “আরে, আপনি?”
আরফি মাথা নাড়ল, “জি।”
প্রীয়তা এবার লক্ষ্য করল করিডোরের শেষ মাথার দিকে স্টাডি রুমের দরজা খোলা। দুজন অপরিচিত লোক ভেতরে ঢুকছে বের হচ্ছে। কেউ একটা বড় টুলবক্স নিয়ে এসেছে। আরেকজন দেয়ালের পাশে ঝুঁকে কী যেন করছে।
প্রীয়তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তার ভেতরের কৌতূহল সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠল। স্টাডি রুমে লোক? আজ? কেন? শেহতাজ কি বের হয়নি?
সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামান্য ঘাড় বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু সামনে আরফি দাঁড়িয়ে থাকায় বেশি কিছু দেখতে পারলো না। প্রীয়তা কৌতুহল মুখে কিছু প্রকাশ করল না। আরফিই আগে কথা বলল, “আসলে আমি আপনাকে ডাকতেই যাচ্ছিলাম।”
“আমাকে?”
“জি।”
“কেন?”
“আপনার রুমে একটু কাজ ছিল।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে গেল, “আমার রুমে?”
“জি।”
“কী কাজ?”
“শেহতাজের ছোট একটা কাজ। ও বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছিল। বলতে পারেন এই কাজটার জন্যই আমি এখনও যাইনি। অনুমতি থাকলে আমি কি রুমে কাজটা করতে পারি?”
প্রীয়তা আর কোনো প্রশ্ন করল না। করিডোরের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকাল।
কী হচ্ছে সেখানে? কেন হচ্ছে? মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু এখন জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না। বরং চুপ থাকাই নিরাপদ। প্রীয়তা ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল, “ঠিক আছে। আমি রুশার ঘরে যাচ্ছি। করুন যা কাজ।”
আরফি সরে দাঁড়াল, “ধন্যবাদ।”
প্রীয়তা রুশার ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তার মনের ভেতর অস্বস্তিটা কাটল না। কারণ অদ্ভুত একটা ব্যাপার সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। লোকগুলোকে দেখতে ইলেকট্রিশিয়ান মনে হচ্ছিল। তবে স্টাডি রুমে তাদের কি কাজ? আরফিই বা কি কাজ করতে গিয়েছে শেহতাজের রুমে?
চট করে প্রীয়তার কদম থেমে গেল। মেঘের বলা, ইলেকট্রিক লাইনে গড়মিল করার মেসেজ পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রুপমহলে ইলেকট্রিশিয়ান? এটা কি কাকতালীয়? নাকি, শেহতাজ আবারও কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে সবার থেকে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই প্রীয়তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। সে আজকাল অত্যাধিক ভয় পাচ্ছে। না না এসব ভাবলে চলবে না। সে আবার এগিয়ে চলল।
সকালটা যেন শুরুই হয়েছে ঝড় নিয়ে। শহরের এক প্রান্তে রুপমহলের করিডোরে অস্বস্তি জমে উঠছে, আর অন্য প্রান্তে মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে একটার পর একটা রহস্যের পেছনে। সকাল আটটারও আগে সে এসে পৌঁছেছে পারভেজ সওদাগরের বাসায়। এক অর্থে প্রীয়তার বাসায়। প্রীয়তার এ বাড়িতে থাকা অবস্থায় মেঘের কখনোই এই বাড়িতে আসা হয়নি। আজই প্রথম।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে বড় টি-টেবিল। টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রিন্ট করা ছবি, নোট, কিছু পুরনো কেস ফাইল এবং একটা ল্যাপটপ। বাকি বেশ কিছু কাগজপত্র মেঝেতে লুটোপুটি খেলছে।
সাসপেন্ডেড হওয়ার পরও পারভেজ সওদাগরের দৃঢ়তা সামান্য পরিমাণও কমেনি। মেঘ টেবিলের ওপাশে বসে একটার পর একটা ছবি দেখছিল। এসবই সেই ছবি, যেগুলো প্রীয়তা শেহতাজের স্টাডি রুম থেকে পাঠিয়েছিল।
প্রথমে এগুলো সাধারণ কিছু পুরনো ছবি বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু খোঁজ নিতে গিয়েই চমকে উঠেছে তারা। পারভেজ সাহেব একটা ফাইল বন্ধ করে ধীরে বললেন, “এই লোকটাকে চিনো?”
মেঘ মাথা নাড়ল, “না।”
“দেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র চোরাচালান মামলার আসামি ছিল। সাত বছর জেল খেটেছে।”
আরেকটা ছবি। “এটা?”
মেঘ আবারো মাথা নাড়ল, সে চেনে না। পারভেজ সাহেব বললেন, “মাদক সিন্ডিকেটের পুরনো কিংপিন।”
আরেকটা। “এটা তিনটা খুনের মামলার আসামি।”
মেঘের কপাল ভাঁজ পড়ে গেল। একজন দুজন না। প্রায় প্রত্যেকটা ছবির মানুষের অতীত অন্ধকার। কেউ অপরাধ জগতের রাজা ছিল। কেউ আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সদস্য। কেউ ভাড়াটে খুনি। কেউ আবার জেল খেটে বেরিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
পারভেজ গম্ভীর গলায় বললেন, “প্রশ্ন হচ্ছে, শেহতাজের স্টাডি রুমে এদের ছবি কেন?”
মেঘ কোনো উত্তর দিতে পারল না। কারণ উত্তর তার কাছেও নেই। শুধু একটা অনুভূতি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। শেহতাজ শেখ আসলে যা দেখায়, সে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। অনেক বেশি বিপজ্জনক। পারভেজ সাহেব এবার আরেকটা ফাইল খুললেন।
“আরেকটা ব্যাপার আছে।”
মেঘ তাকাল। পারভেজ সাহেব একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “যে বন্দুকটার ছবি প্রীয় দিয়েছে...ওটার কোনো লাইসেন্স নেই।”
“মানে চোরাই?”
“হতে পারে না চোরাই। ওটা সাধারণ অস্ত্র না। অত্যন্ত দামি। সীমিত সংখ্যক তৈরি হয়। আর দেশে এমন অস্ত্র এলে তার রেকর্ড থাকার কথা। কিন্তু নেই? একদম নেই।”
কয়েক মুহূর্ত পরে পারভেজ নিচু গলায় আবার বললেন, “আর সবচেয়ে অদ্ভুত তথ্যটা এখনো বলিনি।”
মেঘ মাথা তুলল। পারভেজ সওদাগর একটা জন্মনিবন্ধনের কপি সামনে রাখলেন।
“শেহতাজ শেখ নামে যে জন্মনিবন্ধনের নম্বর পাওয়া গেছে, সেটা ভেরিফাই করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছি।”
“কী সমস্যা?”
“তথ্য মেলে না।”
“মানে?”
“মানে বাংলাদেশ থেকে এটা পাওয়া যাচ্ছে না। যাবেও না।”
মেঘ স্থির হয়ে গেল, “রেকর্ড নেই কিংবা ডেটা নেই? ইচ্ছে করেই কেউ সরাচ্ছে কি?”
পারভেজ সাহেব শুধু মাথা নেড়ে না বোঝালেন। মেঘ স্তব্ধ। একজন মানুষের অস্তিত্ব কি এভাবে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে? ইন্টারনেটে অন্তত আপডেট থাকার কথা!
নাকি…
শেহতাজ শেখ আদৌ শেহতাজ শেখ না? ভাবনাটা মাথায় আসতেই পুরো ভাবনা এলোমেলো হয়ে উঠলো মেঘের। মেঘ একবার নিজের ফোনটা চেক করলো। প্রীয়তার মেসেজ এসেছিল তবে ব্যস্ততায় নজরে পড়ে নি। সে তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলল। রুশার কথা পড়তে পড়তে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রুশা অসহ্য মাথাব্যথায় ছটফট করছে। কোনো মতে সহ্য করছে। আর… প্রীয়তা তাকে সব বলে দিয়েছে।
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের সামনে ভেসে উঠল রুশার মুখ। কতদিন হলো দেখা হয় না? কতদিন হলো কথা হয় না? রুশাকে এক নজর দেখার তৃষ্ণা মেঘকে পাগল করে তুলছে। একবার। শুধু একবার রুশাকে নিজের চোখে দেখতে হবে। যেভাবেই হোক। সে ফোনটা শক্ত করে ধরে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মেঘ ডা. রউফকে ডিরেক্ট কল করলো। তিনি সাথে সাথেই রিসিভ করলেন। মেঘ সরাসরি বলল, “রুশাকে ওই ওষুধটা ইনজেক্ট করা হয়নি। ওষুধটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ওটা না নিলে তো ও মাথা ব্যথায় পাগলের মত ব্যবহার করে। ওর মাথা প্রচন্ড ব্যথা যা সহ্য করতে পারছে না। এই ক্ষেত্রে এই ব্যথা থেকে নিরাময়ের কি কোন উপায় নেই?”
ডাক্তার সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন এরপর বললেন, “এই জিনিসটা তো খারাপ হয়ে গেল। ব্যথাটা ও সহ্য করতেও পারবে না। একটু কমবে আবার অত্যাধিক বাড়বে। আমি তোমাকে একটা ওষুধের নাম পাঠাচ্ছি এটা যেভাবেই হোক রুশাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করো। এটা দেওয়ার সাথে সাথে মাথা ব্যথা কমে যাবে।”
“কোন সাইড ইফেক্ট করবে না তো?”
“না না সেসব সমস্যা নেই। এটা শুধু মাথা ব্যথা কমাবে।” এটুকু বলেই ওদের কথোপকথন থামলো। ডা. রউফ সাথে সাথেই একটা ওষুধের নাম পাঠালেন। মেঘকে যে করেই হোক এই ওষুধটা রুশা অব্দি পৌঁছাতেই হবে। সে কিছু সময় একটু ভেবে নিলো এখন কি করবে। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে আফরান খন্দকারের নম্বর ডায়াল করল। রিং হতে লাগল। একবার। দুইবার। কয়েকবার। অবশেষে কল রিসিভ হলো, ওপাশে আফরানের কণ্ঠ ভেসে এলো, “হ্যালো?”
মেঘ সরাসরি বলল, “কিছু পেয়েছো?”
“শেহতাজ শেখ সম্পর্কে যত খোঁজ নিচ্ছি, তত বেশি গরমিল পাচ্ছি।”
“ডিটেইলসে বলো।”
“লোকটা অত্যাধিক চতুর। অসীম ক্ষমতার সাম্রাজ্য বানিয়ে রেখেছে। তাই ঠিক ধরেও ছুঁতে পারছি না।”
“ছায়া?”
“হ্যাঁ। বড় বড় ব্যবসার রেকর্ড আছে। টাকা আছে। সম্পদ আছে। প্রভাব আছে। কিন্তু অতীত নেই, সব গোপন।”
“আর?”
“যে জন্মনিবন্ধন দিয়েছিলি ওটা প্যারিসের সাঁ-জোসেফ হসপিটালের। ওখানে খোঁজ চালিয়েছি। এটা অথেনটিক। ওদের অফিসিয়াল রেকর্ডেও জন্মনিবন্ধনের একটা কপি আছে। এছাড়া আর কোন তথ্য পাই নি।”
“কিন্তু এদেশে যে এই জন্মনিবন্ধনের অস্তিত্ব নেই?”
“খুব স্বাভাবিক। দেখছি আর কোন তথ্য পেলে জানাবো।” এটুকু বলেই কলটা কেটে দিল। মেঘ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো কিছু সময়। এরপর বেরিয়ে গেল পারভেজ সওদাগরকে বিদায় জানিয়ে। তার যে অনেক কাজ পড়ে আছে।
এদিকে রুশার ঘরটাতে এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা। এসির ঠান্ডা বাতাস ঘরজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিছানার উপর রুশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু প্রীয়তা জানে, সে ঘুমে নয়। রুশার মাথাব্যথাটা এখনো আছে। আগের মতো অসহনীয় নয়। যন্ত্রণার তীব্রতা কিছুটা কমেছে হয়তো। রুশার মুখের পেশিগুলো আর আগের মতো শক্ত হয়ে নেই।
প্রীয়তা বিছানার পাশে বসে রইল। চোখের কোণ দিয়ে বারবার নার্সটার দিকে তাকিয়ে দেখলো। এই নার্সটা একটা আপদ। চব্বিশ ঘণ্টা রুশার আশেপাশে ঘুরতে থাকে। এই বাড়ির শয়তান গুলোর আদর্শ পাহারাদার। এই নার্সের সামনে কেউ কিভাবে অন্য ড্রাগ রুশাকে দিতে পারে? এই নার্সই দিচ্ছে না তো?
প্রীয়তা হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকলো নার্সটার মুখের দিকে। এই মুহূর্তে রুশার অসুখের চেয়েও বড় সমস্যা মনে হচ্ছে এই নারী। এই নার্সকে সরানো গেলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত। অনেক। কিন্তু কীভাবে?
প্রীয়তা উত্তর পেল না। শুধু দীর্ঘক্ষণ বসে রইল। মাঝে মাঝে রুশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রুশা চোখ খুলল না। রুশা এত শক্তি আজ কোথায় পেল? তবে কি মেঘের নামটুকুই তাকে শক্তি দিচ্ছে? কি নিদারুন ভালোবাসা!
বেশ লম্বা সময় বসে প্রীয়তা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে এসে সাবধানে নিজের ঘরের দিকে তাকাল। দরজা ঠেলে রাখা। ভেতরে কেউ নেই। আর সেই অচেনা লোক দুজনও নেই। স্টাডি রুমের আশেপাশেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যথা নিয়মে তালাটা ঝুলছে। সবকিছু আবার স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতাই যেন সবচেয়ে অস্বাভাবিক। তবে প্রীয়তা আর নিজের ঘরের দিকে এগোলো না। তার যে বাড়ির ইলেকট্রনিক মেইন সার্কিট খুঁজতে হবে। সে ছুটে গেল, এরপর শুরু হলো খোঁজাখুঁজি। পুরো রুপমহল যেন একটা গোলকধাঁধা। একটার সঙ্গে আরেকটা করিডোর। পুরোনো কাঠের দরজা। গোপন স্টোররুম। সার্ভিস প্যাসেজ। সিঁড়ির নিচে ছোট ছোট ঘর। প্রীয়তা পুরো বাড়ি ঘুরতে লাগল। কোথায় মেইন কন্ট্রোল? কোথায় ইলেকট্রিক্যাল প্যানেল? কোথায় সার্কিট?
কোথাও কিছু খুঁজে পেল না। কাউকে জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই। যদি সন্দেহ করে? দীর্ঘক্ষন খুঁজে প্রীয়তা অবশেষে হাল ছেড়ে নিজের ঘরে ফিরে এল। দরজা বন্ধ করে ফোনটা বের করল। তবে আলমারির কাছ থেকে সরলো না। যাতে দরজায় কেউ এলেই সাথে সাথে ফোনটা লুকিয়ে ফেলা যায়। এ সময়ে ফোন বের করা বেশি রিস্কি। সাহায্যকারীদের নজরে পড়লেও বিপদ।
প্রীয়তা তাড়াতাড়ি মেঘকে লিখলো, “সারা বাড়ি তল্লাশি করে এসেছি। কোথাও ইলেকট্রনিক সার্কিট পাইনি। জানি না এরা এটাকেও গুপ্তধনের মত সামলে রাখে কিনা।
রুশার মাথা ব্যথা এখনো প্রখর। এই নার্সটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এটাকে সরাতে পারলেই হতো।”
মেসেজ গুলো সাথে সাথেই মেঘ দেখলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই করল, "মেইন সার্কিট লাগবে না। রুশার ঘরের এসিটা কোন ভাবে নষ্ট করে দে। তার থাকলে কেটে দে। এমন ভাবে কাটবি যাতে সামনে দেখা না যায়। মোট কথা মেকানিক ডাকতে হবে এমন কিছু একটা কর, পারবি তো?"
“একদম পারবো। এই নার্সটাকে সরাতে হবে। আমি এখনি যাচ্ছি। করে এসে মেসেজ করছি।”
প্রীয়তা সাথে সাথেই ফোনটা লুকিয়ে আবার ছুটলো রুশার ঘরে।
সূর্য মাথার উপর। গরমের প্রকপ প্রচন্ড। এর মাঝে এসির লাইন কাটা শত্রুতা ছাড়া আর কিচ্ছু না। কিন্তু তাও তাকে করতে হবে। এই দুপুর বেলায় সাধারণ রুবাই রুশার ঘরে থাকে। নার্স একটু রেস্ট নেন। প্রীয়তা ঘরে ঢুকেই দেখলো। রুবাই নেই, নার্স ফোনে ব্যস্ত। রুশা শুয়ে আছে। এই লম্বা কয়েকদিন এভাবেই তো চলল। মেয়েটা অচেতন হয়ে পড়ে থাকে। জাগলেই মাথা ব্যথায় কাতরায়। আবার ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হয় ওকে। আজ বেচারি জেগে জেগেই মাথা ব্যথা সহ্য করে নাটক চালিয়ে যাচ্ছে। ওর যে খুব কষ্ট হচ্ছে তা তো আর বুঝতে বাকি নেই।
প্রীয়তা একবার এসিটাকে ভালো করে দেখে নিলো। এটার তাঁর কোথায় যে কাটবে? ভেতরে থাকে নাকি পিছে? প্রীয়তা বোকার মত তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। একটু কাছে আগাতেই একটা মোটা পাইপের মত কিছু নজরে এল। কিন্তু এটা কাটা তার কর্ম নয়। এখন কি করা যায়!
প্রীয়তার নজর পড়লো এসির রিমোটটার উপর। এসি তো এই রিমোট ছাড়া চালানোই যাবে না। তাহলে এসি অফ করে রিমোট নষ্ট করলেই হয়। এসি চলবেই না। নতুন রিমোট নিয়ে এলে? কিংবা ফোনে কানেক্ট করলে! না না…এসিটাকে খারাপ প্রমাণ করতে হবে। বাড়িতে রুবাই ছাড়া আর কারো এসি নিয়ে এক্সপার্ট হবার তো কথা নয়। রুবাই বাড়াবাড়ি করলে ওকে সামলে নেয়া যাবে।
প্রীয়তা কিছু সময় অকারণ সময় নষ্ট করলো। এরপর মাথায় এল তার বাসার ছোট্ট একটা ঘটনা। একবার সে তার বাসার এসির রিমোটের 'Cool' মোড পরিবর্তন করে 'Fan' বা 'Dry' মোড করে ফেলেছিল ভুলে। এতে এসি থেকে শুধু সাধারণ বাতাস বের হচ্ছিল, কোনো ঠাণ্ডা বাতাস আসছিল না। এর ফলে ফলে পানি পড়া শুরু। ওরা তো ভেবেছিল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মেকানিক আনতে হয়েছিল। তাহলে এখানে Dry মুড অন করে রিমোটটা নষ্ট করে দিলেই কাজটা হয়ে যায়… প্রীয়তা মস্তিষ্কে প্রথমে ছকটা কষে নিলো।
নার্স ওষুধ গোছাতে ব্যস্ত হলে। খুব সতর্কভাবে এসিটা ড্রাই মুডে করে দিয়ে একটা ছোটখাটো গণ্ডগোল তৈরি করল এসির রিমোটের সাথে। যাতে এটা দিয়ে কাজ না হয়। এরপর কয়েক মিনিট যেতেই প্রীয়তা প্রধান নাটকটা শুরু করলো। “এসিটা আচমকা গরম বাতাস দিচ্ছে কেন?”
নার্স ভ্রু কুঁচকে বলল, “একটু আগেই তো ভালো চলছিল! রিমোটটা কোথায়?”
“তাহলে এখন এমন হচ্ছে যে?”
নার্স রিমোট নিয়ে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলো। কিন্তু এসিতে কোন কাজ হলো না। প্রীয়তা বলল, “এসিটা নষ্ট হয়ে গেছে বোধহয়।”
নার্স রিমোটটাকে হাতে কয়েকবার চাপড়ে বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
সাথে সাথেই বাড়ির সকলকে জানানো হলো রুশার ঘরের এসি নষ্ট হয়ে গেছে। সকলেই দ্রুত এ ঘরে এলো। অন্য ঘরের রিমোট এনে চেষ্টা করা হলো। কিন্তু কিছুতেই এসি থেকে গরম বাতাস বন্ধ করা গেল না। এরপর শাহরিয়ার শেখকে কল দেয়া হলো। তিনি জানালেন যত দ্রুত সম্ভব তিনি মেকানিক পাঠাচ্ছেন।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️