ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৮৪তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৮৪. 

শহরের অন্য প্রান্তে মেঘ আর অরূপ সকাল থেকেই নানা কাজে ব্যস্ত। সারাদিন পেরিয়ে তারা কিছু সময় আগেই ঘরে ফিরেছে। এরপর থেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে ফারাজ সওদাগরের পুরোনো রেকর্ড, ব্যাংকিং তথ্য, ভ্রমণ ইতিহাস, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, পুরোনো সংবাদপত্র। যি কিছু আজ পেয়েছি আর কি! প্রতিটা টুকরো তথ্য তারা একত্র করে সমাধান খুঁজছে। টেবিল ভর্তি কাগজ। ল্যাপটপের পর্দায় অসংখ্য ফাইল।
সকালে আরফান আবারো কিছু তথ্য পাঠিয়েছিল, সেগুলো নিয়েই অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো নতুন কয়েকটা নাম। কয়েকটা পুরোনো আর্থিক লেনদেন। আর কিছু আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সূত্র। মেঘ একটার পর একটা তথ্য মিলিয়ে চলেছে এখনো। কিন্তু তাও ঠিক ঠাক কিছু একটা ফাঁকা রয়েই যাচ্ছে যেন। তারা এই পাজল ঠিক সমাধান করেও সমাধান টানতে পারছে না। যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকার কথা, সেখানে একটা বিশাল শূন্যতা। ফারাজ নথিগুলো কোথায় লুকিয়েছিল? কেন মৃ/ত্যু/র এত বছর পরও কেউ সেগুলো খুঁজে পেল না? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শেহতাজ কি সত্যিই নথির জন্য প্রীয়তার কাছে এসেছে? নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ আছে?
এসব ভাবনার মাঝেই রাফির কল এলো। ছেলেটা সকাল থেকে কল করেই যাচ্ছে তবে মেঘ ব্যস্ততায় সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। মেঘ কল রিসিভ করতেই রাফি বলল, “তোরা আমাকে ভালোই বাসিস না। যখন দরকার হয় তখনই মনে করিস। তাছাড়া কোন খোঁজ নিস না‌।”
“এসব কি বলছিস!”
“ঠিক কত বার কল করেছি তোদের?”
“রাফি তুই পড়াশোনা না করলে আমরা পাশ করবো কিভাবে? তাই তোকে পড়ার সুযোগ দিচ্ছি।”
“আমি পড়লেও তোরা পাশ করতে পারবি না। ৮০% এটেনডেন্স ছাড়া স্যার পরীক্ষায় বসতে দিবেন না বলেছে।”
মেঘ একবার অরুপের দিকে তাকালো। মেঘ কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরফানের কল। এই ভরদুপুরে আরফান কল করছে? মেঘ রাফিকে কোন কথা না বলেই আরফানের কলটা রিসিভ করলো। ওপাশে আরফানের চিন্তিত কন্ঠস্বর, “খুব বড় একটা বিপদ হয়ে গেছে।”
“কি হয়েছে?”
“আমি যেই লোকটার মাধ্যমে শেহতাজের বিস্তারিত নিচ্ছিলাম ছেলেটা নিখোঁজ।”
মেঘ বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো, “নিখোঁজ মানে?”
“আজ ভোরে নাকি কারা ওকে ওর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে। আর আমার ধারনা বলছে এ কাজ শেহতাজের।”
“মানে শেহতাজ জেনে গেছে?”
“হ্যাঁ। শেহতাজের সোর্স অনেক দূর। আমি ঠিক জানি না ও আর কি কি জেনেছে। তবে আমাদের উপর রিস্ক আসতে পারে আবার নাও।”
“আসতে পারে আবার নাও মানে?”
“যেই ছেলেটাকে দিয়ে আমি খোঁজ করিয়েছিলাম সে নিজেই আমার আসল পরিচয় জানে না। আমি ওর সাথে ফেক ডিটেইলসে খবরাখবর নিয়েছি। আমাকে দেখে অব্দি নি। তাছাড়া আমার ট্রেস পাওয়া সহজ নয়। তবে যদি কোন ভাবে আমার ট্রেস পায় তবে তোর ট্রেস পেয়ে যাবে। আমি সব ডিটেইলিং এখান থেকে রিমুভ করছি। জিনিসটা মারাত্মক। কিছু দিন শেহতাজ সম্পর্কিত কিংবা ফারাজ সওদাগরকে নিয়ে সব রকম অনুসন্ধান বন্ধ রাখ। আর হ্যাঁ আমি একটু গা ঢাকা দিচ্ছি। সব স্বাভাবিক হোক পরে শুরু করবো নতুন উপায়ে।”
মেঘ ঠিক কি প্রতি উত্তর করবে বুঝে উঠলো না। আরফান আবারো বলল, “মেঘ জেনে শুনে বিপদ নেয়ার কোন মানেই হয় না। অপেক্ষা কর। এরপর আবার সব করা যাবে।”
মেঘ অসহায়ের মত ফোনটা ছুঁড়ে দিলো বিছানায়। অরুপ এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কি হয়েছে?”
“শেহতাজ জেনে গেছে যে ওকে নিয়ে কেউ অনুসন্ধান চালাচ্ছে।”
“এখন?”
“আরফান ভাই যেই লোকটার মাধ্যমে খবরাখবর নিচ্ছিলো সেই লোকটা গায়েব। আজই তাকে তুলে নিয়ে গেছে কারা যেন।”
“শেহতাজ কি আমাদের কথাও জেনে গেছে?”
“জানি না। নাও জানতে পারে। আরফান ভাই সব গোপনে করেছে। তাকে ট্রেস না করা গেলে আমাদেরও করতে পারবে না।”
অরুপ আর কিছু বলল না। ওরা আগুন নিয়ে খেলছে, হাতে তো ছেকা লাগবেই। তবে বেশি ক্ষত হওয়ার থেকে সাবধান হতে হবে।
বাহিরে ভয়াবহ বৃষ্টি। আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টির রেশ বাড়তেই প্রীয়তার আর্তনাদ বাড়লো। সে লাগাতার দরজার ধাক্কাতে লাগলো। ছাদের ফাঁটা অংশ দিয়ে লাগাতার পানি এসে ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। মেঝেতে লেগে থাকা র/ক্ত পানিতে মিলে মিশে ছড়িয়ে উঠলো। তবে প্রীয়তার এই আর্তনাদে কেউ সামান্য ভ্রু ক্ষেপ করলো না। অবশ্য এই বৃষ্টির তালে তার কন্ঠস্বর কোন অব্দি পৌঁছালো না। 
দিনের আলো রাতে পরিনত হতেই বৃষ্টিটা সামান্য থামলো। অরুপ নিজের বাড়িতে ছুটলো। মেঘ সেই একই জায়গায় ঠায় বসে রইলো। তার সত্যিই চিন্তা হচ্ছে। প্রীয়তার জন্য চিন্তা হচ্ছে। সে এই দুশ্চিন্তা কোন ভাবেই অরুপকে বোঝায় নি। আজ ইমরানও শহরে ফিরেছে। ফিরেই বেশ কয়েকবার কল করেছে তাও মেঘ রিসিভ করেননি। ইমরানের থেকে সে কিছুই লুকাতে পারবে না। ইমরান ঠিকই বুঝে নেবে কিছু একটা হয়েছে। ইমরান আজ সবে মাত্র ফিরেছে। ওকে এখনি এসবে জড়াতে চায় না মেঘ।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। তাও প্রীয়তা নিখোঁজ। রুশা আর টেনশন নিতে পারলো না‌। ও খুব আতঙ্কে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মেঘ শুনছো? প্রীয়তা সকালের পর থেকে একবারও এ ঘরে আসে নি। তোমার সাথে কথা বলে সেই যে বের হলো তারপর আর আসে নি। একটু দেখো না কি হয়েছে।”
মেঘের ল্যাপটপ স্ক্রিনেই লাইভ চলছিল। সারাদিনের ব্যস্ততায় সে তেমন হিসেব রাখতে পারে নি ঘরে কে এসেছে আর কে গিয়েছে। তবে রুশার এই কথাটুকু শোনা মাত্রই মেঘ দ্রুত হাতে আদিবাকে কল করলো। সাথে সাথেই রিসিভ হলো। মেঘ বলল, “রুশাকে দাও।”
আদিবা সোজাসুজি ফোনটা রুশার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “মেঘ স্যার কথা বলবেন।”
রুশা ফোনটা কানে ধরতেই মেঘ বলল, “প্রীয়তার কি হয়েছে?”
“সেই সকালে বেরিয়েছিল। সারাদিন একবারও আসে নি। রুবাই এসেছিল তবে প্রীয়তা আসে নি।”
মেঘ একটু কিছু সময় চুপ থাকলো। তার ভয় হলো। প্রীয়তা কি শেহতাজের হাতে ধরা পড়ে গেছে? শাস্তি স্বরুপ ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ? নাকি আরো কঠিন কোন শাস্তি? প্রীয়তা কি বিপদে আছে? মেঘ আর না ভেবে বলল, “ফোনটা আদিবাকে দাও।”
রুশা সাথে সাথেই আদিবাকে দিলো। মেঘ বলল, “একবার ভালো করে প্রীয়তার খোঁজ নাও। প্রীয়তা বিপদে থাকতে পারে। ওকে না পেলে আপডেট জানাও। ফোন করতে হবে না ক্যামেরার সামনে বললেই হবে। তবে খুব সাবধানে।”
“আমি রুশা ম্যাডামের কথায় বার দুয়েক খুঁজেছি। তবে প্রীয়তা ম্যাডাম কোথাও নেই। উনার ঘরটাও ভেতর থেকে বন্ধ।”
“দরজা নক করো। মাথা ব্যথা কিংবা যে কোন ওষুধ বা কাজের বাহানা বাহানা দাও। তাও প্রীয়তাকে এক নজর দেখেই ফিরবে। আমি শুধু জানতে চাই ও ঠিক আছে কিনা।”
“আমি এক্ষুনি দেখছি।”
আদিবা সম্মতি জানিয়ে ফোনটা রাখলো। রাতটা প্রায় অনেক। আদিবা আবার গেল প্রীয়তার অনুসন্ধানে। দু'জন সাহায্যকারীকেও জিজ্ঞেস করলো কিন্তু তারা দেখেনি প্রীয়তাকে। আবারো একই ব্যর্থতা। কোথাও নেই। শেহতাজের ঘর এখনো ভেতর থেকে বন্ধ। ওর কাছে দরজা টোকা দেবার বাহানা নেই। তাও টোকা দিল। কয়েক সেকেন্ড পরই দরজা খুলল শেহতাজ। সে হয়তো ঘুমে ছিল। চোখে মুখে ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। জোরপূর্বক চোখ খুলে দরজাটা খুলেছে। আদিবা বলল, “প্রীয়তা ম্যাডামকে প্রয়োজন ছিল স্যার। একটু ডেকে দেবেন।”
শেহতাজ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো আদিবার মুখে। “কি প্রয়োজন?”
“মাথা ব্যথার বাম দরকার ছিল। ম্যাডাম বলেছিলেন কিছু দরকার হলে যেন উনাকে বলি তাই আর কি।”
“আপনি যান আমি পাঠাচ্ছি।” এটুকু বলেই শেহতাজ আবার দরজা বন্ধ করে দিলো। সে প্রখর ঘুমে ছিল। কখন যে দুপুর রাতে পরিনত হয়েছে সে জানে না। মুহুর্তেই তার মস্তিষ্ক সচল হলো‌ সে যে সেই সকালে প্রীয়তাকে নিচ তলার বদ্ধ ঘরে ফেলে এসেছিল আর এখন রাত‌। এক ফোঁটা পানিও তো দেয় নি। শেহতাজ এক প্রকার দৌড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তার এই তাড়াহুড়ো কিসের? ভয় নাকি চিন্তা? সে প্রীয়তাকে নিয়ে নিজের মনের অজান্তেই ভয় পেলো। আদিবা তখনও দরজার বাহিরেই দাঁড়িয়ে ছিল। শেহতাজের এভাবে দ্রুত চলে যাওয়া তাকেও বেশ অবাক করলো‌। তবে সে পিছু নিলো না। আর না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখার সাহস পেলো। ঘরে যে ক্যামেরা আছে এটা তো আর তার অজানা নয়। 
শেহতাজ নিচে গিয়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরটার বাইরে এখনো তার রাখা পাহারাদার দাঁড়ানো। শেহতাজ এগিয়ে গিয়ে বলল, “সব ঠিক আছে?”
“জি স্যার। ম্যাডাম বিকেল অব্দি খুব ডাকাডাকি করেছেন। এরপর আর কোন শব্দ পাইনি।”
শেহতাজ‌ দ্রুত হাতে তালা খুলল ঘরটার। একবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখলো প্রীয়তা মেঝেতে পড়ে আছে অচেতন নিসাড়। তার শুভ্র মুখটা আরো অত্যাধিক শুভ্র হয়ে উঠেছে। শরীরটা একেবারে ভেজা। ভ্রু কুঁচকে উঠলো শেহতাজ। এই রাত অবধি ভেজা থাকবে কেন! ঘরের পুরো মেঝেটাই ভেজা। শেহতাজ প্রশ্ন ছুঁড়ল, “ঘরটা ভেজা কেন?”
“স্যার বিকেল থেকে খুব বৃষ্টি হয়েছে। তাই হয়তো।”
রাগে, জেদে, বিরক্তিতে সবকিছু মিলিয়ে শেহতাজের মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু সেই রাগটা কার উপর দেখাবে সে? পাহারাদারদের উপর?
না। ওদের তো কিছুই বলা হয়নি। কেউ জানত না প্রীয়তাকে কতক্ষণ এখানে রাখা হবে। কেউ জানত না সে খাবার পেয়েছে কি না, পানি পেয়েছে কি না। কিংবা তাকে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই ভুলটা করেছে সে নিজেই। এই উপলব্ধিটা শেহতাজের মেজাজকে আরও খারাপ করে দিল। সে এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিচু হয়ে অচেতন প্রীয়তার শরীরটা কোলে তুলে নিল। মেয়েটা একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা। তবুও শরীর জ্বরে পুড়ছে। ভেজা চুলগুলো গাল বেয়ে ঝুলে আছে। ঠোঁট ফ্যাকাশে। চোখ বন্ধ। শেহতাজের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ড্যাম...” শব্দটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো তার মুখ দিয়ে। তারপর দ্রুত পা ফেলে মহলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পাহারাদাররা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ সাহস পেল না কিছু জিজ্ঞেস করার। রুপমহলের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল।
এত রাতে হঠাৎ শেহতাজকে এভাবে প্রীয়তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে দেখে কয়েকজন সাহায্যকারী থমকে দাঁড়াল। ডাইনিং হলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সকলে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করল না। এত সাহস কারো নেই।
শেহতাজের মুখের অবস্থা দেখে বোঝাই যাচ্ছে এ মুহূর্তে একটা ভুল প্রশ্নও বিপজ্জনক হতে পারে। সে সোজা নিজের কক্ষের সামনে গিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বিছানার উপর প্রীয়তাকে শুইয়ে দিতেই বুঝতে পারল অবস্থা মোটেও ভালো না। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক। মুখে কোনো রং নেই। শ্বাসপ্রশ্বাসও দুর্বল। মেয়েটার শরীর পুরো ভেজা। এখনো অ্যালকোহলের নেশাক্ত গন্ধ ভেসে আসছে শরীর থেকে। শেহতাজ সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকম তুলে বলল, “দুই মিনিটের মধ্যে কাউকে পাঠাও।”
ওপাশে কণ্ঠস্বর, “জি স্যার!”
কিছুক্ষণের মাঝেই পর একজন সাহায্যকারী এসে হাজির হলো। শেহতাজ আলমারি থেকে প্রীয়তার পোশাক বের করে এগিয়ে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল, “ওর শরীরটা ধোঁয়া জরুরি। গোসল করিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দাও। আমি ডাক্তার কল করছি‌।”
সাহায্যকারী মাথা নাড়ল। শেহতাজ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়েই সে পারিবারিক চিকিৎসককে কল করল, “হ্যালো… রুপমহলে আসতে হবে। ইমার্জেন্সি।”
ডাক্তারের ঘুম জড়ানো কণ্ঠ মুহূর্তে সোজা হয়ে গেলেন, “কি হয়েছে? রুশা ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে। আমার… ওয়াইফ অসুস্থ। আপনি আসুন।”
ডাক্তার আর কথা বাড়ালেন না। আরফি এসব ঘটনার কিছুই জানতো না। তাদের এক ছেলে তাকে সব জানাতেই সেও দৌড়ে আসলো। “কি হয়েছে? কি করেছিস মেয়েটার সাথে?”
শেহতাজ বিরক্ত হলো। তাও প্রকাশ করলো না, “আমি কিছু করলে ও মহলে থাকতো না।’’
আরফি ঘরের দিকে এগোতে গেলেই শেহতাজ আটকে দিল। “ভিতরে ওকে চেঞ্জ করছে। পরে যা।”
আরফি নড়লো না। সে আর প্রশ্নও করলো না। বাইরে আবারো বৃষ্টি বেড়েছে। মহলের প্রতি কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়লো এ খবর। রুশা শুনতেই উতলা হয়ে উঠলো। আদিবা কোন ভাবে ওকে সামলে নিজেই ছুটে এলো। জ্বর পরীক্ষা করলো। তবে জ্বর মাত্রাতিরিক্ত। বোঝাই যাচ্ছে শরীর খুবই দূর্বল। প্রীয়তার পোশাক বদলানো হয়েছে। চুল শুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আদিবা কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা দিলো। জ্বরে স্বাভাবিক যা করা হয়!
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ডাক্তার এসে পৌঁছালেন। জ্বর একটুও কমেনি। ডাক্তার বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলেন। রক্তচাপ দেখলেন। পালস দেখলেন। চোখের প্রতিক্রিয়া দেখলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে গেছে। শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে। ঠান্ডাও লেগেছে।”
শেহতাজ স্থির গলায় বলল, “বিপদজনক কিছু?”
“এখন না। তবে খেয়াল রাখতে হবে।”
সাথে সাথে স্যালাইন লাগানো হলো। কয়েকটা ওষুধ লিখে দিলেন তিনি। আর বিশেষ নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন।
রাত বাড়তে লাগল। মহলের একে একে সব আলো নিভে গেল। চারপাশ নীরব। কিন্তু শেহতাজের ঘরের আলো নিভল না। সে বিছানার পাশে বসে রইল। নিঃশব্দে। অস্বাভাবিকভাবে। কখনো স্যালাইনের ফোঁটা দেখছে। কখনো প্রীয়তার কপাল। কখনো জানালার বাইরে অন্ধকার। তার নিজেরও বোঝা কঠিন, কেন সে উঠে যাচ্ছে না। কেন সে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাচ্ছে না। কেন বারবার নিশ্চিত হচ্ছে প্রীয়তার শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক আছে কি না? তার স্বভাবের সঙ্গে এই আচরণের কোনো মিল নেই। তবুও সে বসে রইল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আদিবা থাকতে চেয়েছিল। সে রুশার জন্য চিন্তা দেখিয়ে রাখেনি। রুবাইও থাকতে চেয়েছিল তাকেও রাখতে চায় নি। কিন্তু কেন এসব?
রাত প্রায় একটার দিকে দরজায় নরম টোকা পড়ল। শেহতাজ তাকাল। ভেতরে ঢুকলেন আনজুম আরা বেগম আর তার সাহায্যকারী। তার হাতে একটা ছোট পিতলের বাটি। শেহতাজ বিস্মিত হলো।
“মা?”
আনজুম আরা বেগম উত্তর দিলেন না। সোজা বিছানার কাছে এসে বাটিটা টেবিলে রাখলেন। “সরিষার তেল গরম করেছি। ঠান্ডা জ্বর তো এটা মালিশ করলে কাজে দেবে।”
সাহায্যকারীকে কোন কিছু বলতে হলো না। সে নিজ হাতে প্রীয়তার পায়ে গরম তেল মালিশ করতে লাগলো। শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মা প্রীয়তাকে একদম সহ্য করতে পারেন না। এতদিন সে কখনো একটা কথা বলতে দেখে নি এই মেয়েটার সাথে। তাহলে?
আনজুম আরা বেগম ছেলের মনের ভাব যেন বুঝলেন। ধীরস্বরে বললেন, “অপছন্দ করি মানে এই না যে মরুক চাই। এই খেলা বন্ধ কর তাজ। দিন শেষে আল্লাহর হিসেবের খাতা কিন্তু কারো জন্য পড়ে থাকে না।”
“মা…”
“আমি ভালো মা নই জানি। কিন্তু আমি কখনো চাই নি তুই তোর বাবার মতো হ। কেন মেয়েটাকে এ বাড়িতে এনেছিস?”
শেহতাজ কোনো উত্তর দিল না। আনজুম আরা বেগম আবার বললেন, “মেয়েটাকে যদি কোন প্রতিশোধের জন্য আনা হয় তবে বলবো ক্ষমা করে দে। আর যদি নিঃশেষ করতে আনা হয় তবে বলবো পাপ আর বাড়াস না। পরে ফেরার রাস্তা পাবি না।”
প্রথমবারের মতো তার চোখে ক্ষণিকের জন্য অদ্ভুত এক ভাবনা ঝলকে উঠল। আনজুম আরা বেগম আর দাঁড়ালেন। বেরিয়ে যাওয়ার আগে শুধু বললেন, “সকালে জ্বর না কমলে আবার ডাক্তার নিয়ে আসিস।”
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শেহতাজ সাহায্যকারীকেও বেরিয়ে যেতে বলল। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্রীয়তার কপালে হাত রাখল। জ্বর এখনো আছে। কিন্তু আগের চেয়ে সামান্য কম। অচেতন অবস্থায়ও প্রীয়তা কুঁকড়ে গেল। ঠোঁট নড়ল। মৃদু স্বরে যেন কিছু বলল। শেহতাজ ঝুঁকে এলো। শব্দটা খুব ক্ষীণ। তবুও সে শুনতে পেল, “...মেঘ...”
মুহূর্তেই শেহতাজের মুখের সমস্ত কোমলতা উধাও হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখ দুটো আবার ঠান্ডা হয়ে গেল। সে ধীরে সোজা হয়ে বসল।
বাইরে তখন গভীর রাত। আর তার সামনে অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকা মেয়েটা জ্বরের ঘোরেও অন্য কারো নাম উচ্চারণ করছে। কেন? মেঘই কেন? 
শেহতাজের কি নিজের নাম শুনতে ইচ্ছে হলো?
শেহতাজ দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু অন্ধকার জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। 
ওদিকে আদিবা ঘরে ফিরেই প্রীয়তার জ্বরের ব্যপারে বিস্তারিত যা জানতে পেরেছে ওটুকু জানালো। মেঘ চেয়ারে হেলান দিল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে এটা সামান্য জ্বর নয়। কিছু তো মারাত্মক হয়েছে! তার যত দ্রুত সম্ভব রুশা আর প্রীয়তাকে মহল থেকে বের করে আনতে হবে। মেঘ তার সামনে ছড়িয়ে থাকা সব তথ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে উত্তরটা কোথাও আছে। একেবারে চোখের সামনেই। তবু সে দেখতে পাচ্ছে না। তাকে কি আবারও শেহতাজ কিস্তিমাত দিচ্ছে? তার সব প্লানিং কি বিফলে? 
না না … এসব হতে পারে না। এবার মেঘ অনেক গুলো জীবনের বাজি লাগিয়েছে। ও ধরা পড়া মানে প্রীয়তা, রুশাসহ আরো অনেক গুলো মানুষ বিপদে পড়বে। মেঘ উঠে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলো। তার ভাবনারা তাকে আতঙ্ক দিচ্ছে। মেঘ আবার ঘরে আসতেই ঠিক তখনই অরুপ আবার এসে হাজির। মেঘ ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত অনেক। অরুপ বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলল, “লুকিয়ে এসেছি। বাড়ি ফিরে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। কতো দিন হলো সারা রাত ঘুরে বেড়াই না!! তাছাড়া বাড়ি ফিরলেই বোর লাগে। সবাই ভাবে আবার কিছু করে বসবো। চোখে চোখে রাখে সব সময়।”
মেঘ ঠিক প্রতিক্রিয়া দিতে ভুলে গেল। অরুপ আবার বলল, “আমি জানি তুই ঘুমাবি না। তাই ভাবলাম আজ লুকিয়ে তোর সাথে অনুসন্ধান চালাই। দারুন সময় যাবে।”
মেঘ নিজেকে স্বাভাবিক রেখেই চেয়ারে বসল, “তোর উপর নজর রাখা অস্বাভাবিক তো নয়! তোর বিহেবিয়ারই ওমন চাইল্ডিস।”
অরুপ মেয়ে মানুষের মতো ভেংচি কেটে খাটের উপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। মেঘ নিজের ভয়টুকু অরুপকে বুঝতে দিল না। সে চায় না অরুপ এসব জানুক। মেঘ প্রীয়তার অসুস্থতার বিষয়টাও আড়াল করে গেলো নিদারুণ ভাবে। 
চলবে…? 
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই} ♥️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন